ছোটগল্পঃ ত্রিকোণমিতি

তীরন্দাজ এর ছবি
লিখেছেন তীরন্দাজ (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৬/১০/২০০৮ - ২:১৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

দুপুরের রোদের রং এখন বেশ নরম। জানলার পর্দা বেয়ে বাঁকা বাঁকা ছায়া শেষ আলোটুকুর জানান দিয়ে মিলিয়ে যাবার পথে। সাধারণত: দুপুরের ঘুমের পরপরই শেষ হয় ছুটির দিনের আমেজ। কিন্তু তার আবেশটুকু রয়ে যায় বিকেল অবধি। কাপড় চোপড় পরে বেরুনোর আগে দেখি নীরা তখনও ড্রেসিং টেবিলের সামনে। চুল বাঁধার কালো ব্যান্ডটি মুখে নিয়ে খোলা চুলগুলোকে আচড়ে নিচ্ছে আরেকবার। পেছনের দিকে টান টান বসার ভঙ্গীমায় শরীরের সুঠাম কাঠামো আরো বেশী আকর্ষনীয় হয়ে চোখে পড়ছে। মুগ্ধ চোখে তাকালাম সেদিকে। মনে হলো একরাশ প্রজাপতি নেচে বেড়াচ্ছে কোন এক অজানা ফুলের ঢেউ এর সাথে শরীর এলিয়ে। আমার মুগ্ধতা টের পেলো নীরা। চোখের দিকে তাকিয়ে একরাশ ফুলেল হাসি ছড়িয়ে বললো,

- কি গো! এমন করে কি দেখছো?
- তোমাকে!
- যাহ্। আমাকে তো প্রতিদিনই দেখ। নতুন করে আবার দেখার কি আছে?
- যাকে ভালোবাসি, তাকে প্রতিদিনই দেখবো। একবার নয়, দু’বার নয়, বারবারই দেখবো।

বলেই এগিয়ে গেলাম ওর দিকে। আলতো করে হাত রাখলাম কাঁধে, এর মরাল গ্রীবা আর কাঁধের মাঝখানের খোলা অংশটায়। চুমু খেলাম ওর মাথায়, ওর চুলোর সোদা গন্ধের ফাঁকে ফাঁকে। মিষ্টি করে হাসলো নীরা। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার প্রতিবিম্বেও সে হাসি বুকের মাঝে ভালোবাসার ঝর্ণায় তিরতিরিয়ে কাঁপন তুললো। পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

- ফির‌বে কখন?
- রাত দশটার মাঝেই। তুমি?
- সেরকমই হবে। একটু দেরীও হতে পারে। জান তো, আমরা তিন বান্ধবী একসাথে হলে কথা একেবারেই ফুরোতে চায়না।

ওকে আরেকটু আদর করে বেরিয়ে গেলাম বাইরে। বুকের ভেতরে বেশ একটা কাঁপুনি অনুভব করলাম। এক আনন্দ আর ভয় ভয় অনুভুতি মিলে মিশে একটু অস্থির করলো মন। নীরার অজান্তে অন্য কারো সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, তাতে কিছুটা অপরাধবোধ জাগবে তো বটেই।

বাইরে রোদের আলো আরো বেশী আবছা হয়ে এসেছে। কিন্তু কেমন যেনো অন্যান্য দিনের চাইতে আলাদা আজকের এই বিকেলের রোদ। কোথাও যেন একটা অস্বাভাবিক আলো। গতবছর সুর্যগ্রহনের সময়ে এমনি আলো ছিল। সে আলোর ছোঁয়ায় শরীর ছাপিয়ে বুকের ভেতরে এক অস্বস্তিকর হিম বাতাস বয় সারাক্ষণ। তারপরও এক অনাবিল উত্তেজনায় এই শরতের নরম রোদের মাঝেই ঘেমে উঠলো হাতের তালু। মনে হলো একটি রঙ্গিন বলয় যেনো আমাকে ঘিরে ঘিরে অনুসরণ করে চলেছে। কোন এক মৃদু সুরের মুর্চ্ছনা বলয় আর আমাকে একাকার করে দিচ্ছে কোন এক নিটোল আনন্দ।

একটি ফুলের দোকানের সামনে থামলাম। এমনি এক সুন্দর সন্ধ্যায় ফুলই সবচেয়ে সুন্দর উপহার! দোকানটির সামনেও ফুলের ডালি নিয়ে বসেছে কিছু শিশু আর কিশোর। ওরা এগিয়ে এলো আমাকে দেখেই। সেদিকে নজর না দিয়ে দরজা ঠেলে দোকানে ঢুকলাম। বেশ বড়সড় অভিজাত দোকান। চারিদিকে ফুলের তোড়া সুন্দর, রুচিসম্মত ভাবে সাজানো। আমার দিকে এগিয়ে এলো দোকানের এক বিক্রেতা। তাকে ছাপিয়ে দৃষ্টি পড়লো দোকানেরই এককোণে। সেখানে একগোছা রজনীগন্ধার পাশে রজনীগন্ধার মতোই দাড়িয়ে আছে তিথি, আমার দিকে পেছন ফিরে। দোকানের সমস্ত ফুলের সুবাস ছাড়িয়ে তিথির শরীরের সুবাসই যেন ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। এগিয়ে গিয়ে ডাকলাম ওকে। চমকে পেছন ফিরে আমাকে দেখেই উচ্ছল হাসিতে ভরে উঠলো ওর অবয়ব। মনে হলো, একগুচ্ছ পাহাড়ী ঝর্ণা যেনো কোন এক ময়ুরের পেখমের সাথে সাথে নেচে উঠলো একসাথে। একরাশ আনন্দ ছড়িয়ে বললো,

- আরে! তুমি এখানে, হঠাৎ?
- তোমাকে দেখতে এসেছি।
- হ্যা! বললেই হলো!

উত্তরে হাসলাম আমি। আসলেই সত্যি। তিথিকে দেখার জন্যে আমি যখন তখন, যতদূরই হোক না কেনো, যেতে তৈরী। যখনই ওকে দেখি, মনে হয় কোন এক স্বপনপূরীর বাগান থেকে নেমেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে ও। সে স্বপনপূরীর কবিতাকথনে তখনও ছন্দিত যেন ওর প্রতিটি চাওনী, প্রতিটি ভঙ্গীমা, প্রতিটি পদক্ষেপ। আসলে তিথি নিজেই একটি নির্ঝরনী থেকে নেমে আসা কবিতা। কবিতা ভালোবাসি, পড়ি, কিন্তু ওর সামনে দাঁড়ালে আমি কবিতাই ভুলে যাই।

তিথির সাথে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করলাম অনেকটা সময়। ছেলেমেয়েরা বারবারই ফুল কেনার তাগাদা দিয়ে গেল, অনুনয় করলো অনেক। আমাদের মনযোগ না পেয়ে ফিরে গেলো হতাশ হয়ে। দেরী হলে হোক! এই নিটোল সময়টুকু একান্ত ভাবেই আমাদের।নিজেদের মাঝেই ডুবে রইলাম সে সময়ের পুরোটুকুই। একসময় বিদায় নিল তিথি।

চাইনীজ রেষ্টুরেন্টের আলো আধারিতে এসে যখন বসলাম, ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি আধ ঘন্টার মতো দেরী হয়ে গেছে আমার। অপেক্ষা কর‌ছিল নীতা। কিন্তু কোন অনুযোগ জানালো না। আমাকে দেখে মৃদু হাসলো প্রতিবারের মতোই। সেজন্যেই ওকে আমার এতো ভাল লাগে। কোন চাওয়া নেই, অনুযোগ নেই নীতার। তারপরও ওর স্বভাবের মাঝে একটি লুকোনো দৃঢতা আছে। প্রতি মূহুর্তেই যেন বলছে, কোন প্রতারণা করবে না আমার সাথে, আমাকে অবহেলা করতে কোন সাহস যেন তোমার কোনদিন না হয়! এই দৃঢ়তার প্রতিই আকর্ষণ আমার। নীতা যেনো একটি বহমান নদী। আপন পথটি চিনে নিয়ে আপন পথেই বয়ে চলেছে। এই চলার মাঝেই দিয়ে যাচ্ছে, যা দেবার। আমার মুখের দিকে তাকালো নীতা। আমি ওর মুখোমুখি বসে বললাম,

- একটু দেরী হয়ে গেলো নীতা!
- না না, তাতে কি? আমি তো এখানে ভালোই বসে ছিলাম। কেমন আছ?
- ভালো আছি। তুমি?
- ভালো। আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?
- না না, অসুবিধা হয়নি।

মনে মনে ভেবেছিলাম রাস্তায় জ্যামের কথা বানিয়ে বলবো। কিন্তু নীতার সামনে এটুকু মিথ্যে বলতেও সাহস হয়না আমার, দরকারও হলোনা। ওকে ফুলের তোড়াটি দিলাম। ওর চেহারায় এক আলোর ঝিলিক খেলে গেলো। তাতেই আমার বুকের ভেতরে এক ফাগুননদী যেন ঢেউ খেলো বারবার। অনর্গল কথা বলে গেলাম আমরা। বাইরের অন্ধকারে রেস্তেরার ভেতরের মৃদু আলোকেও আলোকিত মনে হলো। আমরা দু'জন পরস্পরের মুখোমুখি একে অন্যের হাত ধরে কোন এক অলঙ্কৃত সময়ের সাক্ষী হয়ে রইলাম।

জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি নামছে হঠাৎ।বিদ্যুত চলে যাওয়ায় অন্ধকারে ভরে গেলো আমাদের চারপাশ। ওয়েটার একটি মোমবাতি এনে জালিয়ে দিল টেবিলে। হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দ কানে এসে বাজল। ঘুম ভেঙ্গে গেলো হঠাৎ। দেখি নীরার পাশেই শুয়ে আছি আমি।

বাইরে বৃষ্টি হলেও সকালের আলো জানালা ভেদ করে আমাদের শরীরে এনে পড়ছে। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেছে টের পেয়ে নীরা পিঠের বাঁদিকের উঁচু হাড়ের নীচে হাত বুলিয়ে প্রতিবারের মতোই আদর করলো। প্রতিবারই এই আদরে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু এবার নীরা নিজেই হাত বুলোতো বুলোতে ঘুমিয়ে পড়লো আবার। আমি ওর পাশে শুয়ে ভাবনার অতলে তলিয়ে গেলাম। সপ্নের আবেশটুকু যেনো এখনও জড়িয়ে আছে আমার ভেতরে। মনে হলো, নিষিদ্ধ সরোবরে যেন নৌকো ভাসিয়েছি আমি।

ঘুমের মাঝেই একটু নড়ে উঠলো নীরা। ওর হাতটি সরে যেতেই নিজের মাঝে ফিরে এলাম আমি। ওর মুখের দিকে তাকালাম। কী নিশ্চিত ভালোবাসা নিয়ে আমার পাশে ঘুমিয়ে! একটা কষ্টবোধ কিলবিল করে জানান দিল বুকের ভেতরে। নীরাকে পাশে রেখে এমনি এক সপ্ন কি করে দেখতে পারলাম! আমরা তো আমাদেরকে ভালোবাসি, প্রতিদিনই ভালোবেসে যাচ্ছি। তাহলে কেন? কে এই নীতা? কেই বা তিথি? হঠাৎ চমকে উঠলাম সপ্নের আবহটা আরেকটু বেশী উজ্জল হয়ে উঠতেই। একটি সত্য দিনের মতো আলোকিত হয়ে উঠলো চোখের সামনে। যেভাবে দেখেছি, সেভাবেই নীতা আর তিথির অবয়বও স্পষ্ট হয়ে উঠলো আমার সামনে। এদেরকে প্রতিদিনই দেখি, প্রতিদিন ভালোবাসি। প্রতিদিনের আনন্দ কষ্ট এদের সাথেই ভাগ করি। একেবারেই অচেনা কেউ নয় এরা। দু’জনই একই নারী,আমার পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা নীরাই। সপ্নের সে সোডিয়াম আলোয় আচ্ছন্ন ছিলাম,তাই স্পষ্ট দেখতে পাইনি। হঠাৎই শান্ত হলো মন, নিজের ভেতরটি দেখতে পেলাম চেনা আলোতে। আদরে নীরার শরীরে হাত রাখতেই সে আরামে ‘ওম’ শব্দ করে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।


মন্তব্য

ফারুক হাসান এর ছবি

তিন কোণ এর মাপঝোঁকেই একদম পারফেক্তো!

তীরন্দাজ এর ছবি

ধন্যবাদ ফারক হাসান!
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

তুলিরেখা [অতিথি] এর ছবি

সেলাম,পিথগোরাস সাহেব! হাসি

তীরন্দাজ এর ছবি

ওয়ালাইকুম আসসালাম!
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

মূলত পাঠক এর ছবি

সুন্দর গল্প। ভালো লাগলো।

তীরন্দাজ এর ছবি

ধন্যবাদ জানাই আপনাকে!
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

কীর্তিনাশা এর ছবি

আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পটা জমে ওঠার আগেই শেষ করে দিয়েছেন। তাড়াহুড়োর ছাপও দেখলাম নাকি কিছুটা?
কি জানি হয়তো আমারই ভুল!!

তবে গল্প যথারীতি তিরন্দাজীয়। চলুক

-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

তীরন্দাজ এর ছবি

তাড়াহুড়ো থাকতে পারে। তবে এরচেয়ে বেশী লিখতে চাইনি আমি।
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

অভ্রনীল এর ছবি

ভালো লাগলো। দারুন গল্পটির জন্য ধন্যবাদ।
_________________________________
| নাদানের ছোট্ট জগৎ |
auto

পুতুল এর ছবি

স্বপ্নের দৃশ্য বলেই হয়তো বর্ননাগুলো একটু আবছা থেকেছে।
কিন্তু গল্পের অন্তর্নিহিত দর্শন তাতে বাধাগ্রস্থ হয়নি। কামনা এবং প্রাপ্তির অসাম্যতা থেকেই এধরনের স্বপ্নের বুননটা হয়।
গল্প ভাল লেগেছে।
**********************
কাঁশ বনের বাঘ

**********************
ছায়াবাজি পুতুলরূপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ!
!কাশ বনের বাঘ!

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

ভালো লাগলো গল্পটা।

...........................

সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

অসম্ভব ভাল লাগল গল্পটা। সত্যিই চমৎকার।
_______________
বোকা মানুষ মন খারাপ

satu এর ছবি

খুব ভাল লাগল । অসম্ভব সুন্দর হয়েছে.......

গান্ধর্বী এর ছবি

আহ, খুব ভাল লাগল হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।