রকেট

মন মাঝি এর ছবি
লিখেছেন মন মাঝি [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ১০/০৩/২০১১ - ৭:২১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মনমাঝি

আপনি যদি একটু চিন্তা করে দেখেন, তাহলে অবাক হবেন যে সম্পূর্ণ অচেনা আগন্তুকদের সম্পর্কেও আপনি কতটা জানতে সক্ষম একটা পরীক্ষামূলক রকেটে তারা কি ধরণের প্রাণী ব্যবহার করে তা থেকে ...

ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড ল্যাবরেটরির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। যেখানে অদ্ভুত সেই রকেটের হাজার হাজার টুকরো সযত্ন বিন্যাসে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশগুলি নিয়ে ছোট ছোট কয়েকটি দল কাজ করছে। ক্যাপ্টেন অনেকক্ষণ ধরে একটা প্রশ্ন করতে চাচ্ছেন, কিন্তু কিছু যেন একটা তাঁর মুখ চেপে ধরেছে।

ক্যাপ্টেনের পেছনে ডক্টর জোহানসেন নিজের ডেস্কে বসে এখনো অজিজ্ঞাসিত সেই প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁর গ্রন্থিবহুল বুড়ো হাতে একটা হুইস্কির বোতল শক্ত করে ধরা – সেই বোতল যেটা সবসময় তাঁর ডেস্কেই থাকে কিন্তু একা না হওয়া পর্যন্ত তিনি কখনো যা বের করেন না।

ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড অবশেষে ঘুরে দাঁড়ালেন।

“ওগুলো আমাদের মার্কিং ?” জিজ্ঞেস করলেন। নাঃ এটা সেই প্রশ্ন না। ডক্টর যেমন জানেন, ক্যাপ্টেন বেয়ার্ডও তেমনি রকেট টেস্টিং স্টেশনের মার্কিংগুলি খুব ভালো করেই চেনেন।

“হ্যাঁ,” ড. জোহানসেন বললেন, “ওগুলো আমাদের মার্কিং। হুবহু। কিন্তু পেইন্টটা আমাদের না।”

ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড আবার জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। মাস ছয়েক আগের ঘটনা। উৎক্ষেপণের মাত্র দশ মিনিটের মাথায় দৈত্যাকৃতির পরীক্ষামূলক রকেটটি তখন অবজার্ভেশন স্ক্রীনে স্রেফ একটা ফুটকিতে পরিণত হয়েছে। ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড সেদিনও বিতৃষ্ণাভরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।

“একটা ইঁদুর !” তিনি বলেছিলেন, “দূর্ভাগ্য হলো, একটা ইঁদুর পর্যবেক্ষন করতে পারে না, নির্মান করতে পারে না, রিপোর্ট করতে পারে না। আমার লোকজন অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে, জোহানসেন।”

“আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ হলে পরে হবে, ক্যাপ্টেন,” জোহানসেন বলেছিলেন।

এই আলাপচারিতা চলছিল সেন্ট্রাল কন্ট্রোল থেকে জরুরি ডাক পেয়ে ক্যাপ্টেন ল্যাবরেটরিতে ছুটে আসার বারো ঘন্টা আগে। ড. জোহানসেন আগেই পৌঁছে গেছিলেন ওখানে। প্রোফেসর শুলজ্‌ দেরি না করে ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেলের দিকে মনোযোগ আকর্ষন করলেন সবার। “গতিপথে একটা আকস্মিক অপসরন ঘটে গেছে। নিজেরাই দেখুন। আমরা মঙ্গলগ্রহকে অন্ততপক্ষে সোয়া মিলিওন মাইল ব্যবধানে মিস করবো।”
দুই ঘন্টার মধ্যেই টেস্ট রকেটটার কোর্সে অপসরন, অর্থাৎ বিপথে সরে যাওয়াটুকু তাঁদের সবার কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেল। সবার মনেই জেঁকে বসলো একরাশ হতাশা।

“ইন্সট্রুমেন্টের রিডিং অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে স্টিয়ারিং সিকি ইঞ্চি সরে গিয়েছিল। কিন্তু কোন কারন বোঝা যাচ্ছে না,” প্রোফেসর শুলজ্‌ জানালেন।
“ধাতুতে কোন ত্রুটি ?” ডক্টর জোহানসেন জানতে চাইলেন।
“কতদূর যেতে পারবে ওটা ?” প্রশ্ন ক্যাপ্টেন বেয়ার্ডের।
কাঁধ ঝাঁকালেন প্রোফেসর শুলজ্‌। “যদ্দিন না জ্বালানি শেষ হয়। আর সে সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই বললেই চলে। অথবা, যদ্দিন না গ্রহ-আকারের কোন মহাকাশ-বস্তুর দেখা পাওয়ার ফলে অবতরনের স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক-প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়।”
“গতিপথ ? গতিপথটা হিসেব করেছেন ?” ডক্টর জিজ্ঞেস করেন।
“অবশ্যই। আমার হিসাব মতে, রকেটটা আলফা সেন্টরাইর দিকে ছুটছে।”
ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড ফিরে দাঁড়ালেন। জোহানসেন লক্ষ্য করলেন সেটা।
“আশা করি এরপর থেকে আপনি আপনার লোকজনের জীবন নিয়ে আর এত তাড়াহুড়ো করবেন না, ক্যাপ্টেন ?” সংক্ষিপ্ত মন্তব্য তাঁর।
প্রোফেসর শুলজ্‌ ডায়ালগুলি ঘুরাচ্ছিলেন। “কোনো যোগাযোগ হচ্ছে না,” জানালেন তিনি, “একদমই না।”

এসব ছয় মাস আগের ঘটনা। এর মধ্যে আরো তিনটা টেস্ট রকেট সফল ভাবে উৎক্ষেপন করা হয়ে গেছে। এমন সময় ৪ নং আলাস্কান অবজার্ভেশন পোস্ট থেকে একটা জরুরি বার্তা আসলো একদিন। উত্তর মেরু দিয়ে একটা রকেট প্রবেশ করছে পৃথিবীতে।

অদ্ভুত রকেটটাকে এক স্কোয়াড্রন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রযুক্ত ফাইটার প্লেন অনুসরন করে এবং পাহারা দিয়ে রকেট টেস্টিং স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে আসলো যেখানে রকেটটা নিজেই আস্তে করে ল্যাণ্ড করলো।
পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ইনফ্যান্ট্রির এক ডিভিশন সৈন্যের মাঝে দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন, ডক্টর জোহানসেন এবং অন্য সবাই অস্থিরভাবে অপেক্ষা করছিলেন। অস্বস্তিকর থমথমে একটা পরিবেশ বিরাজ করছে।

“আপনি নিশ্চিত এটা আমাদের না ?” ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড জিজ্ঞেস করেন।
জোহানসেন হাসলেন। “দেখতে আমাদেরটার মত, হ্যাঁ, কিন্তু আকারে তিনগুন বড়।”
“হয়তো এশিয়ান রকেটগুলির একটা ?”
“না, এটা আমাদেরই ডিজাইন। কিন্তু খুব বড়, অসম্ভব রকম বড়।”
প্রোফেসর শুলজ্‌ সবার চিন্তাকে ভাষা দিলেন। “মনে হচ্ছে কেউ আমাদেরটা নকল করেছে। কেউ একজন, কোন একখানে। কল্পনা করাও কঠিন, কিন্তু তারপরও এটাই হচ্ছে বাস্তব।”

ওঁরা দু’টি সপ্তাহ অপেক্ষা করলেন। কিন্তু কিছুই ঘটলো না। তখন তেজষ্ক্রিয়তা-প্রতিরোধক-স্যুট পরে একটা টীম রকেটে প্রবেশ করলো রকেটটা পরীক্ষা করে দেখতে। আরো দু’সপ্তাহ পরে অদ্ভুত রকেটটা টুকরো-টুকরো করে তার ব্যবচ্ছিন্ন অংশগুলি টেস্টিং স্টেশনের মাঠে ছড়িয়ে রাখা হলো। রকেটটা ব্যবচ্ছেদের পর থেকে পুরো স্টেশন নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে কথা বলা শুরু করলো আর বারবার আকাশের দিকে তাকাতে লাগলো।

ক্যাপ্টেন বেয়ার্ড এখন জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে বিচ্ছিন্ন রকেটটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকিয়ে রয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর মন জানালা থেকে দৃশ্যমান রকেটের ঐ বিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশগুলিতে নয়।

“এর নির্মান-উপকরণগুলি আমাদের না ?” তিনি জিজ্ঞেস করেন।
“এই দুনিয়ারই না।”
ক্যাপ্টেন মাথা ঝোঁকালেন। “ওগুলি আমাদের যন্ত্রপাতি ?”
“হ্যাঁ।” ডক্টর জোহানসেন হুইস্কির বোতলটা এখনো শক্ত মুঠিতে ধরে আছেন।
“ওরা ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছে ওদের,” ক্যাপ্টেন মন্তব্য করলেন।

জোহানসেন ডেস্কের ওপর বোতলটা দড়াম করে আছড়ে রাখলেন। “জিজ্ঞেস করুন ক্যাপ্টেন, আল্লার দোহাই, জিজ্ঞেস করুন !!”
ক্যাপ্টেন ঘুরে ডক্টরের মুখোমুখি হলেন। “এটা একটা মানুষ। একটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষ।”
ডক্টর এমন ভাবে হাঁফ ছাড়লেন যেন বুকের ভেতর জমে ওঠা দম কোনমতে পালিয়ে বাঁচে। “হ্যাঁ, এটা একটা মানুষই। এটা শ্বাস নেয়, এটা খায়, মানুষের সব বৈশিষ্ট্যই এটার মধ্যে আছে। কিন্তু এটা আমাদের গ্রহের না।”
“এটা কথা বলে....” ক্যাপ্টেন শুরু করলেন।
“ওটা কথা বলা না, ক্যাপ্টেন,” জোহানসেন মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ঝঙ্কার দিয়ে উঠেন, “এটা স্রেফ কিছু আওয়াজ।” থামলেন তিনি; নিজের হুইস্কির বোতলটার লেবেল খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। ভালো ব্র্যাণ্ডের হুইস্কি বটে। “ওকে গুদামঘরের ভিতর খুব খুশী মনে হয়। আমাকে কোন্‌ জিনিষটা প্রথমে ধাঁধায় ফেলেছিল, জানেন ক্যাপ্টেন ? ও পড়তে পারে না। ও কিছুই পড়তে পারে না, এমনকি ঐ মহাকাশযানের কোন ইন্সট্রুমেন্টই ও পড়তে পারে না। বস্তুতঃ রকেটটার ব্যাপারে কোন আগ্রহই দেখা যায়নি ওর মধ্যে। ”

ক্যাপ্টেন বসে পড়লেন এবার। ডেস্কের উপর বসে ডক্টরের দিকে তাকালেন। “ইঁদুরের বদলে, ওদের অন্তত একটা মানুষ পাঠানোর সাহস আছে বলতেই হবে। একটা মানুষ, ডক্টর।”
হাতের মধ্যে হুইস্কির বোতলটা পিষতে পিষতে ডক্টর জোহানসেন ক্যাপ্টেনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষন। “একটা মানুষ যে কিনা নিজের রকেটের ইন্সট্রুমেন্টগুলিই পড়তে পারে না ?” হেসে উঠলেন তিনি। “আপনিও কি তাহলে আসল পয়েন্টটা মিস করছেন, ক্যাপ্টেন? বাইরে বসে থাকা ঐ গবেট জেনারেলটার মত, যে কিনা অজ্ঞাত স্থান থেকে অদৃশ্য মানুষের আক্রমণের অপেক্ষায় বসে আছে ? ”
“আপনার কি মনে হয় না যে ওটাও একটা সম্ভাবনা ?”
জোহানসেন মাথা ঝোকালেন। “খুবই ভালো সম্ভাবনা, ক্যাপ্টেন, কিন্তু ওরা মানুষ হবে না।” ডক্টর মনে হলো একটু ইতস্তত করে তারপর সামনের দিকে ঝুঁকলেন। “এই রকেটটা, ক্যাপ্টেন, একটা টেস্ট রকেট। ঠিক আমাদেরটার মতই !

কথা শেষ করে ডক্টর অবশেষে তাঁর হুইস্কির বোতলটার ছিপি খুলে দু’টো গ্লাসে কিছু তরল আগুন ঢাললেন।
“ড্রিঙ্কস্‌ চলবে, ক্যাপ্টেন ?”
ক্যাপ্টেন তখন জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

===============================================================
মূলঃ জ্যাক ডগলাস
অনুবাদঃ মনমাঝি



মন্তব্য

কৌস্তুভ এর ছবি

বাঃ!

অনুবাদ ভালো হয়েছে।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ কৌস্তভ ভাই। এবার আর রসগ্রহণে অসুবিধে হয়নি তো ?

মনমাঝি

কৌস্তুভ এর ছবি

হাসি

মুস্তাফিজ এর ছবি

ভালো লেগেছে

...........................
Every Picture Tells a Story

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ মুস্তাফিজ ভাই। ভালো থাকবেন।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ঝরঝরে অনুবাদ। তারায় তারায় খচিত!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

অসঙ্খ্য ধন্যবাদ রোমেল ভাই। আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।

মনমাঝি

পাগল মন এর ছবি

অনুবাদ ভালো লেগেছে কিন্তু এটা কী শেষ নাকি চলবে? অ্যাঁ

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

অতিথি লেখক এর ছবি

হ্যাঁ, গল্পটা এখানেই শেষ। দেঁতো হাসি
এই গল্প আসলে ঠিক সে অর্থে এলিয়েন ইনভেশনের কাহিণী না। জোহানসেন কথিত মূল পয়েন্টটাতেই আসলে কাহিণী শেষ। এক হিসেবে এই কাহিনীরও ওটাই 'মূল পয়েন্ট' বা পাঞ্চ লাইন, যাই বলুন। ভিনগ্রহ থেকে আসা রকেটটা অন্যরকম না হয়ে কেন হুবহু পৃথিবী থেকে পাঠানো টেস্ট রকেটটার মতই দেখতে (অথচ একই রকেট না এবং সাইজে অনেক বড়), কেন ওটার ভেতর টেস্ট এ্যানিমেল হিসেবে ইঁদুরের বদলে মানুষ (যে কিনা আবার কথা বলতে বা পড়তে পারে না, ইঁদুরের মত স্রেফ 'আওয়াজ' করে এবং 'গুদামঘরে' থাকতে বেশী পছন্দ করে) - এইসব প্রশ্নের সাথে জোহানসেনের উপলব্ধি 'ভিনগ্রহের রকেটটাও আসলে, ঠিক আমাদেরটার মতই, ওদের একটা টেস্ট রকেট' (যে রকেটে ইঁদুরের পরিবর্তে টেস্ট এ্যানিমেল হচ্ছে একটা 'মানুষ') এবং এই "ওরা" যে আমরা অর্থাৎ 'মানুষ' নই - এই পর্যবেক্ষণগুলি মিলিয়ে পড়ুন, তাহলে হয়তো বুঝবেন গল্পটা কেন এখানেই শেষ হয়ে গেছে। অন্তত আমার কাছে তা-ই মনে হয়েছে।

ভালো লাগার জন্য ধন্যবাদ পাগল মন। ভালো থাকুন।

মনমাঝি

পাগল মন এর ছবি

ধন্যবাদ আপনাকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য।
আপনিও ভালো থাকবেন।

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

অনুবাদ চলতে থাকুক।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।