বাঙালিগো ‘অনুভূতি সিনড্রোম’ ও কতিপয় পুরানা ক্যাচাল (শেষ অংশ)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ২২/০৪/২০১৩ - ৭:৩৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

দ্বিতীয় পুস্তক

‘অনুভূতি’র জাতীয়তাবাদ ও লীগ, বিএনপি’র পলিটিকস : আজো তারা ঠিক করতে পারে নাই সেটা কী হওন উচিত!

৭.
ইতিহাস আমগো বলে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতির ময়দানে বিএনপি’র উদয় হইছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে ‘চেতনা ও অনুভূতি’র আওয়াজ উঠায় তারে ড্যামেজ করনের লিগা বিএনপি এই এজেন্ডা হাজির করছিল। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ফিলোসফি বিতর্কিত হইতে পারে। কিন্তু তারে মধ্যমণি কইরা বিএনপি’র একটি অবস্থান এতোদিনে গইড়া উঠছে। ‘ইসলামী চেতনা ও অনুভূতি’ সুরক্ষার দাবিরে সে এই জাতীয়তাবাদের মধ্যে সমন্বিত কইরা নিছে। দলের গঠনতন্ত্রে তা প্রতিফলিত হইছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এর নকশা করছিলেন। লীগেরে কোণঠাসা করার উপায় খুঁজতে গিয়া বাহাত্তরের সংবিধানরে তিনি লেবেলিং করছিলেন। মুজিবসেনাগো কপালে ভারতপ্রেমের ছাপ্পা দেওনের সাম্প্রদায়িক পরিণতি কী হইতে পারে জিয়া সেটা ভাবেন নাই। অথবা ভাবতে চান নাই। ক্ষমতায় নিজেরে পাকাপোক্ত করা উনার কাছে প্রাধান্য পাইছিল। মসনদ পাকাপোক্ত করতে হইলে সংবিধান লাগে। আইনী বৈধতা ফ্যাক্টর হইয়া উঠে। বিরোধীপক্ষরে সামাল দেওনের জন্য দল গঠনের প্রয়োজন হয়। জিয়াউর রহমান সেইটা ফিল করতে সমর্থ হইছিলেন। সুতরাং তিনি দল গঠনে নিজেরে মনোনিবেশ করান। ফলশ্রুতিতে রাজনীতির আকাশে বিএনপি’র উদয় হইছিল।

লীগেরে কাউন্টার দেওনের ভাবনা থিকা মেজর জিয়া বিএনপি’র জন্ম দিলেন। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আওয়ামী জাতীয়তাবাদের ‘অনুভূতি’ কনডেম করার মধ্য দিয়া উনার সেই ভাবনা গতি লাভ করছে। বাহাত্তরের সংবিধানে লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করছিল। সামরিক ফরমানের মাধ্যমে ওইটারে বাতিল কইরা জিয়া তাঁর যাত্রা শুরু করছেন। লীগ মনে করছে বাঙালি হওনের হাজার বছরের ‘অনুভূতি’র মধ্যে বাংলাদেশী হওনের বীজ নিহিত আছে। আপামর মানুষের শেয়ারিংয়ের ভিতর থিকা সেই ‘অনুভূতি’ ক্রমবিকাশ পাইছে। কে কোন কওম হইতে আসছেন, কে কারে বিশ্বাস করেন, কার কী মূল্যবোধ ইত্যাদি নিয়া মাতব্বরী বাঙালি জাতীয়তাবাদে নাই। সাম্প্রদায়িকতার ঝুঁকি তো নাই কইলে চলে। ইচ্ছা করলে ধর্মে পূর্ণ ইমান বজায় রাইখা জাতি এই ‘অনুভূতি’র পরিপোষণ করতে পারে। সুতরাং আলাদাভাবে বাংলাদেশী অথবা বাংলাদেশী মুসলমান হওনের ফুরসত বাঙালি জাতীয়তাবাদে নাই। নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশী হইলেও জাতীয়তার ফয়সালা বাঙালি হওনের মধ্যেই সম্ভব।

বাহাত্তরের সংবিধানে লীগের এই প্রস্তাবনা জিয়া কিন্তু প্রত্যাখান করলেন। পলিটিক্যাল কারণে করলেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভারত ইস্যুরে ব্যবহার করনের অভিসন্ধি থিকা করলেন। ভারতের ভূগোল বা জিওগ্রাফির মধ্যে সক্রিয় বাঙালি জাতিসত্তা হইতে বাংলাদেশী জাতিসত্তারে পৃথক প্রমাণের ভাবনা থিকাও করলেন। তাঁর ধারণা হইছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের ইমানী চেতনারে ধারণ করে না। এর ভিতরে যে সংস্কৃতি নিহিত সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ‘ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতি’র লগে সংঘাত তৈয়ার করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ‘অনুভূতি’ ক্ষুণ্নকারী চেতনারে তাই জাতীয়তাবাদ কওন যায় না। যদিও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিজেরে বাঙালি ভাবনের চেতনা থিকা গতি লাভ করছিল! মেজর জিয়া সেই চেতনায় নিজেও শরিক হইছিলেন। বাঙালি হওনের ‘চেতনা ও অনুভূতি’র সুরক্ষায় অস্ত্র হাতে নিছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাছকের পলিটিকস মুক্তিযোদ্ধা জিয়ারে সাফারি ও সানগ্লাস পরিহিত জিয়াউর রহমানের দিকে নিয়া গেলো। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ‘চেতনা ও অনুভূতি’রে তিনি ইগনোর করলেন। তারে কোণঠাসা করনের লিগা সংবিধান হাতে নিলেন। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিভক্তি জন্ম নিলো। ৪২ বছরেও যার নিরসন হয় নাই!

৮.
জিয়াউর রহমানের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা আছিল না। ওই সংযোজনের মধ্য দিয়া জাতির আত্মপরিচয়ের নিশানা বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের পুরানা বিবাদে ফিরা গেলো। লীগেরে কনডেম করনের লিগা তিনি ফন্দি আঁটছিলেন। সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং পরবর্তীকালে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংযোজন উনার ফন্দিরে সফল করতে কামে দিছে। বাংলাদেশে লীগ একুশ বছর ক্ষমতার চেহারা দেখে নাই। আরো গুরুতর ব্যাপার হইলো বাহাত্তরের সংবিধান রচনার কালে বাঙালির একটি সংজ্ঞায়ন সে করছিল। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এই ‘অনুভূতি’ নিয়া লীগ ভবিষ্যতের বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করতে চাইছিল। যাতে পাকিস্তানের দিকে আর ফিরা যাওন না লাগে। বাংলা ভাষার মধুপানে বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা ও ‘অনুভূতি’ অখণ্ড হইয়া উঠে। দুঃখের কথা বটে, বাঙালি হওনের সেই ‘অনুভূতি’র কাছে লীগ আর কখনোই ফেরত যাইতে পারে নাই!

বাংলাদেশের ক্ষমতাছকে টিকা থাকনের লিগা ধর্মীয় ‘চেতনা ও অনুভূতি’র লগে লীগেরে আপোস করতে হইছে। ইসলামী জাতীয়তাবাদের নামে আরব জাতীয়তাবাদ কায়েমের স্বপ্নবিভোর এজেন্টগো লগে হ্যান্ডশেক করতে হইছে। তাগো মধ্যে নিজেরে খাপ খওন লাগছে। কিন্তু এতোকিছুর পরেও একাত্তর ও স্বাধীনতার চেতনা লীগের পিছু ছাড়ে নাই। স্বাধীনতার বিপক্ষে ক্ষতিকর ভূমিকা পালনের অপরাধে একাত্তর আজো জামাতরে তাড়া করে। স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেওনের কারণে লীগেরেও সে সমানে তাড়া করে। ফলে লীগের মধ্যে একটা দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হইছে। টিকা থাকনের প্রশ্নে বাস্তবতারে সে ইগনোর করতে পারে না। আবার অন্যদিকে একাত্তরের ‘চেতনা ও অনুভূতি’র মধ্যে ফেরত যাওনের দায় এড়াইতে পারে না। বিএনপি’র জন্য যেইটা সহজ, লীগের জন্য সেটা এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহনের ন্যায় কঠিন। এদিক থিকা জিয়াউর রহমানরে বাহবা দিতে হয়। লীগের তিনি আত্মদ্বন্দ্বে নিমজ্জিত করতে পারছিলেন। বাংলাদেশের আমজনতারে সকল তর্ক-বিতর্ক থিকা মুক্ত একটা আত্মপরিচয় উপহার দেওনের ক্ষেত্রে লীগ সফলকাম হইতে পারে নাই। বরং নিজেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পতিত হইছে। এইটা তার বিশ্বাসযোগ্যতারে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

লীগ বোধহয় উপলব্ধি করতে পারে নাই যে, দুই নৌকায় পা দিয়া নদী পার হওনের চেষ্টা তারে মানায় না। বিএনপি’রে হয়তো মানায়। কারণ তার বিকাশ জনতার মধ্য থিকা হয় নাই। জনতার সঙ্গে বালেগ হওনের কোনো স্মৃতি বিএনপি’র নাই। সোহরাওয়ার্দি, ভাসানী থিকা শেখ মুজিবের মতো লিডারগো হাত ধইরা সে জনতার মধ্যে বিচরণ করে নাই। জনতার রাগ-অভিমান ও ভালোবাসার তীব্রতা দেখে নাই। বিক্ষোভের তরঙ্গ তারে সইতে হয় নাই। লীগেরে কিন্তু সেই তরঙ্গ বহন করতে হইছে। জনতার প্রবল ভালোবাসা বিক্ষোভের আগুনে লেলিহান হইতে সময় নেয় না। শেখ মুজিব সেটা জীবন দিয়া অনুভব করছেন। দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকার কারণে বিএনপি’রে সেই অভিজ্ঞতা নিতে হয় নাই। জাতির দুর্যোগকালে ক্যারিশমাটিক এক মেজর তারে জন্ম দিছিলেন। ক্ষেত্র অনুকূল ছিল বইলা তিনি সেটা পারছেন।

মুজিব নিহত হওনের কারণে জাতীয় জীবনে শূন্যতা তৈয়ার হইছিল। ইতিহাস জিয়ারে দিয়া সেই শূন্যতা ভরাট করছে। কর্নেল তাহেরকে দিয়া সেই শূন্যতা ভরাট হইতে পারতো। খালেদ মোশাররফ বা অন্য কেউ শূন্যতা-ভরাটের নায়ক হইতে পারতেন। কিন্তু ইতিহাস জিয়ারে নির্বাচন করছিল। মুজিব হত্যার মঞ্চে মেজর জিয়া ব্রুটাসের ভূমিকা নিছিলেন কিনা সিটা নিয়া মহল বিশেষে ডিবেট আছে। অনেকে ধারণা করেন মুজিব হত্যার নীল নকশায় তার নীরব সম্মতি আছিল। বন্ধু তাহেরের ফাঁসি নিশ্চিত করতে জিয়ার বিবেকে বাঁধে নাই। অকম্পিত এই কাঠিন্য দিয়া বিএনপি’রে তিনি সম্ভব করছিলেন। পাবলিকের সমীহ ও ভালোবাসা আদায় কইরা নিছিলেন। যে-কারণে জিয়ার বিএনপি পাবলিকের মনে এই ধারণা বহুলভাবে প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম হইছে যে, ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ খালি সৈন্যগো বিদ্রোহ আছিল না। এই বিদ্রোহে জনতা অংশ নিছিল। সিপাহী-জনতার মিলিত সংগ্রামে দেশ ভারতের মুঠোবন্দি হওন থিকা রক্ষা পাইছিল। এইটা ছিল দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। ভারতের গ্রাস থিকা বাংলাদেশের জনগণরে রক্ষা করনের মুক্তিযুদ্ধ! আর, মেজর জিয়া হইলেন সেই মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক!

ইতিহাস কাউরে নায়কের মহিমা দিতে চাইলে তারে ঠেকানো মুশকিল। জাতিরে সে বাকশালের পরিবর্তে বিএনপি উপহার দিছে। বাকশাল গঠন শেখ ‍মুজিবের জন্য কাল হইছিলে। জন-অসন্তোষ থিকা লীগেরে বাঁচানোর জন্য বাকশাল গঠনে তিনি হাত দিছিলেন। বাকশালের ভিতর দিয়া লীগের ভুলগুলা সংশোধন করবার চাইছিলেন। নির্বাহী ক্ষমতা নিজ হাতে নেওনের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটারে লাইনে আনার ভাবনা তারে আলোড়িত করছিল। মুজিবের ভাবনায় ভুল আছিল। সকলের কণ্ঠরোধ কইরা দেশরে লাইনে অনোন যায় না। এইটা স্বাধীনতার পরিপন্থী। গণতন্ত্রের পরিপন্থী। প্রগতির শত্রু। এবং একনায়কের সহযোগী। মুজিব কি তাইলে একনায়ক হওনের জন্য ৬ মার্চ জাতিরে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের ডাক দিছিলেন? স্বাধীনতার মহানায়ক একনায়ক হওনের ভুল করছিলেন বইলা বিএনপি সম্ভব হইছে। মুজিবের সিদ্ধান্ত যারা মানতে পারেন নাই তারা লীগেরে সেই যে বয়কট করছিলেন, আর ফিরা আসেন নাই। আফসোস!

৯.
মহানায়কের বজ্রকণ্ঠ একদিন জাতিরে একত্র করছিল। আবার মহানায়কের ভুলে তাগো দ্বিখণ্ডিত হইতে হইছে। আত্মপরিচয়ের ‘চেতনা ও অনুভূতি’ খণ্ডিত রূপ ধারণ করছে। এজেন্টগো ষড়যন্ত্রে তৎপর হওয়ার সুযোগ কইরা দিছে। দেশে ‘দ্বৈততা’র সংস্কৃতি একদিনে ত্বরিত হয় নাই। পিছনে ৪২ বছরের ইতিহাস আছে। শত-হাজার বছরে সৃষ্ট বৈষম্যগুলান আছে। বাহাত্তরে প্রণীত বাঙালি ‘চেতনা ও অনুভূতি’র সংস্কৃতিতে ফেরত যাওনের রাস্তা আর মৃসণ নাই। বাংলাদেশী ‘চেতনা ও অনুভূতি’র সংস্কৃতি এখন তারে প্রতিরোধ করে। ‘জয় বাংলা’রে প্রতিরোধ করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। রাজাকারগো খতমের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়া শাহবাগীরা সম্প্রতি ‘জয় বাংলা’রে আবারো ফেরত আনছিলেন। কিন্তু ‘জয় বঙ্গবন্ধু’রে ফেরত আনতে পারেন নাই। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নাম তারা লইছেন। কিন্তু তাগো দাবির সাথে আপামর জনতারে জড়িত করার খাতিরে বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে নীরব থাকছেন। লাভের লাভ অবশ্য কিছুই হয় নাই। যাগো মধ্যে বঙ্গবন্ধু নিয়া বিরূপ ধারণা আছে তারা শাহবাগীদের নিয়া দোলাচলে ভুগছেন। লীগের বি-টিম বইলা শহাবগীদের যারা সন্দেহ করছেন সেই উনারাও তরুণ প্রজন্মের জাগরণের সাথে একাত্ম হন নাই। আর দেশে ফিরনের পর খালেদা সরাসরি শাহবাগীদের বিপক্ষে নিজের অবস্থান পষ্ট করছেন। তাগো নষ্ট ছেলে বইলা সম্বোধন করছেন।

একাত্তরে ‘বাংলা’ আর ‘বঙ্গবন্ধু’ সমার্থক আছিল। ‘বাঙালি’র মধ্যে আল্লা-ভগবান-ঈশ্বর ও তথাগত একাকার হইছিলেন। একত্র হওনের এই সৌন্দর্য ‘ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতি’ নিয়া বাড়াবাড়ি না করনের ‘অনুভূতি’ তীব্র করছিল। একাত্তরের নয় মাস জাতি সহিষ্ণুতা ও নিরপেক্ষতারে মর্ম দিয়া অনুভব করছে। পাকিগো লগে লড়াইয়ে এই ‘অনুভূতি’ তারে প্রেরণা দান করছে। ‘নিরপেক্ষতা’র সেই দিন এখন আর নাই। লোকে তারে এখন সন্দেহ করে। ‘নিরপেক্ষ’ থাকনের ‘অনুভূতি’রে ‘নাস্তিকতা’র সঙ্গে রিলেট কইরা চিন্তা করে। মুক্তচিন্তার মধ্যে ইসলামের অবমাননা করা হইছে কিনা সেটা নিয়া উত্তেজিত হয়। বাংলাদেশী কওমভুক্ত জনগণ হলুদ তথ্যরে এখন সত্য বইলা ভাবতে শিখছে। আর সত্যরে পলিটিকস ভাইবা নাকচ করনের প্রবণতা তার মধ্যে তীব্র হইছে। ‘চেতনা ও অনুভূতি’র এইসব কুহেলিকার মধ্যে মাদ্রাসাভিত্তিক কওমি জনগণ দেড় হাজার বছরের পুরানা সংস্কার নিয়া ক্রমাগত বয়স্ক হইয়া উঠছে। তাগো দিকে ফিরা তাকানোর সময় কারো হয় নাই। আশ্চর্যই বটে!

কওমিরা আস্ত ইনসান, খালি হুজুর না। রাষ্ট্র তাগো এই ‘অনুভূতি’ উপহার দিতে কার্পণ্য বোধ করছেন। তাগো জীবনমান ও চেতনার উন্নতিবিধানে কিছু করছেন কি? সমাজে কওমিরা স্থান কইরা নিতে পারে নাই। সমাজের অংশ হওনের পরেও সমাজ তারে বাইরে রাইখা ভাবছে। হুজুরগো সে শ্রদ্ধা করছে। ব্যক্তিপর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতাও দান করছে। কিন্তু ‘সালাফি’ ইসলামের কট্টর মনোভাব থিকা হুজুরগো বাহির করনের প্রয়াস কেউ নেয় নাই। মসজিদ, মিলাদ ও কোরআন খতমের মাঝে তাগো চলাফেরা সীমাবদ্ধ কইরা দিছে। কওমিগো সিলেবাসে তাই বিজ্ঞানমনষ্কতা নাই। মানবশরীর ও যৌনবিজ্ঞান নিয়া প্রাসঙ্গিক অক্ষর নাই। নর-নারীর মিলামিশার স্বতঃস্ফূর্ত সংস্কৃতি বা তার বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা নাই। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ও ব্যবহার নাই। তুলানামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়া জ্ঞানগভীর কোনো আলোচনাও নাই। কওমিগো ভাবজগতে পৃথিবীর সর্বশেষ অগ্রগতির আনাগোণা নাই। ‘কোরআন’-এ হাফেজ, -এই হইলো তাগো মূল পরিচয়!

কওমি মাদ্রাসায় প্রবেশ করতে রাষ্ট্র বরাবর ভয় পাইছে। রাষ্ট্র ভাবছেন, ইসলামরে অবিকল রাখনের জন্য সংকল্পবদ্ধ এই কওম যদি খেইপা উঠে। যদি সবকিছু তছনছ করে। তাইলে এই শক্তিপুঞ্জরে কে সামাল দিবে? স্বৈরাচার এই ‘যদি’রে কদমবুসি করছে। খালেদার বিএনপি তারে ব্যাপক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়া গেছে। হাসিনার লীগ তাগো দেইখা ডরাইছে। ঘাটানোর সাহস করে নাই। বরং কওমি নেতাগো সুযোগ-সুবিধা দিয়া সন্তুষ্ট রাখনের চেষ্টা করছে। এতে কওমি নেতারা বেনিফিটেড হইলেও মাদ্রাসার মাসুম বাচ্চাগুলার উপকার হয় নাই। ব্যাপক এক ‘যদি’র মধ্যে কওমিরা ক্রমশ প্লেটোর গুহাবন্দি মানুষে পরিণত হইছে। গুহাবন্দি এই মানুষের কাছে মাদ্রাসার চৌহদ্দি তাই একমাত্র সত্য! বাহিরের কর্মচঞ্চল জগৎ মরীচিকা। ইমান ও শরিয়তের স্বরূপ নিয়া কওমিগো মনে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব নাই। মাদ্রাসার জানালা হইতে সে যখন শাহবাগরে দেখে সেইটা তার কাছে অনাচার বইলা মনে হয়। কে ‘ব্যাভিচারী’ ও কে ‘নাস্তিক’ সেই ঠিকাদারী লওনের সুযোগ রাষ্ট্রই তারে কইরা দিছেন। এরচেয়ে অধিক অগ্রসর হওনের সুযোগ কেউ তারে দেয় নাই। কওমি ছাত্রগো ভবিষ্যৎ কতিপয় সুবিধালোভী কাঠমোল্লার হস্তে সমর্পণ কইরা রাষ্ট্র নিজের দায় এড়াইতে চাইছেন। ভোটের পলিটিকস করছেন। কওমিগো প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের এই ‘অনুভূতিহীন’ মনোভাব তাগো ধর্মরোবটে পরিণত করছে। তাগো ১৩ দফা দাবির মধ্যে জীবনবোধের বৈচিত্র্য ও সমাহার তাই না থাকনটাই স্বভাবিক। ধর্মরোবটরা আজ শাহবাগীদের শ্লোগান নকল কইরা ‘নাস্তিক, মুরতাদ’ প্রতিহত করার ডাক দিছে। কাল হয়তো অন্য কাউরে প্রতিহত করার ডাক দিবে। রাষ্ট্র কি তার জন্য নিজেরে প্রস্তুত রাখছেন?

‘অনুভূতি’র শত্রু-মিত্র ও বাংলাদেশে ভারত ইস্যু : পলিটিক্যাল লেবেলিং নাকি অন্য কিছু

১০.
প্রতিহতকরণের সংস্কৃতি সহিষ্ণু ও উদার হইতে পারে না। ‘অনুভূতি’র সুরক্ষার নামে মানুষের চেতনারে সে আপোসের দিকে নিয়া যায়। পলিটিক্যাল ইস্যুতে পরিণত কইরা ফায়দা লুটতে চায়। রাষ্ট্রের মূলধারা থিকা কোনো এক পক্ষ যখন সেই কাজ করে তখন জাতির জীবনে দুর্যোগ নাইমা আসে। সেই দুর্যোগ সমগ্র জাতিরে দিশাহারা কইরা তোলে। নিজেরে নিরাপদ রাখনের ‘অনুভূতি’ জল্লাদের অট্টহাস্যে তখন হৃদয় বিদীর্ণ করে। বাংলাদেশে লীগ, বিএনপি বোধহয় সেই মিশনে নামছেন। রাষ্ট্রের মূল দুই শক্তির মধ্যে অদ্য কোনো ডায়ালগ ঘটে নাই। সামাজিকতা ক্রমে লোপ পাইছে। সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতাও আর অবশিষ্ট নাই। এমনধারা আচরণ এজেন্টগো শক্তিরে সংহত করায়। তৃতীয় শক্তি হওনের সম্ভাবনায় তারা আশাবাদী হইতে থাকে। ঘোর দুর্দিনের মধ্যে জামাতিরা যেমন সেই আশায় সক্রিয় হইছে। স্বৈরাচার ইতিউতি সুযোগ খুঁজনের ধান্দায় আছে। ধর্মরোবট কওমি হুজুরগো মনের মধ্যেও তৃতীয় শক্তি হওনের ঢেউ জাগছে। মূলধারায় শামিল হওনের আশায় জামাত-বিএনপি’র লগে তাগো ব্যাপক সখ্য তার প্রমাণ। আগেই কইছি, সময়ের উলটাস্রোতে গিয়া দাবি তুলনের কারণে কওমিগো আশা পূরণ হওয়া কঠিন। ১৩ দফার প্রাগৈতিহাসিক বৃত্ত থিকা বাহির হইতে না পারলে সময়ের গতিধারা-ই তাগো নিস্তেজ বলদে পরিণত করবো। সমূলে কনডেম কইরা দিবো।

এজেন্টগো বিনষ্ট করতে হইলে মূলধারার শক্তি লীগ, বিএনপি’রে লাইনে ফিরানো দরকার। কওমভুক্ত জনগণের ‘অনুভূতি’ নিয়া পালটা-পালটি প্রতিহিংসার পুরানা খেইল থিকা এগো বাহির হওন প্রয়োজন। অবস্থাদৃষ্টে সেটা কঠিন মনে হইতেছে। দুই শক্তির মধ্যে পরস্পররে বিনাশ করনের জিঘাংসা জাইগা উঠছে। সবকিছুরে পলিটিক্যাল এলিমেন্ট ভাবনের প্রবণতা তাগো চেতনারে অবশ করে দিছে। দুই পার্টির মধ্যে ডায়ালগের সম্ভাবনা তাই জিরো। ডায়ালগ সম্ভব করতে হইলে লীগ, বিএনপি’রে ‘সামাজিক চুক্তির’ মূল শর্তে ফিরা আসতে হবে। জাতিরে আত্মপরিচয় উপহার দেওনের ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহমতের সংস্কৃতির প্রতি আস্থা স্থাপন করতে হবে। জাতীয়তাবাদী ‘চেতনা ও অনুভূতি’ নিয়া এ-পর্যন্ত যে যতো লেবেলিং করছেন সেগুলারে বিবেচনায় নেওনের কথাও ভাবতে হবে। আত্মপরিচয়ের সংজ্ঞা নিয়া ঐক্যে পৌঁছান খুবই জরুরি।

দেশে একাধিক ধর্ম থাকবে এইটা স্বাভাবিক। বহুরকমের সংস্কৃতির অস্তিত্বও অস্বাভাবিক কিছু না। প্রথা-মূল্যবোধ এবং আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে নানা বৈচিত্র্য সমৃদ্ধির পরিচয় তুইলা ধরে। এর মধ্যে সমস্যার কিছু নাই। কিন্তু একাধিক জাতীয়তার ‘অনুভূতি’ সুখকর হওনের সম্ভাবনা ধারণ করে না। কওমভুক্ত জনগণের মধ্যে সে বিভক্তি বাড়ায়। তাগো মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা সৃষ্টি করায়। সংলাপের সংস্কৃতি তখন অবাস্তব মনে হইতে থাকে। এবং সেই সুযোগে জিঘাংসা ও প্রতিহতকরণের সংস্কৃতি প্রবল হইয়া উঠে। এসব থিকা বাহির হওনের স্বার্থে জাতীয়তাবাদের ‘অনুভূতি’ নিয়া ঐক্য প্রয়োজন। কওমের সঙ্গে ডায়ালগ স্থাপনের মাধ্যমে সেটা হইতে পারে। অন্যথায় লেবেলিংয়ের সংস্কৃতি শেষ হওনের আশা নাই। বরং জাতিরে আরো খারাপের দিকে মোড় নিতে হইতে পারে। নিজেগো জাতীয়তাবাদী ‘অনুভূতি’র মধ্যে ভিনদেশী রাষ্ট্র ও জাতিসত্তারে বিজড়িত করার প্রবণতা সৃষ্টি হইতে পারে। বাংলাদেশ যেমন ভারত, পাকিস্তানরে নিজেগো জাতীয়তাবাদী ‘চেতনা ও অনুভূতি’র মধ্যে বারবার বিজড়িত করছে। পলিটিকসের স্বার্থে এটা করা হইছে। কায়েমি স্বার্থ জারি রাখনের জন্য করা হইছে। নিজেগো শাসন করার অক্ষমতা হইতে জাতীয়তাবাদী ‘চেতনা ও অনুভূতি’র মধ্যে ভিনদেশী জাতিসত্তারে বিজড়নের প্রবণতা জায়গা করে নিছে। অদ্য সেটা বিষফোঁড়ায় পরিণত হইছে। বাংলাদেশী কওমের দুর্ভাগ্য এই যে তারা এই প্রবণতারে প্রতিহত করতে পারে নাই। পলিটিকসের মারপ্যাঁচে নিজেরা বরং সেই কালচারে দু’ফাঁক হইছে!

১১.
জাতীয়তাবাদের ‘চেতনা ও অনুভূতি’ নিয়া লীগ, বিএনপি’র বিরোধ সেই কালচারের পরিণাম। মেজর জিয়া ভারতের সঙ্গে আওয়ামী-সখ্যরে একটা পলিটিক্যাল ইস্যুতে পরিণত করছিলেন। অন্যদিকে লীগ সৌদি ও পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপি’র সহবত নিয়া প্রশ্ন তুলনের চেষ্টা করছে। হাসিনা সেদিন খালেদারে পাকিস্তানে গিয়া বসবাস করনের পরামর্শ দিলেন। খালেদাও উনারে ভারতে ঘাঁটি গাড়নের উপদেশ খয়রাতে দেরী করলেন না। পালটা-পালটি এই বাক্যবাণের মধ্যে প্রতিপক্ষরে ঘায়েল করার হিংসুক আমোদ ছাড়া অন্য কিছু নাই। জিয়ার লেবেলিংয়ের মধ্যে তবু একটা ফিলোসফি আছিল। জাতীয় জীবনে বিশ্বাস ও মূল্যবোধের স্বাতন্ত্র্য বা বিনিময়ের প্রশ্নে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হইতে পারে তার একটা ছক তিনি হাজির করছিলেন। গ্রহণ, প্রত্যাখান পৃথক বিষয়। তবে উনার সেই প্রস্তাবনার মধ্যে চিন্তার খোরাক ছিল। এখন সেসব নাই। লীগ, বিএনপি আক্রমণ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না। পরিতাপের বিষয় হইলো, মুজিব ও জিয়া গত হওনের পর থিকা লীগ, বিএনপি’র পালটা-পালটি বাক্যবাণের মধ্যে আবর্জনা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পলিটিকস উৎপাদিত হয় নাই।

ইতিহাস সাক্ষ্য দিছে, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের লগে যুদ্ধের ডাক দিছিলেন। মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র হইতে মুজিবের সেই ডাক পাঠ করছিলেন। ইতিহাস আরো সাক্ষ্য দিছে, একাত্তরের জনযুদ্ধে বাংলাদেশের মিত্র রূপে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কারণে সেইটা সম্ভব হইছে। পাকিস্তানের লগে পুরানা শত্রুতার শোধ নিতে গিয়াও বাংলাদেশ পাওনের লড়াইয়ে ভারত নিজেরে একাত্ম করছিল। এতোকিছু ঘটবার পরেও ভারতের লগে বাংলাদেশের বনিবনা প্রশ্ন ও সন্দেহমুক্ত থাকতে পারে নাই। মিত্র ও শত্রুর দ্বৈত অস্তিত্ব নিয়া দেশের সরকারব্যবস্থা ও রাজনীতির মধ্যে ভারত ইস্যু সক্রিয় হইছে। প্রতিবেশী হিসাবে বাংলাদেশ তারে মিত্র ভাবতেই পছন্দ করে। কিন্তু ক্ষমতাছকের পালাবদল অনিবার্য হওনের ক্ষণে ভারত ইস্যু সামনে আইসা খাড়া হয়। ক্যাটালিস্ট এজেন্ট হিসাবে তার ভূমিকা নিয়া রাজনীতির ময়দান গরম হইয়া উঠে। অন্তত বিএনপি, জামাত ও বামজোটগুলো ভারতরে সেই জায়গা থিকা বারবার রিড করতে পছন্দ করে। ফলশ্রুতিতে বিগত ৪২ বছরে ভারত ইস্যু নিয়া পাবলিকের মনে বিচিত্র ‘অনুভূতি’ বহমান হইছে! মনে রাখন দরকার, আত্মপ্রকাশের কালে বিএনপি সেই ‘অনুভুতি’র ব্যাপারী হইছিল।

১২.
বাংলাদেশের ক্ষমতাছকে ভারত ইস্যু বারবার কেন ফিরা আসে? জাতীয়তাবাদের ‘চেতনা ও অনুভূতি’র প্রতিপক্ষ হিসাবে তারে কেন হাজির করা হয়? লীগেরে ঠেকানোর প্রশ্নে বিএনপি, জামাত ও বামজোট কী কারণে ভারতরে ফ্যাক্টর বইলা গণ্য করে? উত্তর পাইতে হলে বাংলাদেশী জনগণ ভারত সম্পর্কিত ‘অনুভূতি’রে কোন চোখে দেখে সেই খবর লওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশী সিটিজেন, বিশেষ কইরা মুসলমানগো অন্তরে ভারত নিয়া অম্লমধুর ‘অনুভূতি’র রেশ আজো কাটে নাই। কমনসেন্স বলে বাংলাদেশী মুসলমান ভারতীয় বাদ্য-বাজনা, নাচ-গান ও সাহিত্য ভালোবাসে। ভারতবর্ষের সংস্কৃতিরে আপন ভাবে। ভারতীয় ঐতিহ্যের গর্বিত অংশীদার ভাবনের আবেগ তার মধ্যেও কাজ করে। তবে সমস্যা হইলো, হিন্দুত্বের বাইরে গিয়া ভারতরে সে ফিল করতে পারে না। ভারতবর্ষে সক্রিয় বাঙালি জাতিসত্তাকে সে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির মাঝে রাইখা রিড করে। জামাতি ‘অনুভূতি’র পাবন্দ হইলে ওই হিন্দুগো ওপর রাইড করতে চায়। যদিও একদা সে নিজে হিন্দু ভারতের অংশ আছিল। হিন্দু ও বৌদ্ধ স্বরূপে এই ভূবর্ষে তার জন্ম হইছিল। পরে মুসলমানে রূপান্তর লাভ করছে। ভারতের মাটিতে মুসলমান আত্মপরিচয়ে নিজের শিকড়-বাকড় ছাড়ছে। শিকড় ছাড়নের কালে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘাত-সমন্বয়ের যে তিক্ত-মধুর স্মৃতিগুলা তৈয়ার হইছে, সেইটা তার চেতনারে সারাখন দ্বিধাগ্রস্ত কইরা রাখে।

জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়া বাংলাদেশে যে স্ববিরোধিতা জন্ম নিছে সেইখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতির সাকিন ঠিক করনের বাড়াবাড়ি অর্থাৎ ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র প্রাবল্য অস্বীকার যাওনের উপায় নাই। জাতীয়তা নির্ধারণের এই রাজনীতি সাম্প্রদায়িক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওনের জন্য দায়ী। ভারতীয় জাতিসত্তা ও তার আত্মপরিচয় নিয়া নেহেরু, জিন্নার দড়ি টানাটানি ভারত ইস্যুরে জীবিত রাখনে ইন্ধন যুগাইছে। তবে ধর্ম-সমস্যা একমাত্র কারণ না। উৎপাদন ব্যবস্থার বহুবিধ ইতরামি হিন্দু-মুসলমানগো মনে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস বজায় রাখনে ভূমিকা পালন করছিল। সামগ্রিকতার জায়গা হইতে বিবেচনা করলে এই ইতরামি অবশ্য গৌণ কারণ। মার্ক্স সাহেবের শিষ্যরা তারে বড়ো কইরা দেখান আর কী! তাগো বিশ্লেষণের আড়ালে ‘ধর্মীয় অনুভূতির বাড়াবাড়ি’ নামক কারণটারে তাই ফিল কইরা উঠন যায় না। মার্ক্সপন্থীগো ভাবনায় বিষয়টা গরহাজির থাকনের প্রবণতা শো করে। খিয়াল করা দরকার, হাজার বছর পাশাপাশি বসবাস করনের পরেও দুই ধর্মে মনের মিলন কিন্তু ঘটে নাই। উঠবস ছিল। আজো আছে। ইয়ারদোস্তির খামতি নাই। তারপরেও অন্তরে ধর্মীয় ‘বিশ্বাস ও অনুভূতি’র দেয়াল খাড়া কইরা একজন আরেকজনের লগে মিলামিশা করছে। ২০১৩-য় পা দেওনের পরেও মিলামিশার এই ধরনে বিশেষ কোনো চেঞ্জ আসে নাই। আপাত সম্প্রীতির আড়ালে হিন্দু-মুসলমানের মনের গহীনে ‘সাম্প্রদায়িক ঘৃণা’ জীবিত রইছে। সাম্প্রদায়িক অভিমানও শেষ হয় নাই। যার অর্থ হইলো আমগো চেতনায় ৪৭ এখনো মরে নাই। ৪৭-এ কলকাতা, নোয়াখালী বা পাঞ্জাবে যে ভয়ংকর দাঙ্গা-হাঙ্গামা হইছিল তার নেপথ্যে সক্রিয় উপাদানগুলা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হইয়া উঠনের শক্তি এখনো হারায় নাই। ৯২-এ বাবরি মসজিদের ঘটনারে কেন্দ্র কইরা সংঘটিত দাঙ্গা তার প্রমাণ। বাংলাদেশে সম্প্রতি জামাতিরা সেই ঘৃণারে আবারো জাগ্রত করছে। হেফাজতিদের ১৩ দফা সেটারে উসকানী দিতে সহায়তা করছে। ভারতে বিজেপি বা হিন্দু সংঘ হয়তো সেইরকম কোনো উসকানির অপেক্ষায় আছে। সাম্প্রদায়িকতার এই জাগরণ, পুনর্জাগরণের চক্রে পাবলিকের হৃদয় শত-শত বছর ধইরা উঠা-নামা করায় ধর্মমোহের পাক থিকা তারা আর বাহির হইতে পারে নাই। ফলে ভারত, বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন নিরসন হওনের সম্ভাবনা সহসা নাই বইলা মনে হয়।

‘অনুভূতি’র সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলমানের ইমানী জিহাদ : হিন্দু মনের বিরোধ-অবরোধ

১৩.
উপমহাদেশের অভিজ্ঞতা বলে যে লোক এখানে হিন্দু থিকা মুসলমান হইছে, হিন্দু তারে মন থিকা খারিজ করতে দ্বিধা করে নাই। নিজেরে হিন্দু ভাবনের ‘অনুভূতি’ ওই ধর্মান্তরিত লোকটারে মানুষ ভাবতে বাধা দিছে। অন্যদিকে মুসলমানরা হিন্দুগো ‘অনুভূতি’তে এই আস্থা জন্ম দিতে পারে নাই যে ইসলাম হইছে ‘শান্তির ধর্ম’। এক অনন্য জীবনবিধান। সেটা সত্য হইলে ভারতে মুসলমানের সংখ্যা সুলতান ও মোঘল আমলেই শতভাগ পূর্ণ হইতো। বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের কালে যেমনটি ঘটছিল বইলা ইতিহাসে লেখে। সত্য হইলো জামাতি ও হেফাজতিরা ইসলামরে সকল ব্যামোর ঔষধ ভাইবা সন্তোষ বোধ করতে পারে, অগণিত ধর্মের পিঠস্থান ভারতবর্ষ কিন্তু সেটা কখনোই ভাবে নাই। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ প্রমুখরা ভাবে নাই। খ্রিস্টান ও ইহুদির তো প্রশ্নই ওঠে না। ভারতবর্ষের হিন্দুগো কাছে ইরান-তুরান-তুরস্ক, বোখারা-গজনি-সমরখন্দ এবং বাগদাদ থিকা আগত মুসলমান বিজেতারা ‘যবন’ নামে সম্ভাষিত হইছিল। হিন্দুর মনোজগতে ‘যবন’ হইলো সেই ভিনদেশী যারা জিজিয়া ও খারাজি চাপায়। সম্পদের লগে সুন্দরী নারী লুণ্ঠন ও পাচার করে। স্থানীয় জনগণরে জবরদস্তির মাধ্যমে মুসলমান হইতে বাধ্য করে। তাগো ক্রীতদাস হিসাবে মুসলিম সালতানাতে পাচার করে। ভারতীয় নারিীগো দিয়া হারেম পূর্ণ করে। মন্দির ও মঠ ধ্বংসের কাজেরে অশেষ নেকি ও সওয়াবের কাম বইলা প্রচার করে। ভারতীয় সভ্যতার সুদীর্ঘ বিস্তৃতিরে কলা দেখাইয়া তারে ‘দারুল হরব’ ঘোষণার স্পর্ধা দেখায়!

বাহির হইতে আগত মুসলমান বিজেতা, ওলি-দরবেশ ও আরব বণিকগো মাধ্যমে ভারতে ইসলামের প্রসার ঘটছে বইলা ইতিহাসে লেখে। হাজার বছরের মুসলমানী শাসনে নতুন সংস্কৃতি সৃষ্টি হইছে। সাহিত্য, সঙ্গীত, স্থাপত্য, চিত্রকলা, এবং নবাবী রান্নাবান্না ও ফ্যাশনের অশেষ বিকাশ ঘটছে। কিন্তু মুসলমান বিজেতাগো নিয়া স্থানীয় জনগণের মধ্যে যে ত্রাস সৃষ্টি হইছিল, সেইটা দূরীভূত হয় নাই। ঊনিশ শতকে শ্রী বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কলমে মুসলমানরে গালি দিছেন বইলা অনেকে অভিযোগ করেন। বঙ্কিমরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও পাড় সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়া তুলাধুনা করেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী সেকালে ‘দুর্গেশনন্দিনী’র পালটা ‘রায়নন্দিনী’ লিখছিলেন। মুসলমান হিসাবে নিজের ‘অনুভূতি’ ক্ষুণ্ন হওনের অভিমানে কাজটি তিনি করছেন বইলা প্রচার আছে। কিন্তু মুসলমান কেন হিন্দু বঙ্কিমের গালি খায় সেইটা বুঝনের চেষ্টা সিরাজি সাহেব করেন নাই। ক্ষোভ-বিক্ষোভের সেই কাল অনেক দিন হয় বিগত হইছে। কিন্তু নিজেরে সকল জাতি ও ধর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভাবনের মোহ মুসলমানের অন্তর থিকা আজো দূর হয় নাই।

মুসলমানরা ‘কোরআন’রে জগতের অনন্য নিদর্শন বইলা মানেন। সেই ‘কোরআন’ নাকি ঘোষণা দিছে মহান আল্লাহ বনি ইসরাইলের পরিবর্তে মোহাম্মদী উম্মতগো শ্রেষ্ঠ হিসাবে নির্বাচন করছেন। বনি ইসরাইলরা বারবার সংশোধিত হওনের সুযোগ পাইছে। কিন্তু তারে কাজে লাগাইতে পারে নাই। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাগো অন্তরে সংশোধিত হওনের চেতনা সৃষ্টি করতে পারতেন। তাগো কলবে সেই ইচ্ছার সঞ্চার ঘটানো তাঁর পক্ষে কঠিন কাম আছিল না। কিন্তু তিনি সেই ইচ্ছা হইতে নিজেরে প্রত্যাহার কইরা নিছেন। নতুন নজির স্থাপনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছেন। ফলে মূসা ও ঈসার স্থলে মোহাম্মদী উম্মতরা শ্রেষ্ঠত্ব পাইছে। পরম করুণাময়ের কৃপায় জগতের সকল কওমের মধ্যে দ্বীনে মোহাম্মদীরা শ্রেষ্ঠত্ব পাইছে। মূর্তি পূজারীগো ওপরে তো অবশ্যই। এই দ্বীনি বিশ্বাস নিয়া মুসলমান বিজেতা ও ওলি-দরবেশরা মিশর ও ভারতের দিকে যাত্রা করছিলেন। বহু দেবতায় বিশ্বাসী মিশরের সভ্যতা-সংস্কৃতির মধ্যে ইসলামী কৃষ্টি ও মূল্যবোধের প্রসার ঘটানোয় তারা সফল হইছেন। যার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ একমাত্র খতনা করার পুরানা প্রথা ছাড়া মিশরীয় সভ্যতার বিশেষ কোনো চিহ্ন মিশরদেশী মুসলমানগো অন্তরে আর অবশিষ্ট নাই। আরব জাতীয়তাবাদের চাপে মিশরীয় সংস্কৃতি ইসলামী সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হইছে। জামাতের গলিভাই মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্য দিয়া সেই সংস্কৃতি এখন মহীরুহ হওনের অপেক্ষায় আছে। যদিও সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা নিজেরে সেখানে নিরাপদ ভাবনের সাহস রাখেন না। ‘ওমরের চুক্তিনামা’র (Pact of Omar) পরোক্ষ চাপ তাগো সইতে হয়।

ভারতবর্ষে ইসলাম মিশরের অনেক পরে আসছে। তবে মিশরের ন্যায় শক্ত শিকড় গাড়তে পারে নাই। কারণ ‘ধর্মীয় বিশ্বাস ও দর্শনে’ জাতিরে বিকশিত করনের দিক থিকা ভারতবর্ষ মিশরের চাইতে অগ্রসর আছিল। ভারতবর্ষ বেদ, উপনিষদের সূতিকাগার। রামায়ণ, মহাভারতের মতো ধ্রুপদী গ্রন্থ এই সভ্যতার জল-হওয়ায় অঙ্কুরিত হইছে। এই ভারত হইলো মায়াবাদ ও শূন্যবাদের প্রবক্তা। ন্যায়, নব্যন্যায় শাস্ত্রের প্রণেতা। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মের তরঙ্গে সে প্লাবিত হইছে। তিনটি সেমেটিক ধর্ম ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম মিলা যে থিওলজি সৃষ্টি করছে হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম তারে একাই অতিক্রমের শক্তি রাখে। গণিত, জ্যোতিঃর্বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ, ব্যাকরণ ও কামশাস্ত্রে ভারতে তুলনারহিত অগ্রগতি সাধিত হইছিল। কাব্য ও নাট্য সাহিত্য, স্থাপত্য ও চিত্রকলায় ভারতের লগে গ্রিস ও পারস্য সভ্যতার তুলনা হইতে পারে। হাজার বছর ধইরা ভারতবর্ষ নিজের ভিতরে নিজে তরঙ্গিত হইছে। সে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর। সভ্যতারে দু’হাত ভইরা উৎকর্ষ উপহার দেওনের কৃতিত্ব ছিল তার একার। অন্যদিকে কলিযুগে নিপতিত হওনের দায়ভারও সে একা বহন করছে। ভারত মানে শুধু একটা ভূখণ্ড আছিল না। এইটা হইছে সেই মহাদেশ যার বৈচিত্র্য অনিঃশেষ। বাহির হইতে তরঙ্গের পর তরঙ্গ আসছে। লুণ্ঠন, নিপীড়ন ও অত্যাচারে এই ভূবর্ষ আবিল হইছে। তবু সে নিঃশেষ হয় নাই। তারে নির্বাপতি করন যায় নাই। ভারতবাসীর ‘অনুভূতি’র জগতে ইসলাম এমন কোনো বিপ্লব ঘটাইতে সক্ষম হয় নাই যারে অভূতপূর্ব আখ্যা দেওন যায়। ভারতবর্ষের হিন্দু-বৌদ্ধ ও আদিবাসীরা প্রতিমা-বিরোধী ইসলামের আগমনে উৎফুল্ল হওনের পরিবর্তে ভীত ও সংক্ষুব্ধ হইছিল। এক হাজার বছরের মুসলমান শাসন স্থানীয়গো মন থিকা সেই ভয় ও সংক্ষোভ দূর করতে পারে নাই।

ভারতীয় অভিজাত সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণে আগ্রহ বোধ করে নাই। বর্ণশাসিত শূদ্র, নমঃশূদ্ররাও সকলক্ষেত্রে করছে ইতিহাসে এমন প্রমাণ নাই। যুগ-যুগ ধইরা উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুগো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য লোকে যুগে-যুগে নানা পেশা বাইছা লয়। সেই পেশার ওপর ভর কইরা তার একটা পরিচয় গইড়া উঠে। ভারতবর্ষে বর্ণ বলতে পেশা ভিত্তিক সেই পরিচয়টারে স্বীকৃতি দেওনের ইতিহাস আছে। এর মধ্যে জাত-পাতের কোনো বালাই ছিল না। সেটা পরে সৃষ্টি করা হইছে। কালের ফেরে পেশা ভিত্তিক বর্ণ-পরিচয় জাত-পাত ভিত্তিক ধর্মীয় ‘অনুভূতি’র দিকে মোড় নিছিল। উঁচুজাত ও নিচুজাত-এ সমাজরে বিভক্ত করার ফলে বৈষম্য দীর্ঘ থিকা দীর্ঘতা লাভ করছে। মহাত্মা গান্ধি এইটা নিয়া জোর ফাইট দিছেন। কিন্তু ভারত এখনো জাত-পাতের সমস্যা থিকা মুক্ত হইতে পারে নাই। ফলে দলিত জনগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক অভিমান দিনে-দিনে তীব্রতা পাইছে। ভারতীয় সমাজে ‘উদ্ভিদসুলভ জড়তা’ সৃষ্টি হওনের পেছনে এই বৈষম্য ক্ষতিকর ভূমিকা পালন করছে। বিরাট এই জাতিসত্তা তাই বহিরাগত বিজেতাদের প্রতিহত করতে পারে নাই। ভারতীয়রা অবিরত ভারতবর্ষে তরঙ্গিত হইছে। মহাদেশের বাইরে বিজেতা ও শাসক রূপে নিজেরে প্রসারিত করতে পারে নাই। জলবায়ু সেইক্ষেত্রে তারে বাধা দিছে। তার ভিতরে সৃষ্ট সংঘাতগুলা দেয়াল হইয়া দাঁড়াইছে। ভারতীয় জীবন-দর্শন ও সংস্কৃতি সেই তাড়না থিকা তারে নিবৃত্ত করছে। ফলে বহিরাগতের আক্রমণে ভারতের রাজ্যগুলা বারবার পরাস্ত হইছে। অন্যের ওপর জয়ী হওনের জিগীষা গ্রিক, রোমান ও পারস্য সভ্যতারে গতিশীল করছিল। রাষ্ট্র ও সামাজিক ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন সাধিত হইতে তাই সময় লাগে নাই। ভারতের বেলায় এমন ঘটনা ঘটে নাই। বিপুল সমৃদ্ধির মধ্যেও ভারতবাসী তাই দুঃখ-দারিদ্র্যে দিন পার করছে। বহিরাগতের চাবুক তারে বারবার শাসন করার সুযোগ পাইছে। একটা সমৃদ্ধ সভ্যতার জন্য বিষয়টা খুবই মর্মান্তিক।

প্রশ্ন হইলো, বহিরাগত মুসলমানরা কি সেই ধারবাহিকতায় ব্যতিক্রম হইতে পারছিলেন? ইতিহাস সেইটা বলে না। মুসলমান রাজা-রাজড়া, ঐতিহাসিক ও ভিনদেশী পর্যটক ভারতে ইসলামের প্রসার ও মুসলমান শাসনের খুটিনাটি বিবরণ রাইখা গেছেন। উনাগো সেই বিবরণে সুখকর কোনো উত্তরণের ইঙ্গিত নাই। বরং এই ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে যে, ব্যাপক সম্পদ লুণ্ঠন, রমণী সম্ভোগ, মুসলমান হওনের জন্য ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ এবং জোরপূর্বক রাজস্ব আদায়ের সংস্কৃতি থিকা মুসলমান বিজেতা ও শাসকরা বাহির হইতে পারেন নাই। ভারতে ইসলাম প্রচারের মিশন নিয়া আগত ওলি-দরবেশরা মুসলমান শাসকগো এইসব অরাজকতা নিয়া টু-শব্দ করেন নাই। বরং শাসকগো পৃষ্ঠপোষকতায় দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করছেন। মূর্তি পূজারী হিন্দুরা উনাগো ‘অনুভূতি’র জগতে ‘কাফের’ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো স্বীকৃতি লভে নাই। ইসলাম প্রচারে আগত বিজতো ও ওলি-দরবেশরা ভারতবাসীর মেধা ও স্বাতন্ত্র্যবোধের প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শনে সর্বদাই কুণ্ঠা বোধ করছেন।

স্থানীয় জনগণ তাই ‘ইসলামী করপ্রথা (জিজিয়া ও খারজি)’, বিধর্মীগো লগে মুসলমানগো বোঝাপড়া করার তরিকা গ্রহণ করতে পারে নাই। সিন্ধু বিজেতা মোহাম্মদ বিন কাশেমের ব্যাপক সম্পদ লুণ্ঠন ও জোরপূর্বক মুসলমান করনের স্মৃতি স্থানীয় লোকজন তাগো মন থিকা বিলীন করতে সক্ষম হয় নাই। গজনির সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারতে হামলা করছিলেন। সম্পদ ও নারী লুণ্ঠনে মাহমুদ উনার ‘ইমানী’ দায়িত্ব শেষ হইছে বইলা ভাবেন নাই। সেমনাথ মন্দির নিজ হাতে ধ্বংস করছেন। ভারতীয় সভ্যতার ঐতিহ্য বইলা স্বীকৃত ধর্মীয় স্থাপনাগুলারে নির্মমভাবে বিনষ্ট করছেন। এইগুলা নাকি ‘কুফরি’র প্রতীক! সুতরাং ধ্বংস করা ফরজ! সুলতান মাহমুদ ভারতে যে-কাণ্ড করছিলেন, আফগানিস্তানে সেইটা এখন তালেবানরা করছে। বামিয়ানের বৌদ্ধ মূর্তি অনুরূপ এক অজুহাতে ধ্বংস করছে। আমির তিমুর দিল্লি অভিযানের তিন দিনে আড়াই লক্ষ কাফের নিধনের মাধ্যমে ‘ইমানী’ দায়িত্বের পরাকাষ্ঠা প্রর্দশন করছিলেন। আর বঙ্গ-বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন বিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বৌদ্ধ সভ্যতার প্রতীক নালন্দার গ্রন্থাগারে আগুন দিয়া নিজের ‘ইমানী’ দায়িত্ব পুরা করছেন। মজার ব্যাপার হইলো, হেফাজতিরা যেমন ব্লগ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না, বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে খলজিও কিছু জানতেন না। তাতে কী! ‘কাফের’, ‘নাস্তিক’ নিধনের সওয়াব হাসিলে এতো জানাজানির কী আছে! মন্দির, মূর্তির আদলে কিছু একটা থাকলেই হইলো। চেহারা ও পোশাক-আশাক দেইখাও ‘কাফের’ চিনন যায়। জানাজানির দায়িত্ব মাহমুদুর, ফরহাদের ন্যায় এজেন্টরা নিষ্ঠার সহিত পালন করতে আছেন। প্রয়োজনে তাগো জিগাইলে চলবে। নিজেরা জানোনের ফুরসত কই? নালান্দার মুণ্ডিতমস্ক লামাগো তলোয়ার দিয়া কচুকাটা করনের সময় বখতিয়ারের আশপাশে ফরহাদ, মাহমুদুরের মতো গুণীজনরা ছিলেন না। উনারা থাকলে হয়তো এই বঙ্গবিজেতারে বৌদ্ধ ও হিন্দুগো তফাত এবং কোন জায়গায় এরা দুজনেই আসলে ‘কাফের’ সেটা ধরাইয়া দিতেন। অগত্যা শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ লামাগো হিন্দু ‘কাফের’ ভাইবা বখতিয়ার ‘গণহত্যা’ চালাইছেন। মুসলমান হিসাবে নিজের ‘ইমানী’ দায়িত্বও পুরা করছেন।

এইসব নারকীয় অভিযান আর স্বকীয়তাবোধের ওপর আঘাত স্থানীয়গো মনে মুসলমান সম্পর্কে ঘৃণা তৈয়ার করছিল। ভারত অগমনের বছরগুলায় মুসলমানরা হিন্দুগো ‘ধর্মীয় অনুভূতি’রে তীব্রভাবে জখম করছেন। হিন্দুরাও সময়-সুযোগে মুসলমানগো দিকে পালটা ঘৃণা ফেরত দিছে। হাজার বছরের ইতিহাসে সেই পালটা-পালটির প্রশমন আর ঘটে নাই। ঘটানোর চেষ্টা মুসলমানগো মধ্য থিকা জোরালো হয় নাই। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও বাদশাহ আকবরের কথা অনেকে কইতে পারেন। উনাগো ভূমিকা নিয়া বিপরীত তথ্য আছে। ‘অনুভূতি’র প্রশ্নে হিন্দু-মুসলমানে বিরোধ বাধনের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় খিয়াল রাখন দরকার। হিন্দু ধর্মের দার্শনিক তাৎপর্য ও গভীরতা অনেক ব্যাপক আছিল। গভীরতা ব্যাপক হওনের কারণে এই ধর্মে সংস্কার ও বৈচিত্র্যগুলা এতো ব্যাপক হইছে। আজব সব শাখা-প্রশাখা সৃষ্টির ভিতর দিয়া নিজেরে সে বিচিত্ররূপিনী কইরা নিছে। আপনি এখন কোনটারে হিন্দুত্বের জড় ধরবেন? সবগুলা স্বরূপেই থিওলজি, কালচার ও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়া ডকট্রিন সৃষ্টির ক্ষমতা এতো ব্যাপক যে স্তম্ভিত হইতে হয়। আর্যগো মাধ্যমে বিকশিত উপনিষদের মর্মবাণীরে সে বহুভাবে ব্যবহার করছে। তার সাথে সিন্ধু ও দ্রাবিড় সভ্যতার কালচার আইসা যোগ হইছে। আবার প্রাচীন আদিবাসীগো আচার-অনুষ্ঠানরে নিজের ‘বিশ্বাস ও অনুভূতি’র মধ্যে সমন্বিত কইরা নিছে। নতুন স্বরূপ ও মহিমায় তারে ভাববাদের প্রতীকে পরিণত করছে। বিচিত্র স্বরূপে নিজেরে কনভার্ট করনের এই ক্ষমতা হিন্দু ধর্মরে ভারতে নিঃশেষ হইতে দেয় নাই।

বহিরাগত ধর্মের আগমন হিন্দুরা এভাবেই প্রতিহত করছে। তারা নির্যাতিত হইছে। কিন্তু চাপের মুখে ধর্ম ছাড়ে নাই। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র আমলে শ্রী চৈতন্য ভক্তি ও প্রেমরসে বাঙালিগো হৃদয়ে জোয়ার তুলছিলেন। সেইটা ছিল হিন্দু ধর্মের ক্ষয়িষ্ণু হওনের যুগ। অনাচার ও পঙ্কিলতার মধ্যে সমাধিস্থ হওনের দশা হইছিল তার। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বিচক্ষণ শাসনে মুসলমান হওনের অনুভূতি হিন্দুগো মনে জাইগা উঠছিল বটে! কিন্তু ‘রাধা-কৃষ্ণের’ অশ্লীল পরকীয়ারে অধ্যাত্মরসের মহিমায় উন্নীত কইরা শ্রী চৈতন্য সেই জোয়ার প্রতিহত করলেন। হিন্দুগো চেতনায় নতুন তরঙ্গ নিয়া আসলেন। শিব-পার্বতীর শক্তিসাধনার মধ্যে আদিরসের ব্যাপক ছড়াছড়ি আছে। কালিদাস পড়লে সেইটা ভালোই টের পাওন যায়। শৈব ও তান্ত্রিক ধারার মধ্য দিয়া সেই আদিরস শিব ও কালীরে পৃথক মহিমায় উন্নীত করছে। শ্রী চৈতন্য সেদিকে গমন করেন নাই। শৈবধর্মের শক্তিসাধনার বিপরীতে প্রেম ও ভক্তির শান্তরস নিয়া হাজির হইছিলেন। গানের রসে বাংলা ও ভারত মজিলো। রাধা-কৃষ্ণের লীলারঙ্গে প্রকৃতি-পুরুষের সনাতন ব্যঞ্জনা নতুন অভিব্যক্তি লাভ করছিল। ফলে ঈশ্বর ‘অনুভূতি’র তরঙ্গে আরেকটি পালক যোগ হইছিল। হিন্দুরা পরে তারে বৈষ্ণবধর্ম নামে বিশিষ্ট করছে।

ভারতবর্ষের সুবিশাল ভাববাদী তরঙ্গ হইতে শ্রী চৈতন্য সামান্য নুড়ি চয়ন করছিলেন। সেটারে দিয়াই মুসলমান হওনের জোয়ার ঠেকাইলেন। নিজেরে অবিরত রিফর্ম বা সংস্কার করনের এই ক্ষমতা হিন্দুধর্মের শক্তিরে সংহত কইরা রাখছে। তার মনে ‘ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতি’ নিয়া সংস্কার তাই সহজে পরাভব মানে না। ঊনিশ শতকে ব্রাহ্ম মতবাদের মধ্য দিয়া হিন্দুরা নিজেরে আবারো রিফর্ম করছে। ব্রাহ্ম মতবাদ খ্রিস্টান হওনরে প্রবণতা থিকা তাগো ‘অনুভূতি’রে সুরক্ষা দিছিল। ফলে মিশর ও ভারতবর্ষে ইসলামের অভিজ্ঞতা এক হয় নাই। মুসলমান বিজেতা ও ওলি-দরবেশরা ভারতবর্ষের বিরাট ভাববাদী দর্শন আত্মস্থ করেন নাই। সেই মানসিতকতা তাগো মধ্যে জাগরিত হয় নাই। তবে যারা করছেন তারা ইসলাম ছাড়তে বাধ্য হইছেন। তাগো বিশ্বাসের মধ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মায়াবাদের বিচিত্র ভাবনা ও সাধনপদ্ধতিরে সমন্বয় কইরা নিতে হইছে। ভারতবর্ষে ইসলামের এই স্বরূপ সুফিবাদ নাম নিছে। সুফিবাদ আবার লোকায়ত ‘অনুভূতি’র জগতে মারিফতের বলয় সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের বাউল-ফকিররা সেই বলয়ে নিজেরে একাত্ম করছেন। একটি সমন্বিত সাধনপদ্ধতি নিয়া অগ্রসর হইতে চাইছেন। তাগো গানে ও জীবনযাপনে সমন্বয় ও সামঞ্জস্যকরণের সেই ছবি বারবার উইঠা আসছে। যার ফলে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় ‘চেতনা ও অনুভূতি’ এইসব বাউল-ফকিরগো শাসন করতে পারে নাই। মারিফতের অনুভব দিয়া ধর্মীয় অনুশাসনের গণ্ডি তারা অতিক্রম করছিলেন। লালনের মতো বাউল-ফকির সৃষ্টি ও স্রষ্টার পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে সত্তা ও মানবতার লীলা অন্বেষণ করছেন। যার মধ্যে একটা ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনার আভাস প্রকটিত হইছে বইলা অনেকে ধারণা করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ সেই চেতনার স্ফুরণ থিকা নিজেরে ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’য় রিলেট করায়।

ভারতবর্ষের মরমী সাধনার ঐতিহ্যের মধ্যে একীভূত ইসলাম আর সৌদির মরুতে বিকশিত শরিয়া-নির্ভর ইসলাম এক হইতে পারে না। এক হয়-ও নাই। শরিয়াপন্থী ইসলাম সুফিবাদ ও মারিফতের সাধন-তরিকারে স্বীকৃতি প্রদান করে নাই। সুফিবাদের সমর্থনে ইমাম গাজ্জালির ব্যাপক ওকালতির পরেও করে নাই। বহিরাগত মুসলমান শাসক এবং ওলি-দরবেশরা স্থানীয় লোকজনের মধ্যে শরিয়তের কঠোরতাই প্রচার করছেন। কোরআন, হাদিসের ব্যাখ্যা ও মাযহাবের আইন দিয়া ভূবর্ষ শাসনের খোয়াব দেখছেন। স্থানীয়রা সেটা অন্তর থিকা গ্রহণ করতে পারে নাই। ধর্মীয় ‘অনুভূতি’ নিয়া তাগো মনের চিরায়ত সংস্কার সেইক্ষেত্রে বাধা হইছে। আবার ভারতমাটিতে যে ধর্মগুলার জন্ম ও বিকাশ ঘটছে তাগো থিওলজি সৃষ্টির ক্ষমতাও ইসলামরে ‘ওয়েলকাম’ কইতে বাধা দিছে।

ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারে মুসলমানদের ভূমিকা নিয়া বাজারে বহু কেচ্ছা প্রচলিত আছে। বহু হিন্দু ঐতিহাসিক এই কেচ্ছাগুলানরে সত্য বইলা সার্টিফিকেট দিছেন। কিন্তু কাহিনীগুলার মধ্যে বিস্তর ফাঁক-ফোকর ও অতিকথনের প্রবণতা উনারা খেয়াল করেন নাই। মুসলমান শাসনের কালে সংকলিত রাজা-রাজড়াদের জীবনী ও ইতিবৃত্ত, বিশ্বস্বীকৃত মুসলমান ঐতিহাসিক ও পর্যটকগণের বিবরণ উনারা মন দিয়া লক্ষ করেন নাই। পশ্চিমা পণ্ডিতগো বিবরণ থিকা ধার কইরা মুসলমানগো ইতিহাস বর্ণনা করছেন। কালের গতিধারায় সেইটা ক্রমে বাহির হইতেছে। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানে মনের বিরোধ, মানসিক ও সামাজিক অবেরোধ অথবা একে অন্যরে ঠেকানোর মানসিকতা ইংরাজ আগমনের পরে শুরু হয় নাই। বিরোধ-অবরোধ শুরু থিকা ছিল। বেনেপুত্র ইংরাজ সেই বিরোধ-অবরোধের বাস্তবতারে ব্যবহার করছে মাত্র। সুতরাং হিন্দু-মুসলমানের সংঘাতের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়া যারা ইউরো-সেন্ট্রিক কাল থিকা হিসাব-নিকাশ শুরু করেন তাগো নতুন কইরা বিবেচনা করার অনুরোধ রাখা যাইতে পারে।

‘অনুভূতি’র মীমাংসা ও লীগ-বিএনপি’র মিলামিশা : তবে কি মজা মারবে ফজা ভাই?

১৪.
‘ধর্মীয় অনুভূতি’র প্রশ্নে হিন্দু ও মুসলমানগো মানসিক বিরোধ বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভারতরে জারি রাখতে বাধ্য করে। জাতীয়তাবাদী ভাবনা প্রকাশের ক্ষণে মেজর জিয়া সেই সুযোগ নিছেন। হিন্দু-মুসলমানের চেতনাজগতে ভারত নিয়া হাজার বছরের যে বিরোধ-বিচ্ছেদ তারে প্রয়োগ করছেন। একটা একাত্তর সেই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যথেষ্ট আছিল না। একাত্তরে স্বাধিকারের ‘চেতনা ও অনুভূতি’ এতো ব্যাপক হইছিল যে খুটিনাটি বিবাদগুলা বড়ো হওনের সুযোগ পায় নাই। ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালি। বাঙালি’ -এই আওয়াজের তরঙ্গে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-পাহাড়ি সকলে বিলীন হইছিল। জাতীয় জীবনে এমন হইতে পারে। বৃহৎ চেতনার তরঙ্গে ক্ষুদ্র চেতনার ঢেউগুলো দিশা পায় না। শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম পর্যায়রে তার নতুন নির্দশন বইলা গণ্য করা যাইতে পারে। কিন্তু বৃহৎরে একসময় স্থির হইতে হয়। একাত্তর যেমন স্বাধিকার আদায়ের মধ্যে স্থির হইছিল। ছোট তরঙ্গগুলা তখন আবারো মাথা তুলছে। বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় মুজিব সরকার মুক্তিযুদ্ধের টাটকা স্মৃতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হইছিলেন। মাল্টি ক্লাস সোসাইটির বৈশিষ্ট্যগুলা বিবেচনায় নিছিলেন। লীগের উদ্দেশ্য কিন্তু খারাপ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জটিলতার কারণে পাবলিকের কাছে সংবিধানের চেতনারে প্রচার করা সম্ভব হয় নাই। দেশ স্বাধীন হওনের পর শেখ মুজিবের মিত্র বলতে কেউ ছিলেন না। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে লীগের ভূমিকা নিয়া মতভেদের কারণে দলের ভিতরে দূরত্ব ও জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হইছিল। বনিবন না-হওয়ার ফলে অনেকে আবার পৃথক এজেন্টে পরিণত হইছিলেন। শেখ মুজিব নিজেও অনেকরে দূরে ঠেইলা দিছিলেন। অবিশ্বাস, বিদ্বেষ আর সমালোচনার সংস্কৃতি মুজিবরে একা ও আক্রমণাত্মক হইতে প্ররোচনা দিছিল। সৎ পরামর্শ পাইছেন। কিন্তু তারে বিবেচনা করনের ক্ষেত্রে কমজোরির পরিচয় দিছিলেন। নানামুখী এজেন্টের চাপ সামাল দিতে না-পারা উনার নিহত হওনের বড়ো কারণ। বাঙালির সবচাইতে বড়ো আইকন গুলিবিদ্ধ হওনের বিস্ময় নিয়া সিঁড়িতে পতিত হইলেন। আমি বলি, বাংলাদেশ পতিত হইলো। বাহাত্তরের ‘অনুভূতি’ পতিত হইলো। যারে আর উঠানো যায় নাই। বাহাত্তর নিয়া ডায়ালগের প্রয়োজন হয়তো ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতা যে ‘চেতনা ও অনুভূতি’রে হাজির করে সেটা নিয়া অর্থপূর্ণ আলোচনা হইতে পারতো। সংশোধন, পরিমার্জন কঠিন আছিল না। কিন্তু সেইটাও হয় নাই।

আবারো বলি, মেজর জিয়া সুযোগ নিছেন। সঙ্গে জামাত ও ইসলামপন্থী দলগুলারে সুযোগ কইরা দিছেন। এই এজেন্টরা উনার হইয়া জাতীয়তাবাদের ইস্যুরে আরো জটিল করছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থিকা বাঙালির আত্মপরিচয় নির্ণয়ের আওয়াজ জোরালো করছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিদ্যমান ‘চেতনা ও অনুভূতি’র বিপক্ষে ইসলামী জাতীয়তাবদী ‘চেতনা ও অনুভূতি’রে হাজির করছে। অত্মপরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নে একটা বিতর্ক খাড়া কইরা দিছে। বিএনপি’র পেটের ভিতরে বইসা এজেন্টরা এই কাজটি করছে। সেইসঙ্গে লীগেরে পচানোর রাজনীতি তো ছিল-ই। ইসলামপন্থী এজেন্টরা বাংলাদেশের জনগণের মনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা দেওনের কোশেশ করছে যে, সংবিধানে ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’রে প্রমোট করনের মাধ্যমে লীগ প্রমাণ কইরা দিছে যে, নামে মুসলমান হইলেও কামের বেলায় সে আসলে হিন্দু। ভারতপন্থী ও ভারতপ্রেমী। সুতরাং লীগের হাতে বাংলাদেশের সাধের স্বাধীনতা নিরাপদ না।

বিএনপি ও এজেন্টগো কারণে এই যে দ্বন্দ্ব উৎপাদিত হইলো তার সমাধান আর হয় নাই। বাহাত্তরের সংবিধানে বহুত ফাঁক-ফোকর যে আছিল সেটা নিশ্চিত। চার মূলনীতির মধ্যে সমাজতন্ত্রের কথা সেখানে বলা হইছে। কোন সমাজতন্ত্র? মার্কস সায়েবের সমাজতন্ত্র? চিনা না মস্কোপন্থীগো সমাজতন্ত্র? মাওলানা ভাসানীর সমাজতন্ত্র? নাকি এই সমাজতন্ত্র অন্যকিছুরে ইঙ্গিত করে? মূলনীতির মধ্যে সমাজতন্ত্রের সাথে গণতন্ত্র যুক্ত করা হইছে? প্রশ্ন হইলো, কোন গণতন্ত্র? পুঁজিবাদী গণতন্ত্র? নাকি অন্যকিছু? যদি সেটা পুঁজিবাদী গণতন্ত্র হইয়া থাকে তাইলে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে তার জুড়ি মিলানো ক্যামনে সম্ভব? তারা কি একে অন্যরে কনডেম করে না? এই প্রশ্নগুলান তখন উঠে নাই। পরে উঠছে। যে-কারণে বাহাত্তরের সংবিধানরে টিকানো সম্ভব হয় নাই। লীগ নিজেও তাতে ফেরত যাইতে পারে নাই। যাওন সম্ভব না।

আত্মপরিচয় নিয়া লীগ, বিএনপি’র বিপরীতমুখী অবস্থান ইসলামী মোর্চা ও স্বৈরাচারী শক্তিরে লাভবান করছে। বিএনপি তাগো প্রমোট করছে। পরিস্থিতির ফেরে লীগ তাগো সাথে আপোসে গেছে। সহায়তা দিছে। ফলে ইসলামী মোর্চা ও দলগুলা বাংলাদেশে পৃথক একটি শক্তিবলয় হওনের দিকে অগ্রসর হইতে পারছে। লীগ, বিএনপি’রে এখন এই এজেন্টগো কথায় উঠ-বস করতে হয়। সংবিধানের সর্বশেষ অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্যে সেটা প্রতিফলিত হইছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাইখা ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ সংযোজন করা হইছে! একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা ও অনুভূতি’ থিকা উৎসারিত ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা লীগের পক্ষে বাতিল করা সম্ভব হয় নাই। কাজেই ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ সে সংযোজন করছে। আবার এজেন্টগো কারণে ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’রে বাদ দেওনের হিম্মত তার নাই। ফলে লীগ প্রণীত এই সংবিধান ‘চেতনা ও অনুভূতি’র মধ্যে আজব জগাখিচুড়ি তৈয়ার করে। মতিভ্রম সৃষ্টি করায়। বাংলাদেশে এক পক্ষ ইসলামরে রাষ্ট্রধর্ম করনের পক্ষে। ‘ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতি’ হেফাজতের ইস্যুতে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ থাকনের বিষয়টি তারা ক্যামনে মাইনা নিবেন? আরেকপক্ষ ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের দাবি উঠাইছেন। তাগো মতে রাষ্ট্র ইস্পাতকঠিন নিরপেক্ষতার মধ্য দিয়া সকল মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিরে সুরক্ষা দিবে। এই কাজটি নিশ্চিত করনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার ধর্মরে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করার যুক্তি ও প্রয়োজন নাই। তারা এখন ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’র মধ্যে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’-এর বিচরণ ক্যামনে সহ্য করবেন? আশ্চর্যই বটে!

এই দ্বি-চারিতা প্রমাণ করায় লীগের হৃদয়ে একাত্তরের ‘অনুভূতি’ বিশেষ অবশিষ্ট নাই। অথবা মৃতপ্রায় হইছে। বাংলাদেশী জনগণের মনোজগতে চেতনাসৃষ্টির ক্ষমতা সে হারাইছে। উভয়পক্ষরে খুশি রাখনের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওন ছাড়া দ্বিতীয় কোনো এজেন্ডা তার নাই। লীগের এই নির্বাচনমুখী পলিটিকস তার ভিত আরো দুর্বল কইরা দিছে। এই নপুংসকতায় ইলেকশান হয়তো জিতন যায়, রাষ্ট্রের অথবা কওমভুক্ত জনগণের উপকার করন যায় না। ‘আত্মপরিচয়’ জানার অধিকার জাতি রাখে। লীগ তারে সেইটা দিতে ব্যর্থ হইছে। আর বিএনপি সেটারে নিয়া পলিটিকসে লিপ্ত হইছে। দুই দলের আজব রাজনীতির ফল এই হইছে যে বাংলাদেশে ‘অনুভূতি’ একমাত্র রাজনীতিতে পরিণত হইছে। যে কোনো বিষয়ে মানুষের ‘অনুভূতি’ আহত হইতেছে। মাত্রাছাড়া রিএ্যাক্ট করনের প্রবণতা তৈরি হইছে। ৪২ বছর পার হওনের পরেও জাতি নিজের ‘আত্মপরিচয়’ সম্পর্কে নিশ্চিত না। এইটা নিয়া সে এখনো বিভক্ত ও মারমুখী। তার পক্ষে ‘যুক্তিশীল’ ও অপরের ‘স্বাধীনতা’য় বিশ্বাসী হওন কঠিন। ‘অনুভূতি’র মাতন হ্রাস করতে হইলে আত্মপরিচয় সম্পর্কে সন্দেহমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ‘অনুভূতি’ আসলে কী অথবা সেটা আসলেই ক্ষুণ্ন হয় কিনা এই তর্কেই জাতি নিজেরে নিঃশেষ করবে। আর ফাঁকতালে মজা মারবে ফজা ভাই। মতিভ্রমের শিকার মির্জা ফখরুল সাহেব আর ‘হুকুমের আসামী’ গ্রেপ্তারে ওস্দাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিরে ফজা ভাইগো হাতে সোপর্দ করবার চান কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেওনের টাইম বেশিদিন আর নাই। কাজেই সাধু সাবধান।
... ... ...
আহমদ মিনহাজ
২০।০৪।২০১৩

ছবি: 
24/08/2007 - 2:03পূর্বাহ্ন

মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।