একলব্যের দেশে

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ০৯/০১/২০০৮ - ৪:৪১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অস্ত্রশিক্ষক দ্রোণাচার্য্য। সে যুগের প্রায় সকল বীর যোদ্ধা তাঁরই শিষ্য। বীর দর্পে তার শিষ্যরা শত্রুবদে উন্মত্ত। তার শেখানো যুদ্ধ কৌশলে তার শিষ্য একে একে পরাস্ত করছে শত্রুপক্ষকে। কিন্তু একটি বালক যেন হয়ে উঠেছে অপরাজেয়। দ্রোণাচার্য্য মনে মনে ভাবেন, কে এই তীরন্দাজ বালক? যার তীর কখনোই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না। কেই বা এর অস্ত্র শিক্ষক?

যুদ্ধ বিরতীতে একদিন দ্রোণাচার্য্য ডাকলেন সেই বীর তীরন্দাজ কে। বীর যোদ্ধা সম্ভ্রমের সাথে উপস্থিত হলেন দ্রোনাচার্য্যের সামনে। দাড়িয়ে রইলেন নত শীরে। দ্রোনাচার্য্য জানতে চাইলেন বীর যোদ্ধার নাম।
একলব্য। বালকের উত্তর। দ্রোণাচার্য্য বললেন ''আমি তোমার যুদ্ধ কৌশল দেখেছি। অপূর্ব !! আমি জানতে চাইছি কে তোমার অস্ত্র শিক্ষক?''
এই প্রশ্নে কিছুটা থমকে যান দ্রোনাচার্য্য। স্মৃতি খুজেঁ তিনি তার শিষ্যদের মাঝে এই বালকের অবস্থান খুজে পেলেননা। বালকে বললেন,'' আমারতো মনে হয়না আমি কখনো তোমাকে অস্ত্র শিক্ষা দিয়েছি। তুমি কেন আমার সাথে মিথ্যে বলছো, জানো এর জন্য তোমার কঠিন শাস্থি আমি দিতে পারি''
বালক একলব্য বিনীত ভাবে উত্তর দিলো,'' আপনিই আমার গুরু, আপনার কাছ থেকেই আমি অস্ত্র শিক্ষা নিয়েছি, তবে সরাসরি নয়। আপনি যখন আপনার প্রিয় শিষ্যদের যুদ্ধ শিক্ষা দিতেন আমি তখন লুকিয়ে থেকে আপনার কৌশল রপ্ত করেছি। তাই আপনিই আমার গুরু, আমার অস্ত্র শিক্ষক।''
বীর বালকের এই উত্তর শুনে দ্রেণাচার্য্য কি বলবেন ভেবে পেলেন না। শত্রু পক্ষের এই বীর বালককে তার আগামী দিনের ভয়। গম্ভীর কন্ঠে দ্রোণাচার্য্য বললেন,'' তুমি যদি আমার কাছ থেকে যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে থাকো তবে তুমি অপরাধ করেছো এখনো আমাকে গুরু দক্ষিণা না দিয়ে। আমাকে গুরু দক্ষিনা না দিয়ে তুমি কিভাবে সেই কৌশল প্রয়োগ করছো?''
বীর বালক একলব্য জানতে চাইলো,সে এখনি গুরু দক্ষিণা দিতে রাজী আছে, কিন্তু সে কি গুরু দক্ষিণা দেবে?
দ্রোণাচার্য্য চিন্তামগ্ন কন্ঠে বললেন,'' যে দুটি আঙ্গুল দিয়ে তুমি তীর ছোড়, সেই দুটি আঙ্গুল আমাকে গুরুদক্ষিণা দাও।''
বালক একলব্য কোন বাক্যব্যয় না করে নিজের হাতের সেই দুটি আঙ্গুল কেটে দুক্ষিণা দিলো গুরুর চরণে। যে শিক্ষকের শিক্ষা তাকে বানিয়েছিলো বীর তীরন্দাজ,আজ সেই শিক্ষককেই শিক্ষার মূল্য দিয়ে সে হয়ে গেলো যুদ্ধ ক্ষেত্রের অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধা।
গল্পটা মহাভারতের একটি অংশ।আজ আমার হটাৎ করেই মনে হলো এই গল্পটা । কেউ হয়তো ভাবছেন আমি চার উপদেষ্টাকে একলব্য ভাবছি,আবার অনেকেই হয়তো তাদের এক একজন দ্রেনাচার্য্য ভাবছেন।
আমি ভাবি, আমাদের এই ব-দ্বীপে হাজারো একলব্য জন্মেছে যারা এমনি দ্রোণাচার্য্য কে বলি দিয়েছেন তাদের শৌর্য্য।
কখনো স্বইচ্ছায় কখনো অনিচ্ছায়।অনেক্ই হয়তো বলবেন এমন ঘটনা শুধু আমাদের দেশে কেন, সব দেশেই হচ্ছে। আমি মানছি কিন্তু আমার মাতৃভূমি বলেই হয়তো চিন্তায় এমন অহেতুক বাড়াবাড়ি।
আমার কাঁচা হাতের লেখায় আমি জানিনা আমার চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে কিনা, তবে আমি সম্মানিত ব্লগারদের অনুরোধ করছি, আপনাদের সুচিন্তিত মতামতে জানাবেন, আমাদের একলব্যের দেশে কারা একলব্য আর কারা দ্রোণাচার্য্য অথবা আসলেই কি আমার দেশ লক্ষ্য একলব্যের?

.................................প্রীয়ক


মন্তব্য

রানা মেহের এর ছবি

এইসব উপদেষ্টাদের আসলে একলব্যের মতো
মুগ্ধ শিশুর সাথে তুলনা করা ঠিক না।
দ্রোনাচারয?
তাদের অনুসারী হতে চাইবে না পাগল এবং শিশুও।

তবে একলব্য অজস্র ছড়ানো আমাদের দেশে।
জামাতের বাচ্চা ছেলেগুলো।
যারা পারটির কথায়
এক কথায় দেশ অস্বীকার করে
তাদের আমার হতভাগ্য একলব্য ছাড়া কিছুই মনে হয়না।

প্রীয়ক,
আপনার হাত কাচা কিনা জানিনা।
কিন্তু আপনি লেখেন সুন্দর।
আর কারো অপেক্ষা না করে আপনিই লিখুন না।
আমি নিশ্চিত। ভালো হবে

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

হিমু এর ছবি

গল্পটা ঠিক এমন না।

একলব্য ছিলো নিষাদপুত্র, মানে বুনো শিকারীদের ছেলে। দ্রোণের কাছ থেকে সে কোন শিক্ষাও নেয়নি, কেবল জানতো দ্রোণাচার্য মস্তবড় অস্ত্রবিৎ। একলব্যে বনে নিজের মতো করে চর্চা করতো।

একবার কুরু-পান্ডব ছাত্রদের নিয়ে দ্রোণ বনে গিয়ে দেখলেন, এক বালক সেখানে একমনে শরবিদ্যা চর্চা করছে। তাকে দেখে পান্ডবদের একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। একলব্য ফিরে না তাকিয়ে, শুধু শব্দ শুনে তীর ছুঁড়ে সেই কুকুরটিকে ঘায়েল করে।

শব্দভেদ! এই বিদ্যা দ্রোণাচার্য ছাড়া আর কেউ জানেন না, এই বিদ্যা কাউকে শেখানোর ইচ্ছেও দ্রোণাচার্যের নেই। তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন, এক নিষাদের ছেলে কিভাবে এই বিদ্যা আয়ত্ব করলো। আর অর্জুন হিংসায় জ্বলে উঠলো, কারণ দ্রোণাচার্যের সেরা ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও এ বিদ্যা তার নাগালের বাইরে।

অর্জুন গোমড়া মুখে গিয়ে দ্রোণকে তার বাসনার কথা জানায়। রাজার ছেলেকে চটাতে চান না দ্রোণ, সেই সাথে এই আশ্চর্য শব্দভেদবিদ্যা আর কারো আয়ত্বে থাকুক, তা-ও তিনি চান না। বালক অর্জুনের বায়না তিনি পূরণ করেন, কর্কশ দাবি করেন একলব্যের কাছে। একলব্য বাধ্য শিষ্যের মতো নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দ্রোণকে নিবেদন করে। বেচারার ক্যারিয়ারটাই খতম হলো সাথে সাথে।

তবে দ্রোণ অর্জুনের শব্দভেদবিদ্যালাভ ঠেকাতে পারেননি। পাচকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পান্ডবদের কখনো অন্ধকারে খেতে দিও না। তার এ নির্দেশ বেখেয়ালে অমান্য করে এক পাচক, অন্ধকারে খেতে বসে অর্জুন আশ্চর্য হয়ে দেখে, আলো ছাড়াও সে দিব্যি খেয়ে যেতে পারছে। তাহলে না দেখে লক্ষভেদের রহস্য তবে এ-ই, চর্চা? অর্জুন পরে অন্ধকারে নিজের মতো করে শরক্ষেপ চর্চা করতে থাকে শব্দ শুনে।


হাঁটুপানির জলদস্যু

অভিজিৎ এর ছবি

হ্যা, আমিও ঠিক এ কথাগুলোই লিখতে চাচ্ছিলাম। তবে প্রথমে একটা ব্যাপার বাদ পড়েছে। "(একলব্য) দ্রোণের কাছ থেকে সে কোন শিক্ষাও নেয়নি, কেবল জানতো দ্রোণাচার্য মস্তবড় অস্ত্রবিৎ। একলব্যে বনে নিজের মতো করে চর্চা করতো।"
ব্যাপারটা এত নির্দোষ ছিল না। বরং নিষাদ পুত্র (ছোট জাত) বলে দ্রোণ একলব্যকে শিস্য হিসেবে নিতে অপারগ হন, সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। প্রত্যাখ্যাত একলব্য বনে চলে যায়, দ্রোনের একটা মূর্তি গড়ে নিজে নিজেই ধণুবিদ্যা শিখতে থাকে নিজের মত করে। ভেব নিয়েছিল দ্রোণের কাছেই অস্ত্র বিদ্যা শিখছে .মুর্তির সামনে বেল পাতা ফুল ফল দিয়ে .. ঐ ট্র্যাডিশনাল ভারতীয় গুরু ভক্তি আর কি! আর ওই ভক্তিকে পূঁজি করেই দ্রোন পরে একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল দক্ষিণা স্বরূপ কেটে নেন - প্রিয় শিস্য অর্জুনকে উর্ধে রাখতে।

যা হোক মহাভারতের এই গল্পটায় একটা সুক্ষ উপদেশ আছে। ছোটজাতের লোকজনের বিদ্যাবর্চা করা ঠিক না। বুড়া আঙ্গুল কাটা যায় তাতে। এরকমই একটা ঘটনা রামায়নেও আছে। বেদ পাঠ করার 'অপরাধে' রাম শম্বুকের কল্লা ছেদ করেন তার তথাকথিত 'রাম রাজ্যে'।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

কনফুসিয়াস এর ছবি

অভিজিৎ-এর মত করেই জানা ছিলো আমার কাহিনিটা।

-----------------------------------
যা দেখি তা-ই বলি...

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

অতিথি লেখক এর ছবি

সবাইকে ধন্যবাদ মন্তব্য করার জন্য।

আমার এই পোস্টের মূল উদ্দেশ্যটি দ্রোণাচার্য্য সংক্রান্ত নয় মোটেই। তিনি কিরূপে একলব্যের আঙ্গুল কাটিয়া লইলেন এবং এইক্ষেত্রে তাহার প্রকৃত উদ্দেশ্য কিইবা ছিল, তাহা তুলিয়া ধরিবার উদ্দেশ্যে এই পোস্টটি লিখিত হয় নাই।

মহাভারতের এই গল্পটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করা এই পোস্টের উদ্দেশ্য ছিল না মোটেও, যদিও মহাভারতের এই গল্পটি আমি নিজেই অতীব চমৎকাররূপে বিস্তারিত জানি।

একলব্যের দেশে কারা একলব্য আর কারা দ্রোণাচার্য্য - এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজিবার নিমিত্তে ব্লগারদের তাহাদের মতামত জানাইবার অনুরোধ জানাইয়াছিলাম। আমি কৃতার্থ সে ডাকে সাড়া না পেলেও তাহারা আমাকে পুনরায় দ্রোণাচার্য্য ও একলব্যের গল্পটি পুনরায় শুনাইয়া দিলেন।

-----------------------------প্রীয়ক

অতিথি লেখক এর ছবি

রানা মেহের কে ধন্যবাদ উৎসাহ দেবার জন্য।
আমরা জীবনের প্রতি মুহুর্তে যে ভুল সবসময় করি সেটা হচ্ছে সঠিক সময়ে সঠিক মানুষ চিনতে পারিনা। আমি উপমা, উদাহরনে সেই সব মানুষ কে চিনতে চাই। চারিদিকে এত মুখোশ পড়া মানুষরে বসবাস যে তাদের চিনতে প্রিয়জনদের আশ্রয় নিতে হয়।

আজ যারা আমার / আমাদের অহংকার মুক্তিযুদ্ধ কে রূপকথা বলে চালিয়ে দিতে চায়, কখনো কখনো অস্বীকার করার ভান করে, আমি কি করে তাদের চিনব?

কোন গল্প কথা নয়, তুলনার ছকে ফেলে আমি শুধু মানুষ এর আসল রূপ চনিতে চাই।

ব্লগার দের তাই অনুরোধ করেছিলাম , আমাকে সাহায্য করতে।
আবারো ধন্যবাদ রানা'কে উৎসাহ দেবার জন্য।

.......................প্রীয়ক

রানা মেহের এর ছবি

প্রীয়ক
পাল্টা ধন্যবাদ।
হিমু - অভিজিত কাউকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনিনা।
তবে এইটুকু নিশ্চিত
তারা কেউ আপনাকে পড়াশোনা জাহির করার জন্য
এসব বলেননি।

আসলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের
একলব্য নিয়ে একরকম আবেগ আছে।
একটা মানুষ কীভাবে সমস্ত বীরত্ব তুচ্ছ করে
সাধারনের বীর হয়ে গেল।

সম্ভবত এজন্যেই একলব্যের কাহিনী তারা
পরিষ্কার করে বলেছেন।
যারা একলব্যকে জানেন না।
তারা আপনার লেখা টা পড়ে
তাকে ভুল কিংবা অসম্পুরন জানার সম্ভাবনা ছিল।
তারা সেই অসম্পুরন কাজটা শেষ করলেন।

নিয়মিত লিখুন প্রীয়ক

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।