প্রচেষ্টা _০১_০১

সুহান রিজওয়ান এর ছবি
লিখেছেন সুহান রিজওয়ান (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৯/০৬/২০১৬ - ১১:১৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আজকে ক্লাস নেই, অন্যান্য দিন দুপুরের এসময়টা ক্লাস করতে ভাল লাগে। স্যারের কথা গমগম করে ক্লাসরুমে, দুয়েকজন কষ্ট করে মুখের সামনে হাত নিয়ে হাই তোলে, অনেকে নোট নেয়। দুপুরে যেন কারো কোনো তাড়া থাকে না, কলেজের চারপাশ একদম খাঁ খাঁ। কোথাও কুকুর ডাকলে, দূর থেকে কোনো মোটরগাড়ি আওয়াজ দিলে সেই শব্দও কানে আসতে সমস্যা হয় না। মঞ্জু তখন ক্লাসনোট খাতায় তুলতে এলোমেলো থাকে। কত কত পরিকল্পনা নিয়ে সে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরে, পাতার বাঁশি বাজায়।

তবে কয়েক সপ্তাহ হলো, দুপুরের ক্লাস আর নীরব থাকে না, নানা রকম আওয়াজ হয়। বড় বড় ট্রাকে ইট আসে, কন্টাকটরের লোকেরা সেগুলো নামায়, সিমেন্ট গুলানোর মেশিনটা অসুস্থ বয়স্ক মানুষের মতো কাশে একটু পরপর। কলেজ সাজানো হচ্ছে নতুন করে। নতুন ল্যাবরেটরি হয়েছে কয়েকদিন আগে, নিউ অফিস বিল্ডিং তৈরী হয়ে গেলেও এখনো রঙ করা হয়নি। পাকিস্তান গভমেন্ট নাকি দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চিটাগং কলেজের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, সামনে ফিজিক্স, কেমেস্ট্রির জন্যে আলাদা ফ্যাকাল্টি হবে, নতুন হোস্টেলও হবে। এ জন্যেই কলেজের কম্পাউন্ডে এতো ব্যস্ততা। কিন্তু এসব করে কি পাকিস্তানি গভমেন্ট বাঙালিদের ভুলিয়ে রাখতে ? ওদের পাহাড়েও কি এসব কোনো কাজে এসেছে?

মাথায় বেলুন হয়ে উড়তে থাকে চন্দ্রঘোনা মিলের ঘটনা। পাকিস্তানের গভমেন্টের এতো বড় গর্ব ওই মিল, কিন্তু সেখানে জুম্মদের মধ্যে থেকে শ্রমিক আর স্টাফ হতে পেরেছে কজন? মাঝখান দিয়ে গাছ সব কাটা হয়ে যাচ্ছে।

চিন্তার বিরাম নেই। পাহাড়ের পর পাহাড় গাছ কেটে উজাড় হবার দৃশ্যে ঘুরতে ঘুরতে চন্দ্রঘোনা মিল হয়ে যায় চিটাগং কলেজ। এই যে এতো কিছু হচ্ছে উন্নয়নের নামে, মানুষের কাছে এটার ফলাফল কীভাবে যাবে? এদিকের পাট বেচার টাকা নিয়ে ওদিকে মরুভূমিতে নদী বানানো হচ্ছে। বড় বড় পদে সবাই পশ্চিম পাকিস্তানি, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সংখ্যাই সেখানে সীমিত, আর মঞ্জুরা তো গোণার বাইরে। প্রথমবারের মতো গত বছর শরদিন্দু শেখর চাকমা নামে একজন সিভিল সার্ভিসে ঢুকেছেন। এসব বিক্ষিপ্ত ঘটনায় একটা শুরু হয়তো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু শেষে যে কী হবে, সেটা শালার বোঝাই যাচ্ছে না।

পড়ার টেবিল থেকে উঠে মঞ্জু জানালায় যায়। মাথার ভেতরের সমস্ত বেলুন উড়িয়ে নিয়ে যায় বাতাস,ঝাপটা মেরে চোখে ঢুকে পড়ে সবুজ। পাথরঘাটার এদিকটা এখনো বেশ ঠাণ্ডা, বিকালে বা সন্ধ্যায় হাঁটতে ভালো লাগে। একটু জোরে বাতাস বইলে আশপাশের এলাকা থেকে বাঁদরগুলো হোস্টেলের সামনের ওই পিঠ-বাঁকা বটগাছে এসে মিটিং বসায়। কোনো সন্ধ্যায় ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে গেলে মঞ্জু যখন হাঁটতে যায়, ওই গাছের দিকে তাকিয়ে থেকে মাওরুম পারের বটগাছটা চোখে না আনা পর্যন্ত তার মাথা ঠাণ্ডা হয় না। মাওরুম পারের ঐ বটগাছ কি তার আত্মীয়ের চাইতে কম? সেই যে মঞ্জুর বাপে ‘ছোট মহাপুরম উচ্চ বিদ্যালয়’ খুললো, সেটা আবার মঞ্জুর সাথে সাথে বড় হয়ে ‘মহাপুরম জুনিয়র হাইস্কুল’ হলো, তা সেই স্কুলের পশ্চিমে দিকে মহাপুরম গ্রামের মাঝ দিয়ে মাওরুম নদী, সেই নদীর তীরের বটগাছে বাঁদরদের অনুপস্থিতিতে দিনরাত সে দোল খাবে না তো কে খাবে!

মাওরুম নদীর উপরে শিকলে বানানো ব্রিজ,মানুষ উঠলে সেটা আবার কাঁপে -অমন মজাই বা ছোটবেলায় মঞ্জু আর পেয়েছে কোথায়। মিনু দিদি কতবার তাকে নিয়ে বাঁদরদের সভাস্থল সেই বটগাছের তলায় নিয়ে ঝুলতে থাকা সেতুটার দিকে চেয়ে অকারণে হেসেছে সেটার হিসাব নাই। দিদিটা এমন পাগল ছোটবেলা থেকে! মন চাইলো তো,‘চিক্ক! চিক্ক! হুদু গেলে ভেইধন?’ বলে বাড়ি মাথায় করে ফেললো মঞ্জুকে খুঁজতে খুঁজতে, আবার কোনো কোনো দিন কোনো খোঁজই করলো না ভাইয়ের।

এখন সেই গ্রাম নেই, কাপ্তাই বাঁধ গিলে নিয়ে আর কুলি করে ফেরত দেয়নি। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না একদমই। জ্যোছনা রাতের ওসব ইমোশনাল মুহুর্ত বাদ দিলেও ঐ মহাপুরম থেকে মঞ্জুর কি আর মুক্তি মেলে? স্যারের গলায় কাঁপতে থাকা চিটাগং কলেজের নির্জন দুপুর বলো,কিংবা শেষ বিকালে পাথরঘাটার এই হোস্টেলের ঝিরঝিরে বাতাস- মঞ্জুর মাথায় তো চব্বিশ ঘন্টার জন্য গ্যাঁট হয়ে বসেছে ওই গ্রাম, গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া কাঁচা রাস্তা, সেই রাস্তায় এক যুগ আগে চালু করা নীহার বাবুর রাঙামাটি টু নানিয়ারচর বাস সার্ভিস। বাসের ঝাঁকুনিতে রাস্তা অসহ্য লাগলেও গতির যে আলাদা একরকম মজা, সেটাও তো তাদের তখনই প্রথম জানা হলো। ওসব জেনেই বা কী লাভ, কাপ্তাইয়ে বাঁধ দিলে যে ওভাবে গ্রামের পর গ্রাম একে একে ডুবে যাবে পানির উচ্চতা বেড়ে- সেটা তো তখন বোঝা যায়নি। সবার মাঝে উৎকন্ঠা, কী হয়-কী হয়। ওর মাঝেই মঞ্জুর কী খেয়াল চাপলো, এক টুকরা মাটি নিয়ে কাগজে মুড়িয়ে দিদির হাতে দিয়ে সাবধানে রাখার অনুরোধে সে বলে, ‘দি, গমে থোচ! এ মাদিয়ানর ভালত্তমান দাম আগে সি।’

দিদি সেই কাগজের মোড়ক খুলে মাটি হাতে অবাক হয়ে বলে,‘ মঞ্জু,ইয়াননোই হি অব? ’

