কুঞ্ছে যাও গো বাবু ?

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ১০/০৪/২০১৩ - ১০:৪২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(এক ধরনের ছোটো গল্প আছে যেগুলো বুক পকেটে দু টাকার নোটের সাথে ভাঁজ করে রেখে দেয়া যায় সাবলীল, হুট করে সকাল বা বিকেলের এক কাপ চা এর সাথেই পড়ে ফ্যালা যায় অল্প সময়েই। এই গল্পগুলোকে আমি বলি 'পকেট গল্প' এটা সেরকম ই এক পকেট গল্প )

এরকমই কোন এক দিনের শঙ্খচিলের ডানায় ভর করা ভোরে, আমার জানালার কালোমুখো হুনুমানগুলোকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ সাহেবী বেশে আমি লাক্কাতুড়া টী স্টেট এ জগিং করছিলাম, (জগিং না বলে ছোট দৌড়ানি বলা শ্রেয়) আমার অবিবাহিত স্ত্রীর বুকের মত ছোট ছোট টিলা ভেদ করে নদীর মত পথ বা আধাপথ ধরে চলতে চলতে হঠাত কোন নীল কাঠঠোকরার ডানার ঝাপ্টায় থেমে গেছি মাঝে মাঝে, চা বাগানের স্থায়ী বাসিন্দা দু এক খানা শেয়ালের সাথে কদাচিৎ দ্যাখা হয়ে গেলে কিছু হাই হ্যালোর পর্বও সেরে নিয়েছি। উদার চ্যারিটির মত নীল রঙ ঢেলে আকশ সবুজ করেছে যে চা বাগান কে , তার বুকে পা রেখে আমি দুকানে মোজার্টের ডিস্কোগ্রাফী ছেড়ে অসংলগ্ন হাফ প্যান্ট পরা এক তরতাজা যুবক মাথায় বদলেয়ার এর ‘গেট ড্রাঙ্ক’ আউড়াতে আউড়াতে ছুটতে থাকি।

“Get Drunk and stay that way.on what?
On wine, poetry, virtue, whatever.
But get drunk.
And if you sometimes wake up
on the porches of a palace,
in the green grass of a ditch,
your drunkenness gone or disappearing,
Ask the wind, the wave, the star, the birds, the clock,
ask everything that flees”

এই পলায়নরত আকশ, মেঘ, সবুজ, বাতাস, ভোরের নক্ষত্র, পাখিদের মাঝে এক অর্ধনগ্ন তরুনের দৌড়ানোর কুৎসিত দৃশ্য দেখলে জীবনানন্দের কোন এক কবিতার শঙ্খচিল নিশ্চিত আত্মহত্যা করতো। এসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতেই আনমনা হয়ে গেছি কখন বুঝিনি। হঠাত একটা ডাকে সৎবিত ফিরে আসে, পাশ থেকে কোন কিন্নরী বলে ওঠে-
‘কুঞ্ছে যাও গো বাবু?’

পাশে ফিরেই দেখি চা গাছের গভীর সমুদ্রে কোমর ডুবিয়ে এক অপরূপা তরুনী একটা একটা করে চা পাতা খুটছে। তার দেবীর মত চকচকে কালো মুখের কোনে সফেদ সেফন মুক্তাগুলো ছড়িয়ে আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে। সে চোখে যেন পরানো আছে পৃথিবীর সবচে দামী নীলকান্ত মণি। এক নীপুন ভাস্কর্য !! স্বয়ং মাইকেলেঞ্জেলো সে ভাস্করের কাছে মলিন, আফ্রোদিতি তা দেখে নিশ্চিত লজ্জায় কুকড়ে যেত। আমি নিমিষে জড়োসড়ো হয়ে গ্যালাম, তার সৌন্দর্যের তীব্রতা যেন আমায় গিলে খাচ্ছে, আমার হাত পা অসার হয়ে গেছে, আমার জগত থেমে গেছে তার ব্লাউজের হাতায়, ময়লা সস্তা শারীর কুঁচিতে,তার উপত্যকার মত ধুসর নাভীতলে, নাকের গভীরে ঝুলে থাকা পৃথিবীর মত ববৃহৎ নোলকে। হতভম্ভ আমাকে সামনে রেখে সে আবার বলে উঠলো - “কুঞ্ছে যাও গো বাবু?” তার কন্ঠের তীব্রতায় হাজারটা চীল যেন আমার মাথার ভেতরে চিৎকার করে উঠলো, তার সরু সরু আঙুল গুলো সইনিকের ক্ষিপ্র বেয়নেটের মত আমার ফুস্ফুসে যেন বিষ ঢেলে দিল। তার সৌন্দর্যের তীব্রতা আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। সে অসীম সুন্দর থেকে পালানোর জন্য আমি ছুট তে থাকলাম, আপ্রান তাকে পেছনে ফেলে জীবনানন্দের হরিৎ মদের মত ঘাসগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে আমি ছুটতে লাগলাম। তারপরেও আমার পেছনে কে যেন ফিস ফিস করে বলতে থাকলো ‘কুঞ্ছে যাও গো বাবু?’

ঠিক সেদিনের মতই একটা সকাল আজ, সাম্নের টিলার ফাঁকে ধীরে ধীরে সূর্যকে একে একে অন্তর্বাস ছাড়তে দেখছি, বেহায়া সূর্য ধীরে ধীরে খুলে ফেলছে সমস্ত বসন। আমগাছের ডালে কালোমুখো হনুমানের বাচ্চাটার মাত্র ঘুম ভেঙ্গেছে, মায়ের স্তন মুখে নিয়ে সে অশ্লীল সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ছাদের কোনায় বসে আছি, আমার হাতে শহীদ কাদরীর “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা” কাদরী আওড়াচ্ছে-

“একটি চুম্বনের মধ্যে সচীৎকারে ঝলসে গেল কয়েকটা মুখ,
একটা নিবিড় আলিঙ্গনের আয়ুস্কালে
৬০,০০০,০০ উদবাস্তুর উদ্বিগ্ন দঙ্গল
লাফিয়ে উঠলো এই টেবিলের প’র;
বেয়নেটে ছিড়ে যাওয়া নাড়িভুড়ি চেপে,
বাম হাতে রেফ্রিজারেটর খুলে পানি খেলো
যে- লোকটা,তাকে আমি চিনি”

আমার সামনে শালদুধের মত আকাশটা ধিরে ধিরে নিজেকে ছাড়িয়ে রঙ্গিন হতে থাকে, যেন এডভার মাঞ্চ এইমাত্র ‘দ্যা স্ক্রিম’ আঁকতে শুরু করেছেন। আমার সিগারেটের ধোঁয়া উড়তে উড়তে সূর্যের , আকাশের লজ্জা নিবারনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, চায়ের মগের ধোঁয়া ছাদ ডিঙ্গিয়ে নেমে যায় শুপারি গাছটার নিচে। মাদ্রাসার শিশুদের সুর করে পড়া কোরানের আবৃত্তি আমার ফুসফুসকে চিড়তে থাকে ধীরে ধীরে, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে চা বাগান, রাবার বাগান ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে শিশুদের মত, এ অসীম সৌন্দর্য ধারনের স্থান আমার ভেতরে নাই। আমি আবারো কুঁকড়ে যাই সৌন্দর্যের তীব্রতায়। আমার বুকের ভেতরে কে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে ‘ইটস আ বিউটিফুল গ্লুমি সানডে’ ঠিক সে সময় ই নিচের ঘরের চতুর বাক্সে কেউ উচ্চস্বরে বাজায় ‘দ্য ডার্ক সাইড অফ দ্যা মুন’ নিজেকে হত্যার জন্য এর চেয়ে সন্ধিক্ষণ আর কি হতে পারে !! ফ্লয়েড যেন আমার সমস্ত কিছু নিংড়ে নিচ্ছে ‘রাইট’ ‘ওয়াটারস’ ‘গিল্মোর’ চিৎকার করে গাচ্ছে -

“And I am not frightened of dying, any time will do, I
don't mind. Why should I be frightened of dying?
There's no reason for it, you've gotta go sometime."
If you can hear this whispering you are dying.
I never said I was frightened of dying.”

আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি ছাদের কার্নিশে, এই অসম্ভব সুন্দরের মাঝে আমার বেঁচে থাকার অধিকার নাই। বুকের ভেতরে কেউ অনবরত বলছে “ডাই, ডাই মাই চাইল্ড , ডাই সফটলি” সৌন্দর্যের তীব্রতা আমায় গ্রাস করছে দ্রুত।

আমি লাফিয়ে পড়বো ছাদের নীচে, আকাশের গভীর তলে, ঠিক সেই সময় আমার কানের কাছে এক কিন্নরী কন্ঠ বলে উঠলো – “কুঞ্ছে যাও গো বাবু?”

_ (নিবন্ধিত নাম) পিনাক পাণি


মন্তব্য

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

ভালো লেগেছে চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

হাসি

অন্যকেউ এর ছবি

চমৎকার লেখনী আপনার। নিয়মিত লিখুন।

_____________________________________________________________________

বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়।

অতিথি লেখক এর ছবি

হাসি চেষ্টা করছি ধন্যবাদ।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।