ডিমাতংক

ঝরাপাতা এর ছবি
লিখেছেন ঝরাপাতা (তারিখ: সোম, ১৭/১২/২০০৭ - ২:০৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

জলাতংক, বোমাতংক শব্দগুলির সাথে মোটামুটিভাবে সবাই পরিচিত হলেও ডিমাতংকের সাথে পরিচিত এমন লোকের সংখ্যাও নেহায়েত কম হবে না বলেই অধমের ধারণা। একবার কিশোর বয়েসে সুমনের 'পাল্টে দেয়ার স্বপ্ন' ভাইরাসের মতো আমাদের মাঝে সংক্রমিত হলে, পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়ে মঞ্চস্থ করি 'একজন তাহের আলী' নামে একটি স্বরচিত নাটক। নাটকের এক চরম মুহূর্তে নায়ক যখন নায়িকার বাঁধন ছিন্ন করে চলে যাবে সমাজ ভাঙ্গার ডাক দিতে, তখনই ঘটল মহাবিপত্তি। দর্শক সারিতে কোন এক জায়গায় আমাদের নায়ক তাহেরালীর পিতৃদেব বসে ছিল অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে (খুব সম্ভবত: আমাদের নাটকে কাঠ মোল্লাদের আন্ডার এস্টিমেট করাটা উনার সহ্য হচ্ছিলো না বলে)। সেই চরম মুহূর্তে পিতার গরম চাহনিতে ডায়ালগে ভীষম গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলল নায়ক। দৃশ্যপটে তখন তার নজরুলের "বল বীর/ চির উন্নত মম শির/ শির নেহারি আমরি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির ...." আবৃত্তি করার কথা ছিলো। তার বদলে সে আবৃত্তি করলো,

বল বীর,
চির উন্নত মম শির,
শির নেহারি তেহারি দিয়া বানাইয়া খাই ক্ষীর।
(সে সময় কবিতার প্যারোডি করার একটা শখ ছিলো সবার। এটা তারই একটা আউটপুট ছিলো।) সাথে সাথে দর্শক সারিতে তুমুল হারিকেন মাত্রার হাসির ঝড় বয়ে গেলো। আর এদিকে তাহেরালীর মুখ দিয়ে কোন কথাই আর বেরোয় না। এতোক্ষণে বুঝতেই পারছেন তার প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো! জুতা, প্লাস্টিকের বোতল, ঢিল, হতে আরম্ভ করে কাঁচা-পচা ডিমে পুরো মঞ্চ সয়লাব হয়ে গেলো। বেচারা তাহেরালী মঞ্চ ত্যাগ করতে করতে শেষ যে ডায়ালগটা দিয়েছিলো তা হলো, মারবি তো মার, তাই বইলা পচা ডিম? দর্শক সারির হুইসেল আর উল্লাস ধবনিতে যদিও তার কন্ঠস্বর চাপা পড়ে গিয়েছিলো। বিশ্বাস করুন সেই ঘটনার পরে এক সপ্তাহ গৃহবন্দী ছিলাম। কারণ ছিলো ডিমাতংক। নাটকের পাত্র-পাত্রীরা সবাই তখন রাস্তায় বেরুলেই পাবলিকে ডিম ব্লাস্টের শিকার হচ্ছিলো। উফ! কি যে দুর্বিষহ অবস্থা বলে শেষ করা যাবে না।

এতো গেলো আতঙ্ককর বস্তুটির একটি মাত্র প্রয়োগ। এর কিন্তু বহুবিধ প্রয়োগ আছে। কলেজে থাকার সময় একদিন সকালে বন্ধু রাকিব এসে হাজির। বললো- দোস্ত তুই আমারে বাঁচা। আমি বলি, ক্যান, কি হয়েছে তোর? বলে, আমার অবস্থা খারাপ। আম্মার সকাল-বিকাল ডিম আর দুধের জ্বালায় লাইফ শ্যাষ। মনে হয় কয়দিন বাদে আমি নিজেই মুরগী হইয়া যামু। আর খালি কুক্কুরুক কুক, ক্কুকুরুক কুক ডাক ছাড়মু। আমি বলি, তুইতো শালা এমনিতেই ফার্মের মুরগী। ডাক ছাড়লেই কি আর না ছাড়লেই কি! এমন অবস্থা সম্মুখীন কিন্তু অনেকেই আর তাদের কাছে ডিম বস্তুটি একটা মূর্তিমান আতংক। আমার সেই বন্ধুটাকে সেদিন আমি কোন তড়িকা বাতলে দিতে পারেনি। জানিনা, এখনো সে ডিমাতংকের খড়গহস্তে দিনাতিপাত করছে কিনা!

