পিচ্চিতোষ গল্প ০৯: দাদিভাইয়ের বাগান

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: শনি, ১৬/০২/২০০৮ - ৪:১৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বাবুনের দাদিভাইয়ের খুব বাগানের শখ। কিন্তু বাবুনরা থাকে চারতালার ওপরে। ছাদে উঠতে গেলে আরো দু'তলা টপকাতে হবে দাদিভাইকে, আর নিচে তো কোন জায়গাই নেই, গোটাটাই বাড়ি। ঢাকায় একটা শুষ্কংকাষ্ঠং বাড়িভরা গিজগিজে এলাকায় থাকে বাবুনরা। বাবুনের ঘরের জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরূম আর আধখানা ডাইনিং রূম দেখা যায়, আর অনেক কষ্ট করে ঘাড় বাঁকা করলে কার্নিশ এড়িয়ে এক চিলতে আকাশ চোখে পড়ে। রান্নাঘর থেকে অনেকখানি আকাশ দেখা যায় বটে, কিন্তু সেখানে অনেকদিন ধরে একটা ছয়তালা বাড়ির কাজ চলছে, বাবুন তাই রান্নাঘরের জানালা দিয়েও কিছু দেখে না।

বারান্দায় দাঁড়ালে কিছুটা আকাশ চোখে পড়ে। একটা বড়সড় আম গাছ আছে পাশের বাড়িতে, সেখানে একটা কাকের বাসাও আছে। উল্টোদিকে গুল্টুদের বাসা দেখা যায় বারান্দায় দাঁড়ালে, গুল্টুর বাবা সেখানে মাঝে মাঝে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খান।

বাবুন বারান্দায় গেলেই দাদীভাইয়ের বাগানের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। কী নেই সেখানে? মস্তবড় এক টবে ঝাকড়া একটা কাঁচামরিচের গাছ, তাতে মরিচ পেকে টুকটুকে লাল হয়ে ঝুলতে থাকে। পাশের টবেই আছে একটা ধনেপাতার গাছ। তার পাশে একদম জঙ্গুলে একটা সুগন্ধী পাতার গাছ। তারপাশে একটা মেহেদি গাছ।

বাবুনের দাদীভাই সবকিছুরই খুব যত্ন করেন। বাবুন একদিন ভোরবেলা বারান্দায় গিয়ে দেখে, মরিচগাছে সাদা জাল বাঁধা। দাদীভাই গাছে পানি দিচ্ছিলেন প্লাস্টিকের মগ দিয়ে, বাবুন জিজ্ঞেস করে জানলো, চড়ুই পাখি মরিচ গাছের বাচ্চা মরিচগুলোকে খুঁটে খুঁটে খেয়ে ফেলে বলেই এই জাল দিয়ে গাছটাকে বাঁচানো হচ্ছে। বাবুন অবশ্য মাঝে মাঝে বারান্দায় চাল ছড়িয়ে রাখে চড়ুইপাখিগুলির জন্য, কিন্তু এ কথা সে আর দাদীভাইকে বলেনি।

বাবুনের বন্ধু ঝুমঝুমের মা-ও বারান্দায় বাগান করেন, কিন্তু ঝুমঝুমদের বাড়ির বারান্দা অনেক বড়, আর সেখানে মস্ত সব ফুলের গাছ। ঝুমঝুমদের বাড়িতে গেলে বাবুনের খুব ভালো লাগে, কেমন মস্ত বড় বড় ওদের ঘরগুলো। ঝুমঝুমের মা খুব নরম গলায় কথায় বলেন, মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলেন, "বাবুরা, তোমরা খেলা করো, কিন্তু ফুলের গাছকে ব্যথা দিও না কিন্তু!"

বাবুন দেখেছে, কেউ ঝুমঝুমদের বাড়িতে বেড়াতে গেলে ঝুমঝুমের মা খুব উৎসাহ করে নিজের বাগান দেখান। "এই যে, এটা হচ্ছে সেই ফুলের গাছটা, যেটা ঝুমঝুমের বাবা নেপাল থেকে নিয়ে এসেছিলো। আমি অনেক ক্যাটালগ ঘাঁটলাম, কিন্তু এটার ছবিও দেখিনি, নামও খুঁজে পাইনি। ঝুমঝুমের বাবা এর নাম দিয়েছে ঝালবেগুন ফুল। আপনিই বলুন, এরকম মিষ্টি হলুদ ফুলের নাম ঝালবেগুন রাখার কোন মানে আছে? আর বেগুন কখনো ঝাল হয় ...?"

বাবুন একদিন মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলো, "আমার দাদীভাইও বারান্দায় বাগান করেছেন!"

ঝুমঝুমের মা বললেন, "তাই নাকি? কী কী ফুল আছে সে বাগানে?"

বাবুনের মুখটা একটু শুকিয়ে গিয়েছিলো। দাদীভাইয়ের তো ফুলের বাগান নেই, শুধু খাবার জিনিসের বাগান। বাবুন আমতা আমতা করে বলে, "অনেক ফুল, নাম জানি না তো।"

ঝুমঝুমের মা বলেন, "তুমি তোমার দাদীভাইকে জিজ্ঞেস কোরো, তিনি তোমাকে ফুলের নাম শিখিয়ে দেবেন। আর চলো, আমার বাগানের ফুলগুলোকে চিনিয়ে দিই। ... এই যে দেখছো, এটার নাম দুর্বারাণী, দেখেছো কী সুন্দর নীল ছোট ছোট ফুল ...?"

বাবুন বাড়ি ফিরে গম্ভীর হয়ে থাকে। দাদীভাই জঙ্গুলে সুগন্ধী পাতা কাঁচি দিয়ে কেটে চা বানিয়ে খান, কিন্তু সেটাতে কোন ফুল ধরে না। ধনে পাতার গাছে যে ফুল ধরে তা চড়ুইয়ের চোখে পড়লেও মানুষের চোখে দেখা মুশকিল। মেহেদি গাছে শুধু পাতা হয়। মরিচ গাছের ফুল নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। বাবুনের মনটা খারাপ হয়ে যায়।

ঝুমঝুমের মা একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবুনকে বলেন, "চলো বাবুন, তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিচ্ছি। তোমার দাদীভাইয়ের বাগানটাও দেখে আসি।"

বাবুন খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। ঝুমঝুমের মা তো গিয়ে কোন ফুল দেখতে পাবেন না, মরিচ দেখতে পাবেন অবশ্য। কিন্তু মরিচ তো ফুল না, পেকে যত লালই হোক না কেন। বাবুন যে মিথ্যা কথা বলেছে, তা তো আজ ঝুমঝুমের মা জেনে যাবেন।

ঝুমঝুমদের আইসক্রীমের মতো ঠান্ডা গাড়িটার ভেতরে বসে বাবুনের ছোট্ট হৃৎপিন্ড ধুকধুক করতে থাকে।

ঘন্টা বাজাতই বাবুনের দাদীভাই খুব যত্ন করে ঝুমঝুমের মা-কে ডেকে নিয়ে যান। "তুমিই বাবুনের বন্ধু ঝুমঝুমের মা? কী মিষ্টি একটা মেয়ে তুমি! ঝুমঝুমও এসেছে দেখি। বসো বসো। দাঁড়াও তোমাদের হালুয়া খেতে দিই।"

ঝুমঝুমের মা বলেন, "খালা, আপনার বাগান দেখতে এসেছি। বাবুন বলছিলো আপনি নাকি বারান্দায় বাগান করেছেন?"

বাবুনের দাদীভাই হাসেন এ কথা শুনে। বলেন, "বাবুন বললো এ কথা? হুমম! আচ্ছা দেখাচ্ছি বাগান। বসো।"

বাবুন মুখ শুকনো করে নিজের ঘরে গিয়ে , বাবাকে নকল করে পায়চারি করে কিছুক্ষণ।

বাবুনের দাদীভাই দুটো চীনামাটির ছোট্ট প্লেটে হালুয়া নিয়ে ঝুমঝুম আর ঝুমঝুমের মা-কে খেতে দেন। তারপর নিজের ঘর থেকে একটা অ্যালবাম এনে দেখাতে থাকেন।

"এই যে, আমার বুলু। এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এই যে, রাজশাহীতে ছিলাম তখন।
দ্যাখো বুলু কত দুষ্টু ছিলো, বারান্দার গ্রিল বেয়ে উঠে বাঁদরামো করছে। ... আর এই যে আমার আরেক ছেলে টুনু, এখন তো বাড়িতেই থাকে না, ছেলেবেলায় খুব ভীতু ছিলো, বাড়ির বাইরে বেরোতেই ভয় পেতো, এই যে দ্যাখো খেলার মাঠে গিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে। ওর কাকা কোথায় যেন যাচ্ছিলো ক্যামেরা নিয়ে, দেখতে পেয়ে ছবি তুলে রেখেছে। ... আর এই যে, বাবুনের বাবা, কাঠের তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করছে ওর মামার সাথে ...।"

বাবুন ছবিগুলো অনেক বার দেখেছে, দেখে আসছে সেই ছোট্টবেলা থেকে। বুলু কাকার আরো অনেক ছবি আছে আরো অ্যালবামে, টুনু কাকারও। দাদীভাইয়ের আলমারির ড্রয়ারে আরো অনেকগুলি পুরনো অ্যালবাম, সেখানে আরো আরো ছবি।

ঝুমঝুমের মা মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখে টুকটুক করে হালুয়া ভেঙে খেতে থাকেন। ঝুমঝুম বাবুনকে ভ্যাংচায়।

ছবি দেখা শেষ হলে ঝুমঝুমের মা বলে, "খালা, আপনার বাগানে কী কী ফুল আছে?"

বাবুনের দাদীভাই হাসেন। বলেন, "আছে একটা ফুল। আসো, দেখে যাও।"

বাবুন অবাক হয়ে যায়। দাদীভাইয়ের বাগানে আবার ফুল কোথায়?

বারান্দায় গিয়ে বাবুন অবাক হয়ে যায়। মস্ত একটা সাদা ফুল ফুটে আছে, তার পাশে আরেকটা মাঝারি ফুল। কী ফুল এটা?

জানতে চান ঝুমঝুমের মা-ও। "ও মা, কী সুন্দর! এটা কী ফুল? কোথায় পেলেন?"

বাবুনের দাদীভাই হাসেন শুধু।

ঝুমঝুমের মা কাঁচামরিচ, ধনে পাতা, মেহেদি আর সুগন্ধী পাতার গাছও দেখেন মন দিয়ে। দাদী ভাই কিছু মেহেদি পাতা ছিঁড়ে একটা খামে ভরে দেন ঝুমঝুমের হাতে।

ঝুমঝুম আর তার মা চলে যাবার পর বাবুন দাদীভাইয়ের হাত ধরে বলে, "দাদীভাই, এটা কী ফুল?"

দাদীভাই হাসতে থাকেন। বলেন, "এটা পেঁয়াজের ফুল! তুই লোকজনকে এই বাগানের কথা বলে বেড়াস? ছি ছি ছি!"

দাদীভাই হাসতেই থাকেন। বাবুন হাসে না। সে বুঝতে পারে, যতই যত্ন করুক না কেন, বারান্দার বাগানটার দিকে দাদীভাইয়ের তেমন টান নেই। দাদীভাইয়ের বাগানটা আছে তাঁর আলমারিতে, ঐ পুরনো অ্যালবামগুলোর মধ্যে।


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

ওয়াও! খুব ভাল লেগেছে এই লেখাটি।
আপনার চিরাচরিত ভংগীর ব্যতিক্রম।

-জাহিদ হোসেন
_________________________________
যতদূর গেলে পলায়ন হয়, ততদূর কেউ আর পারেনা যেতে।

দ্রোহী এর ছবি

শেষের লাইনটাই আসল। পিচ্চিতোষ গল্পের পুনরাগমন দেখে খুশী হলাম। হাসি


কি মাঝি? ডরাইলা?

সৌরভ এর ছবি

উহু, নির্বাসিত, এইটাই এই লোকের আসল ধারা।
আমি ঠিক করেছি, হিমুভাই বাচ্চাতোষ গল্পের কোন বই বের করলে আমি সেটা স্পন্সর করতে রাজি আছি।

কেমন যেন মন ভালো হয়ে যায়, গল্পের শেষে।


আমি ও আমার স্বপ্নেরা লুকোচুরি খেলি


আবার লিখবো হয়তো কোন দিন

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

চলুক

নিঘাত তিথি এর ছবি

অতি চমৎকার। শেষ লাইনে পুরা বাজিমাত।
----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

হিমু এর ছবি

সবাইকে ধন্যবাদ। পিচ্চিতোষ গল্পের সীমিত পাঠকগোষ্ঠীর ভালোবাসাটুকু অনুভব করতে পারছি খুব করে, আর সৌরভকে বলি, এই গল্পগুলো লেখার পরও খুব ভালো লাগে। আশা করছি মাঝে মাঝেই লিখতে পারবো। সচলের পিচ্চি পাঠক না থাকলেও, পাঠকদের পিচ্চি আছে, পাঠকদের ভেতরেও পিচ্চি আছে একটা একটা করে, তাদের কাছে গল্পগুলি পৌঁছে গেলেই হয়।


হাঁটুপানির জলদস্যু

সৌরভ এর ছবি

আমি একজন পিচ্চি পাঠক। হাসি


আবার লিখবো হয়তো কোন দিন

আরিফ জেবতিক এর ছবি

পিচ্চিতোষ গল্পের ব্যাপক পাঠক বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রত্যেক সচলের ঘরে " ছেলে হোক , মেয়ে হোক , দুইটা পিচ্ছিই যথেষ্ঠ " হয়ে আসুক ।

যুধিষ্ঠির এর ছবি

আগে পড়িনি। কি চমৎকার গল্প একটা! পিচ্চিতোষ গল্প আর লেখা হয় না এখন?

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

এটা আমি পড়সিলাম সচলায়তন সংকলনে। জটিল- শেষ লাইনের আগ বুঝতেই পারি নাই এই গল্পের বক্তব্য কী...

-------------------------------------------------------------
মধ্যরাতের কী-বোর্ড চালক

অতিথি লেখক এর ছবি

এই গল্পটা আমার খুব ভাল লেগেছে!


ছেড়া পাতা
ishumia@gmail.com

তিথীডোর এর ছবি

এই সিরিজটা এত্তো ভাল্লাগে...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।