ভালোবাসা

স্নিগ্ধা এর ছবি
লিখেছেন স্নিগ্ধা (তারিখ: শুক্র, ২৫/০৪/২০০৮ - ১০:৪২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

হ্যা, অদ্ভূত শোনালেও কথাটা সত্যি। প্রমি ছোটবেলা থেকেই কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মাঝে হেসে ফেলে। ব্যাপারটার জন্য আসলে মা খানিকটা দায়ী । মা ওর কান্না থামানোর জন্য অদ্ভূত অদ্ভূত কি কি সব বলতে থাকতো আর প্রমি হেসে ফেলতো। হেসে ফেলতো ঠিকই কিন্তু তাই বলে কান্নাটাও আবার থামাতে পারতো না - অতএব হাসি কান্না, কান্না হাসি দুটোই চলতো একইসাথে কিছুক্ষণ। যেমনটা অনেকসময়ই ঘটে থাকে জীবনে।

তৃষা আবার অন্যরকম। সদাসুখী, ফুরফুরে কিন্তু রেগে গেলে রীতিমত দাপাতে থাকে। কান্নার মধ্যেও রাগটা পরিষ্কার বোঝা যায়। তৃষা প্রমি’র চাইতে পাঁচ বছরের বড়। ওদের মধ্যে চেহারায় কোন মিল না থাকলেও কিছু কিছু ব্যাপারে ওরা ভীষণ একরকম। যেমন, দুজনেই গান অসম্ভব ভালোবাসে - অবশ্য এটা ছোটবেলা থেকে গান শুনতে শুনতে বড় হওয়ার কারণেই হয়তো ( মা যখনই সুযোগ পেত গান শুনতো), দুজনেই লেখে চমৎকার (এটাও মাতৃসুত্রে প্রাপ্ত), দুজনেই ছবি আঁকে অদ্ভূত, পেশাগতভাবে সফল, আর সবচাইতে বড় কথা - অত্যন্ত সংবেদনশীল দুটো মানুষ ওরা। আর কিছু যদি নাও হয় শুধুমাত্র একারণেই ওরা প্রশংসার দাবী রাখে।

এই যেমন এখন - প্রমি জরুরী মিটিঙ্গের মাঝখানেও তার ব্ল্যাকবেরীর দিকে বার বার তাকাচ্ছে আর ভাবছে তৃষা’র ফোনটা আসতে এতো দেরী করছে কেন? তৃষা গেছে মাকে দেখতে। মাকে বাড়িতে রাখা যখন মার স্বার্থেই একেবারে অসম্ভব হয়ে উঠলো, প্রায় গোটা বিশেক আবাসন দেখেশুনে দুজনে বসে যতরকম এদিক ওদিক সবদিক বিবেচনা করা যায় তা করে ঠিক করলো মাকে কোথায় রাখা যায়। শুধু সেবার মানই তো নয়, দূরত্বও একটা বড় ব্যাপার। কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে হয় তৃষা নয় প্রমি কেউ না কেউ প্রতিদিন মাকে দেখতে যায়। মোটামুটি কাছাকাছি না হলে যেটা করতে ওদের দুজনেরই জিব বেরিয়ে যাবার কথা। নিজেদের জীবন, পেশা, আরও হাজারো ব্যস্ততা পাড়ি দিয়ে এটা করা কিন্তু খুব সহজ নয়। তারপরও খুব , ভীষণ, বিতিকিচ্ছিরি কোন প্যাঁচ না লাগলে ওরা যায়। তবে কখনও একসাথে যায় না।

মা ওদের দুজনকে একসাথে দেখলে একটু অস্থির হয়ে পড়ে। কি যেন মনে পড়ি পড়ি করে , কি যেন একটা গোলমাল আছে, কি যেন একটা বলার আছে , কিন্তু ঠিক কথাটা ঠিক পরম্পরায় এসে পৌছোয় না আর মা আরও ছটফট করতে থাকে। তাই ওরা ঠিক করেছে মা’র নির্ভেজাল খুশীটুকু নিশ্চিত করতে ওরা আলাদাই যাবে। যে যেদিন যায় বেরিয়েই অন্যকে জানায় মাকে কেমন দেখলো- খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। এমন না যে একদিনের ব্যবধানে খুব কিছু বদলে যাবার আশা বা আশঙ্কা কোনটাই ওরা করে, কিন্তু তবুও জানার তাগিদটা ওদের ভেতর থেকেই আসে - এটা দুজনেরই একটা প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলা চলে।

শুধু কর্তব্য জ্ঞান বা শুধু ভালোবাসা নয়, প্রমি আর তৃষা এই পুরো ব্যাপারটাকে দেখে একধরনের যাত্রা হিসেবেও। মা যেমন একসময় কিশোরী ছিলো, ওদের বয়সী ছিলো, তারপর আস্তে আস্তে বার্ধক্য এবং ক্রমে এই পর্যায়ে পৌছলো - তেমনি ওরাও পৌছবে। মা’র যাত্রা আগে শুরু হয়েছে, ওদেরটা একটু পরে - তফাৎ এটুকুই। গন্তব্য তো সবারই জানা, খালি পথটা হতে পারে হরেকরকম। আর সে যাত্রাপথে তৃষা বা প্রমি মা’র পাশে থাকবে না- এমন মানসিক গঠন ওদের হতেই পায় নি - মা’র কারণেই পায় নি।

তবে ওরা কখনো একসাথে মাকে দেখতে যায় না। এলযাইমারসের কারণে মা সাম্প্রতিক সবকিছু ভুলে গেলেও আবছা আবছা মনে করতে পারে অনেক আগে তার যেন একটাই ছোট্ট মেয়ে ছিলো। তাহলে আরেকজন কে?

না, ওরা কখনো মাকে মনে করিয়ে দেয় না যে ওরা বোন নয়। কখনো বলে না যে দুজনের মধ্যে একজনই শুধু জৈবিক ভাবে মা’র মেয়ে। কারণ ওদের কাছে সেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় একটা তথ্য।

ওদের দুজনের দুই মা ছোটবেলা, বড়বেলা, অনেকবেলা একইসাথে বন্ধু হিসেবে পার করেছে। জীবনের নানা খানা খন্দ পাড়ি দিয়েছে পাশাপাশি। এবং যাই ঘটুক না কেন শেষ অবধি 'বন্ধুতা'য় বাস করেছে। শুধু এই শেষবেলায় এসে কেবল একজন রয়ে গেছে।

কিন্তু চলে গেলেই কি চলে যাওয়া হয় নাকি? প্রমি আর তৃষার কাছে ঘটনাক্রমে কে শারীরিকভাবে উপস্থিত রয়ে গেল সেটা মোটেই বড় কথা নয়। ভালোবাসার উৎস একটা থাকলেই তো হলো। একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের কাছেও তা পৌছে দেয়া যায় , সময় এবং পার্থিবতার বাধা অতিক্রম করেও। ওদের কাছে তাই উৎসটাই বড় কথা, ভালোবাসা পাওয়া আর ভালোবাসা দিতে পারাটাই বড় কথা, জৈবিক সম্পর্ক নয়, অধিকারবোধ নয়, সামজিক নিয়ম নয়, আর কিছুই নয়।

ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু কি পারে এমন করে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যেতে?


মন্তব্য

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

ছুঁয়ে গেল।

অনিকেত এর ছবি

স্নিগ্ধা'পু

পাঁচের বেশি রেটিং দেয়ার সুযোগ না থাকায় আমি কিঞ্চিত মনক্ষুন্ন। এই লেখা পাঁচের মাঝে অন্তত আট পাবার দাবী রাখে।

চমৎকার লেখা। কেন যে এত অল্প লেখেন............

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু কি পারে এমন করে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যেতে?
ভীষন ভালো লেখা।

...........................

সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

ক্যামেলিয়া আলম এর ছবি

হায়রে জীবন --------- এত ক্ষনস্থায়ী সময়ে এত কষ্ট দেবার জন্য কেন যে প্রকৃতি মুখিয়ে থাকে --------

অসাধারন!
.....................................................................................
সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চ'লে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি..........

.....................................................................................
সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চ'লে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি..........

খেকশিয়াল এর ছবি

অদ্ভুত সুন্দর একটি লেখা, অসাধারন !

-----------------------------------------
রাজামশাই বলে উঠলেন, 'পক্ষীরাজ যদি হবে, তা হলে ন্যাজ নেই কেন?'

-----------------------------------------------
'..দ্রিমুই য্রখ্রন ত্রখ্রন স্রবট্রাত্রেই দ্রিমু!'

রায়হান আবীর এর ছবি

আসলেই এতো কম লিখেন কেন আপনি?
ছুঁয়ে যাওয়া লেখা।
---------------------------------
জ্ঞানীরা ভাবলেন খুব নাস্তানাবুদ করে ছাড়া গেছে...আআআহ...কি আরাম। বিশাল মাঠের একটি তৃণের সাথে লড়াই করে জিতে গেলেন।

ছোট্ট তৃণের জন্য অপরিসীম ঘৃণা।

অনিন্দিতা এর ছবি

ভালোবাসা পাওয়া আর ভালোবাসা দিতে পারাটাই বড় কথা, জৈবিক সম্পর্ক নয়, অধিকারবোধ নয়, সামজিক নিয়ম নয়, আর কিছুই নয়।

চমৎকার উপলব্ধি!

হাসান মোরশেদ এর ছবি

প্রেম ছাড়া কি আর দিনবদল ঘটানো যায়?
xxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxx
...অথবা সময় ছিলো;আমারই অস্তিত্ব ছিলোনা

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

ধুসর গোধূলি এর ছবি
তারেক এর ছবি

খুব ভালো লাগলো। অনেক অনেক কাছের লেখা...
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে

_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে

স্নিগ্ধা এর ছবি

অতন্দ্র প্রহরী, অনিকেত, সু পা শিমূল, ক্যামেলিয়া, খেকশিয়াল, রায়হান আবীর, অনিন্দতা, ধূসর গোধূলী, হাসান মোর্শেদ এবং তারেক - সবাইকে অনেক, অনেক ধন্যবাদ।

আমি আর আমার মা সারাটা জীবন প্রায় দুই বন্ধুর মতো কাটিয়েছিলাম, খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো আমাদের।

খালি শেষের একবছর আমার মা আমাকে আর চিনতেই পারে নি।

কিন্তু তাতে কি? তাতে কি আসলে কিছু আসে যায়?
শেষপর্য্যন্ত ? হাসি

নুরুজ্জামান মানিক এর ছবি

মন ছুয়ে গেল । নিচের কথা গুলির জন্য আপনাকে বিপ্লব ।

"হাসি কান্না, কান্না হাসি দুটোই চলতো একইসাথে কিছুক্ষণ। যেমনটা অনেকসময়ই ঘটে থাকে জীবনে। "

যথার্থ ।
জীবনের বারোমাস,
হাসি,কান্না আর দীঘশ্বাস ।
কারো কি সাধ্য আছে জীবনের
শ্বাশ্বত ব্যকরন পাল্টাবার ?

"গন্তব্য তো সবারই জানা, খালি পথটা হতে পারে হরেকরকম। "

"ভালোবাসা পাওয়া আর ভালোবাসা দিতে পারাটাই বড় কথা, জৈবিক সম্পর্ক নয়, অধিকারবোধ নয়, সামজিক নিয়ম নয়, আর কিছুই নয়। ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু কি পারে এমন করে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যেতে"

না পারে না,ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু কি পারে এমন করে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যেতে। দুস্ট জনেরা বলে , ভালবাসলে নাকি কস্ট পেতে হয় । আমি বলি , তাতে কেন কর এত ভয় । ভালবাসা দিয়েই ত' করা যায় কস্টকে জয়।

নুরুজ্জামান মানিক
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)

স্নিগ্ধা এর ছবি

আপনার মেইলের উত্তর পাঠিয়েছি - কিন্তু বাংলায়। পড়তে না পারলে জানাবেন।

দ্রোহী এর ছবি

খুব সুন্দর একটা লেখা। খুব সুন্দর...........


কি মাঝি? ডরাইলা?

পরিবর্তনশীল এর ছবি

ভালোবাসা!
---------------------------------
ছেঁড়া স্যান্ডেল

স্নিগ্ধা এর ছবি

দ্রোহী আর পরিবর্তনশীল - ধন্যবাদ !

অতিথি লেখক এর ছবি

ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু কি পারে এমন করে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যেতে?
- সত্যিই এই লাইনটা অপূর্ব সুন্দর। অনেক মায়া দিয়ে লেখা হয়েছে এই গল্পটা।
ভালো লাগলো।

নিবন্ধন-নাম : রুদ্রবিলাস

স্নিগ্ধা এর ছবি

ধন্যবাদ রুদ্রবিলাস!

ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি

ভালোবাসার উতস একটা থাকলেই তো হলো। একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের কাছেও তা পৌছে দেয়া যায় , সময় এবং পার্থিবতার বাধা অতিক্রম করেও। ওদের কাছে তাই উৎসটাই বড় কথা, ভালোবাসা পাওয়া আর ভালোবাসা দিতে পারাটাই বড় কথা, জৈবিক সম্পর্ক নয়, অধিকারবোধ নয়, সামজিক নিয়ম নয়, আর কিছুই নয়।
মানবীয় বৃত্তির এই দর্শনটা বুঝতে পেরেছি মনে হয়। এই ভাবনার মধ্যে এই অনুভূতির মধ্যেও একটা শান্ত সৌন্দর্য আর জীবনে বিশ্বাস আছে। তবে যে, বললাম বুঝি; তা কিন্তু আমার ভেতরের বোঝা নয়. অন্যকে বোঝা...। বোঝাতে কি পারলাম?


মনে হয় তবু স্বপ্ন থেকে জেগে
মানুষের মুখচ্ছবি দেখি বাতি জ্বেলে

হাঁটাপথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে। হে সভ্যতা! আমরা সাতভাই হাঁটার নীচে চোখ ফেলে ফেলে খুঁজতে এসেছি চম্পাকে। মাতৃকাচিহ্ন কপালে নিয়ে আমরা এসেছি এই বিপাকে_পরিণামে।

স্নিগ্ধা এর ছবি

তবে যে, বললাম বুঝি; তা কিন্তু আমার ভেতরের বোঝা নয়. অন্যকে বোঝা...।

আমরা সবাইই তো বিভিন্নতায় বসবাস করি, সেটাই তো সৌন্দর্য্য ...... হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।