এপিঠ-ওপিঠ

নিঘাত তিথি এর ছবি
লিখেছেন নিঘাত তিথি (তারিখ: শুক্র, ২৮/০৯/২০০৭ - ১:৩৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ছোট আপু মেইল করেছে কাল। কথার ফাঁকে বলে ফেলার মত করে ও লিখেছে, যেন খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, "ও তোকে তো বলা হয় নি, পরশুদিন ছিনতাইকারী ধরেছিলো আমাকে।" এইটুকু পড়েই আমার আত্মা কাঁপা শুরু করে দিলো। দেশ ছেড়েছি মোটে ক'দিন, অনুভূতিগুলো ভোঁতা হবার সময় পায় নি এখনও। আমি নার্ভ শক্ত করার চেষ্টা করে পরের লাইনগুলো পড়ে যাই।

যা লিখেছে তার সারমর্ম হচ্ছে, রাতের বেলা রিকশায় ছোট আপু এবং ভাইয়া (ছোট আপুর বর) কোথাও যাচ্ছিলো। মোবাইল কানে নিয়ে কথা বলার সময় ছিনতাইকারী রিকশার পেছনে হুডের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওর মোবাইল নিয়ে নিয়েছে। নেবার সময় আপুর চোখ আর কান ঘেঁষে নখের আঁচড় বসিয়ে দিয়েছে। এটা হলো প্রাথমিক ঘটনা।

পরবর্তী ঘটনা আরেকটু জটিল। ভাইয়া বহুদিন বাংলাদেশে ছিলো না। এইসব ঘটনা সম্পর্কে তেমন ধারনা নেই। তিনি সিনেমার হিরোর মত রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে ছিনতাইকারীর পেছন পেছন দৌড় শুরু করেছেন। আপু এদিকে চেঁচিয়ে তাকে মানা করছে যেন না যায়, কে শোনে? আপুর বর্ণনা মতে একটু পরে আপু দেখে যে ভাইয়া এক হাতে মোবাইল আরেক হাতে ছিনতাইকারীকে ধরে নিয়ে আসছে! আশেপাশে দর্শকের ভূমিকায় যেসব পুলিশ এবং আমজনতা ছিলো, এবার তারা সরব হলো, "মারেন ভাই, শালারে ধইরা ইচ্ছামতো মারেন"। আপু ততোক্ষনে ভাইয়াকে ধরেবেঁধে শান্ত করে নিয়ে যাচ্ছে, এই অবস্থায় আপুর চোখে আর মুখে রক্ত দেখে ভাইয়ার মাথায়ও গেলো রক্ত চড়ে। এতক্ষন মারে নি, এবার ছিনতাইকারীকে মার দেয়া শুরু হলো...।

সামনে ঈদ। এই সময়টায় দেশে এই ধরনের অপরাধ বেড়েই যায় সব সময়। আর আমাদের পরিবারে আমি এবং ছোট আপু প্রতিবারই আক্রান্ত হই নিজেদের বেখেয়ালীপনায়। গত বছর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমার ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মোবাইল নিয়ে গেলো, আমি টের পেলাম কয়েক মিনিট পরে। আপুর মানিব্যাগও গিয়েছিলো এমন করেই।

কিন্তু এবার বৈচিত্র্য এলো। হারিয়ে আবার ফেরত পাওয়া গেলো। পুরো মেইলটার শেষে আপু লিখেছে, "ভাগিস, ছিনতাইকারীর কাছে কোন ছুরি বা অস্ত্র ছিলো না। তাহলে কি হতো চিন্তা কর!" আমি চিন্তা করলাম। ভাইয়ার সাহসীপনা কোন মারাত্মক অবস্থা তৈরি করতে পারতো ভেবে শিউড়ে উঠলাম। একইসাথে আমার আপুকে যে ব্যাটা বাথা দিয়েছে তাকে মেরেছে বলে আপুকে রিপ্লাই লিখতে যাচ্ছিলাম যে খুব ভালো হয়েছে ভাইয়া মেরেছে তাকে। কিন্তু পরমুহুর্তেই কি জানি হলো, অন্য ভাবনা পেয়ে বসলো আমাকে।

লোকটা ছিনতাই করছিলো তাহলে ছুরি বা অন্য কিছু ছিলো না কেন? সে তো তাহলে পেশাদার ছিনতাইকারী নয়। এমন তো হতে পারে সে সাধারণ একজন মানুষ, তার ঘরে বউ আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে। তার ছোট মেয়েটা তার কাছে বায়না করেছে এবারের ঈদে তাকে একটা লাল টুকটুকে জামা কিনে দিতে, ছেলেটাও তেমনই কিছু হয়তবা। হয়তো অভাবে আর কোন উপায় না দেখে নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে হঠাৎ তাকে ভুতে পেয়েছিলো, আর এমন ছিনতাই করতে গিয়েছিলো। হয়তো সে ভেবেছে ওদের অনেক আছে, একটা মোবাইল নিলে কি আর হবে!

জানি না...

অপরাধ যারা করে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব যুক্তি থাকে নিশ্চয়ই। তবু তারা অপরাধীই। কিন্তু সেই মারখাওয়া ছিনতাইকারীর পোড়খাওয়া হৃদয়ের কল্পিত অভিমান কেন জানি আমাদের হঠাৎ করে ভাবিয়ে তুলে, স্বস্তি দেয় না।

হায় দারিদ্র, সত্যি মহান করেছো তুমি বঙবাসীদের!


মন্তব্য

কিংকর্তব্যবিমূঢ় এর ছবি

মন খারাপ করা লেখা ...

এসকেপিস্ট মানুষ আমরা ... রাস্তাঘাটে এমন ঘটনা দেখলে সযত্নে এড়িয়ে যাই ... আর ব্লগে এমন পোস্ট দেখলে কমেন্ট না করে বের হয়ে যাই‌ ...

ডাম্পিং ইজ দ্য বেস্ট পলিসি ...

কনফুসিয়াস এর ছবি

এই ব্যাপারগুলা এইরকমই। কখনোই কোন সমাধানে আসা সম্ভব না। চোরের নিজেরও দিবার মত কৈফিয়ত থাকে সবসময়েই, কিন্তু সেটা শুনতে গেলে তার বিচার করা যাবে না। অভাব আছে বলেই চুরি-ছিনতাই জায়েয হয়ে যায় না, এটা যেমন সত্য, তেমনি ঐ অভাব কি করে মিটানো যায়, সেই পন্থা আমাদের জানা নেই, ( মাইক্রো-ক্রেডিট নিয়া ঋণী হবার পরামর্শ দেয়া যায়!!), তাই চোরের প্রতিও মাঝে-সাঝে সহানুভূতি আসে।
কী আর করা!

-যা দেখি তা-ই বলি...

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

মৃন্ময় আহমেদ এর ছবি

দেখছে জনতা! বলছে সাবাস..
মাঝে মধ্যেই এখানে ওখানে
পিটিয়ে মারার ব্যস্ত শ্মশানে
প্রশ্ন অনেক উত্তর নেই
এই অসহ্য সময়টাকে কাঁদতে দে... কাঁদতে দে...
______________________
চিৎকার করি জ্বলেপুড়ে ছারখার
তবুও আমি নাকি অশুচি

'

=========================================
নিজেকেই নিজে চিনি না, পরকে চেনার মিছে বাহানা

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

হায় দারিদ্র, সত্যি অসহায় করেছো তুমি বিশ্ববাসীদের!

আরিফ জেবতিক এর ছবি

লেখাটা ভালো লেগেছে।

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

হুমম...
মন খারাপ করা লেখা।

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

অরূপ এর ছবি

চলুক

হিমু এর ছবি

আমি একবার ছিনতাইকারী ধাওয়া দিয়ে ধরার দৃশ্য দেখেছিলাম রিকশায় বসে। আসাদ গেটে এক মহিলার গলা থেকে টান দিয়ে চেন ছিনিয়ে নিয়ে ঝেড়ে দৌড় দিয়েছে "ছিনতাইকারী"। রিকশাঅলা নেমে বাঁই বাঁই করে দৌড়াচ্ছে, এক পেটমোটা সার্জেন্ট বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে একটা বেতের লাঠি বার করে দৌড় শুরু করলো। আমি যে রিকশায় ছিলাম সেই রিকশার চালক শুকনো পটকা, কোত্থেকে তার শরীরে আসুরিক শক্তি ভর করলো, সে আমাকেসুদ্ধু রিকশা টানতে শুরু করলো পঙ্ক্ষীরাজের মতো। আমার কয়েকগজ সামনে ছিনতাইকারী লোকটা ছুটছে, তার পরনে বেশ দামী লুঙ্গি, গায়ের গেঞ্জিটাও বেশ, লোকটা মিশমিশে কালো, তার হাঁপানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছি রিকশায় বসে।

বেশিক্ষণ ছুটতে পারলো না লোকটা, সেন্ট জোসেফ স্কুলের সামনে এসে ধরা পড়ে গেলো সেই ছুটন্ত রিকশাওয়ালার কাছে। সাথে আরো দুয়েকজন রবাহুত। কয়েকজন মিলে শক্ত করে পাকড়াও করেছে লোকটাকে, আর লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, "কী হইছে ভাই?" আমার রিকশাওয়ালা তাকে দু'ঘা লাগানোর জন্য লাফিয়ে নামলো, আমি বহু কষ্টে তাকে নিবৃত্ত করি।

আমি যতক্ষণ রিকশায় বসেছিলাম, খুব মায়া হচ্ছিলো ব্যাটার ওপর, মনে মনে চাইছিলাম ও জিতে যাক। কেন কে জানে।


হাঁটুপানির জলদস্যু

নিঘাত তিথি এর ছবি

হুমম।

--তিথি

----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

মাশীদ এর ছবি

কি জানি আসলেই।
ক'দিন আগে টিচারের বাসায় যাবার পথে আমার ক্লাস নাইনে পড়ুয়া ভাতিজার রিকশা থামিয়ে দুই হাইজ্যাকার ওর মোবাইলটা নিয়ে নিল। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম শুনে। নিজেকে হাইজ্যাকার হিসেবে চিন্তা করে দেখলাম আমি কখনোই অত পুচকে একটা ছেলেকে হাইজ্যাক করতে থামাতাম না। ওর কাছে কোন টাকা তো থাকেই না, সম্বল বলতে ঐ একটা পুরনো মোবাইল সেট। ছিনতাইকারীর জন্য কোন সহানুভূতি অনুভব করিনি। আমাদের বাসার সবার এবং আমারো ধারণা এরা খুব ডেসপারেট টাইপের ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছাড়া আর কেউ নয়।


ভাল আছি, ভাল থেকো।


ভাল আছি, ভাল থেকো।

নিঘাত তিথি এর ছবি

তুমি নিজেকে হাইজ্যাকার ভেবেছো? হি হি হি। তারপরে আবার ভেবেছো যে তুমি হলে এমন করতে না? এটা হলো কিছু? তুমি এখনকার সুইট মাশীদ বলেই ভাবছো যে করতে না। আর তুমি হাইজ্যাকার হলে এখনকার মত করে ভাবতেই না!

আসলে কি জানো, সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধীর জন্যও আমার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে কেন শুরুটা হয়েছিলো ভেবে। আমি নিজের কোন কাছের কাউকে মনে করে ভাবি কখনও কখনও যে, সে কোন খারাপ কাজ করলে আমি তো শুরুতেই ক্ষেপে যাবো না, কাছের মানুষ বলেই বুঝার চেষ্টা করব কেন সে এমন করলো?
আমরা বেশ ভালো আছি। কিন্তু যারা ভালো নেই তারাও চেষ্টা করে। কেউ কেউ ভুল পথে করে, খুব ভুল পথে করে। কিন্তু কেন, কোন পরিস্থিতিতে করে সেটা আমরা হয়ত কখনই অনুভব করতে পারব না।

এ সবই খন্ড সময়ের অথবা খুব বিফল কোন ভাবনা...

--তিথি

----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।