এক টুকরো শৈশব

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০৯/১২/২০১৩ - ১১:০৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কতবার ভেবেছি কিছু লিখি কিন্তু লেখা হয়নি। সেই কাগজ কলমের সময় থেকে আজ এই কিবোর্ডে লেখার যুগে এসেও অনেকবার লেখা শুরু করেও কোন লেখা শেষ করতে পারিনি। কখনো দুই লাইন কখনো দুই অনুচ্ছেদ এর বেশী গাড়ি চলেনি। কতবারই তো ভেবেছি লিখিনা সেই মুরুব্বীর সাইকেল থেকে আখ (কুইশুর) নিয়ে ভো-দৌড়ের কথা কিংবা বারাদি খেলতে যাওয়ার সেই দুঃসহ যাত্রার কথা। এসব না পারলেও নিদেনপক্ষে আমার গ্রামের সেই সুন্দর দিনগুলি যখন সারা গ্রাম মিলে ছিল একটা পরিবার। সত্যি বলছি এই সবগুলো নিয়েই লিখতে চেয়েছি, শুরু করেছি কিন্তু কিছুদূর এগুনোর পর খেই হারিয়েছি কখনো লেখার তালের, কখনো ধৈর্যের। অথচ এই আমি পরীক্ষার খাতায় রচনাটা বানিয়েই লিখেছি কোন রচনা কমন পড়েনি বলে। আসলে মানুষ মনে হয় বাধ্য হলে এমন কিছু করে ফেলে যা সে কল্পনাও করে না। তাই হবে হয়তো না হলে আমার বন্ধু ডালিমের ভাই কেন জীবনে সাঁতার না শিখে শুধু বাবার হাতে মার খাওয়ার ভয়ে ভরা বর্ষার অথৈই পুকুর সাঁতারে পার হবে?
আমার বন্ধু ডালিম, মজার মানুষ! ওর সাথে আমার পরিচয় সেই ক্লাস ফাইভ থেকে। নতুন স্কুল হয়েছে- গাংনী প্রিক্যাডেট এন্ড জুনিয়র হাইস্কুল। ওখানে ভর্তি হয়েছি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি ওই স্কুলের প্রথম ছাত্র হতে পারিনি। আমার ঠিক আগেই একজন ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। ফলে একটা স্কুলের ইতিহাস হওয়া থেকে বঞ্চিত হলাম। প্রথমে কে চাঁদে পা রাখল মানুষ তাই মনে রাখে দ্বিতীয় জনের কথা ইতিহাস লেখে না । যদিও এতোদিনে ভুলেছি সেই ছেলেটি কে। তা যাক গে। ডালিমের কথায় আসি। ওর বাড়ি গাঁড়াডোব। আমার মত ও ফাইভে ভর্তি হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের ভাব হয়ে গেল। আসলে দশ বার জন ছাত্রছাত্রী থাকলে যা হয় আর কি সবাই খুব কাছের বন্ধু। কারণ এখানে বিভিন্ন দল উপদল তৈরি হওয়া কঠিন। আর স্কুলে যেহেতু ছাত্রছাত্রী কম তাই সবাই সবারই বন্ধু। আর ডালিম তো আমার সহপাঠী; বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। গাঁড়াডোব আমাদের পাশের গ্রাম যদিও ওদের কথা বলার ধরণ আমাদের থেকে অনেকটাই আলাদা। ও কখনো ‘থেকে’ বা ‘হতে’ শব্দ ব্যাবহার করত না, করত ‘হোনে’। আসলাম বলত না, বলত আসনু। শুনতে খারাপ লাগত না বরং ভালোই লাগত। আর ওর এই ‘হোনে’ নিয়ে জালাল স্যারের মশকরা সেই সময় স্কুলের দিনগুলোকে আরও একটু রঙ দিয়েছিল। তো ডালিমকে একদিন ক্লাসে ম্যাডাম পাঁচটা মাছের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। সে উত্তর দিয়েছিল চ্যাঙ, ওকোল, দাড়কি, পুঁটি আর মনে হয় শোল ঠিক মনে নেই। কিন্তু এটা নিশ্চিত ও কাতলা, রুই কিংবা ইলিশের নাম করেনি। এই নিয়ে সেই সময় কত হাসাহাসি। এখন ভাবি ও যে মাছের নাম বলেছিল তাতে আসলে সমস্যা কোথায়। যে মাছ আমরা ধরি, খাই তাই তো সে বলেছিল। এখন মনে হয় বইয়ের বাইরে আমরা চিন্তা করতে শিখিনি, কিন্তু ও শিখেছিল। একটা অপরাধবোধ কাজ করে, হয়তো আমাদের ঠাট্টা মশকরাতেই সে হারিয়ে ফেলেছিল নিজের স্বাধীন চিন্তা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা তো হওয়াই উচিৎ নিজেকে নিজের মত করে চিনতে শেখা; আমাদের চারপাশকে চিনতে শেখা যা নিয়ে আমরা বেড়ে উঠি। যাতে নিজের সংস্কৃতি নিয়ে হীনমন্যতায় না ভুগি কখনো। যখন আমি বড়শিতে কেঁচো গেঁথে ছিপ হাতে ওকোল মাছ ধরতে যাই বর্ষায় পানি জমা ধানের জমিতে, যখন গামছা দিয়ে ধরি দাড়কি মাছ তখন খাতায় লেখার সময় কেন আমরা লিখব রুই কাৎলা মৃগেলের নাম? আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থাটাই এমন যে আমাদের অজান্তেই আমাদের মানসিক ভাবে এমন এক জগতের মানুষে রূপান্তর করে ফেলে যেখানের সদস্য আমরা নই। আমরা যতোই ক্লাস পেরুতে থাকি ততোই বাবু হতে থাকি। আর অস্বস্তি বোধ করতে থাকি আমাদের পুর্বপুরুষদের নিয়ে। আমরা অস্বস্তি বোধ করতে থাকি বাপ চাচাদের লুঙ্গি পরা নিয়ে। আমরা অস্বস্তি বোধ করি গ্রামের সংস্কৃতে, নাক সিটকায় পল্লীগানে। আর ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকি গ্রামের আর দশটা মানুষের থেকে। তাঁরাও আমাদের সাথে মিশতে অস্বস্তি বোধ করেন। ফলাফল স্বরূপ ভেঙ্গে যেতে থাকে সেই চিরচেনা গ্রাম যেখানে সবাই ছিল এক পরিবারের মত। যেখানে আমাদের দোষ ত্রুটির জন্য শাসন করত পুরো গ্রাম, আমাদের সাফল্যের সাথে উদ্বেলিত হত গ্রাম।

আমাদের ডালিমের ভাই পরীক্ষায় হয়তো ফেল করেছে অথবা কোন বিষয়ে ফেল করতে করতে বেঁচে গেছে। সে সময় ফেল করা স্বাভাবিক ছিল; দুয়েক বিষয়ে ফেল করা খারাপ চোখে দেখা হত না। যদিও ডালিমের আব্বা ছেলের এই ব্যর্থতা মেনে নিতে না পেরে ছেলেকে উচিৎ শাস্তি দেওয়ায় প্রধান কর্তব্য মনে করে হেকে ওঠেন। আর সেটা এমনই সময় ছিল যে ছেলেকে ধরে মারা একটা সংস্কৃতির অংশ। কয়েক ঘা মারা না হলে লোকে বড় একটা বাঁধা দিত না। বাবার হাতে মার খাওয়া থেকে বাঁচতে পালানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। পরীক্ষায় লেখার সময়ে বুদ্ধি কাজ না করলেও এই পরিস্থিতে মস্তিস্ক ভালো সাড়া দেয়। কিন্তু বাড়ি থেকে যে ডালিমের ভাই পালাবে কপাল এতোই খারাপ যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার যে পথ তার বাবা সেই দিক থেকেই আসছিল।সঞ্জীব’দার সেই গানের মত ‘ডানে তোমার চাচার বাড়ি বায়ের দিকে পুকুর ঘাট’ পরিস্থিতি। দরজার দিকে বাবা আর উল্টো দিকে ভরা বর্ষার যৈবতি পুকুর। মরার উপর খারার ঘা সে সাঁতারটা তখনো শিখতে পারেনি। সে জানত পুকুরে লাফ দিলে হয়তো ডুবে মরবে কিন্তু লাফ না দিয়েও যে বেঁচে থাকা যাবে এই ভরসা সেই সময় তার ছিল না, তাই পুকুরে লাফ। কিছুক্ষণ পর সে নিজেকে পুকুরের অন্যপাড়ে আবিষ্কার করে। সে যৈবতি পুকুরের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়।অনেক চেষ্টা করেও যে সাঁতার সে আয়ত্ব করতে পারেনি আজ তার অজান্তেই সে তা করে ফেলেছে। তার পরীক্ষায় খারাপ করা জনিত কারণে পিতৃদেবের হাতে মার খাওয়ার ভয় আর তখন নেই, তার হৃদয় জুড়ে সাঁতার শিখে যাওয়ার আনন্দ। হয়তো তার বাবাও ছেলের এই সাঁতার শিখে যাওয়াই মুগ্ধ হয়েছিলেন, হয়তো হননি। কিন্তু ডালিমের ভাই এর ফলে পেয়ে গেছে অন্যতম বড় শক্তি যার নাম আত্মবিশ্বাস। সে আর পরীক্ষায় ফেল করেনি।
পরীক্ষার খাতায় কোন বিষয়ে ধুপ করে লিখে ফেলাও এই সাঁতার দেয়ার মত। উপায় নেই গোলাম হোসেন পরিস্থিতি। আর শিক্ষকগণের নম্বর দেয়ার ওদার্য্য, হয়তো ততদিনে জেনে গেছি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণের রচনা পড়ার সময় নেই; পাতা ভরালেই নম্বর। তাই দোআঁশ মাটিতে ফসল ফলানোর মত লিখে ফেলেছি ইপ্সিত বিষয়ে একটা প্রবন্ধ। যেখানে মানের চেয়ে পৃষ্ঠা সংখ্যা অনেকগুনে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখনই লিখতে চেয়েছি কোন স্মৃতিকথা কিংবা কোন প্রবন্ধ তা হয়ে ওঠেনি। তাই হয়নি আমার সাধের ছেলেবেলাকে নতুন করে আবিষ্কার করা; হয়নি কোন বিষয়ের উপর গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ রচনা। আর একটা সমস্যা আছে আমি রবি ঠাকুরের মত বানিয়ে সত্য বলতে পারিনে, আমি শরৎ বাবুর সেই শ্রীকান্তের মত মেঘ কে মেঘই দেখি সারাদিন তাকিয়ে থেকেও প্রেমিকার কালো চুল খুঁজে পাইনা। আর এই জিনিস আমি জেনে গেছি ইতোমধ্যে, একটা লেখার গুরুত্বপূর্ণ কথা খুব বেশি হয়না। আর তাই কয়েক লাইন লিখলেই শেষ হয়ে যায় আমার চিন্তার ভাণ্ডার। তা দিয়ে বড় জোর একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়া চলে প্রবন্ধ বা গল্প তো দূরের কথা ফেসবুক নোটই হয়না। কিন্তু মাথার ভিতরে একটা ঝিঁঝিঁ পোকা অনবরত ডাকতেই থাকে, গ্রামের সেই উচ্ছ্বল দিন, সেই সোনালী সময়; সেই ভোকাট্টা ঘুড়ির পিছনে ছুট কিংবা মার্বেলের শব্দ। তাই কখনো কাগজ, কখনো কিবোর্ড টেনে নেয়া। শেষ পর্যন্ত লেখা হোক বা না হোক ফিরে পাওয়া যায় কিছু আনন্দমুখর মুহুর্তকে। সেটাই বা কম কিসের!
ধান ভানতে শিবের গীত অনেক হল। সেই কবে থেকেই মনে হয় কৈশোরকে ধরিনা একটু। তখন হয়তো মাঘ মাস, ফাগুনও হতে পারে। তখন আখ বোঝায় গরু-মোষের গাড়ি চলত থানা শহরের আখ ক্রয় কেন্দ্রে। গাড়িতে শুধু গাড়িয়াল, হয়তো সে গান করত হয়তো কথা বলত গরুর সাথে। একটা ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ করতে করতে গাড়ি চলে যেত দৃষ্টিসীমার বাইরে। আরেকটা গাড়ি আসত, তারপর আরও একটা । কখনো বা গাড়ি শহরের দিকে যেত না, যেত যেখানে গুড় তৈরি হবে সেই গুড় তৈরির কলের দিকে। যেখানে সারারাত ধরে চলে আখ মাড়াই করা। কয়েকটা ছোট বড় লোহার চাকা কি এক বিশ্বয়কর ভাবে রাখা থাকত। তার সাথে জুড়ে দেয়া হত একটা বড় জোয়াল। দুটো গরু ঘুরে চলত সেই জোয়াল কাঁধে নিয়ে আর একজন লোহার সেই চাকার মাঝে ঠেলে দিত আখ। আমরা অবাক হয়ে দেখতাম আখ থেকে রস চলে যাচ্ছে এক পাত্রে আরেক দিকে পড়ে থাকত আখের ছোবড়া। সেই রস জমা হচ্ছে আরো বড় কোন পাত্রে, সেখান থেকে রস জ্বাল দেয়া তাওয়াতে। সেখানে লালচে আগুনের লেলিহান শিখায় রস পরিণত হচ্ছে গুড়ে। সেখানে গেলে আখ বা গুড়ের পাটালি না চাইলেও পাওয়া যায় কিন্তু কেন যেন ওখানে যেতে ভালো লাগত না। ইচ্ছে করলেই রাতে সেখানে যেতে পারতাম না, সারাদিন বাঁদরামি করার অনুমতি থাকলেও রাতে গোবেচারী ছেলে হিসেবে বাইরে যাওয়াকে মেনে নিতো না আমার বাবা মা। রাতের সেই মায়াবী পরিবেশ দিনের আলোই বড়ই ফ্যাঁকাসে হয়ে যেত। হয়তো খুব সহজেই আখ পাওয়া যেত বলে সেখানে যেয়ে আখ খেয়ে মজা পেতাম না। কিন্তু আখ আমরা খেতাম। সেখানে না যেয়েই খেতাম। ওই ক্যাঁচর ক্যাঁচর করে চলা গাড়িগুলোই আমাদের প্রধান ভালো লাগা ছিল কারণ এরাই না চাইতে বৃষ্টির মত মাঠের আখ আমাদের হাতের নাগালে নিয়ে আসত।
