প্রবাসে দৈবের বশে ০১২

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: শুক্র, ২৬/১০/২০০৭ - ৪:২৫পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


আজ কেবল বক্তৃতা শোনার ছিলো। ইথিওপিয়ার নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থার সাম্প্রতিক অবস্থা ও সম্ভাবনা নিয়ে বক্তৃতা দিলেন আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর-ইঞ্জ. আসেফা। ড. আসেফা ইংল্যান্ডে মাস্টার্স করেছেন, প্রোমোৎসিওন (ডক্টরেট) করেছেন জার্মানীর বাঘা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এরভেটেহা আখেন থেকে। তিনি আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর একটি মাস্টার্স পর্যায়ের কোর্স প্রণয়ন করতে চান, এ ব্যাপারে নানা সহযোগিতা দেবে কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়। কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপশক্তিপ্রকৌশল বিভাগ এই বক্তৃতার আয়োজন করেছে, ড. ফায়েন তাঁর স্বভাবসুলভ খসখসে গম্ভীর গলায় জানালেন, ড. আসেফা যদিও জার্মান ভালো জানেন, কিন্ত সমস্যা হচ্ছে তিনি ইংরেজি আরো ভালো জানেন, তাই বক্তৃতাটা দেবেন ইংরেজিতে। তবে বক্তৃতার পরে জার্মান ভাষায় এক দফা আলোচনা হবে। ড. আসেফা তাঁর ল্যাপটপের সাথে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর জুড়তে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছিলেন, তিনি কাজ ফেলে হাঁ হাঁ করে উঠলেন, নে, আউফ এংলিশ! ড. ফায়েন মুচকি হেসে বললেন, দুঃখিত, অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলছি ছাত্রদের।

ড. আসেফার বক্তৃতা শুনে খুব তৃপ্তি পেয়েছি বলা চলে না, ভদ্রলোকের প্রেজেন্টেশন কিছুটা তথ্যঅপ্রতুলতায় ভুগছিলো, আর মসৃণ প্রেজেন্টেশন হয়নি মোটেও। জার্মানরা যে কোন জিনিসের পরিমাণগত ব্যাপারে সবসময় খুব যত্নবান, কোন যন্ত্রের নকশা প্রেজেন্টেশনে ব্যবহার করলে সেটার মাপজোক সবসময় লেখা থাকবে। প্রশ্নোত্তর পর্বে এসে ড. আসেফা একটু হিমসিম খেয়ে গেলেন, কারণ অনেক প্রশ্নের উত্তরই তিনি জানেন না। আমি জানতে চেয়েছিলাম ইথিওপিয়ার কতভাগ লোকের আয়ত্বে ইলেকট্রিসিটি আছে, তিনি বেশ কিছুক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে জানালেন, তাঁর সঠিক জানা নেই, তবে ২% হতে পারে, এর বেশি হবে না। জার্মান ছাত্ররা কয়েকজন দুর্দান্ত ইংরেজি জানে, তবে বেশিরভাগের ইংরেজিতে কিছু সমস্যা আছে, যেমন আমার জার্মানে আছে আর কি, সেই ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতেই কয়েকজন তর্ক শুরু করে দিলো। ড. ফায়েন কঠিন হেসে বললেন, কোন সমস্যা না, এ ব্যাপারে আমরা পরেও আলোচনা করতে পারি। ব্যস, তর্ক আবার শুষ্ক ভদ্রতার সীমার মধ্যে ফিরে এলো।

ইথিওপিয়া বাংলাদেশের মতোই রাজনীতি আক্রান্ত দেশ, সেখানে মন্ত্রীমিনিস্টারদের সাথে ওঠবোস থাকলে অনেক কিছু সম্ভব, ড. আসেফার কথা থেকে বোঝা গেলো। ৭০০ মেগাওয়াটের মতো জলবিদ্যুৎশক্তি আছে এখন, তবে ২০ থেকে ৩০ গিগাওয়াট পর্যন্ত নাকি সেটাকে বাড়ানো সম্ভব। অনেকগুলি ছোট ইউনিট না বানিয়ে কয়েকটা বড় ইউনিট বানাতে আগ্রহী সরকার (কারণ বোঝা সহজ, একসাথে অনেক পয়সা নয়ছয় করা যাবে, আমাদের গন্ডার ব্যানাহুদার ম্যাগনেটিক ট্রেনের মতো)। এছাড়া সৌর বিদ্যুৎশক্তিও বেশ প্রতিশ্রুতিশীল, কিন্তু এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি গবেষণা ছাড়া। গবেষণার দশাও খুব একটা ভালো নয়। তবে ইথিওপিয়ায় কফিবীজ শুকানোর জন্য সৌরশুষ্ককারক ব্যবহার করা হয়। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশে বায়ুচিত্র বেশ ভালো, সেখানে বায়ু আর পানির বার্ষিক প্রোফাইল বেশ ইন্টারেস্টিং, একটা কমলে আরেকটা বাড়ে, কাজেই দুটোর খিচুড়ি বানালে বেশ কাজে দেবে। ইথিওপিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম গবাদিপশুর দেশ, ড. আসেফা অকপটে জানালেন, এই পশুর গু না থাকলে ইথিওপিয়াও থাকতো না, কারণ গোটা দেশে বন প্রায় উজাড় হয়ে গেছে, গত পঞ্চাশ বছরে ৩৫% থেকে ৫% এ নেমে এসেছে বনভূমি। ইথিওপিয়ায় ১১ লক্ষ বর্গকিলোমিটারে ৭৮ মিলিয়ন লোক বাস করে, সরকার বাহাদুর হুকুম জারি করেছেন, প্রত্যেককে একটা করে গাছ লাগাতে হবে। আমি মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদায় পড়েছিলেম, ইথিওপিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় মেনেসিস নাকি রাজধানী ঘিরে শুধু ইউক্যালিপ্টাস লাগিয়েছিলেন, আদ্দিস আবাবা শহরটাই নাকি ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধে ভরা। মনে পড়ে গেলো জ্যারেড ডায়মন্ডের কোল্যাপ্সের কথা, অপরিকল্পিত বনায়নও মানুষের অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে ইউক্যালিপ্টাসের মতো পানিখোর গাছ। অবশ্য এ নিয়ে ড. আসেফার সাথে পন্ডিতি করার দুশ্চেষ্টা করিনি।

তবে একটু বিস্মিত হয়েছি ড. আসেফার প্রস্তুতির অভাব দেখে। সম্ভবত তিনি একেবারেই গাণিতিক প্রয়োগের দিকটা দেখেন, প্রেজেন্টেশনের ব্যাপারে তাই কিছু কাঁচা জায়গা রয়ে গেছে। এদিকে আমার সামনে একটা বক্তৃতা দিতে হবে এক কোর্সে, ড. আসেফার অবস্থা দেখে আমিও রীতিমতো শঙ্কিত। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় একটা কাঁচা কাজ করেছে ছাত্রদের নিয়ে, প্রেজেন্টেশনের ওপর কোন গুরুত্ব দেয়নি। দীর্ঘ আন্ডারগ্র্যাড জীবনে আমি ক্লাসরুমে কোন প্রেজেন্টেশন করিনি, আমার প্রেজেন্টেশন দক্ষতা নেই বললেই চলে, যৎসামান্য যা আছে তা বিভিন্ন তৎপরতার সূত্রে।

আমি এখন ফাটিয়ে প্রেজেন্টেশন পেপার বানাবো ঠিক করছি। লম্বু জামুয়েলকে মুরগি হিসাবে পাকড়াও করবো, ওর প্রশ্নগুলিকে সম্ভাব্য ধরে নিয়ে সেগুলির ওপর প্রস্তুতি নেবো। বসে বসে হ্যাজাবো না।


মন্তব্য

দ্রোহী এর ছবি

আমি এখন ফাটিয়ে প্রেজেন্টেশন পেপার বানাবো ঠিক করছি। লম্বু জামুয়েলকে মুরগি হিসাবে পাকড়াও করবো, ওর প্রশ্নগুলিকে সম্ভাব্য ধরে নিয়ে সেগুলির ওপর প্রস্তুতি নেবো। বসে বসে হ্যাজাবো না।

লাভ নাই। সবার সামনে খাড়াইলে বাংলা, ইংরেজী, জার্মান - সবকিছুই গুলিয়ে যাবে।

তবে এই বিজ্ঞাপনটা কিছুটা উপকারে আসবে।


কি মাঝি? ডরাইলা?

ইশতিয়াক রউফ এর ছবি

Coupling -এর একটা এপিসোডে এটা নিয়ে মজা ছিল। জেফ-কে বলা হয়েছিল ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যদের নগ্ন কল্পনা করতে, তাহলে সাহস পাবে। বোর্ড রুমে ঢুকে বেচারে দেখে বিশাল এক আয়না। উলটা নিজেকে এত বড় আয়নায় বিবস্ত্র কল্পনা করে ব্যাটার ইন্টারভিউটা গেল।

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

দীর্ঘ আন্ডারগ্র্যাড জীবনে আমি ক্লাসরুমে কোন প্রেজেন্টেশন করিনি, আমার প্রেজেন্টেশন দক্ষতা নেই বললেই চলে, যৎসামান্য যা আছে তা বিভিন্ন তৎপরতার সূত্রে।

পোলায় কয় কি? আমাগো তো তিনটা বড় বড় ক্লাসরুম প্রেজেন্টেশন ছিল। আর বোর্ড ভাইভা হইছিল দুইটা। তখন চরম বিরক্তি লাগত। এখন মনে হয় দারুন হইছিল সেইটা।

একসেন্টের সমস্যা চরম বিরক্তিকর। সময় নিয়া কথা বইলো। ডোন্ট রাশ। আর স্লাইডগুলার মধ্যে কানেকশন রাইখো। নাইলে দর্শক খেই হারায় ফেলবে।

আমার আরেকটা সমস্যা হচ্ছিলো। সেইটা হলো সব কিছু খুব উপর দিয়া, হালকা করে উপস্থাপন করা। ভাবছিলাম দর্শক তো বুঝবে না। কিন্তু আসলে টার্গেট অডিয়েন্সের উপযোগী প্রেজেন্টেশন করাটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্লগে যতটুকু গভীরে যাওয়া দরকার তারচেয়ে অনেক বেশী গভীরে যেতে হবে স্পেশালাইজড গ্রুপে কথা বলার সময়।

গুড লাক।

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

হিমু এর ছবি
আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

ক্লাস থেকে মাঠে বেরুবেন কবে?

ইরতেজা এর ছবি

ইথিওপিয়া নিয়ে এত কিছু জানতাম না

_____________________________
টুইটার

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।