মেট্রোপলিটন লাইন

মনামী এর ছবি
লিখেছেন মনামী (তারিখ: বুধ, ০১/০২/২০১২ - ৬:৪৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এগুলা কি ছবি? স্থির না, কাজেই ছবি বলা চলে না। দৃশ্য? সিনেমার মত? কিন্তু বানানো না। কেউ কারো ভূমিকায় অভিনয় করছে না। কিংবা করলেও শামীম জানে না, জানতে চায়ও না। সে খালি দেখে, দেখে যায়, দেখতে দেখতে যায় গন্তব্যের দিকে।

দুইটা মেয়ে কথা বলতে বলতে রান্না বসানোর কথা ভুলে যায়, এক মাঝবয়েসী মহিলা ঘরময় ছড়িয়ে থাকা খেলনা কুড়ান, টিভিতে কিছু একটা দেখে উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠে এক যুবক, একটা ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়ান এক লোক।

ট্রেনের স্বচ্ছ দরজায় শামীমের ছায়া পড়ে। ছায়ার ফাঁক দিয়ে শামীম দেখে ঘর। ঘরের পর ঘর পার হয়ে ট্রেন ছুটতে থাকে। শামীমও ছুটছে। দিন গুনতে গুনতে একসময় বছর হয়ে যায়, বছর গোনা তুলনামূলকভাবে সহজ। পেছনে অনেক কারণের ভীড়, একটা বেছে নিয়ে বলা মুশকিল। তবে এই সাজানো শহরে নিজের মতো করে থাকতে পারাটাই বোধহয় মোটের উপর প্রধান কারণ। পরিবার, সমাজ, দেশের স্বস্তিপ্রদ গণ্ডির ভেতরে চলাফেরার ক্ষেত্রে নানা শর্ত প্রযোজ্য। এখানে শর্ত নাই। যদিও স্বাধীনতা বহাল রাখতে টোল দিতে হয়।

তাই ট্যাকে কড়ির ঝনঝনানি শুনতে শামীম দৌড়ায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দৌড়ে কেন যেন কখনই পেরে ওঠে না। সপ্তাহের শেষে কিছুটা থামা যায়। সপ্তাহের শুরুতে স্বাধীনতা টোল নিতে হাজির হয়।

তারপরও শামীম বেশ ভালো আছে। কেবল থাকার জায়গা থেকে কাজের জায়গা পর্যন্ত লম্বা পথ পাড়ি দেয়ার সময় ট্রেনটা যখন ঘরের পর ঘর পার হয়ে ছুটতে থাকে, সেসব ঘরের জানালা দিয়ে টুকরো-টাকরা জীবন ছিটকে পড়ে। টেবিলের উপর বিশাল এক কাগজ বিছিয়ে আঁকিবুঁকি করে এক কিশোর, সোফায় শুয়ে চুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে বই পড়ে এক তরুনী, জানালার কাঁচে নাক চেপে অজানা মানুষের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে এক শিশু আর রাতের খাবার খেতে এক এক করে টেবিলে জড়ো হতে থাকে একটা পরিবার। মেট্রোপলিটন লাইন শামীমকে থাকার জায়গা থেকে কাজের জায়গায় নিয়ে যায়, কিন্তু ফিরিয়ে আনে না।
`


মন্তব্য

নুসায়ের এর ছবি

এই দেশে মেট্রো চলে কালো গহ্বরের ভেতর দিয়ে। কাজে যাই, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশন। মাঝে অন্তহীন কালো আধার। কানে হেডফোন গুজে পাথুরে মুখের লোকজন বসে থাকে। এমন স্বাধীনতার চেয়ে পরাধীন থাকাটাও শান্তির ছিল।

লেখাতে হাততালি

মনামী এর ছবি

এখানে ট্রেন মাটির উপর দিয়াও চলে, নিচে দিয়াও চলে...উপরে নিচে সবখানেই পাথরমুখ মানুষ। অনেক দিন পর লিখলাম, ভাল্লাগলে ভালো...

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পরিবার, সমাজ, দেশের স্বস্তিপ্রদ গণ্ডির ভেতরে চলাফেরার ক্ষেত্রে নানা শর্ত প্রযোজ্য। এখানে শর্ত নাই। যদিও স্বাধীনতা বহাল রাখতে টোল দিতে হয়।

শর্ত নাই - কথাটা ঠিক না। শর্ত থাকেই, তবে সেটা অন্য রকম। টোল দেয়াটাও শর্তের অন্তর্গত।

ট্রেন থেকে জীবনের ছবি দেখার ব্যাপারটা পড়তে গোর্কির 'পীত দানবের পুরী'র কথা মনে হল।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মনামী এর ছবি

হুম! আপনার সঙ্গে একমত...মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ

নীড় সন্ধানী এর ছবি

মুগ্ধতা ছড়িয়ে গেল গল্পটা। কোথাও কোথাও কোথাও..........কি যেন ভাবনা উঁকি দিয়ে গেল।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

মনামী এর ছবি

হাসি

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ এর ছবি

ছোট্ট কিন্তু দারুণ

------------
'আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

মনামী এর ছবি

ছোট হয়ে গেছে বেশী...ধন্যবাদ

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

মন ছুঁয়ে গেল আপনার লেখা ।
আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মনামী এর ছবি

আপনাকেও আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

ধূসর জলছবি এর ছবি

ভাল লাগল

মনামী এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

সবুজ বাঘ এর ছবি

তাইলে শামীন বাসায় না ফিরলে ওর ভাত ক্যারা খাইয়া দিব? ওরে ফিরবার কন...

মাসুম এর ছবি

ছোট কিন্তু চমৎকার ! ভাল লাগছে

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

ভাল লাগল।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।