পুরনো গল্প ০৩

নজমুল আলবাব এর ছবি
লিখেছেন নজমুল আলবাব (তারিখ: রবি, ২৬/০৪/২০০৯ - ৪:১৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মা গুনে গুনে টাকা দিতো। ডানোর কৌটো থেকে বের হতো সেই টাকা। সাত টাকার ডাল, এক টাকার কাচা মরিচ... এভাবে টাকার অংক ধরে ধরে বাজারে পাঠাতো আমাকে। ততদিনে আমি জেনে গেছি, এভাবে হিসেব করেই বাজারে যেতে হয় আমাদের। এভাবে হিসাব করে বাজার করা যায় না তবু সেটা মেনে নিতে হবে। এও জেনেছি, সাত টাকায় এক পোয়া ডাল আর তেরো টাকায় আধা সের, এক টাকা বাচানোর এই হিসাবে আমরা যেতে পারবো না। আমাদেরকে রোজ আট আনা বেশি দিয়েই ডাল কিনতে হবে।

বাবা মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় বারান্দায় এসে দাড়াতো। সে বৃষ্টিই হোক আর শীত। বাজার থেকে ফিরে এসে দেখি বাবা বারন্দায়, সন্ধার আলো আলো অন্ধকারে বাবা আমার দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি সেটা দেখি, আবার নাও দেখি। কথা বলতো না। শুধু একবার, রাতে, মাঝরাত হবে হয়তো। কি একটা বই খুজতে বাবার ঘরে গেলে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কিরে টুটুল তুই রোজ রোজ সাত টাকার ডাল কিনিস কেনো? আমি অবাক হয়ে বলি, তুমি জানলে কিভাবে? বাবা একটু থেমে আবার বলে তেরো টাকা দিলেতো আধাসের ডাল পাওয়া যায়। রোজ রোজ আট আনা বেশি দিস কেনো?

আমার মাথায় ঢং ঢং করে হাতুড়ির বাড়ি পড়ে। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার দিকে তাকানো চোখটায় পুরনো সেই শূন্যতা নেই। সেখানে বরং আছে হিসাব বুঝিয়ে দেয়ার এক আত্মতৃপ্তি। রোজ রোজ সাবান কিনে দেয়ার হিসেবটা বাবা আমাকে বুঝিয়ে দেয়। দাড়িয়ে থাকা আমাকে দেখে বাবার কি হয় জানি না। উঠে দাড়ায়। কাছে আসে, কাধে হাত রাখে আমার, টান দিয়ে বুকে নিয়ে বলে, এভাবেই রোজ রোজ আট আনা দিয়ে দিতে হয়রে টুটুল, এভাবেই রোজ রোজ আমাদের ঠকতে হবে। এভাবেই হিসেবহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা...


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

কেনো জানি এইটাকে গল্প ভাবতে ইচ্ছে করতেছে না। নিজের জীবনেরই কোন একটা অংশ মনে হচ্ছে।

ভাল লাগলো।

উজানগাঁ

মুস্তাফিজ এর ছবি

পেছনের কথা মনে করিয়ে দিলেন ভাই। সেই ৭৩,৭৪,৭৫ এর কথা।

...........................
Every Picture Tells a Story

জিজ্ঞাসু এর ছবি

সাত টাকায় এক পোয়া মসুর ডাল মনে হয় ৮৫, ৮৬র কথা।
যদি বলি আমারও একই গল্প হবে।

___________________
সহজ কথা যায়না বলা সহজে

শাহেনশাহ সিমন [অতিথি] এর ছবি

চলুক

সৌরভ এর ছবি

নিজের গল্প, বড্ড নিজের মনে হচ্ছে।

মুস্তাফিজ ভাই ফিরে যাচ্ছেন বছর তিরিশ আগে। আমি পেছন ফিরে দেখবো বছর পনের। চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকায় মেপে বাজার করতাম।

চলুক।


আবার লিখবো হয়তো কোন দিন

দ্রোহী এর ছবি

আমাকে বিশ টাকার ভেতরে থাকতে হত। এর বেশি সামর্থ্য ছিল না আমাদের।

ধুসর গোধূলি এর ছবি
প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

হুমম, নিজের জীবনের গল্প মনে হচ্ছে।

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

এভাবেই রোজ রোজ আমাদের ঠকতে হবে। এভাবেই হিসেবহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা...
তাই হয়...

...........................

সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

ঐ মিয়া... আমি না এইসব আপনেরে আর লেখতে মানা করছি?
খালি ভেজাল করেন না?

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

ইশতিয়াক রউফ এর ছবি

দিলেন মনটা আবার খারাপ করে। বুঝলাম আপনি মর্মাহত বাউল, তাই বলে প্রতিটা লেখায় এভাবে ঝাঁকি মারতে হবে আমাদের?

লেখাটা পড়ে মনে হচ্ছিল লেখককে জড়িয়ে ধরি।

দ্রোহী এর ছবি

সচলায়তন eবুক "ফেলে আসা ছেলেবেলা" পৃষ্ঠা ৯২ লিখেছেন:

আমি প্রত্যেকদিন বাজারে যেতাম। ইলিশ মাছ দশ টাকায় এক ভাগ হিসাবে বিক্রি হত। একভাগ ইলিশ মাছ কিনতাম আর পুঁই শাক। মাঝে মাঝে রুচি পরিবর্তনের জন্য আড়াইশো গ্রাম গরুর মাংস কেনা হত। প্রত্যেকদিন ইলিশ মাছ, পুঁই শাক নতুবা গরুর মাংস এভাবেই চলতে লাগলো। আমার বুদ্ধিমতি মা সবচেয়ে কম খরচে সংসার চালানোর জন্য এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

আমার ছেলেবেলার কয়েকটা বছর কেটেছিল ঠিক একই ধরনের দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে। গল্পটা পড়ে তাই খুব কষ্ট পেলাম।

সবজান্তা এর ছবি

ভালোই, মানুষজনরে কষ্ট দেওয়ার ভালো বুদ্ধিই বাইর করেছেন ভ্রাতঃ...

পুনশ্চঃ মেইলে কাজ হলো ?


অলমিতি বিস্তারেণ

সংসারে এক সন্ন্যাসী এর ছবি

এই জাতীয় লেখায় মন্তব্য করা যায় না মন খারাপ

আচ্ছা, আপনার ডাকনাম তো "অপু" জানতাম। নাকি টুটুলও? তাহলে তো সচলে, আমার হিসেব মতে, চারজন টুটুল।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
টাকা দিয়ে যা কেনা যায় না, তার পেছনেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় কেনু, কেনু, কেনু? চিন্তিত

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
টাকা দিয়ে যা কেনা যায় না, তার পেছনেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় কেনু, কেনু, কেনু? চিন্তিত

পান্থ রহমান রেজা এর ছবি

এভাবেই হিসেবহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা...
চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

শ্তদ্ল

আমার আম্মা আমােক পান আনাতে িদতো দুই টাকা, সুপাির আনার জন্য দুই টাকা এবং কাচাঁ মরিচ আনার এক টাকা আরও অনেক কথা মনে পড়ে গেল।

সাইফুল আকবর খান এর ছবি

কী যে দুঃখপূরাণ শুরু করলেন বস!
ধুর! মন খারাপ

০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০
"আমার চতুর্পাশে সবকিছু যায় আসে-
আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা!"

___________
সবকিছু নিয়ে এখন সত্যিই বেশ ত্রিধা'য় আছি

রেনেট এর ছবি

চুপচাপ এসে শুধু পড়ে যাই।
---------------------------------------------------------------------------
No one can save me
The damage is done

---------------------------------------------------------------------------
একা একা লাগে

লুৎফুল আরেফীন এর ছবি

আটপ্রৌঢ়ে গল্পের অলবাবীয় সংস্করণ = অভূতপূর্ব গল্প!
___________________________
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

সচল জাহিদ এর ছবি

মনে আছে দু'টাকা রিকশা ভাড়া বাচানোর জন্য মা কতদূর হেটে বাজারে যেতেন আর সপ্তাহের একদিন গরুর মাংস খাবার সেই আনন্দ ।

-----------------------------------------------------------------------------
আমি বৃষ্টি চাই অবিরত মেঘ, তবুও সমূদ্র ছোবনা
মরুর আকাশে রোদ হব শুধু ছায়া হবনা ।।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

স্নিগ্ধা এর ছবি

হায় রে, চার ভাইবোন আমাদের (তার ওপর বড়ভাইয়ের পরিবার) কে নিয়ে সীমিত আয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খাওয়া আমার আব্বা-আম্মা! সপ্তাহে একদিন গরুর মাংস বরাদ্দ ছিলো আমাদেরও। প্রত্যেকটা টাকার মূল্য ছিলো। মনে আছে ছোটবেলায় কালেভদ্রে কোন জামা উপহার পেলে আম্মা ঈদের জন্য তুলে রাখতো।

আহ্‌ -সেসব স্মৃতি, এখন কেন যেন ভাবতে খুব ভালো লাগে!
শেষ বয়সে আমার ভাইদের কল্যাণে আমার বাবা-মা অনেক ভালো থেকেছেন/আছেন। সেজন্যই হয়তো।

তানবীরা এর ছবি

আমাকে কোনদিন এ পরিস্থিতি দিয়ে যেতে হয়নি কিন্তু ছোটবেলায় দাদা মারা যাওয়ায় বাবা গেছেন চ্রম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে। আমাদের কষ্ট সব বাবাই করে ফেলেছিলেন আগে আগে।
ছোটবেলায় দাদু আমাদের ঈদের সালামী দিতে গিয়ে নতুন টাকা গুলোকে রীতিমতো ঘষত, একটা না বেশী চলে যায়, আমরা কাজিনরা সার বেধে দাঁড়াতাম, হেসে গড়িয়ে পড়তাম, আজ অনুভব করতে পারি কেনো ঘষত?

তানবীরা
---------------------------------------------------------
চাই না কিছুই কিন্তু পেলে ভালো লাগে

*******************************************
পদে পদে ভুলভ্রান্তি অথচ জীবন তারচেয়ে বড় ঢের ঢের বড়

শাহীন হাসান এর ছবি

এভাবেই হিসেবহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা...
ভাল-লিখেছেন ....।
....................................
বোধহয় কারও জন্ম হয় না, জন্ম হয় মৃত্যুর !

....................................
বোধহয় কারও জন্ম হয় না, জন্ম হয় মৃত্যুর !

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।