লাইসেঙ্কোইজম

অভিজিৎ এর ছবি
লিখেছেন অভিজিৎ (তারিখ: রবি, ০২/১১/২০০৮ - ৯:০২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

auto

ইমরান হাবিব রুমন নামে এক ভদ্রলোক লাইসেঙ্কোর উপর একটি লেখা পাঠিয়েছেন; এটি পড়ে আমি খুব একচোট হেসে নিলাম। ভদ্রলোকের লেখা পড়ে আমি বুঝতে পারছি কেন আজকে বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার এত দুর্গতি। লাইসঙ্কোর ভুল মতবাদ যা আজ জেনেটিক্স এবং বিবর্তন বিজ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়েছে আজ নয় - অন্ততঃ পঞ্চাশ বছর আগে,এবং ইতিহাসে তার মতবাদ কুখ্যাত হয়ে আছে লাইসেঙ্কোইজম অভিধায়, আর হঠাৎ করে এতদিন পর সেই লাইসেঙ্কোকে বাংলাদেশী ফোরামে প্রমোট করতে দেখে হাসি পাওয়ার পাশাপাশি অবাকও হলাম। এ যেন প্রবন্ধ লিখে নতুন করে প্রমাণ করতে আসা কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব নয়, টলেমীর ভূ-কেন্দ্রিক তত্ত্বই সঠিক। এ ধরনের প্রন্ধের উত্তর দিতে গিয়েই কি নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী পাউলি মন্তব্য করতেন - 'These theories are so bad that they are not even wrong'? লাইসেঙ্কো অনেকদিন ধরেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন এক 'ঠগ্' বিজ্ঞানী হিসেবে, দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন রাজনৈতিক শক্তির অপব্যাবহারকারী এবং 'বিজ্ঞানেরর পাঙ্গামারা' উগ্র কমিউনিস্ট ভাবাদর্শধারীদের দ্বারা চালিত রাষ্ট্রশক্তির এক পতিত ক্রীড়নক হিসেবে। খুবই হতাশাজনক যে, সেই বহুল-বর্জিত, অপাংক্তেয় লাইসেঙ্কো সাহেবের পরিত্যক্ত এবং বাতিল তত্ত্বের গুণগান গেতে এসেছেন রুমন সাহেব এই একবিংশ শতকে এসে তথাকথিত আদর্শের বুলি কপচিয়ে। তিনি বলেছেন, 'বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের জন্য' নাকি লাইসেঙ্কো খুবই জরুরী! তার মতে মেন্ডেলের বংশগতি তত্ত্ব নাকি ছিল 'ভাববাদী', আর এই ভাববাদী চেতনার মুলে কুঠারাঘাত করেছিলেন লাইসেঙ্কো! তাই নাকি?

বাংলাদেশে কিছু বাম ভাবধারার লোকজন আছেন যারা আধুনিক বিজ্ঞান সম্বন্ধে একেবারে ক'অক্ষর গোমাংস (কঠোর মন্তব্যের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী)। এরা ভাবেন বিজ্ঞান বুঝি কেবল আদর্শ দিয়ে চালিত হয়। এরা সুযোগ পেলেই অমুক বিজ্ঞান 'ভাববাদী', তমুক বিজ্ঞান 'বুর্জোয়া' ইত্যকার বিশেষনে বিশেষিত করে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে খাটো করে প্রমাণ করতে চান তার চেয়ে নিজেদের নিজ নিজ মতাদর্শ বিজ্ঞানের থেকে অনেক উন্নততর। কখনো এরা বিজ্ঞানকে ছুঁড়ে ফেলতে ধর্মের কোলে আশ্রয় নেন, কখনো বা আশ্রয় নেন অন্য বস্তাপঁচা বাতিল হয়ে যাওয়া আদর্শের কিংবা অপবিজ্ঞানের। এ যুগে এসে পতিত লাইসেঙ্কোকে নিয়ে রুমন সাহেবদের মাতামাতি আমার সেরকমই মনে হয়েছে। এরা বোঝেন না, বিজ্ঞান কোন আদর্শ দিয়ে চালিত হয় না। বিজ্ঞান টিকে আছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। মোটা দাগে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতির অনুক্রমটি হল এরকম -

১) প্রকৃতিক ঘটনা বা প্রপঞ্চের পর্যপেক্ষণ করা

২) প্রপঞ্চের কারণ অনুমান করে একটা সাময়িক বা অস্থায়ী ব্যাখ্যা বা অনুকল্প প্রদান ।

৩) কৃত্রিম পরিবেশে পরীক্ষা করা। পরীক্ষা থেকে পাওয়া যায় ডেটা বা উপাত্ত।

৪) প্রাপ্ত উপাত্ত পূর্বোক্ত অনুকল্প বা অনুসিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপুর্ণ কিনা তা যাচাই করা।

৫) প্রাপ্ত উপাত্তের বিশ্লেষণ অনুকল্পটির সাথে মিলে গেলে বার বার পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করা হয়। এতে কোন ব্যতিক্রম না পাওয়া গেলে অনুকল্পটিকে ‘তত্ত্ব’ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। আর অনুকল্পের সাথে উপাত্তের বিশ্লেষন না মিললে পূর্বের অনুকল্পটি বাতিল করা হয় এবং শুরু হয় নতুন অনুকল্পের অনুসন্ধান।

৬) তত্ত্ব থেকে আরো নতুন নতুন অনুসিদ্ধান্তে বা অবরোহে উপনীত হওয়া, পূর্বাভাস প্রদান করা। নতুন পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা বারংবার এগুলো সঠিক বলে প্রমাণিত হলে, প্রপঞ্চটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কিছু প্রপঞ্চকে তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করতে পারলে, তত্ত্বটিকে প্রকৃতিক আইনের (Natural Law) মর্যাদা প্রদান করা হয়।

কাজেই বিজ্ঞান ভাববাদ কিংবা ভাগ্যবাদের উপর টিকে নেই - টিকে আছে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নির্ভর নিগূঢ় পদ্ধতির উপরে। বিজ্ঞানে কোন পয়গম্বর নেই, নেই কোন পুরোহিত - পরীক্ষা নিরীক্ষার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ না হলে যে কোন পয়গম্বরের তত্ত্ব এখানে বাতিল হয়ে যায় - তা যতই আদর্শবাদী কিংবা 'মনোমুগ্ধকর' ঠেকুক না কেন কারো কারো কাছে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি বলেই ল্যামার্কিজম এবং লাইসেঙ্কোজম একসময় বাতিল হয়ে গেছে, আর মেন্ডেল আর ডারউইনের তত্ত্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই এখন জীববিজ্ঞানে এখন বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছে। আজকে যে কোন জীববিজ্ঞানের মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক লেভেলের পাঠ্যবই খুললেই মেন্ডেলের তত্ত্ব পাওয়া যাবে। মেন্ডেলের বংশগতি তত্ত্ব খুব গুরুত্ব দিয়ে দিয়ে ছাত্রদের পড়ানো হয় সব জায়গাতেই, সব দেশেই - তা রুমন সাহেবদের কাছে যতই 'ভাববাদী' ঠেকুক না কেন। আর লাইসেঙ্কো নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

যারা লাইসেঙ্কো এবং লাইসেঙ্কোজম সম্বন্ধে সম্যক অবগত নন, তাদের জন্য এর বিবর্তনের ইতিহাস একটু বয়ান করা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব একাডেমিয়ায় স্বীকৃত হলেও ডারউইনের সময় পর্যন্ত বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলো ঠিক কিভাবে কাজ করে কিংবা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চালিত হয় তা সম্পের্ক বিজ্ঞানীদের কোন স্পষ্ট ধারণাই ছিলো না। ল্যামার্ক ১৭৪৪- ১৮২৯) নামের এক বিজ্ঞানী তত্ত্ব দেন যে, অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলো স্রেফ পরিবেশের ফল। জীবের যে অংগগুলো তার জীবনে বেশি ব্যবহৃত হয় সেগুলো আরও উন্নত হতে থাকে, আর যেগুলোর বেশী ব্যবহার হয় না সেগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় বা বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। তার মধ্যে একটা অত্যন্ত জনপ্রিয় উদাহরণ হচ্ছে জিরাফের গলা লম্বা হয়ে যাওয়ার কেচ্ছা কাহিনী। জিরাফের গলা লম্বা হওয়ার ল্যামার্কীয় ব্যাখ্যা হল - 'লম্বা লম্বা গাছের ডগা থেকে কঁচি পাতা পেরে খাওয়ার জন্য কসরত করতে করতে বহু প্রজন্মের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে জিরাফের গলা লম্বা হয়ে গিয়েছে'। অর্থাৎ, ল্যামার্কের তত্ত্বের মূল কথা ছিল - অভিযোজনের কারণ হল পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেহের অংগসমূহের পরিবর্তন ঘটা। ল্যামার্ক আরও বললেন যে, একটি জীব তার জীবদ্দশায় ব্যবহার বা অব্যবহারের ফলে যে বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করে সেগুলো তার পরবর্তী প্রজন্মে বংশগতভাবে সঞ্চারিত হয়। কিন্তু এটা কি ঠিক ব্যাখ্যা হল? কিন্তু ডারউইন এটা ঠিকই বুঝে ছিলেন যে, কোন অঙ্গের ব্যবহারের উপর নির্ভর করে জীবের বিবর্তন ঘটে না, প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করার জন্য শুধুমাত্র বংশগতভাবে যে বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মে দেখা যায় তারাই দায়ী। যে বৈশিষ্ট্যগুলো আপনি আপনার পূর্বপুরুষের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আপানার দেহে পান নি, তার উপর বিবর্তন কাজ করতে পারে না। সেজন্যই মানুষ যতই চেষ্টা করুক কিংবা হাজার কসরত করুক তার পীঠের হাড্ডী পরিবর্তিত হয়ে পাখায় রূপান্তরিত হয়ে যায় না। আমার পায়ে জুতা পড়তে পড়তে ঠোসা গজালে, আমার বাচ্চা জন্ম নিলে তার পায়েও ঠোসা গজায় না।

এখানেই সমস্যার সমাধান নিয়ে আসেন গ্রেগর মেন্ডেল (১৮২২-১৮৮৪), যিনি ১৮৬৫ সালেই তার মত করে আধুনিক জিনতত্ত্বটি (যদিও তিনি 'জিন' শব্দটি কথাও উল্লেখ করেন নি) প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি মটর গাছ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে ১৮৬৬ সালে বংশগতির মৌলিক নিয়মগুলো আবিস্কার করেন, যদিও তার কাজের কথা ১৯০০ সাল পর্যন্ত অজানাই থেকে যায়। তিনি মা বাবার দুজনের মধ্যে বিদ্যমান বংশগতির একক বা বৈশিষ্ট্যগুলোকে 'ইউনিট ক্যারেক্টর' বলে আভিহিত করেছিলেন, তবে, পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে উইলিয়াম জোহান্সেন একে জিন হিসেবে নামকরণ করেন। মেন্ডেল দেখালেন যে, ছেলে মেয়ের প্রত্যেকটা বংশগত বৈশিষ্ট্য মা বাবার কোন না কোন 'ইউনিট ক্যারেক্টর' দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে। বাবা মার কোষের ভিতরের এই ফ্যাকটর বা জিনগুলো একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত হয়। এখন আমরা জানি যে, জিন হচ্ছে ডিএনএ দিয়ে তৈরি বংশগতির একক, যার মধ্যে কোষের বিভিন্ন রকমের তথ্য বা কোড জমা থাকে। বাবা এবং মার যৌন কোষে এই জিনগুলো থাকে, তাদের ছেলে মেয়েরা নিজেদের প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যের জন্য দুজনের থেকে একটা করে জিন পেয়ে থাকে। এই জিনগুলোর মধ্যে কোনরকম কোন মিশ্রণ ঘটে না এবং একটা বৈশিষ্ট্যের জিন আরেকটার উপর কোনভাবে নির্ভরশীল নয়।

অর্থাৎ, আমার চোখের রং-এর বৈশিষ্ট্যের সাথে নাকের আকারের বৈশিষ্ট্যের কোন সম্পর্ক নেই, প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যের জিন আলাদা আলাদা - স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। উত্তরাধিকার সুত্রে আমি আমার বাবা বা মার কাছ থেকে কোন একটা জিন পেলে পাবো, নয়ত পাবো না - এর মাঝামাঝি কোন ব্যবস্থা এখানে নেই। এভাবেই, জিনগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘ইউনিট ক্যারেক্টার’ হিসেবে প্রবাহিত হয়ে আসছে বিভিন্ন জীবের মাঝে – মিশ্রিত না হয়েই। ডঃ রিচার্ড ডকিন্‌স খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এই ব্যাপারটাকে -

একেকটি বিচ্ছিন্ন জিন একে অপরের সাথে 'পুডিং-এর উপাদানগুলোর' মত ভর্তা হয়ে না মিশে বরং তাসের প্যাকেটে রাখা তাসের মত 'সাফল্‌' করে করে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।

আর এই আবিষ্কারটির ফলেই বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এসে প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব সম্পর্কে অন্যতম প্রধান বিরোধটির নিরসন হলো। বিজ্ঞানীরা কেবল তত্ত্ব দিয়েই দেখেননি, পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও দেখেছেন ল্যামার্কের তত্ত্ব ভুল, মেন্ডেলের বংশগতির তত্ত্বই ঠিক। যেমন, জার্মান জীববিদ আগস্ট ভাইজমান জন্মের সাথে সাথে সাদা রঙের ছোট জাতের ইদুর ছানার লেজ কেটে দিয়ে বাইশটি প্রজন্মে সদ্য-ভূমিষ্ট ছানার লেজের দৈর্ঘ্য কমে কিনা তা মেপে দেখলেন। দেখা দেল, সদ্যভূমিষ্ট ছানার লেজের দৈর্ঘ্য কমেনি বা বাড়েনি। এ পরীক্ষা থেকে ভাইজমান পরিস্কারভাবে দেখালেন, জীবদেহে পরিবেশ দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশানুসৃত হয় না। এভাবে তিনি ল্যামার্কবাদের মূল-ভিত্তিটি ধ্বসিয়ে দেন। ভাইজম্যানের পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন বিজ্ঞানী বস এবং শেফার্ডসও। তারাও যথাক্রমে ইদুর এবং কুকুরের কান কেটে কেটে পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন। তারাও একই রকম ফলাফল পেয়েছিলেন। এরকম পরীক্ষা কিন্তু মানুষ বহুকাল ধরেই করে এসেছে। যেমন, ডোবারম্যান কুকুরের লেজ কেটে ফেলা, ইহুদী এবং মুসলমান বালকদের খৎনা করা, চীনদেশে একসময় প্রচলিত প্রথা অনু্যায়ী মেয়েদের পা ছোট রাখার জন্য লোহার জুতো পড়ানো, অনেক আফ্রিকান দেশে মেয়েদের ভগাঙ্গুর কেটে ফেলা, উপমহাদেশে মেয়েদের নাকে এবং কানে ছিদ্র করা ইত্যাদি। কিন্তু এর ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আকাংকিত লক্ষণটির আবির্ভাব হয় নি। ল্যামার্কের তত্ত্ব সঠিক হলে তাই ঘটার কথা ছিলো।

আর অন্যদিকে, গত একশ বছরে জেনেটিক্স এবং মাইক্রো-বায়োলজী বা অনু-জীববিদ্যা এগিয়ে গেছে অকল্পনীয় গতিতে, ক্রোমোসোম, ডিএনএ এবং মিউটেশন থেকে শুরু করে মানুষের জিনোমের পর্যন্ত হিসাব বের করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাওয়া গেছে মেন্ডেলের তত্ত্বের সার্থকতা। ডিএনএর আবিষ্কারসহ বংশগতিবদ্যা, জনপুঞ্জ বংশগতবিদ্যা , বা জিনোমিক্সসহ জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যত এগিয়ে গেছে ততই আরও বিস্তারিতভাবে মেন্ডেলের বংশগতি তত্ত্ব এবং বিবর্তন তত্ত্বের সঠিকতা প্রমাণিত হয়েছে। মেন্ডেলীয় বংশবিদ্যার কারণেই বিজ্ঞানীরা আজ 'জিন' নামে অভিহিত বংশগতীয় দ্রব্যের কাজ, আচরণ এবং প্রকৃতি অনুসন্ধান করতে পারেন, তারা বুঝতে পারেন জিনে হঠাৎ কোন স্থায়ী পরিব্যক্তি বা মিউটেশন ঘটলে তা কিভাবে, কোন নিয়মে বংশানুক্রমিত হয় তা নির্ণয় করতে পারেন, ক্রোমোজমে জিনের অবস্থান, বিন্যাস ও সংযুক্তি বের করতে পারেন। মেন্ডেলের বংশবিদ্যার গবেষণার কারণেই আজ খুলে গেছে আনবিক বংশগতিবিদ্যার রুদ্ধ দুয়ার। তৈরি হয়েছে বংশগতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণার বিভিন্ন শাখা - অনুজীবীয় বংশগতিবিদ্যা, ব্যাকটেরীয় বংশগতিবিদ্যা, ড্রসোফিলা বংশগতিবিদ্যা কিংবা মানব বংশগতিবিদ্যা। জৈবসংগঠনের পর্যায় বা স্তরভেদে এর শাখা আছে - আনবিক বংশগতিবিদ্যা, প্রাণ বংশগতিবিদ্যা, বিকাশীয় বংশগতিবিদ্যা, জনপুঞ্জ বংশগতিবিদ্যা, প্রতিরোধীয় বংশগতিবিদ্যা, পরিবেশ বংশগতিবিদ্যা এবং ইকোলজিকাল বংশগতিবিদ্যা ইত্যাদি। মেন্ডেলের তত্ত্বের সাফল্য কি কেবল ভাববাদ কিংবা ভাগ্যবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় নাকি 'বুর্জোয়া বিজ্ঞান' নামে অভিহিত করে প্রতিরোধ করা যায়?

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারায় উনবিংশ শতকের প্রথম দিকেই ল্যামার্কবাদের মৃত্যু ঘটে যায়, আর টিকে থাকে কেবল মেন্ডেলের বংশগতির আলোকে আধুনিক বিবর্তনবাদ। ব্যাতিক্রম থেকে যায় কেবল ‘মার্ক্সবাদী’ সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেদেশে ত্রিশ চল্লিশের দশকে মার্ক্সবাদী নেতাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন পুঁজি করে ল্যামার্কিজমের ‘ভুডু সায়েন্স’ এর চর্চার নেতৃত্ব দিয়ে যান ত্রসিম দেনিসোভিক লাইসেঙ্কো (Trofim Denisovich Lysenko)। আমি মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান? নামক প্রবন্ধে দেখিয়েছিলাম সোভিয়েত নেতৃত্ব সেসময় জেনেটিক্স বা মেন্ডেলের বংশগতিকে পাত্তা না দিয়ে কেবল ল্যামার্কের পরিবেশ নির্ণয়বাদকে আদর্শ হিসেবে মনে করতেন, কারণ তা তাদের 'সাম্যবাদের বাণী' প্রচারে সহায়তা করে - সব মানুষ সমান; মানুষের ভাল, খারাপ লোভ লালসা - কেবল পরিবেশের ফল! আর এ কারণেই মার্ক্স কিংবা তার পরবতী তাত্ত্বিক কমিউনিস্টরা তাদের অনেক বাণীতেই এটাই জোরের সাথে বলেছিলেন যে মানুষের সকল বৈশিষ্ট্যই পরিবেশের কারণ, এর সাথে বংশের কোন যোগ নেই। লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) এবং তার সমসামিয়ক নেতারা ভাবতেন, বিজ্ঞানকেও 'মার্ক্সিজমের ছাকুনি'র মধ্য দিয়ে যেতে হবে, নইলে পরিশুদ্ধ হবে না! এ প্রসংগে জন গ্রান্ট তার ‘করাপ্টেড সায়েন্স’ গ্রন্থে লিখেছেন -


A peasant amateur agronomist called Trofim D Lysenko came upon the scene, and it was the USSR’s considerable misfortune that he did so at a time when earlier foolish ideas of V. I. Lenin that science should be in accordance with such Marxist and Engelian concepts as dialectical materialism were being hardened into political dogma by Stalin. A corollary of Marxism is that human nature can be mounded: such motivation as greed and ambition can be sublimated to serve society as a whole rather than just an individual. The essential madness of Lysenko was in thinking that the basic nature of plants (i.e. their genetic coding) could be mounded in the same way. That he should use Marxism as a guide in this and in much else was not illogical, in a way, because under the Soviets, Marxism was regarded as itself a science! ।

সোভিয়েত ইউনিয়নে লাইসেঙ্কোর উত্থান একেবারে শূন্য থেকে ঘটেনি। তিনি আবার কৃপাধন্য ছিলেন ভ্লাদিমিরোভিচ মিচুরিয়ান নামের আরেক জোচ্চর বিজ্ঞানীর। দার্শনিক এবং রাজনৈতিক কারণে ভ্লাদিমিরোভিচ মিচুরিয়ান বংশগতিকে ঘৃণার চখে দেখতেন। কিন্তু তার মতামত পার্টির মতাদর্শের সাথে ‘সঙ্গতিপূর্ণ’ থাকায় তিনি পার্টির প্রিয়পাত্র ছিলেন। মিচুরিয়ানের হাইব্রিডাইজেশনের বিভিন্ন পরীক্ষার অসারতা রাশিয়ার প্রখ্যাত জেনেটিক্স জানা বিজ্ঞানীরা তখনই ধরিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মিচুরিয়ান পার্টির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে সমস্ত বিজ্ঞানীদের 'মিথ্যুক' হিসবে প্রতিপন্ন করেন।

এই মিচুরিয়ানেরই যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন লাইসেঙ্কো। তিনি ভার্নালাইজেশন নামক একটা প্রক্রিয়াকে প্রমোট করলেন প্রজাতির পরিবর্তনের পেছনে। তিনি দাবী করলেন ভার্নালাইজেশনের প্রভাবে প্রজাতির চরিত্রও বদলে দেয়া সম্ভব। তিনি মনে করতেন মেন্ডেলবাদ আর তার বংশগতিতত্ত্ব ভুল। বলতেন, ক্রোমোজম বা তাতে স্থিত জিন নয়, জীবের বৈশিষ্ট নিয়ন্ত্রণ করে আসলে সাইটোপ্লাজম। আর সাইটোপ্লাজম তা করে থাকে জীবের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম দিয়ে। এখন বিপাক ক্রিয়া যেহেতু পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, অতএব বংশগতিও পরিবেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে। এই হচ্ছে সাদামাঠাভাবে লাইসেঙ্কোর মার্ক্সবাদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ 'বৈজ্ঞানিক' তত্ত্ব, যা তিনি তৈরি করেছিলেন ১৯৩৫ সালের দিকে। তবে তার গবেষণার ফলাফল প্রখ্যাত জার্নালে প্রকাশ না করে নিউজপেপারে পাঠাতেন আর সাধারণ মানুষ আর ক্ষমতালোভী রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোধা শক্তিকে কাজে লাগাতেন নিজের পদ সুরক্ষিত রাখতে (একই ধরনের ঘটনা আজ আমরা দেখি বুশের জামানায় - 'ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন'কে বিবর্তনবাদের বিপরীতে প্রমোট করার দুরভিসন্ধিতে)। লাইসেঙ্কো পরে নিজের মুখপত্র হিসেবে Yarovizatya নামে একটা বৈজ্ঞানিক জার্নাল কুক্ষিগত করে এর সম্পাদনা শুরু করেন।

জারের আমল থেকেই রাশিয়ায় ডারউইনবাদ আর বংশবিদ্যা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলো। রাশিয়া ছিলো জেনেটিক্সের গবেষনায় শীর্ষস্থানে। কিন্তু লাইসেঙ্কো নামের ঠগ বিজ্ঞানীর আগমনে আর সমাজতন্ত্রের 'ছাকুনির' পাল্লায় পড়ে রাশিয়ায় জেনেটিক্সের বারোটা বেজে যায়। স্বাভাবিকভাবেই যে সমস্ত বিজ্ঞানীরা বংশগতির আধুনিক গবেষণা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন, তারা লাইসেঙ্কোর অবৈজ্ঞানিক মতবাদের বিরোধিতা শুরু করেন। কিন্তু লাইসেঙ্কো সে সমস্ত বিজ্ঞানীদের বুর্জোয়া 'মেন্ডেল-মগার্নবাদের' সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের কন্ঠরোধ করে দেন। ১৯৪৮ সালে সারা সোভিয়েত কৃষিবিজ্ঞান একাডেমির কংগ্রেসে এ বিষয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক হয়। লাইসেঙ্কো এতে নতুন একটি অস্ত্র ব্যবহার করেন। তিনি ঘোষণা করেন,

আমার তত্ত্ব অনুযায়ী বসন্তকালীন গমকে শীতকালীন গমে রূপান্তর করা গিয়েছে, এবং এর ফলে উত্তরের শীতপ্রধান যে সমস্ত অঞ্চলে গম চাষ করা যাচ্ছে না, সেখানেও তা করা যাবে। এতে সমস্ত দেশে কৃষিবিপ্লব হয়ে যাবে।

আর যায় কোথায়। 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের' ধ্বজাধারী সৈনিকেরা লাইসেঙ্কোর মধ্যে মার্ক্সিজমের জয় জয়কার খুঁজে পেলেন। স্ট্যালিনের উদ্যোগে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি লাইসেঙ্কোর মতের সমর্থনে প্রস্তাব গ্রহণ করে। সুতরাং লাইসেঙ্কোর তত্ত্ব অফিশিয়ালি 'মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ' সম্মত হয়ে যায়। তাকে মস্কো ইন্সটিটিউট অব জেনেটিক্সের ডাইরেক্টর করে দেয়া হয়। আর লাইসেঙ্কোর নির্দেশেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্ত গবেষণা পরিচালনা করা হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে লাইসেঙ্কো খোদ ডারউইনের 'প্রাকৃতিক নির্বাচনের' বিরুদ্ধেই জিহাদ শুরু করেন, আর বলতে থাকেন এই সমস্ত 'কম্পিটিশন', আর 'সার্ভাইভাল অব ফিটেস্ট'-এর মত ব্যাপার স্যাপার হচ্ছে বুর্জোয়া জিনিস - এগুলো মার্ক্সিজমের 'সহমর্মিতা' এবং 'সহযোগিতা'র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি হরমোনের অস্তিত্বও অস্বীকার করেন এবং হরমোন প্রয়োগে দেহহত কোন পরিবর্তনকেও অস্বীকার করতেন। আর তিনি যা করতেন সবই পার্টি কর্তৃক বাহবা পেয়ে যেত।

auto
ছবি - লাইসেঙ্কোইজমের বিরোধিতা করায় ভাভিলভকে গুলাগে ঢুকিয়ে মারা হয়

এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। সোভিয়েত ইউনিয়নে মেন্ডেলীয় বংশগতির চর্চা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। লাইসেঙ্কোর বিপরীত মতের সমর্থক বিজ্ঞানীদের সবাইকে গণহারে চাকুরীচ্যুত করা হয়। অনেকেই গ্রেফতার হন। এদেরকে নানাভাবে স্ট্যালিনীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়। এন আই ভাভিলভের (১৮৮৭-১৯৪১) মত বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীকে গুলাগে ঢুকিয়ে পচিয়ে মারা হয়। শুধু ভাভিলভ নয়, জি ডি কার্পেচেঙ্কো (১৮৯৯-১৯৪১), সালোমন লেভিট, ম্যাক্স লেভিন, ইজ্রায়েল এগোল - এমনকি আমেরিকান বংশগতিবিদ এইচজ়ে মুলারের (১৮৯০-১৯৬৭) মত বিজ্ঞানী এবং 'কমিটেড কমিউনিস্ট'কে 'বুর্জোয়া' আখ্যা দিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে লাইসেনঙ্কোর ভুল ভাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর স্ট্যালিনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় এক কোটি লোক মারা যায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, এত লোকের মৃত্যু দেখেও সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের কোন বোধদয় হয়নি। তারা দুধ কলা দিয়ে বছরের পর বছর লাইসেঙ্কোকে পুষেছেন আর মার্ক্সিজমের মোড়কে পুরে লাইসেঙ্কোজমের চর্চাকে উৎসাহিত করেছেন। 'মার্ক্সিস্ট বিজ্ঞানের' সাথে বাস্তবতা না মিললে বাস্তবতাকেই ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছেন।

এমনকি স্ট্যালিনের মৃত্যুর পরও লাইসেঙ্কো প্রথম দিকে নিকিতা ক্রুশ্চেভের (১৮৯৪-১৯৭১) কৃপা পেয়ে গেছেন দেদারসে। তারপরও কালের করাল গ্রাসে সবকিছুরই একময় শেষ আসে। সমাপ্তি আসে লাইসেঙ্কো জামানারও। মূলতঃ ক্রুশ্চেভের সময় থেকেই সোভিয়েত নেতৃত্ব বুঝতে শুরু করলেন লাইসেঙ্কোইজমের প্রয়োগে তাদের কৃষিক্ষত্রের বারোটা বেজে যাচ্ছে। লাইসেঙ্কীয় তুক তাক, ঝাড়ফুক আর অপবিজ্ঞান দিয়ে কৃষিকে আর টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। পশ্চিমা 'বুর্জোয়া হরমোন ট্রিটমেন্ট' (যেটাকে লাইসেঙ্কো অস্বীকার করতেন) করে যে ভেড়ার পালের দৈহিক পরিবর্তন করা সভব - তা রাশিয়ার বিজ্ঞানীরাই দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। ফলে লাইসেঙ্কোর পতন হয়ে উঠে অবশ্যাম্ভাবী। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত একাডেমী অব সায়েন্স লাইসেঙ্কো নামক ওঝাকে সরিয়ে এক সত্যিকার বায়োলজিস্টকে এর প্রধান করতে মনস্থ করে। এর ফলে জেনেটিক্স আবার রাশিয়ায় পুনর্স্থাপিত হয়। লাইসেঙ্কো আর তার ঘি-মাখন খাওয়া সাঙ্গপাঙ্গদের বিভিন্ন পদ থেকে অপসারণ করা হয়। লাইসেঙ্কোর পতন হয়ে দাঁড়ায় কেবল সময়ের ব্যাপার।

অথচ, প্রবন্ধকার দুঃখ করে লিখেছেন,

লাইসেংকো আজ জীবিত নেই। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশাতেই তাকে থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। ষ্ট্যালিনের মৃত্যুর পরেই ক্রুশ্চেভ নেতৃত্ব লেলিন রিসার্চ সেন্টারের পদ থেকে লাইসেংকোকে অপসারিত করে উক্ত প্রতিষ্ঠানে তাঁর চিন্তাধারার গবেষণার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

আহারে কি দুঃখ! 'তাঁর জীবদ্দশাতেই তাকে থামিয়ে দেয়া হয়েছিল।' - লাইসেঙ্কোর জন্য প্রাণ যেন পুড়ে যাচ্ছে একেবারে! মনে হচ্ছে যেন ষড়যন্ত্র করে লাইসেঙ্কোকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। চিরন্তন বাম ঘরনার চিন্তাবিদদের মত তিনিও সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছেন। না লাইসেঙ্কোর প্রতি কোন ষড়যন্ত্র করা হয়নি, হয়নি কোন অন্যায়। তার কর্মকান্ডই তৈরি করেছিলো তার পতনের প্রেক্ষাপট। বরং লাইসেঙ্কো যে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে এতদিন রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় টিকে ছিলো সেটাই চরম বিস্ময়। ১৯৬২ সালেই Yakov Borisovich Zel'dovich, Vitaly Ginzburg, এবং Pyotr Kapitsa বিজ্ঞানীরা লাইসেঙ্কোর কাজকে ‘ভুয়া বিজ্ঞান’ বা 'অপবিজ্ঞান' আখ্যায়িত করে তাদের সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করেন। ১৯৬৪ সালে নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আদ্রে শাখারভ জেনারেল এসেম্বলি অব সায়েন্সের একটি সভায় প্রকাশ্যেই বলেন -

He (Lysenko) is responsible for the shameful backwardness of Soviet biology and of genetics in particular, for the dissemination of pseudo-scientific views, for adventurism, for the degradation of learning, and for the defamation, firing, arrest, even death, of many genuine scientists.।

১৯৬৫ সালের সোভিয়েত মিনিস্ট্রি অব এগ্রিকালচার এবং সোভিয়েত একাডেমী অব সায়েন্স যৌথভাবে একটি প্যানেল নির্মাণ করে লাইসেঙ্কোর বিভিন্ন দাবীর যথার্থতা পরীক্ষা করতে উদ্যোগী হয়। সে প্যানেল কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণ পান যে লাইসেঙ্কোর বহু দাবীর পেছনে ছিল আসলে ব্যাপক পরিমাণে জোচ্চুরী আর জালিয়াতী (scientific fraud)। লাইসেঙ্কোকে সোভিয়েত একাডেমী অব সায়েন্স-এর ইন্সটিটিউট অব জেনেটিক্সের ডাইরেক্টর পদ থেকে অপসারণ করা হয় –যেটা তিনি ১০৪০ সাল থেকে একচ্ছত্রভাবে অধিকার করে রেখেছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্র থেকে লাইসেঙ্কোর সমস্ত মতবাদকে অপসারণ করে সেই 'পুঁজিবাদী জেনেটিক্স' - মেন্ডেলীয় বংশগতিবিদ্যাকে পুনর্স্থাপিত করা হয় অচীরেই। কিন্তু ততদিনে বড্ড দেরী হয়ে গেছে। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা জেনেটিক্সের যে শীর্ষস্থানটি হারিয়েছিলেন তা আর ফেরৎ পাননি। ড আখতারুজ্জামান তার 'বিবর্তনবিদ্যা' বইয়ে লিখেছেন - 'কে বলবে পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পেছনে আসলে লাইসেঙ্কোজমের অবদান কতটুকু!'

প্রবন্ধকার তার প্রবন্ধের শেষে এসে অনাবশ্যক ভাবে আমাকে আক্রমণ করেছেন, তীর্যক ব্যাঙ্গ করে বলেছেন -

শুধুমাত্র ষ্টালিনের সময়কার বিজ্ঞানী বলেই লাইসেংকো সম্পর্কে বিশিষ্ট (!) বিজ্ঞান লেখক জনাব অভিজিৎ রায়-এর মন্তব্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা সহজেয় অনুমেয়।

এই অনাবশ্যক ব্যাঙ্গ এবং শ্লেষের উত্তর দেওয়ার আমার প্রয়োজন নেই। আমি কখনই নিজেকে 'বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক' ভাবি না। কিন্তু ভদ্রলোককে কি করে বোঝাই, -শুধুমাত্র 'ষ্টালিনের সময়কার বিজ্ঞানী বলেই' আমি লাইসেঙ্কোর বিরোধিতা করিনি। লাইসেঙ্কোর বিরোধিতা করেছি তার তত্ত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান প্রমোট করার কারণে, আর সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রীড়নকে পরিনত হয়ে বিজ্ঞানের বারোটা বাজানোর পাশাপাশি বহু নিরপরাধ মৃত্যুর কারণ হওয়ায়। প্রবন্ধকার কি সেটা অনুধাবন করতে পারবেন?

