গুরুপদ বাঁশীওয়ালা

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ৩১/০১/২০১৪ - ৪:৪৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এই আমার মত করে ধরো। এই দেখ আমি কিভাবে ধরেছি। এই বলে গুরুপদ দা নিজে বাঁশীটা ঠোটে ঠেকিয়ে বাজাতে শুরু করল। আর বাঁশীটা কি সুন্দর বাজতে লাগল। নাও চেষ্টা কর। তা তো অবশ্যই। ব্যাপারটা তো বেশ সহজ দেখছি। কিন্তু বাঁশীটা আমি নিজের ঠোটে ঠেকিয়ে যেই ফু দিলাম প্রথমে কোন সুরই বের হলনা। বেশ খানিক্ষন চেষ্টার পর যা বার হল সেটা মোটেই শ্রুতিমধুর কোন শব্দ নয়। আর বের হতে না হতেই আমার দম ফুরিয়ে হাঁফাতে শুরু করলাম। গুরুপদ দা আমার কান্ড দেখে ধীরে সুস্থে একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে টানতে গম্ভীর ভাবে মন্তব্য করল, খুব লেগে থাকতে হবে বুঝলে। ছ মাসের মধ্যে তোমার ফু এসে যাবে। আমি অবাক হয়ে বাঁশী নামিয়ে বললাম, ছ মাস? বলো কি? গুরুপদ দা রহস্যময় হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে মাথা নাড়ালেন। তাহলে বাজনা শিখতে কতদিন লাগবে? তা ধর বছর পাঁচেক পর কিছু কিছু পারবে। তবে সারাজীবন সাধনা করলেও বাঁশীর রহস্য বুঝতে পারবে না।
বাঁশী বাজান বেশ শক্ত ব্যাপার দেখছি। কিন্তু প্রথম মাসের দক্ষিণা দিয়ে আজই প্রথম ক্লাস শুরু করেছি গুরুপদদার বাড়ীতে। হতাশা গ্রাস করেছে আমায়। এটা মনে হচ্ছে আমার বিষয় নয়। বাঁশীটা কিনেছি পঞ্চাশ টাকা দিয়ে, এক মাসের আগাম দক্ষিণা আশি টাকা। গুরুপদ দা অবশ্য এক'শোর কমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু বাঁশী শেখার ছাত্র আজকাল প্রায় জোটে না তাই অগত্যা ওকে রাজী করান গেছে। আর ব্যাপারটা যা দাঁড়াচ্ছে তাতে আমাকেও শিগগির লাইন বদলাতে হচ্ছে।
কি ভাবছ? ছেড়ে দেবে?
না, মানে ব্যাপারটা খুব কঠিন দেখছি। মনে হচ্ছে এই বাঁশীটা সুবিধার নয়। এটা কি পালটানো যাবে?
যাবে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না। ওই দেখতে পাচ্ছ? বলে গুরুপদ দা ঊপরের দিকে দেখায়। সেখানে অনেক বাঁশী খবরের কাগজ জড়িয়ে বান্ডিল করে রাখা।
ওগুলো মেলায় বেচি। সুরের বাঁশী নয়। তোমায় যেটা দিয়েছি সুরের বাঁশী। কি জানো, বাঁশী জিনিষটা বড় শক্ত। ছটা ফুটো দিয়ে সব সুর বার করা কি আর সহজ!
কিন্তু অনেকেই তো ভাল বাজায়। তারা কি করে বার করে?
সাধনা। আর খানিকটা ভাগ্য। সুর সাধনায় বড় বাধা আসে। মোহিনী বিদ্যা কিনা! সহজে রপ্ত করা যায়না।
কি বাধা আসে?
অভাব, বিদ্রূপ,ধিক্কার কত কি আসে! কিন্তু অটল থাকতে হবে।
তাহলে মানুষ এই বাজনা শেখে কেন?
মোহিনী বিদ্যা। কাউকে কাউকে বড় আকর্ষন করে। সে প্রায় উন্মাদ অবস্থা হয়। না শিখে উপায় থাকেনা। সব ভগবানের খেলা। দু চারটে পাগল না থাকলে এসব বাজনা থাকত কোথায়! বাজাত কে আর শুনতই বা কে?
কথাটা পাগল লাইনে চলে আসতেই আমি সতর্ক হয়ে গেলুম। কেননা গুরুপদ দা মাথাগরম বলে পরিচিত। মাথা একবার গরম হয়ে গেলে সারা দুনিয়াকে একধার থেকে গালাগালি শুরু করে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাগ্যদেবীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দেয়। একটা কলি নাকি সারাজীবন গুরুপদ দার পেছনে লেগে আছে। সব কাজেই সেই কলি বাধা সৃষ্টি করে। আর তার উপযুক্ত শাস্তি হিসেবে মাথা গরম হলেই গুরুপদ দা সেই নভচর কলিকে উপুর্যুপরি ধর্ষণ করে। তারপর তার অপমানিত বিস্রস্ত অবস্থা মানস্পটে কল্পনা করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। এরপর আবার গুরুপদ দা ভাল হয়ে যায়। বেশ কয়েক মাস ধরে ওর সঙ্গ করে এসব আমার জানা হয়ে গেছে। তবু সাবধানের তো মার নেই। পাগল গুরুপদ বড় মারাত্মক। তখন ওকে কেউ ঘাঁটায় না। অনেকে আবার বলে বেশী বাঁশী বাজিয়েই ওর এই অবস্থা হয়েছে। খালি বাজালে হবে? ফুড দিতে হবে।
বাঁশী বাজালে কেউ পাগল হয় একথা শুনলেই গুরুপদ দা বক্তার গুষ্টি উদ্ধার করে দেয়। ওর কথা হচ্ছে এতে বরং শ্বাসরোগের সম্ভাবনা দূর হয়ে যায়। ফুসফুস স্ট্রং হয়। বাঁশী বাজাতে মরদ হতে হয় যে রকম মরদ গুরুপদ নিজে।
গুরুপদ দা এবার চা খাবার জন্য উসখুস করতে থাকে। আমায় ইঙ্গিতে বলল ওর বউএর কাছে একটা ট্রাই নিতে। ওদিকের দোচালায় গুরুপদ দার সংসার মানে দুই ছেলে সহ বৌদি থাকে। অভাব অভিযোগের কারণে তারও মাথা বেশীর ভাগ সময় গরম থাকে। এখন আমি পড়লুম মুষ্কিলে।
ঘরের কাছাকাছি দাঁড়াতেই বউদি খ্যানখেনে গলায় বলে, কি ব্যাপার? কি চাই?
আমি খুব নরম গলায় বলি, দাদা একটু চায়ের কথা বলছিল। হবে কিনা জানতে পাঠাল আমায়।
বউদি কঠিন গলায় জানাল, চা চিনির পয়সা বার করতে বল তাহলে হতে পারে। দেখলাম যে বাচ্চাদের দোল খাবার একটা দোলনায় বউদি বসে। আমি পকেট থেকে দশটা টাকা বার করে বলি, এই যে দাদা পাঠাল।
রাখো ওখানে। বউদি আমায় বারান্দায় টাকাটা রাখতে বলে উঠে সামনে এল। তারপর বলল, দাদা দিয়েছে না তুমি দিচ্ছ? আমি চুপ করে থাকি। কেন ভিড়েছ ঐ পাগলের সংগে? আমাদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছ? দু বেলা খাওয়া জোটেনা,। আমায় পরের বাড়ী কাজ করতে হয়। আর তোমার দাদা লোকের কাছে বলে বেড়ায় আমি ছোটলোক তাই লোকের বাড়ী কাজ করতে যাই। কি খাবে আমার বাচ্চাদুটো? বাঁশীর হাওয়া? বড় দলে বাজাত। ঐ পাগলামির জন্য কেউ আর ডাকে না। খবরদার ওর সঙ্গে ভিড়ে জীবন নষ্ট করবে না। বাঁশী শিখে কোন লাভ নেই। তোমার ভালর জন্য বলছি। কি খারাপ লাগছে না?
আমি মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করি। আর কেনই বা আমার খারাপ লাগবে যখন সব কথাই সত্যি।
ফেরার পথে দেখি জ্যোৎস্নায় পথঘাট ভেসে যাচ্ছে। গুরুপদ দা বাঁশী ধরেছে তার সুর দূর পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে। মন কেমন হয়ে যায় এই বাজনা শুনলে। কিন্তু কোন সত্যকে গ্রহণ করব আমি! গুরুপদ দার সত্য না বৌদির সত্য?

মনোবর।
________________________________________


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

অতিথি হিসাবে একটি গল্প দিলাম। ইতিপূর্বেও গল্প লিখেছি। পাঠকদের মতামত চাই। এখানকার সদস্যপদের আবেদন করেছি। বর্তমানে কলকাতায় আছি। স্থায়ীনিবাস দঃ ২৪পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ।

এক লহমা এর ছবি

লেখা খুব তরতর করে এগিয়েছে, সেটা ভালো লেগেছে।
কলির অংশটা দুর্বল লেগেছে।
বানানে আর একটু যত্ন নেওয়া দরকার (ঠোট -> ঠোঁট, ফু -> ফুঁ)।
লিখতে থাকুন, লিখতে লিখতেই লেখা আরো মনোগ্রাহী হয়ে উঠবে এই আশা রাখি।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

গান্ধর্বী এর ছবি

বেশ ভাল লাগল।
সচলায়তনে স্বাগতম হাসি

------------------------------------------

'আমি এখন উদয় এবং অস্তের মাঝামাঝি এক দিগন্তে।
হাতে রুপোলী ডট পেন
বুকে লেবুপাতার বাগান।' (পূর্ণেন্দু পত্রী)

অতিথি লেখক এর ছবি

বাদ‌্যপাগল লোকদের নিয়ে আমার খুব আগ্রহ। কি জানি কি মনে করে এরা একটা বাদ‌্যের সাথে এরা দিনের পর দিন পার করে ফেলে।

গল্প সম্মন্ধে মন্তব্য করার মত কামেল আদমি হয়ে উঠিনি আজও।
শেষের লাইনটা না থাকলে হয়ত গল্পের ধার অনেকটা কমে যেত।

ভাল থাকুন,
শুভেচ্ছা হাসি

[মেঘলা মানুষ]

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

লেখা চলুক। তবে শেষ লাইনটা অপ্রয়োজনীয় মনে হল আমার কাছে।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

অতিথি লেখক এর ছবি

হ্যাঁ, বানান ভুল তো হয়েছে। ভুলের বিষয়ে এক লহমা সচেতন করার জন্য ধন্যবাদ। কলির ব্যাপারটা হচ্ছে।বাস্তবে ব্যাপারটা ঐরকমই ছিল তাই সেভাবেই রেখেছি। চরিত্রটি কাল্পনিক নয়, বাস্তব। সে কারণেই অদল বদলে যাইনি। আপনার উৎসাহ আর উদ্দীপনা হয়ত আরো লেখা আনবে। ধন্যবাদ আপনাকে।

অতিথি লেখক এর ছবি

ত্রিমাত্রিক যা বলেছেন তা তার মনের কথা। ঘটনা হল ঐ দ্বন্দ্বের উপরেই গল্পটি দাঁড়িয়ে। দুটোই সত্য অথচ পরষ্পর বিরোধী। তবে আপনি ঠিকই বলেছেন, হয়ত আরও ভালভাবে বিষয়টা উপস্থাপিত করা যেত যেটা আমি পারিনি।

অতিথি লেখক এর ছবি

গান্ধর্বীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আরও এবং নিয়মিত লেখার ইচ্ছা নিয়েই এসেছি। আপনাদের উৎসাহ আনন্দদায়ক।

অতিথি লেখক এর ছবি

এত সুন্দর বলছিলেন আপনি কিন্তু... গল্পটা কেমন যেন পরিণতি পেলো না! হঠাৎ শেষ হয়ে গেলো। আরো অনেক কিছু আসতে পারতো। দৈর্ঘ্য আরো বাড়তে পারতো। আপনি দারুণ বলেন, কাজেই গল্পটা শুধু প্রয়োজন। ভাল থাকবেন। আরো লিখবেন।

-সুষুপ্ত পাঠক

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ! আপনিও ভাল থাকুন!

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

সচলায়তনে স্বাগতম।

লেখা ভালোই লেগেছে। কিন্তু কয়েকটা জায়গাতে পড়তে গিয়ে হোঁচট খেলাম। "খালি বাজালে হবে? ফুড দিতে হবে।" আর "আমায় ইঙ্গিতে বলল ওর বউএর কাছে একটা ট্রাই নিতে" - দুই ক্ষেত্রেই ইংরেজী শব্দ দুটোয় এসে বেধে গেলাম। আর প্রথমটাতে চট করে খাবার কথা কেন আসছে প্রথমেই ধরা যাচ্ছে না, আরো পরে গিয়ে পরিষ্কার হচ্ছে ব্যপারটা। মনে হয় সংসারে অভাবের কথাটা আগে একবার হালকা করে বলে এলে এই লাইনটাতে এত সমস্যা হতো না।

বাজান, করান - এই দুটোতে এসে প্রথমে বাজানো বা করানো না পড়ে বাজান করান পড়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য এটা আমার ভুলও হতে পারে।

আরো লিখতে থাকুন। শুভকামনা থাকলো।

____________________________

অতিথি লেখক এর ছবি

বানানের ঐ বিষয়গুলিতে একটু সমস্যা আছে। আরো সতর্ক হতে হবে। ধন্যবাদ!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

নিয়মিত লিখতে থাকুন, এবং নিজে তা পড়ুন। নিজের লেখার মধ্যে যেটা পাঠকের পাতে দেবার মতো মনে করবেন সেটা সাবমিট করবেন। মডারেটররা ঠিক মনে করলে সেটা আমাদের কাছ পর্যন্ত চলে আসবে। কোনটা যদি মডারেটরের বেড়া ডিঙোতে না পারে তাহলে হতোদ্যম না হয়ে নতুন আর আরো ভালো লেখা নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। পাঠকরা আপনার লেখায় যে মন্তব্যগুলো করবে সেগুলো ভালোভাবে খেয়াল করবেন। তাহলে পাঠকরা আপনার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করছেন সেটা বুঝতে পারবেন। আর অন্যদের পোস্টগুলো শুধু পড়বেনই না, সাথে মন্তব্যও করবেন। ব্লগ হচ্ছে মিথষ্ক্রিয়ার জায়গা। পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতার মাধ্যমে বেড়ে ওঠার জায়গা।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সাফিনাজ আরজু এর ছবি

চলুক

__________________________________
----আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে---

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ!

অতিথি লেখক এর ছবি

চলুক

রাসিক রেজা নাহিয়েন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।