ভালো নেই

তাপস শর্মা এর ছবি
লিখেছেন তাপস শর্মা [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৬/০২/২০১২ - ১০:১৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কাব্যের মলিন পাতা খুঁজতে খুঁজতে জীবনের একটা করে অধ্যায় পার হয়ে যায়। চারিদিকে কত কোলাহল। কত তুচ্ছ বিষয় নিয়েই না মেতে আছি কতকাল। কতদিন হল শুভ্রের বন্দনা করিনা, খেয়োখেয়িতে বিষ কামড় বসিয়েই ডাস্টবিনে লড়ে যাচ্ছি অবিরাম। মন্দিরে মসজিদে চার্চে গুরুদোয়ারায় গিয়ে মাথা ঠেকায় ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু সেই নিষ্প্রাণের জন্যই আবার অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আরে এটাই তো সময় - আসেন আমরা সবাই পশু হই!!! ওরা আমাদের চেয়ে ঢের ভালো। আমরা সভ্যাতা নষ্ট করি, ওরা জঙ্গল নষ্ট করেনা। আর বেশীদিন নাই - আমরা নিজেদের মাংস ছিরেফুরে খাব, প্রমিস! আসুন নরখাদক হই ? আর ভগবান কিংবা ঈশ্বরের কাছে নিজেদের উৎসর্গ করি !! যে শালার নেংটি আজ অবধি দেখি নাই।

ডট.কম এর যুগে সবই পাশাপাশি কাছাকাছি। শুধু হৃদয়ের তারটা আজ বড্ড দুর্বল। তার মেরামত কেউ করেনা। অনেক কিছুই আজকাল অদ্ভুত ধরণের শূন্য হয়ে গেছে, ফাঁকা, ইনফেক্ট বাঁচার ইচ্ছেটাও কেমন জানি দুর্বল। একটা বিশ্রী গতানুগতিকতা এসে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ, ভীষণ অসুস্থ লাগে।

কমিউনিকেশন বিপ্লব হয়ে গেছে সভ্যতায়। কত সহজেই না মানুষ একে অপরের কাছে পৌঁছে যায়। অথচ এখন ভয় হয়। কিছু অকৃতজ্ঞ ভদ্রতার মুখোশ শুধু ঘুরে বেড়ায়। ভালোবাসা পুড়ে গেছে। কিছু স্বার্থসিদ্ধির ভন্ডামি শুধু আদর্শের বুলি কপচায়। পথের নামে ওৎ পেতে থাকে আসলে কিছু ফাঁদ। ব্ল্যাকবেরির আড়ালে ঘুরে বেরায় দূরত্বেরা। তাই একাকীত্ব নির্মম ভাবে জাপটে ধরে। শহরের রাজপথে এখন ডিজেলের পোড়া ধোঁয়া। অসহ্য সাফোকেশনে দম বন্ধ হয়ে আসে। গীটারের পাগলামোগুলো আজ ঘোরোতর সংসারী। বন্ধুরা সব ঠান্ডা ঘরে নিয়ম করে টাকা কুড়োচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই। তাই মাঠে গিয়ে ঘাস ছুঁয়ে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। স্বপ্নলাঞ্ছিত মন গোপন থেকে টেনে আনে আর এক সীমাহীন আদরের স্বপ্নকে। উষ্ণতা আজ একবার এসো...... প্লীজ।

জীবনকে ডাকবাক্সে বন্দি হতে দেখি বারবার। কিন্তু চিঠির হদিশ পাইনা। খামগুলিও খালিখালি, ঠিক পাতা ঝড়ার গানের মতো; উদ্ভ্রান্ত কিংবা হতাশ। মানুষের ধর্ম নাকি তার নিজের ভেতর, নিজের অস্তিত্বের ভেতর। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কেন এত মন্দির মসজিদ গড়া হল? কেন মানুষ জীবনের সাথে ধর্মের অলীক বিধান খুঁজে মরে? ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণাই মানুষকে পঙ্গু করে দেয়, বধির করে দেয়? তাই আমার কাছে ধর্ম জিনিষটাই একটা ফাও। আরো ভালো ভাবে বলতে গেলে একটা সুপরিকল্পিত অন্ধত্বের ট্র্যাক হল ধর্ম।

এইবার কথা হল একটা প্রশ্ন আমাকে বারবার শুনতে হয়, ধর্ম নিয়ে ঈশ্বর নিয়ে আমার এত অ্যালার্জি কেন। এর উত্তর আমার কাছে শুরু থেকে শেষ একটাই যা নাই তাকে নিয়ে আপনার এত মাথাব্যাথা কেন। আমি আপনার ধর্মাচারণে যেহেতু বাধা দেইনি তাহলে আপনি কেন যুক্তির পরোয়া না করে আমার কাছে ফাঁকা বুলি আউরান? অসহ্য সব প্রশ্নের উত্তর দিতে ক্লান্ত লাগে।

কোন কিছুর জন্য যখন লড়াই করতে হয়। এর শুরুটা কোথায় থেকে হয়। আমি লড়ছি আমার সাথে এবং আমার পরিবারের সাথে, একজন বাবার আদরের সাথে, একজন মায়ের মমতার সাথে। কিছুটা ক্লান্ত আছি। কুলীন ব্রাহ্মণ বংশের একটা তিলক আমার কপালে এবং এবং দেহে সাঁটা হয়েছিল যখন বুঝার মতো বয়েসে ছিলাম না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন ধর্মকে দর্শন না করে ধর্ষণ করতে শুরু করলাম, তখন থেকেই লড়াইটা শুরু। আসলে আমাদের পরিবার আমাদের উপর তাদের লেভেলটা চাপিয়ে দিতে চায়, বিশেষ করে আমার মতো একান্ত ধর্মীয় পরিবেশে মন্দিরমুখো যৌথ পরিবারে বড় হয় মানুষদের যে কতটা চাপ হয় তার বলা মুশকিল। পৈতে নামক একটা দড়িকে দেহ থেকে পরিত্যাগ করার ফলে বহন করতে হচ্ছে নানা গঞ্জনা এবং মানসিক চাপ। এমনকি মুরুব্বীরা শুনাচ্ছে - এইভাবেই নাকি ধর্মের পথে নিজের বিনাশ ডেকে এনেছি। আমি বুঝাতে গিয়ে যদিও ব্যর্থ হয়েছি - কারণ যুক্তির পথে মুক্তি ওরা চায়না। কিন্তু প্রশ্নটা হল আমি যখন ওদের উপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাইনি, ওরা কিন্তু তার উল্টোটা করছে। চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। এটা যে অন্যায় এর বোধ ওদের ভেতর নেই। হাজার বছর ধরে লালিত সেই বিশ্বাস তাদের ভাঙছে না, বরং একটু চির ধরলেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার পুনরুদ্ধারে। এখানেই লড়াই। আর সেই লড়াই এ যেই জিতুক কিংবা হারুক না কেন ব্যাথা হয় উভয় দিকেই। পরিবর্তন অনেক মূল্য নিয়ে যায়, অনেক।

কিনারায় দাঁড়িয়ে জলের ঢেউ চোখে। অপেক্ষা ক্লান্ত তবু ব্যস্ত নয়। ভ্রান্ত পথ উদ্ভ্রান্ত নয় শেষ বেলায়, ভাবনাগুলি কানে কানে কথা কয়। হৃদপিণ্ডের কোলাহলে স্তম্ভিত স্বপ্ন। শুকনো ডালপালারা উদাসীন দেহে শ্মশানের বার্তা বয়ে বেরায়। লম্পট নদী তীরের ব্যর্থ আকর্ষণ, ক্লান্তি ক্ষোভ হাতাশায় বিবর্ণ চিত্তে ঘরে ফিরে যায়। দিন আসে, রাত যায় স্থবির হয়ে আছি। চারিদিকে লম্বা লম্বা প্রগতিশীল মশাল জ্বলে। পুড়িয়ে দিতে চায় কণ্ঠ। প্রাণপণ চেষ্টা করি নিজের অস্তিত্বকে বাঁচাতে। ততক্ষণ লড়াই করে যাই যখন আগুনের লেলিহান শিখা এবং বিস্ফারিত ফুলকি আমাকে ভগ্নাংশে পরিণত করে দেয়।


মন্তব্য

হাসান কাজমী এর ছবি

এ সংগ্রাম বোধহয় আপনার একার নয়; আরও অনেককে দেখেছি এই আগুনে পুড়তে। মনোবল হারাবেন না, ভালো থাকবেন। তাছাড়া আমার মনে হয়, চিরন্তন দ্বন্দটুকু না থাকলে জীবনটা আরো ফিকে লাগবে।

তাপস শর্মা এর ছবি

হয়তো তাই হবে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

দ্যা রিডার এর ছবি

চিরন্তন দ্বন্দটুকু না থাকলে জীবনটা আরো ফিকে লাগবে।

তাপস শর্মা এর ছবি

ধন্যবাদ দ্যা রিডার।

ধূসর জলছবি এর ছবি

মন খারাপ পরিবর্তন অনেক মূল্য নিয়ে যায়, অনেক । চলুক

তাপস শর্মা এর ছবি

এইতো জীবন।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

এর মধ্যেই ভাল আছি। ভাল থাকুন
শুভকামনা।

তাপস শর্মা এর ছবি

আপনিও ভালো থাকুন দাদা।

কাজি মামুন (অতিথি লেখক) এর ছবি

আরে এটাই তো সময় - আসেন আমরা সবাই পশু হই!!!ওরা আমাদের চেয়ে ঢের ভাল। আমরা সভ্যতা নষ্ট করি, ওরা জংগল নষ্ট করে না।

জটিল বলেছেন, তাপসদা। আমরাই চকচকে সভ্যতা বানাই; আবার আমরাই তাকে টুকরো টকরো করে ব্যবচ্ছেদ করি! স্বীয় বাসভূম চোখের সামনে ধূলিসাৎ হতে দেখি; থমকে যায় সভ্যতার চাকা। মনে পড়ে যাযাবরের গানঃ
''প্রেম-হীন ভালবাসা দেশে দেশে
ভেঙ্গেছে সুখের ঘর''

তাই মাঠে গিয়ে ঘাসে ছুঁয়ে চোখ বুঁজে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। স্বপ্নলাঞ্ছিত মন গোপন থেকে টেনে আনে আর এক সীমাহীন আদরের স্বপ্নকে। উষ্ণতা আজ একবার এসো প্লীজ

মনে পড়ল জীবনান্দের লাইনঃ
''ঘাসের বুকের থেকে কবে আমি পেয়েছি যে আমার শরীর...
যত দূর যাই আমি আরো যতদূর পৃথিবীর
নরম পায়ের তলে যেন কত কুমারীর বুকের নিঃশ্বাস কথা কয়''

তাপস শর্মা এর ছবি

ধন্যবাদ মামুন ভাই। জীবনানন্দের লাইনগুলি সত্যিই ছুঁয়ে যায়।

শুভেচ্ছা।

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

তাপসদা আপনার লেখার মধ্যে দিয়ে আপনার লড়াইয়ের যে ছবিটা ফুটে উঠেছে সেটা আমাকে ছুঁয়ে গেল ।
একটাই কথা বলব ।
আপনার ভেতরে আপনি যে মুক্তিকে খুঁজে পেয়েছেন তাকে লালন করেই কাটিয়ে দিন ।

যখন ধ্বনি শুধু প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে নিজেরই কাছে, তখন নীরব থাকাই শ্রেয় ।
শুধু জানবেন, আপনি একা নন ।
অনেককেই এই পথে হাঁটতে হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে ।

ভালো থাকবেন ।

তাপস শর্মা এর ছবি

ধন্যবাদ প্রদীপ্ত।

শুভেচ্ছা।

তারেক অণু এর ছবি

তাপস দা, আমাদের সমাজের কুসংস্কারের নাগপাশ এত বেশী প্রবল, আমার মনে হয় শিক্ষা বিস্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- - এই অজ্ঞানতা দূর করবার জন্য।

কেউ যদি মহাকাশ, নৃতত্ত্ব, জীববিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাস নিয়ে সামান্য জ্ঞানও লাভ করে এইসব ফাঁকা বিশ্বাস অনেক দূরে মিলিয়ে যাবে এমনটিতেই, ধর্মের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত না হয়ে শিক্ষা বিতরণ করা দরকার। সবার মাঝেই।

শুভেচ্ছা

তাপস শর্মা এর ছবি

খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছ। কিন্তু একটা বিষয়ও বারবার খটকা দেয়, অনেক এডুকেটেড মানুষরাও যখন অন্ধ হয়ে যায়!

তারেক অণু এর ছবি

তারা আবার কিসের শিক্ষিত ! ডিগ্রী থাকলেই কি শিক্ষিত হয় নাকি ! এর জন্য চেতনা লাগে, মনন লাগে-

তাপস শর্মা এর ছবি

ইয়েস। দ্যাটস দ্য পয়েন্ট। চলুক

আসলে এরা হল বিষাক্ত সাপের মতো।

নন্দিতা এর ছবি

আপনার লেখাটায় মাঝে কোথাও ছন্দপতন আছে, আবার কোথাও একদম হৃদয় ছুঁয়ে গ্যাছে। আরেকটু যত্ন নিয়ে করলে আরো ভালো হতো।সবমিলিয়ে মনে হলো আমার কথাগুলো আপনি বর্ণনা করলেন !!!!!!!!!!!!

তাপস শর্মা এর ছবি

পড়ার জন্য এবং মন্তব্যের জন্য আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।