গল্পটির নাম হতে পারে 'আমেরিকা'

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি
লিখেছেন কুঙ্গ থাঙ [অতিথি] (তারিখ: শুক্র, ২৭/০৭/২০১২ - ৪:৪৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব
বেড়ার কাণ বা ছিদ্র দিয়ে উঁকি মারাটা তার অভ্যাস থেকে এখন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বন্ধুরা তাই তার নাম দিয়েছে কাণসিং। লোকজন এখন নিজের বাড়ীতে নিজের বউকে আদর করতে লজ্জা পায়, পূর্ণিমাপক্ষের রাত্রিগুলোতে একটু রোমান্টিক হবার সুযোগ নেই; কার দিকে চোখ রাখবে তারা, বউয়ের, না জানালার ফাঁকে, নাকি বেড়ার ছিদ্রে? বেড়াটেড়ার ছিদ্র নিয়ম করে কয়দিন আর বন্ধ করে রাখা যায়, মানুষটা বিন্দুর মতো ছিদ্র দিয়েও যখন গোটা দুনিয়া দেখতে পায়, আর না দেখার জিনিষগুলো তো দেখে আরো বেশি।

কাণসিঙের দুইচোখকে বাহবা না দিয়ে উপায় নেই।

ধরা না পড়লে তার এই কীর্তির কথা কেউ হয়তো জানতে পারতো না। প্রথম সে ধরা খায় বাবানুর কাছে। রৌদ্রদগ্ধ দুপুর, চারদিকে যখন সুনসান নীরবতা; সদ্যবিবাহিত দম্পতির পিরীত তখন উছলে পড়তে চায়, সময় অসময়ের ধার ধারে না। আখ চিবাতে চিবাতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল কাণসিং। হঠাৎ কি শুনে কে জানে, থামে, তারপর একটু ভাবে, তারপর আস্তে আস্তে হাঁটা ধরে অন্য পথে।

দরজায় তার জন্য কোন না কোন ছিদ্র থাকেই, বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘরের ঘটনার মতো - চাঁদ সওদাগর এতো চেষ্টাচরিত্র করেও বেহুলার বাসরঘর নিচ্ছিদ্র রাখতে পারেনি। বাবানুরও পারার কথা না। দরজার ছিদ্রে একচোখ লাগিয়ে মগ্ন হয়ে পড়ে কাণসিং। কোনদিকে খেয়াল নেই। দর্শনের আনন্দে চোখেমুখে রোমাঞ্চ। জিভ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে। হঠাৎ কখন দরজা খুলে যায় বুঝতে পারেনা। চেয়ে দেখে সামনে দাঁড়ানো সাক্ষাৎ যম, বাবানু!
: এই ব্যাটা তুই এখানে কি করস?
: না মানে বাবানুদা তোমার কাছে আসছিলাম এক কাজে।
: কাজে আসছিলা তো ডাক না দিয়া দরজায় কি করস?
: (ভয়ে ভয়ে) না মানে তোমারে ডিস্টার্ব করতে চাই নাই।

এরপরের কথাবার্তা সত্যমিথ্যা মিলে যেখানটায় গিয়ে দাঁড়ায় তাতে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয়না। দৌড় লাগায় কাণসিং, তার পেছনে পেছনে বাবানু। পরে কার না কার বাড়ীর খাটের তলায় লুকিয়ে সেদিনকার মতো রক্ষা পায়।

তারপর ঘর থেকে ঘরে, গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে যায় এই কাহিনী, কাহিনীর সাথে রং মাখানো আরো কাহিনী যোগ হয়। আতংক ছড়িয়ে পড়ে দম্পতিদের ভিতর। প্রেমভাবের স্বাধীন বিকাশ দুরে থাক রাতের ঘুমটুকুও হারাম হবার যোগাড়। গভীর রাতের ঝগড়াঝাটি, চিৎকার চেঁচামেচির হার বাড়তে থাকে। এই সেদিনই তো কাবকলেই তার পতিদেবকে নপুংশক বলে গালি দিয়েছিল, সেই গালি শুনে উঠানে বসা কুকুরটি পর্যন্ত পুরুষ সমাজের অপমান সহ্য করতে না পরে ঘেউ ঘেউ শব্দে পাড়া মাথায় তুলে রাখে সারারাত।

প্রথম প্রথম বিষয়টা তেমন আমলে নেয়নি কেউ, অনেকে বরং মজাই পেত। আশ্চর্য গা শিরশির করা এক ব্যাপার - শুনতেও সুখ। বন্ধুসমাজে তো উৎসবের আনন্দ। আহ ভার্চুয়াল সেক্স। ময়ুরীর বাংলা সিনেমা দেখেও এই আনন্দ পাবার নয়। এদিকে কাণসিংও রসিয়ে গল্প বলতে ওস্তাদ। ঝালমসলা মিশিয়ে জিনিষটাকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায় সে। যেমন -
: দোস্তো, রসবতীটা যে কি হইসে দেখলে তোদের বিশ্বাস হইব না!
: ধুর ব্যাটা কি কস! রসবতী??
: হ রে ভাই। দুনিয়াতে যদি নামকরনের সার্থকতা বইলা যদি কিছু থাকে তাইলে রসবতীই তার প্রমাণ।
তারপর চোখ-মুখ-নাকের জল ফেলতে ফেলতে রসবতীর সাথে তার নামের মিল প্রমাণ করতে কাণসিং যে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়, তার কাছে এক টিকেটে দুই ছবি ফেইল।

