হুঁক্কুঁ (২য় পর্ব)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০৯/০৩/২০০৯ - ২:৪৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

জুলফিকার কবিরাজ

অত:পর টেনু মণ্ডলের তাহাজ্জত আমলের ফায়াজ হল। খুশিতে বাঙ্গী ফাটা হয়ে মণ্ডল পালের সেরা দুটি দামরা গরু মেরে আকিকা দিয়ে নাম রেখে পিদিম জ্বালল। নাম রাখা হল খালিদ বিন অলিদ। বাপ ব্যাটা সম্পর্কে আরবী ব্যাকরণে অনভিজ্ঞ ধর্মান্ধ মণ্ডল ছেলের সাথে বাপের নাম ঠিক থাকল কিনা সে দিকে তাল না দিয়ে গাল ভরা উচ্চারণের একটি সেরা আরবী নাম দিয়েছেন তাতেই বেজায় খুশি। ডাক নাম রাখল হামজা। কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে সে গর্ভ ভরে সহী উচ্চারণে নাম বলার চেষ্টা করে; যদিও তার সে সহী উচ্চারণ ছিল নিজের মাতৃভাষার উচ্চারণের মত কাহিল। যদি কেউ সাদামাটা ভাবে সে নাম উচ্চারণ করে সাথে সাথে সে বলত, ‘উহু হোলে না, এ হোলে গা অরবী লাম, তাও আবার যেম্বা সেম্বা লোহের লাম লায়- এ্যাক্কে ব্যেরে আরবের সেরা বিরির লাম। এসব লাম সোয়ি করি না কলি পরে, তাজিমের সাতে উচ্চেরণ না করলি আদ্দবি থাহে না, বেদ্দবি হয়ি যায়। গুনা হয়।

টেনুর এই সহী ও তাজিমের সাথে উচ্চারণের ব্যাপারটা এবং এত টুকু বাচ্চার এখনি কত বুদ্ধি, কী কী অদ্ভুত কর্ম-কাণ্ড করে সে সবের ইনিয়ে বিনিয়ে বিষদ বর্ণনা একটা বাতিকের ব্যাপার হয়ে গেল। টেনুর বুড়ো বয়সের এইরুপ নাতি প্রীতি কারো কারো কাছে অত্যাচারের পর্যায়ের মনে হল; সে জন্য দেখা হলে অনেকেই তাকে এড়ায়ে চলতে লাগল। কিন্তু দুষ্ট ছেলে ছোকরার দল বেশ মজার একটা বিষয় পেল। তারা দেখা হলেই বলে, ‘আরে দাদা নাহি গো? দাদা, ক্যাম্বা আছ্যাও? তুমার লাতিটুক ক্যাম্বা লয়চে? কী জিন তুমার লাতিক্ষিণির লাম, কালিদ বিন-’
দাদা বলে,‌‌‌ ‘হোলি না হোলি না, তোরে কত করি কই যে লামডা সোয়ি করে কবু। লে আমার সাতে সাতে ধর- খালিদ বিন অলিদ, উরুপে হামজা’। এই ভাবে বুড়কে দিয়ে সে নাম বার বার নানা ভঙ্গীতে উচ্চারণ করায়ে হয়রান করে তুলে। তার পুচকে নাতির অবিশ্বস্য সব কর্মকাণ্ডের কথা মনযোগ ভরে শুনে মাঝে মাঝে বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, ‘দাদা তুমি যা যা কোলে তার যদি এক কেনি কোনাও সত্যি হয়, তালি আমরা হলপ করি কবের পারি তুমার এই লাতিসোনা এক দিন মেলা বড় হোয়ে মণ্ডল গুষ্টির মুক আলো করবি। আল্লা তুমাক একক্কিন সেই রকম নিয়েমত দেচে’।
- আমি কবরের কাদির (কিনারা) পর দাড়া হোয়ে তোরে কাচে কী গুল মারতিচি। এই আমার চোক ছুয়ি কচ্চি, আমার ব্যাক (সব) কতাই সত্যি, আমার কতার ভিদেন (মধ্যে) ইকটু জাল্লাও মিত্যে নেই।
- না দাদা তুমার সব কতাই আমরা বিশ্বিস করি, তুমি আর যাই তাই কর না ক্যা কুন সুময় তুমার জবানে মিত্যি রুচপি লায়; ইডা আমরা বিশ্বিস করি।
- তা ঠিক
- দাদা, তুমার লাতিডা নাহি সেই রকম ঢকের (দেখতে খুব সুন্দর) হয়চে!
- টেনু আনন্দে ডগমগ হয়ে বলে, ‘তা আর কোতি (বলতে) মাশাল্লা আসলেই ঢকের হয়চে’।
এই ভাবে তারা নানা তোষামদে বুড়োর কাছ থেকে তার গাছের ফলমূল বাগায়ে নেয়।

ইতোমধ্যে হামজা দুই এক পা করে হাটা শিখলে তার নানার দ্রষ্টব্য বিষয়ের পরিধিও কদমে কদমে বাড়তে থাকল।
কিন্ত দুষ্ট দলের কাছে আনিছের বেড়ে উঠার সাথে সাথে মণ্ডলের সঙ্গে খেলাটা লাগসই মনে হচ্ছিল না।
লিটন বলল, ‘নারে টেনুক লাড়ে (রাগায়ে) যুত হতেচে না, লোতুন এক্ষিণ কিদুরকী (কখনো ইয়ারকী মারা অর্থে, কখনো ফন্দি আটা অর্থে) ফাদা লাগবি’। সবাই মন্ত্রনা সভায় বসে গেল।

নানা নাতি সকালে বাড়ির সামনে লাঠি ভর দিয়ে হাটচে দেখে তিন চার জন ছেলে এসে সালাম দিয়ে বলল, ‘যাক আমারে দাদার দুক্কু ঘোচেচে, দাদার আর লাটি লাগবি লায় লাতিই এহুন নানার লাটি’।
- তা ঠিকি কইচিস।
- দাদার যে ধাত, শইলির যে গাতন তাতে দাদা হাসে খেলে লাতির বিয়ি পারি দিবি।
- তুরা দুয়া কর দাদা দুয়া কর। দেকতি দেকতি লাতি আমার বিয়ির লাক্কি (উপযোগী) হয়ে উটপি। লাতি আমার বাকার (সিয়ানা হওয়া, যৌবন প্রাপ্তি) আগ আগ দিয়েই নাত বউ ঘরে তোলবো। তত্ দিন যিন আল্লা হায়েত দারাজ করে।
কেউ বলে - ও কালিদ তুমার জামাডাতো খুব বাহারে। কিডা কিনি দেচে? কেউ হামজা নামের বিকৃতি করে বলে, হামু আজ কি দি ভাত খাইচ্যাও?
খালিদ আধো আধো ভাবে গাগু করে উত্তর দেয়। টেনু মণ্ডল বিরক্ত হয়ে বলে ‘তুরা কীরে, মানষির লাম ডাও ঠিক ঠাক মত সোয়ি করে উচ্চেরণ করিসনি’- এই বলে শুরু করে দিল তার সহীর বয়ান।

লিটন এই অপেক্ষাতেই ছিল। সে বলল ‘এ কালু আমরা যে বাংলা জানি তা বাদুরে খাওয়া বাংলা; যার বাজার চল নেই। আর আমারে আরবী বিদ্যে তো ধরলক্ষণ (যব-তব)। তাই কতি ছিলেম কি, ওসব ভুল ভাল অরবী কওয়ার চেন না কওয়াই ভাল। তাও আবার আমারে ধম্মের গুরার দিককার ডাংওর ডাংওর (বড় বড়) সব পিদ্দান (প্রধান) পালোয়ানেরে নাম। ভুল ভাবে সে সব নাম কোয়ে সুরমানি লোক গুলেনেক অপমান করবের চাইনি। আবার বাতেনি গুনার চাষ বারাবেরও চাইনি। তাছারা দাদাও ব্যাজার হয়’।
-তার চে তুই এক্কিন বাংলা নাম দে, আমরা সে নামেই ডাকপো।
- হুঁক্কুঁ।
- বা বড়ো সুন্দের নাম।
- আমরা ক্ষ্যাতে-মাটে কাজ-কাম করি খাই, তাই এক্কিন ক্ষ্যাতাল নাম দিলেম। নামডা ভুল কোলিও অসুবিদি নেই, আবার সোয়ি করে কওয়াও গাদি (অনেক) সুবিদি। নাকের ভিদেন (মধ্যে) লিয়ি ইকটু গুন্না করে কোলিই হোবি। তুরা সগ্গল মিলে ক -‘হুঁক্কুঁ’।
-হুঁক্কুঁ।
-শালারা আমার সাতে কিদুরকি লাগাইছ্যাও - এই বলে টেনু মণ্ডল লাঠি ছুড়ে মারল।


মন্তব্য

ফারুক হাসান এর ছবি

চলুক

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

হুম... কোন অঞ্চলের ভাষা এইটা?
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

অতিথি লেখক এর ছবি

পাবনা সদরের ভাষা

লীনা ফেরদৌস এর ছবি

Lina Fardows

আমরা ক্ষ্যাতে-মাটে কাজ-কাম করি খাই, তাই এক্কিন ক্ষ্যাতাল নাম দিলেম। নামডা ভুল কোলিও অসুবিদি নেই, আবার সোয়ি করে কওয়াও গাদি (অনেক) সুবিদি। নাকের ভিদেন (মধ্যে) লিয়ি ইকটু গুন্না করে কোলিই হোবি। তুরা সগ্গল মিলে ক -‘হুঁক্কুঁ’।

খুব মজা পেলাম । এই লাইনগুলি সেইরকম হয়েছে ।

Lina Fardows

অতিথি লেখক এর ছবি

লীনা,
মন দিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। অধিক মজা চাখতে বোগলে বোগলে (সাথে সাথে) থাকুন।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।