গণদেবতা থেকে গণশত্রু

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ১৮/০৮/২০১৭ - ৩:০৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমাদের পরিকল্পনা ছিল খুব সাদামাঠা- লুইসকে বল দাও।সে কখনোই পেছপা হবে না।– ডেজা ভ্যু।এইরকম কথাটা যেন কাকে নিয়ে শুনেছিলাম-লিওনেল মেসি!হ্যা,মেসিই।কিন্তু এই লুইস কি মেসি?

ভ্এরমণ সহায়িকাঃ লেখাটি, প্রিয় পাঠক, আপনার একটু বেশী মনোযোগ ও প্রস্তুতি দাবি করে।প্রথমে চারপাশটা একটু অন্ধকার করে নিয়ে শান্ত হয়ে বসুন।চোখটা বন্ধ করুন।সামনের অন্ধকারকে উপলব্ধি করুন। এই যন্ত্র-সঙ্গীত শুনতে শুনতে কল্পনা করুন এমন একটি সমস্যাকে যেটাকে আপনি সামান্যই ভেবেছিলেন, কিন্তু ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে তা আপনাকে গ্রাস করছে।এবং আপনি নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রী।

এই যন্ত্র-সঙ্গীতের মাধ্যমে জীবনের এই শেষ দিনগুলোতে আপনার তখন মনে পড়ে আপনজনদের কথা,তাদের সাথে কাটান সময়ের কথা। যে জীবনে, যার জীবনে আপনার আর স্থান নেই- তার কথা।

কিন্তু এতসব অনুভুতিগুলো রেখে আপনি বিনা যুদ্ধে হার মেনে নেবেন, কাভি নেহি- বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী।অতএব যুদ্ধ শুরু। জীবনের শেষ যুদ্ধ।কিন্তু আপনি জানেন এই যুদ্ধে জয় লাভ অসম্ভব।পরাজিত হবার জন্যেই আপনি এই লড়াই শুরু করেছিলেন হয়ত,হয়ত আপনার জন্মই পরাজিত হবার জন্য।এই যন্ত্র-সঙ্গীত

।। ১।।

নবাবপুর থেকে শাখারীবাজারের দিকে কোন কানাগলির হাত ধরলেই নারায়ণদার চায়ের দোকান আপনার সামনে উপস্থাপিত হবে।ছিড়ে ফেলা যায় না ফুটবলের এমন আড্ডায় আমি আর রুম্মান সেখানে নিত্য সংক্রামিত।অমাবস্যার অন্ধকারে চাঁদ হয়ে ফুটে থাকা এলইডি বাতির তলে আমরা বার্সা-রিয়ালের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বকে সংরক্ত করি।যার শুরু হয় আমাকে দিয়ে- জানিস এবার ইউসিএলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দৌড়েছে বার্সা?
ভাই মার্কা পড়া বাদ দে- রুম্মান বলে- এইসব গুজব ছড়ানো ওদের কাজ।
হ্যা, সবই তো গুজব।সবাই তোদের সাথে ষড়যন্ত্র করছে।তোরা সবসময় ভিকটিম।আর এটা মার্কার খবর না।এটা যুগান্তরে পেয়েছি।এই তো কয়েকদিন আগে প্রথম আলোতে আসল, না শুধু সেখানেই না আরো কতগুলো পত্রিকায় পড়েছি রোনালদো লিমা বলেছে বার্সা তার সাথে চুক্তি নিয়ে প্রতারনা করেছিল।সে বলেছে নেইমারের চুক্তি নিয়েও তারা এমন করেছে।দেখ,মেসির চুক্তি নিয়েও তারা এমন করেছে।তোর কি মনে হয় মেসির খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই সে ট্যাক্স দেবে না?
রুম্মান মাথা নাড়ে- এর পিছনে নিঃসন্দেহে মাদ্রিদের হাত আছে।
হ্যা, সবকিছুর পিছনেই মাদ্রিদের হাত থাকে!বলে চলি আমি- তোরা আসলে কিংবদন্তীদের সম্মান দিতেই জানিস না।এই তো কিছুদিন আগে লুইস ফিগোকে বার্সা তাদের উয়েফা একাদশের হয়ে খেলতে দেয়নি।
রুম্মান হাসে,হাসিতে থাকে ক্রোধ মিশে- এখন কেন এত বার্সা-প্রীতি। সে তো ক্লাবের সাথে বেঈমানী করেছে।পাল্টা দিই আমি- একটা খেলোয়াড়ের যেকোন ক্লাবে খেলার স্বাধীনতা আছে।যেখানে টাকা বেশি পাবে সেখানে খেলবে এটাই তো স্বাভাবিক।
হ্যা, তোদের কাছ থেকে এই উত্তরই তো প্রত্যাশিত।তোরা বুঝিস খালি টাকা।তোদের কোন আবেগ নাই।সব আবেগ টাকার জিম্মায় দিয়ে রেখেছিস-সে গজগজ করে-তাও যদি বুঝতাম নিয়মমাফিক চুক্তি করে গেছে, হত; প্রতারকটা প্রি-কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর করেছিল রিয়ালের সাথে।
গভীর জলে যেন আমি পড়ি।তার নিনাদিত সুর হয়- প্রি-কন্ট্রাক্ট মানে?
আরে, প্রি-কট্রাক্ট মানে সে পেরেজের সাথে চুক্তি করেছিল।কিছুই তো জানিস না ঘটনা-সে শ্লেষ মেশায়- জান,জান,...।

শব্দটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে গলি দিয়ে প্রবাহিত অগনিত শব্দস্রোতে বাধা পেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।সত্যিই চারপাশে কত শব্দ প্রবাহমান- মানুষের হুল্লোড়, রিকশার বেল, হকারের হাক থেকে শুরু করে চায়ের কাপের টুংটাং, আমাদের চায়ের কাপের চুমুকুত্থিত শব্দ-সব যেন বুড়িগঙ্গার মুক্ত বাতাসের দুর্গন্ধে ডানা ঝাপটায়।এলইডির কৃত্তিম জ্যোস্নায় পিচ্ছিল সরু গলিগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে আছে আবর্জনার মত দালানগুলি।গতকাল-আজ-আগামীর প্রতিটি দিনেই যার বারান্দা-বেলকনিগুলোতে মেলা থাকবে শুকোতে নাড়া কাপড়,থাকবে টবেতে গাছ।ঘরগুলোতে থাকবে দুপুরের ভাতঘুম, খেলার চলমান ধারাভাষ্য, জয়-পরাজয়ের গন্ধ।মনে হবে যেন আমরা কোন উৎসবে উদ্বেল।মনে হবে যেন এটা প্লাসা দো কাতালুনিয়া বা প্লাসা মাগবার মত কোন এলাকা।আমাদের অধিনায়ক আমাদেরকে খেলাটাকে জীবনের শেষ না ভাবতে বা দেশপ্রেম প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখতে বলে। সে কথা বাতাসে ভেসে আমাদের কানে আসে।আমরা নারায়ণদার দোকানে চায়ের লিকারের স্বাদ শুষে নিই।আমাদের ক্ষোভগুলো বিরতিবিচ্ছিন্নভাবে পুঞ্জীভূত হয় মাঠের কাছাকাছির গ্যালারি গালাগালিতে, অনলাইন চত্বরে, টিম বাসে ছোড়া ঢিলে আর বানর-বানর চীৎকারে।আমরা দেশপ্রেমের একটি সরীসৃপকে আন্তরিক করি শত্রুদের নীল করে তোলার আশ্বাসে- সরীসৃপ কি পোষ মানে?এ এলাকা বা শহরকে নিয়ে গঠিত এই প্রাগৈতিহাসিক গল্পগুলো পড়তে পড়তে আমার কেবলি মনে হয় এটা বার্সেলোনা নয় তো?

এটা যদি বার্সেলোনা হত!এটা বার্সেলোনা শহরই!

।। ২।।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল খুব সাদামাঠা- লুইসকে বল দাও।সে কখনোই পেছপা হবে না।– ডেজা ভ্যু।এইরকম কথাটা যেন কাকে নিয়ে শুনেছিলাম-লিওনেল মেসি!হ্যা,মেসিই।কিন্তু এই লুইস কি মেসি?

ন্যু ক্যাম্পে শীত এসেছে মোটা জ্যাকেট চড়িয়ে।এটা এল ক্ল্যাসিকোর দিন। ২২শে নভেম্বর ২০০২-এর রাত।মাঠে নামার আগে টানেলে দুই দলের খেলোয়াড়রা।লস ব্লাংকোসদের সদ্য ত্রিশে পা গলানো ১০ নম্বর ফিগো বসে পড়ে বুটের ফিতেয় টাইট দিচ্ছে।দিতে দিতে তার মনে পড়ে কিভাবে লুইস মাদেইরো কায়েরো ফিগো হয়ে উঠেছে আজকের ফিগো।ফিগো, ফিগো!- পেছনে থেকে কেউ ডাকছে- কে? একজন নাকি অনেকে ডাকছে?

দুপুরের গা পোড়ানো রোদের মধ্যে খেলা জমেছে রাস্তায়- স্ট্রিট ফুটবল। পাশে ভিড় করা দর্শকরা চেঁচাচ্ছে ঐ নামে।এটা কোথায়?পুরান ঢাকার বিজয় দিবসের স্ট্রিট ফুটবল।মাইকে গান বাজছে, কখনো ধারাভাষ্য। পাশাপাশি শিষ করতালি ছড়াচ্ছে চাঞ্চল্য।কিন্তু তামাটে লোকগুলোকে ঠিক বাঙালী বলে ঠাউরানো যাচ্ছে না।কথাতেও নেই কুট্টি ভাষার টান বরং পর্তুগীজ।কারণ এটা পর্তুগাল।তার আতলান্তিকস্পর্শী ট্যাগাস নদীর দক্ষিণ তীরের শহর আলমাদা।অপর তীরে রাজধানী লিসবন দাঁড়িয়ে।এখানকার কোভা দ্য পিয়াদাদে এলাকায় খেটে-খাওয়া শ্রমিক বাবা-মার একমাত্র সন্তান ফিগো, যে এখন ইউএফসি ওএস পাস্তিলাসের হয়ে খেলে বেড়াচ্ছে স্ট্রিট ফুটবল। তারপর ১১ বছর বয়সে যে বড় ক্লাব স্পোর্তিং সিপির নজরে পড়ে তাদের সাথে প্রশিক্ষণ শুরু করবে আর ১৭ বছর বয়সে মানে ’৯০ তে দলের হয়ে অভিষিক্ত হবে। তারপর ’৯৫ তে বহুবছর বাদে লিগ শিরোপা জিতিয়ে যাত্রা করবে ইতালির পথে।কিন্তু ট্যাগাস তো আসেনি ওখান থেকে,তাই প্রকৃতি বাধা সাধবে। নিজের মানসপুত্রকে সে নিয়ে যাবে তার উৎস স্পেনের আরাগোনা অঙ্গরাজ্যের দিকে,পাশে দাড়ানো বার্সেলোনার ইয়োহান ক্রুয়েফের হাতে তুলে দেয়ার জন্য, ফ্রি এজেন্ট হিসেবে মাত্র ২.২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে, খানিকটা মুফতে তো বলাই যায়।তারপর শুরু হবে তার তারার পথে যাত্রা। টিভিতে, রিডিওতে শুরু হবে, ফিগো...ফিগো-

ফিগো- ঘাড় ঘুড়িয়ে মাদ্রিদের ফিগো দেখে প্যাট্রিক ক্লাইভার্ট তার দিকে এগিয়ে এসেছে। হাই-হ্যালো করতে গিয়ে মনে পড়ে রিভালদোর কথা, ইয়োহান ক্রুয়েফের ড্রিম টিমের পতনের পর যে ত্রয়ী কাতালানদের ‘ড্রিম’ দেখিয়েছিল আরেকবার, যারা হয়ে উঠেছিল এককথায় অপ্রতিরোধ্য।জিতিয়েছিল টানা দু’বার লিগ শিরোপা(৯৭-৯৮,৯৮-৯৯),কোপা দেল রে(’৯৭ ও ’৯৮)।রিভালদো এখন আর নেই।লুই ভ্যান গালের ম্যানেজার হিসেবে প্রত্যাবর্তনে সে ক্লাব ছেড়েছে। অবশ্য প্রথমে বার্সায় এসে জু্টি বেধেছিল রোমারিওর সাথে, তারপর সে চলে গেলে রোনালদোকে নিয়ে আরেক অনবদ্য জুটি।বেতন নিয়ে বার্সা প্রেসিডেন্ট নুনেজের সাথে ঝামেলায় সে জুটি টিকলো মাত্র একবছর। অথচ সে বার্সায় আসার পরই ঘোষণা দিয়েছিল নুনেজ রোনালদো সারাজীবনের জন্য আমাদের।ঝামেলার একটা ঝড় কথাকে মিথ্যে করে দিল।ঝামেলা শুধু ঝামেলা।কি ঝামেলাটাই না হয়েছিল মাদ্রিদে ডেরা বানানোর তিন মাস পর প্রথমবারের মত যখন ‘ঘরের ছেলে’ ফিগো ঘরে ফিরেছিল।তখন অবশ্য সে তো আর ঘরের ছেলে নেই, হয়ে গেছে জুডাস, বিশ্বাসঘাতক।সেদিন ২০০২ সালের ২১ শে অক্টোবর। দাঙ্গা পুলিশ প্রথমে বার্সেলোনার এল প্রাতো বিমান বন্দরে মাদ্রিদকে স্বাগত জানাল,তারপর শিগগিরি বাসে পুড়ে ন্যু ক্যাম্পে হাজির করল ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে।বিমান বন্দর থেকে স্টেডিয়াম অব্দি করা হল ২৫ মিটার চওড়া একটা বিশেষ পথ।যদিও তাতে লাভের মধ্যে কিছু হলো না।উগ্র সমর্থকরা কাঁচের বোতল,পাথরের টুকরো ছুড়ছিল।ওগুলোর আঘাতে কাঁচের জানালা বাইরের অংশ চৌচির হয়ে গেছিল।কিন্তু ভ্যাগিস জানালাটা দুই-স্তর পুরু কাঁচের।মাদ্রিদ ডিফেন্ডার পাভোন সেটা জানায়।
সমস্ত ঘটনাটা তার কার্টুনের মত লাগছিল।সবাই আশ্রয় নিয়েছিল বাসের মাঝখানের জায়গাটায়।ঐ দেখো আরেকটা এল!- একটা বোতল ছুড়েছিল মনে হয় একদিক থেকে বাসটা ঘুরতেই সেটা লাগল বাসের অন্যপাশে। হাহা করে হাসে সে। হাসির ভাঁজ মুখ থেকে শুকিয়ে যাবার অবসরটুকু পাবার আগেই তৎকালীন মাদ্রিদে খেলা মাত্র দ্বিতীয় ইংলিশ স্টিভ ম্যাকমানাম্যান জানিয়ে দেয় প্লেনে সে ফিগোর পাশেই বসেছিল কিন্তু বাসে?- মাফও চাই দোয়াও চাই!

