গল্পঃ ভূমিকম্পে যা করণীয়

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: মঙ্গল, ২৪/০৫/২০১৬ - ১০:১২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

শুরুটা হয়েছিল তখন, যখন রতনের নিজের সাথে ঘটনাটা ঘটল।

অথচ এর আগেও বেশ কয়েকবার ব্যাপারটা পেপারের হেডলাইনে উঠে এসেছিল। টিভি-অনলাইন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ভেসে গিয়েছিল। হাইতি ধ্বংসযজ্ঞ, নেপালের ক্ষতিসাধন সবই রতনের চোখে পড়েছিল অবশ্য। আমরা নিজেদের মধ্যে সেগুলা নিয়ে আলোচনাও করতাম। সে তাতে অংশও নিত। কিন্তু সেটা ছিল কথা-বলা-দরকার-তাই-বলতে-হবে এমন একটা ব্যাপার। তাই আলোচনা শেষে সে টপিক ড্রয়িংরূমে পড়ে থাকত, কিংবা খাবার টেবিলে। ব্যাপারটার ভয়ংকর দিকটা আমাদের ভেতরে ঢুকত না, রতনেরও না।

কিন্তু দেশে যেবার ছয় পেরিয়ে যাওয়া ভূমিকম্প হল, তখনই রতনের টনক নড়ল।

আমাদেরও নড়ল। তবে সেটা দু-তিনদিনের বেশি স্থায়িত্ব পেলো না। ভার্সিটির এক্সাম-ল্যাব-অ্যাসাইনমেন্ট, দীপ্ত ভাইয়ের অফিসের চাপে খুব শীঘ্রই আমরা সবটা ভুলে গেলাম। কেবল ভুললো না রতন। সে পুরো জিনিসটাই মাথার ভেতর গেঁথে নিলো খুব ভালোভাবে। এরপরেই শুরু হলো তার পাগলামি।

ঘটনাটা আরেকটু খুলেই বলা যাক।

যেদিন সেই দেশ কাঁপানো ভূমিকম্পটা হল, সেদিন আমরা চারজনের সকলেই ঘরে ছিলাম। রিপন-রতন-আমার ভার্সিটি অফ, ওদিকে দীপ্ত ভাইয়েরও অফিস বন্ধ। এমনটা খুব বেশি ঘটে না। তাই দিনটা স্মরণীয় রাখার উদ্দেশ্যে আমরা ঠিক করলাম, কিছু একটা রান্না করে ছুটিটা সেলিব্রেট করা উচিৎ। ভোটাভুটির পর ঠিক হল খিচুড়ি। ব্যাচেলার জীবনের সবচেয়ে কমন এবং সহজ রান্না। সাথে ডিম আর মুরগী।

দৌড়াদৌড়ি করে সব যোগাড় করা হলো। বুয়াকে বিদায় দিয়ে নিজেরাই রান্নার আয়োজন করতে থাকলাম। আমাদের মধ্যে রিপন আর দীপ্ত ভাই-ই যা রান্নাবান্না পারে। বাকি আমি আর রতন কোনমতে ডিমটা সিদ্ধ করতে পারব। তাই আপাতত আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হল, মুরগী কেটে একটা সাইজে আনা।

আমি কোনমতে মুরগীটাকে চারটা টুকরা করে রতনকে বললাম, “যা ত, ধুইয়্যা আন্‌!” এরপর হাতটা ধুয়ে সবেমাত্র একটু আরাম করে বসেছি, ঠিক তখন মনে হল খাটটা বুঝি একটু নড়ে উঠেছে। পাত্তা দিতাম না, যদি না সামনে থাকা পানির জগটাও হালকা হালকা করে কাঁপত। দীপ্ত ভাই সাথে সাথে চিৎকার করে উঠলেন, “ভূমিকম্পরে, দৌড় দে!” হুড়মুড়িয়ে সবগুলা দৌড় লাগালাম। যাবার সময় রিপন একবার বাথরুমের দরজায় ধাক্কা মেরে গেল, “রতন বাইর হ!” বেচারার তৎক্ষনাৎ সাড়া পাওয়া গেল না। কিন্তু আমাদের হাতে সময় নেই। যে যা অবস্থায় ছিলাম, সেভাবেই পা চালালাম।

থাকি হচ্ছে আট তলায়। নয় তলা বিল্ডিং-এর নীচ তলার গ্যারেজ। সামনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা আছে। লক্ষ্য ঐটাই। কোনমতে ঘর থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছোটাছুটি শুরু হল। অন্য ফ্ল্যাটগুলায়ও সাড়া পড়ে গেছে। তারাও বের হতে আরম্ভ করেছে। কয়েকজন চিৎকার করছে। একজন লিফটে উঠার চেষ্টা করল বাচ্চাসমেত, কয়েকজন মিলে তাকে একসাথে ধমক লাগালো। এরপর সেই সিঁড়ি দিয়েই নীচে নামা। সামনের বিল্ডিং-এ আবার কে যেন শঙ্খ বাজাচ্ছিল। ভয়ংকর অবস্থা!

সামনের ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে দেখলাম, পুরো বিল্ডিং-এর সবাই-ই মোটামুটি নেমে গেছে। সব পরিবার থেকেই দুই-তিনজন আছে। বাকিরা বাইরে ব্যস্ত। পাঁচতলায় থাকা বৃদ্ধ মানুষটিও তার নাতির কাঁধে ভর দিয়ে নীচে নেমেছে। সবার মুখেই একটা স্পষ্ট আতঙ্ক। ভয়ার্ত চোখে একবার বিল্ডিং-এর দিকে তাকাচ্ছে, একবার চারপাশে তাকাচ্ছে। অন্য জায়গাতেও মানুষের ভিড় বেশ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বোঝা গেল, ভূমিকম্প শেষ। এবার ভেতরে ঢোকা যায়। নিজেদের মধ্যে নেপাল-হাইতি সহ যত ভূমিকম্প সংক্রান্ত তথ্য আছে, সেগুলা বের করতে করতে যখন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছি তখন হঠাৎ রতনের গলা ...

“কী হইসে? তোরা নীচে ক্যান?”

কথাটা আসলো উপর থেকে। একেবারে আট তলা! আমরা অবাক হয়ে মাথা তুলে দেখি, রতন উৎসুক দৃষ্টিতে নীচে তাকিয়ে আছে। হাতে তার এখনো কাটা মুরগীর বাটি। তা থেকে টপটপ করে মনে হয় পানিও পড়ছিল কিছু।

আমাদের হতভম্ব ভাবটা কাটতে একটু সময় লাগল। পুরো বিল্ডিং নীচে নেমে গেছে, পাঁচতলার বৃদ্ধ পর্যন্ত নীচে নামল, আর ঐ গাধাটা আটতলায় বসে করে কী? পাশ থেকে এক আঙ্কেল খানিকটা রসিকতার সুরে বললেন, “বুঝে নাই মনে হয় ...”

সেই হল কাল। কেন সে বুঝল না, এই নিয়ে রতনকে ক্ষ্যাপানোর একটা সুযোগ আমরা পেয়ে গেলাম। পরবর্তী দু-তিনদিন সুযোগ পেলেই এ টপিকটা তুলে আনা আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিল। শেষে রতন রেগেমেগে যখন বলল, “এরপরের বার দেখা যাবে!” তখন আস্তেধীরে আমরা চুপ করে গেলাম। এক জিনিস নিয়ে বেশি চালাতে এমনিতেও ভালো লাগে না ...

তবে ততদিনে রতন তার কাজ করা শুরু করে দিয়েছে। ব্যাপারটা আমরা টের পেলাম যখন সে একদিন আমাদের বলল, “বাড়িওয়ালার কাছে একবার যাওয়া উচিৎ।”

“ক্যান? পানি-গ্যাসে প্রবলেম হইতেসে নাকি?”

“না মানে ভূমিকম্পের জন্য এই বিল্ডিংটা কেমন টেকসই সেটা জানা দরকার একবার।”

আমরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। ভূমিকম্পের টপিকটা ততদিনে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সে এখনো এটা নিয়ে পড়ে আছে! তবে রতনের গলার স্বরে গাম্ভীর্য ছিল বলে আমরা আর কিছু বললাম না। তাছাড়া এটা একটা জরুরী ব্যাপারও বটে। বিল্ডিংটা টেকসই কিনা জানা উচিৎ।

দীপ্ত ভাই আর রতন গেল সেদিন বাড়িওয়ালার বাড়িতে। জানতে পারলাম, আমাদের বিল্ডিং-এর ফাউন্ডেশান মোটামুটি গোছের। আটতলা বিল্ডিং-এর ছয়তলা ভিত্তি। তারমানে আমরা আটতলার বাসিন্দা খানিকটা হলেও ঝুঁকির মধ্যে আছি। এটা জানার পর রতন নাকি বাড়িওয়ালাকে প্রশ্নের পর প্রশ্নে একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। আশেপাশে কী পরিমাণ পানি ছিল, পাইলিং ঠিকমত করেছিল না, রড-সিমেন্টের পিএসআই কত ছিল, আটতলা বিল্ডিং বানাবার নিয়মকানুন ঠিকঠাক মানা হয়েছিল কিনা, গ্যাসলাইন ঠিক কোন দিক দিয়ে গেছে – এইসব হাবিজাবি প্রশ্ন। দীপ্ত ভাই পরে বলার সময় হাসতে হাসতে শেষ। বাড়িওয়ালা বেচারা শেষে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, “আপনার ইচ্ছা হইলে থাকবেন, নাইলে যাইবেন ... অতশত কথা আমি ভাড়াটেদের কইতে পারুম না!”

উত্তেজিত রতন ফেরত এসে জানালো, সে এই বিল্ডিং-এ আর থাকবে না। কারণ, এমনিতে বিল্ডিং ঝুঁকির মধ্যে আছে। তার উপর বাড়িওয়ালা বদমাশ শ্রেণীর লোক। ভাড়াটেদের টাকা নিবে কিন্তু ন্যায্য কথা বলবেন না। এ ত পুরাই মাটিচাপা দেওয়ার ষড়যন্ত্র!

রতন খানিকটা বাড়াবাড়িই করছে, তাতে সন্দেই নেই। কিন্তু তা বলে সে যা অভিযোগ আনছে, তাও ঠিক উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই সে রাতে খাওয়া শেষে আমাদের নিজেদের মধ্যে একটা ছোটখাট মিটিং হয়ে গেল। বিষয়বস্তু “এখানে থাকা যাবে কি না”। রতন একটার পর একটা অভিযোগ তুলে ধরল। আমরা চুপচাপ শুনলাম। এরপর আমাদেরগুলাও বললাম। দেখা গেল, আমাদের তিনজনের তেমন কোন সমস্যা নেই। সবই বলতে গেলে রতনের সমস্যা। তাও কিনা শুরু হয়েছে সেদিনের ভূমিকম্পের পর। এমনিতেও এখানে আর সমস্যা নেই। পানি-গ্যাসের জন্য সব জায়গায় হাহাকার। আমাদের তা নেই। এখান থেকে অফিস-ভার্সিটিও কাছে। কাজেই এ বাসা ছাড়লে সব সুবিধা মিলবে, এমন বাসার খোঁজ পেতে অনেক সময় লাগবে। অত কারোর নেই। কাজেই এখানেই আমরা থাকছি – এমনটা ঠিকঠাক হলো। রতনের সমস্যা হলে সে চলে যেতে পারে।

রতন এরপর আর কিছু বলেনি। চুপচাপ নিজ রূমে চলে গেছিল। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তবে নতুন এক উৎপাত শুরু হল। খাওয়ার সময় কিংবা অন্য কখনও সময় পেলে সে এসে আমাদের উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করত। কিভাবে-কি-করলে-ভূমিকম্পে-উদ্ধার-পাওয়া সম্ভব হচ্ছে তার বিষয়বস্তু। ‘সিঁড়ি-লিফট ব্যবহার করা যাবে না’, ‘গ্যাসলাইন বন্ধ রাখতে হবে’, ‘দরজার নীচে দাঁড়ানো চলবে না’, ‘আফটার শকের প্রিপারেশান থাকতে হবে’ ব্লা ব্লা ... এতবার বলল জিনিসগুলো যে আমাদের সকলেরই প্রায় মুখস্ত হবার মত দশা। রিপন ত একটা নামই দিয়ে ফেলল – কুইক রতন। আর্থকুইকের কুইক।

সেদিন আবার দেখলাম তাকে একটা হেলমেট কিনে আনতে। সাথে একগাদা রঙিন পোষাক। দেখতে অনেকটা বীচে থাকা লাইফগার্ডদের মত।

আমরা কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে রতন, এসব কী?”

সে গম্ভীর গলায় উত্তর দিলো, “এগুলা হচ্ছে সতর্কতা। যাতে ভূমিকম্পে বিপদে পড়লে রক্ষা পাওয়া যায়।”

দীপ্ত ভাই হাসি চেপে রেখে বলল, “কিরকম রে?”

“এই ধরেন” রতন হেলমেটটা তুলে দেখালো, “এইটা মাথা পরলে আপনার মাথা বাঁচবে। আর এই কালারফুল ড্রেস পরলে দূর থেকে আপনারে মানুষ দেখতে পারবে। তাতে উদ্ধার করা সহজ হবে।”

“আচ্ছা!” দীপ্ত ভাই বুঝে ফেলার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। তখনো তার মুখে হাসির ছোঁয়া আছে।

“আপনাদের উচিৎ এগুলা কিনে রাখা ... বলা ত যায় না কখন কী হয়!”

আমরা তখন মানে মানে সরে পড়লাম। এমনিতেই অল্প টাকায় বাঁচি না, তার উপর এখন দুই-তিন হাজার খরচ করে এসব কেনার কোন মানেই হয় না। পাগলামি যত্তসব!

আরেকদিন দেখলাম রতন ফ্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে কি যেন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। হাতে থাকা কাগজে আবার কিছু হিসেব কষছে। ফ্রিজটা দীপ্ত ভাইয়ের। সামনে বিয়ে করার প্ল্যান আছে তার। সেজন্য টাকা জমিয়ে কিছু জিনিস কিনে এগিয়ে থাকা। আমরা সেটা আপাতত সকলে ব্যবহার করছি।

উনি তখন ঘরে ছিলেন না। তাই আমি এগিয়ে গেলাম।

“রতন, কি করিস তুই ঐখানে?”

“হিসাব করি, হিসাব!”

“কিসের হিসাব?”

“ফ্রিজটা পড়লে কীরকম অ্যাঙ্গেলে পড়ব, সেই হিসাব করি।”

বুঝতে পারলাম, ছেলে আবার ভূমিকম্প নিয়ে পড়েছে। কিন্তু ফ্রিজ পড়ার সাথে রতনের সম্পর্ক ঠিক বোধগম্য হল না। তাই আবার জিজ্ঞাসা –

“ফ্রিজ পড়লে তোর কী?”

রতন যেন বিরক্ত হল এবার। মাছি তাড়াবার ভঙ্গিতে হাতটা একবার সরিয়ে সে বলল, “ভয়েড ক্রিয়েট হইবো ক্যামনে দেখি।”

পরে সে ব্যাপারটা খোলাসা করলো। ভূমিকম্পে যখন সবকিছু নড়ে, তখন ঘরে থাকা ভারী জিনিসগুলা একপাশে পড়ে যেতে পারে। তখন সে পাশে থাকা অন্য জিনিস যদি ভারীটাকে আটকাতে পারে, তাহলে একটা ‘ভয়েড’ তৈরি হয়। ত্রিভুজের মত বলে ব্যাপারটাকে ‘ট্রায়াঙ্গেল অফ লাইফ’ বলে। সেটাই রতন খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

“কিন্তু রতন, একটা জিনিস বুঝলাম না। তোর এই ভয়েড ঠিক কোনপাশে তৈরি হবে, তুই আগে থেইকা বুঝবি ক্যামনে?”

রতন এবার খানিকটা থতমত খেয়ে গেল। এটা সে ভেবে দেখেনি। সে শুধু একটা পাশ নিয়ে চিন্তা করছিল যেখানে রিপনের কম্পিউটার টেবিলটা আছে। অন্য দুইপাশ কিন্তু ফাঁকা। সমস্যা হয়ে গেল তাহলে।

সে খানিকটা দ্বিধাজনিত কণ্ঠে বলল, “অন্য দুইপাশে অন্য কিছু রাখা যায় না?”

“কী রাখবি তুই?”

“এই ধর আমাদের টেবিলগুলা আনলাম ...”

“পাগল তুই!” আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করি। “দীপ্ত ভাই মানবে না। ফ্রিজ ইউজ করতে দেয় এই বেশি। চারপাশে জঙ্গল করে রাখলে সেইটা করতে দেয় নাকি সন্দেহ আছে ব্যাটা।”

রতন হাল ছাড়ে না, “ভাইরে একবার বইলা দেখা যায় ...”

“যা খুশি কর। আমি আমার টেবিল আনতে পারুম না।”

সে রাতে রতনের সাথে দীপ্ত ভাইয়ের এ বিষয়ে আর কথা হয়েছিল নাকি জানি না। তবে ফ্রিজের চারপাশ মুক্ত দেখে বোঝা গেল, প্রস্তাব উঠলেও আমার মত ভাইও তা বাতিল করে দিয়েছে।

রতনের পাগলামি আরেকটা নমুনা পেলাম দু-একদিন পর। সে তার ট্রাঙ্ক থেকে একটা ভারী কম্বল বের করে বিছানার উপর রেখেছে। রিপন সেটা দেখতে পেয়েছিল। আমাদেরকে ডেকে এনে সেটা দেখালো।

রতনকে ধরতেই সে বুঝালো যে ভূমিকম্পে কম্বলের মত ভারি জিনিস কাছাকাছি থাকা কতটা জরূরী। কম্পন টের পাওয়ার সাথে সাথে কম্বল জড়িয়ে কোথাও শুয়ে থাকতে হবে – এই হচ্ছে ব্যাপারটা। নামও বলল একটা, “ড্রপ-কভার-হোল্ড”। এতে নাকি বাঁচার সুযোগ অনেক বেশি।

অন্যবারের মত রতনকে আর পঁচানো হলো না। আমরা সবটা শুনে নিঃশব্দে যে যার কাজে ফেরত আসলাম। দীপ্ত ভাই খালি একবার আমার কাছে এসে বলল, “রতনটা বেশি বাড়াবাড়ি করতেসে। অবসেসড হইয়া গেসে পোলাডা।”

আমি শ্রাগ করলাম। কি-ই বা আর করতে পারি।

রতনের অবসেশান সম্ভবত আরো অনেকদিন চলত। কিন্তু তাতে ছেদ পড়ল অন্যভাবে।

ভার্সিটিতে ক্লাস করছিলাম সেদিন। সেমিস্টারের সবচেয়ে কঠিন টিচারগুলার মধ্যে একজন ক্লাস নিচ্ছিলেন। তার মধ্যে হঠাৎ ফোন। কোনমতে স্যারের দৃষ্টি এড়িয়ে কল রিসিভ করলাম। ঐপাশ থেকে ভেসে এলো দীপ্ত ভাইয়ের উত্তেজিত গলা –

“তাড়াতাড়ি হসপিটাল আয়! আব্দুল খালেক হসপিটাল!”

“ক্যান? কী হইল আবার?”

“আরে রতন অ্যাক্সিডেন্ট করছে! তাড়াতাড়ি আয়!”

অতঃপর স্যারের পারমিশান নিয়ে দৌড় দেওয়া, হসপিটাল পৌঁছানো, রূম বের করা এবং প্লাস্টারে মোড়া অবস্থায় রতনকে আবিষ্কার।

ঘটনা কী? ঘটনা কী?

ততক্ষণে তিনজনই হাজির। রতনের ঘরে খবর দেওয়া হয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই নাকি একজন রওনা দিয়ে ফেলেছে। এখন ঘটনা ত জানতে হবে। সবাই মিলে ঘিরে ধরল তাকে। হাতে-পায়ে প্লাস্টার দেওয়া থাকলেও ছেলের জ্ঞান আছে। মুখটাও নাড়াতে পারছে। কাজেই চেপে ধরতেই সে কোনমতে বলে উঠল, “ভূ-ভূ-ভূমিকম্প!”

ভূমিকম্প? কোথায়? টের পেলাম না ত!

আরেকটু জেরা করতেই বাকি কাহিনী বের হয়ে আসলো।

ঘটনা ঘটলো সকালে। এগারোটার দিকে। যখন আমরা সকলে ভার্সিটি বা অফিসে। ঘরে কেবল রতন। কারণ তার আজ ক্লাস নেই। বিছানায় সটান শুয়ে সে বই পড়ছিল। এমন সময় হঠাৎ তার মনে হল খাট কাঁপছে। সে সাথে সাথে বই বন্ধ করে ফেলল। চারপাশে তাকাতে থাকলো। সামনেই থাকা টেবিলের উপর থাকা মোবাইলটাও যেন হঠাৎ কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকলো।

ব্যস, তাকে আর পায় কে! পড়িমড়ি করে রতন ছুটতে শুরু করল। অথচ পাশেই তার কম্বলটা ছিল। ড্রপ-কভার-হোল্ড করার কথা তার মনে রইলো না। টেবিলের উপর থাকা হেলমেট মাথায় চাপানোর কথা তার আর খেয়ালে নেই। লাইফগার্ডের ড্রেসগুলো সেই ট্রাঙ্কেই পড়ে রইল। সব ফেলে তখন আমাদের 'কুয়াক' রতন দৌড়ুতে শুরু করেছে বাইরে যাবার জন্য।

রতনের রূম থেকে সদর দরজায় যেতে দীপ্ত ভাইয়ের ফ্রিজটা পার হতে হয়। সেটার পাশ কাটাবার সময় সে একটাবার থমকে দাঁড়ালো ...

“তারপর?” আমি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। “তুই ভয়েডের ভিতরে যাস নাই?”

রতন চিঁ চিঁ স্বরে বলল, “ভয়েড খুব ছোট লাগতেছিলো রে! মনে হইল আঁটুম না ...”

আমি সেই করূণ মুহূর্তেও প্রায় হেসে ফেলছিলাম। দীপ্ত ভাই বাধা দিলেন, “এরপর কী হইল ক!”

এরপর আমাদের রতন সদর দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালো। কাউকে বের হয়ে না দেখে সে ‘ভূমিকম্প’ ‘ভূমিকম্প’ চিৎকার করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় দৌঁড়াতে থাকে। নিজের সাথে যদি অন্যদেরও বাঁচানো যায়। কিন্তু ঐ করতে গিয়েই ধরাটা খেলো। আটতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত দৌড়ে শেষে চারতলায় গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ল। ভাগ্য তার ভীষণ রকমের ভালো। ধরাধরি করে হসপিটালে আনার পর দেখা গেল মাথায় গুরুতর চোট লাগেনি। তবে দুই হাতের হাড়ে চিঁড় ধরেছে আর ডান পা'টা মচকে গেছে।

“সাধে কি আর সিঁড়ি ব্যবহারে মানা করসে!” মাথা নাড়তে নাড়তে দীপ্ত ভাই বলেন।

সেদিন বাসায় ফিরে আমরা ব্যাপক খোঁজখবর নেবার পরও ভূমিকম্পের কোন হদিস পেলাম না। বাংলাদেশ দূরের কথা, ভারত, মায়ানমার কিংবা সুদূর চীনেও কিছু হয়নি। শুধু জাপানে চার মাত্রার এক ছোটখাট নাড়ানাড়ি হয়েছিল। সেটাই হয়ত কোনভাবে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে আমাদের স্পেশালিস্ট টের পেয়ে গেছে!

সাতদিন থাকবার পর রতনকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়। বাড়িতে ছিল এক মাসের মত। এরপর আবার আমাদের ফ্ল্যাটে চলে এলো। তার অসংখ্য ভূমিকম্প থিওরির করূণ পরিণতির পরও দেখলাম সে এখনো হাল ছাড়েনি। সেদিন আমাকে বলছিল, রাতে বিছানায় শোয়ার সময় যেন বোঝার চেষ্টা করে কিছু কাঁপছে কিনা। খুবই সূক্ষ্মভাবে কাজটা করতে হবে। নাহলে ভুল হয়ে যেতে পারে ...

হায়রে রতন!

☼ মানুষিক সৈনিক ☼


মন্তব্য

মেঘলা মানুষ এর ছবি

বেচার রতন মন খারাপ

অতিথি লেখক এর ছবি

হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

পড়েছি।

সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA