শূকরের মাংস ও একটি অমীমাংসিত সম্পর্ক

শামীম হক এর ছবি
লিখেছেন শামীম হক (তারিখ: রবি, ৩০/০১/২০১১ - ২:০২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এই পাড়ার মানুষ পরচর্চা করতে ভালোবাসে। তারা সময় সুযোগ পেলেই ঘরে এবং বাইরে পাড়ার অন্যান্য মানুষদের বা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী নিয়ে কানাঘুষা করে। এসব কানাঘুষার বিষয়বস্তুর নির্দিষ্ট কোনো ধরণ না থাকলেও কিছু কিছু বিষয়ে কানাঘুষা চলে অনেকটা নিয়মিত। তাদের এ ধরণের নিয়মিত কানাঘুষার বিষয়বস্তুর মধ্যে যারা পড়ে তাদের মধ্যে অন্যতমরা হচ্ছে আসগর সাহেবের মেয়েলী স্বভাবের কলেজ পড়ুয়া ছেলে পলাশ, একই বাড়ির নিচের তলার মেসের ভাড়াটিয়া মফঃস্বলের যুবক জাফর যে ঢাকায় থেকে স্নাতক পড়ে, তাদের উল্টোদিকের দুই বাসা পরের বাসার চোখ-মুখ আর শরীর দিয়ে কথা বলায় পারদর্শী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রেশমা এবং গলির শেষ বাসার পাঁচ তলার ভাড়াটিয়া ল্যাংড়া ফরিদ, তার বউ ও শালী। এদের নিয়ে প্রায়ই অন্দরে, কিংবা পাড়ার চায়ের স্টলে, মুদি দোকানে, স্টেষনারী দোকানে, নাপিতের দোকানে, মোবাইল ফোনের দোকানে নানা রকম রসালো আলোচনা হয়ে থাকে। অবশ্য যদি কখনো হঠাৎ কোনো অতি উত্তেজনাপূ্র্ণ ঘটনা ঘটে যা সম্পূর্ণ মনোযোগের দাবি রাখে তাহলে এদের নিয়ে আলোচনা কিছুদিন স্থগিত থাকে এবং লোকে নতুন উত্তেজনাপূ্র্ণ ঘটনাটি নিয়ে আলোচনায় বা কানাঘুষায় মেতে ওঠে। তারপর ঘটনার উত্তেজনা কমে এলে তারা আবার তাদের নিয়মিত কানাঘুষার বিষয়গুলোতে ফিরে আসে। তখন হঠাৎ উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলো যদি যোগ্যতা রাখে তাহলে নিয়মিত কানাঘুষার বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়, আর তা না হলে লোকে সেগুলো ভুলে যায়। সম্প্রতি তেমনি একটি মনে রাখার মতো অতি উত্তেজনাপুর্ন ঘটনা ঘটে যায় গলির মুখের বাসস্ট্যান্ডের লাগোয়া কিসমত সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্টে।

কিছুদিন আগে দুপুরের পরে বিকাল প্রায় হয় হয় এমন সময়ে কিসমত সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্টে একটি গোলমাল বাধে। এ সময়টায় দোকানে ভীড় তেমন থাকে না। দোকানে দুয়েকজন বাস ড্রাইভার বা মুদি দোকানদার ছাড়া তেমন কেউকে দেখা যায় না। মানিক ও তার দলটি আড্ডা দিতে আসে আরো পরে সন্ধ্যার দিকে। সেদিনও মুখ চেনা একজন বাস ড্রাইভার, দুজন কন্ডাক্টর আর উল্টোদিকের মুদি দোকানের দোকানদার মোকাম্মেল বেলা করে দুপুরের খাওয়া সেরে নিচ্ছিলো। তারা ছাড়া সেদিন আরো একজন মুখ না চেনা মানুষ ছিলো সেখানে, যাকে দেখতে মোটেই বাস ড্রাইভার বা মুদি দোকানদার মনে হয়নি। মাঝ বয়সী লোকটির পোষাক পরিচ্ছদ দেখে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছিলো। সে বসেছিলো অন্যদের থেকে একটু দূরে একা একটি টেবিলে। সঙ্গে একটি ব্যাগও ছিলো। কিসমতের রেস্টুরেন্টে এমন মানুষকে অবেলায় ভাত খেতে দেখা যায় প্রায়ই। লাগোয়া বাসস্ট্যান্ডটির কারণে চেনা অচেনা অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে এখানে খেয়ে নেয়। তাই কেউ লোকটিকে গোলমালটি বাধার আগে লক্ষ্য করেনি। লোকটি প্রথমে এক অর্ডার হাফ প্লেট খাসির তেহারী খায়। তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আরেক অর্ডার হাফ প্লেট তেরারী নেয়। তারপর সময় নিয়ে খাওয়া শেষ করে প্লেটে হাত ধোয়। তারপর পাশে রাখা ব্যাগটি কাঁধে তুলে নেয়। তারপর মানিব্যাগটি বের করে হাতে নিয়ে হোটেল ম্যানেজারের কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বেয়ারার হাঁক দিয়ে দাম বলার জন্য অপেক্ষা করে। গোলমালটি শুরু হয়েছিলো বেয়ারা হাঁক দিয়ে তেহারীর দাম ষাট টাকা হাফ প্লেট হিসেবে একশ কুড়ি টাকা না বলে পঁয়ষট্টি টাকা হাফ প্লেট হিসেবে একশ ত্রিশ টাকা বলার পর।

