দেশান্তরী উপাখ্যান- তিন

শেখ জলিল এর ছবি
লিখেছেন শেখ জলিল (তারিখ: শুক্র, ২২/০২/২০১৩ - ১২:২৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আসাম রাজ্যের সর্বপশ্চিমের মহুকুমা সদর এই ধুবড়ি। ধুবড়ি এলাকার দক্ষিণ পাশ নদীবিধৌত সমতল এলাকা, উত্তর ও পূর্ব এলাকা পাহাড়ি অসমতল। দেশ বিভাগের পর জহিরদের বাড়ি বগড়িবাড়ি এলাকাটি পড়ে গোয়ালপাড়া জেলার ধুবড়ি মহুকুমা এবং বিলাসীপাড়া থানার অধীনে। পরে অবশ্য এই ধুবড়িকে জেলা ও বগড়িবাড়ির নিকটবর্তী 'মহামায়া'কে থানা ঘোষণা করা হয় এবং বগড়িবাড়িকে এর অধীন করে নেয়া হয়। বাঙালি মুসলমানদের জনপ্রিয় নেতা মওলানা ভাসানী ধুবড়ির নিকটবর্তী ভাসান চরে বসবাস গড়েছিলেন। এখান থেকেই তিনি দিয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ডাক। লোকমুখে প্রচলিত আছে এই ভাসান চর থেকেই মওলানা আব্দুল হামিদ খানের নামের সাথে ভাসানী শব্দটি যুক্ত হয়েছিলো।

দক্ষিণের সমতলকে ঢালুতে রেখে পাহাড়ি এলাকার পাশ ঘেঁষে গড়া হয়েছে ধুবড়ি-গৌহাটি-গোয়ালপাড়া সদর রাস্তা। বগড়িবাড়ি এসে এই সদর রাস্তা পশ্চিম-পূব দিক পরিবর্তন করে সোজা উত্তর দিকে মহামায়া হয়ে চলে গেছে গৌহাটির দিকে। যদিও থানার নাম মহামায়া দেয়া হয় পরে, তবে থানা সদর এই বগড়িবাড়িই। এই বাজারের পূব পাশের ঢালুতে রয়েছে একটি বিশাল জলাশয়- যার সৃষ্টি হয়েছে মূলত পাহাড়ি ঢল থেকে। স্থানীয় লোকেরা এটাকে চেনে কুণ্ড নামে। কয়েকটি শ্মশানঘাট, বাহারি কচুরিপানা আর রকমারি মাছে ভরা এই কুণ্ডটি ছিলো আটআনী রাজবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই কুণ্ড থেকে নৈচারধাপ গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটি স্রোতস্বিনী কাল। শৈশবে জহির কতো যে খুব ডুব-সাঁতার খেলেছে সে খালে তার ইয়ত্তা নেই! বর্ষা শেষ হয়ে গেলে যখন সে খালে ভাটা পড়তো বড়শি দিয়ে মাছ ধরতো সবাই।

জহিরের অনুজ জাবিদের আমার বয়স পাঁচ কি ছয়। ছোট ছোট পায়ে সবসময় সে ঘুরঘুর করতো বড় ভাইদের পিছে। যদিও পারতো না তেমন কাজ তবু রোয়া ধান রোপা, পাট কাটা কিংবা মাছ ধরায় বড় ভাইদের সহযোগী হতো সে। একদিন দুপরে বড়শি দিয়ে সে খালে মাছ ধরছে জহিরের আরেক অনুজ জাফর। তীর্থের কাকের মতো জাবিদ মগ্ন হয়ে ক্ষণ গুণছে কখন বড়শিতে মাছ ওঠে। হঠাৎ করেই জাফরের বড়শিতে টপাটপ উঠতে লাগলো বড়ো বড়ো চিতল মাছ। একটা করে মাছ ধরছে জাফর আর পিছনের ডাঙার দিকে জাবিদের দিকে ছুড়ে মারছে সেগুলো।

মাছ পাবে কি পাবে না ভেবে কোনো খালুই নিয়েও যায়নি তারা। জাবিদ তাই দুহাতে সামলিয়ে রাখছে মাছগুলো যতক্ষণ না নিস্তেজ হচ্ছে তাদের প্রাণ। একে একে দশ-পনেরটি মাছ জমে গেলে সেগুলোকে বাড়িতে পাঠানোর চিন্তা করলো তারা। জাবিদের দুই বাহু, হাতের উপর মাছগুলো বিছিয়ে দিলো জাফর। খুশিতে আত্মহারা হয়ে জাবিদ সেগুলো নিয়ে এলো বাড়িতে। এতো মাছ দেখে মা খুব অবাক হয়েছিলেন সেদিন। আরও অবাক হয়েছিলেন বাউণ্ডুলে জহিরকে সন্ধ্যার আগে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখে।

অনেকদিন পর দারুণ উৎসাহে আজ মাকে মাছ কাটায় সাহায্য করলো জহির। মনে পড়ে সেদিন রান্না হয়েছিলো চিতল মাছের কোল, ভূনা আর কালিয়া। খুব মজা করে সব ভাইবোন মিলে মাছ খেয়েছিলো সবাই। একমাত্র বাদ পড়েছিলো জহিরের সবচেয়ে ছোট বোন তারা বানু। বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বলে তাকে সবাই ডাকতো 'দুল্লু' বলে। দুল্লু গিয়েছিলো খালার বাড়ি বেড়াতে। দুদিন পর বাড়িতে এসে জাফরের মুখে মাছ ধরার গল্প শুনে সে কী কান্না তার! তার জন্য মা কেন মাছ রেখে দেয়নি, তারা কেন একা একাই খেয়েছে সব মাছ ইত্যাদি ইত্যাদি। জহিরের মনে পড়ে স্বর্ণালি শৈশব। আহারে চিতল মাছের কোল!

২১.০২.২০১৩ (চলবে)


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

বর্ণনামূলক প্রতিবেদন। ধন্যবাদ। পরবর্তী লেখা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

শেখ জলিল এর ছবি

ঠিক, বর্ণনা চলবে কয়েক পর্বে। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

যতবার তাকে পাই মৃত্যুর শীতল ঢেউ এসে থামে বুকে
আমার জীবন নিয়ে সে থাকে আনন্দ ও স্পর্শের সুখে!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।