কোহিনুরের যমজ (শেষ)

শঙ্কর এর ছবি
লিখেছেন শঙ্কর [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ২২/১১/২০১২ - ৪:৩৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কোহিনুরের যমজ (১)

কোহিনুরের যমজ (২)

কোহিনুরের যমজ (৩)

দিয়ার কথা

এত ইতিহাস ভূগোল আমার ভালো লাগে না। আমি পেটপুরে জলখাবার খেয়ে চললাম সেই ফেলুদা আর কাকাবাবুর কাছে। সেখানে গিয়ে এই নতুন শাজাহানের হীরের হারের গল্পটা শোনাতে হবে না?

সব গল্প শুনে দুজনাই তো ভীষণ খুশী। কাকাবাবু বললেন, “কিহে ফেলু মিত্তির, একবার মাথাটা খাটাবে নাকি?”

ফেলুদা হেসে বলল, “আজ্ঞে না। এবার শুধু বেড়াতে এসেছি। তার ওপরে আপনার সঙ্গ ছেড়ে ঐ সাড়ে চারশ’ বছর আগেকার ছিল-কি-ছিল-না হীরের হারের পেছনে আমি দৌড়তে রাজি নই। “
- না হে, একদম ছিল-কি-ছিল না বলে উড়িয়ে দেওয়ার মত ব্যাপারটাও নয়। সতেরোশ তিন সালে এক পর্তুগীজ পর্যটকের বইতে আমি এই রকমই একটা গল্প পড়েছি। শুনবে নাকি সে গল্প?”

আবার সেই সাল-তারিখের গল্প। এখানে এসে আমি ইতিহাস পড়তে আর রাজি নই। তাই ওঁদেরকে টা টা করে চলে এলাম পদ্মসায়রের ধারে। সেখানে গুপীদা, পানুদা আর সেই টাকমাথা লোকটা ছিপ নিয়ে বসে মাছ ধরছে। তিনজন চুপচাপ বসে আছে।

আমি কথা বলতে গেলেই বলে ওঠে, “চুপ, চুপ, মাছ পালিয়ে যাবে।”

দুত্তেরি, মাছ কোথায়? আমি ঝোপের ওপর প্রজাপতি ধরার ছেষ্টা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে একটা ঝোপের ধারে ঘুমিয়ে পড়লাম।

বেশ অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম যখন ভাঙল তখন প্রায় দুপুর। আমি ঘুমের মধ্যেই শুনলাম দুজনা ফিসফিস করে কথা বলছে। একজনা বললো, “তাহলে আজ রাতেই”, অন্য জনা বললো, “হ্যাঁ, আজই।” আমি ছোখ খুলে কাউকে দখতে পেলাম না। আজ রাতে কি? কে জানে বাবা। তার থেকে বরং বাড়ী ফিরে কাতলা মাছের পাতলা ঝোল খাই গে যাই।

প্যালার কথা

মাংসের কালিয়াটা বেশ জব্বর হয়েছিল। টেনিদার নজর এড়িয়ে আমি বেশ কয়েকটা পিস ঠিক ম্যানেজ করেছি। কাজেই খাওয়ার পরের আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে। স্বাভাবিক ভাবেই গল্পটা শুরু হয়েছিল সেই হীরের হারের কথা দিয়ে। ওটা পেলে এখন কে কি করবে তারই ফিরিস্তি হচ্ছিল। গল্প করতে করতে কখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে খেয়াল নেই। হঠাত ক্যাবলা বলে উঠলো , “আচ্ছা টেনিদা, সেই জহুরীটার ভূতটাতো পদিপিসির সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই ভাগলবা হয়েছিল। তাহলে পদিপিসি মারা যাওয়ার পরেই সে আবার ফিরে এলোনা কেন?”

ভূতের নাম শুনলেই টেনিদার একটু কেমন কেমন লাগে। তার ওপর এই মাঝরাতে, বাড়ীর চারিধারেই জঙ্গল। ফিনিক দিয়ে জ্যোতস্না ফুটেছে। আলো-আঁধারিতে কোনটা কি বোঝাই যাচ্ছে না। টেনিদা খেঁকিয়ে উঠলো, “কেন রে? তোর কি তাকে দরকার নাকি?”

- না, আমি ভাবছিলাম তাহলে কাঁঠালগাছের পাশে ঐ লম্বা লোকটা কে? জহুরীটা কি ন-দশ ফুট লম্বা ছিল?

এতোক্ষণে আমাদেরও নজরে পড়েছে ব্যাপারটা। কাঁঠালগাছের পাশে একটা প্রায় দশফুট লম্বা মতো লোক দাঁড়িয়ে আছে। টেনিদা এক লাফে চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায়। ক্যাবলাটার সাহস আছে। এক চীতকার দিল, “কে রে? কে ওখানে?” তখুনি পাশের ঝোপ দুটো নড়ে উঠলো আর দশ ফুট লম্বা লোকটা ‘ওরে বাবারে’ বলে এক চীতকার। আরে গুপী-পানুর গলা না? এবার টেনিদাকে পায় কে? সাধে কি আমাদের লীডার। এক লাফে বাইরে বেরিয়ে এসে, “কে রে? আয় দেখি।” বলে এক বিকট রণহুঙ্কার দিয়ে এগিয়ে গেল।

আমরাও এগিয়ে দেখি গুপী আর পানু মাটিতে বসে আছে। গুপীর ঘাড়ে পানু উঠেছিল, লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে চোট পেয়েছে। আর পানুর মাথায় দুটো আলু গজিয়েছে। ও পাশের ঝোপের আড়াল থেকে দুটো ছেলে বেরিয়ে এল। হাতে গুলতি। বোঝা গেল পানুর মাথায় আলু দুটো কেন গজিয়েছে। টেনিদা ওদের দিকে তেড়ে যাওয়ার আগেই ওরা হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা ভূত সেজে কি করছিলে? আমরা ভেবেছি কাউকে অন্যায় করে ভয় দেখাচ্ছ, তাই শাস্তি দিতে গেছিলাম।”

সবাই মিলে আমাদের ঘরে এসে বসলাম। ওই ছেলেদুটো, সন্তু আর তপেশ, ওরাও এলো। জেরার চোটে গুপী-পানু বললো ওরা হীরের খোঁজ করতে বেরিয়েছিল। বাড়ীতে তো সবাই খুঁজেছে। ওরা ভেবেছিল বোধ হয় বাগানে পাওয়া যাবে। দিনের বেলা সবাই জানতে পারবে, তাই রাতের বেলা লুকিয়ে লুকিয়ে চেষ্টা করছিল।

দিয়ার কথা

আজ সকালে মুড়ি, নারকোল কুচি আর শশার টুকরো দিয়ে জলখাবার খেলাম। ইশশ, মা কেন এগুলো দেয় না, রোজ শুধু শুধু মাখন-পাঁউরুটি খেতে ভালো লাগে নাকি? ইয়াক।

আমের বোল ধরেছে। আজকে গাছে চড়ে নুন দিয়ে কাঁচা আম খাব ভাবছি। কলকাতায় এই সুযোগ তো আর আসবে না। আমি ভাঁড়ার থেকে এক খাবলা নুন নিয়ে একটা আমগাছে উঠে পড়লাম।

একটু ওপর থেকে কত্তোদূর দেখা যায়। ওইদিকে ফেলুদা আর কাকাবাবু আজকেও দাবা নিয়ে বসেছেন, পদ্মসায়রের ধারে টাকবাবু ছিপ নিয়ে বসে আছেন, উ-উ-ই দূর থেকে এই দিকেই একটা গাড়ি আসছে।

গাড়িটা যেন এই দিকেই আসছে। ও মা, এই বাড়ির সামনেই এসে থামলো। গাড়ি থেকে নেমেই বাবা হাঁক দিলেন “গুপী-ঈ-ঈ, পানু-উ-উ।” ওই এক হাঁকে গুপীদা আর পানুদা ছিপ ফেলে পদ্মসায়রের জলে ঝাঁপ দিল। বাবার পেছন পেছন মাও এসেছে। ওরেবাবা, মা আবার এই দিকেই আসছে। আমার গাছের তলাতে এসে মা ওপর দিকে তাকিয়ে ডাক দিল, “দিয়া, দিয়া।” সেই ডাক শুনে বাগানের সমস্ত শালিক আর চড়াই চুপ করে গেল। মোড়ের মাথার কুকুরটা দুপায়ের ফাঁকে লেজ গুটিয়ে কোণের দিকে সরে গেল। ফেলুদার দাবার বোর্ডের হাতিটা একপায়ে টলমল করতে করতে টপাত করে পড়ে গেল। আমি ভয়ের চোটে আরেকটু ওপরে উঠে গেলাম।

“দিয়া নামলি”, মা কোমড়ে আঁচল জড়িয়ে গাছের গুঁড়িতে পা রাখলো। তারপর শাড়ি পরেই গাছে উঠতে লাগলো। আমি প্রমাদ গুনলাম। মা তো গাঁয়ের মেয়ে। শাড়ি পরেই গাছে উঠতে পারে। মায়ের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়, আরো ওপরে উঠে যাওয়া। মা হাল্কা ডালে উঠবে না। আমি আরো ওপরে ঊঠতে লাগলাম।

ওপরে উঠতে উঠতে হঠাত দেখি গাছের কোটরে ওটা কি চকচক করছে? আমি হাত বাড়িয়ে আসতে করে তুলে নিলাম আর সমস্ত শালিক চড়াই কিচিরমিচির করে বলে উঠলো, “নওলাখা হার, নওলাখা হার।”

আমি আস্তে আস্তে সেই হার নিয়ে নিচে নামছি। সব্বাই চুপ। আর বাড়ির ভেতর থেকে পদিপিসি ছুট্টে বেড়িয়ে এসে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল।

এতোক্ষণে গুপীদা পানুদাও ফিরে এসেছে। গাড়ি নিয়ে পালিয়ে এসেছিল বলে দুজনাই ঠ্যাঙ্গানির ভয় লুকিয়ে ছিল। এখন যখন হার পাওয়া গেছে, তখন আর নিশ্চয়ই প্যাঁদানি খাবেনা। গুপীদা পকেট থেকে হাত বের করে বললো “এটা তবে কি?”

“আরে ওটা তো আমার ঝুটো হীরের হারের লকেটটা। তুই কোথায় পেলি?”

আমি এক ছুট্টে বাড়ির ভেতর । গয়নার বাক্সে ধরেনি বলে লকেটটা গুপীদার পকেটে রেখে দিয়েছিলাম।


মন্তব্য

তাপস শর্মা এর ছবি

অসাধারণ ... গোটা সিরিজটা বেশ উপভোগ করলাম দাদা

এমন আরও আসুক চলুক

শঙ্কর এর ছবি

চেষ্টা করছি ভাই। শুধু একটু সময় চাই।

সুমাদ্রী এর ছবি

খুব ভালো লেগেছে আপনার সিরিজটা। লিখবেন আশা করি নিয়মিত।

অন্ধকার এসে বিশ্বচরাচর ঢেকে দেওয়ার পরেই
আমি দেখতে পাই একটি দুটি তিনটি তারা জ্বলছে আকাশে।।

ঈপ্সিত আর চম্পাকলি এর ছবি

চমতকার। তবে আর একটু চললে চরিত্র গুলিকে সুবিচার কয়া হত।

ঈপ্সিত আর চম্পাকলি
---------------------------------
বোলতা কহিল, এ যে ক্ষুদ্র মউচাক,
এরি তরে মধুকর এত করে জাঁক!
মধুকর কহে তারে, তুমি এসো ভাই,
আরো ক্ষুদ্র মউচাক রচো দেখে যাই।
--------------------------------------------

তুলিরেখা এর ছবি

ভালো লেগেছে।
লীলা মজুমদারের ছোঁয়া গল্পের ভাঁজে ভাঁজে। হাসি
কিন্তু আপনি আগে যে মজারু কাহিনিগুলো লিখতেন, সেগুলোর তুলনা হয় না। বিচ্ছু টাইপ ছোটো ভাই গম্ভীর মুখে বড়দাকে বলছে, "এইসব বই পড়িস না, নষ্ট হয়ে যাবি।" একেবারে বাঁধিয়ে রাখার মতন সব লেখা ছিলো সেগুলো, চোখের সামনে মজার সিনেমার মতন দেখতে পেতাম। ওরকম আর লিখবেন না?

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।