লাইসেঙ্কোজমের তত্ত্ব সঠিক বলা মানে কোপার্নিকাসের বিপরীতে টলেমীর ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বকে সঠিক বলার মত শোনায় আজ। শুধু আদর্শবাদ দিয়ে মিথ্যে তো ঢেকে রাখা যায় না। তারপরও যুগে যুগে আদর্শবাদের জাতাঁকলে পিষ্ট হয়ে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে এগুতে হয়েছে বিজ্ঞানকে নিরন্তর। স্ট্যালিনের রাশিয়ায়, হিটলারের জার্মানীতে কিংবা বুশের আমেরিকায় এ দৃষ্টান্ত আমরা হরহামেশা দেখেছি। বিজ্ঞানকে ভবিষ্যতে মুক্ত হতে হবে এ সমস্ত আদর্শবাদীদের খপ্পর থেকে। কোন ধর্ম, দর্শন কিংবা রাজনৈতিক মহল বিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলে বিজ্ঞানের যে আদপে কোন উন্নতি হয় না - লাইসেঙ্কোর বিয়োগান্তক পরিণতি আমাদের সে শিক্ষাই দেয়।


মন্তব্য

অভিজিৎ এর ছবি

ড. বিপ্লব পালও প্রবন্ধকার ইমরান হাবিব রুমনের একটি সমালোচনা করেছেন আজ, তা পাওয়া যাবে এখানে



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

শিক্ষানবিস এর ছবি

প্রথমে ইমরান হাবিবের প্রবন্ধটা পড়েছিলাম। আগে লাইসেঙ্কো সম্পর্কে কিছু জানতাম না। তার প্রবন্ধটা পড়েই কেমন খটকা লাগলো। কারণ লেখার ধারাটাই অবৈজ্ঞানিক। তার আবেগের আতিশয্য দেখে খটকাটা আরও বেড়ে গেলো। উইকিতে গিয়ে দেখলাম লাইসেঙ্কোর জীবনীতে ক্যাটাগরি দেয়া "Pseudoscientists"।
অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো। আপনার লেখাটা পড়ে সব ক্লিয়ার হয়ে গেলো।

ইমরান হাবিব কমিউনিজমের প্রতি অন্ধ আবেগ থেকে লিখেছেন কি-না জানি না। মনে হয় না। শেষের দিকে উনি যে বক্রোক্তি করেছেন তা থেকে মনে হয়, উনি গোড়া কমিউনিস্ট নন।
কিন্তু তার লেখায় গোড়া কমিউনিজমের আভাস স্পষ্ট। আর লেখাটা বিজ্ঞানসম্মতও নয়। নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে তার লেখাটাকে আমার বিজ্ঞানসম্মত মনে হতো:
- আবেগ বাদ দিয়ে প্রথমেই লাইসেঙ্কোর বৈজ্ঞানিক মতবাদের উত্তরণ ও সারকথা তুলে ধরা।
- কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি মেন্ডেলের বংশগতিবিদ্যাকে ভুল প্রমাণিত করেছেন তা বলা।
- বিজ্ঞানের মূল ধারায় তার প্রকল্প ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানকালে কোন বিজ্ঞানী আবার লাইসেঙ্কোইজমকে সত্য বলছেন তা উল্লেখ করা।

ইমরান হাবিব ভুলে গেছেন, যে লাইসেঙ্কোইজমকে উনি চাইলেও প্রমোট করতে পারবেন না। প্রমোট করতে হলে আরেকজন বিজ্ঞানী লাগবে, লাগবে আরেকটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। লাগবে সেই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা। এর কোন একটিও আমাদের হাতে নেই। ইমরান হাবিব কোন উপাত্ত দিয়ে তার আদর্শিক আবেগকে সাপোর্ট করতে পারেননি।

আমার কথা এটুকুই। পরিশেষে সকল অপবিজ্ঞান আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অভিজিৎ রায়কে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

- - - - - - - - - -
খান মুহাম্মদ বিন আসাদ -bkdrum.com-

nabujh এর ছবি

আপনার আলোচনা ভালো লাগল, অনকে কিছু জানতে পারলাম। তবে একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগল... আপনি ইঁদুরের লেজ কাটার যে উদাহরণ দিলেন সে ব্যাপারে কিন্তু রুমন সাহেব তার লেখাতেই বলেছেন যে:

"লাইসেংকোর মতে সকল বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনই বংশাণুক্রমিক হবে না। যেগুলো জীবদেহের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটাতে
সক্ষম, কেবল সেগুলোই হবে বংশাণুক্রমিক"

তার এ যুক্তি বিষয়ে আপনি কিছু বললেন না কেন?

রুমন সাহেব তার যুক্তির সাথে সাথে একটা উদাহরণও দিয়েছিলেন:

"হিরোসীমায় যখন বোমা ফেলা হয়, তখন তেজস্ক্রিয় রশ্মির
বিকিরণে সেখানকার মানুষদের মধ্যে এমন প্রভাব পড়ে যা তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যেও পরবর্তীকালে নিহিত হতে দেখা গেছে। একটা
গোটা জাতি বংশপরম্পরায় বিকলাঙ্গ হয়েছে বা নানা রোগ নিয়ে জন্মেছে। এই ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রমান করে যে পরিবেশ এক্ষেত্রে অতি সুক্ষ্ম মাত্রায় ক্রিয়া করে জীন এর অভ্যন্তরে কার্যকারী প্রভাব ফেলে তার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। পরিবেশ বলতে জীবের বাহ্যিক স্থুল পরিবেশকেই ধরলে চলবে না, জীবদেহের অভ্যন্তরের সুক্ষ্ম পরিবেশ (micro molecular environment) সেটাকেও যুক্ত করে সুক্ষ্ম ও স্থুল উভয় প্রকার পরিবেশের সঙ্গে জীবদেহের অবস্থান এবং দ্বন্দ্বসংঘাতকে বুঝতে হবে"

--- রুমন সাহেবের এই যুক্তি দেখে মনে হচ্ছে তিনি জিনগত প্রভাবকে অস্বীকার করছনে না কিন্তু সেই সাথে এটা বলার চষ্টো করছেন যে পরিবেশের অভিঘাত কোন কোন ক্ষেত্রে জেনেটিক কোডিং কে পরিবর্তন করে ফেলে যা পরর্বতীতে ভবষ্যিত প্রজন্মরে মাঝে বংশানুক্রমে বাহিত হয়----- এ বষিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাইছি।
আধুনিক বিজ্ঞান এবিষয়ে কি বলে? মানুষের যে সকল বৈশিষ্ট বংশানুক্রমি ভাবে বাহিত হয় তা একন্তই জেনিটিক নাকি এই জেনিটিক বৈশিষ্টও বিভিন্ন বাহ্যিক প্রভাবকের দ্বারা প্রভাবিত হয়... যেমন রুমন সাহেব এখানে তেজস্ক্রিয়তার কথা বলছেন.....?

nabujh এর ছবি

আরেকটা জিজ্ঞাসা হলো- মেন্ডেলের মত অনুসারে যদি পরিবেশের কোন প্রভাব পরবতী প্রজন্মের মাঝে না-ই যায় তা হলে ডারইউনের বিবর্তন বাদ অনুসারে প্রাণীজগতের বিবর্তন হলো কিভাবে? প্রাণীর অভিযোজিত বৈশিষ্ট তার পরবতী প্রজন্মে যদি প্রবাহিত না হয় তাহলে তা হলে বিবর্তন কি করে সম্ভব?

অভিজিৎ এর ছবি

আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অনেক কিছু বলতে হবে। আমি জানিনা এত কিছু আমি পরিস্কার করে বলতে পারব কিনা। তবুও চেষ্টা করছি।

পরিবেশের কোন প্রভাব পরবতী প্রজন্মের মাঝে না-ই যায় তা হলে বিবর্তন বাদ অনুসারে প্রাণীজগতের বিবর্তন হলো কিভাবে? সত্যই তো। ডারউইনও আপনার মত একই সমস্যায় পড়েছিলেন। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ডারউইন একধরনের মাঝামাঝি অবস্থা নিয়েছিলেন। ডারউইন ভেনেছিলেন, বংশধারা নিয়ন্ত্রক দ্রব্য তরল এবং এগুলো মিশ্রিত হয়ে লঘু হয়ে যায় এবং এভাবে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চালিত হয়। জেনকিন ডারউইনকে চিঠি দিয়ে তার ত্তত্বের এ অংশের মারাত্মক অসংগতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আবার ডারউইনের কাজিন গ্যাল্টন কালো এবং সাদা খরগোশের রক্ত পরষ্পরের মধ্যে সঞ্চালন করে দেখালেন যে, এতে বংশধারায় কোন প্রভাব পড়ে না। তিনি আরো কিছু পরীক্ষা করে প্রমাণ করলেন যে ডারউইনের 'মিশ্রণ তত্ত্বের' অনুমান ভুল । পরে মেন্ডেল দেখালেন যে, বংশধারা নিয়ন্ত্রক দ্রব্য আসলে কণাকার (particulate)। এদের কোন মিশ্রণ হয় না এবং বংশপরম্পরায় এগুলো লঘু হয় না।

পরে দ্য ফ্রিস দেখালেন বংশধারার পরিবর্তন ঘটে আসলে মিউটেশন দিয়ে। তার মতে বিবর্তনের জন্য যা দরকার তা হল মিউটেশন। (আজকের দিনের বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মিউটেশন ছাড়াও জিনের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অনেক পরিবৃত্তির উৎপত্তি হতে পারে)।

আবার জিন কিভাবে বংশানুসৃত হয় তা ১৯০৮ সালে পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করেন গনিতবিদ জি এইচ হার্ডি এবং জার্মান চিকিৎসক ভিলহেল্ম ওয়েনবার্গ। ১৯১৬ সালের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করেন যে জনপুঞ্জে এগুলো বিস্তার লাভ করতে হলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। তারা দেখালেন যে উপকারী (অভিযোজনে সহায়ক) মিউটেশনগুলো ক্ষতিকর মিউটেশন, নিরপেক্ষ মিউটেশন ও বুনো বা প্রকৃতজ জিনের তুলনায় দ্রুত জনপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়বে। এ ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা যায়,আপনার উদাহরণ- হিরোসীমায় যখন বোমা ফেলা হয়, তখন তেজস্ক্রিয় রশ্মির
বিকিরণে সেখানকার মানুষদের মধ্যে এমন প্রভাব পড়ে যা তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যেও পরবর্তীকালে নিহিত হতে দেখা গেছে। কিন্তু যেহেতু এটা ক্ষতিকর মিউটেশন (যদি আসলেই কোন মিউটেশন হয়ে থাকে) এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটি কোন বাড়তি সুবিধা নিয়ে আসেনি, প্রাক্ক্রিতিক নির্বাচনের প্রভাবেই তা বাতিল হয়ে গেছে একসময়। এটা মানব জাতির জনপুঞ্জে কোন প্রভাব ফেলেনি।

পরিবেশের গুরুত্ব আছে। বস্তুতঃ আধুনিক বংশগতিবিদ্যায় বংশধারা নিয়ন্ত্রণে জিনোটাইপের উপর পরিবেশের সক্রিয় প্রভাবের কথা স্বীকৃত। কিন্ত তারপরও জিন বা জিনোটাইপের স্থান পরিবেশ নিয়ে পারে না।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

লাইসেঙ্কোকে নিয়ে অভিজিৎ এর এবং লিংক ধরে ইমরান হাবিব রুমনের লেখাদুটো পড়লাম- সেই সাথে বিপ্লব পাল, শংকর রায় প্রমুখের প্রতিক্রিয়াও দেখলাম।
ইমরান হাবিব রুমনের লেখার ব্যাপারে আপাতত এটুকু বলতে পারি যে, তার শিরোনামটির সাথেই আমি দ্বিমত করি- বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী অর্জনে লাইসেঙ্কোকে দরকার বলে মনে করিনা, বরং বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী পুরোপুরি অর্জনে যে জায়গাগুলোতে লাইসেঙ্কো ব্যর্থ হয়েছিলেন- সেগুলোর পর্যালোচনা ও পাঠ আজ মার্ক্সবাদীদের জন্য জরুরী বলেই মনে করি, কেননা- তা নাহলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তিই ঘটবে। রুমনের লেখাটি নিয়ে পরে, অন্যত্র বা সম্ভব হলে এখানেও বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে, এক্ষণে- অভিজিৎ বর্তমান পোস্ট নিয়ে আমার কিছু বক্তব্য বা আলোচনা করার অভিপ্রায় পোষণ করি_____, যদিও, অভিজিৎ এর সাথে আলোচনা কতখানি এগুবে- আমি যথেস্ট সন্দিহান।

আমার এমন সন্দেহের কারণ পূর্বাভিজ্ঞতা, অভিজিৎ এর "মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান" শীর্ষক পোস্টে তার সাথে আলোচনা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা মোটেও সুখকর ছিল না। {অভিজিৎ এর "মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান" শীর্ষক প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় ( এক, দুই) দ্রষ্টব্য, "এক" অভিজিৎ এর পোস্টেই কমেন্ট আকারে আছে, "দুই" এর শেষ কমেন্ট সচলায়তনে ছাড়পত্র পায়নি- সেটি অভিজিৎ কে পড়ার আহবান জানাই।}
আরেকটি সমস্যা দেখি- অভিজিৎ কখনোই আলোচনার পয়েন্টে থাকেন না, ডালপালা দিয়ে আক্রমণ করতেই তার বেশী ভালো লাগে এবং কখনো কখনো বিপরীত মতকে খণ্ডিত ও বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করে এমন এক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হাজির করেন- পাঠকরা খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। একিরকম আলোচ্য পোস্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

রুমনের পুরো লেখায় মেণ্ডেলের বংশগতিবিদ্যার বিরুদ্ধে একটা শব্দও পেলাম না। অথচ, অভিজিৎ এই লেখায় এমন একটি আলোচনা- অনেক কথার মধ্য দিয়ে হাজির করেছেন যে, মনে হবে ইমরান হাবিব রুমন মেণ্ডেলের সমস্ত আবিষ্কার সমস্ত অবদানকেই উড়িয়ে দিয়েছেন!!

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুক্রম এনে হাজির করেছেন এমন ঢং এ, যেন মনেই হবে রুমনের আলোচনায় এই পদ্ধতিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, এবং বাম ভাবধারার 'বিজ্ঞান সম্পর্কে ক'ক্ষর গোমাংস' লোকেরাও আদর্শবাদীতাকে ধারণ করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুক্রমকে অস্বীকার করেন!!!

অভিজিৎ বলেছেন,

কাজেই বিজ্ঞান ভাববাদ কিংবা ভাগ্যবাদের উপর টিকে নেই - টিকে আছে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নির্ভর নিগূঢ় পদ্ধতির উপরে।

একথাটি আসে কোথেকে? কে এটির উল্টোটি দাবি করেছে? এ কথার উপস্থাপনা এমনটি মনে হয় যে, রুমন বিজ্ঞানী মেণ্ডেল ও তার অনুগামীকে ভাববাদী বলায়- যেন বিজ্ঞানকেই ভাববাদ বলে বসেছে! আসলেই কি তাই?

ইমরান হাবিব রুমনের লেখাটি আরেকবার দেখি:---

কিন্তু মেনডেল ও তাঁর অনুগামী বিজ্ঞানীরা 'জীন' এর পরিবর্তনকে পরিবেশ নিরপেক্ষ ও কার্যকারণবিহীন 'আকস্মিক' বলে মনে করেন তাহলে এটা বুঝতে অসুবিধা হয়না যে তিনি (মেনডেল এবং তার অনুগামী মরগ্যান, ভাইসম্যান প্রমুখ বিজ্ঞানীরা) এক্ষেত্রে ভাববাদী চিন্তার দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন।

পুরো লেখায় কিন্তু রুমন যে যুক্তি করেছে, সেখানে একবারের জন্য জানায়নি যে, 'মেনডেলের বংশতিগতি তত্ত্ব ভাববাদী' বা 'সেটা বিজ্ঞান নয়'।

এখন, অভিজিৎ কে যদি জিজ্ঞেস করি, প্রতিটি ক্লাসে বিজ্ঞানে মেনডেলের বংশগতি তত্ত্ব পড়ানো হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে কি এটা পড়ানো হয় যে, " 'জিন' এর পরিবর্তন 'আকস্মিক' - পরিবেশের প্রভাবমুক্ত?"- তবে অভিজিৎ কি জবাব দিবেন?

বিজ্ঞান ও দর্শন পাশাপাশি চলেছে সবসময়- বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার মানুষের নানা দার্শনিক অবস্থানকে নানাভাবে নানা যুক্তি দিয়েছে। নিউটনের ১ম গতিসূত্র থেকে একদল দার্শনিক বলা আরম্ভ করে যে, "বাইরের বল প্রযুক্ত না হলে যেহেতু স্থির বস্তু চিরকাল স্থির- গতিশীল বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকবে- ফলে, প্রথমবার কে এই বল প্রযুক্ত করলেন যে বিশ্বজগৎ অনন্ত গতিশীল হলো?"- এই ধরণের 'প্রাইম মোভার' এর চিন্তাকে যদি কেউ ভাববাদী বলে থাকে, তবে কি কেউ বলবে- নিউটনের ১ম গতিসূত্রকে ভাববাদী বলা হচ্ছে? বিজ্ঞানকে ভাববাদী বলা হচ্ছে?

এবারে আবার আসি- মেনডেল প্রসঙ্গে। "মেন্ডেল দেখালেন যে, ছেলে মেয়ের প্রত্যেকটা বংশগত বৈশিষ্ট্য মা বাবার কোন না কোন 'ইউনিট ক্যারেক্টর' দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে। বাবা মার কোষের ভিতরের এই ফ্যাকটর বা জিনগুলো একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত হয়। এখন আমরা জানি যে, জিন হচ্ছে ডিএনএ দিয়ে তৈরি বংশগতির একক, যার মধ্যে কোষের বিভিন্ন রকমের তথ্য বা কোড জমা থাকে। বাবা এবং মার যৌন কোষে এই জিনগুলো থাকে, তাদের ছেলে মেয়েরা নিজেদের প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যের জন্য দুজনের থেকে একটা করে জিন পেয়ে থাকে।" মেনডেল এর আবিষ্কার সেই ইউনিট ক্যারেক্টর কে বিজ্ঞান বলা যায়, কিন্তু সেই ইউনিট ক্যারেক্টর বা জিন আবিষ্কার থেকে যদি কেউ সিদ্ধান্ত দেন যে, "জিনেটিক কোড বলে একটা লিখন আছে- যা মানুষের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেয়- জন্মকালে পাওয়া লিখন বংশ পরম্পরায় পাওয়া- এতে পরিবেশের কোন প্রভাব নেই, এটাই হলো মানবকূলের ভাগ্যলিখন, সবকিছু পুর্বনির্ধারিত___ ইত্যাদি"- তবে সেটাকে কি বিজ্ঞান বলা যাবে? আজকের বিজ্ঞানে কি এরকম কিছু স্বীকৃত? এরকম দাবীকে যদি ভাগ্যবাদ নাম দেয়া হয় তবে কি সেটা বিজ্ঞানকেই ভাগ্যবাদ বলার সমার্থক হয়?

আপনার

আমার পায়ে জুতা পড়তে পড়তে ঠোসা গজালে, আমার বাচ্চা জন্ম নিলে তার পায়েও ঠোসা গজায় না। ------ জার্মান জীববিদ আগস্ট ভাইজমান জন্মের সাথে সাথে সাদা রঙের ছোট জাতের ইদুর ছানার লেজ কেটে দিয়ে বাইশটি প্রজন্মে সদ্য-ভূমিষ্ট ছানার লেজের দৈর্ঘ্য কমে কিনা তা মেপে দেখলেন। দেখা দেল, সদ্যভূমিষ্ট ছানার লেজের দৈর্ঘ্য কমেনি বা বাড়েনি। এ পরীক্ষা থেকে ভাইজমান পরিস্কারভাবে দেখালেন, জীবদেহে পরিবেশ দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশানুসৃত হয় না। এভাবে তিনি ল্যামার্কবাদের মূল-ভিত্তিটি ধ্বসিয়ে দেন। ভাইজম্যানের পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন বিজ্ঞানী বস এবং শেফার্ডসও। তারাও যথাক্রমে ইদুর এবং কুকুরের কান কেটে কেটে পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন। তারাও একই রকম ফলাফল পেয়েছিলেন। এরকম পরীক্ষা কিন্তু মানুষ বহুকাল ধরেই করে এসেছে। যেমন, ডোবারম্যান কুকুরের লেজ কেটে ফেলা, ইহুদী এবং মুসলমান বালকদের খৎনা করা, চীনদেশে একসময় প্রচলিত প্রথা অনু্যায়ী মেয়েদের পা ছোট রাখার জন্য লোহার জুতো পড়ানো, অনেক আফ্রিকান দেশে মেয়েদের ভগাঙ্গুর কেটে ফেলা, উপমহাদেশে মেয়েদের নাকে এবং কানে ছিদ্র করা ইত্যাদি। কিন্তু এর ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আকাংকিত লক্ষণটির আবির্ভাব হয় নি। ল্যামার্কের তত্ত্ব সঠিক হলে তাই ঘটার কথা ছিলো।

এই আলোচনাগুলো পড়ে মনে হলো- আপনি শুধু যুক্তি করার জন্যই যেন যুক্তি করছেন। ইমরান হাবিব রুমনের লেখাতেও এ ধরণের উদ্যোগগুলো সম্পর্কে কথা আছে- সেখানে ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেলে পরিবর্তনের কথা আছে, পারমাণবিক বোমার প্রভাবের উদাহরণ আছে- সেটাকে খণ্ডন করাটাই কি উচিৎ ছিল না?

"নাবুঝ" নামের ব্লগারের এক প্রশ্নের জবাবে আপনার আলোচনায় পাই,

উপকারী (অভিযোজনে সহায়ক) মিউটেশনগুলো ক্ষতিকর মিউটেশন, নিরপেক্ষ মিউটেশন ও বুনো বা প্রকৃতজ জিনের তুলনায় দ্রুত জনপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়বে। এ ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা যায়,আপনার উদাহরণ- হিরোসীমায় যখন বোমা ফেলা হয়, তখন তেজস্ক্রিয় রশ্মির বিকিরণে সেখানকার মানুষদের মধ্যে এমন প্রভাব পড়ে যা তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যেও পরবর্তীকালে নিহিত হতে দেখা গেছে। কিন্তু যেহেতু এটা ক্ষতিকর মিউটেশন (যদি আসলেই কোন মিউটেশন হয়ে থাকে) এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটি কোন বাড়তি সুবিধা নিয়ে আসেনি, প্রাক্ক্রিতিক নির্বাচনের প্রভাবেই তা বাতিল হয়ে গেছে একসময়। এটা মানব জাতির জনপুঞ্জে কোন প্রভাব ফেলেনি।

পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাড়তি সুবিধা আনা না আনা নিয়ে কি কথা হয়েছিল? মূল বিষয়টি হলো- পরিবেশের প্রভাব নিয়ে, এবং আপনার ঘুরিয়ে পেচিয়ে লম্বা আলোচনাটিতে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিই স্বীকার করলেন। এবং শেষ প্যারায় বললেন,
পরিবেশের গুরুত্ব আছে। বস্তুতঃ আধুনিক বংশগতিবিদ্যায় বংশধারা নিয়ন্ত্রণে জিনোটাইপের উপর পরিবেশের সক্রিয় প্রভাবের কথা স্বীকৃত।

যদিও এর পরে যে বাক্যটি ব্যবহার করেছেন,-
কিন্ত তারপরও জিন বা জিনোটাইপের স্থান পরিবেশ নিয়ে পারে না।

সেটি দ্বারা আসলে কি বুঝাতে চেয়েছেন- সেটা হয়তো শুধু আপনিই জানেন।

"নাবুঝ" এর এই প্রশ্নটি আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ-

মেন্ডেলের মত অনুসারে যদি পরিবেশের কোন প্রভাব পরবতী প্রজন্মের মাঝে না-ই যায় তা হলে ডারইউনের বিবর্তন বাদ অনুসারে প্রাণীজগতের বিবর্তন হলো কিভাবে? প্রাণীর অভিযোজিত বৈশিষ্ট তার পরবতী প্রজন্মে যদি প্রবাহিত না হয় তাহলে তা হলে বিবর্তন কি করে সম্ভব?

সেটির জবাবে ডারউইন কি ভেবেছিলেন, পরবর্তীতে অন্য বিজ্ঞানীরা সেটাকে কিভাবে সংশোধন করলেন এসব কথামালা সাজিয়ে কি মূল প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেন না? এক পর্যায়ে মিউটেশনের কথা বললেন- কিন্তু আজকের বিজ্ঞানীরা কি মিউটেশনকে পরিবেশের প্রভাব নিরপেক্ষ বলে দাবী করেন? অভিযোজন সহায়ক মিউটেশন কথাটি আপনি উল্লেখ করেছেন- এই অভিযোজন বিষয়টি আসলে কি?

গ্রীষ্মমণ্ডলীয়-শীতমণ্ডলীয় প্রাণী-উদ্ভিদের বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যের যেসমস্ত পার্থক্য, পরিবেশের সাথে উপযোগী অভিযোজিত পার্থক্যগুলো কেন? সেটা কি শুধু ভিন্ন বাবা-মার প্রজননের মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যের ফলাফল? স্তন্যপায়ী তিমির যে বিশেষ শ্বাস প্রণালী- তা কি করে আসলো? সেটা কি এ কারণে যে এককালের স্তন্যপায়ী কোন প্রাণী কোন জলজ মাছের সাথে সেক্স করায় যে সন্তান হয়েছে সেখান থেকে এরকম কিছু পাওয়া গেছে?

এখানে কিন্তু বংশগতি বা জিন কে অস্বীকার করা হচ্ছে না, বরং বিবর্তনের কথা স্বীকার করলে দেখা যাবে- এই জিনেরও তো বিবর্তন হয়েছে। সেই বিবর্তন শুধু বাবা-মা'র ক্রসের মাধ্যমে বিবর্তন তা নয়। অভিজিৎ এর আলোচনায় এক জায়গায় দেখলাম,

সেজন্যই মানুষ যতই চেষ্টা করুক কিংবা হাজার কসরত করুক তার পীঠের হাড্ডী পরিবর্তিত হয়ে পাখায় রূপান্তরিত হয়ে যায় না।

এটা পড়ে মওদুদির একটা যুক্তির কথা মনে পড়ে গেলো। বিবর্তনবাদকে খণ্ডাতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, "বানর থেকেই যদি মানুষ আসে, তবে দুনিয়ায় বনে জঙ্গলে চিড়িয়াখানায় কত বানর আছে, কখনো তো কোন বানরের মানুষ হওয়ার খবর পেলাম না!"

এখন কেউ যদি বলে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ভালুকদের হাজার শীতপ্রধান দেশে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তাদের সেখানকার সাদা ভালুকের মত লোমের আধিক্য বা চামড়ার নীচে চর্বির লেয়ার কি সাথে সাথে তৈরী হবে? বা সাদা ভালুক যদি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে প্রসব করে, সেই বাচ্চা ভালুক কি এখানকার কালো ভালুকের মত হবে? এমন প্রশ্নের সাথে আপনার আলোচনার কোন পার্থক্য কি আছে? আজ শুধু মানুষ কেন, যেকোন স্থলজ প্রাণীকে আপনি হাজার পানিতে নামিয়েও কি তিমির মত বিশেষ রকম শ্বাস প্রণালী অর্জন করাতে পারবেন? না সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মানে কি এই যে, বিজ্ঞান দাবী করে যে, বিবর্তন ঘটেনি?

আর আজকে আপনি যেমন মানুষের পিঠের হাড্ডি বিবর্তিত হয়ে পাখির মত ডানা হতে দেখবেন না, তেমনি বিবর্তনের কোন ধাপই হয়তো দেখতে পারবেন না। তারমানে কি এই যে, বিবর্তনের কোন পর্যায়েই কারও পিঠের হাড় বিবর্তিত হয়ে পাখির ডানায় পরিণত হয়নি বা পাখির ডানা অকেজো হয়ে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে আরেক প্রজাতির উদ্ভব হয়নি? আর এসবে কি কিসের ভূমিকা প্রধান? ভিন্ন প্রজাতির যৌন মিলন? তাহলে অযৌন প্রজননের মধ্য দিয়ে বংশবিস্তারকারী জীবের ক্ষেত্রে বিবর্তন ঘটেছে কি করে? এককোষী সরল প্রাণী থেকে বহুকোষী প্রাণী, জটিল থেকে জটিলতর গঠন, অযৌন থেকে যৌন বংশবিস্তার- এসব বিবর্তনে কি পরিবেশের কোন ভূমিকা নেই? Homo habilis থেকে Homo erectus থেকে Homo sapiens archaic থেকে Homo sapiens neandertalensis থেকে Homo sapiens sapiens- এভাবে মানুষের বিবর্তনে, এমনকি Homo sapiens sapiens এর মানুষের মধ্যে যে বিবর্তন সেটা কিকরে? মানুষের ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো, হাতের ব্যবহার, মাথার খুলি ও চোয়ালের বিবর্তন- এসব কি অপবিজ্ঞান?

হাত দিয়ে যখন মানুষ খাওয়া শিখলো, তখন আগের চেয়ে চোয়ালের ব্যবহার কমে যায়, এবং তার ফলে ধীরে ধীরে চোয়াল ছোট হতে থাকে এবং মস্তিস্কের খুলি বড় হতে থাকে- এরকম ব্যাখ্যা যদি অপবিজ্ঞান হয়ে থাকে, তবে এই ধরণের বিবর্তনের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যাটি কি হবে? সেটা কি এরকম যে, চোয়াল বড় খুলি ছোট আদি মানুষ অপর কোন চোয়াল ছোট খুলি বড় কারো সাথে যৌন মিলন ঘটানোর ফলে, পরবর্তী প্রজন্মে এই বৈশিষ্ট চলে এসেছে? কিন্তু যার সাথে যৌন মিলন ঘটানো হলো- তারই বা এমন চোয়াল ছোট-খুলি বড় অবস্থা কিভাবে হলো?

আবার উল্টোভাবে যদি আজ কেউ বলে- এখনকার কোন মানুষ যদি হাতের ব্যবহার বাদ দিয়ে শুধু মুখ দিয়ে খাওয়া আরম্ভ করে- সরাটা জীবন ধরেই এ কাজ করে- তবে তার পরবর্তী প্রজন্মের কি আবার খুলি ছোট হয়ে যাবে এবং চোয়াল বড় হয়ে যাবে? এ প্রশ্নও কি অবান্তর নয়? বিবর্তনের মডেলগুলোতে যে সময়সীমা উল্লেখ করা হয়- সেটা কি এ ধরণের দাবীগুলোকে খণ্ডাতে যথেস্ট নয়? কোন সময়ের কোন এক নিয়ান্দার্থাল মানুষ হাতের ব্যবহারে খাওয়া শুরু করলো- এবং তার বাচ্চা-কাচ্চাদের সাথে সাথে চোয়াল ছোট হয়ে গেল বা খুলি বড় হয়ে গেল- এমন দাবী কি দেখা যায়?

দুটো ইঁদুরের (অপোজিট সেক্সের) লেজ কাটার পরে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের হয়তো লেজের কোন পরিবর্তন বা বিবর্তন পাবেন না; তবে এক পাল লেজ কাটা ইঁদুরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রত্যেকের লেজ কাটা আরম্ভ করলে- লাখ বছর পরের ইঁদুরের লেজ একইরকম থাকবে কি না, সেটি জানতে ইচ্ছা করে।

চলবে---------------

অভিজিৎ এর ছবি

দিনমজুর সাহেব,
আপনার লেখা পড়লাম। আপানার মার্ক্সবাদ নিয়ে লেখা উত্তর আগে দেখা হয়নি। দেখা হল এবারে। আমি যেহেতু সচলায়ত্ন এবং মুক্তমনা ছাড়া অন্য কোথাও লিখিনা, অন্য সাইটে গিয়ে উত্তর আমি হয়ত দিতে পারব না। মুক্তমনায় এর মধ্যে এ নিয়ে একটি উত্তর ইতোমধ্যে দিয়েছি। কিছু প্রশ্নের উত্তর এখানে পেয়ে যাওয়ার কথা। বাকি যদি কিছু থেকে থাকে আপনার তা নিয়ে সময় এবং সুযোগ মত অন্য থ্রেডে আলোচনা করা যাবে। এ থ্রেডের বিষয় যেহেতু লাইসেঙ্কোইজম - সেহেতু আমরা 'বিভিন্ন দিকে ডাল পালা না ছড়িয়ে (আপনার উক্তিই ধার করলাম) মূল বিষয়ে থেকেই বিতর্ক করি, কেমন?

আর বিতর্ক করতে এসে মাথা না গরম করাই বোধহয় ভাল, তাই না? উত্তর দিতে এসে এত যুদ্ধাংদেহী হতে হবে, তার তো কোন মানে নেই। আপনি শুরুই করেছেন এভাবে -

যদিও, অভিজিৎ এর সাথে আলোচনা কতখানি এগুবে- আমি যথেস্ট সন্দিহান। আমার এমন সন্দেহের কারণ পূর্বাভিজ্ঞতা, অভিজিৎ এর "মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান" শীর্ষক পোস্টে তার সাথে আলোচনা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা মোটেও সুখকর ছিল না।

আলোচনা করার আগেই যদি আমার মোটিভ নিয়ে পড়ে যান, আর ভাবেন আলোচনা কতটুকু এগুবে - তাহলে আমার জন্য আলোচনা শুরু করা একটু মুশকিলই হয় বটে। আর আমার তো মনে পড়ে না আমি 'দিনমজুর' নামে কারো সাথে কখনো বিতর্ক করেছিলাম। এখন এই লেখা দেখে বুঝলাম, আপনিই হচ্ছেন সম্ভবত সেই বিখ্যাত ''অনুপম সৈকত শান্ত' । আপনি গালাগালির ঝড়ে সৈকত প্লাবিত করে দেওয়ার পর আবার গাল ফুলিয়ে বলেন - মডারেটর আমার কমেন্ট আটকে দিয়েছে! আপনি নিজেই আরেকটিবার পড়ে দেখেন, আপনি মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান প্রবন্ধটির উত্তর দিতে এসে কি ভাষায় আমাকে আক্রমণ করেছিলেন। আপনার পরবর্তী উত্তর হয়তো আরো জ্বালাময়ী ছিলো কে জানে! যা হোক মডারেটর কেন তখন আপনার পোস্ট আটকিয়েছিলো তারাই ভাল বলতে পারবে। আপনার আটকানো পোস্ট যেহেতু আমি আগে দেখিনি, আমার জন্য বলা মুশকিল। তবে আমি আপনার সাথে বিতর্ক শুরু করার আগে দুটো বিষয় পরিস্কার করতে চাই -

১) আসুন কথা দেই- আমরা সব সময় একই নামে বিতর্ক করব। কখনো অনুপম, কখনো শান্ত, কখনো কল্লোল, কখনো দিনমজুর নামে বিতর্ক করলে আমার পক্ষে সবাইকে উত্তর দেওয়া মুশকিল। কারো ছদ্মনাম কি হবে - তা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু তারপরো বিতর্কের জন্য একটি মিনিমাম লেভেলে এথিক্স বজায় রাখা আমি জরুরী মনে করি। দেখা গেলো আপনি দিনমজুর নামে আলোচনা শুরু করলেন, আমি প্রত্যুত্তর দিলাম। তারপর কথা নেই বার্তা নেই - হঠাৎ ভুঁইফুরে শান্ত সাহেব এসে এক পশলা গাল দিয়ে আমাকে চলে গেলেন। এ ধরনের ব্যাপার স্যাপার ঘটলে সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ আসলেই নষ্ট হয়। মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান এই থ্রেডে 'যাচাই করা হয়নি' অথিতি লেখকদের একই সুরে কথা বলার ধরণ আমাকে হতাশ করেছিলো। এমনকি তাদের বানান ভুলের ধরণও ছিল প্রায় একই রকম।

২) আপনার উপর আমার, কিংবা আমার উপর আপনার যেহেতু কোন ব্যক্তিগত রেষারেষি নেই - আমরা অযথা ব্যক্তিআক্রমণ এবং বিশেষন প্রয়োগ বাদ দেই। আমি মার্ক্সবাদ নিয়ে আপনার মনমত লিখিনি বলেই আমাকে আপনি শ্রেনীশত্রু' বানিয়ে আমার উপর চড়াও হবেন এটা তো ঠিক নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবধ বজায় রেখেও তো আমারা বিতর্কে অবতীর্ণ হতে পারি, তাই না? শুধু বক্তার উপর রাগ না ঝেড়ে আসুন আমরা বক্তার ম্যাসেজকে খন্ডন করা শিখি। ব্যক্তি আক্রমণ যেহেতু সুস্থ বিতর্কের অন্তরায় - তাই সেটা না করে বরং ম্যাসেজকে খন্ডন করাই যথেষ্ট বলে মনে করি।

আপনি যদি উপরের দুটি বিষয়ে একমত হন তবে বিতর্ক এগুবে, নয়ত আমাকে খ্যামা দিতে হবে সঙ্গত কারনেই। এবার আসি মূল প্রসঙ্গের আলোচনায়।

দিনমজুর সাহেব বলেছেন-

রুমনের পুরো লেখায় মেণ্ডেলের বংশগতিবিদ্যার বিরুদ্ধে একটা শব্দও পেলাম না।

তাই নাকি? পুরো লেখাটই তো মেন্ডেলের বংশগতিবিদ্যার বদলে লাইসেঙ্কুজমের মোড়কে ল্যামার্কিজমের সাফাই গাওয়ার বৃথা চেষ্টা। আর মেন্ডেলের তত্ত্বকে বলেছেন ''ভাববাদ'। আর মেন্ডেলের তত্ত্ব লাইসেমকোর বাতিল হয়ে যাওয়া তত্ত্ব কত উৎকৃষ্ট ছিলো তা ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন (লাইসেঙ্কওকে নাকি তার জীবদ্দশাতেই থামিয়ে দেয়া হয়েছিলো। আর আপনি বলছেন আপনি 'মেণ্ডেলের বংশগতিবিদ্যার বিরুদ্ধে 'একটা শব্দও পেলেন না? যেখানে, রুমন সাহেবারা পরিস্কার করেই বলেছেন, 'মেনডেল এবং তার অনুগামী মরগ্যান, ভাইসম্যান প্রমুখ বিজ্ঞানীরাএক্ষেত্রে ভাববাদী চিন্তার দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন' সেখানে দিনমজুর সাহেব তার সাফাই গেয়েছেন এই বলে - 'পুরো লেখায় কিন্তু রুমন যে যুক্তি করেছে, সেখানে একবারের জন্য জানায়নি যে, মেনডেলের বংশতিগতি তত্ত্ব ভাববাদী বা সেটা বিজ্ঞান নয়। এর মানে কি হল? মেন্ডেলের বংশগতি তত্ত্ব একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বোইজ্ঞানিক তত্ত্ব, সেটাকে অগ্রাহ্য করে রুমন সাহেব যখন পরিস্কার করেই অভিমত দেন -'মেন্ডেল 'ভাববাদী চিন্তার দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন' - সেখানে দিনমুজুর সাহেব কি নিয়ে বিতর্ক করছেন তা উনিই ভাল জানেন। আমি ব্যাপারটা পরিস্কার করতেই উল্লেখ করেছি - বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নির্ভর নিগূঢ় পদ্ধতির উপর, ভাববাদের উপরে নয়। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিহিন্ন স্টেপগুলোও হাজির করেছি। মেন্ডেলের তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় টিকে গেছে আর ল্যামার্কের তত্ত্ব পরীক্ষায় টিকেনি - এটাই কি বাস্তবতা নয়? এটা যদি স্বীকার করে আমরা এগোই তা হলে বিতর্কে সুবিধা হয়।

দিনমজুর বলেছেন-

এখন, অভিজিৎ কে যদি জিজ্ঞেস করি, প্রতিটি ক্লাসে বিজ্ঞানে মেনডেলের বংশগতি তত্ত্ব পড়ানো হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে কি এটা পড়ানো হয় যে, " 'জিন' এর পরিবর্তন 'আকস্মিক' - পরিবেশের প্রভাবমুক্ত?"- তবে অভিজিৎ কি জবাব দিবেন?

