ডাবলিনের ডায়েরী - ১৬ (১৯ অগাস্ট ২০০৯)

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি
লিখেছেন নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী (তারিখ: বুধ, ১৯/০৮/২০০৯ - ৬:২০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

auto

অনেক দিন ডায়েরী লিখি না। আজ হঠাত মনে হলো কিছু লিখে রাখি। ডায়েরী আমার জন্য এমন এক স্থান যেখানে আমি এলোমেলো অনেক কিছু লিখে ফেলতে পারি। আসলে ডায়েরী লিখতে তেমন পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না। লেখাটা গোছানো হচ্ছে কি হচ্ছে না, লেখার মূল বক্তব্য প্রকাশ পাচ্ছে কি পাচ্ছে না - কোন কিছু নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। লেখার কাজ, লিখে যাচ্ছি। এই হলো আমার ডায়েরী।

গত কয়েকদিন শরীর ভালো যাচ্ছে না। জ্বর জ্বর লাগছে। ওষুধ খাওয়া হচ্ছে। দেখা যাক বিজয়টা কার হয়, ওষুধ নাকি জ্বরের। না হলে ডাক্তার দেখাতে হবে। আয়ারল্যান্ডে এখন বেশ সোয়াইন ফ্লু এর হাক-ডাক। যতটা না ফ্লু এর কারনে ভয়, তার থেকে বেশি ভয় সরকারের প্রতিশেধক ব্যবস্থার কারনে। ট্রেনে, বাস স্টপেজে, পাবলিক প্লেসে - সব জায়গায় যেভাবে ভয় ধরনো সব বিলডোর্ড লাগানো, পড়লেই আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার জোগাড় হয়। আমার আবার এক আজব বাতিক আছে। কোথাও কোন রোগের উপসর্গ দেয়া থাকলে আমি মেলাতে শুরু করি নিজের সাথে। এবং মজার ব্যাপার, মিলেও যেতে থাকে। একবার একজনকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। যাকে নিয়ে গিয়েছি তাকে ডাক্তার ভেতরে ডেকে পরীক্ষা করছে। আমি রিসিপশনে বসে বসে বিভিন্ন রোগের ব্রোশিওর পড়ছিলাম। অধিকাংশই ক্যানসার। যতই পড়ি ততই দেখি সব রোগের সব উপসর্গ আমার আছে। কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম ইউট্রাসের ক্যানসারের উপসর্গগুলোও আমি নিজের মাঝে আবিষ্কার করে ফেলেছি! এই হলো আমার খুতখুতে মনের অবস্থা। অতএব এখন এসব পড়া বাদ দিয়েছি। এমনিতেই জীবনে সমস্যার শেষ নাই। তার উপর এসব বাড়তি সমস্যা আর চাই না।

ইদানিং আরেকটা নুতন সমস্যা তৈরী হয়েছে। কিছুতেই থিসিস লেখায় মন বসাতে পারছি না। আগে ভাবতাম রিসার্চের কাজটাই জটিল। লেখাটা কোন ব্যাপার না। এখন দেখছি প্রোগ্রামিং করা আমার কাছে যতটা সহজ, ঠিক ততটাই কঠিন ওয়ার্ড প্রসেসরে বসে বসে থিসিস টাইপ করা। সবচেয়ে বড় সমস্যা মন দিয়ে গুছিয়ে লেখা। এক রিলেটেড ওয়ার্ক চাপ্টার আমি গত দুই মাস ধরে লিখছি আবার মুছে ফেলছি, লিখছি আবার মুছে ফেলছি। একবার মনে হয় সবকিছুই আমার কাজের সাথে রিলেটেড, তো আবার মনে হয় এই সব কেন আমি এখানে লিখছি! আজব সমস্যা। গতকাল গ্রাজুয়েট স্ট্যাডিজ অফিস থেকে ই-মেইল পেলাম। ৩০ অক্টোবর থিসিস সাবমিশন। তারিখটা আগেই জানতাম। গতকাল নিশ্চিত করলো। ভাবলাম এখন হয়তো থিসিস লেখায় একটু গতি আসবে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টাটা। থিসিসের পরিবর্তে এখন ডায়েরী লিখছি!

আচ্ছা, রোগ-লেখাপড়া সব বাদ। অন্য কিছু নিয়ে লিখি। কি নিয়ে লেখা যায়? হুম...। সাহিত্য চর্চার বিষয়ে কিছু লেখা যেতে পারে। কিছুদিন আগে ই-বুক আকারে প্রকাশ করলাম উপন্যাস "নিরন্তর"। সত্য কথা বলতে, এই উপন্যাসটা খুব হালকা চালে লিখতে শুরু করেছিলাম। উপন্যাসের বাক্যগঠন থেকে শুরু করে ব্যাক্তি, কাল এবং স্থান – সব নিয়েছি ডিজুস জেনারেশন থেকে। খুব হালকা চালে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত একটা বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেছি। খানিকটা সিনেমাটিক হয়েছে, কিন্তু সেটা ইচ্ছাকৃত। এই উপন্যাসটা যাদের জন্য লেখা তাদের আমি মূল কথাটা সরাসরি বলতে চেয়েছি, ঘুরিয়ে পেচিয়ে নয়। আমার টার্গেট পাঠকদের বয়স সবই টিন এইজার অথবা সদ্য অতিক্রান্ত। তাদের সাহিত্যকে কেটে মূল বক্তব্য বের করার সময় নেই। তাদের যা বলতে হবে সেটা সরাসরি বলাই ভালো। উপন্যাসটা তাদের কাছে সম্ভবত ভালই লেগেছে। তিন হাজার বারের বেশি শুধু আমার সাইট থেকেই ডাউনলোড হয়েছে। এখন অপেক্ষায় আছি আগামী বই মেলায় প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা দেখার।

ডাবলিনে এক ভাইয়া এবং ভাবী আছেন – শ্যামল ভাইয়া এবং লুবনা ভাবী। দুজনই পি.হেইচ.ডি করছেন ডাবলিন ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (ডি.আই.টি)-তে। পড়ালেখার পাশাপাশি তারা বাংলাবার্তা নামে একটা মাসিক পত্রিকাও চালাচ্ছেন এখানে। সেই পত্রিকায় গত মাসে প্রকাশিত হয়েছিল আমার লেখা গল্প "বিবর্জিতা", আর এ মাসে প্রকাশিত হলো "আতঙ্ক"। তাদের উৎসাহেই লেখালেখীটা রক্তে নুতন করে বেগ তুলতে শুরু করেছে ইদানিং। নুতন উপন্যাস "সেদিনও আকাশে চাঁদ ছিল" লিখছি এখন। আশা করছি ডিসেম্বরের আগেই শেষ করতে পারবো। বাকিটা তোলা রইলো সময়ের হাতে।

এই যে এত সময় ডায়েরী লিখছি সেটা হেডফোন কানে দিয়ে! কারণ খুব সাধারন। আমার ঠিক পাশের রুমে ইউনুস এবং তার গার্লফ্রেন্ড প্লে-স্টেশন খেলছে আর চিৎকার করছে। তবে ওদের এই চিৎকার আমার কাছে খারাপ লাগে না। ২১ বছরের ছেলেটা তার ১৮ বছরের বান্ধবীর সাথে যে পাগলামীগুলো করে, এর সবই আমার কাছে অদ্ভুত রকমের ভালো লাগে। মেয়েটা থাকে তার বাবা-মার সাথে। ছেলেটা আমাদের বাসায়। দুজনই রোমানিয়ান। দুজনই মনের দিক থেকে অনেক বাচ্চা। এতটাই বাচ্চা যে তারা কাল রাতে এগারোটা পর্যন্ত বাসার সামনের রাস্তায় ছোয়াছুয়ি খেলেছে! অথচ ইউনুসের কাজ ছিল ভোর চারটায়। মেয়েটাকে সময় দেয়ার জন্য ইউনুসের মাঝে কোন ক্লান্তি নেই। ওরা টিভি দেখছে, গান শুনছে, খেলছে, সেক্স করছে - সবই আমি শুনি এবং খুব স্পষ্ট। ওদের ভালোবাসার পুরো ব্যাপারটাই অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগে আমার কাছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি ওদের ভালোবাসায় যেন কারো নজর না লাগে।

ডায়েরী লিখতে আজ বেশ ভালই লাগছিল। কিন্তু এখন হঠাত করেই ইচ্ছেটা মরে গেলো। আর একটুও লিখতে ইচ্ছে করছে না। মানুষ জীবনের এই এক বড় সমস্যা - আমরা নিজেরাই জানি না আমরা কখন কী করতে চাই। ঈশ্বর আমাদের একটা মন দিয়েছেন, কিন্তু সেই মনকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা দেননি। অনেকটা মারফতি গানের মত: "একটা চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া, জনম ভইরা চলতে আছে / মন আমার দেহ ঘড়ি, সন্ধান করি, কোন মিস্তরী বানাইয়াছে"।

আফসোস, আজও সেই মিস্তরীর সন্ধান পেলাম না।

১৯ অগাস্ট ২০০৯
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।

বি.দ্র. - সংযুক্ত ছবিটি www.archives.gov.on.ca থেকে নেয়া।


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাবলাম আরো কয়েকটা প্যারা আছে; আরেকটু সময় কাজ থেকে দূরে থাকা যাবে। দুম করে শেষ করে দিলেন... মন খারাপ
পইড়া আরাম পাইছি।

/
রেশনুভা

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

রেশনুভা ভাই, লিখতে লিখতে হঠাত আর লিখতে ইচ্ছে করছিল না। তাই থেমে গেলোম। মন বসাতে পারছি না কিছুতেই। তার উপর জ্বরের কারনে বেশি সময় বসে থাকতেও সমস্যা হয়। একটু সুস্থ হলে কিছু ভ্রমন কাহিনী লেখার ইচ্ছে আছে। আশা করি পড়ে মন্তব্য দেবেন তখন।

শুভেচ্ছা রইলো।

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

পড়তে ভালো লাগল। বেশ কিছু বানান ভুল চোখে পড়ল অবশ্য। হাসি থিসিসটা লিখে ফেলেন। দেরি করলে শুধু দেরিই হবে।

ডাবলিনে বাঙালিরা কী অবস্থায় আছেন, আপনাদের জীবন সেখানে কেমন, এসব নিয়ে পোস্ট দিতে পারেন, সময় হলে।

সমস্যা না থাকলে উপন্যাসের লিংকটা দিয়েন। পড়ে দেখবনে।

ভালো থাকুন।

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

ডাবলিনে ডিসিইউ-তে বাংলাদেশী ছাত্ররা বেশ সুনাম অর্জন করেছে। বুয়েটের প্রক্তন শিক্ষক প্রফেসার হাসমী আছেন মেকানিকালের ডিন। এছাড়াও বুয়েটের বেশ কয়েকজন ছাত্র পি.হেইচ.ডি করার পর এখানে শিক্ষক হয়েছেন। ট্রিনিটিতেও আমরা বাংলাদেশী আছি বেশ কয়েকজন।

তবে ডাবলিনের সিংহভাগ বাঙালী ছাত্ররা ভিসা কলেজে আসেন। সেগুলো প্রতিরোধের জন্য সরকার ধীরেধীরে কঠোর হচ্ছে।

বানান ভুলগুলো ধরিয়ে দিলে সুবিধা হতো। ঠিক করে নেয়ার চেষ্টা করছি।

উপন্যাসটা এখান থেকে ডাউনলোড করা যাবে....

http://niaz.web.googlepages.com

ওখানেও অনেক বানান ভুল আছে। সেগুলোও ঠিক করার কাজ চলছে। পড়ার সময় যদি একটু নোট নিয়ে রাখেন, তাহলে খুব উপকার হবে।

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

সম্ভব হলে, পরে কখনো, ডাবলিনের বাঙালিদের নিয়ে আলাদা পোস্ট দিয়েন।

'নিরন্তর' ডাউনলোড করে নিলাম। পড়ব অবশ্যই। পড়ে জানাব কেমন লাগল। অনেকবার ডাউনলোড হইসে দেখলাম, আর মন্তব্যগুলোও খুব প্রশংসার। শুভেচ্ছা রইল আপনার জন্য। আশা করি উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে। হাসি

তাড়াতাড়ি সুস্থ হন।

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

আপনার এই লেখাটায়, যেগুলো এক নজরে চোখে পড়ল:

ডায়েরী - ডায়েরি
হঠাত - হঠাৎ
ব্যাথা - ব্যথা
কারনে - কারণে
প্রতিশেধক - প্রতিষেধক
খুতখুতে - খুঁতখুঁতে (পুরোপুরি নিশ্চিত নই)
তৈরী - তৈরি
চাপ্টার - চ্যাপ্টার
কি নিয়ে লেখা যায়? - কী
ব্যাক্তি - ব্যক্তি
পি.হেইচ.ডি - পি.এইচ.ডি
লেখালেখীটা - লেখালেখিটা
সাধারন - সাধারণ
ছোয়াছুয়ি - ছোঁয়াছুঁয়ি (পুরোপুরি নিশ্চিত নই)
নিয়ন্ত্রন - নিয়ন্ত্রণ
মত - মতো

আশা করি, কিছু মনে করেননি হাসি

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

হঠাত বানানটা নিয়ে আমি খুব কনফিউজড। আগে হঠাৎ লিখতাম। পরে একজন বললেন বানানটা হঠাত হবে! ডায়েরী আর চাপ্টারটা চলে যায়। ইংরেজির বাংলাতো তাই। তবুও পরবর্তিতে ডায়েরি আর চ্যাপ্টার-ই লিখবো। এই বানান দুটোই ভালো লেগেছে। কারণ, সাধারণ - এই বানানগুলো জানার পরও ভুল করছি বারবার....। আর পি.হেইচ.ডি আসলেই এটা। এইচ বলে আসলে কিছু নেই। সেটা হবে হেইচ। লক্ষ্য করবেন, আমরা আনি, অর্স, আউজ বলি না। হানি, হর্স বা হাউজ বলি। এই নিয়ে অনেক বিব্রতকর ঘটনা আছে। পরে একদিন পোস্টে লিখবো।

বানানগুলো ঠিক করে দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

আরেকটু সাহায্য....

ব্যয় হবে নাকি ব্যায়?
ব্যাপার নাকি ব্যপার?

সম্ভবত প্রথম দুটো, তাই না?

মূলত পাঠক এর ছবি

অপ্র'র ছোঁয়াছুঁয়ি ও খুঁতখুঁতে, দুটোতেই চন্দ্রবিন্দু লাগবে। সচলে বানান বিষয়ে চন্দ্রবিন্দু ঘটিত ভুল খুব চোখে পড়ে, কেন জানি না।

এইচ কেন হেইচ হবে বুঝলাম না, কোথায় দেখলেন এটা জানালে ভালো হয়। বিলেতে ও আমেরিকায় শিক্ষিত/অ্যাকাডেমিসিয়ান ও সাধারণ লোক দু দলের কাউকেই শুনি নি হেইচ বলতে। ভারতে দক্ষিণ ভারতীয়, বিশেষতঃ তামিলদের ছাড়া আর কোনো সম্প্রদায় বলে বলে শুনি নি। আমরা যেমন হানি, হর্স বা হাউজ বলি, তেমনি আওয়ার, এয়ার (উত্তরাধিকারী), অনার ইত্যাদিও তো বলি, কাজেই এ যুক্তিটা খাটছে কি?

ব্যয় ও ব্যাপার ঠিক।

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

আওয়ার, অনার, অনেস্ট ইত্যাদিতে হেইচ উহ্য থাকে। এটাকে সাইলেন্ট হেইচ বলে। এই জন্য আওয়ার, অনার বা অনেস্ট এর আগে এ্যান বসে।

আজ পড়লাম অ্যামেরিকায় এইচ-ই বলে। তবে আয়ারল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডে হেইচ বলে। অস্ট্রেলিয়াতে দুটোই বলে। আয়ারল্যান্ডে কোন দিন কাউকে এইচ বলতে শুনিনি। এমন কি বললে বুঝেও না। ইংল্যান্ডেও হেইচ শুনেছি অনেক, তবে মিক্সড কালচার বেশি হওয়ায় ওখানে এইচও শোনা যায়। তবে ডিকশনারী মতে দুটাই সঠিক।

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

কিছু মনে করার প্রশ্নই আসে না। বরং খুশি হয়েছি যে আপনি বানানগুলো ঠিক করে দিয়েছেন। শুভেচ্ছা রইলো।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।