ফালতু গল্প ১ : ঘোষণা

সুবোধ অবোধ এর ছবি
লিখেছেন সুবোধ অবোধ (তারিখ: রবি, ৩০/০৩/২০১৪ - ২:৪৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মোখলেসুরের চায়ের দোকানে বসে বসে রাজা উজির মারতে মারতে বিস্বাদ চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম আমি, কামরুল আর মনি। এই ব্যাটা মোখলেসুর মোটামুটি সবসময়ই এমন ফালতু স্বাদের চা বানালেও আড্ডা দেয়ার জন্য তার দোকান খুব ভাল জায়গা বলে মাঝেমধ্যে এখানে এসে বসি দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডাবাজি করার সুবিধার্থে। কারণ এদিকটায় পাড়ার মুরুব্বিরা খুব একটা আসে না, তাই একটু পর পর উঠে "চাচা স্লামালিকুম; আঙ্কেল ভাল আছেন; জ্বি, আমাদের বাসার সবাই ভাল আছে" বলে উঠে দাড়াতে হয় না। চোখ বন্ধ করে সিগারেটে সুখটান দেয়া যায়, এক টান দিয়ে চোরের মত এদিক সেদিক দেখার দরকার হয় না। একথা সেকথার মাঝে কামরুল সবে মাত্র গতরাতে দেখা কি একটা সিনেমার একটা দৃশ্যের বর্ণনা দেয়া শুরু করেছে, ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন ফরিদ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে হাপাতে লাগল। খুব অল্পতেই ফরিদ সবসময় বিচলিত হয় বলে তার এহেন অবস্থায় আমরা খুব একটা বিচলিত হই না। তবে এমন ছুটতে ছুটতে এসে হাপাতে থাকা একজনকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যায়না, তাই আমি শেষ হওয়া চায়ের কাপ মোখলেসুরের কাছে ফেরত দিয়ে ফরিদের দিকে কৌতুহলি চোখে তাকালাম, কামরুল তার শেষ না হওয়া চায়ের কাপ তার পাশেই বেঞ্চে নামিয়ে রেখে নিজের চোখে কৌতুহলি দৃষ্টি নিয়ে আসল আর মনি এতক্ষণ যেমন মনযোগ দিয়ে নাক খুঁটাচ্ছিল তেমনই খুঁটতে থাকল, তবে তার চোখ দেখে বোঝা গেল যে সেও কৌতুহলি। ফরিদ হাপাতে হাপাতেই বলল -"কাম তো একখান হইছে!!"
আমরা তিনজনই সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম-"কি হইছে? কি হইছে?!"
ফরিদ হরবর করে বলল -"ইয়েগোরে ইয়েরে ই দিয়া বাইরায়া এহাবারে ই কইরা হালাইছে!"
এই হল ফরিদের আরেক সমস্যা। উত্তেজনায় সে সবসময় সবকিছু গুলিয়ে ভজঘট পাকিয়ে ফেলে। এখনও সে তাই করে ফেললেও তার কথা থেকে এটুকু বুঝতে পারলাম যে কারও আত্মীয় সজন বা বন্ধুবান্ধব কাউকে কিছু একটা দিয়ে পিটিয়ে অবস্থা খারাপ করে ফেলা হয়েছে। আমরা ফরিদের প্রকাশ ভঙ্গিতে মোটামুটি হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম -"কিয়েগোরে কিয়েরে কি দিয়া বাইরায়া কি কইরা হালাইছে?"
ফরিদ আমাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মোখলেসুর কে বলল -"পানি দ্যাও।"
আমরাও ফরিদ একটু ধাতস্হ হবে এই আশায় অপেক্ষা করতে লাগলাম। পানি খেয়ে মুখ মুছতে মুছতে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে ফরিদ বলল -"ওই উত্তুর পাড়ার সলিম গো ভাই কলিম রে তো আইজকা বাইরায়া এহাবারে ভচকায়া হালাইছে!"
আমরা যারপরনাই অবাক হই -"মানে কি?! পিটাইছে কেডা, কারা? ও না নেতার চ্যালা?"
ফরিদ উত্তেজনায় কামরুলের উরুতে একটা থাবড়া দিয়ে বলে -"ওইডাই তো কাহিনী। মারছে তো ওর পার্টির লোকই!" কামরুল থাবড়া খেয়ে 'আউ' আওয়াজ তুলে সরে বসে। মুখলেসুর প্লাস্টিকের গামলার বহুবার ব্যাবহৃত ঘোলা পানিতে এঁটো কাঁচের কাপ ধুতে গিয়ে টুংটাং আওয়াজ তোলে।
পার্টির লোকই মেরেছে শুনে আমরা আরও অবাক হই। বলি -"কাহিনী কি?"
ফরিদ এবার হাসতে হাসতে বলে -"আর কইস না, হালায় একটা বলদ!" বলে একটু থামে, "জানস-ই তো, আইজকা ওগো পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচন ছিল। আর উই তো এইবার যে চেয়ারম্যান হব মাসুদ, হ্যার চ্যালা। সকাল ব্যালা থিকা নির্বাচন হইছে। দুপুরের পর ভোট গোনাগুনি শ্যাষে মাইকে যখন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করব ওই হালায় উঠছে ত্যাজ দেখায়া। ভ্যাকেই মোটামুটি ধইরাই থুইছে যে এইবার মাসুদ চেয়ারম্যান হব, তাই কলিম রে কিছুই কয় নাই। আর ওই হালায় তো একটা পাঠা, খালি গায়ে গতরেই জোর, মাথার তো কিছুই নাই।" এই পর্যন্ত বলে ফরিদ একটু দম নেয়ার জন্য থামে। আমরা অধৈর্য্য হই। ফরিদ আবার শুরু করে -"হালায় মাইক হাতে পায়া মনে কর্ যে কি থুয়্যা কি কব তার ঠিক নাই। ভকর ভকর করতে করতে উত্তেজনায়ই নাকি কি বুইঝা নিজেরেই চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়া বইছে!"
ফরিদের কথা শুনে আমরা বেকুব হয়ে যাই। ফাপরবাজী করছে ভেবে বলি -"ধুর ব্যাটা, চাপা মারতাছস!! এইডা কেমনে সম্ভব?"
ফরিদ প্রতিবাদ করে উঠে -"আরে না দোস্ত, চাপা মারমু ক্যা? হুন তারপর কি হইছে, কলিমের যে চ্যালা চামুণ্ডা আছে অরাও তো অর মতই গাধা, ঘোষণা হুইন্যা অরা তো হই হই কইরা উঠছে! আর মাসুদ তো মনে কর সেই খ্যাপা খেপছে! আর অর অন্য চ্যালারা এতদিন যারা সুযুগ খুঁজতাছিল অরা তো কলিম রে স্টেজ থিকা নামায়া মাইর!! আর গাইল যে হারামীর বাচ্চা, মাইক হাতে পাইলেই নিজেরে চেয়ারম্যান মনে হয়?! গোড়াইটা বাঁশের লাঠি দিয়া বাইরায়া এহাবারে ই কইরা হালাইছে!" বলতে বলতে ফরিদ আবার উত্তেজিত হয়ে যায়!
আর আমি মাত্র দুই দিন আগে পড়া মতিকণ্ঠের একটা লাইন বিরবির করে আওড়াই -মাইক খুব ডেঞ্জারাস বস্তু

পাদটীকাঃ
এই ফালতু গল্পটির সকল চরিত্র কাল্পনিক। এমনকি আমিও কাল্পনিক! তাহলে কল্পনা টা কে করল সেটা একটা প্রশ্ন। তবে কবি বলেছেন-“তোমরা বেশি বেশি কুশ্চেন করিও না। তাহা হইলে সব আওলাইয়া যাইবে!” সুতরাং... তবে যে যাই করেন না কেন ভুলেও নিচের এই ঘটনার সাথে গল্প মেলানোর চেষ্টা করিবেন না।

“স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র যখন বিদ্রোহীদের দখলে আসে, তখন ২৬শে মার্চ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান এবং ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। এই সব ঘোষণা বিদ্যুতের মত লোকের মুখে ছড়িয়ে পড়ে, শেখ মুজিবের নির্দেশে সশস্ত্রবাহিনীর বাঙালীরা স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই শুরু করেছে।”
-সূত্রঃ মূলধার ’৭১, লেখকঃমঈদুল হাসান, অষ্টম মুদ্রণ,মার্চ ২০১৩, পৃষ্ঠাঃ৫-৬

কয়েকদিন পর টিভি তে একটা প্রোগ্রাম আছে। দীর্ঘক্ষণ মাইক সামনে থাকবে। হে হে হে... বুঝেনই তো... মাইক খুব ডেইঞ্জারাস বস্তু!


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

কাল্পনিক গল্পগুলো সব আমাদের দেশে এসে সত্য হয়ে যায়। মন খারাপ :( মন খারাপ

- সুচিন্তিত ভুল

সুবোধ অবোধ এর ছবি

ভাল হাসি খারাপ মন খারাপ দুই রকম-ই হয়...

মেঘলা মানুষ এর ছবি

হাচল হবার পর প্রথম লেখা? অভিনন্দন!
আমি তো হাচল হবার পর এক সপ্তাহ ডুব মেরে বসেছিলাম, নতুন কি লিখব সে জন্যে; আপনি তো সে তুলনায় অনেক স্বাচ্ছন্দেই লিখে ফেললেন।

সচলগ আরও লম্বা হোক, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা হাসি

সুবোধ অবোধ এর ছবি

দিয়ে দিলাম সাহস করে দেঁতো হাসি
আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

অন্যকেউ এর ছবি

অভিনন্দন সুবোধ অবোধ। লেখা ভালো লেগেছে। আরও লিখুন। পরের লেখায় হয়তো আপনার লেখার ধরন নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলা যাবে।

_____________________________________________________________________

বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়।

সুবোধ অবোধ এর ছবি

ধন্যবাদ। হাসি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হাচলাভিনন্দন! হাততালি এই উদাসী বেশ ধর্লেঙ্ক্যা??

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সুবোধ অবোধ এর ছবি

ধইন্যা ভাই... হাসি
ছুডু বেলায় শখ ছিল বড় হয়ে বান্দর হব.. হে হে হে... খাইছে

দীনহিন এর ছবি

গল্প বলার জন্য দরকার সংলাপ দক্ষতা, হিউমার, আর সময়-সচেতনতা। আর এ সবগুলোতেই রয়েছে আপনার অপার সম্ভাবনা।
হাচলাভিনন্দন, হে সুবোধ, হে অবোধ!

.............................
তুমি কষে ধর হাল
আমি তুলে বাঁধি পাল

সুবোধ অবোধ এর ছবি

আশাকরি একদিন এইসব সম্ভাবনা গুলোকে কাজে রূপান্তর করতে পারব পরিপূর্ণ ভাবে.... হাসি
ধন্যবাদ আপনাকে ...

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

গল্প পরে পড়বো - আগে অভিনন্দন জানাই - হাচলাভিনন্দন।

____________________________

সুবোধ অবোধ এর ছবি

ধৈন্যবাদ প্রোফেসর সাব। হাসি

এক লহমা এর ছবি

হ, মাইক খুব ডেইঞ্জারাস বস্তু!
প্রথম হাচলী গল্পের জন্য অভিনিন্দন দেঁতো হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সুবোধ অবোধ এর ছবি

হ, পুরাই ডেঞ্জারাস। একবার হাতে মাইক পাইছেন তো নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিতে শুধু ঠোঁট চুলকাবে!!! খাইছে
ধইন্যা .... হাসি

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

এই জন্যেই আমার অমায়িক লোক খুব ভালো লাগে (অমায়িক - যার মাইক লাগে না)। চোখ টিপি

প্যারাগুলোর পাঝে একটা করে লাইন গ্যাপ দিলে পড়তে আরাম হতো।

____________________________

সুবোধ অবোধ এর ছবি

হো হো হো
গ্যাপ দেয়ার জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কথোপকথন টাইপ তো.. খাইছে

আয়নামতি এর ছবি

হাচলত্বের অভিনন্দন থাকলো। দেখলেন তো আমার ফুউউউউউয়ের কারিশমা দেঁতো হাসি

সুবোধ অবোধ এর ছবি

ধইন্যা ধইন্যা ... দেঁতো হাসি
আরও ফুউউউ দেন যেন বেশি বেশি লিখতে পারি .. হাসি

তাহসিন রেজা এর ছবি

হাচলত্বের অভিনন্দন

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

সুবোধ অবোধ এর ছবি

আপনেরেও... হাসি

অমি_বন্যা  এর ছবি

হাচলাভীনন্দন চলুক

সুবোধ অবোধ এর ছবি

ধইন্যা ... হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।