এবার বুঝতে পারছি আপনাদের সমস্যাটা কোথায়। যত গোলমাল রূমন সাহেবের আমদানি করা 'আকস্মিক' শব্দটি নিয়ে। আপনি এখানে আমার জন্য দুটি অপশন ছুড়ে দিয়েছেন - ১) আকস্মিক ২) পরিবেশের প্রভাব - জানতে চেয়েছেন এর মধ্যে কোনটি ঠিক। এর উত্তর হচ্ছে -দুটোই, এবং তার সাথে বাড়তি কিছু। বিস্তারিত আলোচনার আগে এধরনের প্রশ্নের যৌক্তিক দুর্বলতা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। প্রশ্নকর্তা ধরেই নিয়েছেন - দুটো অপশনের যে কোন একটিতেই সত্যতা লুকিয়ে আছে। আর কোন অপশন থাকতে পারে না। দর্শনের ভাষায় এধরনের যৌক্তিক ভ্রান্তিকে বলে 'ফ্যালাসি অব বাইফারকেশন' বা ব্ল্যাক-এন্ড ওহাইট ফ্যালাসি। কেন আকস্মিক কিংবা না হয় পরিবেশ - এ দুটোর মধ্যেই অপশন বেছে নিতে হবে? জিনের পরিবর্তনে পরিবেশের প্রভাবও আছে, আবার আকস্মিকভাবেও পরিবর্তন হতে পারে। আপনি কি 'র‌্যান্ডম মিউটেশন' -এর নাম শুনেছেন? এই র‌্যান্দম মিউটেশন আকস্মিক ভাবেই হয় - কোন নিয়ম মেনে হয় না। কিভাবে র‌্যান্ডম মিউটেশন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবে বিবর্তন ঘটে তা সংক্ষেপে জানার জন্য ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির এই সাইটটি দেখা যেতে পারে। পরিবেশ অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ, কিন্তু পরিবেশই সব কিছু নয়। পরিবেশ দিলেই যে মিউটেশন ঘটবে তা হলফ করে বলা যায় না। ফেনোটাইপের উপর পরিবেশের প্রভাব প্রমাণিত হলেও জেনোটাইপের উপরে নয়। খুব সাদামাঠাভাবে জেনোটাইপ এবং ফেনোটাইপের সম্পর্ক্টিকে নিম্নলিখিতিতভাবে দেখানো যায় -

জেনোটাইপ + পরিবেশ + র‌্যান্ডম ভ্যারিয়েশন ---> ফেনোটাইপ।

আপনি আপনার লেখায় পরিবেশের প্রভাবে যে সমস্ত বাহ্যিক পরিবর্তনের কথা বলেছেন (শীতকালীন এবং গ্রীষ্মকালীন সাদা ভালুক, কালোভালুক ইত্যাদি) সবগুলোই আসলে ফেনটাইপের পরিবর্তনের উদাহরণ। আর অপরদিকে ভালুকের যে জিন তা কিন্তু অখন্ড এবং অবিভাজ্য একক হিসেবেই পরবরতী প্রজন্মে সঞ্চালিত হচ্ছে। এ ব্যাপারটি অস্বীকার করা বোকামী। সেজন্যই ভাইজমানের পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সে পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করলেন যে, জীবদেহে পরিবেশ দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশানুসৃত হয় না ( রেফারেন্স, বিবর্তনবিদ্যা, ড ম আখতারুজ্জামান, বাংলা একাডেমী; ২য় মূদ্রণ - হাসান বুক হাউজ, পৃষ্ঠা ১৬৪)।

ল্যামার্কবাদ এবং লাইসেঙ্কুবাদের মূল সমস্যা ছিল, তারা মনে করতেন পরিবেশই সব পরিবর্তনের চাবিকাঠি। জেনেটক্সের কোন ব্যাপার স্যাপার নেই। কাজেই আপনি যে বলেছেন, 'এখানে কিন্তু বংশগতি বা জিন কে অস্বীকার করা হচ্ছে না...' তা কিন্তু ভুল। আপনি যদি ল্যামার্কের এবং লাইসেঙ্কোর তত্ত্বের ইতিহাস পড়ে দেখেন তারা জিনকে অস্বীকার করে শুধু পরিবেশ নির্ণয়বাদকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যেমন, ল্যামার্ক বলেছিলেন, 'পরিবেশের দাবী মেটাতে কিংবা নতুন প্রয়োজনের তাগিদে জীবের মধ্যে ইচ্ছা বা অভিলাস তৈরি হয়, তার নাম জীবের বাসনা। এ বাসনা পুরণ করতে কোন অঙ্গের ব্যবহার অধিকতর হলে তাতে নতুন লক্ষনা বা চরিত্র এবং কখনো কখনো নতুন অঙ্গেরও উৎপত্তি ঘটে। এভাবে ক্রমাগত ব্যবহার বা অব্যবহার থেকে অঙ্গের অবক্ষয় এবং বিলুপ্তি ঘটে (জিরাফের গলা লম্বা হওয়ার উদাহরণটি স্মরণ করুন আবারো)। ল্যামার্ক আরো ভাবতেন জীবনকালে অর্জিত লক্ষণগুলো সঞ্চয়ী (adaptive) এবং বংশানুক্রমিক হওয়াতে, একটি প্রজাতি ধীরে ধীরে নতুন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হবে। আর নব্য-ল্যামার্কবাদী লাইসেঙ্কো ভাবতেন, ক্রোমোজম বা তাতে স্থিত জিন নয়, জীবের বৈশিষ্ট নিয়ন্ত্রণ করে আসলে সাইটোপ্লাজম। আর সাইটোপ্লাজম তা করে থাকে জীবের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম দিয়ে। এখন বিপাক ক্রিয়া যেহেতু পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, অতএব বংশগতিও পরিবেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে। এ অনুসিদ্ধান্তগুলো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আমার কথা যদি আপনার বিশ্বাস না হয়, তা হলে আসুন আমরা দেখি বিবর্তনবিদ্যার উপর বিশ্বে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত এবং পঠিত Mark Ridley 'র Evolution বইটি থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যাক (Third edition, Blackwell publishing, page 257)-

'Biologists generally reject Lamarkism for two reasons. One is factual. Since Weismann, in the late ninetieth century, it has generally been accepted that acquired characteristics are as a matter of fact is not inherited. More than a century of genetics since Weisman supported this view (A few minor exception is known, but they do not challenge the general principle). The second objection is theoretical. Lamarckism by itself arguably cannot account for the evolution of adaptation...'

আপনি আমার মন্তব্য অস্বীকার করার আগে বিবর্তনের উপর লেখা পাঠ্যপুস্তকগুলোতে চোখ বোলালে ভাল হত না?
দিনমজুর বলেছেন -

এটা পড়ে মওদুদির একটা যুক্তির কথা মনে পড়ে গেলো। বিবর্তনবাদকে খণ্ডাতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, "বানর থেকেই যদি মানুষ আসে, তবে দুনিয়ায় বনে জঙ্গলে চিড়িয়াখানায় কত বানর আছে, কখনো তো কোন বানরের মানুষ হওয়ার খবর পেলাম না!"

আপনি আমার সাথে বিতর্ক করতে এসে এসমস্ত চটকদার মন্তব্য হাজির না করলেই খুশি হব। পরিবেশ দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশানুসৃত হয় কিনা তা যুক্তিনিষ্ঠ ভাবে প্রমাণের জন্য ভাইজম্যানের পরীক্ষা আর মউদুদীর উক্তি কি এক হল? আমি ল্যামার্কিজম এবং তার মোড়কে পোড়া লাইসেঙ্কোইজম খন্ডন করে যে উদাহরনগুলো হাজির করেছি সেগুলো বেশিরভাগই আপনি পাবেন ঢকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা এবং সাইটোজেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক এবং ডঃ আখতারুজ্জামান এর বিবর্তন বিদ্যা বইয়ে। আপনি দয়া করে বইটির ১৬৪- ১৬৭ পৃষ্ঠা পড়ুন, এবং বোঝার চেষ্টা করুন। ডঃ আখতারুজ্জামান মওদুদী নন, তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশী সময় ধরে বিবর্তন বিদ্যা পড়াচ্ছেন। ডোমারম্যানের লেজ কাটা থেকে শুরু করে খৎনা করা, মেয়েদের নাকে কানে ছিদ্র করার উদাহরনগুলো ১৬৭ পৃষ্ঠায় পরিষ্কার ভাবে বলা আছে। আর আপনার কাছে তা মনে হয় মওদুদীবাদ! আপনি কি সত্যই ল্যামার্কিজমের সাথে বিবর্তনবাদের পার্থক্যটি বোঝেন? আপনার প্রশ্ন শুনে কিন্তু মনে হচ্ছে না। যেমন আপিনি বলেছেন -

যেকোন স্থলজ প্রাণীকে আপনি হাজার পানিতে নামিয়েও কি তিমির মত বিশেষ রকম শ্বাস প্রণালী অর্জন করাতে পারবেন? না সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মানে কি এই যে, বিজ্ঞান দাবী করে যে, বিবর্তন ঘটেনি?

এরজন্যই মনে হয়েছে আমার যে আপনি আসলে বিবর্তন বোঝেন না। বিবর্তন অবশ্যই হয়েছে কিন্তু ল্যামার্কীয় বা লাইসেঙ্কিয় পদ্ধতিতে হয়নি। হয়েছে ডারউইনীয় পদ্ধতিতে। আপনার কি সত্যই মনে হয় নাকি পরিবশ পেয়েছিলো বলেই পাখির ডানা গজিয়েছে, তিমির বিশেষ শ্বাস নালী গজিয়েছে, আর পরিবেশ পায়িনি বলেই মানুষের তা হয়নি? তাই যদি মনে করেন - আমি আসলেই বলব বিবর্তন সম্বন্ধে আপনি আসলেই জানেন না। প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করার জন্য শুধুমাত্র বংশগতভাবে যে বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মে দেখা তাদের উপর। আর মেন্ডেলীয় আধুনিক বংশগতিবিদ্যা এবং ডারউইনের বিবর্তনর তত্ত্ব অনুযায়ী কোন জনপুঞ্জে মিউটেশন এবং জেনেটিক রিকম্বিনেশনের কারণে প্রচুর পরিমাণে প্রকারণ থাকে। যে প্রকরণগুলো বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়, সেই প্রকরণগুলোওই জনপুঞ্জে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক বিবর্তনবাদ অনুযায়ী যে সকল প্রকরণগুলো বিবর্তনের জন্য দায়ী তারমধ্যে অন্যতম হল - প্রাকৃতিক নির্বাচন, জিন মিউটেশন, ক্রোমোজম মিউটেশন, জেনেটিক রিকম্বিনেশন, জেনেটিক ড্রিফট, অন্তরণ ইত্যাদি। জেনেটিক ট্রেইট না তৈরি হয়নি বলেই পানিতে নামিয়ে দিলে তিমির মত বিশেষ রকম শ্বাস প্রণালী অর্জন করাতে পারবে না, আপনি সে পরীক্ষা যতদিন ইচ্ছে বসে করুন না কেন। কিন্তু জনপুঞ্জে যদি সেই প্রকরণ থেকে থাকে তো অন্য কথা। যেমন, ল্যামার্কের দেয়া জিরাফের উদাহরণে, জনপুঞ্জে বেটে লম্বা মাঝারি সব ধরণের গলাবিশষ্ট্য জিরাফ ছিল। প্রাকৃর্তিক নির্বাচনের কারণে লম্বা গলার জিরাফরা টিকে থাকার জন্য বেশী সুবিধা পেয়েছিলো কারণ তারা সহজেই উঁচু ডালের পাতা নাগাল পেতে পারত, তার ফলে তারাই বেশী সফলভাবে টিকে ছিলো। ফলে অন্যন্যান্য প্রকরণ থাকলেও ধীরে ধীরে একসময় জনপুঞ্জে প্রকারণ থাকলেও লম্বা গলার জিরাফের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেই প্রজাতিই টিকে গিয়েছিলো। এক্ষেত্রে ইচ্ছা, প্রয়োজন, চাহিদা বা জীবিতকালে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের কোন মূল্য নেই।

আপনার পরবর্তী অনশগুলোর উত্তর আগেই দিয়েছি। আবার দিতে গেলে পুনরুক্তি করা হবে বিধায় সরাসরি শেষ অংশে চলে যাচ্ছি।

দুটো ইঁদুরের (অপোজিট সেক্সের) লেজ কাটার পরে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের হয়তো লেজের কোন পরিবর্তন বা বিবর্তন পাবেন না; তবে এক পাল লেজ কাটা ইঁদুরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রত্যেকের লেজ কাটা আরম্ভ করলে- লাখ বছর পরের ইঁদুরের লেজ একইরকম থাকবে কি না, সেটি জানতে ইচ্ছা করে।

আপনি আবারো বিবর্তন সম্বন্ধে আপনার অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আপনি লেজ কেটে কেটে যত বছর ইচ্ছা পরীক্ষা করেন না কেন, সেটা সফল হবে না। ভাইজমান একটি দুটি প্রজন্ম নয়, ছত্রিশ প্রজন্ম ধরে লেজ কাটা ইদুর নিয়ে একই পরিক্ষা করেছেন। আপনি ইচ্ছে করলে আর পঞ্চাশ প্রজন্ম ধরে করেন না - কোন লাভ হবে না। কারন আপনি কেবল ফেনোটাইপ পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিবর্তন এভাবে কাজ করে নারে ভাই। আপনি বোধ হয় ল্যামার্কিজম থেকেই বেরুতে পারছেন না। ল্যামার্কিজমের সাথে আধুনিক বিবর্তনের পার্থক্যগুলো না জানা থাকলে এগুলো বোঝা একটু কষ্টকরই বটে।

আপনি চাইলে আমি ভাল কিছু বইয়ের নাম দিতে পারি। মাথা গরম করে তর্ক করতে না এসে এরপর বইগুলো পড়ে এসে আলোচনা করে আসলেই আমিও উপকৃত হব, সেই সাথে পাঠকেরাও।

তবে আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি আলোচনায় অংশ নেবার জন্য।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

আপনি আপনার লেখায় পরিবেশের প্রভাবে যে সমস্ত বাহ্যিক পরিবর্তনের কথা বলেছেন (শীতকালীন এবং গ্রীষ্মকালীন সাদা ভালুক, কালোভালুক ইত্যাদি) সবগুলোই আসলে ফেনটাইপের পরিবর্তনের উদাহরণ। আর অপরদিকে ভালুকের যে জিন তা কিন্তু অখন্ড এবং অবিভাজ্য একক হিসেবেই পরবরতী প্রজন্মে সঞ্চালিত হচ্ছে। এ ব্যাপারটি অস্বীকার করা বোকামী। সেজন্যই ভাইজমানের পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সে পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করলেন যে, জীবদেহে পরিবেশ দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশানুসৃত হয় না।

আপনার আলোচনাটি পরিষ্কার হলো না।
শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীনের ভালুকের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ফেনোটাইপের পরিবর্তনের উদাহরণ বলতে কি বুঝালেন? ভালুকের জিন অখণ্ড ও অবিভাজ্য একক হিসেবেই পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চালিত হচ্ছে- এর মানেও বা কি?

মানে কি এই যে, শীতকালীন ভালুক ও গ্রীষ্মকালীন ভালুকের শরীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য কেবল পরিবেশগত, এবং এই পৃথক বৈশিষ্ট বংশ পরম্পরায় অনুসৃত হয় না? অর্থাৎ আপনার বক্তব্য অনুযায়ি কি এই সিদ্ধান্তে আসবো যে, গ্রীষ্মকালীন ভালুককে শীতপ্রধান অঞ্চলে বা শীতপ্রধান ভালুককে গ্রীষ্মকালীন অঞ্চলে জন্ম পরবর্তী সময় থেকে বেড়ে তুললে যথাক্রমে শীতপ্রধান ও গ্রীষ্মপ্রধান ভালুকের বৈশিষ্টগুলো অর্জন করে ফেলবে?

বা মানুষের কথাও যদি বলি- তবে আফ্রিকার নিগ্রো দম্পত্তি গ্রীণল্যাণ্ডের বরফে সন্তান জন্ম দিলে এবং সেই সন্তান আমৃত্যু সেই ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বেড়ে উঠলেও কি সাদা চামড়ার মানুষগুলোর অনুরূপ দেখতে হবে?

যদি নাহয়, তবে বুঝতে এসব পার্থক্যও তাদের জিন গত পার্থক্যই। ভিন্ন প্রজাতির মধ্যেই শুধু জিনের পার্থক্য থাকে না, একই প্রজাতির মধ্যেও জিনগত পার্থক্য থাকে। নিগ্রো, মঙ্গোলিয়ো বা ককেশাস মানুষেরা আলাদা প্রজাতি হিসাবে গণ্য না হলেও এটা বলার উপায় নেই যে তাদের প্রতি আলিলের জিন পুল সম্পূর্ণ একই। অর্থাৎ যে জিন গায়ের রংএর জন্য দায়ী- সে জিন সাদা ও কালো চামড়ার লোকের ক্ষেত্রে ভিন্ন, তাদের ক্ষেত্রে চুলের প্রকৃতির জন্য দায়ী জিন, চোখের রং এর জন্য দায়ী জিনও ভিন্ন। নিশ্চিতভাবেই সাদাদের জিনপুল ও কৃষ্ণাজ্ঞদের জিনপুলে এক'টি জিনে পার্থক্য থাকবে।
ফলে, শুধু 'ফেনোটাইপের পরিবর্তনের উদাহরণ' বলতে কি বুঝানো হয়েছে জানলে ভালো হতো। ফেনোটাইপের সংজ্ঞায় পাই "outward, physical manifestation" of the organism. অর্থাৎ ফেনোটাইপ হচ্ছে physical parts, the sum of the atoms, molecules, macromolecules, cells, structures, metabolism, energy utilization, tissues, organs, reflexes and behaviors; এককথায় ফেনোটাইপ হচ্ছে anything that is part of the observable structure, function or behavior of a living organism. কিন্তু এই বাহ্যিক বৈশিষ্ট কিভাবে তৈরী হয় বা ফেনোটাইপের জন্য দায়ী কে? এর উত্তরে বলা যেতে পারে 'expression of an organism's genes as well as the influence of environmental factors and possible interactions between the two' এরই ফলই হচ্ছে ফেনোটাইপ। আর জেনোটাইপ হচ্ছে বংশগতির তথ্যসমূহ যা জেনেটিক কোডে লিপিবদ্ধ থাকে। এই জেনোটাইপের বাহ্যিক প্রকাশটাই হচ্ছে কিন্তু ফেনোটাইপ, তবে ফেনোটাইপের একটা রেঞ্জ আছে- যেটাকে বলা যেতে পরিবেশগত রেঞ্জ, এর নাম phenotypic plasticity (The ability of an organism with a given genotype to change its phenotype in response to changes in the environment)। কোন মানুষের চোখের কালার, গায়ের রং, সে লম্বা না বেঁটে- এগুলো সবই বাহ্যিক বৈশিষ্ট এবং এগুলো ফেনোটাইপ, এ বাহ্যিক বৈশিষ্টগুলো আবার কিছু কিছু জিন নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে এই তথ্যগুলো যে জেনেটিক কোডে লিপিবদ্ধ থাকে সেটাই হচ্ছে জেনোটাইপ। ফলে, জাপানীজদের গড় উচ্চতা আর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের লোকদের গড় উচ্চতার মধ্যে যে পার্থক্য তা যেমন ফেনোটাইপের পার্থক্য, একইভাবে জেনোটাইপেরও পার্থক্য- যদিও তারা আলাদা প্রজাতি তৈরী করেনি (যতক্ষণ আলাদা প্রজাতি তৈরী হয় নি- ততক্ষণ একই প্রজাতির এই ভিন্ন জেনোটাইপকে আলাদা প্রকরণ বলা যেতে পারে)। ফেনোটাইপের রেঞ্জের যে কথা বলেছিলাম সেটির উদাহরণ দেখিঃ সাদা চামড়া কোন মানুষ দীর্ঘদিন বিষুবীয় উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে কাটালে দেখা যায় তাদের গায়ের চামড়া কিছুটা তামাটে আকার ধারণ করে। এই পরিবর্তনও ফেনোটাইপের পরিবর্তন, জেনোটাইপের নয়। কেননা, এই কিছুটা তামাটে লোকদের পরবর্তী প্রজন্ম শীতপ্রধান অঞ্চলে বেড়ে উঠলে ঠিকই আগের সাদা চামড়া পেয়ে যায়। বা ধরুন, কোন লোক নিয়মিত ব্যায়াম করে পেশীবহুল শরীর বানালো- এটাও ফেনোটাইপের পরিবর্তন, কোন লোক প্রচুর চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়ার কারণে অনেক মোটা হয়ে গেলো, এগুলো ফেনোটাইপের পরিবর্তন- কেননা পেশীবহুল ঐ লোকের পরবর্তী প্রজন্ম সেইরকম ব্যায়াম না করলে নিশ্চয়ই একই রকম পেশীবহুল হবে না, বা মোটা ঐ লোকের পরবর্তী প্রজন্ম যথাযথ খাবার না পেলে উল্টো অপুষ্টিতে ভুগে কাঠির মত হতে পারে (মোটা বা শুকনো হওয়ার ধরণটা কিছুটা বংশগতও হতে পারে)। এরকম ফেনোটাইপের পরিবর্তনের একটা কিন্তু রেঞ্জ আছে- যা জেনোটাইপ দিয়েই নির্ধারিত, মানে ব্যায়ামের মাধ্যমে একটা সীমা পর্যন্তই পেশীকে শক্ত বানাননো যাবে, হাজার চেষ্টা করলেও গণ্ডারের মত শক্ত হবে না; মোটা হওয়ারও সীমা আছে- যত কিছুই খাওয়া হোক না কেন একজন মানুষ নিশ্চয়ই একটি হাঁতীর সমান হতে পারবে না। এই যে সীমারেখা এটাও জেনোটাইপের কারণেই।
যাহোক যেটা বলছিলাম, সীমার মধ্যে যে পরিবর্তন সেটা ফেনোটাইপের পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তন বংশপরম্পরায় অনুসৃত হয়না। কিন্তু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও শীতপ্রধান প্রাণীর বংশপরম্পরার যে বৈশিষ্টের পার্থক্য- সেটা ফেনোটাইপের পরিবর্তনের উদাহরণ বলতে যদি এরকম বুঝিয়ে থাকেন- তবে বলতে হবে আসলেই আমি আপনার এই বিবর্তনের ধারণার ব্যাপারে যথেস্টই অজ্ঞ।

আপনি আবারো বিবর্তন সম্বন্ধে আপনার অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আপনি লেজ কেটে কেটে যত বছর ইচ্ছা পরীক্ষা করেন না কেন, সেটা সফল হবে না। ভাইজমান একটি দুটি প্রজন্ম নয়, ছত্রিশ প্রজন্ম ধরে লেজ কাটা ইদুর নিয়ে একই পরিক্ষা করেছেন। আপনি ইচ্ছে করলে আর পঞ্চাশ প্রজন্ম ধরে করেন না - কোন লাভ হবে না। কারন আপনি কেবল ফেনোটাইপ পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিবর্তন এভাবে কাজ করে নারে ভাই।

একই ধরণের কমেন্ট নিচেও (৭.১.১.১.১ নং কমেন্টে) করেছেন- আমার ৫ নং কমেন্টের যে বক্তব্য দেখে আপনার এধরণের অবস্থান সেটি হলোঃ "দুটো ইঁদুরের (অপোজিট সেক্সের) লেজ কাটার পরে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের হয়তো লেজের কোন পরিবর্তন বা বিবর্তন পাবেন না; তবে এক পাল লেজ কাটা ইঁদুরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রত্যেকের লেজ কাটা আরম্ভ করলে- লাখ বছর পরের ইঁদুরের লেজ একইরকম থাকবে কি না, সেটি জানতে ইচ্ছা করে।" ৫ নং কমেন্ট লিখেছিল শান্ত, আর পরেরটি লিখেছিল রুবাইয়াৎ- কিন্তু ৫ নং কমেন্টের ঠিক এই অংশটুকুর ব্যাপারে প্রথমে বাকি দুজনের (কল্লোল ও রুবাইয়াৎ) যথেস্ট আপত্তি ছিল। তারপরেও শেষ পর্যন্ত আমরা এ অংশটুকু রাখি তার কারণ অনেকটা এরূপ:
# পরীক্ষণটিতে 'লেজ কাটা' যেহেতু পরিবেশের প্রভাবকে ইণ্ডিকেট করেছে- আমরাও একে পরিবেশের প্রভাবের অর্থেই ব্যবহার করেছি। যদিও জানি, লেজ কাটা- চামড়া ছুলা- ঠোসা ফেলা এসব আর পরিবেশগত তাপমাত্রা পরিবর্তন বা শীত-উষ্ণতার প্রভাব- আলো-অন্ধকারের প্রভাব, রেডিয়েশনের প্রভাব এসব এক কথা নয়।
# ল্যামার্কিস্ট কর্তৃক সময়কালের যুক্তি দেখানোর চেস্টা করেছি। কেননা কোন কোন বিবর্তনে ৩০/৪০ প্রজন্ম, আবার কোন কোন বিবর্তনে কয়েকশো প্রজন্ম আবার কোন কোন বিবর্তনে হাজার হাজার প্রজন্মও লেগেছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে হাজার প্রজন্মেও বিবর্তন ঘটেনি, হয়তো বিলুপ্তই হয়ে গেছে কোন প্রজাতি- তথাপি কোন বিবর্তন ঘটাতে পারেনি। সুতরাং কোন একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিকে নির্দিষ্ট পরিবেশের ভিতর দিয়ে ৩০/৪০ প্রজন্ম পার করেই নিশ্চিৎ হওয়া যায় না যে, পরিবেশের কোন প্রভাব নেই।
# সমুদ্রের ও ফ্রেশ ওয়াটারের স্টিকেলব্যাক মাছের বিবর্তন থেকে আমরা দেখতে পাই, সমুদ্রের ৩৫ টি বাড়তি কাটার স্তর যুক্ত স্টিকেলব্যাককে নদীতে আনলে কয়েক প্রজন্মেই এই বাড়তি কাটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এমনকি বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সমুদ্র থেকে নদীর পানিতে মাছগুলোকে স্থানান্তরিত করা হলে তারা নাকি এক প্রজন্মেই বিবর্তনটা ঘটিয়ে ফেলতে পারে, এই বাড়তি স্তরটি আর থাকে না তাদের পরের প্রজন্মে।
নিশ্চিতভাবেই অন্য সব কাটাওয়ালা সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রেই বিবর্তনটি একইভাবে কাজ করবে না। ফলে, কেউ যদি অন্য একটি কাটাযুক্ত সামুদ্রিক মাছকে নদীর পানিতে ছেড়ে ৩০/৪০ প্রজন্ম দেখে জানান দেয় যে যেহেতু শরিরবৃত্তীয় কোন পরিবর্তন ঘটেনি- ফলে পরিবেশের প্রভাব নেই- তবে সেটাকে কি সঠিক বলা যাবে?
# William Rice এবং G.W. Salt এর পরীক্ষণে দেখা যায়, ফ্রুট ফ্লাইকে কয়ভাগে ভাগ করে আলো/অন্ধকার, শুকনো/ভেজা এমন আলাদা আলাদা পরিবেশে কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখার ফলে দেখা গেছে ৩৫ প্রজন্ম পরে বংশ পরম্পরায় তারা শুধু নিজস্ব গ্রুপের ফ্রুট ফ্লাইয়ের সাথেই মিলিত হচ্ছে। অপরদিকে Diane Dodd এর পরীক্ষণ থেকে দেখা যায়- দুই গ্রুপ ফ্রুট ফ্লাইকে আলাদা রেখে এক দলকে স্টার্চ এবং আরেকদলকে মালটোজ খাওয়ানো হলে দেখা যায়- আট প্রজন্ম পরেই তাদের মধ্যে মিলিত হওয়ার ব্যাপারে বিশেষ অভ্যাস তৈরী হয়েছে, অর্থাৎ স্টার্চ খাওয়া মাছি শুধু স্টার্চ খাওয়া মাছির সাথে এবং মাল্টোজ খাওয়া মাছি শুধু মাল্টোজ খাওয়া মাছির সাথেই মিলিত হচ্ছে।
# এই ঘটনাগুলো বা পরীক্ষণ গুলো নিশ্চিতভাবেই বায়োলজিকাল নির্ণয়বাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ দেয়।
# বন্যা আহমেদের "বিবর্তনের পথ ধরে" বই এ স্টিকেলব্যাক মাছের ঐ বিবর্তন সম্পর্কে এভাবে লেখা হয়েছেঃ "সমুদ্রের মাছগুলোর গায়ে ৩৫ টি বাড়তি হাড্ডি বা কাটার স্তর দেখা যায়, যা দিয়ে তারা নিজেদেরকে ভয়ঙ্কর সব প্রাণীর দাঁতালো আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু নদীতে বাস করা স্টিকেলব্যাকের প্রজাতিগুলোর জন্য আর নিজের দেহে এত ভারী ভারী যুদ্ধাস্ত্র বয়ে বেড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তারা বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়ই অভিযোজিত হয়ে এই অপ্রয়োজনীয় স্তরটা থেকে রেহাই পেয়ে গেছে"। এই আলোচনায় কি ল্যামার্কিজমের ছোঁয়া নেই?
আসলে অভিযোজনের বিষয়টি দেখলে- এখনও ব্যাখ্যার জন্য ল্যামার্কের তত্ত অনেক সহজ। যদিও জেনেটিক্স থেকে আমরা বুঝি বিবর্তনটা ঠিক ল্যামার্কের তত্ত দিয়ে ঘটে না এবং বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে অপেক্ষাকৃত জটিল ও গাণিতিক জেনেটিক্স-জিনোমিক্স ছাড়া উপায়ও নেই।

মোদ্দা কথা, আমরা এটাই বলতে চাই- বিবর্তনের ক্ষেত্রে জিন ও পরিবেশ উভয়ের ভূমিকাই মুখ্য- যদিও জিনের ভূমিকা প্রায়োর ও প্রাইমারী, পরিবেশ সেকেণ্ডারী। তবে এটাও স্বীকার করছি যে, আমাদের ৫ নং কমেন্টের যুক্তিতে ল্যামার্কিয়ান ভাব কিছুটা হলেও ছিল- তার একটা কারণ আমরা ভেবেছি- ল্যামার্ককে খণ্ডন করতে হলে- এ যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করা দরকার।

পরিশেষে, আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই বিষয়টি অবতারণার জন্য এবং আমাদের আলোচনা সুযোগ দেবার জন্য, অন্যত্র হয়তো আবার দেখা হবে- আপাতত এ পোস্টে বিদায়।
ভালো থাকবেন।

দিনমজুর এর ছবি

----- মুক্তমনা'র অভিজিৎ এর জানা-বোঝা, পাণ্ডিত্য নিয়ে অনেকেই মুগ্ধ, আমরাও কম মুগ্ধ নই। অভিজিৎ এর আলোচ্য প্রবন্ধটির প্রতিক্রিয়ায় শংকর রায় অনেক ক্ষেত্রে দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও তাই শেষে বলেন, "However, I am impressed with Roy & Pal's erudition"। impressed নাহয়ে উপায় কি? ইমরান হাবিব রুমনের লেখার জবাব দিতে তিনি যে বিশাল প্রবন্ধ রচনা করেছেন, তার প্রতি ছত্রে ছত্রে আমরা impressed হই। তেমনি impressed হই যখন ভাইসম্যান ও গ্যালটনের প্রসঙ্গ আনতে দেখি। ল্যামার্ক-লাইসেঙ্কোকে উড়িয়ে দিতে তিনি এনাদের বরাদ যখন দিচ্ছেন- তখন ভাবি এ কেমন বিজ্ঞানবাদিতা?

প্রথমে আসা যাক ভাইসম্যান প্রসঙ্গে। উনিশ শতকের শেষের দিকে এই ভাইসম্যান (Weismann, 1834-1914) Germ Plasm Theory নামে এক তত্ত্ব প্রচার করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী Germ Plasm হচ্ছে একধরনের কুলসম্পদ, যা এক পুরুষ থেকে পরের পুরুষে অক্ষতভাবে সঞ্চারিত হয়। যৗন প্রজনন-প্রক্রিয়ার ফলে যে মিশ্রণ অবধারিত, কেবল তারই দরুন সেই Germ Plasm কিছু পরিমাণে সংপরিবর্তিত (Modified) হয়। এই মতানুসারে সপ্রাণ জীব বা জিনের বাহ্য রূপটি (Phenotype) হচ্ছে চিরনির্দিষ্ট এক কুলবৈশিষ্ট্য বা genotype - এরই নানা অস্থায়ী বহিঃপ্রকাশের একটি রূপ মাত্র। এইটা অনেকটাই সতেরো শতকে চালু হওয়া প্রাক-গঠনবাদের (pre-formationism) অনুরূপ। গোঢ়াতেই এই তত্ত্ব বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করে বসে কেননা এটির মূল কথাটিই ছিল যে যাবতীয় প্রাণ সমুদয়ের সম্ভাব্য সকল বৈশিষ্ট্যই এক প্রথম Germ Plasm এর মাঝে উপস্থিত ছিল, সেগুলোকেই ঝাড়াই-বাছাই করে নেয়া হয়েছে মাত্র!!!

