যন্ত্রকৌশল বন্দনা(যন্ত্রনা)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০৩/০১/২০১১ - ১০:৫২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(নিচের লেখাটি বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে সদ্য ভর্তিকৃত এক অথর্ব ছাত্রের প্রেক্ষাপট হইতে রচিত হইলেও, দেশের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন বিভাগের ঈদৃশ ছাত্রগণ তাহাদের নিজেদের এইখানে সম্যকরুপে খুঁজিয়া পাইবার অবকাশ রহিয়াছে)

মনেতে অতিশয় ইচ্ছা আছিল জগদ্বিখ্যাত যন্ত্রকৌশলী হইয়া সংসারতন্ত্র, মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিব। উচ্চমার্গীয় রকেট বানাইয়া, উহার পুচ্ছদেশে এক গুচ্ছ আগুন ধরাইয়া, ধরিত্রীর মায়া তুচ্ছ করিয়া, মঙ্গল পানে উড়িয়া যাইবার কৃচ্ছ্র সাধন করিব; কিম্বা অতি আড়ম্বড় কলের গাড়িতে গতির ঝড় তুলিয়া, পূর্বাপর সকল রেকর্ডরে মড়মড় করিয়া ভাঙ্গিয়া তরতর করি শিকাগ্রে তুলিব। নতুবা অঙ্গতন্ত্রহীন এমন এক যন্ত্রমানব বানাইব যাহার স্বতন্ত্র মহিমায় সকলের চক্ষু অতন্দ্র ও বাকযন্ত্র রন্ধ্রহীন হইয়া পড়িবে। এইরুপে স্বপ্নের ভেলায় ভাসিয়া, অবিমৃশ্য-হাসি হাসিয়া, জোরকদমে আসিয়া, অতপর ফাঁসিয়া গেলাম আজকের এই বুয়েট-যন্ত্রে।

হলেতে অত্যাশর্যভাবে বিনা ক্লেশে সিট পাইলেও, উপরিহিসাবে পাইলাম সরেশ ছারপোকাদের ঊষ্ণতম অভ্যর্থনা আর কদাকার মাকড়সাদের শৈল্পিক বুননের নয়নাভিরাম নমুনা। ক্যাম্পাসে প্রথম দিনই র‍্যাগিং নামক একপ্রকার অতি সামাজিক প্রক্রিয়ায় কতিপয় দাদা আমাকে নিতান্তই হাঁদা বানাইয়া ছাড়িলেন। তবুও শ্রেণীকক্ষে নূতন সহপাঠিদের বৈচিত্র্যে(সহপাঠিনীদের সহ), মনেতে বিচিত্র আনন্দ চিত্রিত হইল যেন। শুরু হইতেই কলেজ-উত্তীর্ণ কর্নবিবরে, শিক্ষক প্রবরের কোন কথাই যেন ঢুকিতে চাহিত না। প্রথম বেঞ্চিতে উপবিষ্ট, বিদ্যাভারক্লিষ্ট, বিশিষ্ট মাথামোটাগুলি অতিশিষ্ট সুবোধ বালকের ন্যায় কিরুপে টিচারের লেকচার নির্বিকারে আকছার গিলিয়া যাইত, তাহা দেখিয়াই নাচার হইয়া পড়িতাম।

দিন যতই যাইতে লাগিল, বিভীষিকার ব্যাপ্তি ততই বিস্তৃত হইতে থাকিল। পরিচিত হইলাম মেকানিকাল ড্রইং নামক এক অপার্থিব অঙ্কন প্রক্রিয়ার সহিত, যাহার দৌরাত্ম্যে আত্মা অগত্যা লাপাত্তা হইবার যোগাড়। মেশিন শপে যখন ঢুকিলাম, তখন অন্ধকারের অতিমাত্র্যে বুঝিতে পারিলাম না ইহা শ্মশান নাকি ভাগাড় নাকি খোঁয়াড়।প্রতিটি ব্যবহারিক প্রক্রিয়াকে আমার নিতান্তই অব্যবহারিক ও প্রয়োজনীয় প্রতিটি প্রহরের প্রতিসংহরণ বলিয়াই মনে হইত। পরের টার্মে যখন কম্পিউতার নামক যাদুযন্ত্রটির সামনে অথর্বের ন্যায় গাঁড়িয়া বসিয়া, দুর্বোধ্য কিছু শব্দ উপচয় করার চেষ্টায় সময় অপচয় করিতাম- বিনিময়ে পাইতাম গুরুজীর ভুরু-কুঞ্চিত ভৎসনা, তখন মনে মনে ইহাদের আবিষ্কর্তা অপদার্থ প্রোগ্রামারগুলিরে কষিয়া গালাগাল দিয়া স্বীয় ক্লেশ শুষিয়া লইতেই ব্রত হইতাম।

ভীতিপ্রদ এইসকল ঘটনার ঘনঘটা যেন কাটিতে চাহিত না। সি.টি ও কুইজ নামক আরও দুটি প্রেষনমূলক প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত চাপাতির ন্যায় যখন প্রসবিত হইতে থাকি, তখন অপ্রসন্ন অদৃষ্টে সদয় দৃষ্টি দিবার ধৃষ্টতা আর দেখাইনা। খুঁজিতে থাকি নিষ্কৃতির পথ। খুজিতে খুজিতে, কিছু না বুঝিতেই, নিজেরে খুজিয়া পাই টার্ম ফাইনাল নামক যুঝিবার-প্রান্তরে। সপ্তাহকালের বন্ধ!! তাই মহানন্দে অন্ধ হইয়া সপ্তাহান্তে অতিমন্দ প্রশ্নপত্র যখন অশনির গন্ধ ছড়ায়, তখন ভাবী বিভীষিকায় বশীভুত হইয়া রন্ধ্রপথে মন্দ্ররব ধ্বনিত হইতে থাকে। উত্তর করিবার চাইতে তাহা ছাড়িবার প্রতিযোগিতায় মগ্ন হওয়া, অতঃপর ভগ্নচিত্তে শেষলগ্নে হল ছাড়িয়া আসা, এই হয় নিতিকার তিথিকৃত্য।

এই বিয়োগান্ত নাট্যপরিক্রমার শেষে দেবু বাবু সাজিয়া, তথৈবচ ফলপত্র হাতে লইয়া যখন ম্লানমুখে উপদেষ্টার সম্মুখে উপবিষ্ট হইতে হয়, তখন মঞ্চস্থ করিবার একটি দৃশ্যই অবশিষ্ট থাকে। অবয়বে কৃত্রিম লজ্জার আবির্ভাব ঘটাইয়া, অধরে একপ্রস্থ স্মিতরেখা বিস্তার করিয়া, চিরাচরিত চাটুকার-ধর্মের পরাকাষ্ঠায় পৌঁছাইয়া, ভাঁড়ের ন্যায় বলিতে হয় “মহাশয়, আমি এই ফলাফলে সন্তুষ্ট নহি, ভবিষ্যতে অত্যধিক ভালো করিতে সংকল্প‘গ্রস্থ’ ”।

কিন্তু সেই ভবিষ্যত, পরম ভবিষ্যত...

(প্রথম বর্ষে থাকাকালীন রচিত এবং কেবলমাত্র নিজস্ব ফেসবুকীয় খেরোখাতার 'নোটস' এ প্রকাশিত)

ধৈবত


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাল বলেছেন। কিন্তু শেষের দিকে এসে কেন যেন একঘেয়েমি এশে পড়ে, মনোটোনাস লাগে।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ, লেখা শেষের দিকে এসে একঘেঁয়ে লাগলে আমারই দোষ মন খারাপ । তবে তৃতীয় আর চতুর্থ বর্ষের সন্ধিক্ষনে আছি, আমি। ক্লাসগুলো সেই প্রথম দিন থেকেই একঘেঁয়ে লাগলেও সমস্ত আবহ, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা, প্রক্সি এডভেঞ্চার এসবের কিছুই এপর্যন্ত একঘেঁয়ে লাগেনি দেঁতো হাসি

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

আর কি কহিব??? এ যে রীতিমত শব্দের অপার্থিব মায়াজাল; ধৈবত গুরুর চরণে দশাসই দু-দশ ঐরাবত আকৃতির স্তুতিবাক্য আনিয়া ফেলিলেও তাহার এহেন শানের কিঞ্চিত সমতুল্য হইবে না।

-অতীত

অতিথি লেখক এর ছবি

গরুর চরনে তো ঐরাবত রাখিতে হয় না, ঘাস কিম্বা গুল্মলতা রাখিতে হয়, যাহাতে উহাদের গলধঃকরন করিয়া ঘটে কিছু বুদ্ধি গজায় দেঁতো হাসি ।। গুরু অতীত দা কে ধন্যবাদ।

ধৈবত

mef এর ছবি

ডিপার্টমেন্ট অফ মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং
ডি.ও.এম.ই ..." হাউস অব ডোম"
অথবা "বয়লার "
পড়েছো মোগলের হাতে...
ব্যাপক সহানুভূতি

অতিথি লেখক এর ছবি

দেঁতো হাসি
ধন্যবাদ আপনাকে

ধৈবত

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

পূর্বেই এই বস্তু গলাধঃকরণ করিয়াছিলুম। লোটা হইতে আরো নির্গমনাও বাছা। পরীক্ষে একটি ভ্রান্ত ধারমা।

_________________________________________

সেরিওজা

অতিথি লেখক এর ছবি

পুস্তকপত্র চুলায় চড়াইয়া তাড়াতাড়ি আরেকখানি 'ব্যাডভেঞ্চার' উগরাইয়া দে। উত্তরপত্রে যদি ইসপিরিং, দঁড়ি- রশির ধৈর্ঘ্য, পুরুত্ব ইত্যাদি ঠিকমত মাপজোঁক করিতে না পারি তাহলে তোর 'ব্যাডভেঞ্চার' আদ্যপন্ত লিখিয়া দিয়াই শিক্ষকগনেরে পুলকিত করিয়া আসিব।

ধৈবত

ওসিরিস এর ছবি

দুলাইন পরেই বুঝেছিলাম এ ভাই আপনি। আগে পড়ি নাই লেখাটা, পড়লাম, সমবেদনা নিজেদের জন্য।
_______________________________________________
সিগনেচার কই??? আমি ভাই শিক্ষিৎ নই। চলবে টিপসই???

অতিথি লেখক এর ছবি

বুঝিয়া যাইবার পরেও, দাঁতে ঠোঁট কামড়াইয়া ক্লেশিত হইয়া পড়িয়া যাইবার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। সমবেদনায় সহমত।

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

সিরাম স্যার।
আরো আসুক। আসতেই থাকুক।

সাত্যকি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধইন্যা, দাদা

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

তুই মানুষ না শালা।
তুই ভীনগ্রহের প্রাণী।
এতো চমৎকার লিখিস ক্যাম্নে? তোরে ১০০১টা মাইনাচ

---আশফাক আহমেদ

অতিথি লেখক এর ছবি

আমি যে জুপিটার গ্রহের প্রাণী সাবু , তুই বুজলি কিভাবে অ্যাঁ
মাইনাচ খাইয়া তো সাইনাচের প্রব্লেম উইঠা গেল। আর লিখুম না...তার্মায়রেবাপ দেঁতো হাসি

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

আমারও উচ্চমার্গীয় কোন রকেট বানাইয়া, উহার পুচ্ছদেশে তোকে বাধিয়া, ধরিত্রীর মায়া তুচ্ছ করিয়া, মঙ্গল পানে উড়াইয়া দিবার কৃচ্ছ্র সাধন করিতে মন চায়! শয়তানী হাসি

তোকে "বিশেষ অঙ্গতন্ত্রহীন" কোন এক যন্ত্রমানব বলিয়া আমার ধারণা হয়।। গুরু গুরু

দৃপ্র

অতিথি লেখক এর ছবি

তোকে "বিশেষ অঙ্গতন্ত্রহীন" কোন এক যন্ত্রমানব বলিয়া আমার ধারণা হয়।।
রেগে টং রেগে টং
অশ্লীষ!! তোর মন্তব্য সচলাডুদের ব্যান করা উচিত দেঁতো হাসি
আশা করি তোর লেখা সত্বর আসিবে, শুভকামনা থাকিল

ধৈবত

ব্যঙের ছাতা এর ছবি

গড়াগড়ি দিয়া হাসি
মারাত্মক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।