মঞ্জু কথা না বলে হাসে। আর দিনকতক পরে বাঁধের পানি উঠে এলে সব কিছু ডুবে যায়।

দরজা ডুবে, গোয়াল ঘর ডুবে, বাতাসে একটু একটু সাঁতার কাটা ধানের শীষ ডুবে। কিন্তু যত্ন করে রাখা সেই মাটিটুকু ডোবে না। আর এরপর থেকে মাথার ভেতর দিন নেই- রাত নেই- ভাসা নেই-ডোবা নেই, কেবল ঘাঁটি গেঁড়ে বসে থাকা মহাপুরমের মাটি তাকে বলে,‘কাজ করতে হবে রে মঞ্জু, কাজ করতে হবে!’ । কিন্তু মাথার মধ্যে জমিজমা সহ আস্ত একটা গ্রাম ওভাবে ঢুঁকে বসে মশার মতো পিনপিন করলে, কাজটা সে কীভাবে করবে সেটাই যে বুঝে উঠতে পারে না!

এই যে হোস্টেলের সব নীরব দুপুরগুলো, অথবা পড়ার মতো বইটই না থাকলে রাতের খাবার আগে ও পরে, ছুটির দিনে সকালে নাস্তার পরে আধঘণ্টার যাত্রা করে টাউনে যাবার ব্যস্ততা না থাকলে- মঞ্জু যে একটু ভাবনা চিন্তা করবে, মাথার ভেতর বকবক করতে থাকা ওই নির্জীব বাড়িগুলোর জন্যে সেটা আর হয়ে ওঠে না। তার উপরে আছে টিকটিকি। লেজ নেই, সরকারী পোশাক কখনো গায়ে থাকে, কখনো থাকে না। গভমেন্ট বড় হুঁশিয়ার। এ বছরের পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলন অরগানাইজ করায় মঞ্জু বেশ অ্যাকটিভ ছিলো, শালারা সেই থেকে একদম পিছু ছাড়ছে না। শোনা যাচ্ছে, প্রায় প্রত্যেক জুম্ম ছাত্রের উপরেই টিকটিকি লেলিয়ে দেওয়ায় আইয়ূব খানের ডাইরেক্ট অর্ডার আছে। আর এই গোয়েন্দাগুলাও পারে বাবা, বুদ্ধিটাও যদি ঠিকমতো থাকতো। মঞ্জুর পেছনে যেটা ঘোরে, সেটা আবার সিনেমার নায়কদের মতো লম্বা জুলফি রেখেছে। এমন স্টুপিড শালা, যখন তখন হোস্টেলে ঢুকে যায়, এর ওর ঘরে গিয়ে কথা বলবার চেষ্টা করে। মঞ্জুর সামনে পড়লেই আবার একটা বোকার মতো হাসি দিয়ে বেরিয়ে যায়। ধরা পড়েও পিছ ছাড়ে না। রাতের বেলা বাতাস খেতে নিচে নামলে রাস্তার ওপারে, দিনের বেলা ক্লাসে যাবার সময় আধঘন্টার বাস যাত্রায় পেছন দিকে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী হয়ে, কলেজের খেলার মাঠে বিকালে ঘাসের উপরে বসে একটু অবসরের মাখা মাখা ভাব আনলেই এই শালা নিজের লম্বা জুলফি নিয়ে হাজির। কোনো মানে হয়!

কিন্তু ওসব মাথায় রেখে থেমে গেলে কী চলবে? কাজ করতে হবে তোকে মঞ্জু, কাজ করতে হবে।

ডিগ্রীর সার্টিফিকেট দিয়ে লাভটা কী যদি চেঞ্জ আনা না যায়? সরকারী চাকরি, না হয় বেসরকারী দাস- এই তো হতে হবে। কিন্তু জুম্ম জাতির ভাগ্য তাতে বদলাবে না। দরকার পথে নামা। সেই পথ এতো সহজ না যে বুড়িঘাট থেকে নাচতে নাচতে তাকে রাঙামাটি নিয়ে যাবে। ইতিহাস পড়তে বসলে মঞ্জুর গা থেকে যেমন ভলকে ভলকে উৎসাহ বেরিয়ে আসে, মাথার মধ্যে এখন সেই একই হুড়মুড়ি চলে নেতাজী সুভাষ বোস, মাস্টারদা সূর্যসেনের নাম মনে পড়ায়। রাত জেগে সেই নমস্যদের দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখার সময় মঞ্জু টের পায়, ওই শালাদের সাধ্য নেই ওর পেছনে টিকটিকি লাগিয়ে বুকের ভেতরের ছাপ্পড় মুছে ফেলার। আজকের কথা তো নয়, মঞ্জু প্রস্তুত হচ্ছে সে অনেক দিন। কবে থেকে, তা মনে করার চেষ্টায় মঞ্জু জানালা ছেড়ে গায়ের শার্টটা খুলে বিছানায় অর্ধেক শরীর চিৎ করে শুইয়ে দেয়।

বাবা বাড়ির নাম দিয়েছিলো অনোমা কুঠির, ঘর ছিলো সাতটা। এখনো মাঝে মাঝে দুপুরের ক্লাসে ঘুম লেগে এলে সেই ছনের ছাউনি মঞ্জুর নাকে গুটিগুটি মেরে ঢুকে যায়। ছনের গন্ধ তো আর একা আসে না, দল বেঁধে নিয়ে আসে বইয়ের ঘ্রাণও। কলকাতা থেকে বাবার নিয়ে আসা বই। মাসিক পত্রিকা ছিলো অনেক-বসুমতি, শুকতারা। আর সে পড়তোও। পড়ার বই, গল্পের বই, পত্রিকা- বাদ দিতো না কিছু। পড়তে গিয়ে হুঁশ হারিয়ে ফেলার ঘটনা কত দিন ঘটেছে। একবার যেমন ঘরের এক কোনে পাট রাখা গাদা গাদা করে, মঞ্জু একদিকে বসে বই পড়ছে। সন্তুটা ছিলো ভারী দুরন্ত, তার নাকি বল ঢুকেছে ঘরে, সেই বল খুঁজতে সে নিয়ে এলো চেরাগ। চেরাগ জ্বালিয়ে সন্তু আঁতিপাতি করে এদিকে বল খুঁজছে, আর মঞ্জু এদিকে বই থেকে চোখই সরাচ্ছে না। পাছায় আগুনের ছ্যাঁকা লাগা পর্যন্ত মঞ্জু বুঝতে পারলো না যে ঘরে আগুন লেগেছে। ভাগ্যিস সেদিন মিনুদি ছিলো, সে’ই তাদের দুজনকে সরিয়ে নিয়ে পরে চিৎকার করে লোক ডেকে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করলো। কিন্তু ওসব ঘটনায় মঞ্জুর বই পড়া কি আদৌ কমেছে? ওই যে পড়ার টেবিলে থরে থরে সাজানো বিএ ক্লাসের বইয়ের সাথে দেশি-বিদেশি বই সব দেখা যাচ্ছে। সেই স্কুল থেকেই মঞ্জু বৃত্তির টাকা দিয়ে বলতে গেলে শুধু বই কিনেছে। কিন্তু এসব বই কেবল একলা পড়তে মঞ্জুর কেমন অস্থির লাগে। তার মনে হয় সবাইকে জোর করে ধরে বসিয়ে ক্লাস নেয়, মাস্টারদা আর নেতাজীর জীবনী পড়ে শোনায়। বিএ পাশ দিয়ে গ্রামে গিয়ে মাস্টারি শুরু করবে নাকি?

ভাবনায় হবু শিক্ষকের চোখের পাতা পিটপিট করে। ভেবে দেখলে, গ্রামে যাওয়াই ভালো। অমার্জিত অগোছালো মুখের কথায় ভরপুর, সবল জঙ্ঘা সম্বল করে চড়াই পেরিয়ে আসা, টুইলের শার্টে ঘামের গন্ধ সাথে আনা উৎসুক মুখের পাহাড়ি শিশুদের পড়াতে মঞ্জুর কি ক্লান্ত লাগবে নাকি কখনো?

আর তাছাড়া গ্রামের মানুষ এখনো স্বার্থ বুঝতে শেখেনি, ব্যক্তিগত লাভের জন্য মুখ বুজে অন্যায় পাশ কাটিয়ে যায় না। গত কদিনে অনেক তো দেখা হলো। কই, মিটিং করার সময় বারবার ডেকেও তো একটাও শহুরে, কথিত শিক্ষিত ছেলেকে পাওয়া গেলো না। এ অজুহাত সে অজুহাত দেখিয়ে সরে গেলো সবাই। মিটিং এ সত্যিকার অর্থে আসলে সাড়া দিয়েছে ওই গ্রাম থেকে আসা ছেলেরাই। মঞ্জুর মত এরাও কাপ্তাই ড্যামের ভয়ংকর রুপটা নিজ চোখে দেখেছে, পাকিস্তান সরকার ওদের কীভাবে বঞ্চিত করেছে তা ওরা জানে। শহরের ঘি খেয়ে পাছা ফুলানোর সুযোগ এদের আসেনি বলেই কাজ করবার জন্যে, আন্দোলন করবার জন্যে এরা আদর্শ। মাস্টারি পেশার ফাঁকে এদের নিয়েই গ্রামে গ্রামে, পাহাড়ে পাহড়ে ঘুরে জুম্মদের সচেতন করে তুলবে মঞ্জু। জানাবে, সরকার কীভাবে অবিচার করেছে ওদের সাথে। হিসাব নিকাশ করে দেখাবে, পুনর্বাসনের বাজেট থেকে কতটা মেরে দিয়েছে স্থানীয় করাপ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অসুখবিসুখে পড়লে আবার বিপদ, সেরকম হলে পাহাড়ে ঘোরা বন্ধ করে কেবল শিক্ষকতাকেই আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর রাস্তা কই! অসুস্থ হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে কোনো স্কুলের বারান্দায় আর তার প্রস্তুত করা লিফলেট- সরকারের সমস্ত মিথ্যাচার তুলে ধরা আছে যেখানে- ছাত্রদের হাত ঘুরে চলে যাচ্ছে পাহাড়ের গভীর থেকে গহীনে, ঝরনা থেকে ঝরনায়; মঞ্জুর এই চমৎকার কল্পনাটা দানা বাঁধতে গিয়েও ফট করে ফেটে যায় লিফলেট প্রসঙ্গে।

লিফলেটের ভাষা কি বেশি কড়া হয়ে গেছে? নইলে জ্ঞানেন্দ্র, প্রদ্যুৎ এরা এমন ঘাবড়ে গেলো কেনো? কই, মঞ্জু তো স্মৃতি থেকে দুয়েকবার রিভাইজ দিয়েও তেমন কিছু বের করতে পারে না! দাবি দাওয়া তো তাদের খুব স্পষ্ট। কাপ্তাই বাঁধের জল রাখতে হবে ষাট ফুটের নিচে, ক্ষতিপূরণের জন্যে বরাদ্দ অর্থের সব ঠিক মতো দিতে হবে, পরিকল্পিত পুনর্বাসন করতে হবে- ব্যাস, হয়ে গেলো।

কিন্তু জ্ঞানেন্দুরা এই লিফলেট দেখেই একেবারে খেপে গেলো সেদিন, মঞ্জুকে একরকম চেপে ধরে মনোজের সাথে কথা বলতে সেই শ্রীপুর পর্যন্ত নিয়ে গেলো শালারা। ভাষা নাকি এতো কড়া হয়েছে যে সরকারের হাতে এ জিনিস যাওয়া মাত্র ওদের গ্রেপ্তার অবশ্যম্ভাবী। মঞ্জুর অসহ্য লাগে এসব। চারিদিকে সব সফট ছেলেপিলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, রাজনীতি এদের কাছে চায়ের দোকান- বড়জোর কলেজের কম্পাউন্ডে গলা পরিষ্কার করার ওষুধ। চকবাজারের মোড় থেকে সুগন্ধী কেনার মতো এতো আয়াসে অধিকার আদায় হয় না, এ কথা ওরা বুঝবে কবে?

তবে এই টিকটিকিদের কাছ থেকে সাবধান না হয়ে উপায় নাই। নিজেকে নিয়ে চিন্তা মঞ্জুর বেশি নয়, কিন্তু পার্টির অন্য ডেডিকেটেড ছেলেদের জন্যে ভাবনা হয়। আইয়ূব খান এদের আটকে ফেলতে পারলে সরল- নিরক্ষর জুম্মদের সচেতন করবে কারা? লিফলেট বিতরণের কাজ তো চলছে, কিন্তু এরপর কী ভাবে কী করবে চিন্তায় করোটির জটগুলো যেন আঠালো হতে থাকে ক্রমশ। আজ হোক কাল হোক, পুলিশের কাছ থেকে কি আর সম্পুর্ণ লুকানো যাবে এইসব? তার চেয়ে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির আসল আস্তানা এখন যে শ্রীপুর হোস্টেল, সেখানে বরং ছেলেদের অ্যালার্ট করে দেয়া যায়। গোপন ইনফরমেশনসহ কাগজপত্র কিছু থাকলে সেগুলা পুড়িয়ে ফেলতে বলা যায়। বোকার মতো ধরা দিয়ে লাভ কী, কত কাজ করার আছে।

বিছানা ছেড়ে মঞ্জু যায় পড়ার টেবিলে যায়, পিঠ-সোজা শক্ত কাঠের চেয়ারে বসলে কোমরের কাছে একটু একটু টান পড়ে। চন্দ্রঘোনা মিলে চারুবিকাশ আর ধর্মদর্শী আছে, তাদের চিঠি লেখা দরকার। লিফলেট বাহক হিসেবে না হয় নতুন ছেলেপিলেকে পাঠালো, কিন্তু সেখানে পৌঁছে কার কতটুকু কী দায়িত্ব- এই ছেলেরা কি আর তা বুঝবে! ঘুরে ফিরে সব তো মঞ্জুরই কাজ।

কিন্তু চিঠি লিখতে কলম টেনে নেয়া মাত্রই মহাপুরম গ্রাম মশা হয়ে কামড়াতে থাকে আবার। উপরে, ডানে মার্জিন দেয়া দিস্তা কাগজের তোড়া সেলাই করে বানানো খাতার উপরে কালো কালিতে মঞ্জুর নাম আর শিক্ষাবর্ষ কেমন যেন দুলতে থাকে মাওরুম নদীর শেকলে বানানো ব্রিজের মতো।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, ১৯৬২।

নাচতে থাকা অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে কোত্থেকে যে চিঠি লেখা আরম্ভ করবে মঞ্জু তাই ভুলে বসে থাকে। অথচ কত কত কাজ যে করতে হবে তাকে,এই ভেবে সে শান্তিও পায় না এতটুকু।


মন্তব্য

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

অন্য একটি লেখার অংশ বিশেষ তুলে দিলাম। অসংলগ্ন বোধ হলে পাঠকের কাছে দুঃখপ্রকাশ করছি হাসি

সোহেল ইমাম এর ছবি

লেখাটা কি সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন? সম্পূর্ণ লেখাটা কবে পাচ্ছি ভাই।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

নাহ, শেষ হয়নি।

কবে শেষ হবে সেটাও বুঝতে পারছি না। মন খারাপ

সোহেল ইমাম এর ছবি

এই সময় কালটার ওপর আরো কিছু ভালো উপন্যাসের খুব দরকার। সেটা আপনার হাত দিয়ে এলে সত্যিই ভালো হয়।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

তানিম এহসান এর ছবি

ইটা রাইখ্যা গেলাম...

চলুক! হাসি

নীড় সন্ধানী এর ছবি

কাজ শুরু করে দিয়েছেন তাহলে। বেশ আগ্রহ পাচ্ছি। সময় লাগুক, কিন্তু পুরোটা গুছিয়ে নিয়ে শেষ করুন। হাসি

দ্বিতীয় চিটাগং কলেজ নিয়ে আয়ুবীয় ধাপ্পার ব্যাপারটা কি আসলেই সত্যি ঘটেছিল নাকি?

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

ঈয়াসীন এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

পাহাড়ের সেই দিনগুলো নিয়ে নতুন উপন্যাস আসছে? পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

শেহাব এর ছবি

ন্যারেশন খুব দ্রুতগতিতে এগুলো। এর ফলে কোন একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ছবি আমার মাথায় তৈরি হওয়ার আগেই ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন সময়ের কোন ঘটনা চলে এসেছে। আপনার লেখার এই স্টাইলটি আমার জন্য নতুন। এক্সপেরিমেন্ট করে যান।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।