কে কাকে কতক্ষন আর পাহারা দিয়ে রাখে। তাছাড়া ব্যাপারটি এই পর্যায়ে গড়াবে কেইবা জানতো। যার নিজের ঘাড়ে পড়ে সেই শেখে। এই যেমন, কান্দু ছিল তার এক নম্বর শ্রোতা। কান খাড়া করে সে কাণসিঙের গল্পগুলো শুনতো, শুনার পর শরীর ঠান্ডা করতে পুকুরে ঝাপিয়ে পড়তো। সেই কান্দু নিজেই যেদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসলো, তার আগের দিন এসে কাণসিংকে শাসিয়ে গেল তার ঘরে উপদ্রব না ফেলতে। এর তিনদিন বাদেই আসরে কান্দুর প্রথম রাতের রসালো বর্ণনা বয়ান করে কাণসিং। কথাটা একান ওকান হয়ে যখন কান্দুর কানে পৌছায় তখন "খানকির পোলারে আমি আইজ.." বলে দা নিয়ে বের হয় সে, যদিও সেদিন কাণসিঙের হদিশ পাওয়া যায় না।

এভাবে চলতে চলতে বিষয়টি রসকেলি থেকে একসময় মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, কেননা মান-সম্মানের সাথে অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। কি করা যায় কি করা যায়- কেউ ঘরের বেড়া বদলায়, কেউ দরজা-জানালা ঠিকঠাক করে - সবকিছু নিচ্ছিদ্র নাহয় রাখা গেল - কিন্তু শব্দ? কাণসিং ততোদিনে রবতত্ত্বও বের করে ফেলেছে, তার এখন ছিদ্র দিয়েও দেখতে হয়না, কান পাতলেই সব বুঝে ফেলে। প্রাইভেসী বলে কিছু আর থাকে না। কিছু করারও থাকেনা। কে কাকে কি বলে দোষারোপ করবে - প্রমাণ সাক্ষী কিছুই তো নাই। তাছাড়া কাণসিঙের শ্রোতা ভক্তের অভাব নাই, তারা নীরব সমর্থন দিয়ে যায়।

শেষ পর্ব
বিয়ে করে বরং সমস্যায় পড়ে যায় কাণসিং। বউয়ের কাছে মধুর রাত কাটানোর ভাগ্য তার হয়না। মনে শান্তি নেই, সারাক্ষন চিন্তা, বেড়ায় কেউ চোখ লাগালো না তো, আড়ি পাতলো না তো। কিছুক্ষন পরপর গলা খাকাড়ি দেয়, মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই "কে, কে" বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। বউটা পড়লো আরো অশান্তিতে। শরীরে মনে সুখ না থাকলে কিসের শান্তি? তবে এতো অশান্তির মধ্যেও বদভ্যাসটা ছাড়তে পারেনা কাণসিং।

সেদিন রাতে টর্চ নিয়ে মিশনে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের শেষ মাথায় পৌঁছে গেল। শেষ মাথায় দুম্বুলদের বাড়ী। বন্ধুমহলের প্রায় সবাই বিয়ে করে ফেললেও দুম্বুল এখনো বিয়ে করেনি। তার বিয়ে না করার কি কারণ থাকতে পারে চিন্তা করতে করতে শুনতে পায় দুম্বলদের ঘরের ভেতর মৃদু গোঙানির আওয়াজ। থেমে যায় কাণসিং, সন্দেহ বাড়ে, সাথে উত্তেজনাও। এগিয়ে গিয়ে বেড়ায় ছিদ্র খুঁজতে থাকে, পেয়েও যায়। চোখ পেতে দেখতে পায় দুম্বুলের অসুস্থ মা মুখে গোঙানির মতো শব্দ করে ঘুমাচ্ছে। ধুর! আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে কাণসিং বাড়ীর পথ ধরে।

: হায় হায় তুমি এতোরাইতে আসছ কেন? সে যদি দেইখা ফালায়?
: তোমারটা গেছে তার পুরান ডিউটিতে। এতো তাড়াতাড়ি ফিরত না।
: বাইরে যাই চল।
: না, আজকে ভিতরেই হউক না।
নিজের ঘরের ছিদ্র দিয়ে দুম্বুলের সাথে বউ অঞ্জুলিকে যে ভংগিতে দেখলো তাতে কাণসিঙের বুকটাই ছিদ্র হয়ে গেল।

মুল গল্প: শুভাশিস সিনহা। 'মানু কিদিয়া লেহাউশপাৎ লাল্লাম ইতারাতা' (পৌরি প্রকাশন, ২০১১) গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া।
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা থেকে অনুবাদ: কুঙ্গ থাঙ


মন্তব্য

সুমাদ্রী এর ছবি

গল্পটা একটু রসালো হলেও এই ঘটনাগুলো ভয়ানক। বাংলাদেশের যেকোন শহরের তুলনামূলকভাবে কম খরচের হোটেলগুলোতে স্বামী-স্ত্রী অথবা যুগলদের রাত্রিযাপন করাটা এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে। বিদেশী পর্ণোছবি দেখতে দেখতে বোর হয়ে যাওয়া অবদমনের স্বর্গে বসবাসরত আমাদের কিশোর-তরুনদের জন্য গোপন ক্যামেরায় ভিডিও করা দম্পতি অথবা যুগলদের অন্তরঙ্গ মুহুর্তগুলো খুবই উপভোগ্য। এটা এখন দারুণ ব্যবসা, এটা দিয়ে সহজেই প্রতারণা করা যায় যেহেতু আমাদের রক্ষণশীল সমাজে যৌনতা ব্যাপারটাই একটা ট্যাবু। কোথাও সঙ্গী নিয়ে রাত্রি যাপন করতে গেলে ভালবাসা করার আগে রুমটাতে অপারেশন '' খোঁজ দ্য সার্চ '' চালানোর জন্য সবার কাছে পরামর্শ রইল। কে জানে আপনার নিজের প্রেমের কাহিনী হয়ত আপনাকেও দেখতে হতে পারে কাকতালীয়ভাবে।

অন্ধকার এসে বিশ্বচরাচর ঢেকে দেওয়ার পরেই
আমি দেখতে পাই একটি দুটি তিনটি তারা জ্বলছে আকাশে।।

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

বহুদিন আগে ময়মনসিংহ শহরে এক হোটেলে উঠেছিলাম। দরজায় হাতলের নীচে দেখি ছোট্ট এক ছ্যাঁদা। কি আর করা, ভিতর থেকে স্কচটেপ মেরে বন্ধ করে দিলাম। ঐ সামান্য ছ্যাঁদার পিছনে কত বড় বড় ইতিহাস লুকিয়ে আছে কে জানে!

ক্রেসিডা এর ছবি

চলুক তীব্র ও তীক্ষ্ণ; ভালো লাগলো।

__________________________
বুক পকেটে খুচরো পয়সার মতো কিছু গোলাপের পাঁপড়ি;

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ। মুল লেখাটির ভাষারীতি অনুসরন করার চেষ্টা করেছি যদিও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।

রিয়েল ডেমোন এর ছবি

আসলে নিজের খারাপ গুণ নিজের উপরেই আসে খাইছে

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

হ। হোয়াট গোজ এরাউন্ড কামস এরাউন্ড।

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

সেইটাই।

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

তারেক অণু এর ছবি
ছিন্ন_পাতা এর ছবি

অনুবাদ বলে মনে হয়নি।

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ পড়ার জন্য এবং মন্তব্যে রাখার জন্য।

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

ধন্যবাদ, তারেক অণূ হাসি

কল্যাণ এর ছবি

ঝরঝরে, একটানে পড়ে ফেললাম চলুক

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

কৌস্তুভ এর ছবি

আমি আপনার অনুবাদের অনুরাগী হাসি

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

কিছুটা হইলেও লজ্জা পাইলাম, লজ্জার মধ্যেই ধন্যবাদ হাসি

শান্ত এর ছবি

অনেকদিন পর লিখলেন। ভালো লাগলো।

__________
সুপ্রিয় দেব শান্ত

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

পড়ার জন্যে অশেষ ধন্যবাদ থাকলো।

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাল লাগলো। ধন্যবাদ।

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

আপনাকেও ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

ভালো লাগল। ধন্যবাদ।

i_am_rebel

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

আইচ্ছা হাসি

অরফিয়াস এর ছবি

গল্পটা মজার হলেও বিষয়টি গভীর। অনেকগুলো দিক থেকে একে যাচাই করা সম্ভব। নিজের ঘরের ছিদ্র বন্ধ না করে অনেকেই অপরের ছিদ্র ঢাকতে দৌড়ায়- এটাও একটা দিক মনে হলো। তবে মূল গল্প থেকে এরকম অনুবাদ আসলেই প্রশংসাযোগ্য।

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

ঠিকই বলেছেন প্রথম প্রথম নিছক পিপিং টম স্টোরি বলে মনে হলেও গভীরভাবে ভাবলে অনেক দিক বের হয়ে আসে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

সজল এর ছবি

গল্পটি মজার। কাণসিঙ কি আমেরিকার রূপক?

---
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

কুঙ্গ থাঙ এর ছবি

হাসি

পথিক পরাণ এর ছবি

যাক। দেরীতে হৈলেও আপনি লিখলেন। আপনার আগের লেখাগুলোও অসাধারণ।

চলুক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।