এহেন ভাইসম্যানকে অভিজিৎ বাবু কি বলবেন জানি না কিন্তু তার লেখার আরেক জায়গাতে তাকে যখন গ্যাল্টনের (1822-1911) রেফারেন্স দিতে দেখি তখন তার বিজ্ঞানচর্চার নমুনা সম্পর্কে সংশয়াপন্ন হতে হয় বৈকি। Eugenics এর কথা পাঠক নিশ্চয়ই জানেন। এই ধারার লোকেরা উনিশ শতকের শেষের দিকে প্রমাণ করতে চাইল যে সমাজের উঁচু শ্রেণীর লোকেরা বংশগতভাবেই উন্নত । কাজে কাজেই সমাজে তাদের উঁচু অবস্থানটা ন্যায়সংগত। এই Eugenics এর আবিষ্কর্তা ছিলেন গ্যাল্টন এবং তার সাথে ছিলেন কার্ল পীয়ারসন (1857-1936)। তারা জানান দেন, শ্বেতাঙ্গরা শ্রেষ্ঠ, শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে আবার নর্ডিকরা শ্রেষ্ঠ, ফলে বংশ গরিমা- রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষা এসব হয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক(!) ভিত্তি গড়ে তুলেন এই গ্যালটনেরা। এদের ধান্দাগুলো পাঠক নিশ্চয়ই ধরতে পেরেছেন। সমাজের নিচুতলার লোকজন যখনই তাদের প্রাপ্য দাবী করে তখন তাদেরকে বলা হয় “আরে ব্যাটা তুই তো নিচু জাত তোর আবার অধিকার কিরে? এই দ্যাখ বিজ্ঞানী মেন্ডেল কি বইলা গেছেন, কি বইলা গেছেন ভাইসম্যান, গ্যাল্টন”। ঘৃণ্য এই বর্ণবাদিতা যুক্তি পায়, বল পায় বিজ্ঞানের নামে। যে কাজগুলা মধ্যযুগে ধর্মের নামে চলত (কোথাও কোথাও এখনও চলে) সেগুলোই একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে গ্যালটন-পীয়ারসনেরা (অধুনা অভিজিৎ বাবুরাও!!!) বলেন বিজ্ঞানের নামে। গ্যাল্টন এর পরবর্তীকালে নাৎসীরাও (নাৎসী Eugenics দ্রষ্টব্য ) প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে তারা সাদা চামড়ার লোকেরা কালোদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সাদাদের মধ্যে আবার নর্ডিক নরগোষ্ঠী শ্রেষ্ঠ, বিশেষ করে ইহুদিদের থেকে কেননা তাদের শরীরে রয়েছে বিশুদ্ধ আর্য রক্ত (রক্ত বললে ব্যাপারটা এখনকার প্রেক্ষিতে আর বৈজ্ঞানিক থাকে না, তাই রক্তের বদলে পাঠককে জিন বসিয়ে দেবার আহবান জানাচ্ছি)। এইখানেই শেষ না, এই গোষ্ঠী এমনকি ডারউইনকেও ব্যবহার করে প্রচারণা চালায় যে মানুষের মাঝেও কামড়াকামড়ি করে যারা টিকে থাকবে তারাই নাকি দুনিয়ার সেরা মানুষ অর্থাৎ বীরভোগ্যা বসুন্ধরা (survival of the fittest) যেটারে নাম দেয়া হয় সামাজিক ডারউইনবাদ (Social Darwinism)। এটা করা হয় যুদ্ধ, হানাহানি এবং দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচারকে বৈধতা দেয়ার জন্যে এবং তা করা হয় বিজ্ঞানের নামে। কিছুদিন আগেও বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকে চেষ্টা করেছেন নারীদেরকে পুরুষদের থেকে হীন প্রতিপন্ন করতে। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেমন মস্তিষ্কের আকার আয়তন, হাড়ের সংখ্যা ইত্যাদি বিষয় দিয়ে তারা বলতে চেয়েছেন সেই একই কথা যেটা অভিজিৎ বাবুরা এখন বলেন জিন দিয়ে। অর্থাৎ জন্মগতভাবেই একদল নিকৃষ্ট।

অথচ এখনকার বিজ্ঞান যে পরিবেশের প্রভাবকে অস্বীকার করে না, বিজ্ঞানে প্রমানিত যে গ্যালটন-ভাইসম্যান-ম্যালথাসের সেসমস্ত রদ্দিমালগুলো সবই ভূয়া। মানুষের লোভ-লালসা পরিবেশের ফল- একথা বলে অভিজিৎ বাবুর যে বিষ্ময় চিহ্ন প্রকাশ করেছেন- সেটাতেই আসলে উল্টো আমাদেরই বিস্মিত হতে হয়। বুঝতে সমস্যা হয়না কেন তিনি গ্যালটন-ভাইসম্যানকে এত উচ্চে তুলে ধরেন! Human Genome Project এ কাজ করছেন এমন এক বিজ্ঞানীর (Craig Venter, president of Celera Genomics) জবানিতেই শুনুন "We simply do not have enough genes for this idea of biological determinism to be right"। অভিজিৎ বাবুর মত অনেকেই বুদ্ধিমত্তার জন্যে দায়ী, মানুষের লোভের জন্যে দায়ী, এমনকি মানুষের অপরাধ প্রবণতার জন্যে দায়ী (criminal gene) অনেক জিন খুঁজেছেন কিন্তু আফসোস এই যে এই ধরনের কোন জিন পাওয়া যায় নাই। অভিজিৎ বাবু হয়ত পেয়েছেন, সন্ধান দিয়ে আমাদিগকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করবেন নিশ্চয়।

শুরু করেছিলাম- অভিজিৎ এর পাণ্ডিত্যে সকলের মুগ্ধতা দিয়ে। সেরকম মুগ্ধতার মুখোমুখি আরেক জায়গায় হয়েছিলাম- বা মাঝে মধ্যে হতে হয়, সে গল্পটি এই ফাকে আপনাদের শুনিয়ে যাই------

পিস টিভির কল্যাণে আজ জাকির নায়েক, আহমাদ দীদাতের নাম মোটামুটি অনেকেই জানে, তাদের ছবি সম্বলিত ভিউকার্ড পর্যন্ত বের হয়ে গিয়েছে। ঘরে ঘরে জাকির নায়েকদের ভক্ত পাওয়া যায়। সেরকম ভক্তের সাথে কথা বললেই যেটা পাই সেটা হলো অসম্ভব রকমের মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতা হলো জাকির নায়েকের অগাধ পাণ্ডিত্যের মুগ্ধতা। যতজনের সাথে কথা বলেছি- এক কথা এই লোক শুধু কোরআন-হাদীস ই জানে না, অন্য ধর্ম সম্পর্কেও যে কত জানে!! বিজ্ঞানের লেটেস্ট আবিষ্কার সম্পর্কে জানে, অনেক গুলো ভাষা জানে- আরবী ভাষা - ব্যকরণ এমন অসাধারণভাবে জানে----- ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলেই মুগ্ধ হতেই হয়। কিন্তু এই নির্ভেজাল মুগ্ধতার কারণ এবং একই সাথে একটা বড় বিপদ হলো- যারা মুগ্ধ তারা একই রকম করে অনেক কিছুই জানেন না- অন্য ধর্ম তো দূরের কথা নিজের ধর্মই জানেন না, আরবী ভাষার ব্যকরণ তো দূরের কথা- যে কোরআনটা পড়েন তার অর্থ পর্যন্ত কখনো দেখেননি। ফলে, জাকির নায়েক যখন কোরআন ঘেটে দেখিয়ে দেন- পৃথিবী গোলাকার- তখন তারা মুগ্ধ হন, জাকির নায়েক যখন জানিয়ে দেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে তখন খুশী হন, যখন দেখিয়ে দেন যে বিগ ব্যাং থিউরি কোরআনেই আছে- তখন আনন্দের আতিশয্যে লাফিয়ে উঠেন।

সব ধরণের জাকির নায়েকদের ভণ্ডামি ধরে ফেলার জন্য আসল মুক্তমনাদের খুব দরকার।

চলবে-------------

অভিজিৎ এর ছবি

আমি আপনার লেখার পয়েন্ট বাই পয়েন্ট উত্তর দিয়েছি, আর আপনি সে দিকে না গিয়ে সামাজিক ডারউইনবাদ, ইউজিনিক্স -এগুলোতে নিয়ে গেছেন। সামাজিক ডারউইন বাদ আর ডারউইনিজম এক নয়। জীববিজ্ঞানীরা সামাজিক ডারউইনবাদকে স্বীকার করেন না। এ নিয়ে আমিও আগে অনেক লিখেছি। আমাদের বিতর্কের বিষয় ছিলো জীববিজ্ঞান। জীববিজ্ঞানে ল্যামার্কিজম এবং লাইসেঙ্কুইজম বাতিল একটি ধারনা। আপনি যদি আমার লেখা খণদন করতে না পারেন তা হলে প্রোপাগান্ডা পোস্ট থেকে বিরত থাকুন।

'জাকির নায়েক' বিশেষণ ব্যবহার করলেই তর্কে জেতা যায় না। সবার সামনে বোকা হতে হয় বরং।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

আমি আপনার লেখার পয়েন্ট বাই পয়েন্ট উত্তর দিয়েছি, ------

আমার ৫ নং কমেন্টের জবাবে আপনার আলোচনা আমার চোখে পড়ার আগেই আমি ৬ নং কমেন্টটি দিয়েছি। ৬ নং কমেন্ট আসলে লেখা শুরু করেছিলাম পরশু, সেটা কাল দুপুরের কিছু আগে কমপ্লিট করে সাবমিট করি। এসময়টিতে আমার ল্যাপটপ লগ ইন করাই ছিল এবং আপনার মূল পোস্ট রিফ্রেস করা হয়নি- ফলে আপনার ৫।১ নং কমেন্ট দেখিনি। সুতরাং আমার ৬ নং কমেন্ট ছিল মূল পোস্ট দেখে প্রতিক্রিয়া কমেন্ট (৫ নং এর ধারাবাহিকতায়)।
এটা বলছি কারণ, আপনার ৫।১ কমেন্ট চোখে পড়লে, হয়তো ৬ নং কমেন্ট এরকম হতো না, কেননা আপনার ৫।১ নং কমেন্টের বেশ কয়েক জায়গায় আপত্তি থাকলেও- মূল ডিবেটের জায়গাটিতে আপনার অবস্থানকে মোটামুটি সমর্থনই করি, এবং এটুকু মনে হয়েছে আসলে আমাদের ডিবেটটিতে দুজন দুজনের অবস্থানকে ভুলভাবে ইনটারপ্রেট করার জন্য (আমি ভেবেছি আপনি পরিবেশের প্রভাবকে অগ্রাহ্য করছেন- আর সম্ভবত আপনি ভেবেছেন- আমি জেনেটিক্সকে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছি- "প্রশ্নকর্তা ধরেই নিয়েছেন - দুটো অপশনের যে কোন একটিতেই সত্যতা লুকিয়ে আছে। আর কোন অপশন থাকতে পারে না") এটি ঘটেছে।

আপনার ৫।১ কমেন্টের জবাবে আরো কিছু কথা বলার ইচ্ছা থাকলো।

আলোচনার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অভিজিৎ এর ছবি

আলোচনার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।

এটা বলছি কারণ, আপনার ৫।১ কমেন্ট চোখে পড়লে, হয়তো ৬ নং কমেন্ট এরকম হতো না, কেননা আপনার ৫।১ নং কমেন্টের বেশ কয়েক জায়গায় আপত্তি থাকলেও- মূল ডিবেটের জায়গাটিতে আপনার অবস্থানকে মোটামুটি সমর্থনই করি,

ধন্যবাদ। আপনিও সুন্দর কিছু পয়েন্ট হাজির করেছেন এ ডিবেটে। ভবিষ্যতেও লিখবেন।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিগন্ত এর ছবি

ভাইজম্যান বা গালটন দুজনেই দুই বিজ্ঞানী। আর সব বিজ্ঞানীর মত এদের তত্ত্বেও অনেক ঠিকভুল আছে। তাই তাদের একটা তত্ত্ব ভুল দেখালে আরো দশটা ভুল প্রমাণ হয় না। তারা ব্যক্তিগত জীবনে খুব খারাপ হলেও না।

যাহোক, একটা অমীমাংসিত প্রশ্নে আসা যাক। পরমাণু বোমার প্রভাবে জাপানে কেন এখনও বিকলাঙ্গ শিশু জন্মগ্রহণ করে সে নিয়ে। কারণটা সহজ, পরমাণু বোমার প্রভাবে স্থানীয় অনেকের জিনে স্থায়ী পরিবর্তন বা মিউটেশন হয়েছিল। তার ফলে ওই অঞ্চলে অনেকেরই বিভিন্নরকম রোগ দেখা দেয়। জিনে পরিবর্তন যেহেতু অনেকক্ষেত্রেই বংশানুক্রমে থেকে যায় (প্রজননের সময় উত্তরাধিকার সূত্রে) তাই এখনও রোগ হয়ে থাকে।


হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

দিনমজুর এর ছবি

ভাইজম্যান বা গালটন দুজনেই দুই বিজ্ঞানী। আর সব বিজ্ঞানীর মত এদের তত্ত্বেও অনেক ঠিকভুল আছে। তাই তাদের একটা তত্ত্ব ভুল দেখালে আরো দশটা ভুল প্রমাণ হয় না। তারা ব্যক্তিগত জীবনে খুব খারাপ হলেও না।

এটা আমিও মনে করি। সাথে সাথে এটাও মনে করি যে, কোন বিজ্ঞানীর একটা তত্ত্ব সঠিক প্রমানিত হলে তার আর সব কিছুই ঠিক প্রমাণ হয় না। মেনডেলের বংশগতি তত্ত সঠিক হলেই কি তার বা তার অনুসারীদের সমস্ত দাবীই সঠিক হয়ে যায়? আবার ল্যামার্কের তত্ত ভুল প্রমানিত হলেই কি এরকমটি ভাবা যায় যে, ল্যামার্কিস্টরা যা যা দাবী করেছিল- তার সবই ভুল?

উনিশ শতকের শুরু থেকে মাঝামঝি সময় পর্যন্ত মেনডেলিস্ট-মর্গানিস্ট আর ল্যামার্কিস্টদের মধ্যে বিতর্ক, দ্বন্দ্ববিরোধ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী কেমন হওয়া দরকার? মেনডেলিস্টরা পরিবেশের প্রভাব সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে আরম্ভ করেছিল, সেখান থেকে একসময় ভাইসম্যানেরা এমন অবস্থানে গিয়ে পৌচেছিল যে, তা সরাসরি বিবর্তনবাদকেই অস্বীকার করার প্রয়াস পায়। আর উল্টো দিকে ল্যামার্কিস্টরা পরিবেশের উপর বেশী জোর দিতে গিয়ে জেনেটিক্সকেই অস্বীকার করে বসে। কিন্তু এই ডিবেট তো শুধু সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের মধ্যে হয়নি- গোটা দুনিয়ার বায়োলজিস্টরাই দ্বিধাবিভক্ত ছিল। দুনিয়ার বায়োলজিস্টরাই দুটো শিবিরে বিভক্ত ছিল। অনেক বিজ্ঞানী সে সময়ে আবার মাঝামাঝি অবস্থানও নিয়েছিলেন- দেখা যাক ভবিষ্যৎ কি বলে- এরকম আরকি। এমন নয় যে সব সমাজতন্ত্রীরা ল্যামার্কিস্ট ছিল আর অসমাজতন্ত্রীরা মেনডেলিস্ট ছিল। সোভিয়েত botanist ও geneticist ভাভিলভ -যিনি নিজে ছিলেন একজন মেনডেলিস্ট, এবং সেই সাথে ল্যামার্কিস্টদের বড় সমালোচক- তিনি কিন্তু লেনিন পদক জিতেন, ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত জিন ল্যাবরেটরীর চেয়ারম্যান ছিলেন। তার তত্তাবধানে লেনিনগ্রাদে যে সিডব্যাংক গড়ে তোলা হয় সেটি ছিল সে সময় দুনিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ। '৪০ এর পরে গিয়ে কিন্তু সেখানে ভাভিলভ ও তার অনুসারীদের তথা মেনডেলিস্টদের উপর ঝামেলাগুলো আরোপিত হয়। ফলে, লাইসেঙ্কোকে ধরতে গিয়ে কেউ যদি- পুরো সমাজতন্ত্রকে- মার্কস-লেনিনকেই আক্রমণের লক্ষবস্তুতে পরিণত করে, সেটাকে কি ঠিক মনে হয়?

আজকের বিজ্ঞানে আমরা জানি- সে সময়ের দুই শিবিরের কোন শিবিরই পুরোপুরি ঠিক নয়। এবং সাথে এটাও স্বীকার করা উচিৎ যে- ঐ সময়ের ঐ ডিবেট বিজ্ঞানকে অনেক এগিয়ে নিয়েছে (৪০ থেকে সোভিয়েতে মেনডেলিস্টদের উপর আক্রমণকে বাদ দিলে)।

আর একটি বিষয়, যে কারণে উপরের কমেন্টে ভাইসম্যান- গ্যালটনকে এনেছি, তাহলো বিজ্ঞানের আদর্শের প্রসঙ্গ। অভিজিৎ যেমন জানাচ্ছেন বিজ্ঞানের কোন আদর্শ নেই- সেটা সম্পূর্ণটাই অবজেকটিভ- বিজ্ঞানীকে ভাববাদী বলায় ওনার বিশাল আপত্তি তৈরী হয়েছে---------, তাই গ্যালটনকে আনা, সামাজিক ডারউইনবাদকে আনা। এই গ্যালটন যখন তার সুপ্রজননবিদ্যা (যার মোদ্দাকথা উন্নত মানুষ পেতে ভালো জাতের দম্পতির প্রজনন প্রয়োজন) প্রচার করেন, তখন তাঁর জন্য লণ্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে eugenics নামে একটি বিভাগ খোলা হয়- যেটার প্রধান হন তিনি- এবং গ্যালটনের পরে সে পদে বসেন পীয়ারসন। এই শাখা এক পর্যায়ে এমন একটি স্থানে যায় যে, ইংল্যাণ্ড-আমেরিকায় নীচু (!) জাতের মানুষকে নির্বীজ করার চেস্টাও চালানো হয়েছিল। পরবর্তীতে হিটলারের আর্য রক্তের কথাতো সবাই জানি। দুনিয়া জুড়ে বৃটিশ উপনিবেশগুলোকে বৈধতা দিতে বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী ম্যালথাসকে তৈরী করে। ডারউইনের বিবর্তনবাদকে এমনভাবে ব্যাখ্যা দেয়া হলো যে, যুদ্ধ-বিগ্রহে উপনিবেশগুলোর মানুষগুলো মারা পড়াটাই স্বাভাবিক, কেননা বৃটিশরাই শ্রেষ্ঠ আর সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট অনুযায়ী কেবল বৃটিশরাই শেষ পর্যন্ত সার্ভাইভ করে যাবে! বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী তাই এসমস্ত 'বিজ্ঞান'(!) কে প্রোমোট করে গেছে, ফলে গ্যালটনকে ১৯০৯ সালে নাইট উপাধি দেয়া হয়।
বিজ্ঞানের নাম করে কিভাবে বর্ণবাদকে লালন-পালন করা হয়েছে সেটা আশা করি পরিষ্কার হয়েছে। (আমাদের এই উপমহাদেশেও আমরা ওদের চোখে কুকুরের জাত হিসাবে গণ্য হয়েছি- সে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, অথচ- আমাদের চিন্তাজগতে সেই উপনিবেশিক প্রভাব এখনো বিদ্যমান। সেখানকার সাহিত্যিকদের বর্ণবাদী লেখা এখানে জনপ্রিয় হয়! টারজান একবার নরখাদক আদিবাসীদের (যে পরিবেশে টারজান নিজেও বেড়ে উঠেছিল) সাথে এক নর হত্যা করে খাওয়ার জন্য উদ্যত হলেও শেষ পর্যন্ত পারে না- কারণ তার বৃটিশ-শ্বেতাঙ্গ রক্ত এসে তাকে বাঁধা দেয়!!)

আসলে বিজ্ঞানকে যতই বলিনা কেন তা মুক্ত, তা কিন্তু মুক্ত নয়। লাইসেঙ্কো-গ্যালটনদের তাই ঠগ- বর্ণবাদী, কাউকে কাউকে ভাববাদী বলা মানে বিজ্ঞানকে ঠগ-বর্ণবাদী-ভাববাদী বলা নয়। সে কারণেই আসে আদর্শের প্রশ্ন। আর এই প্রসঙ্গের মীমাংসার জন্য সর্বাগ্রে দরকার এ প্রশ্ন: কার জন্য বিজ্ঞান? যারা বলছেন 'বিজ্ঞান শুধু বিজ্ঞানের জন্য', তারা কি জানেন না- বর্তমান দুনিয়ায় এ কথা বলে বিজ্ঞানকে সমস্ত মানুষের হাত থেকে সরিয়ে কিছু মানুষ (বিজ্ঞানকে নিয়ে ব্যবসা করাই যাদের উদ্দেশ্য) এবং শাসকগোষ্ঠী বিজ্ঞানকে কুক্ষিগত করে রাখছে? আমরাও চাই বিজ্ঞান হোক মুক্ত, সকল মানুষের জন্য অবারিত; কেননা বিজ্ঞান মানুষের সামনে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করেছে, মানুষের জীবনকে করেছে উন্নত, বিজ্ঞান তাই হতে পারে কেবলমাত্র মানুষের জন্যই।

আপনাকে ধন্যবাদ।

অভিজিৎ এর ছবি

আমরা জীব্বিজ্ঞানের আলোচনায় ছিলাম, আমি বলেছিলাম জীববিজ্ঞানে ল্যামার্কিজম এবং লাইসেঙ্কোইজম বাতিল হয়ে গেছে অনেক আগেই। আমি প্রমাণ চেয়েছিলাম জীববিজ্ঞানের কোন বইয়ে লাইসেঙ্কোর তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক বলে মনে করা হয় এখন? কোন বইয়ে ল্যামার্কিজমকে সঠিক মনে করা হয়? আপনি তার উত্তর না দিয়ে সামাজিক ডারউইনবাদকে নিয়ে এসেছেন আলোচনায়। ভিক্টোরিয়ান যুগে সামাজিক ডারউইনবাদের (সোশাল ডারউইনিজমের) উদ্ভব ঘটান হার্বার্ট স্পেনসার নামের এক দার্শনিক, যা ডারউইন প্রদত্ত্ব বিবর্তন তত্ত্ব থেকে একেবারেই আলাদা। স্পেন্সর জীববিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ডারউইন কথিত জীবন সংগ্রাম কে বিকৃত করে 'যোগ্যতমের বিজয়' (সারভারিভাল অব ফিটেস্ট) শব্দগুচ্ছ সামাজিক জীবনে ব্যবহার করে বিবর্তনে একটি অপলাপমূলক ধারণার আমদানী করেন। হার্ভার্ডের দর্শনের মূল নির্যাসটি ছিল - 'মাইট ইজ রাইট'। তিনি প্রচারণা চালান যে, গরীবদের উপর ধনীদের নিরন্তর শোষণ কিংবা শক্তিহীনদের উপর শক্তিমানদের দর্প এগুলো নিতান্তই প্রাকৃতিক ব্যাপার। প্রাকৃতিকভাবে বিবর্তনের ফলশ্রুতিতেই এগুলো ঘটছে, তাই এগুলোর সামাজিক প্রয়োগও যৌক্তিক। এ ধরনের বিভ্রান্তকারী দর্শনের ফলশ্রুতিতেই পরবর্তীতে বিভিন্ন শাষক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ঔপনিবেশিকতাবাদ, জাতিভেদ, বর্ণবৈষম্যকে বৈধতা দান করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বিভিন্ন সময়। হিটলার তার নাৎসীবাদের সমর্থনে একে ব্যবহার করেন। ১৯৩০ সালে আমেরিকার ২৪ টি রাষ্ট্রে 'বন্ধ্যাকরণ আইন' পাশ করা হয়, উদ্দেশ্য ছিল জনপুঞ্জে 'অনাকাঙ্খিত' এবং 'অনুপযুক্ত' দুর্বল পিতামাতার জিনের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। অর্থাৎ- সামাজিকভাবে ডারউইনবাদের প্রয়োগ-এর মাধ্যমে 'যোগ্যতমের বিজয়' নানা ধরণের নৈরাজ্যজনক প্রতিক্রিয়শীলতার জন্ম দিয়েছিল, আর বিভ্রান্িত সৃষ্টি করেছিল, যা থেকে অনেকে এখনও মুক্তি পায় নি। কিন্তু সত্যি বলতে কি- ডারউইন কখনওই এধরনের 'যোগ্যতমের বিজয়'-এর কথা বলেন নি, কিংবা তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বকে কখনই সামাজিকজীবনে প্রয়োগ করার কথা ভাবেননি। কাজেই এ ধরনের বর্ণবাদী তত্ত্বের সাথে ডারউইন বা তত্ত্বকে জড়ানো নিতান্তই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রকৃতিতে কিছু ঘটে বলেই তা সামাজিক জীবনেও প্রয়োগ করা উচিৎ - এ ধরণের চিন্তাধারা এক ধরনের কুযুক্তি বা হেত্বাভাস (ফ্যালাসি)। হেত্বাভাসটির পুঁথিগত নাম হল - 'প্রকৃতির দোহাই' (এপিল টু নেচার)। প্রাকৃতিক নির্বাচন আসলে প্রকৃতিতে প্রজাতির প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকার কিংবা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথাই শুধু ব্যাখা করছে - সামাজিক জীবনে এর প্রয়োগের 'ঔচিত্য' নিয়ে কখনোই মাথা ঘামাচ্ছে না। প্রকৃতিতে কিছু ঘটার অর্থ এই নয় যে তা সামাজিকভাবেও প্রয়োগ করতে হবে। আর তা ছাড়া বিবর্তনবাদের মুল বিষয়বস্তু ভালো করে বুঝলে দেখা যায় যে এর সাথে স্পেনসার্‌ -এর দেওয়া মতবাদের কোন সম্পর্কই নেই। প্রকৃতিতে কেবল নিরন্তর প্রতিযোগিতাই চলছে না, বরং বিভিন্ন ধরণের পারষ্রিক সহযোগিতা, মিথোজীবীতা কিংবা সহ-বিবর্তনও বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। জীবের টিকে থাকার জন্য এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অথচ, সামাজিক বিবর্তনবাদে এই ব্যাপারগুলো অস্বীকার করে কেবল 'যোগ্যতমের বিজয়'-এর কথাই কেবল সোচ্চারে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, বিবর্তন ঘটার জন্য প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরণের প্রকারণ অবশ্য প্রয়োজনীয়। জনপুঞ্জে জেনেটিক প্রকারণ না থাকলে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া কাজই করতে পারবে না। কিন্তু সামাজিক ডারউইনবাদের প্রবক্তারা জোর করে 'অনাকাঙ্খিত' জিনকে হটিয়ে দিয়ে প্রকারণকে দূর করার জন্য তৎপর হয়েছিলেন। এ জন্য বহু আগেই 'সামাজিক ডারউইনবাদ' সচেতন বৈজ্ঞানিক মহাল থেকে পরিত্যক্ত হয়েছে। অনেকেই অজ্ঞতার কারণে এখনো ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাথে পরিত্যক্ত সামাজিক বিবর্তনবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। যেমন ফেলেছেন আপনি। বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্য কারো সামাজিক ডারউইনিজিম বা ইউজিনিক্সের দারস্ত হয়ে হয় না। বিবর্তনকে সামাজিক ভাবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা ভুল ছিল, কিন্তু তার মানে তো এই নয় এতে লাইসেকনোইজম সঠিক প্রমাণিত হয়ে গেছে। আমি বিবর্তনের বহুল ব্যবহৃত পাঠ্যপুস্তক থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছি ল্যামার্কিজম কেন ভুল, এবং ব্যাখ্যা করেছি ল্যামার্কিজম বা লাইস্কোইজম দিয়ে বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। আপনি আমার যুক্তি খন্ডন করতে পারেননি।

আমি আবারো দুটো প্রশ্ন করছি আপনাকে--

১) ল্যামার্কিজম এবং লাইসেঙ্কোইজম যে জীবনিজ্ঞানে বাতিল হয়ে গেছে তা কি আপনি মানেন?

২) মেন্ডেলের বংশগতির সূত্র যে জীববিজ্ঞানে খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয় তা কি আপনি মানেন?

উপরের দুটো প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যা হয়, তবে আমাদের তর্ক করার আর কিছু নেই।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

প্রথমে আপনার প্রশ্নের জবাবে বলি:
১। ল্যামার্কের তত্ত্ব আজ ভুল বলে প্রমানিত। লাইসেঙ্কোইজমকে বিজ্ঞানের কোন ধারা বলেই মানিনা। তবে লাইসেঙ্কো ও ল্যামার্ক দুজনেই বিজ্ঞানী ছিলেন, উভয়ের কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষা, কিছু অবজারভেশন ছিল। লাইসেঙ্কো ভার্ণালাইজেশন সহ বেশ কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যা পরবর্তীতে ভুল প্রমানিত হয়, এবং ষাটের দশকে লাইসেঙ্কো নিজেও জানান যে, তার দাবী ভুল ছিল। ল্যামার্কের তত্তও আজ ভুল প্রমানিত। এটা খুবই স্বাভাবিক। এভাবেই বিজ্ঞান এগিয়ে যায়। তবে লাইসেঙ্কো শুধু ভুল করেছেন বা তার তত্ত ভুল প্রমানিত হয়েছে এমনটি নয়, বরং জানা যায় যে- তিনি কিছু চাতুরিরও দারস্থ হয়েছিলেন- নিজের তত্তের স্বপক্ষে যুক্তি হাজির করার জন্য যথাযথ পরীক্ষণ না করেই- পরীক্ষণের নেগেটিভ রেজাল্টগুলো আড়াল করে এবং কিছু তথ্য-উপাত্তের বিকৃতি করেছেন বলে ভালোরকম অভিযোগ রয়েছে- এসবের কোনটাই বিজ্ঞানের এথিকসের মধ্যে পড়ে না। ফলে ল্যামার্ক ও লাইসেঙ্কোকে একই পাল্লায় মাপতে পারি না।
একইভাবে ল্যামার্কিজম আর লাইসেঙ্কোইজমকে পাশাপাশি রাখতেও আমার যথেস্ট আপত্তি আছে।

২। মেনডেলের বংশগতি সূত্রের বিপরীতে দাঁড়ানো মানে বিজ্ঞানকেই অস্বীকার করা। এবং প্রথম থেকে এটাই বলছি- এই মেনডেলের বংশগতি সূত্রকে মোটেই আমি অস্বীকার করছি না। এমনকি সে সময়কার ল্যামার্কিস্টদের মধ্যেও অনেকেই মেনডেলের বংশগতি সূত্র তথা জিনকে অস্বীকার করেন নি। এবং একটা সময় ডিবেটের সেন্টার পয়েন্ট ছিল- এই যে জিনের যে বিবর্তন সেটাতে পরিবেশের প্রভাব আছে কি নেই।
------------------------
এবারে আসি অন্যান্য প্রসঙ্গে---
১।

অনেকেই অজ্ঞতার কারণে এখনো ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাথে পরিত্যক্ত সামাজিক বিবর্তনবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। যেমন ফেলেছেন আপনি।

আমার আলোচনা পড়ে কি আপনার মনে হয়েছে যে আমি ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাথে সামাজিক বিবর্তনবাদকে গুলিয়ে ফেলেছি? না-কি আমিও এই সামাজিক বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি? আপনি কি অন্যের বক্তব্যকে বিকৃত না করে আলোচনা করতে পারেন না? কারো বক্তব্যের জবাব দেয়ার আগে ভালো করে সেটি পড়ে দেখার অভ্যাসটা একটু গড়ুন।

২।

বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্য কারো সামাজিক ডারউইনিজিম বা ইউজিনিক্সের দারস্ত হয়ে হয় না।

উপরের আলোচনায় আমি জানিয়েছি কেন ইউজিনিক্স আর সামাজিক বিবর্তনবাদকে এনেছি। দরকার হলে আবার পড়ুন। কোথাও কি দেখিয়েছি- এসবের মধ্য দিয়ে বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার চেস্টা করেছি? আবারো বলছি- দয়া করে বক্তব্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করবেন না।

৩।

বিবর্তনকে সামাজিক ভাবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা ভুল ছিল, কিন্তু তার মানে তো এই নয় এতে লাইসেঙ্কোইজম সঠিক প্রমাণিত হয়ে গেছে।

এটা বলার মানে কি? আমি আমার কোন মন্তব্যের কোন জায়গায় কি লাইসেঙ্কোইজমের পক্ষে যুক্তি করেছি? বরং দেখুন- আমার ১ম মন্তব্যের শুরুতে কি বলেছি।

৪।

আমি বিবর্তনের বহুল ব্যবহৃত পাঠ্যপুস্তক থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছি ল্যামার্কিজম কেন ভুল, এবং ব্যাখ্যা করেছি ল্যামার্কিজম বা লাইস্কোইজম দিয়ে বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। আপনি আমার যুক্তি খন্ডন করতে পারেননি।

আপনার মত যদি আমিও মনে করি ল্যামার্কের তত্ত ও লাইসেঙ্কোইজম ভুল ছিল, তবে কোন যুক্তি আমি খণ্ডাতে যাবো?
তবে, এটাও ঠিক যে, ল্যামার্কের তত্ত ভুল প্রমান করতে গিয়ে আপনি যেসমস্ত যুক্তির অবতারণা করেছেন- সেগুলোকে খুবই খেলো মনে হয়েছে। বাপ-মায়ের পায়ের ঠোসা বাচ্চাকাচ্চার পায়েও কেন পড়ে না, ইদুরের লেজ কাটা হলে পরের প্রজন্মের লেজের কোন পরিবর্তন হয় না- এমন যুক্তি যখন দেন, তখন বুঝতে হয়- ল্যামার্কিস্টরা আসলে কোন যুক্তি করছিল, ভাইসম্যানদের এসমস্ত পরীক্ষণকে তারা কিভাবে খণ্ডন করেছিল - সেসমস্ত আসলে আপনার জানা নেই। সবচেয়ে হাস্যকর লেগেছিল পিঠের হাড্ডি থেকে ডানা হওয়া সম্ভব নয় বলে যে কথাটি বলেছিলেন সেটি দেখে।
আপনার শুধু লাস্ট কমেন্টেই(৫।১) আপনার প্রকৃত অবস্থানটি বুঝা গেছে। যেখানে আপনি ন্যাচারাল সিলেকশন ও জিনের প্রকরণের বিষয়টি নিয়ে বলেছেন - এর সাথে আমি একমত।

৫। এই মন্তব্যের শুরুতে আপনি স্পেনসারকে এনেছেন। আমি কিন্তু তাদের না এনে গ্যালটনকে টেনেছিলাম। গ্যালটনের নামকে এড়িয়ে গেলেন কেন? স্পেন্সাররা বিজ্ঞানের নাম ভাঙ্গায়নি- দর্শনের নামেই ওসব চালাতে চেয়েছিল, আর গ্যালটন-পীয়ারসনেরা বিজ্ঞানের নামে চালিয়েছিল সেকারণে? ১৯৩০ সালে আমেরিকায় যে বন্ধ্যাকরণ আইন পাশ হয় সেটা কিন্তু ইউজিনিক্সের অবদান, যেটার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিলই আপনার গ্যালটন-পীয়ারসন প্রমুখ বিজ্ঞানীরা। এমনকি হিটলারের নাৎসীবাদও ইউজিনিক্সের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

অভিজিৎ এর ছবি

ল্যামার্কের তত্ত্ব আজ ভুল বলে প্রমানিত। লাইসেঙ্কোইজমকে বিজ্ঞানের কোন ধারা বলেই মানিনা।

মেনডেলের বংশগতি সূত্রের বিপরীতে দাঁড়ানো মানে বিজ্ঞানকেই অস্বীকার করা।

গুড। তাইলে আর ত্যানা প্যাচানোর দরকার নাই। আমার প্রবন্ধ ছিল লাইসেঙ্কোইজম নিয়ে। লাইসেঙ্কোইজম নামক 'ভুল সায়েন্সের' চর্চা করতে গিয়ে একসময় রাশিয়ায় শত শত বিজ্ঞানীকে গুলাগে প্রেরণ করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, শস্তি দেয়া হয়েছে - এটা বলাই ছিলো প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। আপনি আমার মুল পয়েন্ট মেনে নিয়েছেন - কাজেই আমি আর বিতর্কের কোন কারণ দেখি না।

আর বিবর্তন বিষয়ে আপনার যে বক্তব্য, তা প্রথম থেকেই ল্যামার্কিয় ধারণায় গঠিত নাইলে আপনি বলতেন না যে, 'এক পাল লেজ কাটা ইঁদুরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রত্যেকের লেজ কাটা আরম্ভ করলে- লাখ বছর পরের ইঁদুরের লেজ একইরকম থাকবে কি না' - এটা যে স্রেফ ফেনোটাইপের পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই পুরোন ল্যামার্কিয় বিবর্তনকে দেখার চেষ্টা সেটাই আপনি বুঝেন নি।

আর বিতর্ক করতে এসে প্রতিপক্ষকে 'মওদুদী', কখনো 'জাকির নায়েক' প্রভৃতি বিশেষণে ভুষিত করার অভ্যাস আছে আপনার। এ জিনিস আপনি আগেও করেছিলেন - নামে বেনামে। এই মোহটা ত্যাগ করার চেষ্টা করুন। এটা সুস্থ বিতর্কের অন্তরায়। মনে রাখবেন, আপনার নিকৃষ্ট বক্তব্য এবং ততোধিক ভুল ব্যাখ্যা দেখেও আমি আপনাকে কোন বিশেষণে বিশেষিত করে আমার লেখা লিখিনি। আমাদের মধ্যে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু বিশেষনের আদান-প্রদান কোথাও আমাদের নিয়ে যাবে না।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

অভিজিৎ এর ছবি

দিনমজুর সাহেব, আপনার উপরের দিকের করা কমেন্ট (৬.১.১ ) , যেখানে আপনি লিখেছেন -

এটা বলছি কারণ, আপনার ৫।১ কমেন্ট চোখে পড়লে, হয়তো ৬ নং কমেন্ট এরকম হতো না, কেননা আপনার ৫।১ নং কমেন্টের বেশ কয়েক জায়গায় আপত্তি থাকলেও- মূল ডিবেটের জায়গাটিতে আপনার অবস্থানকে মোটামুটি সমর্থনই করি,

এটা আগে দেখি নি। আজকে ব্লগে ঢুকে একদম নীচের উত্তরটি দেখেছিলাম। উপরের উত্তরটি আগে দেখলে এর পর আপনাকে ধন্যবাদ জানানো ছাড়া অন্য কিছু করতাম না।

যা হোক আমরা বোধহয় দুটো বিষয়ে খুব সহজেই একমত হতে পারি।

* ল্যামার্কিজম ভুল প্রমাণিত হয়ে গেছে। আর পরিবেশকে "ওয়ান এন্ড ওনলি" গুরুত্ব দিতে গিয়ে লাইসেঙ্কোইজমের মত ভুল মতবাদের জন্ম হয়েছিলো।

* আবার শুধু 'জিন' জিনিসটিকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দিতে গিয়ে এবং এর ভুল প্রয়োগ করে ইউজিনিক্সের মত মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের সূচনা হয়েছিলো, যেটা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়।

আমরা যদি এ দু বিষয়ে এককমত হই, তাহলে প্রত্যাশা করি আমাদের মধ্যে বিরোধ দূর করে হ্যান্ডশেক করাটা কঠিন কোন ব্যাপার হবে না। আপনার জবাবের প্রত্যাশায় রইলাম।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

সুহাস এর ছবি

এ ব্লগে এটাই আমার প্রথম কমেন্ট। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে এই বিতর্কটি পড়ছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল বিতর্কের বিতার্কিদের লেবেল এঁটে দেয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ল্যামার্কের তত্ত্বকে বাতিল করার জন্য যে সমস্ত পরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলোকে এককথায় মওদুদীর উক্তির সাথে কিংবা জাকির নায়েকের তুলনা করা বালখিল্য। বহুদিন আগে যখন বায়োলজিতে মাস্টার্স করেছিলাম, আমার গবেষণার বিষয় ছিলো বিবর্তনীয় সংশ্লেষণ। অর্গানিক সিলেকশনের কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছিলো আমাকে। সেখানে মাল্টিপল জিন, পলিজিন এবং সাংখ্যিক বংশানুসৃতি নিয়ে কাজ করেছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম মেন্ডেলের সূত্রের সার্থকতা। এমনকি মেন্ডেলের সূত্রগুলোর আধুনিক ক্রোমোজমভিত্তিক ব্যাখ্যাগুলোও আমাকে জানতে হয়েছিলো। জিনের সেগ্রিগেশন মেন্ডেলের দুটো সূত্রকে কিভাবে ক্রোমজমের মাধ্যমে সহজেই ব্যাখ্যা করে দিতে পারে তা এ বিষয়ে গবেষণারত অনেকেই জানেন। মেন্ডেলের তত্ত্ব বিজ্ঞানে যেমন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, ল্যামার্কের তত্ত্ব সেরকম নয়। ল্যামার্ক অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছেন। আমাদের পড়াতে গিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কেন ল্যামার্কের তত্ত্ব দিয়ে বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। শুধু লাইসেঙ্কো নয়, সামনার ও প্রিজিয়াম, পল কামেরার, উইলিয়াম ম্যাকডোগেলের পরীক্ষাগুলোও 'পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রভাবে জীবদেহের অঙ্গসমূহের পরিবর্তনের' কোন ইঙ্গিত দেয়নি। এমনকি কিছু পরীক্ষা - যেমন কামারারেরটি সাজানো এবং ভূয়া হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। দেখা গিয়েছিলো, ব্যাঙের হাতের প্যাডে ইঞ্জেকশন দিয়ে কালি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এ ঘটনা ফাঁস হয়ে যাবার পর কামরার আত্মহত্যা করেছিলেন। এ সব কিছুই আসলে ল্যামার্কবাদের বিপক্ষে গেছে। ল্যামার্কের ফলাফল অনেক আগেই বাতিল হয়ে যাবার পরও কেন প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের রথী মহারথীরা লাইসেঙ্কোর মত একজন আরগোনোমিস্টের মাধ্যমে ল্যামার্কবাদের চর্চা করে গেছেন, তা বিস্ময় উদ্রেগ করে।

যা হোক অভিজিত অনেককিছুই বলেছেন এ নিয়ে। দিনমজুরও Eugenics নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। সুস্থ আলোচনা ভাল লাগে। আমি আশা করব, তারা যেন ব্যক্তিগত আক্রোশ এড়িয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। পাঠক হিসেবে এটিই আমার প্রত্যাশা।

অভিজিৎ এর ছবি

এ ব্লগে এটাই আমার প্রথম কমেন্ট। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে এই বিতর্কটি পড়ছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল বিতর্কের বিতার্কিদের লেবেল এঁটে দেয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ল্যামার্কের তত্ত্বকে বাতিল করার জন্য যে সমস্ত পরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলোকে এককথায় মওদুদীর উক্তির সাথে কিংবা জাকির নায়েকের তুলনা করা বালখিল্য।

আমিও ঠিক একথাই শুরু থেকে বলে চলেছি। বিতর্কের পরিবেশ না থাকলে বিতর্ক করা অর্থহীন। আমি মার্ক্সবাদ নিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখার পর পি মুনশী নামের এক ভদ্রলোক এর উত্তর দিতে গিয়ে 'ছাগল' উপমা নিয়ে আসলেন। আর দিনমজুর ওরফে অনুপম সৈকত শান্ত সাহেব সুযোগ পেলেই আমাকে মওদুদী কিংবা জাকির নায়েক বানাতে চান! কি করে বোঝাই যে, এ ধরনের অর্থহীন বিশেষণ আরোপ আসলে নিজেদের যুক্তির দীনতাই তুলে ধরে। কোন একটি বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেই গালাগালির দিকে নিয়ে যেতে হবে এমন তো মানে নেই। যারা নিজেদের আদর্শ এবং বিশ্বাসকে 'বৈজ্ঞানিক' মনে করেন, তাদের কাজকর্ম কেন এত অবোইজ্ঞানিক হবে, তা আসলেই আমাকে আশ্চর্য করে।

বহুদিন আগে যখন বায়োলজিতে মাস্টার্স করেছিলাম, আমার গবেষণার বিষয় ছিলো বিবর্তনীয় সংশ্লেষণ। অর্গানিক সিলেকশনের কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছিলো আমাকে। ...সেখানে দেখেছিলাম মেন্ডেলের সূত্রের সার্থকতা।

অনেক ধন্যবাদ আমার ব্লগে লিখবার জন্য। আপনাদের মত মানুষদের আসলে আরো বেশি করে লেখা উচিৎ। আপনার লেখার অবশিষ্ট অংশের সাথে যে কোন একাডেমিক লোকই সহমত পোষণ করবে। ল্যামার্কের অর্জিত লক্ষনার বংশানৃতি যে ভুল ছিলো তা গত শতাব্দীর দিকেই ভুল প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। তারপরও কিছু লোক ল্যামার্কিজম দিয়েই অনেক সময় বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে চান। এমনকি এঙ্গেলসও তার এন্টিডুরিং নামক বিখ্যাত পুস্তকে শ্রম বা হাতের ব্যবহার মানব বিবর্তনের নিয়ামক ভেবেছিলেন। আসলে তার চিন্তাতে ল্যামার্কবাদের, বিশেষতঃ অর্জিত লক্ষনার বংশানুতির প্রভার স্পষ্ট ছিলো (বিবর্তনবিদ্যা, ডঃ ম আখতারুজ্জামান, ২য় সংস্করণ, পৃঃ ৩০৪)।

আমি এ প্রসঙ্গে ডঃ আখতারুজ্জামানের বইটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করি, যা পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে --

'...ডারউইনের প্রজাতির উৎপত্তি পড়ে মার্কস পরম উৎসাহের সাথে এ কথা তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে জানিয়ে লিখেছিলেন। মার্ক্স তার নিজের লেখা জগতবিখ্যাত পুস্তক 'ক্যাপিটাল' ডারউইনকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডারউইন তাতে কোন সাড়া দেননি। ... ডারউইন সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনবিদ্যাকে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন না। রুজের মতে, ডারউইনের "জীবনের জন্য সংগ্রাম"কে যারা "শ্রেনী সংগ্রামে"র সমার্থক মনে করতে চান, তারা যে ডারউইনের মতকে আদৌ বুজগতে পারেননি তা ডারউইন বিলক্ষণ জানতেন। বিবর্তন তত্ত্বে কোন কিছু ঘটবেই, ঘটতে বাধ্য, ঘটনার কোন অনিবার্যতা এবং অবশ্যম্ভাবিতা নেই, তা ডারুইনের চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে। প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার এবং বিবর্তন সম্পর্কে সুপরিচিত লেখক পিটার জে বাউলারও একই মত পোষণ করেন ( বিবর্তনবিদ্যা, পৃঃ ৩০৩ -৩০৪)

আলোচনার জন্য আপনাকে আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনি ভবিষ্যতে আরো লিখবেন - এ প্রত্যাশা করছি।


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

mosharrof এর ছবি

অভিজিৎ এর দু'টো লেখা এ পর্যন্ত পড়েছি। বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আমি তার পরিচয় পেয়েছি। এবং আমাদের পরিচিত মহলে বিবর্তনবাদের ওপরে ( অভিজিৎ ও অন্য আর এক জন লেখকের লেখা ) বই খানিকটা আগ্রহের সঞ্চার করেছে। বইটির নাম এ মুহুর্তে স্পস্ট মনে নেই। পুরোটা আমার নিজের পড়া হয়ে উঠে নি। বিবর্তনবাদের উপরে এখানে যারা সুনির্দিষ্টভাবে লিখছেন তাদের বরাতে বোঝা যাচ্ছে বিবর্তনবাদকে এখানে সকলে স্বীকার করছেন। বলে রাখা ভাল কমিউনিজমকে সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র আদর্শ হিসেবে মানি। এবং বিবর্তনবাদ বিষয়ে আমার জ্ঞান এত কম যে তা উন্নিত করার জন্য অভিজিতের অনেক পরামর্শ মেনে নিতেই হবে। অর্থাৎ কিছু বই-পুস্তক পড়ে নেয়া কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে একে অন্যকে এখানে যেভাবে অযাচিত কটুক্তি করা হয় সে রকম কটুক্তি আমার বরাতেও জুটবে এ রকম একটা ধারণা থাকার পরও কিছু কথা তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
এ লেখাটি ইমরান হাবিব রুমনের একটি লেখার সূত্র ধরে লেখা। এবং অভিজিৎ যে বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসার চান, সেক্ষেত্রে ইমরান হাবিব রুমন একজন সক্রিয় কর্মী। হতে পারে তার হাত দিয়েও কারো কারো হাতে অভিজিতের লেখা বইটি পৌঁছেছে। দেশের বাইরে থেকে দেশের অভ্যন্তরে বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে যারা কাছ করছেন তাদের সম্পর্কে অভিজিতের নূন্যতম কোন ধারণা আছে বলেই জানি। রাজিনতিক দলসমূহের মধ্যে বামপন্থী দলগুলোই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ সংগ্রাম করছে।এবং সেক্ষেত্রে বিজ্ঞানমনস্কতার পরিবর্তে বাংলাদেশে সকল পুঁজিবাদী চিন্তার অনুসারী রাজনৈতিক দলসমূহ (বুর্জোয়া দল) ধর্মকে রাজনৈতিক অঙ্গণে ব্যবহারের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। কতিপয় বামপন্থী দল তারপরও বুর্জোয়াদের একটি অংশের সাথে জোট বেধে বসে আছে। তারপরও তারা অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষেই কথা বলে থাকেন। বাংলাদেশের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার যারা ধারক তারা চেয়ে আছেন এ বামপন্থী শক্তির দিকে, তাদের কার্যকর উত্থানই বাংলাদেশের মোড় ঘোরাতে পারে। শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চ নামে বাংলাদেশে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের একটি প্লাটফর্ম গড়ে উঠেছে যেখানে আমাদের মতো বামপন্থী নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। ফলে অভিজিতের লেখার মধ্যে বামপন্থীদের নিয়ে শ্লেষাত্মক বক্তব্যের পেছনে অন্য কিছু আছে এভাবে ভাবতে এখনো আমি অপারগ। বরং ভাবাদর্শগতভাবে বিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট মতাদর্শধারীদের একটা বিতর্ক এখানে উঠে আসছে এভাবে ভাবতে পারলে আমরা এ বিষয়ে নিজেদের সম্বৃদ্ধ করতে পারব বলেই ধারণা।
আজকের দিনে শিক্ষা ও বিজ্ঞানের বিকাশে পুঁজিবাদ একটি বাধা। কারণ মানবজাতির জ্ঞানভান্ডারে যে জ্ঞানের সমারোহ ঘটেছে তার মাঝে বিচরন করার অধিকারকে এ সমাজ স্বীকার করে না। ধন-বৈষম্য যেমন এক্ষেত্রে বাধা তেমনি বহুজাতিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণেরই চলছে সামান্য কিছু গবেষণা। বিজ্ঞানের উত্তরোত্তর বিকাশ মানবজাতির জীবন পাল্টে দেয়ার পরিবর্তে মুনাফা অর্জনের কাজেই তা ব্যবহৃত হচ্ছে। পুজির দাসত্বের হাত থেকে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে মুক্ত করার প্রশ্নটি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ধারণায় না থাকলে এর অগ্রগতি সম্ভব নয়।
অথচ এত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে কমিউনিজমকে মহাশত্রুর আসনে বসিয়ে অভিজিত কাদের জয়গান গাইতে চান তা জানার আগ্রহ রইলো। অন্যদের পরিচয় আড়াল করার বিষয়টিকে অভিজিত প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কিন্তু তারপরেও তাদের চিন্তায় তারা নিজেদের মার্কসবাদী হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু অভিজিত এক্ষেত্রে সততা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন না। ডারউইন মার্কসবাদী ছিলেন না, কিন্তু মার্কস ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। এমন কি ক্যাপিটাল গ্রন্থ লেখার পূর্বে যে সকল অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ থেকে মার্কস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাদের অবদানকেও তিনি স্বীকার করেছিলেন। ফলে বিজ্ঞানের যে কোন সত্যকে মেনে নিতে মার্কসবাদীরা অন্ধত্বের পরিচয় দেবে, এমন অন্ধ ধারণা বিজ্ঞানমনস্ক কোন ব্যক্তির ধারণ করা সত্যিই দুঃখজনক।

অভিজিৎ এর ছবি

আমি প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানচ্ছি এ ব্লগে এসে সুচিন্তিত মন্তব্য করবার জন্য। আপনি শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের সাথে আপনি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন বিধায় একটা বড় ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য। আপনি নিশ্চয় জানেন শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চকে গরে তুলবার পেছনে এবং এই সংগঠনটির সাথে নিজেকে এবং মুক্তমনাকে জড়িত করে আমরা এই দুঃসময়েও অগ্রসর চিন্তা মানুষের মাঝে পৌঁছিয়ে দিতে পারছি। আর আপনারা যারা বাংলাদেশ থেকে এই মিশনকে সফল করে তুলছেন, তাদের যদি আমি ধন্যবাদ না জানাই তো কাকে জানাবো! আমার সত্যই ভাল লাগছে আপনাকে এখানে দেখে।
এবার অপনার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা বলব। আশা করি আমরা আলোচনার সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখব।

অভিজিৎ এর দু'টো লেখা এ পর্যন্ত পড়েছি। বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আমি তার পরিচয় পেয়েছি। এবং আমাদের পরিচিত মহলে বিবর্তনবাদের ওপরে ( অভিজিৎ ও অন্য আর এক জন লেখকের লেখা ) বই খানিকটা আগ্রহের সঞ্চার করেছে। বইটির নাম এ মুহুর্তে স্পস্ট মনে নেই। পুরোটা আমার নিজের পড়া হয়ে উঠে নি।

আসলে বিবর্তনের উপর আমি কোন বই লিখিনি। আমার স্ত্রী বন্যার লেখা একটা বই আছে - 'বিবর্তনের পথ ধরে'। আপনি হয়ত সেটার কথা বলছেন। আমার দুটো বই বাজারে আছে - আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, এবং 'মহাবিশ্বে প্রাণ এবং বুদ্ধিমত্তার খোঁজে' । এর মধ্যে ২য়টি আমার একার নয়, ফরিদ আহমেদের সাথে যৌথভাবে লেখা। এ দুটো বই বাদ দিলে - গত বছর একটি সংকলনের কাজ করেছিলাম - 'স্বতন্ত্র ভাবনা' নামে। তবে বিবর্তনের উপর আমি আগ্রহী সবসময়ই। বই না লিখলেও উৎসাহের কারনেই বিবর্তনের আধুনিকতম ধ্যান ধারনাগুলোর সাথে পরিচিত হতে ভালবাসি। আধুনিক গবেষনা কোন দিকে যাচ্ছে তার একটা খোঁজ খবর রাখতে পছন্দ করি। সে সুত্রেই মেন্ডেল এবং লাইসেঙ্কো নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ হয়েছিলো। এ সুযোগে যে ব্যাপারগুলো আবারো ঝালিয়ে নেয়া গেল - এ কিন্তু মন্দ হল না একেবারে। কি বলেন?

বিবর্তনবাদের উপরে এখানে যারা সুনির্দিষ্টভাবে লিখছেন তাদের বরাতে বোঝা যাচ্ছে বিবর্তনবাদকে এখানে সকলে স্বীকার করছেন। বলে রাখা ভাল কমিউনিজমকে সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র আদর্শ হিসেবে মানি।

হ্যা, কমিউনিজমকে আপনার বা আপনাদের মত সমাজ পরিবর্তনের 'একমাত্র আদর্শ' হিসেবে আমি না মানলেও আমার বলতেই হবে, আপনাদের ডেডিকেশন, মোটিভেশন, জ্ঞানের অনুসন্ধান, নিপীড়িতদের অধিকার কায়েম করে সমাজকে সুন্দর করার ইচ্ছে - সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করে। আমি ছোটবেলা থেকেই বাম পরিবেশে বর হয়েছি। নির্মল সেনের মত ব্যক্তিত্ব আমাদের বাসায় আসতেন আমার বাবার সাথে আড্ডা মারতে। আর বাসদ আর সিপিবির অসংখ্য কর্মীরা তো ছিলোই। কমিউনিজমের তাত্ত্বিক ব্যর্থতার দিকে অয়াঙ্গুল না তুলেও বলা যায় - তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠা, এবং অধিকারের লড়াইয়ের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাম ঘরণার কর্মীরা সত্যই প্রশংসনিয় কাজ করেছেন, এবং এখনো করে চলেছেন। আর সেজন্যই তো শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের প্ল্যাটফর্মের প্রতি রয়েছে আমার এবং আমার তৈরি মুক্তমনার রয়েছে অকুন্ঠ সমর্থন।

তারপরও আমি আসলে একটি জায়গায় সুচিন্তিত একটি পার্থক্য করব। আমি জৈব বিবর্তনকে সামাজিক বিবর্তনের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাই না। আমি ' বেঁচে থাকার জন্য জীবন সংগ্রাম' কে ডারউইনের মতই 'শ্রেনী সংগ্রামের' সমার্থক মনে করি না। আমি আসলেই মনে করি অদর্শবাদের পাল্লায় পড়লে বিজ্ঞানের কোন উন্নতি হয় না। স্ট্যালিনের জামানায় যেমন আমরা লাইসেঙ্কুইজমের পরিণতি দেখেছি, তেমনি আজকে বুশের জামানায় দেখিছি 'ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন'-এর পরিণতি। আর অন্যদিকে ইসমাকিক বিশ্ব তো নগ্নভাবে কোরাণ হাদিসের মধ্যে বিজ্ঞান খোঁজার চেষ্টা করে চলেছেন। আসলে পুঁজিবাদী, সাম্যবাদী ধর্মবাদী সকলেই নিজেদের আদর্শের যাতাকলে পিষ্ট করতে চেয়েছেন। এতে কিন্তু বিজ্ঞানের লাভ হয়নি মোটেই। আমার বক্তব্য ছিল সেটাই।

এ লেখাটি ইমরান হাবিব রুমনের একটি লেখার সূত্র ধরে লেখা। এবং অভিজিৎ যে বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসার চান, সেক্ষেত্রে ইমরান হাবিব রুমন একজন সক্রিয় কর্মী।

এটা জেনে আমার খুবই ভাল লাগছে। ইমরান হাবিব রুমন আরো লিখুন সেই কামনাই করি। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোন বিরোধ নেই। আমি তার সাথে যে বিষয়গুলোতে দ্বিমত করেছি, সেগুলো আমি মনে করি একাডেমিয়ার দৃষ্টিকোন থেকেই সুস্থ মতান্তর। ল্যামার্কিজম এনং লাইসেঙ্কোইজমের পরিবেশ নির্ণয়বাদ কোথায় ভুল করেছিলো - সেটা জানানোই ছিলো আমার লেখার উদ্দেশ্য। ওইটুকু বাদ দিলে রুমনের সাথে আমার তেমন কণ বিরোধ নেই। উনার লেখা সত্যই প্রাঞ্জল এবং চিন্তার উদ্রেগকারী।

ফলে অভিজিতের লেখার মধ্যে বামপন্থীদের নিয়ে শ্লেষাত্মক বক্তব্যের পেছনে অন্য কিছু আছে এভাবে ভাবতে এখনো আমি অপারগ। বরং ভাবাদর্শগতভাবে বিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট মতাদর্শধারীদের একটা বিতর্ক এখানে উঠে আসছে এভাবে ভাবতে পারলে আমরা এ বিষয়ে নিজেদের সম্বৃদ্ধ করতে পারব বলেই ধারণা।

অনেক ধন্যবাদ। আমি বিজ্ঞান এবং আদর্শবাদ নিয়ে আমার অভিমত আগেই দিয়েছি। তাই নতুন কিছু বল্বার নেই। তবে 'বামপন্থীদের নিয়ে শ্লেষাত্মক বক্তব্য' আমি করিনি। বরং আমি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছি রুমনের লেখায় যেখানে আমাকে 'বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক' এবং তার পর একটি আশ্চর্যবোধক চিহ্ন এঁটে দিয়ে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ করার চেষ্টা ছিল। আমার শ্লেষ ছিলো শুধু ওইটুকুতেই। যদি রুমন সে কাজটি না করতেন, আমি হয়ত আমার প্রবন্ধটি ওভাবে লিখতাম না - বরং আরো নৈর্বক্তিক থাকার চেষ্টাই করতাম। তবে আমরা এক আদর্শের হই বা ভিন্ন আদর্শের - সুস্থ আলোচনা সবসময়ই আমাদের সমৃদ্ধ করে। আমরাও এর মাধ্যমে আমাদের সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারব বলে মনে করি।

অথচ এত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে কমিউনিজমকে মহাশত্রুর আসনে বসিয়ে অভিজিত কাদের জয়গান গাইতে চান তা জানার আগ্রহ রইলো।

প্রথমতঃ আমার জ্ঞান তেমন কিছু নয়। প্রতিদিনই আমি শিখছি। কাজেই 'এত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও' বাক্যটি আমার জন্য মিসএপ্লায়েড! আর দ্বিতীয়তঃ আপনার এই প্যারার বক্তব্য এর আগের প্যারার বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক এবং বিপরীতমুখি। আপনি একটু আগেই বলেছেন, আমার বক্তব্যের পেছনে 'অন্য কিছু আছে এভাবে ভাবতে এখনো আমি অপারগ' আবার এখন বলছেন, 'কমিউনিজমকে মহাশত্রুর আসনে বসিয়ে অভিজিত কাদের জয়গান গাইতে চান'। যাহোক, আমি কাউকে মহাশত্রুর আসনে বসাইনি। আমি খুব একাডেমিক দৃষ্টিকোন থেকেই লাইসেঙ্কুইজমের ব্যররথতা নিয়ে আলোচনা করেছি। যারা একাডেমিক লাইনে এ নিয়ে গবেষনা করেন তারা সবাই আমার সাথে একমত হবেন। আপনি উপরে সুহাস সাহেবের বক্তব্য নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, আপনি আরো পড়তে পারেন এ নিয়ে আমাদের ফোরামে ডঃ জাফর উল্লাহর মন্তব্যও

আমি আশা করব আপনি বুঝবেন যে এধরনের বৈজ্ঞানিক আলোচনায় - মহাশত্রুর আসনে বসানো, না বসানো আসলে এখানে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আমার উদ্দেশ্য হতে পারে নিস্পৃহভাবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। আমি বিষয়টিকে সেভাবেই দেখি।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

সুহাস,
আপনার মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এই মন্তব্যের কিছু বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষনের অভিপ্রায়ে লেখছি------

বহুদিন আগে যখন বায়োলজিতে মাস্টার্স করেছিলাম, আমার গবেষণার বিষয় ছিলো বিবর্তনীয় সংশ্লেষণ। অর্গানিক সিলেকশনের কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছিলো আমাকে। সেখানে মাল্টিপল জিন, পলিজিন এবং সাংখ্যিক বংশানুসৃতি নিয়ে কাজ করেছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম মেন্ডেলের সূত্রের সার্থকতা। এমনকি মেন্ডেলের সূত্রগুলোর আধুনিক ক্রোমোজমভিত্তিক ব্যাখ্যাগুলোও আমাকে জানতে হয়েছিলো। জিনের সেগ্রিগেশন মেন্ডেলের দুটো সূত্রকে কিভাবে ক্রোমজমের মাধ্যমে সহজেই ব্যাখ্যা করে দিতে পারে তা এ বিষয়ে গবেষণারত অনেকেই জানেন। মেন্ডেলের তত্ত্ব বিজ্ঞানে যেমন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, ল্যামার্কের তত্ত্ব সেরকম নয়।

আমি প্রথম থেকে বলছি, আমি আমার কোন আলোচনায় এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইনি যে, মেনডেলের বংশগতি তত্ত ভুল। আজকের বিজ্ঞানে মেনডেলের বংশগতিবিদ্যা প্রমানিত সত্য। উল্টোদিকে ল্যামার্কের inheritance of acquired characters ভুল হিসাবেই প্রমানিত।
অভিজিতের বক্তব্যের ক্ষেত্রে আমার আপত্তির জায়গাটি ছিল অন্য জায়গায়। সেটি আশা করি আমার প্রথম মন্তব্য (৫ নং) পড়লে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
আসলে বিবর্তনকে স্বীকার করে নিলে (জিন আবিষ্কারের আগে) প্রথম যে প্রশ্নের সম্মুখীন জীববিজ্ঞানীরা হয়েছিল তা হলো এটা কিভাবে ঘটেছিল। সেক্ষেত্রে একটা পর্যায়ে ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশন ও মেনডেলের বংশগতি তত্ত আবিষ্কারের পরে (বিশেষ করে উনিশ শতকের কিছু আগে থেকে)- বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্পষ্ট দুটো ভাগ ছিল, যাদের একদল ল্যামার্কের তত্তের অনুসারী এবং অপরদল মেনডেলের তত্ত থেকে এ ধরাণায় উপনীত হয় যে, ল্যামার্কের তত্ত অনুযায়ী পরিবেশ থেকে অর্জিত বৈশিষ্ট্য বংশ পরম্পরায় অনুসৃত হয় না। পরবর্তী দলের মধ্যে ভাইসম্যান- গ্যালটনদের বক্তব্য শুরুর দিকে যথেস্ট জোরালো ছিল এবং তারা কিছু পরীক্ষণও চালান। কিন্তু সেসব পরীক্ষণের পাল্টা যুক্তিও কিন্তু সেসময় ল্যামার্কিস্টরা এনে হাজির করেছিল। আজ আমরা সন্দেহাতীতভাবে জানি যে, প্রজাতির বিবর্তন ল্যামার্কের তত্ত অনুসারে হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেকালে ল্যামার্কিস্টদের সমস্ত যুক্তি ভুল বা সেগুলো বিজ্ঞান নয় (অপবিজ্ঞান) এবং মেনডেলিস্টদের সমস্ত পরীক্ষণই সঠিক বা সমস্ত দাবীই সঠিক। মূলত এ জায়গাটিই আমি তুলে ধরার চেস্টা করেছি।

আজকে আমরা প্রজাতির বিবর্তন সম্পর্কে কি জানি? সেই জিরাফের গল্প দিয়েই বুঝি। ল্যামার্কের তত্ত অনুযায়ী, ছোট গলার জিরাফের পূর্বপুরুষদের পরিবেশের সাথে অভিযোজনের প্রয়োজনে (খাদ্যসংগ্রহ- উচু গাছ থেকে পাতা খাওয়ার নিমিত্তে), ধীরে ধীরে গলা লম্বা হয়ে যায়। অর্থাৎ গ্রাজুয়ালি গলার দৈর্ঘ পরিবেশের সাথে বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে আজকের জিরাফের মত লম্বা গলার জিরাফ তৈরী হয়। আজ আমরা জানি যে, এমনটি আসলে ঘটেনি। বরং, এমনটি বলা যেতে পারে যে, সে সময় জিরাফের পূর্বপুরুষদের মধ্যে নানা প্রকরণ (লম্বা গলা, মাঝারি গলা, ছোট গলা) উপস্থিত ছিল। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে এমন জিরাফই শুধু টিকেছে- বাকি জিরাফ টিকতে পারেনি। এক পর্যায়ে লম্বা গলার জিরাফের প্রকরণ টিকে গেছে এবং বাকি প্রকরণগুলো লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এটাই হচ্ছে ন্যাচারল সিলেকশন। কিন্তু আমরা আজ ন্যাচারাল সিলেকশনকে যেভাবে বুঝছি, সেভাবে বুঝাটা কি সেসময়ের জন্য সহজ ছিল? এমনকি ডারউইন স্বয়ং কিভাবে বুঝেছিলেন?

জিন আবিষ্কারের পরে, আসলেই বিবর্তন সংক্রান্ত ব্যাখ্যা একটি বিশেষ মাত্রা পায়। মেনডেল প্রথম যে ইউনিট ক্যারেকটর আবিষ্কার করেন- তাই আসলে জিন। মরগ্যান দেখান এই জিন কোষের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াসের ক্রোমোজমের ভেতরে থাকে। এই জিনই বংশ পরম্পরায় জীবের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করে। কিন্তু বিবর্তনের কথা মানলে আমাদের এটাও মানতে হয় যে, জীবের এই বংশ পরম্পরার বৈশিষ্ট্যও বিবর্তিত হয়েছে বা হচ্ছে। ফলে, প্রশ্নটি আসে, জিনের বিবর্তন কিভাবে ও কিরূপে ঘটে? উনিশ শতকের শুরুর দিকটিতে এই প্রশ্নে জীববিজ্ঞানীদের প্রধানত দুটো শিবিরে বিভক্ত হওয়া তাই খুব স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু দুই শিবিরের বড় সমস্যা ছিল এটাই যে, একপর্যায়ে তারা অপরটিকে উড়িয়ে দিতে গেলো। ল্যামার্কিস্টদের মধ্যে অনেককেই দেখা গেলো- তারা পুরো জেনেটিক্সকেই বর্জন করলো, একইভাবে মেনডেলিস্ট-মর্গানিস্টদের অনেকেই পরিবেশের ভূমিকা পুরো অস্বীকার করতে গিয়ে biological determinism এর পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলো। বস্তুত উভয় শিবিরের এ অবস্থান দুটোই ছিল ভুল। আবার উল্টোদিকে, ল্যামার্কিস্টদের মধ্যে অনেকে যেমন জিনের প্রভাবকে অস্বীকার করেনি, তেমনি মেনডেলিস্টদের মধ্যেও অনেকে কিন্তু পরিবেশের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি।

এখন, ইমরান হাবিব রুমনের লেখাটি সম্পর্কে আমি আমার প্রথম কমেন্টে জানিয়েছি- তার সাথে আমি একমত নই। কিন্তু- রুমনের লেখার জবাবে অভিজিতের এই পোস্টকে প্রচণ্ড দুর্বল মনে হয়েছে এবং যুক্তিগুলোকে অত্যন্ত খেলো মনে হয়েছে। এবং এ পোস্টে রুমনকে খণ্ডাতে গিয়ে অহেতুক বামধারার লোকজনের বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান নিয়ে কটাক্ষ করেছেন- অহেতুক আজেবাজে কথার জঞ্জাল উপস্থিত করেছিলেন বলে মনে হয়েছে। যেহেতু এটা অভিজিতের পোস্ট- সেহেতু এখানে রুমনের বক্তব্যের অসারতা তুলে ধরার চেয়েও অভিজিতের সাথে দ্বিমতের জায়গাগুলো তুলে ধরার তাগিদ বোধ করেছি। এবং মনে হয়েছে- অভিজিৎ রুমনকে খণ্ডন করতে গিয়ে আসল যুক্তির পরিবর্তে, পরিপূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনাগুলো হাজির করার পরিবর্তে উনিশ শতকের সে আমলের biological determinism কেই সামনে যেন নিয়ে আসছেন।

এবারে দেখি ভাইসম্যান ও গ্যালটনের পরীক্ষণের দিকে। ভাইসম্যানের লেজ কাটা পরীক্ষণে কি ল্যামার্কের তত্ত সন্দেহাতীতভাবে বাতিল হয়ে গিয়েছিল সে সময়ে? সে পরীক্ষণের বিপরীতে মোটাদাগে প্রধান দুটো যুক্তি এসেছিল: এক পরিবেশের প্রভাব আর এমন আরোপিত (ঐচ্ছিক) লেজ কাটা কি এক? দুই: সময়কাল- যেটাকে তারা খুব জোরেশোরে এনেছিলেন- কেননা, তাদের মতে পরিবেশের প্রভাবে অভিযোজন গুলো ধীর প্রক্রিয়ায় ও অনেক জেনারেশনের ফল। সেই সাথে তারা এটাও বলেছিল- পরিবেশের প্রভাবে সবারই একইরকম এবং একই হারে বিবর্তন ঘটবে - এমনটা নাও হতে পারে। আবার ন্যাচারাল সিলেকশনকেও কিন্তু ল্যামার্কিস্টরা তাদের অবস্থানের পক্ষেই জোরালো যুক্তি হিসাবে দেখেছিল। ন্যাচার তথা পরিবেশই সিলেকশন ঘটিয়ে ও বিবর্তন ঘটিয়ে যোগ্য জীবদের টিকিয়ে রাখছে। ফলে, ভাইসম্যানের লেজ কাটা পরীক্ষণের পরেও কিন্তু ল্যামার্কিস্টরা বা জীববিজ্ঞানীরা সকলে একমত হতে পারেননি। কেন? সেসময়ে ল্যামার্কিস্টরা জানিয়েছিল- অর্জিত বৈশিষ্ট্য হতে হবে সূক্ষাতিসূক্ষ পর্যায়ে। পায়ে ঠোসা পড়লে- বা একসিডেন্টে হাত-পা হারালে পরবর্তী প্রজন্মেও অনুরূপ পরিবর্তন ঘটে না, সেটা সহজে সকলের পর্যবেক্ষণেই ছিল, ফলে- তারপরেও যখন ল্যামার্কিস্টরা ব্যক্তি পর্যায়ে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন তখন এর মানে এ ধরণের ম্যাক্রো বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেননি। ফলে, ল্যামার্কিস্টদের অবস্থান ভুল ছিল এটা দেখানোর জন্য যখন অভিজিৎ ঠোসার কথা বলেন, তখন সেটাকে সঠিক আলোচনা মনে হয়না।

একইভাবে গ্যালটনের পরীক্ষণ দিয়েও যে ল্যামার্কিস্টরা ভুল অবস্থানে ছিল প্রমান করতে চাইলে মনে হয় এক ভুলকে আরেক ভুল দিয়ে সংশোধন করার চেস্টা করা হচ্ছে। ল্যামার্ক (কোন কোন ক্ষেত্রে ডারউইনও) মনে করতেন, পরবর্তী প্রজন্মে বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলো মিশ্রিত হয়ে যায় (যেমন ফর্সা বাবা, কালো মায়ের সন্তান শ্যামলা হয়ে গেলো)। আমরা আজ জানি, এটি ভুল- এবং গ্যালটন যে এর বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন সেটিই ঠিক। কিন্তু সাথে এটাও বলতে হবে, এ ব্যাপারে গ্যালটনের সিদ্ধান্তটুকুই শুধু ঠিক- কিন্তু তা প্রমাণ করার জন্য যে পরীক্ষণ করেছিলেন- তা মস্ত বড় ভুলের উপর দাঁড়িয়ে করেছিলেন। বংশগতির বৈশিষ্ট মোটেও রক্ত দিয়ে নির্ধারিত হয় না- সাদা ও কালো খরগোশের রক্তও এমনকি একই গ্রুপের, একই আরএইচ ফ্যাক্টরের হতে পারে। ফলে, তিনি সাদা-কালো খরগোশের রক্ত পরষ্পরের মধ্যে সঞ্চালন করে যে দেখান বংশগতির বৈশিষ্ট্য মিশ্রিত হয়না, তাতে আসলে কিছুই প্রমানিত হয়না। অথচ মিশ্রণ তত্তের বিপরীতে সবচেয়ে ভালো ও জোরালো যুক্তি হতে পারে খোদ মেনডেলের পরীক্ষণ। কিন্তু অভিজিতের আলোচনায় এই গ্যালটনের ভুল পরীক্ষণ দিয়ে ল্যামার্ককে খণ্ডন দেখে তাই অবাকই হয়েছি। সেই সাথে যখন দেখি গ্যালটনের ইউজিনিক্সের অনুসারীরা পরবর্তীতে রক্তের ধারাকে, বংশের ধারা হিসাবে দেখিয়ে "নীল রক্তের" আভিজাত্যে গর্বিত হয়ে বর্ণবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে- তখন ভাবি ইউজিনিক্সের প্রবক্তা গ্যালটন এমন রক্তের মিশ্রণ ঘটিয়ে পরীক্ষণ করতেই পারে, কিন্তু আজকের যুগের বিজ্ঞান আলোচনায় সেই পরীক্ষণের দিকে দৃষ্টিভঙ্গী কেমন হবে?

আপনার আলোচনায় দেখলাম,

ল্যামার্কের তত্ত্বকে বাতিল করার জন্য যে সমস্ত পরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলোকে এককথায় মওদুদীর উক্তির সাথে কিংবা জাকির নায়েকের তুলনা করা বালখিল্য।

অভিজিৎও বলেছেন,
পরিবেশ দ্বারা উৎপন্ন প্রভাব বংশানুসৃত হয় কিনা তা যুক্তিনিষ্ঠ ভাবে প্রমাণের জন্য ভাইজম্যানের পরীক্ষা আর মউদুদীর উক্তি কি এক হল? আমি ল্যামার্কিজম এবং তার মোড়কে পোড়া লাইসেঙ্কোইজম খন্ডন করে যে উদাহরনগুলো হাজির করেছি সেগুলো বেশিরভাগই আপনি পাবেন ঢকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা এবং সাইটোজেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক এবং ডঃ আখতারুজ্জামান এর বিবর্তন বিদ্যা বইয়ে। আপনি দয়া করে বইটির ১৬৪- ১৬৭ পৃষ্ঠা পড়ুন, এবং বোঝার চেষ্টা করুন। ডঃ আখতারুজ্জামান মওদুদী নন, তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশী সময় ধরে বিবর্তন বিদ্যা পড়াচ্ছেন। ডোমারম্যানের লেজ কাটা থেকে শুরু করে খৎনা করা, মেয়েদের নাকে কানে ছিদ্র করার উদাহরনগুলো ১৬৭ পৃষ্ঠায় পরিষ্কার ভাবে বলা আছে। আর আপনার কাছে তা মনে হয় মওদুদীবাদ!

আমি মওদুদির তুলনা এনেছিলাম কিন্তু অভিজিতের "সেজন্যই মানুষ যতই চেষ্টা করুক কিংবা হাজার কসরত করুক তার পীঠের হাড্ডী পরিবর্তিত হয়ে পাখায় রূপান্তরিত হয়ে যায় না"- এই কমেন্ট দেখে। এ ধরণের যুক্তি আসলেই একজন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানলেখকের মুখে শোভা পায় কি-না, ভেবে দেখার আহবান জানাই। শুধু মওদুদি নয়, ডারউইনের বিবর্তনবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরে এ ভাষায় বিবর্তনবাদকে উড়িয়ে দিয়েছে আরো অনেকেই- বিশেষ করে সে আমলের সৃষ্টিতত্ত্ববাদী লোকেরা- তাদের মধ্যে ধর্মীয় পাদ্রী থেকে, সাহিত্যিক-দার্শনিক, এমনকি বিভিন্ন বিজ্ঞানীরাও এমন সব যুক্তি এনেছিলেন। চার্লস কিংসলি "জলশিশু" নামে এক শিশুতোষ উপন্যাস লিখেন যেখানে দেখানো হয় টম নামে এক ছোট ছেলে হঠাৎ চার ইঞ্চি সাইজের ফুলকাওয়ালা জলশিশু হয়ে গেলো। টমের ভাষায়- "পাঠক! এই বিবর্তনমূলক অবক্ষয়কে অসম্ভব বলে ভাববেন না। এ যুগের বিজ্ঞান বিশারদগণ কিন্তু প্রাকৃতিক প্রপঞ্চের ব্যাপারে যথেস্ট উদার মনোভাবের জন্ম দিয়েছেন যদিও তারা সবসময় নিজের কল্পনার সীমাবদ্ধতাকে প্রকৃতির উপর আরোপ করে থাকেন"। কিংসলি মনে করতেন ডারউইন ও সমগোত্রীয় বিজ্ঞানীদের মতবাদ কাল্পনিক, তাই তিনি এমন একটি কাল্পনিক ও উদ্ভট কাহিনী লিখেন, লিখে প্রমান করতে চান- আমার লেখাটি যদি আপনাদের কাছে এতই উদ্ভট মনে হয়- তবে ডারউইনেরটা নয় কেন?
আমি অভিজিতের মানুষের পিঠের হাড্ডি পাখায় রূপান্তরিত হয়না- এ যুক্তির সাথে মওদুদি-কিংসলি থেকে সৃষ্টিতত্তবাদীদের করা যুক্তিরই মিল পাই। আজো সাধারণ্যের মধ্যে বিবর্তনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুক্তি যেটি আসে সেটি হলো- কই প্রকৃতিতে কত প্রাণী-জীব আছে, তাদের বিবর্তন তো দেখা যায় না, কেন? মাছ থেকে কেন আজ স্থলজ প্রাণী বিবর্তিত হতে দেখা যায় না, কেন কোন ভূখণ্ডের প্রাণীর পিঠের হাড্ডি পাখায় রূপান্তরিত হয়ে পাখি হতে দেখা যায় না------ ইত্যাদি।

আবার, যখন ড ম আখতারুজ্জামানের বই এর কথা বলা হলো, তখনও দুটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার- এক, আমি বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের পরীক্ষণ সংক্রান্ত আলোচনাকে মওদুদিবাদ বলিনি- বলেছি অভিজিতের ঐ যুক্তিকে (পিঠের হাড্ডি পাখায় রূপান্তরিত হয়না কেন!!), দুই, বিবর্তনবাদের উপর লিখিত বই এ ভাইসম্যান- গ্যালটন প্রমুখের পরীক্ষণের কথা আসতেই পারে, ধারাবাহিক ইতিহাস বুঝার জন্য সেটা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু আমি মনে করি- ল্যামার্ক/ডারউইনের মিশ্রণ তত্তকে খারিজ করার বিষয়টি গ্যালটনের খরগোশের রক্ত মিশ্রণ পরীক্ষণ দিয়ে সম্ভব নয়- একইভাবে ভাইসম্যানের ইদুরের লেজ কাটা পরীক্ষণ ল্যামার্কিস্টদের পরিবেশ নির্ণয়বাদকে খণ্ডন করার জন্য যথেস্ট নয়।

ল্যামার্কের ফলাফল অনেক আগেই বাতিল হয়ে যাবার পরও কেন প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের রথী মহারথীরা লাইসেঙ্কোর মত একজন আরগোনোমিস্টের মাধ্যমে ল্যামার্কবাদের চর্চা করে গেছেন, তা বিস্ময় উদ্রেক করে।

আমার ৭.১. নং কমেন্টে দেখিয়েছি যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে শুধু ল্যামার্কিজমের চর্চা হয়েছে- এটা ভুল। গোটা দুনিয়ার বায়োলজিস্টরা দুটো শিবিরে বিভক্ত ছিল- এমনকি আপনি ল্যামার্কিস্টদের যে তালিকা দিয়েছেন- তারাও কিন্তু সোভিয়েত বিজ্ঞানী নন। বিজ্ঞানীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, ভুল-সঠিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা সমস্তই খুব স্বাভাবিক এবং এটা হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এবং গত শতাব্দীর মাঝামঝির আগ পর্যন্ত আজকের মত এত নিশ্চিন্ত হওয়ারও কোন উপায় ছিল না। তবে এটা ঠিক যে, ধীরে ধীরে ল্যামার্কিস্টদের যুক্তি-পরীক্ষন গুলো একে একে ভুল প্রমানিত হচ্ছিল। কিন্তু আজকের সমস্ত আবিষ্কার ও প্রমাণসমূহ দেখে সেসময়কার বিজ্ঞানীদের ভুল-ভালকে অবজ্ঞার চোখে দেখাটা এক ধরণের মূর্খামি বলে মনে হয়। গোটা দুনিয়ার সমস্ত বিজ্ঞানীকূল যখন প্রজাতির সুস্থিতির ধারণা পোষণ করেন- তখন ফ্রেঞ্চ প্রকৃতিবিদ ল্যামার্কই প্রথম জানান দেন, প্রজাতি সুস্থির নয়। শুধু এই পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি- সাথে তিনি এই বিবর্তনের কারণও অনুসন্ধান করেন। আজ যতই ল্যামার্কের বিভিন্ন তত্ত ভুল প্রমানিত হোক না কেন, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তার ভূমিকাকে অস্বীকার করার কি কোন জো আছে? অথচ, লাইসেঙ্কোকে উড়িয়ে দিতে গিয়ে অভিজিৎ তার আলোচনায় ল্যামার্ককে কিভাবে উপস্থিত করছেন তা দেখার আহবান জানাই। "ল্যামার্ক নামের এক বিজ্ঞানী তত্ত দেন যে----" এভাবে শুরু করার পর থেকে অভিজিতের যে আলোচনা তাতে মনে হয়েছে- বেচারা ল্যামার্ক সেই তত্ত দেয়াতে যেন মহাপাপ করেছেন! বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনায় এমনটি আশা করিনি।

যাহোক, আপনার আলোচনায় যে অবাক হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলো- সেটি নিয়েই বলি। আজ যেমন আমরা সহজেই ল্যামার্কের তত্তের ভুল দেখতে পাই- সে সময়ে যে বিজ্ঞানীদের পক্ষে সেটা খুব সহজ ছিল না, তার কারণ জেনেটিক্স সম্পর্কে সে সময়ে আজকের মত জ্ঞান ছিলনা- এবং কিছু প্রশ্নের সমাধান আজকের জেনেটিক্স-জিনোমিক্স প্রভৃতি ছাড়া সম্ভব হয়নি। এখন দেখি, ল্যামার্কিস্টরা কোন কোন জায়গায় পরিবেশের প্রভাব বা ব্যবহার-অব্যবহার তত্তের উপর নির্ভর করছিলেনঃ
# দুনিয়ার জীব-বৈচিত্র তথা প্রজাতির বৈচিত্র যদি সমস্তই আদি এককোষী সরল জীব থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তবে এই বিবর্তনের মূল কি? ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশন থেকেও দেখা যাচ্ছে- ন্যাচারের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রজাতিকেই দেখা যাচ্ছে- পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার উপযোগী বৈশিষ্ট নিয়েই অবস্থান করছে। মিউটেশন বা জেনেটিক রিকম্বিনেশন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ল্যামার্কের তত্ত তাই এ প্রশ্নের সমাধান দিয়েছে।
# বিভিন্ন জীবের শরীরতত্ত থেকে জানা যায়, অনেকেরই বিলুপ্তপ্রায় ও অপ্রয়োজনীয় কিছু অঙ্গ আছে। যেমন: তিমি মাছের পায়ের হাড়, মানুষের লেজের হাড়------ ইত্যাদি। এগুলো যেমন বিবর্তনের পক্ষে সাক্ষ দেয় এভাবে যে, এক কালে এদের পূর্ব পুরুষদের এসব অঙ্গ ছিল এবং এই অঙ্গগুলো পূর্বপুরুষদের প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু এখন সেগুলো অপ্রয়োজনীয়। স্বয়ং ডারউইনও এর ব্যাখ্যায় ল্যামার্ককে গ্রহণ করেছিলেন - অর্থাৎ অব্যবহারে- অপ্রয়োজনে এসমস্ত অঙ্গ বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে।
# জিওগ্রাফিক স্পেসিয়েশনের (allopatric speciation) ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, একই পপুলেশন যখন দুভাগে বিভক্ত হয়ে দুটো ভিন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিচরণ করছে, তখন একটা সময় পরে দেখা যাচ্ছে- উভয়ের মধ্যে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার উপযোগী আলাদা বৈশিষ্ট তৈরী হয়ে গিয়েছে- এটাকেও একসময় ল্যামার্কের তত্তের পক্ষে কাজে লাগানো হয়েছে, কেননা একই পরিবেশে থাকাকালীন অবস্থায় স্পেসিয়েশন ঘটছে না- ঘটছে তখনই যখন পরিবেশ পাল্টাচ্ছে।

এমন আরো কিছু বিষয়ে ল্যামার্কিস্টরা তাদের পক্ষে ন্যাচারাল সিলেকশনকে যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করতেন। উনিশ শতকের প্রথম দিকে তাই ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশন তত্তে আস্থাশীল বায়োলজিস্টদের বড় অংশই ল্যামার্কিস্ট ছিল, ফলে দেখা যায়- যখন Weismann, Hugo De Vries, Thomas Hunt Morgan জেনেটিক্স নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে গিয়ে ল্যামার্কের তত্তের ভুলগুলো দেখতে পারছিলেন- তারা ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশনেরও বিপরীতে অবস্থান নিতে থাকেন, এবং এক পর্যায়ে biological determinism এর পক্ষে অবস্থান নিতে থাকেন। আজকে আমরা জানি, এই biological determinism এর পক্ষে কোন প্রমান বিজ্ঞানীরা হাজির করতে পারেনি। Human Genome Project এ কাজ করছেন এমন এক বিজ্ঞানীর (Craig Venter, president of Celera Genomics) জবানিতেই শুনুন "We simply do not have enough genes for this idea of biological determinism to be right"।

আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।

অভিজিৎ এর ছবি

আমি মওদুদির তুলনা এনেছিলাম কিন্তু অভিজিতের "সেজন্যই মানুষ যতই চেষ্টা করুক কিংবা হাজার কসরত করুক তার পীঠের হাড্ডী পরিবর্তিত হয়ে পাখায় রূপান্তরিত হয়ে যায় না"- এই কমেন্ট দেখে। এ ধরণের যুক্তি আসলেই একজন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানলেখকের মুখে শোভা পায় কি-না, ভেবে দেখার আহবান জানাই।

আপনি যদি ল্যামার্কের সূত্রগুলোর অবৈজ্ঞানিকতার মূল বিষয়টা ধরতে পারতেন, তাহলে হয়ত আমার দেওয়া 'পীঠের হাড্ডী পরিবর্তিত হয়ে পাখায় রূপান্তরিত হয়ে' যাওয়ার উপমা যত সরলীকৃতই মনে হোক না কেন এটা আপনি মওদুদীর সাথে তুলনা করতেন না। বিবর্তন প্রক্রিয়াকে ব্যখ্যা করার জন্য ল্যামার্ক চারটি সূত্রের অবতারনা করেছিলেন -

প্রথম সূত্র : বিবর্তনে জীব যত জটিল হতে থাকে ততই ক্রমাগত তাদের আকার ও দেহের বিভিন্ন অংশের বৃদ্ধি পেতে থাকে।

২য় সূত্র : পরিবেশের 'দাবী' বা 'চাহিদা' মেটাতে, নতুন 'প্রয়োজনের' তাগিদ পুরণার্থে, জীবের মধ্যে যে 'ইচ্ছা' বা 'অভিলাস' উৎপন্ন হয়, তার নাম 'জীবের বাসনা' । এ বাসনা পূরণ করতে কোন অঙ্গের ব্যবহার অধিকতর হলে তাতে নতুন লক্ষণা বা চারিত্র এবং কখনো কখনো নতুন অঙ্গের উৎপত্তি ঘটে। এভাবে ক্রমাগত ব্যবহার বা অব্যবহার থেকে অঙ্গের অবক্ষয় বা বিলুপ্তি ঘটে।

৩য় সূত্র : ব্যবহার ও অব্যবহার সূত্র (Law of use and disuse): যে সকল অঙ্গ ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত হয়ে নতুন লক্ষণার উৎপত্তি হয়, সেগুলো হয় রক্ষিত না হয় বিনষ্ট হয়ে যায়।

চতুর্থ সূত্র: অর্জিত লক্ষণার বংশানুসৃতি (Inheritance of acquired characters) জীবের জীবনকালে অর্জিত লক্ষণাগুলো সঞ্চয়ী (adaptive) বা যোগান্বয় (cumulative) ও বংশানুক্রমিকতা সম্পন্ন (heritable) হওয়াতে একটি প্রজাতি ধীরে ধীরে নতুন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয় ।

বিবর্তন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে ল্যামার্কের উপরের ধারনাগুলো যে ভুল ছিলো তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষতঃ ল্যামার্কের ২য় সূত্রটি দেখুন - পরিবেশের 'দাবী' বা 'চাহিদা' মেটাতে জীবের মধ্যে যে 'ইচ্ছা' বা 'অভিলাস' উৎপন্ন হয়, আর এ ইচ্ছা বা বাসনা পূরণ করতে কখনো কখনো নতুন অঙ্গের উৎপত্তি ঘটে - এই হচ্ছে মোদ্দাকথা। এখন, ধরুন আমার মধ্যে 'ইচ্ছা' বা 'অভিলাস' উৎপন্ন হল - 'আমি উড়ব' - তাহলেই কি আমার 'এ বাসনা পূরণ করতে' গিয়ে আমার পিঠে পাখা গজিয়ে যাবে? - এই ছিলো আমার মূল বক্তব্য। নিঃসন্দেহে বোঝা যায় ল্যামার্কিজম ভুল। এটা বিবর্তন শুধু নয়, কোন পদ্ধতিকেই আসলে ব্যাখ্যা করতে পারে না। সেজন্যই ডারউইন নিজেও বলেছেন, "ঈশ্বর আমাদের ল্যামার্কের কান্ডজ্ঞান থেকে রক্ষা করুন" (১৮৪৪) , এবং - "দু দুবার পাঠ করেও মনে হল পুস্তকটি বাজে এবং এ থেকে আমি কিছুই শিখতে পারলাম না (১৮৬৩, চার্লস লায়েলকে লেখা পত্র)। মওদুদী যদি কাউকে বলতে হয় তো ল্যামার্ক এবং তার আদর্শের রূপকার লাইসেঙ্কোকে বলুন - আমাকে নয়।

বিজ্ঞানের একটি বিষয়ের উপর বিতর্ক করতে এসে মওদুদী, জাকির নায়েক - এ সমস্ত বিশেষণ বোধ হয় আমার প্রতি না ব্যবহার করাই ভাল। এতে করে নিজেকেই বোকা প্রমাণিত হতে হবে। এ শুধু আমি নয়, আরো বহু পাঠকই তা মনে করছেন - এটা বোধ হয় এখন বুঝতে পারছেন।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

জনাব অভিজিৎ,

আপনি যদি ল্যামার্কের সূত্রগুলোর অবৈজ্ঞানিকতার মূল বিষয়টা ধরতে পারতেন, তাহলে হয়ত আমার দেওয়া 'পীঠের হাড্ডী পরিবর্তিত হয়ে পাখায় রূপান্তরিত হয়ে' যাওয়ার উপমা যত সরলীকৃতই মনে হোক না কেন এটা আপনি মওদুদীর সাথে তুলনা করতেন না।

হুম, স্বীকার করছি আপনার মত করে ল্যামার্কের সূত্রগুলোর অবৈজ্ঞানিকতা(!) ধরতে পারিনি।

আপনার মন্তব্যটি দেখে কিছুটা বিরক্তিই লাগছে, এক কথা বারবার কতই বলা যায়?
যাহোক- দেখি আরেকবার বলে আপনাকে বুঝাতে পারি কি না!

যখন তুলনা বা উপমা (পজিটিভ অথবা নেগেটিভ অর্থে) দেয়া হয় কোন একটি ধরণ বা বৈশিষ্ট থেকে- তখন আপত্তি থাকলে সেই বৈশিষ্টের ব্যাপারেই আপত্তি করা উচিৎ। বুঝতে পারছি, মওদুদির ব্যাপারে আপনার যথেস্টই এলার্জি আছে- আমাদের সকলেরই এই এলার্জি আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক- কিন্তু এখানে মওদুদির প্রসঙ্গ কোন জায়গা থেকে এনেছি সেটা আগে দেখা দরকার ছিল বলেই মনে হয়।

মওদুদি যখন ডারউইনিজমের সমালোচনায় বলেন- আজকের বানর কেন মানুষ হয় না, তখন সহজেই বুঝা যায় এই লোক ডারউইনিজম না বুঝেই ভাসা ভাসা ধারণা থেকে যুক্তি করছেন। এই ভাসা ভাসা ধারণাটাও তৈরী হয়েছে, নিজের জানা-বোঝা তথা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থেকে- মানে ডারউইন যেটা বলতে চেয়েছিলেন সেটা না ধরেই বা না ধরতে পেরেই নিজের মত করে ডারউইনকে বুঝে সমালোচনা করার জায়গা থেকেই তার সেই যুক্তি! সেটা শুধু মওদুদিই করেছে তা নয়- আগেই বলেছি এটা আরও অনেকেরই কাজ। অর্থাৎ যখন বলেছি- মওদুদির কথা মনে পড়ে যায়, তখন আসলে এটাই তুলে ধরতে চেয়েছি- মওদুদি তথা ঐ ধরণের যুক্তি করা লোকেদের মত আপনিও যাকে খণ্ডন করতে যাচ্ছেন- তাকে বা তার বক্তব্যকে পুরো না বুঝেই নিজের চিন্তার বলয় থেকেই খণ্ডন করছেন, ফলে আপনার যুক্তিগুলোও একইরকম হয়ে যাচ্ছে।

আসলে, যুক্তি-তর্কে সবসময়ই কিছু বিষয় খেয়াল রাখা দরকার- সেটা হলো আমি যাকে খণ্ডাতে যাচ্ছি, তার বক্তব্য তার মত করে বুঝে দ্বিমতের জায়গাগুলোকে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে হয়। তা নাহলে "এই মোষ মানুষ খায়" এক মাংস বিক্রেতার এই বিজ্ঞাপন দেখে মানুষ খেকো মোষের আমদানীর অভিযোগে সেই মাংস বিক্রেতাকে একচোট নেয়ার মত গাধামিও অনেকে করতে পারে!

আপনি ল্যামার্কের ২য় সূত্রটি দেখিয়ে জানালেন যে, এই ২য় সূত্রকে খণ্ডন করতে আপনার পিঠের হাড্ডি-পাখা যুক্তি খুব যথার্থ হয়েছে। এবং এটা দেখে মনে হলো আসলে আপনি ল্যামার্কের আলোচনা ধরতেই পারেন নি, পূর্ব থেকে নির্ধারণ করে রেখেছেন ল্যামার্ক ভুল- ল্যামার্কের তত্ত অবৈজ্ঞানিক; আর সেখান থেকেই আপনার যুক্তি তুলে ধরছেন। ল্যামার্ক যে "জীবের বাসনা"র কথা বলছেন- সেই বাসনা বলতে তিনি ইচ্ছা বুঝাতে চাননি মোটেও। ড ম আখতারুজ্জামানের বইটিতেও আছে- যে শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে "বাসনা", সেটির আসল অনুবাদ হবে need. ল্যামার্ক তার ব্যাখ্যায় জানাচ্ছেন- পরিবেশের বিশেষ পরিবর্তনের কারণে জীবের মধ্যে কোন অঙ্গ ব্যবহারের বা অব্যবহারের দরকার হয়ে পড়ে- সেখান থেকে উদ্ভূত হয় এক ধরণের চাহিদার বা আর্জের। এই আর্জ বা চাহিদাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিবর্তন ঘটিয়ে ফেলে। এই বিবর্তন হয় অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং সেই জীবের অগোচরে-অজ্ঞাতে। অবশ্যই পুরো ধারণাটিই আজ ভুল বলে প্রমানিত। কিন্তু কেউ যদি ল্যামার্ককে ভুল প্রমানিত করতে চান- তবে ল্যামার্ক প্রকৃত কি কি দাবি করেছেন- সেগুলোর ভুল দেখানোটাই উচিৎ। যা বলেন নি বা দাবি করেননি, সেগুলোকে ভুল প্রমান করাকেই মনে হয় বোকামি বলে। ফলে ল্যামার্কের "জীবের বাসনা" মানে আজকে আপনার আমার সাধারণ ইচ্ছা-অনিচ্ছা ধরে নিয়ে তার পরে সেটাকে ইচ্ছামত সমালোচনা করাটা কোন কাজের কথা নয়।

আমাকে অনেকবারই অনেক বই পড়ার মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন (মাথা পেতে নিয়েছি- কেননা পড়ার বিকল্প আসলে কিছুই নেই), এখন আমি বিনয়ের সাথে আপনাকে একটি পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করছিঃ দয়া করে যা পড়বেন একটু বুঝে শুনে পড়বেন, মানে বুঝার চেষ্টা করবেন।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়- বিজ্ঞানে ভুল-ভ্রান্তির অবস্থান কি? কোন বিজ্ঞানী যে কোন ভুল পরীক্ষণ করলেই, ভুল সিদ্ধান্ত জানালেই কি তার প্রতি বিরূপ হতে হবে? বিজ্ঞানের ধারাবাহিক বিকাশকে কি অস্বীকার করবো? আজকের বিজ্ঞানে পূর্বের কোন তত্ত - আবিষ্কার ভুল প্রমানিত হলে- আগের সেই বিজ্ঞানকে অপবিজ্ঞান বলবো? আপনার আলোচনায় দেখিঃ

"মওদুদী যদি কাউকে বলতে হয় তো ল্যামার্ক এবং তার আদর্শের রূপকার লাইসেঙ্কোকে বলুন - আমাকে নয়।"

খুব অবাক হলাম, এই যদি বিজ্ঞানমনস্কতা হয়, তাহলে তো বলতে হয়- ল্যামার্কের মত সমস্ত বিজ্ঞানী যাদের গবেষণা, সিদ্ধান্ত এক পর্যায়ে ভুল প্রমানিত হয়েছে সকলকে মওদুদি বলতে হয়! এরকম কাঠগড়ায় ল্যামার্ক থেকে শুরু করে নিউটন-পাস্তুর-ডারউইন এমন আরো কতজনকে দাঁড় হতে হয় সেটাই ভাবছি!!
যতই ভাবছি- ততই বোকাই বনে যাচ্ছি।
থাক, কাজ নেই আপনাদের মত চালাক হয়ে------

অভিজিৎ এর ছবি

খুব অবাক হলাম, এই যদি বিজ্ঞানমনস্কতা হয়, তাহলে তো বলতে হয়- ল্যামার্কের মত সমস্ত বিজ্ঞানী যাদের গবেষণা, সিদ্ধান্ত এক পর্যায়ে ভুল প্রমানিত হয়েছে সকলকে মওদুদি বলতে হয়! এরকম কাঠগড়ায় ল্যামার্ক থেকে শুরু করে নিউটন-পাস্তুর-ডারউইন এমন আরো কতজনকে দাঁড় হতে হয় সেটাই ভাবছি!!

আপনি আসলে কথা ঘুরাচ্ছেন। ল্যামার্কবাদ যে ভুল আর লাইসেঙ্কুজম যে রদ্দিমাল তা স্বীকার করে নিয়েছেন, অথচ সে কথা আমি আমার মূল প্রবন্ধে একটা সরল এনালজির মাধ্যমে হাজির করায় আমাকে 'মওদুদী' বলে বসলেন। শুধু তাই নয়, আমি যখন বললাম - ভাই আমার সাথে বিতর্ক করতে এসে এধরনের বিশেষণ প্রয়োগ না করাই ভাল - তখন আবার মন্তব্যের শেষে 'জাকির' নায়েক জুড়ে দিলেন। বিশেষণ প্রয়োগ ছাড়া মনে হচ্ছে আপনি কিছু লিখতেই পারেন না। শুধু আমি না, ব্লগের অনেকেই যখন এ ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছেন - তখন আপনি একবারের জন্যও বলেলন না যে, এ ধরনের বিশেষণ প্রয়োগ ঠিক হয় নি, বরং কেন মওদুদী বলেছেন - তা নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে দীর্ঘ কাব্য রচনা করতে শুরু করেছেন। এই না হলে মার্ক্সিস্ট!

যতই ভাবছি- ততই বোকাই বনে যাচ্ছি।
থাক, কাজ নেই আপনাদের মত চালাক হয়ে------

না না - কি যে বলেন - চালাক তো আপনারা, আর আপনাদের মতের সাথে কারো না মিলিলেই সে হইয়া যায় ছাগল, জাকির নায়েক নয়ত মওদুদী! জয় হোক আপনাদের।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

ইমরান হাবিব রুমন    এর ছবি

ব্যস্ততার জন্য অনেক দেরীতে লিখতে বসলাম। ভালো লাগলো এ বিষয় নিয়ে বেশ কিছু প্রণবন্ত বিতর্কে। আমরা সত্যানুসন্ধানী বলেই যে কোন বিষয় বস্তুকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে চাই। তাই অভিজ্ঞ এবং বয়ঃজেষ্ঠ লেখকদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে চাই। আমার প্রথম লেখা ছিল এটি। অভিজিত সাহেবের লেখা পড়ে অনেক সমৃদ্ধ হলাম। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমন না করে যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে খুব ভালো করতেন। আমরা যারা একেবারেই নবীন তারা তো আপনাদের কাছেই শিখতে চাই। বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার দূর্গতি কেন- তা নিয়ে অস্বচ্ছতা থাকলে পরে আলোচনা করা যাবে। আমরা আমাদের ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে একেবারে স্কুল পর্যায় থেকে বিজ্ঞান ক্লাব, বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান আলোচনা সহ বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করছি। এসব ক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা আমাদের আরও সমৃদ্ধ করবে বলেই প্রত্যাশা করি। যাহোক ইউরোপ-আমেরিকায় বসেও যারা এভাবে দেশের কথা ভাবে তাদেরকে শ্রদ্ধা করতেই হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ একদিন একাকী বসে ছিলেন। একলোক এসে তাকে অনেকক্ষণ ধরেই গালিগালাজ করলেন। স্বামী বিবেকানন্দ চুপ করে সবকিছুই শুনলেন। লোকটা থামলে তিনি প্রশ্ন করলেন, মনে করো কেও যদি তোমাকে একটা জামা দেয়, তোমার পছন্দ না হলে তুমি কি করবে? লোকটা উত্তর দিল- ফিরিয়ে দিতাম। স্বামী বিবেকানন্দ হেসে বললেন- তোমার এতক্ষনের কথাগুলোও আমার পছন্দ হয়নি, তাই ফিরিয়ে দিলাম।
অভিজিত সাহেব যে যুক্তি করেছেন তা ভুল বা ঠিক যাই হোক না কেন তা নিয়ে আলোচনার আকাক্ষা ব্যক্ত করে বাকী গুলো আমার জন্য অপ্রয়োজনীয় বিধায় ফিরিয়ে নেয়ার অনুরোধ করলাম।
জনাব অভিজিত প্রথমেই না বুঝে যে বিষয় নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন তা কিন্তু অনেক পাঠকই ধরতে পেরেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আঁটি ভেঙ্গে শাস বের করে মুখের সামনে ধরতে হয়, তা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম বলে ক্ষমা প্রার্থী। অভিজিত রায় তার লেখায় আমার লেখা সম্পর্কে বলেছেন- " তিনি বলেছেন, 'বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের জন্য' নাকি লাইসেঙ্কো খুবই জরুরী! তার মতে মেন্ডেলের বংশগতি তত্ত্ব নাকি ছিল 'ভাববাদী', আর এই ভাববাদী চেতনার মুলে কুঠারাঘাত করেছিলেন লাইসেঙ্কো! তাই নাকি? "
অথচ আমার লেখায় ছিল- " বিশ্বের কোন ঘটনায় কার্যকারণ সম্পর্ক বহির্ভূত নয়। কিন্তু মেনডেল ও তাঁর অনুগামী বিজ্ঞানীরা 'জীন' এর পরিবর্তনকে পরিবেশ নিরপেক্ষ ও কার্যকারণবিহীন 'আকস্মিক' ঘটনা বলে চিহ্নিত করেছেন। কোন বিশেষ যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্য যদি কেও কোন ঘটনাকে কার্যকারণবিহীন 'আকস্মিক' বলে মনে করেন তাহলে এটা বুঝতে অসুবিধা হয়না যে তিনি (মেনডেল এবং তাঁর অনুগামী মরগ্যান, ভাইসম্যান প্রমুখ বিজ্ঞানীরা) এক্ষেত্রে ভাববাদী চিন্তার দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন।"
'এক্ষেত্রে ' শব্দটা কেন কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং কি বুঝানো হয়েছে তা খুব সহজেই অনুমেয়। এর মাধ্যমে মেনডেলের বংশগতি তত্ত্ব ভাববাদী বা মেনডেল ভাববাদী তা কখনওই বুঝায় না। আবার ২/১ টা ঘটনার মাধ্যমে কোন বিজ্ঞানীকে বিশ্লেষণ বা তাঁর সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত প্রদানও বিজ্ঞান বিরোধী। যেমন অভিজিত রায় এবং দিনমজুর (দিনমজুরের পুরো লেখাটা ভালোভাবে পড়া হয়নি, মন্তব্য ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী) সাহেব বলে ফেললেন- "ল্যামার্কের তত্ত্ব আজ ভুল বলে প্রমানিত। লাইসেঙ্কোইজমকে বিজ্ঞানের কোন ধারা বলেই মানিনা।"
ল্যামার্ক সম্পর্কে বন্যা আহমেদ তার 'বিবর্তনের পথ ধরে' বইয়ে খুব অল্প কথায় বেশ গুছিয়ে বলেছেন, " জীববিজ্ঞানে ল্যামার্ক তাঁর অবদানের জন্য যতখানি পরিচিত, তার চেয়ে ঢের বেশী পরিচিত বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে তাঁর ভুল মতবাদের কারণে। ল্যামার্ক সঠিকভাবেই সিদ্ধান্তে আসেন যে, প্রজাতি সুস্থির নয়, এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির বিবর্তন ঘটে, তবে তিনি যে পদ্ধতিতে এই পরিবর্তন ঘটে বলে ব্যাখ্যা দেন তা পরবর্তীতে সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমানিত হয়। কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, লামার্কই হচ্ছেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি প্রজাতির স্থিরতাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে চ্যালেঞ্জ করে বিবর্তনের চালিকাশক্তি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে একটি যুক্তিযুক্ত উত্তর খুজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। "
লাইসেংকোর বিষয়ে বলার আগে মেনডেলের বিষয়টা পরিস্কার করা দরকার।
" বস্তুজগতে কোন দুটি কনা হুবাহু এক নয়। আবার সময়ের সাথে সাথে বিশেষ বস্তুটিও পরিবর্তিত হয়। প্রতিটি বস্তুর একটা থেকে আরেকটার কিছু না কিছু পার্থক্য থাকবেই। জীবজগতেও একই ঘটনা বর্তমান। একই প্রজাতির (species)দুইটি উদ্ভিদ বা প্রাণী এক নয়। সুক্ষাতীসুক্ষ হাজার একটা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দিয়ে এই পার্থক্য ধরা পড়ে। এই পার্থক্যকে বিজ্ঞনীরা variation বা পরিবৃত্তি বলে থাকেন। বৈশিষ্ট্যের এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একই প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ বা প্রাণীর মধ্যে basic structure এ একটা সমতা বা মিল দেখতে পাওয়া যায়। আবার বিভিন্ন প্রজাতিগুলোর মধ্যে ধরলে দেখা যাবে যে এক প্রজাতির উদ্ভিদ বা প্রাণীর যেমন অনেক ক্ষেত্রে তফাৎও রয়েছে তেমনি তাদের মধ্যে কতকগুলো মূল বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে সাদৃশ্যও বর্তমান। এগুলোকে ভিত্তি করেই variety, species, genus, family প্রভৃতি পর্যায়ের ধারণাগুলো গড়ে উঠেছে। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সমগ্র জীবজগতে হাজার হাজার বছর ধরে বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে একটা স্তর থেকে আরেকটা স্তর সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন উদ্ভিদ আর প্রাণীর মধ্যে বংশপরম্পরায় নানা পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এই পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্যগুলোর ক্রমাগত পরিমানগত (quantitative) পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে এক সময়ে এসে ঘটিয়েছে গুণগত (qualitative)পরিবর্তন এবং এই গুনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য সূচিত হয়েছে। এরই মধ্যে দিয়ে উত্তরন সম্ভব হয়েছে নতুন এক স্তরের। কিন্তু বিভিন্ন প্রশ্ন মানুষকে ভাবিয়েছে- জীবজগতে কেন এত বৈচিত্র, কেন এক বিশেষ প্রজাতি অন্য এক প্রজাতি থেকে ভিন্নতর, কিভাবে বিশেষ এক প্রজাতি তার বেশিষ্ট্যকে ধারাবাহিকভাবে রক্ষা করে চলছে, কিভাবে পিতা মাতা থেকে সন্তান-সন্ততির মধ্যে বিশিষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সম্ভব হয় এবং কোন নিয়মের দ্বারা পরিচালিত হয় বিবর্তনের ধারাবাহিকতা। এই প্রশ্নগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিজ্ঞানের যে শাখা এই প্রশ্নগুলো সমাধান কারায় সচেষ্ট বিজ্ঞানীরা তাকে genrtics নামে অভিহিত করেছেন। এবিষয়ে যুক্তিগ্রাহ্য ধারণার অধিকারি হবার প্রচেষ্টা মানুষের বহুদিনের হলেও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখিত প্রশ্নগুলোকে বিচার করার সর্বপ্রথম প্রচেষ্টা দেখা দেয় অষ্টদশ শতাব্দীর শেষভাগে বা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে। বিজ্ঞানী মেনডেল ছিলেন এ বিষয়ে প্রতিকৃৎ। পূর্ববর্তী যে ধারণা অথ্যাৎ বংশাণুক্রম (heredity) ব্যাপারটি ব্যাপারটি অতিপ্রাকৃত অজ্ঞাত নিয়মোর্দ্ধ কোন সত্ত্বা কতৃক নিয়ন্ত্রিত সেই ধারণাকে ভেঙ্গে মেনডেল ও তাঁর অনুগামী বিজ্ঞানীরা (মরগ্যান, ভাইসম্যান) বংশাণুক্রম সম্পর্কে তাদের অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন যে, জীবদেহে বিভিন্ন বিশিষ্ট্যতা প্রকাশের পিছনে কোনও নিয়ামকের (factor) সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। এই নিয়ামককে তারা বংশাণুক্রম জীবজববস্তুসত্ত্বা বা 'জীন' বলে অবিহিত করেন। প্রসঙ্গত আধুনিক বিজ্ঞান 'জীন' এর বস্তুগত চরিত্র নির্নয়ে সক্ষম হবার পর এর ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মগুলো সম্পর্কে যে ধারণা দিতে পেরেছে , মেনডেলদের 'জীন' এর ধারণা সে তুলনায় অনেক স্থুল ছিল।
মেনডেল, ভাইসম্যান, মরগ্যান বিজ্ঞানীদের মতে যৌন জননের (sexual reproduction) মাধ্যমে 'জীন' পূর্বপুরুষ থেকে সন্তান-সন্ততির মাধ্যে জৈবিক বিশিষ্টতা বহন করে নিয়ে যায় এবং জীবজগতের শুরু থেকেই এইভাবে জৈবিক বিশিষ্টতা বংশপরম্পরায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। পরিবেশের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ফলে সময়ে সময়ে জীবদেহে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কিছু কিছু পরিবৃত্তি (variation) দেখা যায়। তাদের অভিমত হলো এই পরিবর্তনগুলো 'জীন' এর উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনা এবং এই ধরনের পরিবর্তনকে তাঁরা দেহগত পরিবর্তন (phenotype) বলে অভিহিত করেন। এর থেকে তাঁরা সিদ্ধান্ত করলেন যে, বংশাণুক্রমিকতার ধারক ও বাহক (factor of hereditary transmission) যে 'জীন' তার সঙ্গেজীবদেহে পরিলক্ষিত ওই পরিবৃত্তির (variation) কোন সম্পর্ক নেই। অতএব ঐ পরিবর্তনগুলো বংশাণুক্রমিক নয়। তাঁরা অবশ্য এ কথাও বললেন যে যদি কোন কারণে 'জীন' এর গঠন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এমন কোন পরিবর্তন (mutation) সম্ভব হয় যেটা জীবদেহের প্রকাশিত কোন পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাহলে দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সেই পরিবর্তনটি হবে বংশাণুক্রমিক। কিন্তু জীনের এই পরিবর্তন ঘটে আকস্মিকভাবে (accidental)। হাজার বছরে এরুপ আকস্মিক ঘটনা নাও ঘটতে পারে।
যদিও সেযুগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবার উপায়দির সীমাবদ্ধতার দরুন অনেক কিছুই বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা হাতে কলমে প্রমান করা সম্ভব হয়নি, তবুও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য যুক্তি থেকে যে সঠিক বস্তুনিষ্ট এবং যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে আসা যায় তাঁদের চিন্তার ক্ষেত্রে তার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তাঁরা বলেছেন 'জীন' জীবদেহে জৈবিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশের নিয়ামক এবং জীনের মধ্যে কোনও অবধারনীয় পরিবর্তন ঘটলে তা জীবদেহে জৈবিক বৈশিষ্ট্যে প্রকাশিত হবে। কিন্তু 'জীন' এর এই পরিবর্তনের কোন বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা তাঁরা দিতে পারেননি। বরং 'জীন' এর এই পরিবর্তনটি তাঁদের কাছে অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্য (empirical fact) হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে এবং এই পরিবর্তনকে তাঁরা পরিবেশ নিরপেক্ষ এবং কার্যকারণ সম্পর্কবিহীন 'আকস্মিক' ঘটনা বলে চিহ্নিত করেছেন।
এক্ষেত্রে তাঁরা খেয়াল করলেন না যে বিশ্বের কোন ঘটনায় কার্যকারণ সম্পর্ক বহির্ভূত নয়।
এক্ষেত্রেই তাঁরা চিন্তার ক্ষেত্রে ভাববাদী চিন্তা চেতনার শিকার হয়ে পড়লেন..........।
চলবে...........................

অভিজিৎ এর ছবি

ধন্যবাদ মন্তব্য করার জন্য। আমি আগেই মোশারফ সাহেবকে উত্তর দিতে গিয়ে বলেছি - আপনার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোন বিরোধ নেই। আমি আপনার একাডেমিক লাইনে সাথে যে বিষয়গুলোতে দ্বিমত করেছি, সেগুলো আমি মনে করি একাডেমিয়ার দৃষ্টিকোন থেকেই সুস্থ মতান্তর। ল্যামার্কিজম এনং লাইসেঙ্কোইজমের পরিবেশ নির্ণয়বাদ কোথায় ভুল করেছিলো , কেন এখন এই ধারনাগুলো বিজ্ঞানের জগতে পরিত্যক্ত- সেটা ঠিকমত জানানোই ছিলো আমার লেখার উদ্দেশ্য। ওইটুকু বাদ দিলে আপনার সাথে আমার তেমন কোন বিরোধ নেই। আপনার লেখা সত্যই প্রাঞ্জল এবং চিন্তার উদ্রেগকারী।

আপনি যদি 'বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক' বলে ওভাবে না লিখতেন, তাহলে আমিও এত বড় প্রবন্ধ ওভাবে লিখতাম না। যা হোক, আপনার বক্তব্য পড়ছি। এ নিয়ে আমি শিগগিরই উত্তর দিব। কিছু পয়েন্টের উত্তর আগেই দিয়েছি যদিও। তারপরও আবার আলোচনা হতেই পারে। সুস্থ আলোচনা সত্যই হৃদয়গ্রাহী। আপনি এখানে লিখবার পাশাপাশি মুক্তমনাতেও লিখুন।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

এবং দিনমজুর (দিনমজুরের পুরো লেখাটা ভালোভাবে পড়া হয়নি, মন্তব্য ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী) সাহেব বলে ফেললেন- "ল্যামার্কের তত্ত্ব আজ ভুল বলে প্রমানিত। লাইসেঙ্কোইজমকে বিজ্ঞানের কোন ধারা বলেই মানিনা।"

======প্রকৃতিবিদ ল্যামার্কই প্রথম জানান যে, প্রজাতি সুস্থির নয়- এই অবদানের জন্যই তিনি বেচে থাকবেন। তিনি এতেই ক্ষান্ত থাকেন নি- প্রজাতির বিবর্তনের কারণও অনুসন্ধান করেছিলেন। এবং তার তত্ত নিয়ে হাজির হন। তার তত্তের মূল কথা ছিল পরিবেশের প্রভাবে জীবের ব্যক্তি পর্যায়ে অর্জিত বৈশিষ্ট সমূহ বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়। তিনি ভাবতেন জীবের অনেক প্রজন্ম ধরে ব্যবহার-অব্যবহারের ফলে বংশ পরম্পরার বৈশিষ্ট বিবর্তিত হতে পারে- অর্থাৎ ব্যবহারের ফলে কোন অঙ্গ বিকশিত হতে পারে- তেমনি দীর্ঘ অব্যবহারের ফলে বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে। তিনি মনে করতেন, বংশ পরম্পরার বৈশিষ্ট সমূহ পরবর্তী প্রজন্মে মিশ্রিত হয়েও প্রজাতির বৈচিত্র তৈরি হয়েছে। ১৭৭৮ সালে প্রথম গ্রন্থ থেকে শুরু করে ১৮ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত তার গবেষণা তথা পর্যবেক্ষনকে বৈপ্লবিক না বলে উপায় নেই।
এখানে বুঝতে হবে, ল্যামার্ক বা ডারউইনের বিজ্ঞান কিন্তু পরীক্ষণ নির্ভর বিজ্ঞান নয়। প্রকৃতির অসংখ্য ঘটনা থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সেখান থেকে সিদ্ধান্তে আসা। সেখান থেকে প্রাচীণকে পড়া, মানে এক ধরণের ইতিহাস ভিত্তিক বিজ্ঞান। বিভিন্ন যুগের ফসিল, বিভিন্ন পরিবেশের উদ্ভিদ-প্রাণীর বৈশিষ্টের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য এসবই তাদের কাচামাল। ফলে সেখান থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছা সহজ নয়। আজ বিজ্ঞান জানাচ্ছে যে, একটাও ফসিল না পাওয়া গেলেও শুধু জেনেটিক কোড পড়েই বিবর্তনবাদ প্রমান করা সম্ভব- অথচ জিন সম্পর্কে কোনরূপ ধারণা ছাড়াই বিবর্তনের ধারণায় পৌছা কিন্তু প্রায় অসম্ভবই বলতে হবে। ডারউইনের সামনে লায়েল ছিল, হটন ছিল, ল্যামার্ক ছিল- কিন্তু ল্যামার্কের সামনে কিন্তু এরা কেউ ছিল না , উপরন্তু সময়কালটা ছিল ডারউইনের আবিষ্কারেরও আরো প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগের। ফলে, ল্যামার্কের ভুল হওয়াটা দোষের নয়। তারপরেও বলতে হবে, প্রজাতির বিবর্তনের বিষয়টি তিনি সঠিক ভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। এবং এটাই তো বিজ্ঞান। বিজ্ঞান তো এভাবেই এগিয়ে যায়, এই ধারাবাহিকতা না থাকলে তো বিজ্ঞান তো স্থবির হয়ে পড়তো।
হ্যা, ল্যামার্কের বিবর্তনের ধারণাটি সঠিক হলেও বিবর্তন কিভাবে ঘটে এ বিষয়ে তার তত্ত আজকের বিজ্ঞানে ভুল হিসাবেই গণ্য। কিন্তু ল্যামার্কের তত্ত্বের গুরুত্বকে কিন্তু অস্বীকার করার জো নেই। পরিবেশের প্রভাবকে তিনিই প্রথম অবলোকন করেন, জীবের বৈশিষ্টগুলো পরিবেশের সাথে কেমন খাপ খেয়ে যাচ্ছে এটি তিনিই প্রথম সফলভাবে ধরেন।

উল্টোদিকে, লাইসেঙ্কো সম্পর্কে এটুকু বলতে পারি, তিনিও একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। উনিশ শতকের বায়োলজিস্টরা যে দুভাগে বিভক্ত ছিলেন- তাদের মধ্য লাইসেঙ্কো ল্যামার্কিস্ট ঘরানার ছিলেন। এবং অনেক ল্যামার্কিস্টদের মত পরিবেশ নির্ণয়বাদকে আকড়ে ধরতে গিয়ে জেনেটিক্সকে পুরো অস্বীকার করে বসেন। আরেক মার্ক্সবাদী জিন-বিজ্ঞানী ১৯৪০ সালের এক প্রবন্ধে লিখছেন- লাইসেঙ্কোর ১০ দাবির মধ্যে ৯টিই ভুল, এমনকি লাইসেঙ্কো ষাটের দশকে নিজের বিভিন্ন দাবির ভুল-ভ্রান্তিও স্বীকার করে গিয়েছেন, ফলে লাইসেঙ্কো বিভিন্ন পরীক্ষণের মধ্য দিয়ে যেসব সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছেন- সেগুলোর অধিকাংশই যে ভুল তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এটাতে আমার কোন আপত্তি নেই। অনেক বিজ্ঞানীর অসংখ্য গবেষণা, অসংখ্য দাবি/সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে ভুল হিসাবে প্রমানিত হয়েছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে, লাইসেঙ্কো সম্পর্কে অভিযোগ আছে- তিনি পরীক্ষণে কিছু কারচুপির দারস্থ হয়েছিলেন (নেগেটিভ রেজাল্ট আড়াল করে শুধু পজিটিভ রেজাল্টকে সামনে আনা, যে স্কেলে পরীক্ষণ করার পরে সিদ্ধান্তে আসা যায়- তারচেয়েও অনেক ছোট স্কেলেই পরীক্ষণ করেই সিদ্ধান্ত জানান দেয়া ইত্যাদি)। এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে বলতেই হয় তিনি বিজ্ঞানের এথিকস ভঙ্গ করেছিলেন।
আর লাইসেঙ্কোইজম নামে বিজ্ঞানের কোন ধারার কথা আমি আসলেই জানি না। মিচুরিন ও লাইসেঙ্কো উভয়েই ছিলেন ল্যামার্কিজমের অনুসারী। ল্যামার্কিস্ট হিসাবে এই দুই বিজ্ঞানী বেশ কিছু পরীক্ষণ করেছিলেন, বিশেষ করে কৃষি ক্ষেত্রে তারা বেশ কিছু পরিক্ষা নীরিক্ষা চালিয়েছিলেন। তাদের সেরকম বিশেষ কোন তত্তের ব্যাপারে জানা নেই, সেকারণেই বলেছি লাইসেঙ্কোইজমকে বিজ্ঞানের কোন ধারা হিসাবে মনে করিনা।

এখন আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার মনে করছি- তা হলো স্ট্যালিন কর্তৃক লাইসেঙ্কোকে প্রমোট করার বিষয়টি। আগেই জানিয়েছি- অভিজিৎ কর্তৃক বিজ্ঞানকে মার্ক্সবাদ কর্তৃক শুদ্ধ হওয়ার দাবী বা গল্প ফাদাকে অজ্ঞতা প্রসুত মনে হয়েছে। আগেই দেখিয়েছি- ১৯৪০ সাল পর্যন্ত জিনবিজ্ঞানী ভাভিলভের জিন ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ছিলেন, লেনিন পদক জিতেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানেই ছিলেন। ১৯৪০ সালের আগে তার বা অন্য মেনডেলিস্ট ঘরানার বিজ্ঞানীদের কাজে বাধা তৈরী করা হয়নি। ফলে, মার্ক্সবাদ দিয়ে বিজ্ঞানকে পরিশুদ্ধ হওয়ার কথা গালগল্প ছাড়া কিছুই নয়।
এখন কথা হলো- লাইসেঙ্কো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো? সেখানেও কিছু বিষয় বলা দরকার। ৩০-৪০ এর দশকটিতে সোভিয়েত ইউনিয়নে যুদ্ধাবস্থা ও দুর্ভিক্ষাবস্থা চলছিল, ফলে সেখানে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা প্রচণ্ডভাবে অনুভূত হচ্ছিল। এখন জিনবিজ্ঞানীদের প্রক্রিয়ানুযায়ী ভালো বীজ বাছাই ও সেখান থেকে বীজ তৈরী করে উৎপাদন বাড়ানোটা ছিল সময় সাপেক্ষ। সে তুলনায়, মিচুরিন-লাইসেঙ্কোর গ্রাফটিং, ভার্নালাইজেশন এসব প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বীজের বৈশিষ্ট পাল্টে দেয়ার দাবি অনুযায়ী কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। সোভিয়েত নেতাদের এরকম তাৎক্ষণিক দাওয়াই দরকার ছিল, ফলে লাইসেঙ্কো যখন জানাতে থাকে ভার্নালাইজেশন দিয়ে শীতেও বসন্তকালীন ফলন হবে----- ইত্যাদি, তখন এই বিজ্ঞানীর উপর স্বভাবতই নির্ভর করতে হয়েছিল।

এরপরের প্রশ্নটি আসে- ভাভিলভকে কেন আটক করা হলো- জেলে বসে তাকে কেন মরতে হলো? ভাভিলভের অনুসারীদেরও কেন অপদস্থ হতে হলো? সেখানেও জেনেটিক্সের প্রতি আক্রোশ বা বিজ্ঞানকে মার্ক্সবাদ দিয়ে পরিশুদ্ধ না হওয়ার অপরাধে ভাভিলভদের বিরুদ্ধে একশন নেয়া হয়েছে- এটা সঠিক নয়। ৩০ এর দশকটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে এক টালমাটাল সময়। বাইরের শত্রু, সোভিয়েতে কুলাকদের ষড়যন্ত্র এবং পার্টির অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র সবমিলিয়ে বলশেভিক পার্টিকে কঠিন সংগ্রামে পড়তে হয়। স্ট্যালিনকে বাধ্য হয়ে শুদ্ধি অভিযানে নামতে হয়। পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিরই একটা বড় অংশ ওপেন ট্রায়ালে দোষী সাব্যস্ত হয়। চারদিকে অনাস্থা-অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছিল সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাসীকে। এটা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক বাড়াবাড়িও হয়েছিল- অসংখ্য নিরপরাধ মানুষও সাজা পেয়েছিল। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে, এই শুদ্ধি অভিযান চালানো ছাড়া উপায়ও ছিল না। সম্ভবত সেই শুদ্ধি অভিযানের শেষের দিকের বলি ভাভিলভ । হতে পারে- তিনি নির্দোষ। এবং এটাও ঠিক যে, জেনেটিক্স চর্চায় ৪০ এর পর থেকে রাশিয়া অনেক পিছিয়ে পড়ে। এতদসত্তেও এটা বলতেই হবে যে, ঐ সময়ে সে শুদ্ধি অভিযান না চালালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার বাহিনীর কাছে টিকতে পারতো না, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের মত ভেঙ্গে পড়তো।

দিনমজুর এর ছবি

আমরা যদি এ দু বিষয়ে এককমত হই, তাহলে প্রত্যাশা করি আমাদের মধ্যে বিরোধ দূর করে হ্যান্ডশেক করাটা কঠিন কোন ব্যাপার হবে না। আপনার জবাবের প্রত্যাশায় রইলাম।

আমি এ প্রসঙ্গে ডঃ আখতারুজ্জামানের বইটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করি, যা পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে --
'...ডারউইনের প্রজাতির উৎপত্তি পড়ে মার্কস পরম উৎসাহের সাথে এ কথা তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে জানিয়ে লিখেছিলেন। মার্ক্স তার নিজের লেখা জগতবিখ্যাত পুস্তক 'ক্যাপিটাল' ডারউইনকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডারউইন তাতে কোন সাড়া দেননি। ... ডারউইন সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনবিদ্যাকে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন না। রুজের মতে, ডারউইনের "জীবনের জন্য সংগ্রাম"কে যারা "শ্রেনী সংগ্রামে"র সমার্থক মনে করতে চান, তারা যে ডারউইনের মতকে আদৌ বুজগতে পারেননি তা ডারউইন বিলক্ষণ জানতেন। বিবর্তন তত্ত্বে কোন কিছু ঘটবেই, ঘটতে বাধ্য, ঘটনার কোন অনিবার্যতা এবং অবশ্যম্ভাবিতা নেই, তা ডারুইনের চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে। প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার এবং বিবর্তন সম্পর্কে সুপরিচিত লেখক পিটার জে বাউলারও একই মত পোষণ করেন ( বিবর্তনবিদ্যা, পৃঃ ৩০৩ -৩০৪)

তারপরও আমি আসলে একটি জায়গায় সুচিন্তিত একটি পার্থক্য করব। আমি জৈব বিবর্তনকে সামাজিক বিবর্তনের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাই না। আমি ' বেঁচে থাকার জন্য জীবন সংগ্রাম' কে ডারউইনের মতই 'শ্রেনী সংগ্রামের' সমার্থক মনে করি না।

আমরা যদি এ দু বিষয়ে এককমত হই, তাহলে প্রত্যাশা করি আমাদের মধ্যে বিরোধ দূর করে হ্যান্ডশেক করাটা কঠিন কোন ব্যাপার হবে না। আপনার জবাবের প্রত্যাশায় রইলাম।

আমি এ প্রসঙ্গে ডঃ আখতারুজ্জামানের বইটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করি, যা পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে --
'...ডারউইনের প্রজাতির উৎপত্তি পড়ে মার্কস পরম উৎসাহের সাথে এ কথা তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে জানিয়ে লিখেছিলেন। মার্ক্স তার নিজের লেখা জগতবিখ্যাত পুস্তক 'ক্যাপিটাল' ডারউইনকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডারউইন তাতে কোন সাড়া দেননি। ... ডারউইন সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনবিদ্যাকে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন না। রুজের মতে, ডারউইনের "জীবনের জন্য সংগ্রাম"কে যারা "শ্রেনী সংগ্রামে"র সমার্থক মনে করতে চান, তারা যে ডারউইনের মতকে আদৌ বুজগতে পারেননি তা ডারউইন বিলক্ষণ জানতেন। বিবর্তন তত্ত্বে কোন কিছু ঘটবেই, ঘটতে বাধ্য, ঘটনার কোন অনিবার্যতা এবং অবশ্যম্ভাবিতা নেই, তা ডারুইনের চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে। প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার এবং বিবর্তন সম্পর্কে সুপরিচিত লেখক পিটার জে বাউলারও একই মত পোষণ করেন ( বিবর্তনবিদ্যা, পৃঃ ৩০৩ -৩০৪)

তারপরও আমি আসলে একটি জায়গায় সুচিন্তিত একটি পার্থক্য করব। আমি জৈব বিবর্তনকে সামাজিক বিবর্তনের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাই না। আমি ' বেঁচে থাকার জন্য জীবন সংগ্রাম' কে ডারউইনের মতই 'শ্রেনী সংগ্রামের' সমার্থক মনে করি না।
অভিজিৎ বলেছেনঃ

আমরা যদি এ দু বিষয়ে এককমত হই, তাহলে প্রত্যাশা করি আমাদের মধ্যে বিরোধ দূর করে হ্যান্ডশেক করাটা কঠিন কোন ব্যাপার হবে না। আপনার জবাবের প্রত্যাশায় রইলাম।

আপনার উল্লেখিত বিষয় দুটোতে আপনার সাথে কোন দ্বিমত পোষণ করিনা, প্রথম থেকে করিওনি। ফলে, সে বিষয় দুটোতে হ্যাণ্ডশেকে করতে আপত্তি থাকার প্রশ্নই উঠে না। তবে, আপনার সাথে আমার দ্বিমত বা ভিন্নতার জায়গাটি অন্যত্র (আমি হয়তো বুঝাতে পারিনি)। যেমন আপনার ৯।১ কমেন্টের দিকে যদি তাকাই, তবে দেখিঃ
আমি এ প্রসঙ্গে ডঃ আখতারুজ্জামানের বইটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করি, যা পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে --
'...ডারউইনের প্রজাতির উৎপত্তি পড়ে মার্কস পরম উৎসাহের সাথে এ কথা তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে জানিয়ে লিখেছিলেন। মার্ক্স তার নিজের লেখা জগতবিখ্যাত পুস্তক 'ক্যাপিটাল' ডারউইনকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডারউইন তাতে কোন সাড়া দেননি। ... ডারউইন সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনবিদ্যাকে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন না। রুজের মতে, ডারউইনের "জীবনের জন্য সংগ্রাম"কে যারা "শ্রেনী সংগ্রামে"র সমার্থক মনে করতে চান, তারা যে ডারউইনের মতকে আদৌ বুঝতে পারেননি তা ডারউইন বিলক্ষণ জানতেন। বিবর্তন তত্ত্বে কোন কিছু ঘটবেই, ঘটতে বাধ্য, ঘটনার কোন অনিবার্যতা এবং অবশ্যম্ভাবিতা নেই, তা ডারুইনের চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে। প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার এবং বিবর্তন সম্পর্কে সুপরিচিত লেখক পিটার জে বাউলারও একই মত পোষণ করেন ( বিবর্তনবিদ্যা, পৃঃ ৩০৩ -৩০৪)

এবং মোশাররফের আলোচনার জবাবে ৯.১.১.১ নং কমেন্টে জানাচ্ছেন,

তারপরও আমি আসলে একটি জায়গায় সুচিন্তিত একটি পার্থক্য করব। আমি জৈব বিবর্তনকে সামাজিক বিবর্তনের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাই না। আমি ' বেঁচে থাকার জন্য জীবন সংগ্রাম' কে ডারউইনের মতই 'শ্রেনী সংগ্রামের' সমার্থক মনে করি না।

এরকম জায়গাগুলোতেই আপনার সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি (সেই সাথে এইক্ষেত্রে ড ম আখতারুজ্জামানের সাথেও)।
দেখুন, এখানে কি সুন্দর শেষ পর্যন্ত "সামাজিক বিবর্তনবাদ" এর মত জঘণ্য একটা অধ্যায়কে মার্ক্সের ঘাড়ে বা মার্ক্সবাদীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন! (এটাকে কি বলবো? ইচ্ছাকৃত বিকৃতি- নাকি অজ্ঞতা?)

ড ম আখতারুজ্জামানও কিন্তু সামাজিক বিবর্তনবাদের কথা আনেন নি! ড ম আখতারুজ্জামান বা রুজ আসলে মার্ক্সবাদকে ধরতে পারেননি বা জানেননা বলেই সেরকম আলোচনা করেছেন বলে মনে হয়েছে। কেননা, ডারউইনের বিবর্তনবাদ বা ন্যাচারাল সিলেকশনের সাথে শ্রেণী সংগ্রামের কোন সম্পর্কই নেই। হুম ডারউইনের বিবর্তনবাদ মার্ক্স, এঙ্গেলসকে খুবই আলোড়িত করেছিল ঠিকই, কেননা ডারউইনের বিবর্তনবাদের ভূমিকা শুধু জীববিজ্ঞানেই নয়- বরং তা দীর্ঘকালের চেপে বসা সৃষ্টিতত্তবাদীদের বিশ্বাসের মূলে গিয়ে আঘাত করে, মানুষের জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গীই পাল্টে দেয়। ফলে, মার্ক্স-এঙ্গেলসও খুব উচ্ছসিত ছিলেন। বিভিন্ন যুগে বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার যেমন দর্শনের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে দারুন প্রভাবিত করেছিল- তেমনি ডারউইনের এই আবিষ্কারও মার্ক্সকে তার দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ গড়তে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। মার্ক্স সেটি স্বীকার করেছেন- শুধু বিবর্তনবাদ নয়, মার্ক্স তিনটি আবিষ্কারের পক্ষে সরাসরি তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছিলেন (অর্থাৎ এই তিনটি আবিষ্কার তার দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে গড়ে তুলতে মূল ভূমিকা রেখেছিল)- বিবর্তনবাদ, পদার্থবিদ্যার শক্তি-বস্তুর নিত্যতা সূত্র এবং কোষ তত্ত্ব। এই তিনটি আবিষ্কার না হলে কি মার্ক্সের পক্ষে বস্তুর নিয়ত পরিবর্তনশীলতার পক্ষে ঐ দর্শন গড়ে তোলা সম্ভবপর হতো? নির্জীব বস্তুজগতের পরিবর্তনময়তার কথা জানান দিলেও, জীবজগতের পরিবর্তনশীলতার কথা ডারউইনের বিবর্তনবাদ ছাড়া কিভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতো? ফলে, বিবর্তনবাদ নিয়ে মার্ক্স-এঙ্গেলস স্বভাবতই খুব উচ্ছসিত ছিলেন।

কিন্তু বিবর্তনবাদ নিয়ে মার্ক্স-এঙ্গেলসের আগ্রহকে যদি বিবর্তনবাদকে শ্রেণী সংগ্রামের সমার্থক বানানো বলা হয়- তখন সেটাকে তথ্যবিকৃতি না বলে আর কোন উপায় থাকে না। বরং মার্ক্স-এঙ্গেলস তথা বিভিন্ন যুগে মার্ক্সবাদীদের সামাজিক বিবর্তনবাদীদের বিপরীতে অবস্থান নিতে হয়েছে। মানুষের সমাজেও 'সারভাইভাল অব ফিটেস্ট' কে অগ্রাহ্য করেই মার্ক্সবাদকে দাঁড়াতে হয়েছে। মানব সমাজ আর পশু সমাজের পার্থক্য মার্ক্সকে দেখাতে হয়েছে। দেখাতে হয়েছে, মানুষ কেবল প্রকৃতির দাস নয়- সে প্রকৃতিকে বসে আনার চেস্টাও করে। মানব সমাজে মানবিকতা বলে একটা অধ্যায় আছে। এখানে ন্যায়-অন্যায় বোধ আছে এবং এই ন্যায়-অন্যায় বোধও পরিবর্তনশীল। শ্রেণী সংগ্রাম ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকে আসেনি। মানব সমাজের বিবর্তন বুঝার ক্ষেত্রে বরং সেসময়কার নৃতাত্তিক ডেভলোপমেন্টগুলো যথেস্ট ভূমিকা রেখেছে, ডারউইনের বিবর্তনবাদের ভূমিকা শুধু ততোটুকুই- মানব সমাজও পরিবর্তনশীল। কিন্তু মানব সমাজে ন্যাচারাল সিলেকশনের পক্ষে মার্ক্সকে কথা বলতে কি দেখেছেন?

দিনমজুর এর ছবি

অভিজিৎ বলেছেনঃ

আমরা যদি এ দু বিষয়ে এককমত হই, তাহলে প্রত্যাশা করি আমাদের মধ্যে বিরোধ দূর করে হ্যান্ডশেক করাটা কঠিন কোন ব্যাপার হবে না। আপনার জবাবের প্রত্যাশায় রইলাম।

আপনার উল্লেখিত বিষয় দুটোতে আপনার সাথে কোন দ্বিমত পোষণ করিনা, প্রথম থেকে করিওনি। ফলে, সে বিষয় দুটোতে হ্যাণ্ডশেকে করতে আপত্তি থাকার প্রশ্নই উঠে না। তবে, আপনার সাথে আমার দ্বিমত বা ভিন্নতার জায়গাটি অন্যত্র (আমি হয়তো বুঝাতে পারিনি)। যেমন আপনার ৯।১ কমেন্টের দিকে যদি তাকাই, তবে দেখিঃ
আমি এ প্রসঙ্গে ডঃ আখতারুজ্জামানের বইটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করি, যা পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে --
'...ডারউইনের প্রজাতির উৎপত্তি পড়ে মার্কস পরম উৎসাহের সাথে এ কথা তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে জানিয়ে লিখেছিলেন। মার্ক্স তার নিজের লেখা জগতবিখ্যাত পুস্তক 'ক্যাপিটাল' ডারউইনকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডারউইন তাতে কোন সাড়া দেননি। ... ডারউইন সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনবিদ্যাকে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন না। রুজের মতে, ডারউইনের "জীবনের জন্য সংগ্রাম"কে যারা "শ্রেনী সংগ্রামে"র সমার্থক মনে করতে চান, তারা যে ডারউইনের মতকে আদৌ বুঝতে পারেননি তা ডারউইন বিলক্ষণ জানতেন। বিবর্তন তত্ত্বে কোন কিছু ঘটবেই, ঘটতে বাধ্য, ঘটনার কোন অনিবার্যতা এবং অবশ্যম্ভাবিতা নেই, তা ডারুইনের চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে। প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার এবং বিবর্তন সম্পর্কে সুপরিচিত লেখক পিটার জে বাউলারও একই মত পোষণ করেন ( বিবর্তনবিদ্যা, পৃঃ ৩০৩ -৩০৪)

এবং মোশাররফের আলোচনার জবাবে ৯.১.১.১ নং কমেন্টে জানাচ্ছেন,
তারপরও আমি আসলে একটি জায়গায় সুচিন্তিত একটি পার্থক্য করব। আমি জৈব বিবর্তনকে সামাজিক বিবর্তনের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাই না। আমি ' বেঁচে থাকার জন্য জীবন সংগ্রাম' কে ডারউইনের মতই 'শ্রেনী সংগ্রামের' সমার্থক মনে করি না।

এরকম জায়গাগুলোতেই আপনার সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি (সেই সাথে এইক্ষেত্রে ড ম আখতারুজ্জামানের সাথেও)।
দেখুন, এখানে কি সুন্দর শেষ পর্যন্ত "সামাজিক বিবর্তনবাদ" এর মত জঘণ্য একটা অধ্যায়কে মার্ক্সের ঘাড়ে বা মার্ক্সবাদীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন! (এটাকে কি বলবো? ইচ্ছাকৃত বিকৃতি- নাকি অজ্ঞতা?) ড ম আখতারুজ্জামানও কিন্তু সামাজিক বিবর্তনবাদের কথা আনেন নি!

ড ম আখতারুজ্জামান বা রুজ আসলে মার্ক্সবাদকে ধরতে পারেননি বা জানেননা বলেই সেরকম আলোচনা করেছেন বলে মনে হয়েছে। কেননা, ডারউইনের বিবর্তনবাদ বা ন্যাচারাল সিলেকশনের সাথে শ্রেণী সংগ্রামের কোন সম্পর্কই নেই। হুম ডারউইনের বিবর্তনবাদ মার্ক্স, এঙ্গেলসকে খুবই আলোড়িত করেছিল ঠিকই, কেননা ডারউইনের বিবর্তনবাদের ভূমিকা শুধু জীববিজ্ঞানেই নয়- বরং তা দীর্ঘকালের চেপে বসা সৃষ্টিতত্তবাদীদের বিশ্বাসের মূলে গিয়ে আঘাত করে, মানুষের জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গীই পাল্টে দেয়। ফলে, মার্ক্স-এঙ্গেলসও খুব উচ্ছসিত ছিলেন। বিভিন্ন যুগে বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার যেমন দর্শনের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে দারুন প্রভাবিত করেছিল- তেমনি ডারউইনের এই আবিষ্কারও মার্ক্সকে তার দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ গড়তে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। মার্ক্স সেটি স্বীকার করেছেন- শুধু বিবর্তনবাদ নয়, মার্ক্স তিনটি আবিষ্কারের পক্ষে সরাসরি তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছিলেন (অর্থাৎ এই তিনটি আবিষ্কার তার দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে গড়ে তুলতে মূল ভূমিকা রেখেছিল)- বিবর্তনবাদ, পদার্থবিদ্যার শক্তি-বস্তুর নিত্যতা সূত্র এবং কোষ তত্ত্ব। এই তিনটি আবিষ্কার না হলে কি মার্ক্সের পক্ষে বস্তুর নিয়ত পরিবর্তনশীলতার পক্ষে ঐ দর্শন গড়ে তোলা সম্ভবপর হতো? নির্জীব বস্তুজগতের পরিবর্তনময়তার কথা জানান দিলেও, জীবজগতের পরিবর্তনশীলতার কথা ডারউইনের বিবর্তনবাদ ছাড়া কিভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতো? ফলে, বিবর্তনবাদ নিয়ে মার্ক্স-এঙ্গেলস স্বভাবতই খুব উচ্ছসিত ছিলেন।

কিন্তু বিবর্তনবাদ নিয়ে মার্ক্স-এঙ্গেলসের আগ্রহকে যদি বিবর্তনবাদকে শ্রেণী সংগ্রামের সমার্থক বানানো বলা হয়- তখন সেটাকে তথ্যবিকৃতি না বলে আর কোন উপায় থাকে না। বরং মার্ক্স-এঙ্গেলস তথা বিভিন্ন যুগে মার্ক্সবাদীদের সামাজিক বিবর্তনবাদীদের বিপরীতে অবস্থান নিতে হয়েছে। মানুষের সমাজেও 'সারভাইভাল অব ফিটেস্ট' কে অগ্রাহ্য করেই মার্ক্সবাদকে দাঁড়াতে হয়েছে। মানব সমাজ আর পশু সমাজের পার্থক্য মার্ক্সকে দেখাতে হয়েছে। দেখাতে হয়েছে, মানুষ কেবল প্রকৃতির দাস নয়- সে প্রকৃতিকে বসে আনার চেস্টাও করে। মানব সমাজে মানবিকতা বলে একটা অধ্যায় আছে। এখানে ন্যায়-অন্যায় বোধ আছে এবং এই ন্যায়-অন্যায় বোধও পরিবর্তনশীল। শ্রেণী সংগ্রাম ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকে আসেনি। মানব সমাজের বিবর্তন বুঝার ক্ষেত্রে বরং সেসময়কার নৃতাত্তিক ডেভলোপমেন্টগুলো যথেস্ট ভূমিকা রেখেছে, ডারউইনের বিবর্তনবাদের ভূমিকা শুধু ততোটুকুই- মানব সমাজও পরিবর্তনশীল এ সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো যুক্তি পাওয়া যেতে পারে ডারউইন থেকে। কিন্তু মানব সমাজে ন্যাচারাল সিলেকশনের পক্ষে মার্ক্সকে কথা বলতে কি দেখেছেন? সুতরাং, মার্ক্স ডারউইনের বিবর্তনবাদকে শ্রেণী সংগ্রামের সমার্থক দেখিয়েছেন এমন দাবি সম্পূর্ণই অজ্ঞতাপ্রসূত (কারো কারো ক্ষেত্রে বলতে ইচ্ছাকৃত তথা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেস্টা)।

(আশা করি উপরের ১১ নং কমেন্টটি মুছে ফেলা হবে)

অভিজিৎ এর ছবি

ড ম আখতারুজ্জামান বা রুজ আসলে মার্ক্সবাদকে ধরতে পারেননি বা জানেননা বলেই সেরকম আলোচনা করেছেন বলে মনে হয়েছে।

আপনি ড ম আখতারুজ্জামান-এর পরিচয় সম্ভবত জানেন না। ঊনি বাংলাদেশে সিপিবির-সেন্ট্রাল কমিটির লীডার এবং তাত্ত্বিক উপদেষ্টা ছিলেন বহুদিন। কাজেই তিনি মার্ক্সবাদ ''জানেন না' কিংবা 'ধররতে পারেননি' ব্যাপারটা ঠিক নয়। আসল কথা হচ্ছে - তিনি মার্ক্সবাদও জানেন, জানেন বিবর্তনবাদও (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন বিবর্তনবিদ্যা পড়াতেন)। আর সেজন্যই ডারউইনবাদ দিয়ে সমাজকে ব্যাখ্যা করার অপচেষ্টা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আপনি হয়ত বলবেন, মার্ক্সিস্টরা এগুলো করে না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অনেকেই না জেনে মার্ক্সবাদে ডারউইন নিয়ে আসেন। এই ব্লগেও রাসেল নামে এক ভদ্রলোক ডারউইনিজমের বিবর্তনের আলোকে সমাজকে ব্যাখ্যা করতে তৎপর হয়েছিলেন। আসলে বিজ্ঞানকে আদর্শবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত না করলে উপায় নেই।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

প্রথম থেকেই দেখা যাচ্ছে, আপনি কেবল কোটেশন দিয়ে আপনার যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন। এটা কোন সুস্থ চর্চা নয় বলেই মনে হয়। ড ম আখতারুজ্জামান বা রুজ মার্ক্সবাদ বুঝেননি বা বিকৃত করেছেন- এটা কেন বলেছি সেটা সেখানেই উল্লেখ করেছি। আপনি যদি সেই যুক্তি খণ্ডন করতে পারেন, করেন; না পারলে অন্তত ড ম আখতারুজ্জামানের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন- কিন্তু যুক্তি খণ্ডন না করে- ড ম আখতারুজ্জামান কি করছেন না করছেন, বা তিনি কি----- এসব ফিরিস্তি না আনাটাই ভালো। সিপিবির সেন্ট্রাল কমিটির লীডার ও তাত্তিক উপদেষ্টা হলেই তিনি মার্ক্সবাদ বিশারদ হয়ে যান না। বিশেষত এখানকার সিপিবি, ভারতের সিপিএম মার্কা দলগুলোর মার্ক্সবাদ বিশ্লেষণ দেখে যদি মার্ক্সবাদকে বুঝতে যান বা চান- তবে বলবো ভুল করছেন। আপনি মার্ক্সবাদকে খারিজ করতে চাইলে- অরিজিনাল টেক্সট পড়ুন, মার্ক্স পড়ুন- এঙ্গেলস পড়ুন- লেনিন পড়ুন। শুধু কোটেশন দিয়ে তথা আরেকজনের মার্ক্সবাদ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা পড়ে যুক্তি করতে আসা কাজের কিছু না, আর সে সমস্ত কোটেশনের বিপরীত যুক্তি- বা মতকে না খণ্ডন করে, অমুক ব্যক্তি এই ছিল- তমুক ব্যক্তি সেই ছিল-- এসব বলা বালসুলভ। আশা করি বুঝতে পারছেন। আর আলোচনায় কোথাকার কোন রাসেল কবে কি বলেছিল সেটা দিয়ে মার্ক্সিজমের ভুল প্রমান করতে যাওয়াটা চরম হাস্যকর।

অভিজিৎ এর ছবি

এবং দিনমজুর (দিনমজুরের পুরো লেখাটা ভালোভাবে পড়া হয়নি, মন্তব্য ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী) সাহেব বলে ফেললেন- "ল্যামার্কের তত্ত্ব আজ ভুল বলে প্রমানিত। লাইসেঙ্কোইজমকে বিজ্ঞানের কোন ধারা বলেই মানিনা।"

আসলেই ল্যামার্কের তত্ত্ব আজ ভুল বলে প্রমাণিত। তবে ল্যামার্কের অবদান অবশ্যই আছে। ল্যামার্কের কয়েকটি অবিস্মরনীয় অবদানের মধ্যে একটি এই যে, তিনি সর্বপ্রথম জীববিদ্যা পরিপদটি এবং বর্তমান অর্থে প্রজাতি পরিপদটি ব্যবহার করেন। আর এ ছাড়া আরো কিছু অবদানের কথা দিনমজুরের বক্তব্যে উল্লিখিত আছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে - বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ল্যামার্ক যেসব জিনিসপত্র প্রস্তাব করেন - (যেমন অর্জিত লক্ষণার বংশানুসৃতি তত্ত্ব) সেগুলো ছিল ভুল। এটা এখনকার সব বিজ্ঞানী এবং গবেষকেরাই স্বীকার করেন। এমনকি ডারউইনও ল্যামার্কের তত্ত্বের সমালোচনা করেছিলেন সেই সময়ই - "ঈশ্বর আমাদের ল্যামার্কের কান্ডজ্ঞান থেকে রক্ষা করুন" (১৮৪৪) , এবং - "দু দুবার পাঠ করেও মনে হল পুস্তকটি বাজে এবং এ থেকে আমি কিছুই শিখতে পারলাম না (১৮৬৩, চার্লস লায়েলকে লেখা পত্র) ইত্যাদি দ্রঃ।

আসলে আমি যতদূর জানি, কামারের ঘটনার পর (সুহাসের পোস্ট দ্রঃ) পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে ল্যামার্কবাদ আর নব্য ল্যামার্কবাদের মৃত্যু ঘটে যায়, ব্যতিক্রম থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেদেশে ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে নব্য ল্যামার্কবাদের মোড়কে লাইসেঙ্কোইজমের চর্চা চালিয়ে যাওয়া হয় - যা সভিয়েত রাশিয়ায় জেনেটিক্সের বারোটা বাজিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে বিবর্তনের উপর অন্যতম অথেনটিক সাইট 'টক অরিজিন' থেকে কিছু পয়েন্ট উদ্ধৃত করি -

1. Stalin rejected neo-Darwinian evolution in favor of Lamarckism.

Mendeleyev's "periodic system of elements" clearly shows how very important in the history of nature is the emergence of qualitative changes out of quantitative changes. The same thing is shown in biology by the theory of neo-Lamarckism, to which neo-Darwinism is yielding place. (Stalin 1906, 304)

More specifically, Stalin rejected the ideas of August Weismann, a 19th-century German biologist, in favor of Trofim Lysenko, a pseudoscientist who based his ideas on Lamarckism. Weismann, who accepted Darwin's theory of evolution, disproved Lamarckism and proposed that germ cells pass on hereditary information; his work was an early variant of the modern evolutionary synthesis which unites evolutionary theory with genetics. Stalin appointed Lysenko head of the Academy of Agricultural Sciences of the Soviet Union, where he had great political power. (Rossiannov 1993)

Stalin and Lysenko rejected evolution and genetics for ideological, not biological, reasons. (Stalin was quite ignorant of science in general.) The class struggle of Marxism contradicts the individual competition implied by natural selection. More importantly, genetics, implying that traits were fixed at birth, contradicted the ideal of moulding and improving traits. Stalin proclaimed genetics a capitalist pseudo-science.

2. Stalin was, first and foremost, a Marxist dictator, far above any allegiance he might have had to any theories concerning the origin of species, whether Lamarckian or Darwinian. Stalin distrusted scientists as being prone to free-thinking. Though his persecution of biologists and biology were particularly egregious (causing appalling damage to Soviet agriculture), he imprisoned and killed thousands of scientists and engineers from all fields.

লাইসেঙ্কুইজম নিয়ে খুব বেশি কিছু না বলাই বোধ হয় ভাল। বহুদিন আগেই বিজ্ঞানে একটি পরিত্যাক্ত বিষয়। আশা করি রুমন আদর্শবাদ থেকে মুক্ত হয় বিজ্ঞানকে দেখতে সচেষ্ট হবেন।

এই দুটি লিঙ্ক দেখা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে --

Lysenkoism - Skeptic's dictionary

Who was Lysenko ? What was Lysenkoism ? , Prof. Helena Sheehan

লেখিকা হেলেনা সীহানের শেষ মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য,

The sorts of conclusions not to be drawn are: that science must be kept free from philosophy and from politics, that science is in essence non-ideological and that ideology is necessarily antithetical to science.Science is inextricably tied up with philosophy, politics and ideology.

যা কাকতালীয়ভাবে হলেও আমার লেখার উপসংহারে প্রদত্ত অভিমতের সাথে মিলে যায় -

বিজ্ঞানকে ভবিষ্যতে মুক্ত হতে হবে এ সমস্ত আদর্শবাদীদের খপ্পর থেকে। কোন ধর্ম, দর্শন কিংবা রাজনৈতিক মহল বিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলে বিজ্ঞানের যে আদপে কোন উন্নতি হয় না - লাইসেঙ্কোর বিয়োগান্তক পরিণতি আমাদের সে শিক্ষাই দেয়।

আশা করি রুমন এর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সমর্থ হবেন।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

ইমরান হাবিব রুমনের আর্টিকেল পড়ে আপনি যেমন হেসেছিলেন- আপনার এই কমেন্ট পড়ে আমরাও না হেসে পারিনি। বিনোদনের খোরাক যোগানোতে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

আপনি Helena Sheehan এর যে অংশটুকু কোট করেছেন, এবং সেটি থেকে আপনার যে বক্তব্যের সমর্থন খুজেছেন বা দেখিয়েছেন- দুটিই কয়েকবার করে পড়লাম, শুধু আমোদ লাভের জন্যই বারবার পড়েছি তা নয়- নিজেকে যাচাই করার জন্য পড়েছি, কেননা আপনি পণ্ডিত মানুষ- আপনার মতে আমি অজ্ঞ-বোকা; ফলে অজ্ঞ-বোকার বুঝতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা যথেস্টই থাকে- তার উপর আমি ইংরেজীতে খুবই কাঁচা- ইংরেজীর নাম শুনলে ভয়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর চলে আসে আর আপনি থাকেন বিদেশ-বিভুইয়ে, ইংরেজীতে কত মোটামোটা বই পড়েছেন! সুতরাং Helena Sheehan এর যে অংশটুকু কোট করেছেন তার বাংলা অনুবাদ আমি যেভাবে বুঝছি- সেটাই ভুল কিনা বুঝার চেষ্টা করছি। পারছি না। বারবার পড়ছি, কিন্তু যতবারই পড়ছি ততবারই আমি যেটা বুঝছি সেটা আপনার বক্তব্যের ঠিক বিপরীত-ই বলে মনে হচ্ছে।

শেষে অনুবাদই করার চেষ্টা করলামঃ "এমন সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না যে, বিজ্ঞানকে দর্শন এবং রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখতেই হবে, এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না যে বিজ্ঞান প্রকৃতই অনাদর্শবাদী। এবং এমনটি নয় যে আদর্শবাদ অবশ্যই বিজ্ঞানের সাথে সাংঘার্ষিক বা বিপরীত।
বিজ্ঞান এক অটুট বাঁধনে দর্শন, রাজনীতি ও আদর্শবাদের সাথে বাঁধা"।

আপনি বলেছেন,

যা কাকতালীয়ভাবে হলেও আমার লেখার উপসংহারে প্রদত্ত অভিমতের সাথে মিলে যায় -
উদ্ধৃতি
বিজ্ঞানকে ভবিষ্যতে মুক্ত হতে হবে এ সমস্ত আদর্শবাদীদের খপ্পর থেকে। কোন ধর্ম, দর্শন কিংবা রাজনৈতিক মহল বিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলে বিজ্ঞানের যে আদপে কোন উন্নতি হয় না - লাইসেঙ্কোর বিয়োগান্তক পরিণতি আমাদের সে শিক্ষাই দেয়।

আমার অনুবাদটির সাথে আপনার উপসংহারের অভিমতের কোন মিল (না কাক- না তাল, কিছুই না) খুঁজে পাচ্ছি না। হতে পারে, আমি অজ্ঞ, মূর্খ-সূখ্য মানুষ- আমার অনুবাদটিই প্রকাণ্ড ভুল; আপনার মত পণ্ডিতের কাছেই তাই দারস্থ হচ্ছি- এর আগে অনেকবার বই পড়ার উপদেশ দিয়েছিলেন, দরকার হলে কিছু বই এর নামও জানাতে চেয়েছিলেন- এবারে সত্যি সত্যি আমাকে কিছু বই এর নাম জানিয়ে উপকারটুকু করুন- ইংরাজী ভাষা শিক্ষার উপর ভালো কিছু বই সাজেস্ট করলে বড়ই উপকৃত হই, এমন বই যা পাঠ করে Helena Sheehan এর কোট করা বক্তব্যের সাথে আপনার উপসংহারের অভিমতটুকুর মিল খুজে পেতে পারি।

আর পাঠকদের উদ্দেশ্যে অভিজিৎ Helena Sheehan এর যে লেখা থেকে কোট করেছেন- সেই লেখার লাস্ট প্যারাটুকু পুরোটাই তুলে দিচ্ছিঃ

The sorts of conclusions to be drawn are: that there are no shortcuts in dealing with such intricate issues and that a certain cultural level is required to deal with them competently. The sorts of conclusions not to be drawn are: that science must be kept free from philosophy and from politics, that science is in essence non-ideological and that ideology is necessarily antithetical to science.Science is inextricably tied up with philosophy, politics and ideology.

বুঝতেই পারছেন- অভিজিৎ Helena Sheehan এর লেখাটির শেষ প্যারার প্রথম বাক্যটি বাদ দিয়ে তুলে দিয়েছেন। পুরো প্যারা পড়লে- বুঝবেন Helena Sheehan লাইসেঙ্কোর ঘটনা থেকে কি সিদ্ধান্ত টানা যেতে পারে এবং একই সাথে কি সিদ্ধান্ত টানা উচিৎ হবে না- তাই উল্লেখ করেছেন।

সেই সাথে পাঠকদের উদ্দেশ্যে আরেকটি অংশ তুলে দিচ্ছি, যেটি পড়লে হয়তো লাইসেঙ্কোইজম সম্পর্কে Helena Sheehan এর দৃষ্টিভঙ্গী জানতে পারবেন। আর, অভিজিৎ যদি Helena Sheehan এর এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে তার নিজের অভিমতের মিল খুঁজে পান, তবে বলতেই হবে- অভিজিৎ বাবুর সাথে আমাদের দ্বিমত করার আর কিছুই নেই।

My own view of what is required in the way of an analysis of Lysenkoism is that it cannot be understood simply as a story of personal opportunism and political terror, nor as a cautionary tale against the dangers of bureaucratic interference in intellectual life or of ideological distortion of science. These are obviously elements of an analysis, but it is vital to see the emergence of Lysenkoism as no historical accident, as no imposition of alien elements (philosophy and politics) upon science.

অভিজিৎ এর ছবি

ইমরান হাবিব রুমনের আর্টিকেল পড়ে আপনি যেমন হেসেছিলেন- আপনার এই কমেন্ট পড়ে আমরাও না হেসে পারিনি। বিনোদনের খোরাক যোগানোতে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

আপনাকে বিনোদিত হতে দেখে আমিও কৃতার্থ। আবার নিজে শুধু নন, আমি থেকে 'আমরা' হয়ে হেসেছেন। কম কি! প্রাণখুলে হাসতে থাকুন।

আপনি Helena Sheehan এর যে অংশটুকু কোট করেছেন, এবং সেটি থেকে আপনার যে বক্তব্যের সমর্থন খুজেছেন বা দেখিয়েছেন- দুটিই কয়েকবার করে পড়লাম, শুধু আমোদ লাভের জন্যই বারবার পড়েছি তা নয়- নিজেকে যাচাই করার জন্য পড়েছি, কেননা আপনি পণ্ডিত মানুষ- আপনার মতে আমি অজ্ঞ-বোকা; ফলে অজ্ঞ-বোকার বুঝতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা যথেস্টই থাকে- তার উপর আমি ইংরেজীতে খুবই কাঁচা- ইংরেজীর নাম শুনলে ভয়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর চলে আসে আর আপনি থাকেন বিদেশ-বিভুইয়ে, ইংরেজীতে কত মোটামোটা বই পড়েছেন!...।

আপনি এখন অর্থহীন প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন। আমি তো বলিনি আমি ইংরেজীতে মোট মোটা বই পড়েছি, আর আপনি ইংরেজীতে দুর্বল। কেন অযথা আমার মুখে কথা বসিয়ে অযথা বাগাড়ম্বর করে হাসির পাত্র হচ্ছেন। বিতর্ক হচ্ছিলো ল্যামার্কিজম আর লাইসেঙ্কোইজম নিয়ে। সে গুলো বিজ্ঞানে বহু আগেই বাতিল হয়ে গেছে। এ ব্যাপারটা মেনে নিলে অযথা ত্যানা প্যাচানোর তো কারণ দেখি না। কে মোটা বই পড়েছে আর কে ইংরেজীতে ভাল এগুলো এখানে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।

শেষে অনুবাদই করার চেষ্টা করলামঃ ...।

আপনার অনুবাদ প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি তো বলিনি আমি উপসংহারে Helena Sheehan যা বলেছেন - তাই হুবহু (একেবারে আক্ষরিক অর্থে) আমিও তাই ব্যবহার করেছি। আমি বলেছি আমার বক্তব্য Helena Sheehan এর উপসংহারে প্রদত্ত অভিমতের সাথে মিলে যায়। হেলেনাও মনে করেন বিজ্ঞানকে রাজনীতি এবং আদর্শবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে (... that science must be kept free from philosophy and from politics, ...), এটা তো আমিও মনে করি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে - Science is inextricably tied up with philosophy, politics and ideology. - মানে বিজ্ঞান আদর্শবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত নয় - এটা তো আমি ভাই স্বীকার করিই। সেজন্যই বর্তমানের কথা না বলে বলেছি - বিজ্ঞানকে ভবিষ্যতে মুক্ত হতে হবে এ সমস্ত আদর্শবাদীদের খপ্পর থেকে। কথাটা কি কঠিন শোনাচ্ছে খুব? এটা না বুঝে হেলেনার উদ্ধৃত অংশ আক্ষরিক ভাবে অনুবাদ করে আর এ নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে 'নিজেকে 'মুখ্য সুখ্য' বলে প্রকারন্তরে নিজেকে জাহির করার আমি কোন কারণ দেখি না।

সেই সাথে পাঠকদের উদ্দেশ্যে আরেকটি অংশ তুলে দিচ্ছি, যেটি পড়লে হয়তো লাইসেঙ্কোইজম সম্পর্কে Helena Sheehan এর দৃষ্টিভঙ্গী জানতে পারবেন। আর, অভিজিৎ যদি Helena Sheehan এর এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে তার নিজের অভিমতের মিল খুঁজে পান, তবে বলতেই হবে- অভিজিৎ বাবুর সাথে আমাদের দ্বিমত করার আর কিছুই নেই।

ঠিক আছে, তাহলে ল্যাঠা তো চুকলোই। আমি আপনার উদ্ধৃত হেলেনার এনালাইসিসের সাথে দ্বিমত করি না। আমিও কিছু লাইন হেলেনার রচনা থেকে কোট করি, তাহলে (লেখাটার মাঝামাঝি অংশে দেখুন)-

The science of genetics was denounced as reactionary, bourgeois, idealist and formalist. It was held to be contrary to the Marxist philosophy of dialectical materialism. I ts stress on the relative stability of the gene was supposedly a denial of dialectical development as well as an assault on materialism.

একথা গুলোর কাছাকাছি কিছু কথা বলাতেই দিনমজুর সাহেব আমার উপর খাপ্পা হয়ে উঠলেন। হেলেনার উপরের কথা গুলোই আমার রচনার মূল কথা। সোভিয়েত নেতৃত্ব সেসময় জেনেটিক্স বা মেন্ডেলের বংশগতিকে পাত্তা না দিয়ে কেবল ল্যামার্কের পরিবেশ নির্ণয়বাদকে আদর্শ হিসেবে মনে করতেন, কারণ তা মার্ক্সীয় 'সাম্যবাদের বাণী' র সাথে মিলে যায়- সব মানুষ সমান; মানুষের ভাল, খারাপ লোভ লালসা - কেবল পরিবেশের ফল! পরিবেশ দিয়েই সব কিছু পালটে দেয়া যাবে। লাইসেঙ্কো ডারউইনিজমের বিরোধিতা করে আর এঙ্গেলসীয় ল্যামার্কিজম গেয়ে একটি 'সায়েন্টিফিক পেপার'ও লিখেছিলেন ১৯৪১ সালে - 'Engels and Some Problems of Dar-
winism' নামে। এ'ই 'মার্ক্সীয় লাইসেঙ্কোইজম' যে কতবড় ভুল - তা আমি আমার প্রবন্ধে খুব ভালভাবেই দেখিয়েছি। এগুলো শুনেই আপনাদের গা চিড়বিড় করে উঠলো। কিন্তু সত্যের খাতিরে তিক্ত কথা ত কিছু শুনতেই হবে। শুধু গলা কাঁপিয়ে মার্ক্সবাদকে বিজ্ঞান বানালেই ত হবে না, লাইসেঙ্কোইজমের বিয়োগান্তক পরিণতির পেছনে মার্ক্সবাদের আর সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের 'কমিউনিস্ট' প্রোপাগান্ডার অবদান কম নয় - এটা সাড়া বিশ্বেই এখন স্বীকৃত।

মুশকিলটা হল আপনারা আপনাদের মাথার ভিতরে মার্ক্সবাদের সে ছক তৈরি করে রেখেছেন সেই ফরম্যাটের একটু বাইরে কিছু শুনলেই আপনাদের মাথার রক্ত গরম হয়ে উঠে। প্রতিপক্ষ হয়ে যায় 'ছাগল', 'জাকির নায়েক' নয়ত 'মওদুদী'। আমি তো টক অরিজিনের মত অথেন্টিক সাইট থেকেও উদ্ধৃতি হাজির করে দেখিয়েছি কিভাবে স্ট্যালিন মার্ক্সবাদের ছাঁকুনিতে ফেলে বিজ্ঞানকে চিড়ে চ্যাপটা করে দিয়ে লাইসেঙ্কোইজম প্রমোট করে শেষ মেষ জেনেটিক্সের বারোটা বাজিয়েছেন। নিজের বিশ্বাসের বিপরীত কিছু শুনলেই অপরকে যদি মওদুদী বনে যেতে হয়, তবে তো আমি সত্যই নাচার।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

দিনমজুর এর ছবি

এ পোস্টে আর মন্তব্য করবো না বলে ভেবেছিলাম, তবে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে-

১।

আপনাকে বিনোদিত হতে দেখে আমিও কৃতার্থ। আবার নিজে শুধু নন, আমি থেকে 'আমরা' হয়ে হেসেছেন। কম কি! প্রাণখুলে হাসতে থাকুন।

আসলে দিনমজুর নিকটি আমরা তিনজন (কল্লোল মোস্তফা, অনুপম সৈকত শান্ত, মাহবুব রুবাইয়াৎ) মিলে চালাই, একসাথে না থাকলেও আমরা যথেস্ট আলোচনা- শেয়ার এসব করেই দিনমজুরের পোস্ট-তর্ক-বিতর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাই। কখনো সেটা সম্ভব না হলে- কল্লোল- শান্ত বা রুবাইয়াৎ আলাদা আলাদা নামে লিখি (রুবাইয়াৎ সেক্ষেত্রে লিখে Schlemiel নামে) এবং পরে সেগুলো কম্পাইল ও আলোচনার মাধ্যমে একত্রিত করে দিনমজুর নিকে হাজির হই।
ফলে দিনমজুরের যেকোন লেখায়- আমরা কথাটা মাঝে মধ্যেই পাবেন। কখনো কখনো 'আমি'ও থাকে- তবে সেই 'আমি'কে আমরা তিনজনই ধারণ করি।

২।

আমি বলেছি আমার বক্তব্য Helena Sheehan এর উপসংহারে প্রদত্ত অভিমতের সাথে মিলে যায়। হেলেনাও মনে করেন বিজ্ঞানকে রাজনীতি এবং আদর্শবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে (... that science must be kept free from philosophy and from politics, ...), এটা তো আমিও মনে করি।

আপনি যে মনে করেন, বিজ্ঞানকে রাজনীতি ও আদর্শবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে- সেটা আপনার পুরো পোস্টে ও মন্তব্যে পরিষ্কার। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যত্র-তত্র কোটেশনের যথেচ্ছ ব্যবহার করার বিপদটি টের পাওয়ার কথা- সেটিই তুলে ধরেছি। আপনি এখানে বলছেন- হেলেনাও মনে করেন 'বিজ্ঞানকে রাজনীতি এবং আদর্শবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে'- সেটা আসলে মস্ত বিকৃতি। .. that science must be kept free from philosophy and from politics,- এটা বলার আগে যে " .. .. " ব্যবহার করলেন- সেই " .. .. " এ কি আছে? The sorts of conclusions not to be drawn are- অর্থাৎ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না যে, বলে আপনি যতটুকু তুলে ধরেছেন সেটুকু ।

উদাহরণ দেই, করিমের মূল বক্তব্য "আমি মনে করি না যে, রহিম খারাপ" এটিকে আপনি যদি এভাবে উল্লেখ করেন "করিমও মনে করেন রহিম খারাপ (তিনি বলেছেন-"----- যে, রহিম খারাপ")"- তবে এটাকে কি বিকৃতি বলা হবে না? প্রকৃতপক্ষে করিম যা বলতে চেয়েছে- সেটাকে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবে উপস্থাপন করা হলো না কি?

হেলেনা শিহানের পুরো লেখা আবার পড়ুন, তাহলে বুঝতে পারবেন- তিনি আপনার মত বিজ্ঞানকে সমস্ত রকম আদর্শবাদ থেকে মুক্ত রাখার কথা বলেছেন কি না? আর আশা করবো, শুধু কোটেশন না দিয়ে যুক্তিগুলো ধরুন - বুঝুন এবং সেই যুক্তিগুলো নিয়েই উপস্থিত হবেন- অন্তত যে কোটেশন দিচ্ছেন- সেগুলো বুঝার চেষ্টা করুন।

৩।

Science is inextricably tied up with philosophy, politics and ideology. - মানে বিজ্ঞান আদর্শবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত নয় - এটা তো আমি ভাই স্বীকার করিই। সেজন্যই বর্তমানের কথা না বলে বলেছি - বিজ্ঞানকে ভবিষ্যতে মুক্ত হতে হবে এ সমস্ত আদর্শবাদীদের খপ্পর থেকে। কথাটা কি কঠিন শোনাচ্ছে খুব? এটা না বুঝে হেলেনার উদ্ধৃত অংশ আক্ষরিক ভাবে অনুবাদ করে আর এ নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে 'নিজেকে 'মুখ্য সুখ্য' বলে প্রকারন্তরে নিজেকে জাহির করার আমি কোন কারণ দেখি না।

আপনি যে ভাবানুবাদ করলেন এবং আমাকে আক্ষরিক অনুবাদ করে ফেনিয়ে ফেলার ব্যাপারে অভিযুক্ত করলেন- সেই ভাবানুবাদ কিন্তু হেলেনার ভাব থেকে সম্পূর্ণটাই পৃথক- বলতে হবে, সেটা আপনার ভাব এবং যেহেতু আপনার ভাব ও হেলেনার ভাব বিপরীত- সুতরাং এটাকে অনুবাদ না বলাটাই শ্রেয় হবে। Science is inextricably tied up with philosophy, politics and ideology. - মানে বিজ্ঞান আদর্শবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত নয়- এটা কে বললো? কেননা আপনি যে অনুবাদ দেখালেন সেটাতে বিজ্ঞানের আদর্শবাদ থেকে মুক্ত না হওয়াটা নেগেটিভ সেন্স বহন করে, কিন্তু হেলেনার অবস্থান কিন্তু তা নয়। হেলেনা বলছেন- বিজ্ঞান দর্শন-রাজনীতি ও আদর্শবাদের সাথে বাঁধা- এবং ক্রিয়াবিশেষণ ব্যবহার করেছেন inextricably, মানে হলো অটুটভাবে- বা এমনভাবে বাঁধা যে চাইলেও এই সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এবং ঠিক এই বাক্যের আগেই তিনি জানাচ্ছেন - এই সিদ্ধান্ত টানা যাবে না যে বিজ্ঞানকে আদর্শবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে। ফলে আপনি যে আদর্শবাদকে খপ্পর হিসাবে দেখালেন- সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তি অবস্থান, সেটা হেলেনার নাম করে তুলে না ধরলেই ভালো হতো। পরবর্তীতে অন্তত আপনাকে সৎ হিসাবে দেখতেই চাইবো।

৪। হেলেনা শিহানের একটা কোটেশন তুলে দিয়ে বললেনঃ

একথা গুলোর কাছাকাছি কিছু কথা বলাতেই দিনমজুর সাহেব আমার উপর খাপ্পা হয়ে উঠলেন। হেলেনার উপরের কথা গুলোই আমার রচনার মূল কথা।

দেখুন হেলানা শিহানের কথাগুলোর কাছাকাছি কথার জন্য আমরা আপনার সাথে দ্বিমত করিনি। আপনি প্রথম কমেন্ট থেকে শেষ পর্যন্ত দেখুন- লাইসেঙ্কো বা লাইসেঙ্কোইজম নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহের জায়গা ছিলনা, রুমনের সাথে যে দ্বিমত করি- সেটা প্রথম কমেন্টের শুরুতেই জানিয়েছি। ফলে দ্বিমতের জায়গাগুলো খুব পরিষ্কারভাবেই জানিয়েছি- তারপরেও বারেবারে যদি বলেন-
এ'ই 'মার্ক্সীয় লাইসেঙ্কোইজম' যে কতবড় ভুল - তা আমি আমার প্রবন্ধে খুব ভালভাবেই দেখিয়েছি। এগুলো শুনেই আপনাদের গা চিড়বিড় করে উঠলো।
তাহলে সেটার মত চরম বিরক্তিকর বাজে বিষয় আর কিছু হয়না। একদম শুরুতেই আপনার বক্তব্যের ব্যাপারে আমাদের যে অভিযোগ- (রুমন মেনডেলের বংশগতি বিদ্যাকে বা বিজ্ঞানকে ভাববাদী বলেছে কি না যে- আপনি আপনি বানিয়ে সেটি উল্লেখ করে রুমনকে খণ্ডন করতে গেলেন?), এখনও দেখছি একই কথা বলতে হচ্ছে! আপনি এরকমটি ছাড়া কি আলোচনা করতে পারেন না? আমাদের কোথায়- কোন জায়গায় আপত্তি, সেগুলো ধরে ধরে আলোচনা করেছি, ভালো লাগবে সেগুলো খণ্ডন করলে, তা না করে যেখানে আমরা আপনার সাথে একমত বলে বারেবারে জানান দেয়ার পরেও সেখানটিই ভুলভাবে উপস্থাপন করে আমাদের গা চিড়চিড় করে উঠে জানালে, তখন সত্যিই গা চিড়চিড় করতে চায়। বিজ্ঞানকে আদর্শবাদ থেকে মুক্ত রাখতে চান ভালো কথা, ব্যক্তিজীবনে অন্তত আপনার কাছে কিছু এথিকস তো আশা করতেই পারি। আশা করবো- আমাদের বক্তব্যকে আর বিকৃত করবেন না।
আবারো বলছি, লাইসেঙ্কো বা লাইসেঙ্কোইজম ভুল-সঠিক এসব নিয়ে আপনার সাথে আমাদের কোন দ্বিমত নেই, হেলেনা শিহানেরও আপনার সাথে কোন দ্বিমত নেই; সমস্ত দ্বিমতের জায়গাটি হলো, লাইসেঙ্কোইজমের ঘটনা থেকে টানা আপনার সিদ্ধান্তের সাথেঃ
লাইসেঙ্কোইজমের বিয়োগান্তক পরিণতির পেছনে মার্ক্সবাদের আর সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের 'কমিউনিস্ট' প্রোপাগান্ডার অবদান কম নয় - এটা সাড়া বিশ্বেই এখন স্বীকৃত।

আমরা প্রথম থেকে এটাই বলতে চেয়েছি- লাইসেঙ্কোইজমকে ভুল দেখিয়ে মার্ক্সবাদের ভুল প্রমান করাটা চরম অবৈজ্ঞানিক। আশা করি আমাদের এই অবস্থানকে আর লাইসেঙ্কোইজমের পক্ষের অবস্থান হিসাবে দাঁড় করিয়ে যুক্তি সাজাবেন না।

৫।

মুশকিলটা হল আপনারা আপনাদের মাথার ভিতরে মার্ক্সবাদের সে ছক তৈরি করে রেখেছেন সেই ফরম্যাটের একটু বাইরে কিছু শুনলেই আপনাদের মাথার রক্ত গরম হয়ে উঠে। প্রতিপক্ষ হয়ে যায় 'ছাগল', 'জাকির নায়েক' নয়ত 'মওদুদী'।

মার্ক্সবাদের ছক বলতে কি বুঝালেন? হ্যা আমরা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীকে সঠিক মনে করি, মার্ক্সের রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রকে সঠিক মনে করি। জগতের পরিবর্তনশীলতাকে সঠিক মনে করি, ডারউইনের বিবর্তনবাদ- বা মেনডেলের বংশগতিবিদ্যাকেও সঠিক মনে করি। এগুলোকে সঠিক মনে করার কারণ এখন পর্যন্ত এসবের বেঠিকতা আমাদের কাছে সন্দেহাতীতভাবে কেউ তুলে ধরতে পারেনি। এটাকে যদি ছকে আবদ্ধ বলেন, বলতে পারেন। কিন্তু মাথা গরমের বিষয়টি পরিষ্কার হলো না, মাথা গরম হতে যাবে কেন? যা হয়েছে, মাঝে মধ্যেই বিরক্তি এসেছে, এবং সেটা বলেওছি। এই বিরক্তিও আসতো না যদি না আপনি মুক্তমনার মত একটা সাইটের কর্ণধার হতেন- আপনার কাছে এমন কাঁচা-অপক্ক আলোচনা খুবই হতাশাজনক! ফলে মাঝে মধ্যে হতাশবোধও করেছি। কিন্তু মাথা গরম হবে কেন? আপনাদের কি জাকির নায়েক- আহমাদ দীদাতদের কুযুক্তিগুলো খণ্ডন করতে গিয়ে মাথা গরম হয় কখনো?
আর, প্রতিপক্ষ হিসাবে আপনাকে কখনো আমরা ছাগল বলিনি, বলার কথাও নয়; তুলনা দেয়ার জন্য প্রাণীজগতকে টানার দরকার পড়ে না আমাদের। তবে, এটাও স্বীকার করি যে, মওদুদি - জাকির নায়েকদের প্রতি কেবল করুনাই হয়, তাদের প্রতি মনোভাব আর আপনার প্রতি অবশ্যই এক নয়; আপনাকে অনেক কারণেই অনেক দিকে শ্রদ্ধা করি, তবে গত কিছু আলোচনায় আপনার যুক্তি করার ধরণের সাথে তাদের মিল পেয়েছি- তার মানে এই নয় যে- ওদের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছে বা আপনাকে ওদের মতই একই গোত্রের মনে করছি- এ শুধু কিছু পদ্ধতিগত মিল যেটিতে জাকির নায়েকরা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে তথ্য বিকৃতি ঘটায়, মিথ্যাচারের আশ্রয় ঘটায় - আপনাকেও ইদানিং একই কাজ করতে দেখছি।

সবশেষে এতটুকু বলছি, বিজ্ঞান আন্দোলনে আপনার অবদানকে স্বীকার করি- আপনার প্রকাশিত গ্রন্থ দুটো (রুমনের মত আমাদের তিনজনেরও মধ্যে কেউ কেউ আপনার ১ম গ্রন্থটি অনেককে কিনতে উদ্দ্বুদ্ধ করেছি- কিনেছিলাম বাসদের একটি অনুষ্ঠান থেকে টিএসসিতে, তবে এটাও মনে করি- শুধু এ কারণেই আমাদের বক্তব্যের কোন ভুল খণ্ডন থেকে আপনাকে বিরত থাকতে বলতে পারিনা!!) এবং মুক্তমনার অনেক প্রবন্ধ থেকে আমরা অনেক কিছুই শিখেছি। সে কারণে এখনো আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু এটাও ঠিক যে- আপনার আগের(মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান) ও এই পোস্টের আলোচনায় সে কৃতজ্ঞতা না কমলেও- আপনার ব্যাপারে সামান্য হলেও বিরক্তিও তৈরি হয়েছে, সেই বিরক্তিটুকু সম্পূর্ণ পরিহার করে আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারিনি এটা স্বীকার করছি, এবং কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করছি।

সবাইকে ধন্যবাদ, সাথে অভিজিৎ কে আবারো আন্তরিক ধন্যবাদ- বিষয়টিতে এত আলোচনার সুযোগ দেয়ার জন্য।

tanmoy এর ছবি

সব comment ও লেখাগুলো পড়লাম।মনে হয় না এই debate আর বেশিদুর এগোবে। AVIJIT বাবুর এভাবে ভুল ব্যাখ্যা দেয়াটা সত্যি খারাপ লাগলো।

দিনমজুর এর মন্তব্য -----

" বিজ্ঞানকে আদর্শবাদ থেকে মুক্ত রাখতে চান ভালো কথা, ব্যক্তিজীবনে অন্তত আপনার কাছে কিছু এথিকস তো আশা করতেই পারি। "

--------সহমত।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA