বাতি জ্বালানো বুড়োর স্মরণে

মাসুদা ভাট্টি এর ছবি
লিখেছেন মাসুদা ভাট্টি (তারিখ: শনি, ০৪/০৪/২০০৯ - ৯:৩৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১.
কবি বললেন, জ্যোছনার নদী ঘুমুবে এখন; তীর্থযাত্রী তখন সূর্যের কথা তুললেন, তবে কি বিদায়ের ক্ষণ ঘনালো, কবির চোখে ঘাম। নির্জনতার প্রয়োজন খুব, নাহ্ আত্মার নির্লিপ্ততার – তর্কটা জমেই ওঠে। কাল এই রাত শেষ হবে, তখন আমাকে খুঁজে নিও বন্ধুত্বের মোড়ে – কবি ও তীর্থযাত্রীর বিদায় সম্ভাষণ।

২.
যদি মানুষ না হতাম, তাহলে কী হতাম আমি? গাছ নাকি এগাছ ওগাছ করা চারপেয়ে? পাখি হওয়া যেতো যদি? খারাপ কি হলে বাবুই কিংবা শালিক? হাঁস হলেও মন্দ হতো না, জলে আকাশে ভূঁয়ে, আহ্ কী দারুণ হতো। পাথর হতাম যদি এক জায়গায় আজীবন, বেশ কাটিয়ে দেয়া যেতো কিংবা বৃষ্টির ফোঁটা অদৃশ্য সূঁতো বেয়ে নিরুদ্দিষ্ট থেকে ঝরতাম; আমাকে অবশ্য কী হতে চাই সে প্রশ্ন কেউ করেনি; মানুষ হওয়ার এই দুঃখ আমি কী দিয়ে ঢাকি!

৩.
গলাব্যাথার মতো আঁটকে থাকা সত্য বলতে এসেছি, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে সত্যটা আমায় বলতেই হবে, ব্যাথায় ভেঙে পড়তে পড়তে যদিও, দয়া করে স্মরণ করিয়ে দিও না কোনও অতীত সুখের কথা, আমরা আজ অতীতচারী নই, প্রতিশ্রুতি রাখার কথাও বলো না, আমি শুধু এটুকু সত্য যা কাশির মতো আঁটকে আছে গলার ভেতর, তা বের করে দিতে চাই – ভালোবাসি।

৪.
কারো আমি বন্ধু। কারো বোন। কারো ভাই। কারও কন্যা কিংবা পুত্র; মা অথবা বাবা। তুতো বোন অথবা ভাই, চাচা, ফুপু; কেউ বা শুধুই নামে – আমার পরিচিত মানুষের কাছে আমি তাই, অপরিচিতরা জানে আমি মানুষ। এক ঘর, এক পৃথিবী ভর্তি মানুষের মুখ, আমি কাউকে চিনি কাউকে চিনি না, কেউ কাউকে চেনে না, অথচ একে অন্যকে একটা সম্পর্ক দিয়ে চেনার চেষ্টা করে, ঘটা করে সম্পর্কের নামও দেয়, মিথ্যের সম্পর্ক, ছলনার সম্পর্ক, প্রতিশোধের সম্পর্ক, ভণিতার সম্পর্ক – এতো মুখ এতো সম্পর্কের সবটাই প্রেমহীন তবে? অপরিচিত মানুষের অপরিচিত স্বর, আমারও তাই, যদিও আমার মুখই আমার কাছে পরিচিত নয়, আমার সঙ্গেই কি আমার কোনও সম্পর্ক আছে? তাহলে আমার গল্পটাও তো ভিন্ন কিছুই নয়। এই মানুষভর্তি পৃথিবীর মতো বিশাল কামরায়, কেউ কেউ আমার বন্ধু, কেউ কেউ দূরবর্তী আত্মীয়, অথচ আমরা কেউ-ই কারো নই, কেউ কাউকে আসলে চিনি না; যদিও আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে, আছে সেই সম্পর্কের বিশাল নামও।
৫.
অর্থনীতি বদলেছে, বদলায় সাদা বাড়িটির কর্মচারীরা, সবুজ নোটের ওপর ছাপানো মুখটিও বদলায় মাঝে মাঝে, শুধু বদলায় না পুরোনো মিথ্যে কথা, প্রতিশ্রুতি আর দেঁতো হাসিসমূহ। শত্রুও বদলায় মাঝে মাঝে, কেউ কেউ দীর্ঘ হত্যাযজ্ঞ শেষে অবসরে যায়, আগে তবু রক্তপিয়াসুরা বীরের মর্যাদা পেতো, তারা মৃত্যুবরণ করতো সম্মুখ সমরে; এখন যুদ্ধদৃশ্যের পরিচালক নির্বাচনে জয়ী হয় ব্যাপক জনপ্রিয়তায়; তারপর সে নতুন উদ্যোমে মানুষ হত্যার পরিকল্পনা করে।

৬.
রাস্তাটি এক সময় জীবন্ত ছিল, আলো ছিল, টিমটিমে হলেও, তাতে ঢ়েরির তেল ঢেলে যেতো কেউ, তার দুঃখ মাখানো মুখে গণহত্যার ছায়া ছিল, সে বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে ভাবতো, মাথার ওপরে আকাশে কিছু আছে, কিছু একটা, যদিও ডানে-বামে, ওপরে নীচে কিছুই দেখা যায় না, সে চোখ বন্ধ করে, অবিশ্বাস নিয়ে, তার হৃদয় তার জিভের কাছে উঠে আসে, টের পায় সে; চোখে কি তবে কালো ছাই পড়লো? জিভে কয়লার স্বাদ, সত্য গিলে খেলে যেমন হয়, সে রাতের কথা ভাবে, দিনের ভূত ঘাড়ে নিয়ে রাত আসছে, গতকালের মতোই হয়তো আজকের রাত, তার পাকা দাঁড়ির মতো, সময়ের উকুন সেখানে কিলবিল করছে, ঢ়েরির বাতির আলোয় তার দাঁড়ির উকুনগুলিকে লাল দেখায় – বৃদ্ধ হলেও মানুষের রক্ত তার শরীরে।
৭.
আকাশের ভাগ্য ভালো, সে কিছু তারা পেয়েছে; পৃথিবীর ভাগ্যটা খুব খারাপ, সে কিছু মানুষ পেয়েছে। তারা তারা গেলে না, ক্ষুধার্ত সূর্য চাঁদ গিলে খায় যদিবা, দিনশেষে উগরে দেয় তাও। অথচ পৃথিবীতে কালো বৃষ্টি ঝরে, সাগর বুক চিতিয়ে ওঠে, বিদ্যুৎ বজ্র বুক চিরে ফালাফালা করে। আকাশ তাই তারাদের নিয়ে সফল, পৃথিবী শুধুই মানুষ নিয়ে ব্যর্থ; লাজ-লজ্জাহীন মানুষ।

৮.

সূর্য বিদায়ের দৃশ্য আঁকতে নেই কারণ তাতে বরাবরই কম পড়বে রং, আমি শিখেছি এই সত্য। আমার শরীরের ভেতর ঘোড়ার খুরের উদ্দামতা নিয়েও আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। পাথরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা জোঁকের ঝিলিক দেখেও আমি ভিত না হতে শিখেছি। না চাইলেও শুনতে শিখেছি আমি। ভালোবাসা ও ঘৃণা দু’টোই শিখেছি, আমি সহজ ও সরল হতে শিখেছি, যদিও আমার শৈশবে ফিরে যাওয়া শিখিনি; জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করা শিখেছি আমি, মৃত্যু এবং একাকীত্বের সঙ্গে বসবাসও শিখেছি - কেউ হাত বাড়িয়ে দিলে তা ধরতে হয়, এই শিক্ষা আমায় সভ্যতা দিলো, অথচ হাতের উষ্ণতা কিংবা শীতলতা, টের পেতেও শিখেছি আমি, কেউ শেখায়নি, আমি নিজেই শিখেছি তা।

৯.

সাদা গোলাপটির কোনও পাপড়ি ছিল না। মলিন ফুলদানিতে তাকে ন্যাড়া দ্যাখাচ্ছিলো খুব, পানি দেয়নি কেউ, তাই হয়তো সব পাপড়ি ঝরে গেছে; কাঁদতে কাঁদতে ঝরে গেছে – পাপড়িগুলো ঝরে যেতে যেতে এই পৃথিবীর কথা ভাবছিলো।


মন্তব্য

নীড় সন্ধানী [অতিথি] এর ছবি

যথারীতি ভালো লাগলো।


শত্রুও বদলায় মাঝে মাঝে, কেউ কেউ দীর্ঘ হত্যাযজ্ঞ শেষে অবসরে যায়, আগে তবু রক্তপিয়াসুরা বীরের মর্যাদা পেতো, তারা মৃত্যুবরণ করতো সম্মুখ সমরে; এখন যুদ্ধদৃশ্যের পরিচালক নির্বাচনে জয়ী হয় ব্যাপক জনপ্রিয়তায়; তারপর সে নতুন উদ্যোমে মানুষ হত্যার পরিকল্পনা করে।

সত্য যে নিষ্ঠুর, সেই নিষ্ঠুরতায় বসবাস আমাদের।

মাসুদা ভাট্টি এর ছবি

আসলে কী ভাবে বলি? এই লেখাগুলো জর্নালের মতো, যখন যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবে লিখেছি, আমার মনের অবস্থার অপাঙ্গ রূপ এগুলো। বেশ কিছুদিন আমি কিছুই লিখছিনা, কিংবা যখন লিখি না কিছুই, ঠিক সেই সময়গুলো ভরে থাকে এরকম টুকরো টুকরো কথামালায়, বলা যায় এরাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। এখানে এগুলো তুলে দেয়ার ইচ্ছে ছিল না মোটেও, কিন্তু অনেক দিন কোনও লেখা দেইনি, নিজের এই অনুপস্থিতি নিজেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কষ্ট হচ্ছিলো খুব, তাই এগুলো, যা আমার একান্তই নিজস্ব, তাই-ই তুলে দিয়েছিলাম; আপনাদের ভালো লেগেছে, এই ভালো লাগা আমাকে ছুঁয়ে গেছে দারুণ ভাবে, মুগ্ধ করেছে, আর করেছে সাহসী। কিন্তু দুঃসাহসেরও সীমা আছে, আমি তাই লাগাম টানছি।
আমাকে নিংড়ানো এই জলজ বুদ্বুদ কারো বিরক্তির কারণ হওয়ার আগেই সরিয়ে নিচ্ছি; আবারও এদেরকে গুটিয়ে নিচ্ছি আমারই ভেতর- এরপর অন্য কোনও লেখা।

শুভেচ্ছা সবাইকে।

নুরুজ্জামান মানিক এর ছবি

অন্য কোনও লেখা দিবেন জেনে যত খুশি হলাম ততটুকু আহত হলাম আপনার 'আবারও এদেরকে গুটিয়ে নিচ্ছি আমারই ভেতর' ঘোষণায় ।

নুরুজ্জামান মানিক
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)

নুরুজ্জামান মানিক
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)

ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি

অতিসংবেদনাই লেখকের সম্পদ। সেই সম্পদের আরো কিছু ব্যবহার বোধহয় এই জার্নাল ধরনের লেখাগুলো। ভাল লাগে ভাষার আস্বাদ। তবে আরো কিছুটা মূর্ত হলে মনে হয় কমিউনিকেশন বেশি সম্ভব হয়।

হাঁটাপথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে। হে সভ্যতা! আমরা সাতভাই হাঁটার নীচে চোখ ফেলে ফেলে খুঁজতে এসেছি চম্পাকে। মাতৃকাচিহ্ন কপালে নিয়ে আমরা এসেছি এই বিপাকে_পরিণামে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।