অচেনা অনিয়মিত মানুষ দেখে যখন বেয়ারাদের মনে হয় এরা এই প্রথম এখানে খাবার খেতে এসেছে এবং আর কখনো হয়তো এখানে খেতে ফিরে আসবে না, তখন তারা এই ধরণের চালাকি করে। তারা খাবারের দাম দুই টাকা, পাঁচ টাকা বাড়িয়ে বলে। ম্যানেজার কিসমতেরও এতে সম্মতি আছে। বেশীরভাগ সময় কোনো ঝামেলা হয় না। কখনো কখনো কোনো কোনো খরিদ্দার প্রতিবাদ করলে খরিদ্দারের মেজাজ অনুযায়ী কিসমত বেয়ারাকে ডেকে ভুল দাম বলেছে বলে ধমক দেয়, চড় থাপ্পড় দেয়, বা কান ধরে উঠ-বস করায়। তারপর বেয়ারার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে ঝামেলার মীমাংসা করে। কিন্তু সেই লোকটি এসবের কোনো সুযোগই দেয়নি। সে বেয়ারা দাম বলা মাত্র মাথায় রক্ত উঠিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছিলো। তার হৈচৈ থেকে বোঝা গিয়েছিলো সে আগেও এই রেস্টুরেন্টে খেয়েছে এবং সে জানতো যে তেহারীর দাম আসলে প্রতি হাফ প্লেট ষাট টাকা। তার বিশেষত্বহীন চেহারার কারণে বেয়ারাটির তাকে মনে না থাকায় সে এমন ভুলটি করেছিলো।

লোকটির চেঁচামেচি দোকানে খেতে থাকা খদ্দেরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খেতে খেতে তারা তাদের বচসা শুনছিলো। ম্যানেজার কিসমত বেয়ারাকে চোখ রাঙায়, ধমক দেয়। বেয়ারা কান ধরে, বলে তার ভুল হয়েছে, সে ভেবেছিলো লোকটি তেহারী খাওয়ার আগে চা-সিঙ্গাড়া খেয়েছিলো, আসলে অন্য কেউ খেয়েছিলো, বেয়ারা গুলিয়ে ফেলেছে, হিসেব রাখতে ভুল করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিসমত লোকটিকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে, 'আরে ভাই চেইতেন না, এই ফাজিলটা একটা ভুল কইরা ফেলাইছে। ওরে আমি উচিত শিক্ষা দিমু। রাগ কইরেন না। দেন, আপনি একশ বিশ টাকাই দেন।'

এ কথায় লোকটি শান্ত হয়ে যায়। সে তার মানি ব্যাগ থেকে একশ কুড়ি টাকা বের করে কাউন্টারের উপর ছুঁড়ে দিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো। ম্যানেজার আর বেয়ারা তার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ভাবছিলো যাক, অল্পের উপর দিয়ে ঝামেলা কেটেছে। ঠিক তখন অপ্রত্যাশিত কান্ডটি করে লোকটি। বের হয়ে যেতে যেতে সে হঠাৎ এক পলক থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে কিসমতের চোখে চোখ রেখে মুখে একরাশ ঘৃণা ফুটিয়ে বলে, 'হারামজাদা অমানুষের বাচ্চারা, তোদের ভিতরের খবর আমি জানি। তোরা খাসির মাংসর নামে শুওরের মাংস খাওয়াস, মানুষের ধর্ম নষ্ট করস।' তারপর ছুটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।

দেখতে ভদ্রলোক মতো লোকটির মুখে তুইতোকারি, এমন গালি আর তার চেয়ে ভয়ংকর অভিযোগটি শুনে কিসমত হতভম্ব হয়ে যায়। সে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে না। তার মতো মাথায় টুপি, থুতনিতে মুঠো ভরা দাড়ির ধার্মিক দেখতে একজন মানুষ যাকে মানিক পর্যন্ত মামু বলে ডাকে, তাকে কেউ এমন নির্দ্বিধায় তুইতোকারি করতে পারে, 'হারামজাদা অমানুষের বাচ্চা' বলতে পারে তা তার ধারণার বাইরে ছিলো। খেতে থাকা খদ্দেররা খাওয়া থামিয়ে হাঁ করে তাকিয়েছিলো। কিসমত মুহূর্ত পরেই সম্বিত ফিরে 'ওই মিয়া, এইডি কী কন, গাইল দেন ক্যান?' বলে তেড়ে আসে। কিন্তু লোকটি এক লাফে একটি চলন্ত বাসে উঠে পড়ে ততক্ষণে। কিসমত ছুটে রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে চলে যেতে থাকা বাসটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ 'হারামজাদা', 'জাউরার পোলা', 'কুত্তার বাচ্চা' এই ধরণের কিছু খিস্তি করে। তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে রেস্টুরেন্টে ঢুকে কাউন্টারের পিছনে নিজের চেয়ারে ফিরে যেতে যেতে অন্যান্য খদ্দেরদের শুনিয়ে বলে, 'প্যান্ট সাট পরলেই মাইনষে ভদ্রলোক হয় না। দেখলানি ব্যাটায় কেমন বেয়াদ্দপ?'

তারপর যেন আপদ ঝেড়ে ফেলছে এমনভাবে পরনের লুঙ্গী ঝাড়া দিয়ে হাঁটুর কাছে গুটিয়ে চেয়ারে বসতে বসতে কিসমত অবাক হয়ে লক্ষ্য করে তার খদ্দেররা খাওয়া বন্ধ করে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। আড়চোখে তার দিকেও তাকাচ্ছে। তাদের চোখে সন্দেহর ছায়া। তাদের মধ্যে সেই সময় কেউ তেহারী খাচ্ছিলো না, তবে মুখ চেনা বাস ড্রাইভারটি ও মোকাম্মেল খাসির মাংস দিয়ে ভাত খাচ্ছিলো। তারা খাওয়া থামিয়ে মাংসগুলো নেড়েচেড়ে, আঙ্গুল দিয়ে টিপে, নখ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো। অন্যরা যারা খাসির মাংস খাচ্ছিলো না, তারা তাদের খাসির মাংস নাড়া চাড়া করা দেখছিলো। কিসমতের এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তার রেস্টুরেন্টের খদ্দেররা বেশীরভাগ তার চেনা লোকজন। তারা অনেকদিন থেকে এখানে খাওয়া দাওয়া করছে। তারা যে কখনোই তার খাবার দাবার নিয়ে অভিযোগ করে না তা নয়। অনেকেই নানা সময় দাম বেশী, ঝাল বেশী, পরিমাণ কম, মাছের তরকারিতে মাত্র এক টুকরো আলু, ঠাণ্ডা ভাত, বাসি তরকারি ইত্যাদি অভিযোগ করেছে। কিন্তু তারপরও তার রেস্টুরেন্টের খাবার পাড়ার অন্য দুটি রেস্টুরেন্টের খাবারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং তার খদ্দেররা বলতে গেলে তার বাঁধা। সে ধমকে ওঠে, 'হেই মিয়ারা, তোমাগো কি মাথা খারাপ হইয়া গেলো নাকি? ওই হারামজাদা ব্যাক্কেল ব্যাটার কথা শুইনা তবদা খাইয়া গেলা। আমার হোটেলে আইজকা পরথম খাসির মাংস খাইলানি? মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধইরা খাইতাছো, তোমাগোরে কোনোদিন খারাপ কিছু খাওয়াইছি? ওই মিয়া মোকাম্মেল, খাওনা ক্যান? খাইয়া শেষ করো।'

