বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নদী খনন -২

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শনি, ০৭/০৪/২০১২ - ১০:১৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পর্ব-১ এ নদী খনন কি এবং কেন প্রয়োজন এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্বে থাকছে বাংলাদেশের নদী খননের বিবেচ্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা।

আলোচনায় যাওয়ার আগে নদী খননের প্রকারভেদ একটু জেনে নেই। নদী খনন মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে।

প্রারম্ভিক এবং প্রধান খনন (ক্যাপিটাল ড্রেজিং)
রক্ষণাবেক্ষন খনন (মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং)

পলি জমে মৃতপ্রায় নদীর পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য কিংবা নতুন নতুন পানি প্রবাহের পথ তৈরীর জন্য প্রথম যে বড় ধরনের খনন করা হয় তাই ক্যাপিটাল ড্রেজিং। আর খননকৃত নদীপথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে খনন করা হয় তে হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষন খনন।

নদীখনন শুরুর আগে বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কি পরিমান পলি অপসারন করা হবে তা নির্নয় করা জরুরি কেননা প্রতি একক আয়তন অপসারিত পলির উপরই খনন খরচ নির্ধারিত হয়। সেই সাথে খননের পরিমান বেশি হলে তা কার্যকর করার মত প্রয়োজনীয় সংখ্যক ড্রেজার(খননকারী যন্ত্র) আমাদের দেশে আছে নাকি তাও নজরে আনতে হয়। আমাদের দেশে মূলত দু’টি সরকারি প্রতিষ্ঠান নদীখনন নিয়ে কাজ করে। এরা হচ্ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বি.আই.ডাব্লিউ.টি.এ) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বি.ডাব্লিউ.ডি.বি)। এদের মধ্যে বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ মূলত নদী পথের নাব্যতা রক্ষার জন্য খনন করে থাকে। অপরদিকে বি.ডব্লিউ.ডি.বি নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করে মৃতপ্রায় কোনো নদী রক্ষার জন্য কিংবা কোনো নতুন পথ তৈরীর জন্য খনন কাজ পরিচালনা করে থাকে। হতাশার কথা এই যে আমাদের মতো নদীবিধৌত দেশে নদী খননের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ড্রেজার নেই আর যেগুলো আছে তা বেশির ভাগই অত্যন্ত পুরোনো।সে কারনে বড় ধরনের ড্রেজিং এর জন্য আমাদেরকে বিদেশী প্রতিষ্ঠান এর উপর নির্ভর করতে হয় আর তাতে খরচ বহুলাংশে বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের মাধ্যমে খননকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে হয়।গড়াই নদীর বর্তমান খনন কাজে নিয়োজিত আছে একটি চীনা সংস্হা এবং যতদূর মনে পড়ে প্রস্তাবিত যমুনা নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের খনন কাজ এরাই করবে।

যাই হোক, আবার পূর্বের আলোচনায় ফিরে আসি। পলির পরিমান ছাড়াও নদীখননের জন্য অনেক গুলো প্রযুক্তিগত দিক নির্ধারন করতে হয়। নদী খনন মূলত পুরো নদী জুড়ে হয়না। খনন করে নদীর মধ্যে একটা গভীরপথ তৈরী করা হয়। নদী খনন এর পূর্বে খনন বিন্যাস (ড্রেজিং এলাইনমেন্ট), খনন সেকশন নির্ধারন আর খননকৃত পলি কোথায় ফালানো হবে তা বের করা জরুরি। কোন বিন্যাসে খনন হলে নদীতে সবচেয়ে বেশি পরিমান পানি আসবে এবং কম পলি জমা হবে তা গানিতিক বা কাঠামোগত মডেলিং এর মাধ্যমে নির্ধারন করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীখননের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহয়তা মূলত আই.ডাব্লিউ.এম আর কাছ থেকে নিয়ে থাকে।

একটা সত্য গল্প দিয়ে আজকে শেষ করছি। পূর্ববর্তী পর্বে বলেছি যে, বর্তমানে চলমান গড়াই নদী খনন প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সকল প্রযুক্তিগত নির্দেশনা দিচ্ছে আই.ডাব্লিউ.এম। তো গল্পটা শুরু করি। গড়াই নদীর জন্য তৈরী গানিতিক মডেলে দেখা যায় যে, যদি গড়াই এর ডান তীরে পদ্মা-গড়াই এর সংযোগস্হলে গ্রোয়েন ( পানির প্রবাহের দিক পরিবর্তেন জন্য যে কাঠামো নদীতে নির্মান করা হয়) নির্মান করা যায়, তাহলে নদী খননের পর শুষ্ক মৌসুমের গড়াই এর পানি প্রবাহ ৫-১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তো আমরা পরিকল্পনা করি যে, যদি খননকৃত পলি দূরে বা তীরে না ফেলে, গড়াই এর ডান তীরে পদ্মা-গড়াই এর সংযোগস্হলে নিয়মানুসারে ফালানো যায় তাহলে তা কিছুটা হলেও গ্রোয়েন এর মত কাজ করবে এবং পদ্মার পানির পথ গড়াই এর দিকে যাবে। তে পরিকল্পনামাফিক খনন পরিচালনাকারী চীনা প্রতিষ্ঠানটি খননকৃত পলি পদ্মা-গড়াই এর সংযোগস্হলে গড়াই এর ডান তীর ঘেসে ফালানো শুরু করে। কিন্তু পরেরদিনই আলোচনার বিষয় হয়ে যায় “কোটি টাকা খরচ করে নদীর মাটি আবার নদীতেই ফেলা হচ্ছে”। ফলশ্রুতিতে এই পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হয়। আমার এই গল্পের উদ্দেশ্য ছিলো যে, বাংলাদেশের নদীখননে বাইরের হস্তক্ষেপ খুব নেতিবাচক একটা দিক। প্রযুক্তিগত ব্যাপারগুলোতে না বুঝে অযথা হস্তক্ষেপ কাজের মান কমিয়ে দেয় এতে কোনো সন্দেহ নাই।

আগামী পর্বে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প গুলতো আমাদের দেশে কি কি সমস্যা হয়ে থাকে তা নিয়ে আলোচনা থাকছে। সেই সাথে বাংলাদেশে খননকাজ পরিচালনাকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠান গুলোর কাজের মান নিয়েও আলোচনা থাকবে।

ইশতিয়াক


মন্তব্য

সচল জাহিদ এর ছবি

ইশতিয়াক, চমৎকার চলছে। পর্বগুলো আরেকটু বড় করো পারলে।

গড়াই নদীত অনেক আগে সাবমার্জড ভেইন বা বটম ভেইন দিয়ে এর উৎসতে ( মানে যে পয়েন্টে এটি গঙ্গা থেকে পানি পায়) পলি অপসারনের পরিকল্পনা ও ব্যাপক স্টাডি হয়েছিল। আমি নিজে এই ভেইন নিয়ে এমএস করার সময় রিভিউ করেছিলাম এইসব, মনে হয় বাস্তবায়ন হয়নি।

আমি যতটুকু জানি গঙ্গা ব্যারাজের একটি প্রধান উদ্দেশ্য গড়াই ও অন্যান্ন দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে ফ্ল্যাশ করে আবার নাব্যতা ফিরিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে গঙ্গা ব্যারাজে পরিকল্পনাধীন থাকার পরেও গড়াই নদীর এই ড্রেজিং প্রকল্প কতটুকু যৌক্তিক সেটি বিতর্কের দাবী রাখে। সেই সাথে গ্রোয়েনের হেডে যে পরিমান স্কাওয়ার হবার কথা তাতে পলি দিয়ে তৈরী প্রাকৃতিক গ্রোয়েন কতটুকু কার্যকরী হবে সেটা নিয়ে ভৌত মডেল স্টাডি না করে নিশ্চিত হওয়া মনে হয় সমীচিন হবেনা।

কপোতাক্ষ নদীর একটি ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প ছিল আই ডব্লিও এম এর। পারলে সেই প্রকল্প নিয়ে কিছু তথ্য দিও।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

ইশতিয়াক এর ছবি

বর্তমানে একটা স্টাডি চলছে বিশ্ব ব্যাংক এর অর্থায়নে "গড়াই অফটেক ম্যানেজমেন্ট" নামক।এখানে বটম ভেইন, সিরিজ গ্রোয়েন, আর গাইড বাধ এর অপশন গুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। আপনি যে প্রকল্পের কথা বলছেন, ওটায় কাজ করেছিলো ডাচ কোম্পানি।
আপনার কথা ঠিক। প্রাকৃতিক গ্রোয়েন কখনোই ঠিক ভাবে কাজ করবেনা। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো পলি ফেলে (অনেকটা সাবমার্জড গ্রোয়েন এর মত) যদি কিছুটা হলেও শুরুতে ডাইভারশন বাড়ানো যায় তবে ড্রেজড চ্যানেলএ পারতপক্ষে নতুন করে পলি জমার পরিমান কমবে কেননা বর্তমানে গড়াই পানির প্রবাহ ভয়াবহ রকমের কম।

গঙ্গা ব্যারেজ একটা দীর্ঘস্হায়ী প্রকল্প। নির্মান কাজ কবে শুরু হবে তা অনিশ্চিত আর শুরু হলেও তার নির্মান সময় ১০ বছরের কম হবেনা। আর ফান্ডিংও নিশ্চিত না। আর আপনি তো জানেন গঙ্গা ব্যারেজ এর ক্যানাল হেড রেগুলেটর হবে গড়াই। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত পানি পরিবহন ড্রেজিং ছাড়া গড়াইতে সম্ভব বলে মনে হয়না। মজার ব্যাপার হচ্ছে উল্টো আমার মনে হয় অফটেক ম্যানেজমেন্ট এর যে নতুন প্রকল্প চলছে তার নিরর্থক কেননা গড়াই ক্যানেল হেড রেগুলেটর হিসেবে কাজ করলে তখন আর গড়াই এর অফটেকে আলাদা কোনো কাঠামোর দরকার হয়না।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।