কবিতা ও বিজ্ঞান - জগদীশচন্দ্র বসু

অবনীল এর ছবি
লিখেছেন অবনীল (তারিখ: সোম, ২৫/০৩/২০১৯ - ৭:৫৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অন্তর্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করেই হোঁচট খেলাম এক পুরোনো বিজ্ঞান সাময়িকীতে। কলকাতায় ১৯৪৮ সালে গঠিত হয়েছিলো বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ নামে এক বিজ্ঞান সচেতনতা প্রচার ও প্রসার বিষয়ক সংগঠন। প্রতিষ্ঠাতা আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়াদি নিয়ে চমৎকার সব প্রবন্ধ রয়েছে এতে, যদিও কালের আবর্তে তথ্যগুলো এখন আর তেমন সময়োপযোগী নয়। কিন্তু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর এই ছোট্ট পুনঃপ্রকাশিত লেখাটা এখনো তাঁর আবেদন হারায়নি বলেই আমার বিশ্বাস। কবি এবং বিজ্ঞানীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে তিনি যে সামঞ্জস্যতা দেখাতে চেয়েছেন তা আমার মনে হয় সবার কাছেই খুবি চমৎকার একটা পর্যবেক্ষন হিসেবে পরিগণিত হবে। সেই সাথে এই দুই ধারাকে সবসময় আলাদা করে দেখার যে সংস্কৃতি আছে সেটাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় বৈকি। চলুন পড়ে দেখা যাক -

কবিতা ও বিজ্ঞান
- জগদীশচন্দ্র বসু (জ্ঞান ও বিজ্ঞান । ৩২ তম বর্ষ। পঞ্চম সংখ্যা। মেঃ ১৯৭৯)

small

কবি এই বিশ্বজগতে তাঁহার হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়া একটি অরূপকে দেখিতে পান, তাহাকেই তিনি রূপের মধ্যে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন। অন্যের দেখা যেখানে ফুরাইয়া যায় সেখানেও তাঁহার ভাবের দৃষ্টি অবরুদ্ধ হয় না। সেই অপরূপ দেশের বার্ত্তা তাঁহার কাব্যের ছন্দে ছন্দে নানা আভাসে বাজিয়া উঠিতে থাকে। বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে, কিন্তু কবিত্ব-সাধনার সহিত তাঁহার সাধনার ঐক্য আছে। দৃষ্টির আলক যেখানে শেষ হইয়া যায় সেখানেও তিনি আলোকের অনুসরন করিতে থাকেন, শ্রুতির শক্তি যেখানে সুরের শেষ সীমায় পৌঁছায় সেখান হইতেও তিনি কম্পমান বাণী আহরণ করিয়া আনেন। প্রকাশের অতীত যে রহস্য প্রকাশের আড়ালে বসিয়া দিনরাত্রি কাজ করিতেছে, বৈজ্ঞানিক তাহাকেই প্রশ্ন করিয়া দুর্ব্বোধ উত্তর বাহির করিতেছেন এবং সেই উত্তরকেই মানব-ভাষায় যথাযথ করিয়া ব্যক্ত করিতে নিযুক্ত আছেন।

এই যে প্রকৃতির রহস্য-নিকেতন, ইহার নানা মহল, ইহার দ্বার অসংখ্য। প্রকৃতি-বিজ্ঞানবিৎ, রাসায়নিক, জীবতত্ত্ববিৎ ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া এক এক মহলে প্রবেশ করিয়াছেন। মনে করিয়াছেন সেই সেই মহলই বুঝি তাঁহার বিশেষ স্থান, অন্য মহলে বুঝি তাঁহার গতিবিধি নাই। তাই জড়কে, উদ্ভিদকে, সচেতনকে তাঁহারা অলঙ্ঘ্যভাবে বিভক্ত করিয়াছেন। কিন্তু এই বিভাগকে দেখাই যে বৈজ্ঞানিক দেখা, একথা আমি স্বীকার করি না। কক্ষে কক্ষে সুবিধার জন্য যত দেয়াল তোলাই যাক না, সকল মহলেরি এক অধিষ্ঠাতা। সকল বিজ্ঞানই পরিশেষে এই সত্যকে আবিস্কার করিবে বলিয়া ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়া যাত্রা করিয়াছে। সকল পথই যেখানে একত্র মিলিয়াছে সেইখানেই পূর্ণ সত্য। সত্য খন্ড খন্ড হইয়া আপনার মধ্যে অসংখ্য বিরোধ ঘটাইয়া অবস্থিত নহে। সেইজন্য প্রতিদিনই দেখিতে পাই জীবতত্ত্ব, রসায়নতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, আপন আপন সীমা হারাইয়া ফেলিতেছে।

বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্ব্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই, কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না। কবিকে সর্ব্বদা আত্মহারা হইতে হয়, আত্মসম্বরণ করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য। কিন্তু কবির কবিত্ব নিজের আবেগের মধ্য হইতে ত প্রমাণ বাহির করিতে পারে না! এজন্য তাঁহাকে উপমার ভাষা ব্যবহার করিতে হয়। সকল কথায় তাঁহাকে 'যেন' যোগ করিয়া দিতে হয়।

বৈজ্ঞানিককে যে পথ অনুসরণ করিতে হয় তাহা একান্ত বন্ধুর এবং পর্য্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের কঠোর পথে তাঁহাকে সর্বদা আত্মসম্বরণ করিয়া চলিতে হয়। সর্ব্বদা তাঁহার ভাবনা, পাছে নিজের মন নিজকে ফাঁকি দেয়। এজন্য পদে পদে মনের কথাটা বাহিরের সঙ্গে মিলাইয়া চলিতে হয়। দুই দিক হইতে যেখানে না মিলে সেখানে তিনি এক দিকের কথা কোন মতেই গ্রহণ করিতে পারেন না।

ইহার পুরস্কার এই যে, তিনি যেটুকু পান তাহার চেয়ে কিছুমাত্র বেশী দাবী করিতে পারেন না বটে, কিন্তু সেটুকু তিনি নিশ্চিতরূপেই পান এবং ভাবী পাওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি কখনও কোন অংশে দুর্ব্বল করিয়া রাখেন না।

কিন্তু এমন যে কঠিন নিশ্চিতের পথ, এই পথ দিয়াও বৈজ্ঞানিক সেই অপরিসীম রহস্যের অভিমুখেই চলিয়াছেন। এমন বিস্ময়ের রাজ্যের মধ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হইতেছেন যেখানে অদৃশ্য আলোকরশ্মির পথের সম্মুখে স্থুল পদার্থের বাধা একেবারেই শূন্য হইয়া যাইতেছে এবং যেখানে বস্তু ও শক্তি এক হইয়া দাঁড়াইতেছে। এইরূপ হঠাৎ চক্ষুর আবরণ অপসারিত হইয়া এক অচিন্ত্যনীয় রাজ্যের দৃশ্য যখন বৈজ্ঞানিককে অভিভূত করে তখন মুহূর্তের জন্য তিনিও আপনার স্বাভাবিক আত্মসম্বরণ করিতে বিস্মৃত হন এবং বলিয়া উঠেন 'যেন নহে - এই সেই'।


মন্তব্য

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সত্তরের দশক থেকে শুরু করে আশির দশকের গোড়া পর্যন্ত বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ডের নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা প্রথম পত্র বইয়ের শুরুর দিকে এই প্রবন্ধটা ছিল। বড় বোনের কাছ থেকে শিখেছিলাম 'যেন নহে - এই সেই' কথাটার মানে কী।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অবনীল এর ছবি

বাহ। আমি নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে এই লেখা পাইনি। এই প্রবন্ধ ত এখনো পাঠ্যপুস্তকে রাখার মতো! এবং উচিতও আমার মতে।

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

সজীব ওসমান এর ছবি

ভালো লেখা। তবে, আপনার দিনক্ষণগুলির উল্লেখ ভুলভাবে দেয়া আছে। প্রতিষ্ঠার কাল হবে ১৯৪৮। ১৯৭৮ সম্ভব না, কারন তার আগেই সত্যেন বোস মারা যান। জগদীশ বসুর লেখাটাও ১৯৭৯ এ হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নাই।

অবনীল এর ছবি

প্রথমটায় আপনার সংশোধন সঠিক । ঠিক করে নিচ্ছি। সাময়িকী তে '৭৭ সালে পাঠাগার স্থাপনের কথা ছিল, সেটার সাথে মিলিয়ে ফেলেছিলাম। ধন্যবাদ।

জগদীশচন্দ্র বসুর লেখাটা সাময়িকীতে পুনঃপ্রকাশিত সেটা শুরুতে বলা হয়েছে । আবারও ধন্যবাদ।

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

তারেক অণু এর ছবি

রবি ঠাকুর ও জগদীশ বসুর মধ্যকার চিঠিগুলো নিয়ে একটা বই ছাপা হয়েছে, চমৎকার সংকলন, ভাবনার খোরাক যোগায় অনেক।

অবনীল এর ছবি

বাহ। খুঁজে দেখবো । বেশ আগ্রহ উদ্দীপক একটা আলাপচারিতা হবে নিশ্চিত। জানানোর জন্য ধন্যবাদ।

নেট ঘেঁটে একটা লেখা পেলাম তাঁদের নিয়ে, এই অংশটা বেশ লাগলো -
তাঁদের দুজনের অন্তরঙ্গতা সম্পর্কে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “একজন বিজ্ঞানী, অন্যজন কবি - এঁদের মধ্যে যে আকর্ষণ ছিল সে কেবল বন্ধুত্ব বললে সম্পূর্ণ বলা হয় না। পরস্পরের মধ্যে একটি গভীর অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ ছিল। কথাবার্তা গল্প করার মধ্যে ভাব-বিনিময়ের চেষ্টা যেন সর্বদাই চলত। নতুন গল্পের প্লট বা যে প্রবন্ধ লিখছেন তার বিষয়বস্তু নিয়ে বাবা আলোচনা করতেন। জগদীশচন্দ্র তাঁর উদ্ভাবিত নতুন যন্ত্রের কথা বলতেন, নতুবা বলতেন জড় ও জীবের মধ্যে কী সব অদ্ভুত মিল তিনি সেই যন্ত্রের সাহায্যে আবিষ্কার করেছেন। দুজনের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চললেও তাঁরা যেন যথেষ্ট খোরাক পেতেন পরস্পরের আলোচনা থেকে।” (রবিজীবনী, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা-২৭৯, প্রশান্তকুমার পাল)

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

নীড় সন্ধানী এর ছবি

জগদীশচন্দ্র বসুর এই লেখাটি আমরা স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়েছিলাম। অনেকদিন পর আবারো পড়লাম। জগদীশচন্দ্র বাংলায় খুব কম লেখালেখি করেছেন। তাঁর একমাত্র বাংলা লেখার সংকলন 'অব্যক্ত' প্রকাশিত হয়েছিল সম্ভবত ১৯২১/২২ সালের দিকে। সংকলনটি বাংলাদেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নতুন করে প্রকাশ করেছে। ওই সংকলনে তাঁর সহজ এবং বিচিত্র রসের কিছু লেখা আছে যা এত বছর পরও মুগ্ধতা জাগায়।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

কনফুসিয়াস এর ছবি

কী চমৎকার একটা লেখা!
কবি ও বৈজ্ঞানিক, তাঁদের যাত্রাপথটুকু আলাদা, গন্তব্যের উদ্দেশ্যও হয়তো বা, কিন্তু দুজনেই অসীম কল্পনাশক্তির অধিকারী।
পাঠ্যপুস্তকে এই লেখাটা পাইনি আমি। এরকম সুস্বাদু বাংলা পড়তে খুব ভালো লাগে। এখনকার বাংলা চর্চাকারীরা কেমন শব্দদীনতা নিয়ে কাজ চালিয়ে দিচ্ছি, এটা খুব পষ্ট হয়ে ওঠে।

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

অবনীল এর ছবি

একদম মনের কথাটা বলেছেন। এজন্যই বলতে গেলে এসব লেখায় ফিরে যাওয়া, তাদের লেখাগুলো থেকে শিখে যদি ধরণটা নিজের লেখা নিয়ে আস্তে পারি। সময় করে পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।