সেই সময় আমরা খেলতাম আমাদের ঈদগাহতে। ঈদগাহ জুড়ে বিশাল দুই গাছ। একটা আম আর একটা পাকুড়। এটা এমনই আম গাছ যার আম মনে হয় ছিল তেঁতুলের চেয়ে টক। তথাপি সেই গাছের পাকা আম কেউ খেয়েছে কিনা তা নিয়ে আমরা সন্দিহান ছিলাম। আঁটি হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেত গাছের সব আম। বোল ঝরে ঝাওয়ার পর গাছটির উপর চলত সারাদিন ব্যাপী পাথর নিক্ষেপ। ছোট থেকে মুরুব্বী কেউ রেহায় দিত না। হয়তো আম শেষ হয়ে গেলে গাছটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচত। এটা ছিল সরকারি গাছ। তাই সবার সমান অধিকার। কিন্তু একবার হল কি এক মালাই বিক্রিকারী (আইসক্রিমওয়ালা) এই গাছটি কিনে নেয় মানে ওই বছরের সমস্ত আম তার। দলিল থাকা আর তা দখল পাওয়ার মাঝে অনেক তফাৎ। এই আইসক্রিমওয়ালা মাঝে মাঝে এসে পাহারা দিত কিন্তু প্রতিদিন এসেই দেখত আম কমে যাচ্ছে। তো একদিন আমরা এই গাছের আম পাড়ছি। সে তার আইচক্রিমের সাইকেল নিয়ে ঐ দিক দিয়েই যাচ্ছিল। আমাদের দেখে করলে তাড়া। আমরা যেদিকে যে পারি দিলাম ছুট। কিছুক্ষণ পরে আইচক্রিমওয়ালা দেখল তার আইচক্রিম শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে একজন কে তাড়া করলে আরেকজন এসে তার আইচক্রিমে হামলা করে, তাকে তাড়া করলে আরেকজন এসে নিয়ে যায় আইচক্রিম। সে পরে আর আম নিয়ে চিন্তা করেনি। সেই বছরেও কোন আম পাকার সময় পর্যন্ত গাছে থাকেনি।
আর পাকুড় গাছ সে তো আরেক ধরণের বিস্ময়। এই গাছের মাঝে থাকত দুটো চরম বিস্ময়কর পোকা। এদের যে ভদ্র সমাজে কী বলে আমার জানা নেই। একটা ছিল ইঞ্চিসমান, কিছুটা কালচে। এদের পিঠে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিয়ে ধরলে অনবরত মাথা কুটত। আমরা নাম দিয়েছিলাম চিড়িকুটা। আরেকটি ছিল কিছুটা বড়, তারচেয়ে বড় শুঁড়। এ নাকি চুল কেটে দিত। তাই আমরা এদের বলতাম চুলকাটা। কত অলস দুপুর আমরা কাটিয়েছি এদের সাথে খেলা করে তার হিসেব নেই। সেই আম পাকুড় কোনটিই আজ আর নেই। প্রথমটি হয়তো বয়সের ভারে হয়তো জরা জীর্ণতায় হয়তো আমাদের অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। আর দ্বিতীয়টিকে মানুষের চাহিদার সাথে সেবা দিতে না পারায় বিদায় নিতে হয়েছে। পাকুড় গাছের ফল হাজারো পাখির জন্য উপাদেয় খাদ্য হলেও মানুষের জন্য নয়। তাই সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে বেশকিছু কাঁঠাল গাছ। সেই পাকুড়ের সাথে বিদায় নিয়েছে আমার সেই ছোটবেলার অলস দুপুরের সেই চিড়িকুটা আর চুলকাটা; হারিয়ে ফেলা শৈশবের মত হয়তো আর কখনো ফিরে পাবো না আমার এই বন্ধুদুটিকে।
এই ঈদগাহ ছিল আমাদের দুপুরের আস্তানা। যখন দেখতাম ক্যাঁচর ক্যাঁচর আখ বোঝায় গাড়ি চলেছে রাস্তা দিয়ে আমরা দৌড়ে যেতাম রাস্তায়। একটা আখ টেনে বের করে চলে আসতাম আমাদের আস্তানায়। কখনো আম গাছের নিচে বসে কখনো বা পাকুড় গাছের ছায়ায় আমাদের বন্ধু চুলকাটা বা চিড়েকুটার সাথে আমরা আখ খেতাম। এইভাবে, না-বলে আখ টেনে নেয়া যে চুরি তা আমাদের কখনো মাথায় আসেনি। আম খাওয়ার মত এটাকে আমরা স্বাভাবিক ভাবেই নিতাম। এখন যেমন ঘুষ খাওয়াকে আমরা স্বাভাবিক ভাবেই নিই। কেউ ঘুষ না খেলে যেমন আমরা তাকে বোকা মনে করি তখন এভাবে আখ না খেলে তাকে গোবেচেরা মনে করতাম।
তো সেই মাঘ মাসে হয়তো ফাগুনে আমি সেদিন একা পাকুড় গাছের নিচে। সাথে কেউ নেই তাই সময় পার করা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। মরার উপর খাঁড়ার ঘা সেদিন কত সময় পেরিয়ে গেল কোন ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দের খোঁজ নেই। হঠাৎ দেখি একজন মুরুব্বী একটা মাডগার্ড বিহীন, হয়তো মাডগার্ড ছিল হয়তো মাডগার্ড কিংবা ব্রেক কিছুই ছিল না- সাইকেল নিয়ে চলেছে। সেই সাইকেলের সাথে বাঁধা এক আটি আখ। হয়তো তিনি তার নাতনির জন্য কিংবা নাতির জন্য নিয়ে চলেছেন। ভাবলাম, রাস্তায় যদি কোন নাতি তা খেতেই চায় তো দোষটা কোথায়? আর তাই আমি প্রত্যেকদিন যা করি সেদিনও তাই করেছিলাম। সেই আটি থেকে নিজের ভাগের একটা আখ নিয়ে দিলাম দৌড়। পিছনে তাকিয়ে দেখি আমার সে দাদু আমাকে দু চোখে দেখতে পারেন না। নেয়ার মাঝে তো একটি আখই নিয়েছি কিন্তু বুড়োকে বুঝাবে কে সে কথা। তিনি ওই মুরুব্বী শরীরে মনে হয় ফিরে পেয়েছিলেন যৌবনের শক্তি । আমি যতই জোরে দৌড়ায় আমাদের মাঝে দুরুত্ব বাড়ে না। এ যেন স্বপ্নে দৌড়ে চলা। যতই দ্রুত যেতে চাই ততোই পিছনে পড়ি। উপায়ন্তর না দেখে আখ ফেলে দিলাম দৌড়। এই যাত্রায় বেঁচে গেলে পরে অনেক আখ খাওয়া যাবে। আরও কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পর পিছনে ফিরে দেখি তিনি আখটি হাতে নিয়ে ফিরে চলেছেন তার মাডগার্ড ব্রেকবিহীন হয়তো সব থাকা সাইকেলের দিকে।


মন্তব্য

দীনহিন এর ছবি

আরও কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পর পিছনে ফিরে দেখি তিনি আখটি হাতে নিয়ে ফিরে চলেছেন তার মাডগার্ড ব্রেকবিহীন হয়তো সব থাকা সাইকেলের দিকে।

আনন্দ দিয়েছে দাদুর গল্প।
অতিথি লেখকের নাম নেই। তাছাড়া লেখাটিকে প্যারায় বিভক্ত করে পাঠোপযোগী করা যেত খুব সহজেই।
আরো লেখা আশা করছি সামনে, শুধু সামান্য এডিটিং করার অনুরোধ থাকল লেখকের কাছে।

.............................
তুমি কষে ধর হাল
আমি তুলে বাঁধি পাল

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনাকে আনন্দ দিয়েছে জেনে ভাল লাগল। আপনার পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। ভবিশ্যতে আরও সুচারুরূপে লিখব আশা করি।

অতিথি লেখক এর ছবি

বারবার নাম লিখতে ভুলে যাই।
- জাহিদ

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

ভালো লাগল

দীনহিনের সঙ্গে একমত

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

ওনেক ধন্যবাদ।
- জাহিদ

অতিথি লেখক এর ছবি

আরও লিখুন, চমৎকার লাগল আপনার স্মৃতিচারণ। চলুক

ওকোল মাছটি চিনলাম না।

......জিপসি

অতিথি লেখক এর ছবি

বোঝা যাচ্ছে চ্যাং মাছটি চিনেছেন। ওকোল মাছ চ্যাং মাছের মত শুধু মাথাটা একটু মোটা।
--- জাহিদ

বনি এর ছবি

শৈশবের স্মৃতিচারন বরাবরই ভাল লাগে।আপনি লিখেছেনও চমৎকার। চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

দুর্দান্ত। হাততালি । আশাকরি শৈশবের গল্প শেষ হয়নি, চলবে ধারাবাহিক।

আমার লেখা পড়ে কল্পিত এক শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। আমার শৈশব যদিও এতটা প্রকৃতির সান্নিধ্যে হয়নি তবু ও যতটুকু হয়েছে তার সাথে এটি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আমার শৈশবে নদী ছিলো, পাহাড় ছিলো বেশি।

আপনার মতোই অবস্থা আমার, লেখা আসেনা, লিখতে গেলে দু-চার লাইনে সেটা থমকে যায়। কিন্তু আপনি শেষ পর্যন্ত ভালোলাগার একটি দীর্ঘ রচনা লিখে ফেললেন। আমি যে কবে পারবো ? চিন্তিত

মাসুদ সজীব

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।