দাতো তুরাশভিলি’র জিনস জেনারেশন-২

জীবনযুদ্ধ এর ছবি
লিখেছেন জীবনযুদ্ধ [অতিথি] (তারিখ: শনি, ০১/০৮/২০২০ - ১২:৫৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

চাচাভাদজে স্ট্রিটের ‘মিত্ত’ নামক যে রেস্তোরাঁয় দাতো আমাকে যেতে বলেছে, সেটি খুঁজে বার করতে রীতিমত গলদঘর্ম হতে হয়। ভুলটা অবশ্য আমারই। দাতো বলেছিল, রেস্তোরাঁটি হার্ডরক ক্যাফের সেকেন্ড ফ্লোরে। হার্ডরক ক্যাফেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। ছোট একটি টিলার গায়ে মাটি কেটে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে গড়া এই ক্যাফে। মার্কিন এই ক্যাফেটিতে খাবারের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সামনের রাস্তায় বিপুল লোকসমাগম থাকলেও ভেতরে কিন্তু একেবারেই সুনসান। ক্যাফেটির পাশ দিয়ে সাবেকি আমলের প্রশস্ত সিঁড়ি। সিঁড়ির প্রান্তে এক ফুল বিক্রেতা কয়েক থোকা ফুল নিয়ে বসেছেন। সেই ফুলগুলোকে সাবধানে এড়িয়ে দ্বিতলে পৌঁছে যে তিনটি ক্যাফের দেখা পাই, তাদের মাঝে কোনটিই মিত্ত নয়। কিন্তু হার্ড রকের সেকেন্ড ফ্লোরেই যে মিত্ত-র অবস্থান, সেটাতো দাতো বার বার করে বলে দিয়েছেন। তাহলে আমার ভুলটা কোথায়?

পথভ্রষ্ট পথিকের মত আমি দোতলার বারান্দায় রেলিংঘেরা স্থানটিতে বেশ কয়েকবার পায়চারি করি। একবার ভাবি, ফিরে যাই। হটাৎ উপরের দিকে তাকাতে গিয়ে দেখি, পাহাড়ের মাথায় আরও এক তল আছে। সেখানে কয়েকটি দোকানের সামনে ঝুলছে সন্ধ্যাবাতি। তখনই বুঝি, কী বোকা আমি। এদেশে তো সেকেন্ড ফ্লোর মানে তৃতীয় তল।

মিত্ত রেস্তোরাঁটি খুব বড় নয়। জনা বিশেক লোকের বসবার ব্যবস্থা। দরজা ঠেলে ঢুকতেই বাঁ দিকে লিকার কাউন্টার। আর ডান দিকে বসবার টেবিল। সেখানে তিনটি টেবিল জোড়া লাগিয়ে জনা সাতেক লোক বেশ জম্পেশ আড্ডায় মশগুল। এদের মাঝে যিনি কোণের দিকের চেয়ারে উপবিষ্ট, তিনি আমাকে দেখেই উঠে এসে করমর্দন করে বলেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই সঞ্জয়?’ তারপর বাকি সবাইয়ের সাথে আমাকে এমনভাবে পরিচয় করিয়ে দেন, যেন আমি তার কতকালের ইয়ার দোস্ত।

