প্রিয় হুমায়ূন

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ২০/০৭/২০১২ - ২:২৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমার বড়দের(!) বই পড়ার শুরুটা হুমায়ূন আহমেদকে দিয়েই।সেও অনেক ছোট্টবেলায়।খুব ছোটবেলার অনুভূতিগুলো সাধারণত খুব প্রকট হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।মনের একটা বিশাল অংশ জুড়ে দীর্ঘদিন হুমায়ূনপ্রভাব ছিল।এখনো কি নেই?তার ভালবাসার গল্পগুলো পড়ে ভালবাসার যে ধারণা হয়েছিল,আজো তা অটুট।তার নাটকগুলো থেকে শিখেছিলাম কিভাবে নির্লিপ্ত বাক্যের জোরালো প্রয়োগ ঘটানো যায়! ঠিক সেভাবে কথা বলবার কত চেষ্টাই না করেছি।যখন বন্ধুদের চিঠি লিখতাম সেখানে হুমায়ূন স্টাইলে বাক্য লেখবার একটা সচেতন প্রয়াস সবসময় থাকতই।তার মত লেখক হতে চাইতাম।তার ঢংয়ে গল্প বলতে চাইতাম।
এসএসসি অব্দি আম্মু চা খেতে দেয়নি।আমার সে কি অপেক্ষা! কবে আমি চা খাওয়ার অনুমতি পাব,আর হুমায়ূন গল্পের নায়িকাদের মত বৃষ্টি হলেই মগভর্তি চা নিয়ে জানলার পাশে বসে যাব।তাই এখনো বৃষ্টি হলে,কিংবা খুব মন খারাপ হলে,কিংবা খুব একা লাগলে,অথবা খুব আনন্দ হলেও এক মগ চা-ই আমার সঙ্গী।
আঠারতম জন্মদিনে শাড়ি পরার প্ল্যানটাও তো উনার গল্প থেকেই পাওয়া।সূতি শাড়ি আর চোখে কাজল টানা না হলে আমি আর অষ্টাদশী হলাম নাকি??এখনো তো শাড়ি-কাজলের বাতিক অক্ষত।আনন্দের চূড়ান্ত প্রকাশে এখনো শাড়ি না হলে আমার চলে না।
সেই বয়েসে কল্পনায় যে এলোমেলো পাগলা মানুষটার স্বপ্ন দেখতাম সেই ভাবনাটাও তো উনার গল্প থেকে পাওয়া! বয়ঃসন্ধিতে এসেই দুম করে যে খালাতো ভাইটার প্রেমে পড়ে গেলাম তার জন্যে তো উনার গপ্পগুলোই দায়ী।ভাবতাম উল্টোপাল্টা এক পাগলা মানুষ আসবে আর তার হাত ধরে প্রতি রাতের ঝুম বৃষ্টিতে আমি ভিজব।বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল যে ভালবাসার পরম প্রকাশ সেও তো প্রথম তিনিই বোঝালেন।
তার কোনো গল্পে কখনও কাউকে হেরে যেতে দেখিনি।নানান কষ্ট পার হয়ে শেষাবধি জয়গাঁথাই উচ্চারিত হত।অন্তত কোনো না কোনো দিকে জিতিয়েই দিতেন তিনি।এই ব্যাপারটা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে খুব।উনার নিজের জীবনের গল্পগুলোও ভাল লাগত।যেন আমার খুব কাছের পরিচিত কেউ তার কথা বলে যাচ্ছেন!
তার বানানো নাটকের কথা তো না বললেই নয়।এমনিতে পরীক্ষা আসলে টিভি দেখা একদম মানা হলেও হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখায় মানা ছিল না কখনো।সে এক বিরাট ইতিহাস,কঙ্কা ভাইয়া তিতলী ভাইয়া,ক্যাকো ক্যাকো- এইরকম আরো নানান উক্তি তো এখনো বন্ধু মহলে উচ্চারিত হয়।
পরীক্ষার ভীষন চাপের সময় তাঁর হিমু ছিল জীবনদায়ীর মত।একটা বই শেষ হতে বড়জোর পঁয়তাল্লিশ মিনিট, আর সেই সময়ের পুরোটাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি।আমি চিরকাল সেইসব মানুষকেই আমার পছন্দের তালিকার শীর্ষে রেখেছি যারা আমাকে সবচাইতে বেশি হাসাতে পেরেছেন।হুমায়ূন আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম।
এই মানুষটা সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে ছিলেন না।বরঞ্চ শেষটায় এসে অনেক বিতর্কিত লেখা/কথা লিখে/বলে ফেলেছেন।নিতান্তই ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর অনেক বইই সাহিত্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারেনি।তাঁর ব্যাক্তিগত জীবন নিয়েও বিতর্কের সীমা নেই।তবুও এ দেশের বেশিরভাগ পাঠকের মনেই তাঁর যে অবস্থান সেটা অস্বীকার করা যায় না।আমার কৈশোরের স্বপ্নময় জগতে আরো অনেক লেখকের পাশাপাশি তার লেখনীর প্রভাব আমি অস্বীকার করতে পারিনা।আরো অনেকেই পারেন না,সে আমি নিশ্চিত জানি।
না ফেরার দেশে ভাল থাকবেন প্রিয় হুমায়ূন।আমরা আপনাকে ভুলবনা-তা সে ভালবাসা থেকেই হোক আর বিরক্তি থেকেই হোক।

সুবর্ণনন্দিনী


মন্তব্য

জিয়া এর ছবি

শ্রদ্ধাঞ্জলি হুমায়ূন আহমেদ।

সাবেকা এর ছবি

সত্যি কথা বললে হুমায়ূন আহমেদের লেখার ভক্ত পাঠক ছিলাম না কিন্তু খবরটা দেখে বুকটা ব্যাথায় মুচড় দিয়ে উঠল মন খারাপ

আরিফিন সন্ধি এর ছবি

কদিন আগে দেশে বসে এইসব দিনরাত্রি পড়ে আসলাম। যখন ছোট বেলায় এই নাটক দেখাতো, শুধু বড়দেরকে দেখতাম, ওনার নাটক দেখার জন্য ভীড়। তারপর এবার পড়ে দেখলাম, আসলে হুমায়ূন আহমেদের হাতে জাদু ছিল।

বেঁচে থাকুন আমাদের মাঝে চিরকাল

উতপাখির হৃদয় এর ছবি

হুমায়ুনের অনবদ্য সৃষ্টি হিমু, বাকের ভাই এ যুগের বেশিরভাগ তরুণকে যেভাবে মোহাবিষ্ট করেছে তা আর কোন চরিত্র পেরেছে ?

অমি_বন্যা এর ছবি

শ্রদ্ধায় অটুট থাক তার স্মৃতি । শ্রদ্ধা

সাফি এর ছবি

শ্রদ্ধা

সুরঞ্জনা এর ছবি

আমার চা খাওয়া বাতিকের জন্যও ওনার বইতে চায়ের বর্ণনাকে দায়ী করা চলে।
গুণী ছিলেন।

............................................................................................
এক পথে যারা চলিবে তাহারা
সকলেরে নিক্‌ চিনে।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা।
আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

অতিথি লেখক এর ছবি

কৃতজ্ঞতা আপনাকেও।

সুবর্ণনন্দিনী

নিলয় নন্দী এর ছবি

লেখাটা ভালো লেগেছে।
চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

খুব আবেগ আর স্তব্ধতা থেকে লেখা।ভাল লেগেছে জেনে ভাল লাগল।ধন্যবাদ।

সুবর্ণনন্দিনী

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।