প্রবাসে (সুইডেনে) ডিম বস্তুটা সহজলভ্য, দামও হাতের নাগালে। তাই যাদের ডিমে অ্যালার্জি আছে, তাদের জন্য বড়ই দু:সংবাদ। আমার অবশ্য ডিমে কোন অ্যালার্জি নেই। কিন্তু প্রায় নাস্তাতে ডিম-পাউরুটি খাওয়া হতো বলে মাঝে মাঝে বিরক্তি লাগতো বই কি! আমরা ছিলাম তিনজন, একেক দিন একেজনের রান্না। এর মাঝে শাকিল ভাই নামে আরেকজন উঠলেন আমাদের সাথে (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক)। খুবই চমৎকার একজন মানুষ। আরো মজার ব্যাপার হলো- উনার যেদিন রান্নার ডেট থাকতো আমরা চোখ বন্ধ করে বলতে পারতাম আজকের মেনু কি হবে এবং নিশ্চিতভাবেই তা চিংড়ি ভাজি আর ডিম। উনার সেই ডিম-কারি খেতে খেতে একসময় দেখি আমরা সবাই ডিমাতংকে ভুগছি, অনেকে তো ওইদিন ফাস্টফুড খেয়ে চালিয়ে দিতো।

যা হোক, একদিন শুক্রবারে শাকিল ভাইয়ের রান্নার সিডিউল ছিলো। সেদিন কামরুল ভাই বললেন, শাকিল ভাই আর যাই রান্না করেন আজকে ডিম রান্না কইরেন না (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কামরুল ভাই-এর শুক্রবারের মেনুতে মাছ মাংস থাকা চাই)। শাকিল ভাই ঘোষণা দিলেন, ওকে, আজকে আমি মাংস আর স্পিনাক রান্না করবো। আমার কেন জানি মনে হলো, সে নাটকীয় ঘোষণা দেয়ার সময় উনার মাসলও পপ্যাই-এর মতো ফুলে উঠলো। জুম্মার নামাজ শেষে সবাই একসাথে খেতে বসলাম। কিন্তু নাটকীয় ঘোষণার আসল নাটক যে খেতে বসার পরে টের পাবো তা বুঝতে পারিনি। প্রচুর পরিমাণ মরিচ আর জিরা সদ্ব্যবহারে হাফসিদ্ধ মাংস গলধ:করণের যন্ত্রণা ভুক্তভোগী মাত্রই টের পাবেন। আর এক কড়াই পানির ভেতর ভাসমান স্পিনাক দেখে কেমন জানি আমাশয় আমাশয় লাগছিল। তবে আশংকা যে এভাবে সত্যি হবে তা টের পেলাম আরো এক ঘন্টা পরে যখন পেটে মোচড় দেয়া শুরু হলো।

মোটামুটিভাবে সবারই কম-বেশি 'ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ' এই আপ্তবাক্যের মর্ম অনুধাবন করা হলে কামরুল ভাই কাতর চোখে বিকেলের টেবিলে প্রস্তাব করলেন- শাকিল ভাই, রাতে আর মাংস রান্না কইরেন না, ডিমই চলুক।

আরো দুই জোড়া চোখ পেটে হাত চেপে রেখে টেবিলের আরেক প্রান্ত থেকে কাতর অনুনয় জানাতে থাকলো . . . .


মন্তব্য

শেখ জলিল এর ছবি

মারবি তো মার, তাই বইলা পচা ডিম? ......স্মৃতি রোমন্থনটা দারুণ! মজা পাইলাম।

যতবার তাকে পাই মৃত্যুর শীতল ঢেউ এসে থামে বুকে
আমার জীবন নিয়ে সে থাকে আনন্দ ও স্পর্শের সুখে!

মাহবুব লীলেন এর ছবি

ছোটবেলা আমি মুরগির ডিম ফোটার জন্য পানি পড়া দিতাম

আর ঢাকায় বস্তিবাসী হবার পরে মনে মনে বলেছি- পৃথিবীতে মুরগি ডিম না পাড়তো তাহলে মেসনিবাসি ব্যাচেলর বিশ্বকে নিজেরাই ডিম পাড়ার পদ্ধতি আবিষ্কার করে
আলু-ডিম-ডাল
ডাল-ডিম-আলুর সংসার
চালিয়ে নিয়ে যেতে হতে

ঝরাপাতা এর ছবি

ধন্যবাদ শেখ জলিল।

সহমত লীলেন ভাই। এখনো বিপদে ডিমই ভরাসা।


রোদ্দুরেই শুধু জন্মাবে বিদ্রোহ, যুক্তিতে নির্মিত হবে সমকাল।


বিকিয়ে যাওয়া মানুষ তুমি, আসল মানুষ চিনে নাও
আসল মানুষ ধরবে সে হাত, যদি হাত বাড়িয়ে দাও।

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

সম্ভবত: সমরেশ মজুমদারের 'গর্ভধারীনি'তে ছিল - "আজ রোববার । কল্যাণদের বাসায় সবার আজ মন ভালো, কারণ আজ ডিমের তরকারী রান্না হবে।" হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।