টেবিলের মাঝ বরাবর যিনি বসে, তার ভুঁড়ির চাপে টেবিলটি প্রায় উল্টে যাবার উপক্রম। মুখে একগাল দাঁড়ি। পরনে লাল চেকের শার্ট। ব্যক্তিত্বের মাঝে আমুদে ভাব সুস্পষ্ট। তিনি যখন হাসতে থাকেন, তখন টেবিলে রাখা ওয়াইনের গ্লাসে তৈরি হয় সুনামির কম্পন। দাতো আমকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ইনি আমাদের আজকের আড্ডার তামাদা। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকায় ও আমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে। এ ধরণের কোনো আড্ডায় সাধারণত সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ যিনি, তাকে নির্বাচিত করা হয় মধ্যমণি কিংবা নেতা হিসেবে। জর্জিয়ান ভাষায় তিনিই হলেন তামাদা। তামাদা যতক্ষণ আড্ডা চালাবেন ততক্ষণই চালাতে হবে, কেও উঠে যেতে চাইলে তার অনুমতি নিয়ে উঠতে হবে, তিনি কাওকে কিছু খাবার জন্যে অনুরোধ করলে সে অনুরোধ রাখতে হবে। এই যেমন আমাকে দেখেই আমাদের টেবিলের সেই তামাদা ভদ্রলোক প্রথমেই বললেন, ‘পাশের ওই ওয়াইনারির মালিক আমি। এখানে যত পদের ওয়াইন দেখছ, সব আমার কারখানার। তোমার গ্লাসে আমি স্পেশাল একটা হোয়াইট ওয়াইন ঢেলে দিচ্ছি। এই বোতলের সব ওয়াইন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু উঠতে পারবে না। যদি ওঠ, তাহলে ধরে নেব আমাদের ওয়াইন তোমার ভালো লাগেনি।’– এই বলে তিনি টলায়মান শরীর চেয়ার থেকে উঠিয়ে ওয়াইনের জগটি আমার দিকে ঠেলে দেন। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনি। কারণ ভদ্রলোক ইতোমধ্যেই কিছুটা মাতাল। আমিও তার মত গেলাসের পর গেলাস ওয়াইন ঠেলে নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে এই মুহূর্তে বিবশ করতে চাই না। এসেছি দাতো-র সাথে কিছু খোশগল্প আর তথ্য বিনিময়ের জন্যে। সেটাই মূল উদ্দেশ্য। সে-সবের বারোটা বাজিয়ে সুরাজব্দ পদচারনায় হোটেলে ফিরতে চাই না।

দাতো মনে হয় আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারে। ও আমার গ্লাসে খানিক ওয়াইন ঢেলে কিঙ্কালির একটি বিরাট প্লেট আমার দিকে এগিয়ে দেয়। কিঙ্কালি হল জর্জিয়ান ডাম্পলিং। ওরা নানাভাবে ওটা বানায়। কখনো ভেতরে দেয়া থাকে শূকর অথবা গো মাংস। আবার কখনো ভেতরে পোরা থাকে মাশরুম। আমাদের টেবিলেরগুলো মাশরুম কিঙ্কালি। আটার পুরু স্তর ধারণ করে আছে জলপাই তেলে জারিত মাশরুমকে। খেতে যেন অমৃত। শুধু কিঙ্কালি-ই নয়, সাথে আরেকটি প্লেটে আছে রুটি, পিকেল, চিজ আর টমেটো। আমি ওয়াইনের গ্লাসে হালকা কয়েকটি চুমুক দিয়ে বাকি খাবারের দিকেই ঝুঁকে পড়ি। পেটে খাবারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে সোমরস অতো সহজে কাবু করতে পারে না।

আমাকে খাবার আর পানীয়ের মাঝে ঠেলে দিয়ে দাতো ডুবে গেছে ওর খাতা আর কলমের মাঝে। ওদিকে বাকিরা তখন জর্জিয়ান ভাষায় সোল্লাসে কোনো আলোচনায় মত্ত। আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে দাতো-র দিকে তাকালে ও খেরোখাতায় লেখা থামিয়ে বলে, আমার এক বন্ধু এখানকার বেশ নামী একটা ট্যুর কোম্পানির মালিক। ও সেদিন ধরেছে জর্জিয়ার ইতিহাস , প্রকৃতি ইত্যাদি নিয়ে গুণগান করে এক পাতার একটা লেখা ওকে তৈরি করে দিতে হবে। সেটা বিদেশীদের কাছে উপস্থাপন করবে। লেখাটা কালকের মধ্যেই ওকে দিতে হবে। সেজন্যেই এখানে বসে আড্ডার মাঝেও লিখছি।’

কিঙ্কালি খাওয়া শেষ না হতেই বেয়ারা এনে রেখে যায় লবিয়ানির প্লেট। লবিয়ানিকে তুলনা করা যায় কেটে কেটে রাখা আলু পরোটার সাথে। পার্থক্য এই যে, আলুর পরিবর্তে ওরা ঢুকিয়ে রাখে লালচে সিমের ভর্তা। খেতে মন্দ নয়। দুদিন আগেই নাকি ওদের কী এক পরব গেছে। সে পরবে ওরা খুব করে এই লবিয়ানি খায়।

‘এই যে আমার এই বন্ধুটিকে দেখছ, এ কিন্তু জর্জিয়ার প্রখ্যাত এক নায়ক। টিভি নাটকে অভিনয় করে।’– তৃতীয় লবিয়ানির টুকরোয় যখন কামড় বসিয়েছি, তখন হটাৎ কলম থামিয়ে দাতো উল্টোদিকে উপবিষ্ট যুবককে নির্দেশ করে বলে। এতক্ষণ যুবক বাকিদের সাথে গল্পে মশগুল ছিল। নিজেকে নিয়ে কথা ওঠায় সে সলজ্জভাবে মাথা নাড়ে। বুঝতে পারি– ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইংরেজিতে দখল না থাকার কারণে আমার সাথে কথোপকথনে বাধা পাচ্ছে। এই যে ওরা আমাকে উপেক্ষা করে নিজেদের মাঝে গল্প করছে, সেটি কিন্তু আমাকে উপেক্ষা করবার জন্যে নয়। ভাষাগত সীমাবদ্ধতার জন্যে। এ দেশের লোকেরা এখনো ইংরেজিতে সড়গড় নয়। লোকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে জানে অথবা শেখে রুশ। রুশ ভাষা শেখার জন্যে অবশ্য আজকাল কেও আর জোরজবরদস্তি চালায় না। কিন্তু পারিবারিক আর সামজিক মণ্ডলে নানাভাবে আজও জর্জিয়ানরা রুশ দেশের সম্পর্কিত। যদিও সেই সম্পর্কের প্রতি আজ আর তাদের কোনো মোহ, দায়বদ্ধতা কিংবা ভালোবাসা নেই। তবুও নিজের অজান্তেই কিছুটা যেন ঘৃণা নিয়ে হলেও রুশ শিখে ফেলে। তিব্লিসি শহরে পুরনো বইয়ের দোকানে যে বইগুলো চোখে পড়েছে, তার অন্তত চল্লিশ ভাগ-ই রুশ ভাষায় লিখিত। তবে ভাষাজ্ঞানের দিক থেকে দাতো-কে সেই গড়পড়তা জর্জিয়ানদের বাইরের গোত্রে ফেলা যায়। কারণ ওর শিক্ষাজীবনের কিছুটা সময় কেটেছে মাদ্রিদ আর লন্ডনে। এছাড়া নানা সাহিত্য সমাবেশে যোগদান উপলক্ষ্যে প্রায়ই হিল্লি-দিল্লী ছুটতে হয়। ওর বেশ কয়েকটা বই-ও ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি তাই ওর কাছে কোনো প্রতিবন্ধক নয়।

প্রায় দু তিন পাতা খস খস করে লিখে সমাপ্ত করবার পর দাতো হটাৎ কলম থামিয়ে বলে, ‘কী ব্যাপার, কিঙ্কালিগুলো সব শেষ করো। এগুলো সব কিন্তু খেয়ে উঠতে হবে!’ আমি ‘আর পারছি না’ ধরণের মিনতিপূর্ণ দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলে ও হাতের খাতাখানা ভাঁজ করে বলে, ‘তাহলে চল, এখান থেকে উঠি। আমরা বরং রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। তার আগে তামাদা-র অনুমতি নিয়ে নেই।’ তামাদা ভদ্রলোকের কাছে আর্জি পেশ করতেই তিনি বিদায়লগ্নে করমর্দন করবার জন্যে ভুঁড়ি বাগিয়ে উঠিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। তাতে করে আবারও টেবিলে কম্পন সৃষ্টি হয়ে সবকিছু উল্টে পড়বার জোগাড় হয়। তাকে নিবৃত্ত করে আমিই বরং সামনে ছুটে গিয়ে তার সাথে হাত মেলাই। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জড়ানো কণ্ঠে তিনি বলতে থাকেন– ‘আরেকদিন আসুন এখানে, আরও কয়েক পদের ওয়াইন এনে রাখবো আপনার জন্যে।’

বড় পথটায় নেমে আসি আমি আর দাতো। ওখানে দুধারে কাঠবাদাম গাছের সারি। অধিকাংশই পাতা হারিয়ে বিকেলের গুমোট অন্ধকারকে জাপটে ধরে আছে। যে কটির গায়ে এখনো সৌভাগ্যক্রমে কিছু পাতা ঝুলে আছে তারা এ বেলায় শুষে নিচ্ছে পাশের পথে যান্ত্রিক যাননির্গত বিষাক্ত গ্যাস। জ্যামে আটকে থাকা বাস আর গাড়ির ধোঁয়া খানিকটা ঝাঁঝালো গন্ধ তৈরি করেছে এ খানটায়।
তিব্লিসি ছোট শহর। প্রায় দশ লক্ষ লোকের নিবাস এ শহরে। তার মানে গোটা দেশের এক তৃতীয়াংশ লোকের আবাস-ই এ রাজধানী শহরে। মুশকিল হল, সোভিয়েত সময়ে যখন এ শহরটির রাস্তাঘাট পরিকল্পনা আর নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানার ব্যাপারটিকে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয়নি। ওদিকে এখনকার সময়ে এখানে হুড়মুরিয়ে এসে ঢুকছে জার্মানি আর আমেরিকার সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি। লোকের কিছু পয়সা হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ বাড়ছে। সেই সাথে বাড়তে পারছে না রাস্তার পরিধি। ফলে নিত্য জ্যাম লেগেই আছে শহরের নানা কোণে।

আমরা তিব্লিসি স্টেট ইউনিভার্সিটি অভিমুখে হাঁটতে থাকি। এখানে পথের পাশের গাছগুলো বদলে গেছে। কাঠবাদামের পরিবর্তে এখানে দেখছি বিশাল সব উইলো গাছ। কর্পোরেশনের ল্যাম্পপোস্ট সারাই করবার দুটি গাড়ি সেই গাছগুলোর কাছ ঘেঁষে কী জানি করছে। কাছে গেলে বুঝি, তারা গাছের উপরি অংশে পেঁচিয়ে রাখছে মরিচবাতির সুতো। এ বাতিগুলো নাকি আর কদিন পর থেকেই জ্বালানো হবে। জ্বলবে জানুয়ারির ছ তারিখ অবধি। অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের এই দেশে ক্রিসমাস ওই ছ তারিখেই কিনা, তাই। মাথা উঁচু করে তাকিয়ে বুঝলাম– বাতিগুলো কেবল গাছের কাণ্ডে নয়, গাছের একেবারে মগডাল থেকে বয়ে নিয়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে সড়কের অপর প্রান্তের গাছে। এই বাতিগুলো সব একসাথে জ্বললে নিশ্চয়ই বিয়েবাড়ির গলির মত দেখাবে এই পুরো অঞ্চলটা।

স্টেট ইউনিভার্সিটির গেটের কাছটায় এসে দেখে, তখুনি হয়তো শেষ হল কোনো ক্লাস। হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসছে একপাল ছাত্রছাত্রি। তাদের মাঝে কয়েকজন ঢোকার মুখের সিঁড়িটার কাছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। বাকিরা বাস ধরার অভিপ্রায়ে রাস্তা পেরুচ্ছে। পথ থেকে তাকিয়ে দেখতে পাই, বেশ কিছু ক্লাসে এখনো আলো জ্বলছে। এখানে কী তবে রাত্রিকালীন কোর্সের ব্যবস্থা আছে? কে জানে!

‘ঠিক এই জায়গাটার পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে আমি আজও থমকে দাঁড়াই, জানো?’– অর্ধবৃত্তাকার সেই সিঁড়িটি, যেটি হাঁটা পথ থেকে শুরু হয়ে চলে গেছে ভবনের ভেতর অবধি, সেখানে হটাৎ দাঁড়িয়ে দাতো বলে। আমি অবশ্য ওর বইয়ের পেছনে থাকা লেখক পরিচিতি পড়ে আগে থেকেই জানি যে, ও এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিল। এমনকি আশির দশকের অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলনে যে নেতৃত্ব পর্যায়ে ছিল, সে-ও জানি। ওর সাথে দেখা করবার মূল আগ্রহটা ছিল সেই কারণেই। লেখক তো অনেকেই হয়। কিন্তু ক জনেই বা সমাজ সচেতন, রাজনীতি সচেতন হয়, ক জনেরই বা দেশের রাজনৈতিক কিংবা মুক্তির আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার ইতিহাস থাকে! সে জন্যেই মনে হয়েছে, জর্জিয়া দেশটির সমাজতন্ত্র থেকে পরবর্তী অধ্যায়ে উত্তরণ সম্পর্কে যদি কিছু ধারণা পেতে চাই, তবে দাতো হতে পারে কার্যকরী সূত্র।

‘ঠিক এই জায়গাটা থেকেই আমরা শুরু করেছিলাম ছাত্র আন্দোলন। কেজিবি-র একেবারে নাকের ডগায়।’– সেই পূর্বের কথার খেই ধরে দাতো বলে। আমরা আবার হাঁটতে থাকি। কাছেই হুরমা নামক একটি ক্যাফে। বাইরে কিছু চেয়ার পাতা। ওখানে কিছুক্ষণ বসে বরং এ নিয়ে আরও কথা বলা যেতে পারে। যদিও জানি না এক বালতি ওয়াইন ঠেসার পর চা কফি খাবার কোন ইচ্ছে ওর ইচ্ছে আছে কিনা। ‘আমি কিছু নেব না। তবে তুমি চাইলে বসা যেতে পারে। আমার তো আর কোন তাড়া নেই।’– দাতো-র সম্মতি পেয়ে হুরমা-য় ঢুকে আমি এক কাপ আরল গ্রে চায়ের অর্ডার করি।
আজ তেমন হুল ফোটানো ঠাণ্ডা নেই। তাই ক্যাফের বাইরে পেতে রাখা চেয়ারে শুধু আমরা-ই নই, আরও কিছু মানুষ বসে। আমাদের টেবিলের মাঝখানে রাখা ছাইদানিতে একটি সদ্য পোড়া সিগারেটের বাট। সেটিকে আরও ভেতরে ঠেলে দিয়ে আমি বলি, ‘তোমাদের সেই ছাত্র আন্দোলনের কথা কী যেন বলছিলে?’

দাতো আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বিদায়ী সন্ধ্যের আঁধারে ঢাকা পথের দিকে তাকায়। তারপর অস্ফুট স্বরে বলে, ‘এই যে এই রাস্তাটা, এর শেষ মাথাতেই তখন ছিল জর্জিয়ান কেজিবি-র সদর দপ্তর। ‘৮৮ সালে আমরা যখন ক্যাম্পাসে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিই, তখন মোটামুটি সবাই জানতাম, এদের হাতে গুম হয়ে যেতে পারি। সে ঝুঁকি নিয়েই আন্দোলনে নামি। পথ সমাবেশের উদ্যোগ নিই।’
আমি খুব অবাক হই। কারণ, দাতো-র সেই বইটি পড়েই জানি– সে সময়ে এমন কিছু করার চেষ্টা মানেই সাক্ষাৎ মৃত্যুকে কাছে টেনে আনা। আর তাছাড়া ওরা না হয় জীবনের মায়া ত্যাগ করে সমাবেশের উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু সেই সমাবেশে লোক সমাগম হয়েছিল? নাকি বক্তারাই ছিল সমাবেশের একমাত্র শ্রোতা? আমার প্রশ্নে দাতো খানিক হেসে নেয়। তারপর জ্যাকেটের পকেট থেকে হাত বের করে টেবিলের জমিনে টোকা মারতে মারতে বলে, ‘একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা বক্তৃতা শুরু করার পর আমাদের ঘিরে ধরল কিজেবি-র সাদা পোশাকে থাকা গোয়েন্দারা। দূর থেকে দেখে পথচলতি লোকেরা ভাবল, এরাও বুঝি তাদের মতই সাধারণ জনতা। তারা মনে মনে সাহস পেল। একজন দুজন করে এগিয়ে এসে যোগ দিল সমাবেশে। এভাবেই ধীরে ধীরে সেটা রূপ নিল জনসমুদ্রে।’

‘কিন্তু কেজিবি কি তারপরও চাইলে পারতো না তোমাদেরকে দমিয়ে দিতে?’– চায়ে শেষ চুমুক দিতে দিতে আমি জিজ্ঞেস করি। বাইরের খোলা হাওয়ায় চায়ের কাপটা তাপ হারিয়েছে দ্রুত। তাই আধ কাপ শেষ হবার পরই আর চায়ের প্রতি মন নেই আমার।

‘হয়তো পারতো।’ সন্দিগ্ধভাবে মাথা দুলিয়ে দাতো-র উত্তর, ‘কিন্তু আশির দশকের ওই শেষ ভাগের সময়টাতে আসলে তারাও হয়তো হয়ে পড়েছিল কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ। গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রইকা চলছে তখন। মস্কোর কর্তারা নিজেদের নীতি কীভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে বা যাবে, সেই নিয়েই বেশি চিন্তিত। এখানকার কম্যুনিস্ট পার্টির ভেতরেও কিছু বিদ্রোহী অংশ ভেতরে ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাদের সাথেও আমাদের, মানে ছাত্রনেতাদের যোগাযোগ ছিল। সবকিছু মিলিয়ে আজ মনে হয়– আমাদেরকে গুম করার ঝুঁকিটা কেজিবি ওই সময়ে নিতে চায়নি। কিংবা হয়তো শুধুই কপাল জোরে বেঁচে গেছি।’– এটুকু বলে ও আমার চায়ের পেয়ালার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টির অর্থ হয়তো এমন– তোমার চা শেষ হলে চল ওঠা যাক, আমরা না হয় হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।

ক্যাফে থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম গেলেই সুলাকাউরি বুক শপ। এ রাস্তায় শুধু এটিই নয়, আরও প্রায় তিন চারটে বইয়ের দোকান আছে। ইউনিভার্সিটি পাড়া বলেই হয়তো বইয়ের ব্যবসা মন্দ নয় এদিকটায়। সেই বুক শপের পাশ দিয়ে হেঁটে পেরোবার সময়ে দাতো থেমে বলে, ‘চল এখানটায় একটু ঢোকা যাক। এরা আমার একটি বইয়ের পাবলিশার। শালারা বই বেচে ভালোই কামাচ্ছে, কিন্তু আমাকে বই বেচার হিসাব নিয়মিত দেয় না। দেখি, ভেতরে গিয়ে একটু মুখ দেখিয়ে আসি।’ বুঝলাম, লেখক-প্রকাশকের সম্পর্কের টানাপোড়ানের স্বরূপ আমাদের দেশ আর এখানকার মাঝে খুব একটা ভিন্ন নয়।

ভেতরে যিনি ক্যাশ রেজিস্টারে ছিলেন, তিনি দাতো-কে দেখেই সহাস্যবদনে অভ্যর্থনা জানালেন। দু জনের মাঝে জর্জিয়ান ভাষায় বেশ কিছু কথাবার্তা হল। দাতো-র বাচনভঙ্গি দেখে আন্দাজ করলাম, আলোচনার বিষয়বস্তু কিঞ্চিৎ অপ্রীতিকর। সেটি সমাপ্ত হবার পর ও আমাকে পাশের সেলফের একটি বইয়ের দিকে নির্দেশ করে বলল, ‘এই যে আমার এই বইটি ওরা প্রকাশ করেছে। আমার মনে হয় এটা তোমার ভালো লাগবে। তোমাকে কিছুক্ষণ আগে আমাদের যে ছাত্র আন্দোলন আর কমুনিসম থেকে বেরিয়ে আসার টালমাটাল সময়ের গল্প বলছিলাম, এই বইটি সেসব নিয়েই। এর ইংরেজি তর্জমা প্রকাশিত হবে খুব শীঘ্রই। আমি তোমাকে পোস্ট করে দিব ক্ষণ।’

আগের পর্বের লিংক- দাতো তুরাশভিলি’র জিনস জেনারেশন-১


মন্তব্য

তারেক অণু এর ছবি

ভালো লাগলো। সেখানে গেলে 'তামাদা' খুঁজে নিব। ধন্যবাদ

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

সময় নিয়ে পড়ার জন্যে আপনাকেও ধন্যবাদ হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।