ম্যাকমানাম্যান এবার সংযুক্ত হয় পাভোনের হাসিতে।কিন্তু ফিগো তাতে কিভাবে যোগ দেবে সে বরং সেই হাসি চোখে মেখে মেখে নেয়,কারণ তার তো সেদিন মনে হচ্ছিল সে হচ্ছে একটা খুনের দাগী আসামী।কিন্তু কাউকে না কাউকে এই দর্শকদের শান্ত করতে হবে।তাই তো?ড্রেসিংরুমে এই কথাটা বলাবলি হতে শোনা যাচ্ছিল হিয়েরো আর পুয়োলের মধ্যে।ঐ যে বার্সার পুয়োল! ক্লাইভার্টের হাত মিলিয়ে যাওয়ার পর পুয়োলের ঝাকড়া চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রত্যাবর্তনের সেই কথাগুলো ফিগোর মনে গলে পড়ে।কিন্তু কথা গলে পড়ার এ অবসরটুকু তার শারীরিক দৈর্ঘ্যকে আর দীর্ঘায়িত করতে ব্যর্থ হয়- আরে ভাই সামনে একটা ম্যাচ।এবং যে সে ম্যাচ নয়,১১৫ বছর ধরে আপনাদের রক্তকে শীতে জমাটবদ্ধ হতে না দেয়া ম্যাচ।এটা ২২শে নভেম্বর এবং ম্যাচটা এখনই শুরু হতে যাচ্ছে।
যেখানে মাঠে নামার আগে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর কেসই কেরোসিন।ম্যানেজার দেল বস্কের চাকরী সুতোয় ঝুলছে রিয়ালের আগের ১৩ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৩টা ম্যাচ জয়ের মুখ দেখার কারণে।আর বার্সা গত ম্যাচে দেপোর্তেভো লা করুনার কাছ থেকে কোন করুণা যোগাড় করতে পারেনি।রিয়ালের মড়ার উপর খাড়ার ঘা 'গ্যালাকটিকোস'দের জিদান,রোনালদো প্রমুখেরা ইনজুরির জন্য নেই।তাই ফিগোর কাঁধেই মাদ্রিদের ভার।
বার্সেলোনা দল স্বাগতিক হিসেবে প্রথমে মাঠে ঢোকে।তারপর রিয়াল মাদ্রিদ টানেলটা পেরিয়ে ফটক দিয়ে মাঠে ঢুকতে যাচ্ছে।ফিগো এগিয়ে চলেছে সেদিকে,ফটক দিয়ে মাঠে ঢোকার জন্য।নব ঘুরিয়ে খুলে ঢুকতেই চোখকে গিলে ফেলে কয়েকজন লোক।কয়জন হবে- দশজন। ফিগোর এজেন্ট হোসে ভিয়েগার অফিস তারা গরম করে তুলেছে।

নবঘুরিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে যায় ফিগো।একটা চেয়ার টেনে বসে এক পায়ের উপর আরেক পাকে চালান করে দেয়ার সুখটুকু উপলব্ধি করতে যেয়ে একটি ধোঁয়াটে দিনে একটি ধোঁয়াটে গল্পকে বিস্তার ঘটানোর সুযোগ দেয়।অন্যসকল দিনের মত শুরু হওয়া এই দিনটির নাম ২০০০ সালের ১৬ জুলাই।সকালে বার্সেলোনার বাড়িতে বসে প্রাতরাশ খেতে খেতে টিভির নিউজ বুলেটিন থেকে ছোড়া একটি বুলেট ফিগোর চোখে সকালকে সন্ধ্যা বানিয়ে দেয়।সন্ধ্যা বানানোর পরের যে সময়টুকু ফিগোকে ঘিরে থাকে তা গঠিত হয় ঘড়ির টিকটিক আর চিন্তার জালকে নিয়ে।নিউজ বুলেটিন থেকে ছোড়া বুলেটটি ছিল- লরেঞ্জো সাঞ্জকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে রিয়াল মাদ্রিদের পঞ্চদশতম প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।চটজলদি ব্যাগপত্র গুছিয়ে নেয় সে।পালাতে হবে এই শহর থেকে।বার্সেলোনার এল প্রাতো থেকে উড়ে যায় লিসবনে।কিন্তু কেন এভাবে চোরের মত পালিয়ে আসা আমার এবং আপনার এই প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায় কারণ সে তার এজেন্ট হোসে ভেইগার অফিসে ঢুকছে।নব ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ঢুকে পড়ে সে।ঢুকে পড়তেই দর্শকদের বাজখাই চিৎকার তার কানে বাড়ি খায়।কয়েকটা লাফ দিয়ে শরীরকে ছাড়িয়ে নিয়েই সে মাঠের মাঝখানের দিকে দৌড় দেয়,যেখান থেকে তার মাদ্রিদের সহখেলোয়াড়রা দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাবে।

ন্যু ক্যাম্পে স্বাগতিক বার্সার পর রিয়ালের খেলোয়াড়রা দর্শকদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানায়। ২২ শে নভেম্বরের এই দলে থাকা লুইস ফিগোর তখন বার্সা ছাড়ার পর রিয়ালের হয়ে প্রথমবারের মত ন্যু ক্যাম্পে ঢোকার স্মৃতি মনে না পড়ে পারেই না।আগে থেকে পত্রিকাগুলো নিম্নচাপের খবর ছড়াচ্ছিল।২১শে অক্টোবরের সে ম্যাচে ফিগো মাঠে প্রবেশ করতেই নিম্নচাপটা রূপান্তরিত হল প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে। প্রবেশ মুহূর্তেই আকাশ ভেংগে পড়ল লাখখানেক লোকের স্বরতন্ত্রীর স্বরের আঘাতে।গ্যালারিতে উড়ছিল নকল ডলার ষাট মিলিয়ন ডলারের প্রতীকী রূপে।তার নগ্ন পুতুল দৌল খাচ্ছিল।ব্যানার টানান হয়েছিল জুডাস, বিশ্বাসঘাতক, ম্যাসিনারি বা ভাড়াটে সৈনিক; বেঈমান ফিগো যাবে কোথায় ছদ্মবেশে? ফিগো তোমাকে এখন ঘৃণা করি কারণ তোমাকে একসময় ভালবাসতাম!স্তম্ভিত ফিগো কয়েকটা দিন আগেও এখানকার গনদেবতা ফিগো কানে আঙুল চেপে একটু লজ্জিত, একটু অবিশ্বাসের হাসি হাসার চেষ্টা করছিল।

অবিশ্বাস, কিসের অবিশ্বাস ফিগো,এইরকম স্মরণীয় অভ্যর্থনার সংগী হবার অবিশ্বাস?এই শহরের দেয়ালে যদি তুমি কান পাততে তবে তোমার মত অবিশ্বাসের রোগাক্রান্তদের(বার্সা সমর্থক)কথাও শুনতে,তারাও বিশ্বাস করতে পারছেনা ব্যতিক্রমীভাবে ভালবাসা পাওয়া ও অ-স্প্যানিশ হয়েও অধিনায়কত্ব পাওয়া একজনের প্রস্থান- বার্সেলোনায় সবাই তাকে ভালবাসতো।কিন্তু সে ছলচাতুরী করেছে,ক্লাবকে ঠকিয়েছে।আর শুনতে,সে আমাদের সবাইকে বিস্মিত করেছে।সবকিছু ছিল খুবই হতাশার- এমন কথা বার্সার গোলরক্ষক ফ্রানসেস্কো আরনাউয়ের মুখে।হতাশার পান্ডুরতা ব্যাপৃত হত ঘরের ছেলে গার্দিওয়ালার মুখেও- বার্সাকে প্রতিনিধিত্ব করত সে। তার মাদ্রিদে যাওয়া মেনে নেয়া তাই সত্যি সত্যিই খুব কঠিন।
যেমন কঠিন পুরান ঢাকার গলি-রহস্য সমাধান করা।আপনি নারায়ণদার চায়ের দোকানের খোঁজে নাক গুঁজে দিলেন কোন গলিতে,তারপর পা ঠেলতেই থাকলেন।একসময় দেখতে পেলেন আপনি নব্বই দশকের শেষভাগে মাদ্রিদের এক রাস্তায়।আপনাকে মাদ্রিদিস্তা হিসেবে ধরে নিয়ে আমি কথা বলতে শুরু করি।আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে, আমি একটা মাত্র ডলারের চেক দিয়ে আমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে ধ্বসিয়ে দিতে পারি।এমন কি হতে পারে...!আমাদের চেতনায় প্রতিহিংসা প্রসারিত হয়।কারণ আমরা আসল পথ খুঁজে পাচ্ছি না।আমাদের কানে বাজছে- আমাদের পরিকল্পনা ছিল খুব সাদামাঠা- লুইসকে বল দাও।সে কখনোই পেছপা হবে না- ডেজা ভ্যু।এইরকম কথাটা যেন কাকে নিয়ে শুনেছিলাম- লিওনেল মেসি!হ্যা মেসিই।কিন্তু এই লুইস কি মেসি?

না,এটা স্পেনে জন্মান ব্লাউগারানাদের ভালবাসার গণদেবতা লুইস ফিগো।যে '৯৪-এ ইয়োহান ক্রুয়েফের ড্রিম টিমের পতনের পর বার্সাকে 'ড্রিম' দেখাচ্ছে, প্রথমে রোমারিও, রোনালদোর সাথে জুটি তারপর রিভালদো-ক্লাইভার্টের সাথে অপ্রতিরোধ্য ত্রয়ী করে লা লিগায় সর্বোচ্চ ১০৬ অ্যাসিস্ট (এখন ২য়) করে, প্রয়োজনের সময় গোল করে দেবতার ইচ্ছেশক্তির মত একের পর এক শিরোপা জিতে নিচ্ছে। এসেই সুপার কোপা স্পেনা '৯৬,তারপর উয়েফা উইনার্স কাপ '৯৭, উয়েফা সুপার কাপ '৯৭, লা লিগা টানা '৯৭-'৯৮ ও '৯৮-'৯৯, কোপা দেল রে '৯৭ ও '৯৮।এইগুলোর নাম আপনাকে খুব ভাবায় না। কারণ আপনি ৩২ বছর পর হেনকেসের অধীনে মাদ্রিদের ৭ম এবং মাত্রই দেল বস্কের অধীনে ৮ম চ্যাম্পিয়ানস লিগ শিরোপা স্ট্যাদে দ্য ফ্রান্স থেকে জিতে উল্লসিত।এছাড়াও আপনি '৯৫ এবং '৯৭ লিগ শিরোপা জিতেছেন।কিন্তু তারপরও আমার পরিসংখ্যান আপনাকে আক্রান্ত করবে- কথা দিচ্ছি।কারণ আপনি '৯০-'৯৪ পর্যন্ত পাঁচ বছর স্প্যানিশ ভাত-ঘুমে লা লিগা দেখেননি, '৯৫ ও '৯৭ তে জিতলেন কিন্তু '৯৮,'৯৯ দেখলেন নব্বই দশকে মোট সাত-সাতবার আপনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কাতলানদের লিগ ঘরে তুলতে,তখন আপনি আঙুল গুনে সাতের বিপরীতে দুই পর্যন্ত গুনতে সক্ষম হলেন।মান-সম্মানের ম্যাচ এল ক্ল্যাসিকোতে আপনি দাড়াতেই পারছেন না।
কারণ নব্বই দশকে মুখোমুখি দেখতে বার্সার কাছে রিয়াল হয়ে আছে হাফ ব্যাটারি (১২-৭)!ফিগোর আমলের এল ক্ল্যাসিকোর কথায় আসি।প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো সাঞ্জের পরিকল্পনায় আমরা পাই নামী ম্যানেজার আর ডেভিড সুকার,মিয়াতোভিচ, রাউল,সিডর্ফদের মত খেলোয়াড়।কিন্তু কিছুতেই যে হিসেব মেলে না।কিছুতেই পুরান ঢাকার গলির হিসেব মিলিয়ে আপনি পাচ্ছেন না নারায়ণদার চায়ের দোকান,সেখানে থাকা আমার আর রুম্মানের পুরাণের চেয়ে পৌরাণিক আড্ডায় সংরক্তিত হতে।আর এদিকে হেরেই চলেছে আমার ও আপনার দল।
ফিগো বার্সায় পা রাখার পর থেকে মোট ১১ দেখায় মোটে দুইবার হাসি মুখে বাড়ি ফিরতে পেরেছি।এর মধ্যে ৯৭ আর '৯৮ তে টানা পাঁচ হার আমাদের শরীর দিয়ে বয়ে গেছে।তার স্বাদ অনুভব করতে গিয়ে আমাদের মনে হয় '৯৭-'৯৯ এই তিনটি বছর বার্সা অপরাজেয়।এই অনুভবের স্বাদটি কেমন বিহবল তা না পেয়ে থাকলে,অফিসে সহকর্মীদের,ক্লাসের ফাঁকে বা গলির চায়ের দোকানে বন্ধুদের আড্ডায় আপনি পাবেন, কারণ আপনি বেঁচে থাকবেন '০৮-'১১ এর সময়ে...আপনি কোথাও তখন মুখ দেখাতে পারছেন না, আপনাকে দেখে সবাই হাসাহাসি করছে,টিটকারি মারছে।আপনি পালাচ্ছেন।সবধরনের আড্ডা থেকে আপনি পালাচ্ছেন।

কিন্তু উপায় নেই, বল পায়ে একটু থেমে চট করে গতি বাড়িয়ে আগুয়ান ডিফেন্ডারকে স্টেপওভারে পরাস্ত করে ডান বা বাম উইং থেকে ইউরোপের সময়ের সবচেয়ে নিখুঁত ক্রসগুলো ফেলছে বার্সেলোনার গণদেবতা ফিগো তার গোলশিকারী সতীর্থদের জন্য।কখন ডান উইং এ বল পেয়ে লং টাচে মাদ্রিদের ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে ডি বক্সের ডানকোনার দুরুহ কোণ থেকে বাঁকানো শটে গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে আপনার মাদ্রিদিস্তা হৃদপিন্ডকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে গোলপোস্টের বামপাশের জালে বল।কখনবা সেটা বাম পায়ের শটে ডান পোস্টের জালে।এবং টিভিতে তখনি ধারাভাষ্যকারের গলা থেকে ছিড়ে বেরোনো জিহবার সাথে গোল-গোল-গোওললল শব্দ উৎকীর্ণ কানে সাইরেনের মত বাজতে থাকছে।স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন বয়ে যাওয়া প্রধান নদীতে জোয়ার লাল-নীল রঙে অন্তরঙ্গ।এই গ্যালারিতেই জন্ম আমাদের।সবার।কারণ আমি রুম্মান,আপনি,মাঠের খেলোয়াড় ফিগো সবাই প্রথমত দর্শক। কারণ আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে একজন লোক বলে গেছিল,বাবু,ভাল খেলা খেলতে হলে ভাল খেলা দেখতে হবে।পরে জেনেছি সে বিখ্যাত দাবাড়ু কাপাব্লাংকা।আবার এই গ্যালারিতেই আমরা জন্ম দিই গণদেবতাদের।
কিন্তু সময় নেই, গোলের সাইরেন বাজছে ধারাভাষ্যে।তাই আবার পালাতে শুরু করেন।প্রথমে নাক গুঁজে দেন পুরান ঢাকার এক গলিতে।তারপর পা ঠেলতে ঠেলতে ঘুরপ্যাঁচ খেয়ে মাদ্রিদের এক রাস্তায়।আমার সাথে দেখা হয়ে যায়। বলেন,আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে, আমি একটা মাত্র ডলারের চেক দিয়ে বার্সাকে ধ্বসিয়ে দিতে পারি!লুইস ফিগোকে মাদ্রিদে নিয়ে আসতে পারি।আমি নীরবতা গুনে বলি,এই স্বপ্ন নির্মাণের জন্য একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন ব্যবসায়ী দরকার।আচ্ছা তারা কি একই হতে পারে না?

ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ নিজেসহ তার দশজন সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে ২০০০ সালের জুলাই মাসের একটি ধোঁয়াটে দিন ১৬ জুলাইতে স্ক্যামান্ডার নদীর তীরে ট্রয় নগরীতে উপস্থিত।ট্রয়ের নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে রয়েছে গ্রীকদের দিয়ে!কী করা যায়!হোসে ভিয়েগার সাথে আলোচনা চলছে স্পার্টান হেলেন-প্রেমিক লুইস ফিগোর চুক্তি নিয়ে।এই আলোচনায় ট্যাগাস নদীর উত্তর তীরের হোসে ভিয়েগার লিসবন অফিস গরম।এই গরমে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকে সদ্য বার্সেলোনা থেকে পালিয়ে আসা হেলেন-প্রেমিক পেরিস।থাকতে হয়, কারণ এইসব ঘটনা ঘটতে দিতে হবে, কারণ সে ঝাপ দিয়ে দিয়েছে, এখন আর পেছনে-ফেরা সুযোগরহিত, এখন তার সবকিছু অভিকর্ষে পতনশীল; কারণ মানুষের করোটিতে কি চলে ইতিহাসের পাতা তা লিখে রাখে না সবসময়।তাই এটাই সেই সুযোগ গণদেবতাকে গণশত্রু করে দেবার।এটাই সেই সুযোগ!কিন্তু এখন পেরিস ওরফে ফিগোকে খেয়াল রাখতে হয়, চুক্তিটা যেন প্রথম জীবনের ইতালিতে নিষিদ্ধ হওয়ার মত ঘটনা না ঘটায়।
'৯৫তে স্পোর্তিং সিপির সাথে চুক্তির শেষদিকে এসেও ক্লাব নতুন চুক্তি করছিল না ফিগোর সাথে।পরে একতরফাভাবে জুভেন্টাসের সাথে চুক্তি করে বসল।ফিগোর হাতে সেটা পৌছতেই সে খুব রেগে গেল।তারপর পার্মার প্রেসিডেন্ট পাস্তেরেল্লোর সাথে কথা বলে একটা চুক্তি করল।একটা সন্তোষজনক চুক্তি,ফিগোর মতে একমাত্র নিয়মমাফিক চুক্তি।কিন্তু একই সময় দুই ক্লাবের সাথে চুক্তি তো অনৈতিক।জুভরা সিরি 'আ' লিগ কমিটির কাছে পার্মার বিরুদ্ধে তাদের খেলোয়াড় চুরির অভিযোগ করে বসল।যার ফলশ্রুতিতে ইতালিতে ট্রান্সফার দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
জীবনের প্রথম বড় ক্লাবে যাওয়ার সময় ফিগোকে জীবন দেখিয়ে দিলো সে আসলে পুরান ঢাকার ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তারের মত প্যাচানো,জটিল।কিন্তু জটিলতা সমাধান করেই সামনে এগোতে হবে।যেমন বার্সার ৪৩তম প্রেসিডেন্ট নুনেজ করে চলেছে।সাফল্য ও কথিত সরকারী আনুকুল্যে প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল এগিয়ে গেছে যোজন যোজন। কিন্তু এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র সে নয়।তিলতিল করে পুনর্গঠন করল ফুটবল।ক্লাব বার্সেলোনাকে।সুশৃংঙ্খল পরিচালনা পর্ষদ আর আয় বুঝে ব্যয়ের নীতি এবং অতি অবশ্যি তৃণমূল থেকে প্রতিভা তুলে আনার জন্য লা মাসিয়াকে গড়ে তুললো বিশ্বসেরা ফুটবল একাডেমী হিসেবে।এভাবেই সুশৃংঙ্খল নিয়মতান্ত্রিকতা তার ক্লাবকে নব্বই দশকের সেরা ক্লাবগুলোর একটিতে পরিণত করলো।আর ফিগো এই তাকে বেতন বাড়ানোর জন্য ব্লাকমেইল করছে!দেখ, সব খেলোয়াড় যদি একইরকম চায় তাহলে আমরা তো পোষাতে পারব না।অতীত যাদের দাম মেটেনি তারা চলে গেছে রিয়ালে এবং এতে কিচ্ছু যায় আসেনি।নুনেজের সাফ জবাব।

এই জবাব কোন কিছু সাফ করতে না পেরে একটা জায়গায় জং ধরায় সেই জায়গাটা এমন যে ভাঙলে জোড়া লাগানো দুঃসাধ্য।জায়গাটার কোন নাম জানার জেব্রাক্রসিং থাকেনা বলে সবকিছু ঝাপসাতর হয়ে আসে।তাতে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকে ২০০২ সালের ২২ নভেম্বরের ম্যাচে সিগারেট ফুঁকতে দেখা যায়।অন্যমনস্কতার জন্য প্রথমার্ধটা মিস হয়ে গেছে আমাদের।ধুর!কিন্তু খুব বেশী ক্ষতি হয়ে যায়নি।ম্যাচ ০-০তে সমতায় আছে।এখন মধ্যবিরতি চলছে।একটু গান শুনে নেয়া যায়।ঐ যে ট্যাগাসকে নিয়ে বিখ্যাত পর্তুগীজ গানটা, শুনেছেন নাকি- চুল পেকে একদিন হবে সাদা, ট্যাগাস তো তবু রবে অনন্তযৌবনা।সত্যি ট্যাগাস সবসময় একইরকম রয়ে যাবে।এই বার্সেলোনা আর মাদ্রিদ শহরটার মত,কোন পরিবর্তন নেই।মাদ্রিদে পাবেন বিখ্যাত বুল ফাইট, নাইট ক্লাব,শুকর ছানার রোস্ট- কোচিনিল্লো তো বার্সেলোনায় মিলবে অসাধারণ সমুদ্র সৈকত, ভাস্কর্য,শৈল্পিক একটা ছোয়া।বাঙালীদের মত দুপুরের প্রধান খাবার ও সন্ধ্যায় হুল্লোড় করে বন্ধুদের সাথে স্থানীয় বারে খাওয়া আর ভাতঘুম তো দুই জায়গায় সাধারণ ব্যাপার।

অনেকটা একইরকমভাবে পরিবর্তন হবে না ফিগোর প্রতি কাতালান সাধারণ ক্ষোভের।সেটা হোক ২০০০-এর ১৬ই অক্টোবর বা ২০০২-এর ২২শে নভেম্বর।সেদিনও যতবার ফিগোর পায়ে বল গেছে গ্যালারি দুয়ো দিয়েছে,আজো তাই।ফিগো বার্সার কাউকে ট্যাকেল করলে গ্যালারি ফুঁসে উঠেছে।এধরণের কানে তালা ধরানো শব্দ স্প্যানিশ স্টেডিয়ামে কেউ কোনদিন শোনেনি।সেটা স্কাই স্পোর্টসের সাংবাদিক বালাগ জানায়। মাদ্রিদ ডিফেন্ডার ক্যাম্পোও তার সাথে একমত হয়- না, সেও জীবনে এমন কিছু শোনেননি।সেদিন ৩৯ মিনিটের সময় পুয়োলের ট্যাকেলে ফিগো মাঝমাঠের পার্শ্বরেখা পেরিয়ে ফুঁসে ওঠে দর্শকদের নাগালের মধ্যে ১ম বারের মত চলে গেলে শুরু হয় গালি আর বোতলবৃষ্টি।৬৪ মিনিটে কর্নার নেবার সময়ো একই অবস্থা।যদিও পুলিশ জায়গাটা ঘিরে রেখেছিল তবু মাদ্রিদের নিয়মিত কর্নার নেবার খেলোয়াড়টির সাহসে তা কুলোয়নি।কারণ এটা পুরান ঢাকা, এটা শাখারীবাজার; এইসব এলাকায় একটু সাবধানে চলতে, কথা বলতে হবে।নইলে আপনি গণশত্রু হয়ে যাবেন।আপনি এই এলাকায় নতুন নিঃশ্বাস ফেলছেন তাই হয়ত জানেন না। কিন্তু ফিগো তা নয়, তাই রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখানোর গুজবটা চারিদিকে ব্যাপৃত হলেও মূল খবরটা পেটেই ভুড়ি হিসেবে জমা রাখে।নইলে হয়ত তাকে খুন করে ফেলত সবাই।ফিসফিস করে ব্যাপারটা জানায় বার্সার দলবদল সংক্রান্ত পরামশর্ক মিঙ্গুয়েল্লা, ফিগোকে স্পোর্তিং সিপি থেকে বার্সায় আনতে যার ভূমিকা ছিল।

কিন্তু আজকে বার্সা ছাড়ার আড়াই বছর পর, ফিগোর সাহসেরা কি তাকে সংগ দেবে?চিন্তা নেই, এখনি জানা যাবে।মাদ্রিদ কর্নার পেয়েছে।ম্যাচের ৬৯ মিনিট।ফিগোই বল নিয়ে এগিয়ে চলেছে ডান কোণায়।কাছাকাছি যেতেই ফুঁসে উঠেছে সমুদ্র-সঙ্গীত।হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই ছুড়ে মারছে প্রতারকটাকে- ধাতব মুদ্রা,ছুড়ি,গ্লাস,হুইস্কির বোতল- জনি ওয়াকার।গায়ে লাগবে নাতো- সে ভাবছিল।পরিহিত সাবেক ফিগো।যে বার্সার হয়ে লিগ জেতার পর মাথার চুল লাল-নীল রঙ করে ব্যঙ্গ করেছিল রিয়ালকে উদ্দেশ্য করে- সাদা ছিঁচকাঁদুনেরা, চ্যাম্পিয়ানদের স্যালুট করো।কারণ সারাটা মৌসুম ধরে রিয়াল রেফারি বার্সাকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে এমন ধোয়া তুলছিল।যদিও এটা করা উচিত হয়নি, ফুটবলে অবশ্যই প্রতিপক্ষকে সম্মান করা উচিত- এখন এমনটাই মনে হয় ফিগোর।কিন্তু এসব অন্য কথাবার্তা।

মাঠে তারদিকে বৃষ্টির মত খুচরো জিনিস উড়ে আসছে।রেফারি ছুটে আসে।বার্সার খেলোয়াড়রাও ছুটে আসে।রেফারি বার্সার অধিনায়কের সাথে কথা অলে।পুয়োল এগিয়ে গিয়ে ক্ষিপ্ত দর্শকদের শান্ত করার চেষ্টা করে।পুলিশ কর্নার নেয়ার জায়গাটার থাকে।এরপর তিনবারের চেষ্টায় তিন মিনিট বাদে ফিগোর পায়ের সংগে কথা বলে বল উড়ে আসে কর্নার থেকে।ঘড়িতে ম্যাচ গড়িয়ে ৭২ মিনিট।বল উড়ে আসে সরাসরি গোলে।গোলরক্ষক পাঞ্চ করে সেভ করলে আবার বিপরীত দিকে মাদ্রিদের কর্নার।এবার?
ঘৃণা প্রধান নদীতে সমস্বত্ত্ব মিশ্রিত।তাই এক কোণার গ্যালারি উত্তাল হলে অন্য পাশ কি চুপ থাকবে?এবার এই পাশের সময়- বোতল, টেনিস বলের বৃষ্টি নামে ফিগো বল কুড়াতে মাঠের পাশে গেলেই।এবার সে চলে আস্তে থাকে মাথা নীচু করে।যেমন নীচু ছিল প্রথম ন্যু ক্যাম্পে প্রত্যাবর্তনের ২-০ তে হারা ম্যাচে, যেমন নীচু ছিল ঐ ম্যাচে শরীর থেকে সাদা রঙের গন্ধ মুছে ফেলা লুইস এনরিকের মাথা ছুয়ে প্রথম গোল খাওয়ার পরে কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দশার বৃষ্টির সময়।
মাইকেল সলগাদো ফিগোর কানে মুখ রাখে- বন্ধু, ছাড় এটা।আপন পরান বাঁচাও।সলগাদো শর্ট কর্নার নেয়ার সময় সাধারণত কর্নারের কাছাকাছি থাকে।কিন্তু আজ? না, অনেক ধন্যবাদ।

এদিকে ঝাঁকড়া চুলের পুয়োলকে আবার ছুটে গিয়ে গ্যালারিকে শান্ত করতে দেখা যায়।স্টেডিয়ামের মাইকে দর্শকদের শান্ত হতে অনুরোধ আসে।রেফারি খেলোয়াড়দের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।২০(বা ১২) মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে খেলা।দর্শকদের নিক্ষিপ্ত চিৎকার ঠেলেই সব খেলোয়াড় ড্রেসিং রুমে চলে যায়- প্রথমে মূল দরজা, তারপর সিড়ি, তারপর ফের সেই টানেল হয়ে।পেরেজের মুখেও সিগারেট জ্বলতে দেখা যায়।আর টেবিলে ছিটিয়ে থাকে অনেক কাগজ, বাতাসে ঝুলে থাকে কথাবার্তা, মাথায় চলছে আশংকা- হোসে ভিয়েগার ট্রয় অফিসে উপস্থিত সব মানুষের।ট্রয়ের নিশ্বাস যে অবরুদ্ধ গ্রীকদের দ্বারা।

এতক্ষন অনেক আলোচনা, তো হল, এবার রাজি হয়ে যাও হেলেন-প্রেমিক ফিগো।ট্যাগাস শুধু লিসবন-আলমাদা নয় ট্রয়ের মাদ্রিদ দিয়েও প্রবাহিত।তবে আপত্তি কিসের ট্রয়ের হয়ে লড়তে?আর তার উপর তুমি এখন চুক্তির খাঁচায় আটকান পাখি। রাজী হয়ে যাও তবে।

না, কোনভাবেই তাকে বার্সেলোনা ছাড়তে দেয়া হবেনা।বার্সার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী লুইস বাসেতের চিৎকার ভেসে আসে ট্রয়ের দেয়ালের ওপার থেকে।

।।৩।।

ফিগো ইউরো’০০-এ পর্তুগালকে নেতৃত্ত্ব দিতে বিমানে চাপে। সাথে নিয়ে যায় নতুন চুক্তি নিয়ে চাপান-উতোর।হ্যাটট্রিক শিরোপা না জিততে পারায় এবং ক্লাবের তারকা খেলোয়াড়দের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে ম্যানেজার ভ্যান গাল বার্সা ছাড়ায় একটা অভিভাবক শূন্যতা চলছে তখন ক্লাবে।এদিকে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবেই বেজে উঠেছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দামামা।রিয়ালে লড়ছে সদ্যবিদায়ী লরেঞ্জো সাঞ্জ এবং পঁচানব্বইয়ে সাঞ্জের কাছে হারা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।বার্সায় জোসেপ হুয়ান গ্যাসপার্ত এবং লুইস বাসনেত।
এই ডামাডোলের মধ্যেই বার্সেলোনা শহরের দেয়ালগুলোর কানে আসে ফিগোর রিয়ালযাত্রার গোপন কথা।ফলে নির্বাচনের উত্তেজনার পারদ আরো চড়ে।জুলাইয়ে নেদারল্যান্ডের ইউরো সেমি থেকে বাদ পড়ে ফিরে এসে ফিগো বার্সা সমর্থকদের আশ্বস্ত করে- অন্য ক্লাব নিয়ে যা-ই বলা হোক, লুইস ফিগোর সাথে বার্সেলোনার একটা চুক্তি আছে।আমি এতটা পাগল না যে এমন কাজ করব... সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে আমি ক্যাম্প ন্যুতে পরবর্তী মৌসুম থাকছি।
গার্দিওয়ালা এবং লুইস এনরিকেও সমর্থকদের আশ্বস্ত করে।

পাঁচ বছর আগে পরাজিত পেরেজের পরাজয় এ যাত্রায়ও দূর থেকে দেখা যাচ্ছে।কারণ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সাঞ্জ অনেক সাফল্যই এনে দিয়েছে মাদ্রিদকে।দুইবার লিগ,তারপর আগে এবং সম্প্রতি আবার চ্যাম্পিয়ানস লিগ শিরোপা।কিন্তু মুদ্রার উল্টো একটা পিঠও আছে, যেখানে মাদ্রিদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের ছবি জ্যান্ত। ২৭০ মিলিয়ন ইউরো ঋণে এতটাই অবস্থা ভয়াবহ যে মাদ্রিদকে সুকার, সিডর্ফ, মিয়াতভিচদের মত তারকাকে বেচে দিতে হচ্ছে।ধুরন্ধর ব্যবসায়ী পেরেজ এই ছিদ্রটাকেই লখীন্দরের বাসরঘরে ঢোকার পথ করে।নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করে অর্থনৈতিক এ সংকট সে দূর করবে বিশ্বসেরা সব তারকা দিয়ে গ্যালাকটিকোস দল গড়ে।সমর্থকদের মন পাবার জন্য রিয়াল মাদ্রিদের ৮০,০০০ সদস্যদের মধ্যে গণজরিপ চালায় ‘পাবলিক কাকে চায়’, সেখানে অনুমিতভাবেই প্রথমে আসে ফিগোর নামটি।ফলে সমর্থকদের মন পাওয়াসহ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মূল অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার এক ঢিলে দুই পাখি মারার রাস্তা সমাগত।পেরেজ সবাইকে কথা দেয় নির্বাচিত হলে সে ফিগোকে এনেই ছাড়বে।
অতীতে সুস্টার,লাউড্রপরা তো এসেছে,তবে ফিগোকে আনা কেন আকাশকুসুম কল্পনা হবে- হবে।কারণ... ওই দেখেন সাঞ্জ হাসতে শুরু করেছে, এটাকে পেরেজের স্ট্যান্টবাজী হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেছে। স্ট্যান্টবাজী হবেইবা না কেন, মাদ্রিদ যে তার চক্ষুশূল।আর কাতালান আবহাওয়াও এমন যে ওরা কোন মূল্যেই ওদের সেরা রত্নটিকে হাতছাড়া করবেনা।তাহলে কি হবে মাদ্রিদের স্বপ্নের, আমরা যে ভেবেছিলাম আমাদের স্বপ্ন নির্মাণের জন্য দরকার একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্যবসায়ীর।

পেরেজের চেয়ারে বসা যে কতখানি অবাস্তব সম্ভাবনা সেটা ফিগো এবং তার এজেন্টেরও অজানা নয়। তাই পেরেজ যখন প্রি-কন্ট্রাক্ট অফার নিয়ে আসে, তলে তলে চলতে থাকা কর্তৃপক্ষের সাথে চুক্তি নিয়ে চাপান-উতোরে নতুন একটা বুস্ট দেয়ার সুযোগ ফিগোর চোখে চকচকিয়ে ওঠে। পেরেজকে চুক্তির ঘুঁটি বানাতে চায় সে।এদিকে বাজিকর পেরেজও হয়ত জানে ফিগোর সাথে বার্সা কর্তৃপক্ষের চুক্তি নিয়ে ঝামেলার খবর।তাই প্রি-কন্ট্রাক্ট টোপটা যে ফিগো অবস্থার কারণে গ্রহণ করবে এটা হয়ত তার জানা থাকে।পেরেজও কি তাহলে ফিগোকে নির্বাচনে জেতার ঘুঁটি বনে নিয়ে যায়না?

প্রি-কন্ট্রাক্টটা একটু গোলমেলে- পেরেজ নির্বাচিত হলে(যার সম্ভাবনা শুন্যের কোঠায়)ফিগো রিয়ালের সাথে চুক্তি করবে যার জন্য পেরেজ এখনই তাকে ১.৬ মিলিয়ন পাউন্ড দেবে।নির্বাচিত না হলে এই টাকাটা ফিগোর পকেটেই থেকে যাবে।আর চুক্তি ভঙ্গ করলে ফিগোকে ১৯ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করতে হবে।চুক্তির এসব অংক মাথায় ঢোকে না কিছু, বার্সা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী গ্যাসপার্ত তাই বিরক্ত হয়ে বলে, আরে বুদ্ধু বোঝো না কিছুই, ফিগোর লক্ষ্য হল বসে বসে টাকা কামান এবং বার্সায় থাকা।

তাহলে আমাদের হাতে থাকে সমর্থকদেরকে দুইজনের দেয়া কথা আর একে অন্যকে ঘুঁটি বানানোর চাল।

প্রি-কন্ট্রাক্টে স্বাক্ষর দিয়েই এজেন্ট হোসে ভিয়েগাকে প্রেসিডেন্ট নুনেজ আর গ্যাসপার্ত ও বাসেতের কাছে পাঠায়- আমাদের কাছে পেরেজের কাছ থেকে এই অফার আছে। তবে ফিগোর সাথে বার্সা সন্তোষজনক চুক্তি করলে সে এখানেই থাকবে।
এদিকে বাইরে প্রি-কন্ট্রাক্টের কথা কার কাছে স্বীকার করা যায়না কারণ ঘরের কথা কি জনে জনে শুনিয়ে বেড়াতে হবে? আর স্ট্যান্টবাজীর অভিযোগে পেরেজ শুনিয়ে দেয়- ফিগো চুক্তি ভঙ্গ করলে তার কাছ থেকে ১৯ মিলিয়ন আদায় করা হবে যা দিয়ে আসছে গোটা মৌসুম সমর্থকদের মুফতে মাদ্রিদের খেলা দেখান হবে।
যাইহোক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা আশ্বস্ত করে ফিগোর ব্যাপারে ভবিষ্যতে তারা ভেবে দেখবে। গ্যাসপার্ত সমর্থকদের বলে- আমার একটা পরিকল্পনা আছে ফিগোকে নিয়ে যেটা আমি এখনই খোলসা করছি না।কিন্তু এটা ফিগোকে বার্সায় রাখবে।
এই ভরসাতেই কাহিনী গড়িয়ে পড়ে জমে একটি ধোয়াটে দিন ১৬ জুলাইতে।প্রাতরাশের টেবিলে টিভির নিউজ বুলেটিন থেকে ছোড়া একটি বুলেট- প্রেসিডেন্টের চেয়ারে পেরেজের বসার খবর, ফিগোর চোখে সকালকে সন্ধ্যা বানিয়ে দেয়।কী!এও কি সম্ভব!ফিগোর বিশ্বাস হয়নি। পেরেজের বোর্ডের অন্যতম ডিরেক্টর ক্যালদেরন জানাচ্ছে প্রথম দুই-তিন দিন মাদ্রিদের কারও বিশ্বাস হয়নি!
এরপর পালিয়ে লিসবন, হোসে ভিয়েগার অফিস, নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে প্রবেশ, দশ জনের তার চোখকে গিলে ফেলা-

রাজী হয়ে যাও ফিগো ট্রয়ের জন্য লড়তে।

রাজী হওয়া মানে দেবতার মৃত্যু।কিন্তু বিপরীতে ভিয়েগা বিপদে পড়বে, তাইনা?ফোনটা তুলে নেয় ফিগো, ওপাশে প্রেমিকা- হ্যালো হেলেন,হ্যা আমি রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাচ্ছি।আর বার্সেলোনায় ফিরছি না।
এরই সাথে বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে বার্সেলোনায় থাকা ফিগোর জাপানি সুশি রেস্টুরেন্ট।

শেষপর্যন্ত এই দলবদলটা ঠেকাতে পারত পরের সপ্তাহেই বার্সা প্রেসিডেন্ট হওয়া গ্যাসপার্ত।কিন্তু তার জন্য তাকে ১৯ মিলিয়ন খসাতে হত যা তাদের দলবদলের ইতিহাসের পঞ্চম সর্বোচ্চ, তাও আবার নিজেদের খেলোয়াড়ের জন্য!তার চেয়ে বড় ব্যাপার টাকাটা দিয়ে মাদ্রিদের সমর্থকরা ফাও খেলা দেখবে!রিয়াল ফ্যানদের তাদের নিজেদের খেলা দেখানোর জন্য আমি টাকা দেব?-গ্যাসপার্ত বলে- আমি মারা যাব তাহলে।তারা যে চুক্তি করেছে সেটা সম্পূর্ণ নীতিবিবর্জিত।ফিগো ভাবে টাকাই জীবনে সব।

আরেকবার ভিক্টিম বার্সেলোনা।সেই ফার্দিনান্দের সাথে ইসাবেলার বিয়েতে মাদ্রিদের অধীনস্ত হবার পর থেকে শুধু বার্সেলোনাই তো ভিক্টিম।আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে দলে টানার সময়ও তো বার্সাই ভিক্টিম।শুধু আমরাই কেন ভিক্টিম হব জনগণের কাছে এ প্রশ্নটা রাখে মিডিয়া।শুধু আমরাই কেন ভিক্টিম হব- জনগণে সমভাবে পরিবাহিত হয়ে ২০০০ বা ২০০২-এ ন্যু ক্যাম্পে লাখখানেক স্বরতন্ত্রীর স্বরের আঘাতে ভেঙ্গে ফেলে আকাশ।

লুইস এটা ডিজার্ভ করে না।সে এখানে সব কিছু দিয়েছে- ডিফেন্ডার ক্যাম্পো মাথা নাড়ে যখন ২০ মিনিটের মূলতবির পর গোলহীন ড্রতে শেষ হওয়া ম্যাচে ক্যামেরায় আবিষ্কৃত ফিগোর দিকে ছুড়ে মারা বর্জ্যে কোচিনেল্লোর মাথা বা শূকরছানার মাথা। ছি ছি পড়ে যায় চারদিকে। পরদিন মাদ্রিদ মুখপত্র মার্কায় হেডলাইন- ডার্বি অফ শেম।এএস উগ্রপন্থী কাতালান সমর্থকদের আদলে লেখে- ব্রোংঙ্কস ন্যু।

কিন্তু দোষটা কার-আমরা এখানে ভিলেন নই- গ্যাসপার্তের মাথা ডানে-বামে নড়ে। বার্সা মুখপত্র এল মুন্দো দেপোর্তিভো লেখে, ফিগোই উত্যক্তকারী, দ্য ম্যান হু পয়জনড দ্য ডার্বি।বার্সা ডিরেক্টর ব্রুগুয়েরাস সাফ জানায় ফিগো তো দুই বছর ধরেই আমাদের ফ্যানদের উত্যক্ত করে আসছে।জাভি নিচু স্বরে বলে সে কর্নারটা না নিতেই পারত।নিচু স্বরের উপরই চড়ে বসে ভ্যান গালের চড়া স্বর-ফিগোই দর্শকদের উত্যক্ত করেছে।সে কর্নার নিতে অনেক আস্তে হেঁটে গেছে, বোতল তুলেছে...।ভ্যান গালের কথাটা বিস্ময় ছড়িয়ে দেয় ফিগোর মুখে- কী সে এ কথা বলেছে!বার্সায় থাকতে তো কোনদিন বলেনি।অথচ আমি কয়েকবারই তার চাকরি বাঁচিয়েছিলাম।বিস্ময়টা সংক্রামিত মিঙ্গুয়েল্লার চোয়ালেও, শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারি শূকরের মাথা ছোড়া বার্সা সমর্থকদের কাজ নয়।বার্সেলোনায় তো কেউ কোচিনিল্লো খায় না।

তাহলে এটা কাদের কাজ?

তোর কি এখনও ফিগোকে জুডাস মনে হয় না?এবং আপনার?
রুম্মান প্রশ্ন ছোড়ে।প্রশ্নে শাখারীবাজারের রাত ডানা ঝাপটায়।আমরা নারায়ণদার চায়ের স্বাদ শুষে নিই।আমাদের রক্তে দেশপ্রেমের একটি সরীসৃপকে আন্তরিক করি- সরীসৃপ কি পোষ মানে?
এ এলাকা বা শহরকে নিয়ে গঠিত এই প্রাগৈতিহাসিক গল্পগুলো পড়তে পড়তে আমার কেবলি মনে হয়, এটা বার্সেলোনা নয় তো?

পরিশিষ্টঃ বিশৃংঙ্খলা এবং ক্লাব প্রেসিডেন্টের ম্যাচ পরবর্তী বক্তব্যের জন্য ২০০২-এর এল ক্ল্যাসিকো পরবর্তী দুই ম্যাচের জন্য ক্যাম্প ন্যুতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।পরবর্তীতে অবশ্য জরিমানা দিয়ে পার পায় বার্সা কর্তৃপক্ষ।

-পার্থ পিউস রোজারিও


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

অনুগ্রহ করে যতিচিহ্নের পর একটি স্পেস দিন। নইলে লেখা পড়তে সমস্যা হয়। ধন্যবাদ।

পার্থ পিউস রোজারিও এর ছবি

এখন কি সংশোধন করা সম্ভব?

হিমু এর ছবি

অতিথি লেখকেরা প্রকাশিত লেখা আর সম্পাদনা করতে পারেন না। পরবর্তী লেখায় যদি এ ব্যাপারটা একটু দেখেন, পাঠকের জন্যে সুবিধা হয়।

পার্থ পিউস রোজারিও এর ছবি

ঠিক আছে।

অতিথি লেখক এর ছবি

দুর্দান্ত আঁকার হাত আপনার। একটু একটু করে ছবিটা ফুটে উঠলো চোখের সামনে। ভালো থাকবেন।

---মোখলেস হোসেন।

পার্থ পিউস রোজারিও এর ছবি

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।আপনিও ভাল থাকবেন।

কর্ণজয় এর ছবি

বাহ্! সুন্দর বিন্যাস। তথ্য, কল্পনা, ব্যাখ্যা ও প্রতীক-- সবকিছু মিলিয়ে যে ছবি, সত্যি সুন্দর। লেখাটা ছবিই হয়ে উঠেছে।।।

পার্থ পিউস রোজারিও এর ছবি

মন্তব্যের এর জন্য ধন্যবাদ। সত্যি বলতে নতুন লেখকদের সম্পাদনা করার কোন সুযোগ না থাকায় লেখাটায় অনেক খুঁত রয়ে গেল। সচল সম্পাদকদের এদিকটা নিয়ে ভাবা দরকার বলে মনে করি কারন সবচেয়ে বেশি সম্পাদনা- সংশোধন দরকার পড়ে নবীন লেখকদেরই।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA