জন্মপাপ

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
লিখেছেন আশরাফ মাহমুদ (তারিখ: বুধ, ২৪/০৮/২০১১ - ৯:৫৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমার মৃত্যুটা কীভাবে হবে আপনাকে বলি।

পুকুর বা দিঘীর জলে। ভেলায়। মাদকতাময় জোছনা অথবা বোবা রোদ্দুরে। আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চাইবে, অথচ আমি জোর করে জেগে থাকবো। মস্তিষ্কের ভেতরে সমস্ত স্মৃতি রঙের ট্রেন হয়ে তীব্র বেগে ছুটতে থাকবে। এবং সে থাকবে। অথবা মা, যদি মা আবার আসে। আমি ঘন নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পৃথিবীকে অবজ্ঞা করে চলে যাবো।

সোমবার সকালে উঠে বাস ধরতে দাড়ি কামাতে হবে না দ্রুততার সাথে, গালের বাঁ পাশে দাগ পড়বে না। বাচ্চার দেখাশোনা, ইস্কুলের খবর নেয়া, জীবন কেমন যাচ্ছে সেটি ইনিয়েবিনিয়ে জানতে গিয়ে মূলত তার বন্ধুদের ব্যাপারে তথ্য নেয়া। তেমনি করে তাকে-ও জেরা না করা। তার অফিসের কোনো কলিগকে সন্দেহ না করা, ওই লোকটার সাথে বেশি কথা বললো কি না সেটি নিয়ে চিন্তিত না হওয়া। সপ্তাহের বাজার করতে গিয়ে খিস্তি করা। আর বছরে এক বা দুয়েক ফার্মের মুরগীর বাজারে গিয়ে বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো করে বেড়ানো যাওয়া। এইসব। সারমেয় জীবন। আমাকে আর বইতে হবে না। জীবন আমাকে অবজ্ঞা করেছে। আমি জীবনকে উপহাস করে যাবো। পাতায় বসে থাকা পোকাটি, যে জিরাফের গ্রীবা বেয়ে নেমে যাওয়ার আগে একটু কামড়ে দিতে চায়।

আমার ছোটবেলা সরল ছিলো না। সত্য জেনে ওরা ইস্কুল থেকে বের করে দিয়েছিলো। কেউ বন্ধুত্ব পাতায় নি। পরে আমাকে বাধ্য হয়ে পড়তে হয় প্রতিবন্ধীদের ইস্কুলে। সীমাবদ্ধতা না থাকলে-ও আমার। কলেজে কিছুটা স্বাধীনতা পেলাম। সিগারেট ধরেছিলাম বলে কিছু মাছি-বন্ধু-ও পেলাম। আর পেলাম নীল আকাশ। যার মেঘে মেঘে আমার দুঃখ বিছিয়ে দিয়ে কালো করে ফেলতাম, এবং বর্ষা নামিয়ে আনতাম। ইউনিতে ঢুকে পড়ে আমি পাল্টে গেলাম। পাল্টালাম। বুঝে গেলাম অধিকার কেড়ে নিতে হয়, সংগ্রাম করে অধিকার পাওয়া যায় না, অধিকার কেড়ে নিতে হয়!

আমার জন্মটা কীভাবে হলো আপনাকে বলি।

এইসব পরে শুনেছি। একটি প্রায়-অন্ধকার ঘরে। এবং রেডির তেলে অথবা হারিকেনে কেরোসিন জ্বলে গর্ভযন্ত্রণায় আমার মায়ের গোঙ্গানির সাথে পাল্লা দিয়ে এক আধটু আলো, রাত ছিলো বলে আলোহীনতা বেশি অসহ্য লাগে নি। বাইরে কালবৈশাখীর যুবতীর ওড়না উড়িয়ে নেওয়া মাতাল হাওয়া। রহিমা খালা ধাত্রীর কাজ করেছিলো। মায়ের প্রতি এটুকু মমতা কেনো জানি তিনি দেখিয়েছিলেন। আমি রহিমা খালাকে বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নিতে দিই নি। মা আঁতুরঘরেই থেকে গিয়েছিলো বলে আমি আরো অসহায় হলাম।

আমার নাম রাফি রাখলো। মানুষ আদর করে ইদানীং কুকুরের নাম-ও যিশু রাখে। তবে আমি আরো একটি নাম নিয়ে বড় হলাম। নামটা শুনে আমার এতো কষ্ট হতো যে আমার আত্মহত্যা করতে মন চাইতো, মায়ের জন্য। সবাই এতো বেশি ডাকতো যে ওটাকেই আমার নাম মনে হতো। নটির পোলা।


মন্তব্য

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে মিশে থাকে কতটুকু প্রতিশোধ?

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
অর্ক রায় চৌধুরী এর ছবি

অসাধারণ বর্ণনা। জন্মই যেখানে আজন্ম পাপ, সেখানে নিজেকে খুঁজে পাওয়া বড় মুশকিল।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
রু (অতিথি) এর ছবি

খুব ভালো লেগেছে।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

ধন্যবাদ, রু। নিকটা বেশ!

অপছন্দনীয় এর ছবি

চলুক

সচলায়তনে যারা "স্বাধীনতাবিরোধীর ছানাপোনা" টার্মের সফল এবং সগর্ব প্রয়োগকারী - এবং তার মাধ্যমে বাপ=সন্তান মধ্যযুগীয় ইকুয়েশনের সমর্থক, আশা করি গল্পটা তাদের ভালো লাগবে।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

ধন্যু।
শেষের কথাগুলো বুঝি নাই, মানে গল্পের সাথে সম্পর্কসাধন করতে পারি নি। মন খারাপ

অপছন্দনীয় এর ছবি

তাহলে হয়তো আমি গল্পটা বুঝতে ভুল করেছি... হাসি

যাক, বাদ দেই।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

এক যৌনকর্মীর ছেলের কথন।

অপছন্দনীয় এর ছবি

সেটাই মনে হচ্ছিলো - অর্থাৎ (বাবা) মায়ের পরিচয়ের (যে পরিচয়ের ক্ষেত্রে সন্তানের কোন ভূমিকাই ছিলো না) কারণে সন্তানের ক্ষেত্রে ডিসক্রিমিনেশন এবং তার প্রভাব হাসি

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

আমিই জট পাকায় ফেলছি। খাইছে

মৌনকুহর এর ছবি

সচলায়তনে যারা "স্বাধীনতাবিরোধীর ছানাপোনা" টার্মের সফল এবং সগর্ব প্রয়োগকারী - এবং তার মাধ্যমে বাপ=সন্তান মধ্যযুগীয় ইকুয়েশনের সমর্থক, আশা করি গল্পটা তাদের ভালো লাগবে।

সহমত চলুক

-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-
ফেসবুক -.-.-.-.-.- ব্যক্তিগত ব্লগ

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

"নটীর পোলা" টার্মটা কি এখন খুব প্রচলিত?
এরচেয়ে বেশি প্রচলিত বোধহয় "খানকীর পোলা" টার্মটা... গল্প প্রয়োজনে সেটাই বেশি যুক্তিযুক্ত হতো মনে হলো...

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

মিলু এর ছবি

ব্যাপারটা অঞ্চলভেদে বদলে যায় মনে হয়। আমি পড়াশোনাসূত্রে বছর পাঁচেক কাটিয়েছি টাঙ্গাইলে। টাঙ্গাইলের আশপাশ আর বৃহত্তর ময়মনসিংহের নানান জায়গার প্রচুর বন্ধুবান্ধব পেয়েছিলাম সেখানে। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহের দিকে গেলে দেখবেন ওখানকার জাতীয় গালিই "ন*র পোলা"। মানুষের মুখ থেকে মাত্র একটা গালি বের হলেও এটাই বের হয়ে আসে। আবার ঢাকার ছেলে হিসেবে যা দেখেছি, তাতে মনে হয় ঢাকায় "খা**র পোলা"-ই সম্ভবত বেশী প্রচলিত।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

নোয়াখালীতে-ও প্রচলিত আছে।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

আমি তো দেশে গিয়ে শুনলাম এবার। তারপর-ও ভাবনায় থাকলো।

আয়নামতি এর ছবি

চলুক চলুক

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
মিলু এর ছবি

ভালো লাগল। চলুক

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
ফাহিম হাসান এর ছবি

ধাক্কাটা একটু বেশিই লাগল। লেখা অনবদ্য।

দাড়ি বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই বোধহয়

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

ব্যথা লাগে নি তো। খাইছে

ঠিক করলাম। আপনার নিয়মিত উৎসাহের জন্য কৃতজ্ঞতা।

হেমন্তের ঘ্রাণ এর ছবি

দুর্দান্ত !!! এত অসাধারন ভাবে কবে যে লিখতে পারব কে জানে ? মন খারাপ

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

আরে কী যে বলেন। হাসি শুরু করে দেন।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

অনেকদিন পর গদ্য লিখলেন। অসাধারণ বর্ননা। তবে জন্মটা বুঝলেও মৃত্যুটা একটা অস্পষ্ট লেগেছে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

ধন্যবাদ। ওটা অস্পষ্টই রাখতে চেয়েছি।

কৌস্তুভ এর ছবি

দারুণ। 'রেড়ির তেল' বোঝাতে চেয়েছেন বোধ হয়? রেন্ডি শব্দটা কিন্তু খানকি'র সমার্থক... নটির পোলা শব্দটা অপরিচিত ছিল, আপনাদের মন্তব্য পড়ে বুঝতে পারলাম।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

জানি। বানাম্ভুল হয়েছিলো। হাসি

সচল জাহিদ এর ছবি

চমৎকার গদ্য পড়লাম।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

চলুক

..................................................................
আমি ছুঁয়ে দিতে চাই সেই বৃষ্টিভেজা সুর...

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
যুমার এর ছবি

জীবনকে উপহাস করলে ও জীবন-জীবনই থেকে যায়। লেখার প্রথম অংশটা মাদকতাময়,শেষটা একটা ধাক্কা।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

তা ঠিক। শুভেচ্ছা।

মৃত্যুময় ঈষৎ এর ছবি

চমৎকার!!!


_____________________
Give Her Freedom!

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
দুষ্ট বালিকা এর ছবি

ভালো লেগেছে।

**************************************************
“মসজিদ ভাঙলে আল্লার কিছু যায় আসে না, মন্দির ভাঙলে ভগবানের কিছু যায়-আসে না; যায়-আসে শুধু ধর্মান্ধদের। ওরাই মসজিদ ভাঙে, মন্দির ভাঙে।

মসজিদ তোলা আর ভাঙার নাম রাজনীতি, মন্দির ভাঙা আর তোলার নাম রাজনীতি।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
শাব্দিক এর ছবি

চলুক দারুন।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
সুমন তুরহান এর ছবি

সহসা সচকিত করলো। লেখা উত্তম জাঝা! হয়েছে! চলুক

-----------------------------------------------------------
স্নান স্নান চিৎকার শুনে থাকো যদি
নেমে এসো পূর্ণবেগে ভরাস্রোতে হে লৌকিক অলৌকিক নদী

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
তানিম এহসান এর ছবি

চুপ করিয়ে দিলেন বেশ কিছুক্ষণ! এদের সাথে কাজ করেছি আমি, প্রথম কিছুদিন ঘুমোতে পারতামনা - কি অসাধারণ সব শিশু কিন্তু একটা চৌহদ্দির বাইরে বেরুতে পারতোনা!! মানুষের মত করে মানুষকে ছোট করতে আর কোন পশু-প্রাণী পারবেনা!!

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন। আগ্রহ জানালাম।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।