কিসমতের ধমক খেয়ে মোকাম্মেল 'না না, আমিতো কিছু কই নাই' বলে তাড়াতাড়ি এক লোকমা ভাত মুখে দেয়। সে কিসমতকে রাগাতে চায় না। কিসমতের সাথে তার সম্পর্ক ভালো। সে এই রেস্টুরেন্টের নিয়মিত খদ্দের এবং কিসমত তাকে মাঝে মাঝে এক কাপ চা বা একটি সিঙ্গাড়া মাগনা খাওয়ায়। কিন্তু তার খাওয়ার রুচি নষ্ট হয়ে যায় এবং সে 'প্যাট ভইরা গেছে, বেশী খাইয়া ফেলাইছি' বলে ভাতের প্লেটে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে ফেলে। তার দেখাদেখি বাস ড্রাইভারটিও খাওয়া শেষ না করে হাত ধুয়ে উঠে পড়ে।

তারপর এই ঘটনা মোকাম্মেলের মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন সন্ধ্যায় মানিক তার দলবল নিয়ে অন্যান্য দিনের মতো তার দোকান থেকে সিগারেট কিনে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো। তখন আসগর সাহেবের ছেলে পলাশ বাস থেকে নেমে গলিতে ঢোকে। তাকে দেখে মানিকের দল থেকে একজন 'হিজড়া' বলে আওয়াজ দেয়। তারা প্রায়ই এই কাজটি করে এবং পলাশ মাথা নিচু করে হেঁটে যায়। মানিকের দলটি মনোযোগ দিয়ে তার মেয়েলী হাঁটার ধরণ লক্ষ্য করে। দলের আরেকজন তাকে শুনিয়ে বলে, 'হিজড়া না, শালায় হাফ লেডিস' আর অন্যরা হাসে। অন্যান্য দিন মোকাম্মেলও মুচকি মুচকি হাসে। কিন্তু সেদিন সে পলাশের ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করে না। সে নিতান্তই কথাচ্ছলে বলছে এমন ভাবে 'মানিক ভাই, আইজকা কিসমতের হোটেলে কি হইসে জানেন' বলে তাদেরকে কিসমত সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্টের ঘটনাটি বিস্তারিত জানায়। মানিক ও তার দল নতুন বিষয় পেয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। গরুর মাংসের নামে মহিষের মাংস বা খাসির মাংসের নামে কুকুরের মাংস খাওয়ানোর কথা লোকে শুনেছে বা বিভিন্ন সময়ে পত্র পত্রিকার খবরে পড়েছে। কিন্তু খাসির মাংসের নামে শূকরের মাংস খাওয়ানোর অভিযোগটিতে নতুনত্ব আছে।

অন্যান্য দিনের মতো মানিকের দলটি সেদিনও সিগারেট শেষ করে কিসমতের রেস্টুরেন্টে যায় এবং কোনার দিকের একটি টেবিলে বসে থাকা খদ্দেরদের উঠিয়ে দিয়ে সেটি দখল করে বসে পুরি ও দুধ-চা অর্ডার দেয়। কিছুক্ষণ পরে বেয়ারা পুরি আর দুধ-চা এনে তাদের টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞাসা করে পুরি ভিজিয়ে খাওয়ার জন্য গরুর বা খাসির মাংসের ঝোল দেবে কি না। তখন মানিক কিসমতকে শুনিয়ে বেয়ারাকে বলে, 'খাসির মাংসের ঝোলের নামে আবার শুওরের মাংসের ঝোল খাওয়াবি নাতো?'

বেয়ারা দাঁতে জিহ্বা কেটে কিসমতের দিকে তাকায়। কিসমত তার কাউন্টার থেকে মানিকের দলটিকে উদ্দেশ্য করে বলে, 'মামুরা আপনেরা এইডি কি কন? আমি এইখানে হোটেল চালাই এতো বছর। আপনেগোরে আমি কোনদিন খারাপ খাওয়াছি? আমি ইমানদার মানুষ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি মাইনষেরে হারাম খাওয়াই এইডা কইতে পারলেন?'

মানিকরা কিসমতের অভিমান ভরা আত্ম সমর্থন শুনে হাসে। দলের একজন বলে, 'শুওরের মাংস না খাওয়াইলেও মাঝে মাঝে মহিষের মাংস খাওয়ান না? তিনদিনের বাসি তরকারি খাওয়ান না?'

কিসমত নিজের দুই গালে আলতো চড় দিয়ে তওবা করার ভঙ্গী করে বলে, 'ছিঃ ছিঃ, দুইটা বেশী পয়সার লোভে আমি দোযখে যাইতে রাজী না।'

মানিকের দল আবারও হাসে। তারা জানে কিসমত আগেরদিনের বাসি তরকারি নতুন রান্না করা তরকারির সাথে মিশায়। মহিষের মাংসও হয়তো খাওয়ায়, যদিও কখনো প্রমাণিত হয়নি। তারা বেয়ারাকে বলে মাংসের ঝোল লাগবে না। তারা ঝোল ছাড়া পুরি খেতে খেতে আর চায়ে চুমুক দিয়ে গলা ভেজাতে ভেজাতে আলোচনা করে শূকরের মাংস কোথায় পাওয়া যায়, দাম কেমন ইত্যাদি। একজন বলে সে শুনেছে ফার্মগেটে খৃস্টানদের এলাকায় শূকরের মাংস বিক্রি হয়। তখন প্রাসঙ্গিকভাবে প্রশ্ন ওঠে দুপুরের অভিযোগকারী লোকটি শূকরের মাংস জেনেও কেনো তেহারী খেয়ে শেষ করেছিলো? সে কি ফার্মগেটের বাসিন্দা? সে হয়তো খৃস্টান এবং তাই সে জানে শূকরের মাংস খেতে কেমন। কিংবা সে হয়তো কিসমতকে তাদের এলাকায় শূকরের মাংস কিনতে দেখেছে। সে যদি খৃস্টানই হয়ে থাকে তাহলে মুসলমানের ধর্ম নষ্ট হওয়া নিয়ে তার মাথা ব্যথা কেন? হতে পারে তার এ ব্যাপারে মাথা ব্যথা নেই, কিন্তু তাকে ঠকানোর চেষ্টা করায় তার রাগ হয়েছিলো বলে সে ঘটনাটি ফাঁস করে দেয়। তারপরও অভিযোগটি ঠিক শক্তিশালী মনে হয় না তাদের কাছে। শূকরের মাংসের দাম যদি খাসির মাংসের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা হয় তাহলে অভিযোগটির ভিত্তি থাকতে পারে। কিন্তু তাদের শূকরের মাংসের দাম সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। তাদের একজন জানতে চায় শূকরের মাংস দেখতে কেমন। দেখা যায় তাও কারো জানা নাই। মানিক তখন রসিকতা করে কিসমতকে জিজ্ঞাসা করে, 'মামু, শুওরের মাংস দেখতে কেমন? খাসির মাংসের মতো?'

কিসমত ব্যথা ভরা চোখে তাদের দিকে তাকায়, বলে, 'মামু এইসব কী কথা কন?'

মানিকের দলটি গলা ফাটিয়ে হাসে। কিসমত চিন্তিত বোধ করে। তামাশার ছলে বলা এসব কথা ছড়িয়ে পড়বে। লোকে শূকরের মাংসের কথা বিশ্বাস না করলেও মহিষের মাংসের প্রশ্ন তুলবে, হারাম-হালালের প্রশ্ন তুলবে, বাসি তরকারির প্রশ্ন তুলবে। মাস দুয়েক পরে রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। রমজান মাসে তার রেস্টুরেন্ট ব্যাবসা জমজমাট। এই পাড়ায় তার ইফতার আর খাসির হালিম অশেষ জনপ্রিয়। এসব প্রশ্ন উঠলে তার ব্যাবসার ক্ষতি হবে।

মানিক আর তার সঙ্গীরা পুরি আর চা খাওয়া শেষ করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে। সিগারেট ধরিয়ে রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে তারা পরবর্তী কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করে। প্রাইমারী স্কুলের মাঠের অন্ধকারে বসে গাঁজা টানা যায়, অথবা ল্যাংড়া ফরিদের বাসায় গিয়ে সময় কাটানো যায়। তারা যখন সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করছে তখন চোখ-মুখ এবং শরীর দিয়ে কথা বলায় পারদর্শী রেশমাকে তারা বাস থেকে নামতে দেখে। রেশমাকে দেখে দলের একজন শিস দিয়ে ওঠে। আরেকজন তাকে শুনিয়ে বলে, 'মানিক ভাইয়ের টিয়া পাখি খাঁচায় ধরা দিতে চায় না রে।'

রেশমা না শোনার ভান করে হেঁটে যায়। মানিক ও তার দল রেশমার হাঁটার সাথে তার ভারী নিতম্বের দুলুনি লক্ষ করে। রেশমার প্রতি মানিকের প্রেম ভাব আছে। মানিক একবার রেশমার গায় জবা ফুল ছুঁড়ে দিয়েছে। আরেকবার বর্ষাকালে কদম ফুল ছুঁড়ে দিয়েছে। কিন্তু রেশমা তাকে পাত্তা দিতে চায় না। মানিকের তা ভালো লাগে না। মানিকের মনে কিছু সন্দেহ আছে অনেকদিন থেকে যে রেশমা আর পলাশদের নিচের তলার মেসের ভাড়াটিয়া মফঃস্বলের যুবক জাফরের মধ্যে কোনো ফষ্টি-নষ্টির ব্যাপার আছে। জাফর, পলাশ আর রেশমাকে প্রায়ই পলাশদের ছাদে আড্ডা দিতে দেখা যায়। আড্ডার সময় রেশমার হাত-পা নাড়িয়ে হেসে হেসে চোখ মুখ আর শরীর দিয়ে কথা বলা তাদের চোখে লাগে। রেশমা যদিও পলাশদের বাড়ির বাসিন্দা নয়, তবুও সে তাদের ছাদে যায় আড্ডা দিতে। তার আকর্ষণ নিশ্চয়ই জাফর। পলাশ রেশমার চেয়ে বয়সে ছোট, তাছাড়া তার মতো মেয়েলী ছেলের প্রতি রেশমার মতো ভরা শরীরের মেয়ের আগ্রহ হওয়ার কথা না। রেশমার মতো মেয়েদের প্রয়োজন তাগড়া শরীরের ছেলে। জাফর তাগড়া এবং সুদর্শন। সুতরাং রেশমা নিশ্চয়ই জাফরের টানেই তাদের ছাদে যায়। মানিক ও তার দল তা পছন্দ করে না। তবে এখানে আরো একটি ব্যাপার আছে। রেশমাকে প্রতিদিন ছাদে দেখা না গেলেও পলাশ আর জাফরকে প্রায় প্রতিদিন বিকালে ছাদে গল্প করতে দেখা যায়। কখনো কখনো দুপুরের দিকে তাদেরকে জাফরের বারান্দায়ও দেখা যায়। জাফরের মেসের অন্য ভাড়াটিয়ারা সবাই চাকুরিজীবী। তাই দুপুরে তারা কেউ মেসে থাকেনা। জাফরের যদি কোনো দিন ক্লাস না থাকে, কিংবা সে যদি কোনো কারণে ক্লাসে না যায়, কিংবা সে যদি ক্লাস থেকে আগে আগে ফেরে এবং কোনো কারণে যদি পলাশও তখন বাসায় থাকে তাহলে তাদের এক সাথে দেখা যায়। তারা মেসের ভিতরেই থাকে সাধারণতঃ। মানিকদের বা পাড়ার অন্যদের চোখে তারা পড়ে যখন জাফরের সিগারেট খাওয়ার বা চা খাওয়ার জন্য তারা বারান্দায় আসে। ব্যাপারটি অনেকের চোখে লাগে। জাফর আর পলাশ এক বয়সী নয়। তারা এক ক্লাসে পড়ে না। তারা এক ধরণেরও নয়। তাদের সম্পর্কতো বন্ধুত্বের সম্পর্ক হওয়ার কথা নয়। এমন কি হতে পারে যে পলাশ আসলে জাফর আর রেশমার প্রেমের সহযোগী? সে তাদের মধ্যে সংবাদ আদান প্রদান করে, কিংবা তাদের পরামর্শ দেয়, কিংবা একজনের মনের ভাব জেনে নিয়ে অন্যজনকে জানায়? বিষয়টি পরিষ্কার নয়। মানিকের দলবল এবং পাড়ার মানুষদের মনে অবশ্য মাঝে মাঝে অন্য একটি সন্দেহও উঁকি দেয়।

রেশমার নিতম্বের দুলুনি দেখতে দেখতে মানিক ও তার দল যখন এসব ভাবছিলো, তখন পরের বাসটি এসে থামে এবং জাফর সেই বাস থেকে নেমে আসে। সে সাধারণতঃ সন্ধ্যার আগে ফেরে। আজ সেও দেরি করে ফিরছে! সে মানিক বা তার দলের কোনো সদস্যের চোখের দিকে না তাকিয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে যায়। মানিকরা তার এই আচরণটি পছন্দ করে না। সে তাদের কখনো সালাম দেয় না, বা বিনয়ী ভঙ্গীতে মুখে তেলতেলে হাসি ফুটিয়ে ভিরু গলায় 'ভালো আছেন ভাইয়ারা?' বলে না। সে সবসময় এমন ভাবে তাদের পাশ কাটিয়ে যায় যেন সে তাদের দেখতে পায় না। তার এমন দাম্ভিক আচরণ মানিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। তবে তারা এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন এখনো জরুরী মনে করছে না। তার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে দলের একজন মানিককে প্রশ্ন করে, 'বস্, ঘটনা কী? আইজ এই শালা আর টিয়া পাখি দুইজনই দেরি কইরা ফিরতাছে, আবার দুইজনে পর পর দুই বাস থেইকা নামছে।'

মানিক জবাব না দিয়ে কঠিন চোখে জাফরের চলে যাওয়া দেখতে থাকে। চিন্তাটি তার মনেও এসেছে। জাফর আর রেশমা কি পাড়ার বাইরে গোপনে দেখা করতে শুরু করেছে? তারা কি কোনো পার্কে বা শপিং মলে বা ফাস্ট ফুডের দোকানে হাত ধরাধরি করছে? ভাবতে ভাবতে তার আবার পলাশের কথা মনে হয়। এই তিনজনের মধ্যে কার সাথে কার কি সম্পর্ক তা পরিষ্কার করা দরকার বলে তার মনে হয়। তারপর সেদিনের জন্য তারা প্রাইমারী স্কুলের মাঠে বসে গাঁজা টানার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেদিকে হেঁটে যায়।

সেদিনের এসব উত্তেজনার পর আরো কিছু ঘটনা দ্রুত ঘটে যায় পরবর্তি কয়েক দিনে। সেদিনের দিন দুয়েক পরে প্রতিদিন গাঁজা খেতে ভালো লাগে না বলে মানিকের দলটি সন্ধ্যার পরে কিসমতের রেস্টুরেন্টে চা পুরি খেয়ে ল্যাংড়া ফরিদের বাসায় যায় সময় কাটাতে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো ফরিদের বউ আর শালীর সাথে কিছু ফুর্তি করা এবং ফরিদের সাথে দেনা পাওনার বিষয়টি খোলসা করা। ইদানিং ফরিদ তাদের আর আগের মতো সম্মানী দেয় না। সে বলে পুলিসের চাহিদা আগের চেয়ে বেড়েছে, তাই মানিকদের চাহিদা অনুযায়ি সম্মানী দিতে গেলে তার আর কিছু থাকে না। সে তাদের চাহিদার চেয়ে অনেক কম দিতে চায়। ফরিদের সাথে যেহেতু পুলিসের ভালো সম্পর্ক আছে, সেহেতু মানিকরা তাকে পাড়া থেকে উচ্ছেদ করতে পারে না। বরং তারা একটি নতুন বুদ্ধি বের করে। তারা প্রায়ই সন্ধ্যার পর ফরিদের বাসায় গিয়ে তার বউ আর শালীর সাথে ফুর্তি করে সময় কাটায়। কিন্তু তাদের এমন আচরণ ফরিদের ব্যাবসার জন্য ভালো নয়। কারণ তার অনেক ক্লায়েন্টরা যারা সন্ধ্যায় আসতে পছন্দ করে তারা মানিকদের কারণে তখন আসতে পারে না। সেদিন সন্ধ্যায় মানিকরা যখন তার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয় তখন তারা একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। ফরিদের ঘরে ঢুকতেই তারা একজন চেনা মুখের মানুষকে তার সোফায় বসে থাকতে দেখতে পায়। এ লোকটির সাথে যদিও তাদের আগে কখনো পরিচয় হয়নি, কথোপকথন হয়নি, তবুও তারা লোকটিকে ভালো করে চেনে, তার সম্পর্কে জানে। লোকটির নাম কী, সে কোথায় থাকে তা তাদের জানা না থাকলেও লোকটি যে তাদের সহ পাড়ার অন্যান্য কার্যক্রমের উপর চোখ রাখে এবং পুলিসকে নিয়মিত তথ্য দেয় তা তাদের জানা। তাই ঘরে ঢুকে তাকে বসে থাকতে দেখে তারা থতমত খেয়ে যায়। ফরিদ তাদের দেখে স্বাভাবিকভাবে বলে, 'বসেন, চা বানাইতে বলি।' তারপর বসে থাকা লোকটিকে দেখিয়ে বলে 'ইনি আমার খালতো ভাই, বেড়াইতে আসছে।'

লোকটি তাদের সালাম দিয়ে সোফায় জায়গা করে দিয়ে বলে, 'বসেন, বসেন।'

মানিক সালামের জবাব দিয়ে ফরিদকে বলে, 'নাহ থাক, আজকে আরেকটা কাজ আছে। তাছাড়া আজকে আপনার মেহমান আছে, আমরা আরেকদিন আইসা চা খাবো।'

তারা বেরিয়ে যাওয়ার সময় লোকটি মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলে, 'কাজ থাকলে আজকে কাজ শেষ করেন। তবে আবার দেখা হবে আশা করি, স্লামালাইকুম।'

মানিকরা 'জি জি, অয়ালাইকুম সালাম' বলে তাড়াহুড়ো করে ফরিদের বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।

এরপর তারা বুঝতে পারে ল্যাংড়া ফরিদের কাছ থেকে আর আগের মতো হাতখরচ পাওয়া যাবে না, বরং এখন সে যা দিচ্ছে তাই নিয়ে আপাততঃ সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তার বাসায় গিয়ে আগের মতো আর ঘন ঘন ফুর্তি করা যাবে না। কিন্তু তারা কয়েকদিন পর তাদের হাতখরচ যোগাড় করার আরেকটি উপায় খুঁজে পায়। পলাশের বাবা কিছুদিন ধরে তাদের বাসার সামনে ইঁট আর বালি এনে রাখতে শুরু করেছেন তিন তলা বাড়ি পাঁচ তলা করবেন বলে। মানিকের দল এ বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলার জন্য একদিন সন্ধ্যায় পলাশদের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়। তাদের বসার ঘরে বসে চা-বিস্কুট-চানাচুর খেতে খেতে আসগর সাহেবকে তারা তাদের আগমনের কারণ জানায়। তারা মোটা অংকের টাকা দাবি করে বলে যে তার বিনিময়ে তারা বাড়ির কাজের জন্য আনা মালামালের এবং বাড়ির কাজ চলাকালীন সময়ে যেন কেউ কোনো রকম ঝামেলা করতে না পারে তার নিরাপত্তা দেবে। তাদের আসার কারণ জানতে পেরে আসগর সাহেব বলেন যে এরকম মোটা অংকের চাঁদা তার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। তিনি আরো বলেন যে চাঁদাবাজী একটি অসামাজিক কাজ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আসগর সাহেবের স্পর্ধা দেখে আর তাদেরকে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করায় দলের কয়েকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাঁকে শিক্ষা দেয়ার হুমকি দেয়। মানিক তাদের শান্ত করে আসগর সাহেবকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, তার দলের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখা তাঁর জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সে আরও বলে যে তাদের মধ্যে কারো কারো এক খুন এবং কারো কারো জোড়া খুনের অভিজ্ঞতা আছে, তাদের রাগানো ঠিক হবে না। তারা যদি খুশি থাকে আর সব কিছু দেখে শুনে রাখে তাহলে বাড়ি বড় করায় কোনো সমস্যা হবে না। বাড়ি নির্মাণের সময় কেউ দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে মারা যাবে না। তারপর বেশী রাত হয়ে যাচ্ছে বলে তারা আবার দুই দিন পরে আসার কথা বলে সেদিনের মতো বিদায় নেয়।

কথা অনুযায়ী মানিক ও তার দল দিন দুয়েক পর আরেক সন্ধ্যায় আসগর সাহেবের বাসায় উপস্থিত হয়ে জানতে পারে যে তিনি তাদের সম্মানী যোগাড় করে রাখেননি। এতে তারা বিস্মিত হয় এবং জানতে চায় তাঁর আরো কিছুদিন সময় লাগবে কি না। কিন্তু আসগর সাহেব তাদের অবাক করে বলেন যে, তিনি এ অন্যায় মেনে নিতে রাজী নন এবং প্রয়োজনে তিনি পুলিসের সাহায্য নিতে প্রস্তুত। এতে মানিক হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে আসগর সাহেবকে চড়-থাপ্পড় দিতে শুরু করে। পলাশ এ সময় ভিতরের ঘর থেকে দৌড়ে এসে বাবাকে আড়াল করে রক্ষা করার চেষ্টা করে এবং মানিকদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে। মানিকরা কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে পলাশের উত্তেজিত রূপ দেখে। তার মেয়েদের মতো মিহি গলার চিৎকার শোনে। তার চোখে কাজল আর হাতে নেইল পলিশ লক্ষ্য করে। তারপর তারা আবার ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে 'হিজড়া' 'মাগী' এইসব বলে গালিগালাজ করে এবং বেদম মারধর করে তার ঠোঁট-মুখ ফাটিয়ে রক্ত বের করে দেয়। তখন হৈচৈ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে জাফর এবং তার মেসের লোকেরা ছুটে এসে দরজা খোলা পেয়ে আসগর সাহেবের বাসায় ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্যান্য ফ্ল্যাটের আরো কয়েকজন ভাড়াটিয়াও সেখানে এসে উপস্থিত হয়। জাফর পলাশকে মানিকদের হাত থেকে জোর করে ছাড়িয়ে নেয় এবং মানিককে শাসায় যেন আসগর সাহেবকে আর কোনো রকম বিরক্ত করা না হয়। সে আরো বলে যে, সে তাদের ভয় পায় না এবং সে তাদের অসামাজিক কার্যকলাপের কথা সব জানে। মানিকরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জাফরের চোখে সাহস দেখে। তারা পলাশকে দেখে জাফরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে। তারা পলাশের ক্ষতের রক্ত তার চোখের জলে গলে যাওয়া কাজলের সাথে মিশে জাফরের শার্টে বিচিত্র এক নকশা চিত্রিত হতে দেখে। তখন মানিক জাফরকে বলে জাফর কী করে তাও তারা জানে। সে জাফর আর পলাশের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সে আরো বলে যে, তারা পাড়ায় কোনো রকম অসামাজিক কাজ হতে দেবে না। পাড়ার পরিবেশ সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখা তাদের দায়িত্ব এবং সে দায়িত্ব তারা পালন করবে এমন হুমকি দিয়ে তারা আসগর সাহেবের বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। তখন সেখানে উপস্থিত ভাড়াটিয়ারা বিহ্বল বোধ করে। মানিক যদি জাফর আর রেশমার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলতো, তাহলেই তা স্বাভাবিক শোনাতো বলে তাদের মনে হয়। তা না করে মানিক কেন জাফর আর পলাশের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তা নিয়ে তারা চিন্তিত বোধ করে। তারপর তাদের মুখ থেকে সেদিনের ঘটনা অতি দ্রুত পাড়ার অন্যন্যদের মধ্যেও জানাজানি হয়ে যায়।

এর পরদিন জাফর আসগর সাহেবকে থানায় নিয়ে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে ডায়েরী করায়। পুলিস তাদের বলে যে তারাও মানিকের দলটির প্রতি সন্তুষ্ট নয় এবং তারা ব্যবস্থা নেবে। ঠিক সেদিন রাতেই কিছু লোক অজ্ঞান অবস্থায় প্রায় অর্ধমৃত জাফরকে প্রাইমারী স্কুলের মাঠে পড়ে থাকতে দেখে। কে বা কারা তাকে বেদম মারধর করে হাড়গোড় ভেঙ্গে মাঠে ফেলে রেখেছে। তারা তাকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যায় এবং পাড়ায় ফিরে জানায় যে বেদম প্রহারের পরও জাফর প্রাণে বেঁচে গিয়েছে এবং মাসখানেকের চিকিৎসায় সে আবার সুস্থ হয়ে উঠবে।

এসব ঘটে যাওয়ার পর প্রায় মাসখানেক মানিক আর তার দলটিকে পাড়ায় দেখা যায় না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর সাথে জড়িত থাকায় এবং তাদের প্রতি পুলিসের মনোযোগের কারণে তারা গা ঢাকা দেয়। এর মধ্যে রেশমার বিয়ের কথাবার্তা হঠাৎ করে পাকাপাকি হয়। পাড়ার লোকে জানতে পারে পাত্র রেশমার পূর্ব পরিচিত। তাদের মধ্যে বছর কয়েকের প্রেম চলছিলো। রেশমার মতো মেয়ের যে প্রেম টাইপের একটি দু'টি সম্পর্ক থাকবে এতে আর আশ্চর্য কী! কিন্তু লোকে ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না জাফরও তার অন্যতম প্রেমিক ছিলো কি না। জাফর আর পলাশের সম্পর্ক বিষয়ে মানিকের অভিযোগটি সম্পর্কে অবগত না থাকলে অবশ্য তাদের মনে জাফর আর রেশমার সম্পর্ক নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতো না। মানিকও এ বিয়েতে কোনো রকম বাগড়া না দেয়ায় লোকে অবাক হয়, যদিও স্বস্তি বোধ করে। মানিকরা গা ঢাকা দেয়ায়, বা কিছুদিন নতুন কোন ঝামেলায় জড়াতে না চাওয়ায়, বা মানিকের আর আগের মতো রেশমার প্রতি প্রেম ভাব না থাকায় কোনো ঝামেলা ছাড়া বিয়েটি হয়ে যায় এবং বর পক্ষ রেশমাকে শ্বশুর বাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এর মাঝে ল্যাংড়া ফরিদও একদিন তার পরিবার নিয়ে পাড়া ছেড়ে চলে যায়। এদিকে আসগর সাহেব বাড়ি বাড়ানোর পরিকল্পনা ত্যাগ করেন। তাঁরা অতি দ্রুত বাসা বদলে অন্য কোথাও চলে যান। এরপর আসগর সাহেব বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন ও কয়েকজন দালালের সহায়তায় দ্রুত বাড়ি বিক্রির চেষ্টা শুরু করেন। জাফরও আর পাড়ায় ফিরে আসে না। শোনা যায় সে সুস্থ হয়ে অন্য কোথাও বাসা নিয়েছে, তার মেসের কয়েকজন উদ্যোগ নিয়ে তার ফেলে যাওয়া মালামাল তার কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

এসব ঘটনার ‌উত্তেজনায় লোকে কিসমত হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের শূকর মাংস বিষয়ক গুজবটি নিয়ে আলোচনা করতে কিছুদিনের জন্য ভুলে যায়। তাদের আলোচনার নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত ঘটে যাওয়া অধিকতর উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাগুলো প্রাধান্য পায়। এ সময় কিসমতের রেস্টুরেন্ট কয়েকদিন বন্ধ থাকে এবং কিসমত কয়েকজন ইলেক্ট্রিশিয়ান, কাঠ মিস্ত্রী এবং রঙ মিস্ত্রীদের দিয়ে রেস্টুরেন্টে কিছু কাজকর্ম করায়। তারপর একদিন আবার রেস্টুরেন্ট খোলে। সবাই তার রেস্টুরেন্টে ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পায়। ঝকঝকে তকতকে মেঝে, সিলিংএ বাড়তি দু'টি ফ্যান, দেয়ালে নতুন রঙ, মেরামত করা চেয়ার টেবিল। পশ্চিমের দেয়ালে কোন এক জীবন পেইন্টারের আঁকা কাবা শরীফের ছবি। ছবির উপরে আকাশের গায়ে আরবী অক্ষরে কুলহু আল্লাহ আর নিচে লাল রঙ দিয়ে বাংলায় লেখা, 'মানব মন খোদার বাসস্থান, সেখানে আঘাত দিলে খোদার আরশ কেঁপে উঠে। মানব মনে কেউ আঘাত দিও না।' ধীরে ধীরে মানিকের দলবলও একে একে পাড়ায় ফিরতে শুরু করে।

তারপর শুরু হয় রমজান মাস। পাড়ার পরিবেশ শান্ত হয়ে আসে। লোকে ধর্ম কর্মে মন দেয়। তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, সেহেরি খায়, ইফতার খায়, একে অন্যকে তারাবীর নামাজে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায় এবং প্রতিপালকের নির্দেশ অনুযায়ী সংযমী হয়ে ওঠে। তারা ইফতারের পর মানিককে তার দলবল নিয়ে টুপি মাথায় দিয়ে ধীর এবং শান্ত ভঙ্গীতে পাড়ায় হাঁটতে দেখে। তারা মানিকের উপর রমজান মাসের প্রভাব বুঝতে পারে। তারা মানিকের আচরণে সংযম লক্ষ্য করে স্বস্তি বোধ করে। তারা দিনের বেলায় ঈদের কেনাকাটা করে আর সন্ধ্যায় কিসমত সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্টে ইফতার কেনার জন্য ভীড় করে, খাসির হালিমের ডেকচির পাশে লম্বা লাইন দেয়। হালিমের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় তাদের অনেকের শূকরের মাংস বিষয়ক গুজবটি মনে পড়ে। তবে তারা কিসমতের দাড়ি-টুপি আর তার রেস্টুরেন্টের দেয়ালে কাবা শরীফের ছবি দেখে তার ইমান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং স্বস্তি বোধ করে। তার কাছ থেকে হালিম কিনতে তারা দ্বিধা করে না। তবে একই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কারো কারো পলাশ আর জাফরের কথাও মনে পড়ে। তারা উপলব্ধি করে জাফর আর পলাশের অমীমাংসিত সম্পর্কটিই তাদের পাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়ার মূল কারণ। তারা জাফর আর পলাশকে নিয়ে পাড়ায় আর কোনো ঝামেলা হবে না ভেবে স্বস্তি বোধ করবে কি না সে সিদ্ধান্ত নিতে পারার আগেই তাদের হালিম নেয়ার ডাক আসে। তাদের চিন্তায় বাধা পড়ে। হালিমে যেন মাংসের পরিমাণ কম দেয়া না হয় সেদিকে চোখ রাখতে গিয়ে তারা জাফর আর পলাশ বিষয়ক চিন্তাটি আর এগিয়ে নিতে পারে না।


মন্তব্য

অবাঞ্ছিত এর ছবি

লেখার স্টাইল ভালো, তয় একটু মাথার উপ্রে দিয়া গেলো

__________________________
ঈশ্বর সরে দাঁড়াও।
উপাসনার অতিক্রান্ত লগ্নে
তোমার লাল স্বর্গের মেঘেরা
আজ শুকনো নীল...

শামীম হক এর ছবি

লেখার স্টাইলটা ভালো পাওয়ার জন্য ধন্যবাদ, তয় কী বা কেন মাথার উপ্রে দিয়া গেলো, বুঝাইয়া কইলে ভালো হইতো হাসি

কৌস্তুভ এর ছবি

ভালো লাগল।

শামীম হক এর ছবি

ভালো লেগেছে জেনেছে ভালো লাগলো। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখা ভালো লাগলো। অবাঞ্ছিত ভাই আপনি কোন পার্ট বুঝলেন না? আমি যা বুঝলাম,

১) পলাশ হোমোসেক্সুয়াল ছিল আর জাফরের সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক ছিল।

২) ফরিদ পিম্প বা দালাল ছিল বলাই বাহুল্য। তার বউ ও শালী প্রস্টিটিউট ছিল। কিন্তু তার বাসার রহস্যময় মেহমান টা কে ছিল বোঝা গেলনা। হতে পারে মানিকরা পাতি সন্ত্রাসী, কিন্তু ঐ মেহমান আরো বড়ো প্রভাবশালী বলয়ের কেউ হওয়াতে মানিকরা আর তাকে ঘাঁটায়নি। কিন্তু মেহমান আরো প্রভাবশালী সন্ত্রাসী চক্রের কেউ হলে, সে মানিকদের গতিবিধি পুলিশকে পাচার করবে কেন তা বোঝা গেলনা।

যা হোক, আমি পড়ার পর যেটা মনে হয়েছে তা হল, "What's the whole point?".
এর সবচেয়ে সন্তোষজনক উত্তর যেটা বের করতে পেরেছি তা হলো, গল্পটা বাংলাদেশের টিপিকাল পাড়াগুলোতে বহমান জীবনের একটা স্ন্যাপ-শট। সেখানকার বখাটেদের দল, সেখানকার চায়ের দোকান, সেখানকার গুজব -- এগুলো নিয়ে জগা-খিচুড়ি। কিসমত আদৌ শূকরের মাংস ভেজাল দিত কিনা, এত দৃঢ় আসগর সাহেব কেন হঠাৎ বাড়ি বিক্রি করে পাড়া ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ( ছেলের সমকামীতা ফাঁস হয়ে যাওয়াতে? ), --- এসব হেঁয়ালি গল্পের ভেতর রেখে দেয়াটা লেখকের স্বাধীনতা এবং পাঠকও যার যার ইচ্ছেমত নিজ উত্তর বের করে নিতে পারেন।

লেখা মসৃণ ও সুন্দর কিন্তু আবহমান জীবনের স্ন্যাপ-শট ধারণ ছাড়া লেখায় গূঢ় কিছু খুঁজে পাইনি। এটাই যা নেতিবাচক দিক। বাকি ভালো লেগেছে।

-- ঋষি নারাং

শামীম হক এর ছবি

গল্পে কোনো গূঢ় ম্যাসেজ দেয়ার ইচ্ছা ছিলো না, যেমন বলেছেন আবহমান জীবনের স্ন্যাপ-শট ধারণ করাটাই উদ্দেশ্য ছিলো। হেঁয়ালিগুলোও ইচ্ছাকৃত। এমন সমালোচনা কাম্য, নিজের লেখার ভালো-মন্দ সম্পর্কে ধারণা পাই। কিছুটা ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো। ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

ভালো লাগল।
------------------------------
Lover of Sadness | Sad Stories

জি.এম.তানিম এর ছবি

ভালো গল্প।

-----------------------------------------------------------------
কাচের জগে, বালতি-মগে, চায়ের কাপে ছাই,
অন্ধকারে ভূতের কোরাস, “মুন্ডু কেটে খাই” ।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

এই গল্পটা যখন প্রকাশিত হয় তখন যে করেই হোক আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। গল্প বেশ ভালো লেগেছে। আমার কাছে কিছুটা শহীদুল জহির প্রভাবিত বলে মনে হয়েছে।

লেখক তার লেখালেখি থামিয়ে দিলেন কেন?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

গল্পটি দারুণ লেগেছে। গল্পের চেয়েও ভালো লেগেছে গল্প বলা।

---মোখলেস হোসেন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA