পারী ১

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ২৮/১১/২০১১ - ৮:৩৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

স্কুলে অথবা কলেজ়ে পড়ার সময় কোন ক্লাসে যেন অন্নদাশঙ্কর রায় এর লেখা প্রবন্ধ পড়ে প্যারিস এর প্রতি একটা টান জন্মে গিয়েছিল।এত সুন্দর বর্ণনা ছিল যে মনে হচ্ছিল চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছি।চিন্তা করতাম কবে যাব সেখানে,রাস্তা ধরে ঘুরে বেড়াব, ক্যাফেটেরিয়াতে বসে আড্ডা দিব! আমার ঘোরাঘুরির তালিকায় একদম এক নম্বরে রেখে দিয়েছিলাম। এরপর বিভিন্ন সময় প্রবন্ধ পড়ে, গল্প শুনে, ছবি দেখে পছন্দের জায়গার তালিকা আরও বড় হতে থাকে। মিশরের পিরামিড,ইতালির ভেনিস, ইন্ডিয়ার গোয়া, শিমলা, আমেরিকার লাস ভেগাস আর কানাডার নায়াগ্রাফলস।
ছোটবেলায় বানানো এই তালিকার কথা একসময় ভুলেই গিয়েছিলাম।পরদেশে আসার পর আবার মাথায় উঁকি দিতে শুরু করেছে।আর এই সুযোগে প্রথমেই প্যারিস যাব ঠিক করলাম।
তিন দিনে কোথায় কোথায় ঘুরব, সেটার একটা প্ল্যান করে ফেললাম। আমরা এখান থেকে ড্রাইভ করে গিয়েছিলাম। ইচ্ছা ছিল যেদিন প্যারিস গিয়ে পৌছাবো সেদিন ও ঘুরতে যাওয়ার, কিন্তু প্যারিস এর সীমানায় প্রবেশ করা মাত্রই বিশাল এক জ্যাম এ আটকে পড়লাম। পুরোপুরি দুই ঘ্ন্টা বেশি লাগ্ল হোটেল পর্যন্ত যেতে। রাস্তাগুলো অনেক্ টা ঢাকার রাস্তার মতো, অসংখ্য চৌরাস্তা, তার উপর আবার গাড়িগুলো ট্র্যাফিক সিগনাল মেনে চলে না সবসময়- যখন ই রাস্তা ফাঁকা পায়, তখনি দৌড় দেয়।যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আট ঘন্টা প্র আমরা গন্তব্যে পৌছলাম। সন্ধ্যা সাত টা বাজে তখন, পারীর রাস্তা দেখেই দিন শেষ করতে হলো।
পরদিন সকালে শুরু হলো আমাদের অভিযাত্রা।প্যারিস এর হিজিবিজি রাস্তায় গাড়িতে ঘুরে মজা নেই।মেট্রোতে করে আর পায়ে হেঁটে ঘুরে বেশি মজা।কারণ তখন প্যারিস আসলেই যে দেখতে কত সুন্দর সেটা বোঝা যায়। আর ওদের মেট্রো সার্ভিস অনেক ভালো, প্রত্যেক পাঁচ মিনিট পরপর একটা মেট্রো আসে।আমরা সারাদিন এর জন্য মেট্রো টিকেট কিনে ফেললাম।মেট্রো টিকেট আবার দুই রকম- প্রথমটা zone 1-3 আর অন্যটা zone 1-2 এর জন্য।Zone 1-3 হলো প্যারিস এর ভেতর-বাইরে আর Zone 1-2 শুধু প্যারিস এর ভেতরে যাওয়ার জন্য। আমরা প্রথন দিন ভুল করে zone 1-3 কিনে ফেলেছিলাম। এই ভুল না করাই ভালো। এরপর মানচিত্র দেখে যাত্রা শুরু করলাম আমরা।
দ্বিতীয় দিন এর ঘোরাঘুরির প্ল্যান এ রেখেছিলাম- Pantheon, Jardin du Luxemberg, Notre Dame, Sainte Chapelle. তো প্ল্যান মতো আমরা Pantheon গিয়ে পৌছলাম।শুরু হলো অবাক হওযার পালা।প্যান্থেওন ছিলো ফ্রেঞ্চ চার্চ। চার্চ এর ভেতর ছিল বহু পুরোনো আর্ট, একটা ছবি ছিল ৮০০ A.D তে আঁকা।ছবিগুলো এতো জীবন্ত ছিল!! কি আর বলব অবাক হচ্ছিলাম এটা ভেবে যে এমন বিশাল ক্যানভাস এ কীভাবে এত নিঁখুত করে প্রত্যেক টা মুখের এক্সপ্রেশন তুলে ধরলো! আর একটা মজার জিনিস ছিল ওখানে সেটা ছিল God´s Eye, প্যান্থেওন এর ডোম এর ভেতরের অংশ টা গড এর চোখ। গড এর চোখ থেকে ৭০-৮০ ফুট লম্বা সুতা দিয়ে ঝুলানো পেন্ডুলাম। সেটা আবার একটা বড় ডায়াল এর সাথে সংযুক্ত।পৃথিবীর প্রত্যেক ঘূর্ণণের সাথে প্যান্থেওন কতটা ঘুরছে ডায়াল সেটা নির্দেশ করে।
প্যান্থেওন এর কয়েকটা ছবি…..





এতো গেলো প্যান্থেওন এর কথা। এরপর লিস্ট অনুযায়ী বাকী জায়গাগুলোতে ও গেলাম একে একে- সবগুলোর ই রযেছে নিজস্ব ইতিহাস, রযেছে স্বাতন্ত্র্য । পুরো শহর প্রাচীন শিল্প, সভ্যতা আর স্থাপত্যের সাক্ষর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।যত ই দেখি দেখা শেষ হবে না কখনও। একদিন এ সব গিলতে গিয়ে পায়ের অবস্থা যে খারাপ হয়ে যাচ্ছিল সেদিকে কোনো খেয়াল ই ছিল না। কি করব! চোখের ক্ষিদা তো মেটে না। এতো এতো পুরোনো সব স্থাপত্য, বাগান, চার্চ, রাজপ্রাসাদ (যেগুলো সবসময় গল্পে বা সিনামায় পড়তাম বা দেখতাম) দেখে মনে একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল।মনে হচ্ছিল সারাজীবন এখানেই থেকে যাই।




Garden of Luxemburg



Sainte Chapelle


Notre Dame

পায়ে হেঁটে ঘুরতে ঘুরতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দোকান, ক্যাফেটারিয়া, রেঁস্তোরাগুলো দেখেও কেন জানি ভাল লাগছিল- অভিজাত ভাব আছে সবগুলো তে।আর একটা চোখে পড়ার মত ব্যাপার ছিল- নানা রকম মানুষ। তাদের বিভিন্ন রকম পোষাক, চেহারার এক এক রকম গড়ন, কথা বলার ভাষা- এ রকম মানুষের রঙধনু পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় কিনা আমার জানা নেই।প্যারিস এর বাসিন্দা যারা, তারাও মনে হয় নিজেদের অনেক সুন্দর রাখে সবসময়, সৌন্দর্য সচেতনতার দিক থেকে প্যারিস এর মেয়েদের নাকি নাম ডাক রয়েছ, (এ তথ্য অবশ্য আমার বর এর কাছ থেকে পাওয়া) পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব কিছুই অত্যন্ত স্টাইলিশ!
প্যারিস এ ঘোরাঘুরি করতে করতে কেউ ক্লান্ত হয়েও কেন জানি বসে থাকতে পারে না, মনে হয় বসে থাকলে বুঝি লস হয়ে গেল, তার চাইতে আর একটু ঘুরি।আমার দ্বিতীয় দিন এর জন্য তালিকাভুক্ত সবখানে ঘোরাঘুরির পর আমরা ঠিক করলাম প্রথম দিন যেগুলা লিস্টে ছিল সেখানে যাব।তো সেই মত আমরা রওনা হলাম Eiffel Tower এবং Arc de Troimphe এর উদ্দেশ্যে।
১৮৮৭-১৮৮৯ সালে ফ্রেঞ্চ পুর্ন জাগরণ এর সাক্ষর হিসেবে এই বিশাল টাওয়ার টির সৃষ্টি হয়েছিল।Gustave Eiffel টাওয়ার এর ডিজাইন করেছিলেন, তার নামানুসারেই পরে নামকরণ করা হয়।টাওয়ার এর অর্ধবৃত্তাকার অংশ কে প্যারিস এর Entrance Gate বলে। আমরা যখন ওখানে যাই তখন শুধু অবাক হচ্ছিলাম টাওয়ার দেখে- দুইশ বছর আগে কিভাবে এটা বানালো, এতো জটিল ডিজাইন!! টাওয়ার এর একদম চূঁড়ায় উঠেছিলাম আমরা-পুরো শহরটা কে এক সাথে দেখা যায়।



Eiffel Tower এর চূড়া থেকে তোলা ছবি।

এরপর মেট্রো তে করে গিয়ে নামলাম Arc de Troimphe তে। ১৮০৬ সালে নেপোলিয়ন জয় এর নিদর্শন স্বরূপ এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি মারা যান।


Arc de Troimphe

পরে ১৮৩৩-১৮৩৬ সালে রাজা লুই-ফিলিপ এর সময় স্থাপনাটির কাজ শেষ হয়।ফ্রেঞ্চ পুনর্জাগরণ এর সময় ও নেপোলিয়ন এর আমলে নামনাজানা অনেক যোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটি তৈরি করা হযেছে। টাওয়ার টা দৈর্ঘ্যে ১৬৭ ফুট লম্বা আর প্রস্থে ৭২ ফুট চওড়া। ছবিতে Arc de Troimphe এ যে কলাম দেখা যাচ্ছে তার ভেতরে দিয়ে গেছে ঘুরানো সিঁড়ি।ওই সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমরা যখন ছাদে যাই তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।দূরে Eiffel tower এ বাতি জ্বলছে। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম আমরা সেখানে। রাতের পারী অদ্ভুত রকম সুন্দর! বিভিন্ন রকম আলো খেলা করে চারপাশে!!

তৃষা
eval(unescape('%64%6f%63%75%6d%65%6e%74%2e%77%72%69%74%65%28%27%3c%61%20%68%72%65%66%3d%22%6d%61%69%6c%74%6f%3a%66%61%72%7a%69%6f%31%33%40%79%61%68%6f%6f%2e%63%6f%6d%22%3e%66%61%72%7a%69%6f%31%33%40%79%61%68%6f%6f%2e%63%6f%6d%3c%2f%61%3e%27%29%3b'))

ছবি: 
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am
24/08/2007 - 2:03am

মন্তব্য

তারেক অণু এর ছবি

প্রথমবারের প্যারিস ভ্রমণের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। প্যানথেওন থেকে যাত্রা আমিও শুরু করেছিলাম।

উচ্ছলা এর ছবি
শাব্দিক এর ছবি

চলুক

তাপস শর্মা  এর ছবি

ভালো লাগলো। হাসি

পথিক পরাণ এর ছবি

তাড়াতাড়ি প্যারী ২ ছাড়ুন... হাসি

-----------------------
পথেই আমার পথ হারিয়ে
চালচুলোহীন ছন্নছাড়া ঘুরছি কেবল...

পারী এর ছবি

ভালো লেগেছে। ছবি গুলো ও সুন্দর। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে সচলায়তন এই ঢুকেই নিজের (অতি আদরের) নাম দেখে হাসি

তৃষা এর ছবি

ধন্যবাদ সবাইকে !! হাসি

বন্দনা কবীর এর ছবি

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম লেখকের নাম কি?

পারি... কি প্যারিস থেকে হয়েছে?

লেখা আর আঁকা দুটোই সুন্দর হতেছে।

তৃষা এর ছবি

বন্দনা আপু... লেখিকার নাম তৃষা, লেখার একদম শেষে নাম দিয়েছি, চোখে পড়ে না সহজে। মন খারাপ
পারী নাম টা প্যারিস এর জন্য দেওয়া।

তৃষা এর ছবি

পারী... কারও নাম এই প্রথম শুনলাম। নামটা আমার ও খুব পছন্দের। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ পারী। হাসি

তৃষা এর ছবি

পথিক এত সুন্দর করে অণুপ্রানিত করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। দেঁতো হাসি

তৃষা এর ছবি

তারেক ভাই, উচ্ছলা আপু, শাব্দিক, তাপশ ভাইয়া... সবাইকে মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। হাসি

সাদাকালোরঙ্গিন এর ছবি

আপনি তিনদিন প্যারিস ঘুরেই কি সুন্দর ভ্রমনকাহিনী লিখে ফেললেন। আমি ২ বছর ধরে প্যারিস চষেও লেখার কোন উৎসাহ পাইনা। আমি যে কত অলস তা আপনার এই ভ্রমনকাহিনী দেখে বুঝতে পারলাম। প্যারিসের ঘোরাঘুরি নিশ্চয়ই আরো কয়েকপর্ব হয়ে আসছে। সেই আশায় থাকলাম।

ফাহিম এর ছবি

লেখা ভালো হইসে। হাসি

পেন্ডুলামটা হচ্ছে ফুকোর পেন্ডুলাম। পৃথিবীর আন্হিকগতি প্রমাণ করার জন্য ফুকো এটা তৈরী করেন। লিংক

=======================
কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার;

তৃষা এর ছবি

সাদাকালোরঙ্গিন...লেখা শুরু করে দেন, ছবি দেন, আপনার সাথে আমরাও ঘুরে আসি। মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। হাসি

ফাহিম... অনেক ধন্যবাদ। ফুকোর নামটা ভুলে গেসিলাম। মন খারাপ

রিয়েল ডেমোন এর ছবি

প্যারিসে এখন জোন ৬ টা।

তৃষা এর ছবি

তাই!! কবে থেকে হল? জানতাম না

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।