শুশুক (১)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ১৯/০২/২০১৬ - ৫:৫৫পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অনেকদিন আগে এইদেশে একটি নদী ছিল। সে নদী প্রমত্তা, এ পারে দাঁড়িয়ে ওপার দেখতে পাবেননা - এমন তার বিস্তার। আমার দাদা-পরদাদারা গয়না নৌকায় নদী পার হয়ে গঞ্জে যেতেন, সোনাপুর গঞ্জ তখন অনেক দুরের পথ, যেতে আসতে পাক্কা দুই দিন। গয়না নৌকা দেখেননি তো? বিশাল সে নৌকা, এই যে মান্দার গাছটা দেখছেন - তা ধরেন নৌকার হালটাই হবে অত বড়, দুইজন মাল্লা লাগে সে হাল নাড়াতে। নৌকার মাঝখানে বেশ বড়সড় একটা ঘর, সে ঘরে দরজা আছে, জানালা আছে, আছে মাথার উপর খড়ের ছাউনি। ছাউনি থেকেই বোধকরি নাম হয়েছে ছই।

ছই এর পরেই মাস্তুল। মাস্তুলে নানান রঙের পাল, নানান সাইজের, একতলা, দোতলা এমনকি তিন চারতলা পালের নৌকাও চোখে পড়তো সে আমলে। নৌকার বাইরের দিকে আলকাতরার পুরু আস্তর, নদীর পানি গায়ে লাগলে পিছলে পড়ে। বানিয়ে, রাঙিয়ে, সাজিয়ে, গুছিয়ে নৌকা ভাসাতে ভাসাতে বছর ঘুরে যেতো। সেই দিন তো আর নেই, গয়না নৌকার শান শওকতও এখন শুধুই ইতিহাস। এক আধটা যে চোখে পড়েনা তা নয়, কিন্তু মন ভরে না। পুরনো ঢাকার টাঙ্গাগাড়ি দেখেছেন? টাঙ্গা টানা ঘোড়া আর রেসের ঘোড়ায় যে তফাৎ তেমনই পার্থক্য সে আমলের আর এ আমলের গয়না নৌকায়। নদীর কথায় ফিরে আসি। নদীর পানি ছিল কার্ত্তিক মাসের আমাবস্যার মতো কালো - অতল গভীর। ওই নদীতে নৌকা বাইতে বুকের পাটা লাগে। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবেন, ভরা পূর্ণিমায় আপনি নৌকার মাস্তুলে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে, চারিদিকে থৈ থৈ পানি, আকাশে কাসার থালার মতো চাঁদ, অগুনতি তারা, যেন আতশবাজির খেলা চলছে। আপনার মনটা উদাস, আপনি ভরা দমে হাতের বাঁশিতে দিলেন একটা টান। কিন্তু কে শুনবে সেই মোহন বাঁশির সুর? আপনার সঙ্গী সাথীরা তো তখন গভীর ঘুমে অচেতন। কে শুনবে? কে শুনত সেই কালে? নদীতে ছিল এক আজব প্রাণী, গ্রাম্য ভাষায় আমরা ডাকি শিশু, আপনারা বলেন শুশুক। তারা শুনত, চাঁদের আলোয় গয়না নৌকার সাথে পাল্লা দিয়ে সাতার কাটতো তারা। আপনাকে যে গল্পটা বলছি সে গল্পে শুশুকদের একটা ভূমিকা আছে। পুরনো কালের গল্প, আমার দাদার মুখে শোনা | তিনি শুনেছিলেন তাঁর বাবা, মানে আমার পরদাদার কাছে।

আমার পরদাদার নাম রণ শেখ। তাঁরা দুই ভাই, রণ শেখ বড়। দুই ভাইয়ের তখন জোয়ান কাল, মহিষের মত শক্তি তাদের গায়ে। কামলাদের সাথে পাল্লা দিয়ে হাল বায়, নিড়ান দেয়, খালি হাতে খামচে ধরে তেড়ে আসা পাগলা ষাঁড়ের বাঁকানো শিং। রণ শেখ চাষির ছেলে। সে আমলে মানুষ জন ছিল কম, চাষের জমিজমাও এখনকার মতো এমন ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায়নি। এক এক দাগে বিঘা বিঘা জমি, সে জমিতে উপচে পড়া ফসল। আষাঢ়-শ্রাবনে বিলের পানির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ত ধানের চারা। ভাদ্রে শীষ, আশ্বিনে রঙ, পাকতে পাকতে আরও একমাস। অগ্রাহায়নের শুরুতেই কাটা-ঝাড়া-মাড়াই সব শেষ, ঘরে ঘরে নতুন ধান, আপনাদের ভাষায় নবান্ন। বাতাসে ততদিনে একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আমেজ, খাল বিলের পানিও টানের দিকে। হৈ হল্লা, মাছ ধরা, গানবাজনা, যাত্রা-পালায় গ্রামে যেন সুখের বান বয়ে যেতো। গ্রামে তো তখন বিজলি বাতি ছিলনা, কেরোসিনেরও অনেক দাম। সন্ধাবাতি জ্বলে উঠতো জ্বলতে হয় বলেই, রাতের খাওয়া দাওয়া তো সূর্য ডোবার আগেই শেষ। অন্ধকার জমাট বেঁধে এলে, সন্ধাবাতি নিবিয়ে বাড়ির উঠোনে খড়ের স্তূপে আগুন জ্বেলে চারপাশে গোল হয়ে বসতো সবাই। শুরু হতো কিসসা, গল্পের তো অভাব নেই, যতো মানুষ ততো জীবন, যতো জীবন ততো গল্প। এভাবেই কেটে যেতো আরও কিছুদিন, একটা সময় শীত নামত গ্রামে। সেকি কামড় শীতের! পৌষ পেরিয়ে মাঘ, মাঘের পরে ফাল্গুন…… বৈশাখ পর্যন্ত মানুষ জনের হাতে কোনও কাজকর্ম নেই। জোয়ান ছেলেগুলোর দারুণ দুঃসময়। কারও কারও কথা অবশ্য আলাদা, তাদের মনে ফুর্তির জোয়ার। এই সময়টায় গ্রামে বিয়ের ধুম লাগতো কিনা। কিন্তু বিয়ে কি মুখের কথা? ঘটক ডাকো, মেয়ে দেখো, তারপর আছে দেওয়া থোওয়া, ঝামেলা তো কম নয়! বিয়ে শাদি কপালের ব্যাপার ভাইজান, কয়জনেরই বা এমন কপাল হয়? অনেকেই বেরিয়ে পড়ত ঘর ছেড়ে। কেউ যেত গঞ্জে ব্যবসা করতে, কেউ যেত গানের দলে, কেউ বা উজান দেশে মাছ ধরতে। এক দুজন চলে যেত আসামে। আসাম তখন রূপকথার রাজ্য, কামাখ্যার দেশ, কামরূপের পুরী। শোনেন তাহলে।

রণ শেখের কাহিনী

রণ শেখের মন ভালো নেই, বিয়েটা এবছর হতে হতেও হয়নি। সরকার বাড়ির সেঝ মেয়েটাকে মনে ধরেছিল খুব। রণ শেখের দিন কাটে বাঁশি বাজিয়ে, কালীবাড়ির পেছনের তাল বাগানে বসে থেকে। বাগানের পশ্চিমে খালের ওপারে শুভরিয়া গ্রাম। বাগান থেকে শুভরিয়ার সরকার বাড়ির পুকুর ঘাট দেখা যায়, কোনও কোনও দিন দেখা মেলে নজিতন বানুর। রণ শেখের বুকটা হুহু করে উঠে, এই জীবন আর ভালো লাগেনা। ভালো লাগেনি রেজাক আলীরও, কিছুদিন হল সে নিরুদ্দেশ। আর কেউ না জানলেও রণ শেখ জানে ভিতরের খবর, বন্ধু গিয়েছে আসামে। সে দেশে নাকি রাজত্ব করে মেয়েরা, তারা পরীর মত সুন্দর, তারা জাদু জানে, রঙ্গ জানে। পুরুষ মানুষের দারুণ কদর সেদেশে, কোনভাবে একবার পা রাখতে পারলেই জীবন সার্থক। রেজাক আলি যে আর ফিরে আসবেনা সেটি নিশ্চিত। কামরূপ-কামাখ্যায় চলে যাওয়া জোয়ান ছেলেরা কখনও ফিরে আসেনা। ব্যতিক্রম শুধু শম্ভুনাথ।

শম্ভুনাথের বাবা আদিনাথ ছিল পরগনার পেয়াদা। পরগনার সাথে তালুকের বহুদিনের রেষারেষি, এমন কোনও বছর নেই যখন এক দুইটা লাশ পড়েনি কাটাখালির বিলে।লাঠিয়াল মরলে কেউ খবর রাখেনা, আত্মীয় পরিজন দিন কতক কান্নাকাটি করে, ওইটুকুই। আদিনাথের ছিল মন্দ কপাল। রাতের আঁধারে তালুকের মেজ কর্তাকে চিনতে পারেনি, আর লাঠিটাও ছিল লাঠির মতো, গাঁটে গাঁটে তেল মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে শক্ত করে তোলা। কেউ দেখেনি, কোনও সাক্ষী নেই, তারপরও ভুল করলো আদিনাথ, ভুল করলো পালিয়ে গিয়ে। বেশিদূর যেতে পারেনি, সোনাপুর গঞ্জের ঘাটে ধরা পড়লো কোম্পানির পাইকের হাতে। তালুকের লোকজন পারলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলে, কিন্তু কোম্পানি তাকে দাড় করালো কাঠগড়ায়, সোনাপুরের ইতিহাসে সে এক নতুন ঘটনা। বিচার চলতে চলতেই হঠাৎ মৃত্যু হয় আদিনাথের, গলায় গামছা বাঁধা লাশটা লটকে ছিল ফাটকের বরগায়। জেলের খাতায় আত্মহত্যা, গ্রামের মানুষের বিশ্বাস এটা তালুকদারের কাজ।

সেই ঘটনার এক মাস পরের কথা, পেয়াদা বাড়ির ছোটো বউ সন্ধ্যা বাতি জ্বালিয়ে মাত্র ফিরে এসেছে রান্না ঘরে। কেন যেন তার মনে হল এই ঘরে সে একা নয়, আরেকজন আছে। হাতের বটিটা শক্ত করে ধরে রেখে চোখের কোন দিয়ে তাকাতে চোখে পড়ে দারুণ রূপবতী এক কন্যা। আকাশ পাতাল রূপ তার, পরনে লাল শাড়ি, ঢেঁকির উপর বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ছোটো বউয়ের চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, হাতের আঙ্গুলের জায়গায় খালি হাড্ডি। ছোটো বউয়ের চিৎকার শুনে বাড়ির লোকজন এসে দেখে সে চোখ উল্টে পড়ে আছে ঢেঁকির পাশে। জ্ঞান ফেরার পর তার মুখে খালি একটাই কথা ‘ওলাবিবি'। পেয়াদা বাড়িতে সন্ধাবাতি জ্বলেছিল আর মাত্র দিন পাঁচেক। ওলাবিবির নজরে একবার পড়লে আর রক্ষা নাই। সপ্তা ঘুরতে না ঘুরতেই সব শেষ, বেচে রইলো কেবল শম্ভুনাথ। শম্ভুনাথও বিবাগী হয়ে কোথায় যেন চলে গেলো কিছুদিন পর। রণ শেখের তখন বাল্য কাল।

সেই শম্ভুনাথ ফিরে এসেছে বছর দুই আগে, সে এখন বিরাট ওঝা। ভেঙ্গে পড়া পেয়াদা বাড়িতে তার আখড়া | তুকতাক, মারণ-উচাটন আর তন্ত্রমন্ত্র নিয়েই তার দিন কাটে। শম্ভুনাথ এর বউ আগুনের হলকার মত সুন্দরী, দুধে আলতা গায়ের রং। তার কটা চোখের দিকে তাকালে কেমন যেন অবশ অবশ লাগে। গ্রামের মানুষের ধারণা সে কামরূপ-কামাখ্যার মেয়ে। সত্য মিথ্যা যাচাই করার সাহস কারো নেই। শম্ভুনাথ পেয়াদার ছেলে তার উপর মন্ত্রসিদ্ধ।  

উত্তর পাড়ার সীমান্ত ঘেঁষে পেয়াদা বাড়ি , বাড়ির কোল ঘেঁষেই বয়ে চলেছে ধীরজা, আমাদের গল্পের সেই নদী। পাশেই বয়সের ভারে রুক্ষ হয়ে আসা একটি তাল গাছ, তার তলায় ভাঙ্গাচোরা একটা আখড়া। সেখানে সন্ধ্যা বেলায় শম্ভুনাথ গেরুয়া পড়ে বসে থাকে, ধুনির আগুনে কল্কি জ্বালিয়ে দম দেয়, মন্ত্র পড়ে। আসে পাশে ঘুর ঘুর করে গ্রামের কিছু ছেলে ছোকরা। এই মাঝ পৌষে এদের কোনো কাজ কর্ম নেই - নেই দুরে কোথাও যাবার হিম্মত | সারাদিন আখড়াতেই পড়ে থাকে, এটা ওটা ফরমায়েশ খাটে। এদের কয় জন আসলে শম্ভুনাথের কৃপাপ্রার্থী আর কয়জন শম্ভুনাথিনির, কে জানে!

সন্ধ্যা হয় হয়, রণ শেখ ভ্রু কুঁচকে আখড়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আজ আসর বসেনি। একবার ভাবল চলে যাবে কিনা, পরক্ষনেই মত বদলে পেয়াদা বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে সে। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ধুনি হাতে উঠোনে বেরিয়ে এসেছে শম্ভুনাথের বউ। শাড়ির আঁচলটি কোমরে গোঁজা, টান টান শাড়ির আড়ালে বুকের কাছে যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছে তার। রণ শেখের গলা শুকিয়ে আসে, আহারে সেকি কী রূপ পেয়াদা বাড়ির বউয়ের! একটু সরে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দেয় রণ শেখ।

"বাইডাগে খাড়াইয়া ক্যালা? শেহের বেডা নি?"
"আদাব কাহা, বালা আসুইন?"
"বালাই, হাইন্জা বেলায় কী কামে আইলা?"
"রেজাইক্কার কারবারডা একবার দেখসুইন কাহা?"
"রেজাইক্কা আবার কী করলো? হেইলা না গঞ্জে গেসে !"
"কেডা কয়?"
"মাইনষে কয়!"
"মাইনষের কতা ব্যাঙের মাতা, আমার টাইন হুনুইন যে।"
"কী কইবা কইয়ালাও, দিরং কইরো না। আইজ আখড়া বন্ধ, আমি আডো যাইবাম।"
"কী কইবাম কাহা! শুক্কুরবার বিয়ান বেলায় আড়াত গিয়া খালি বইসি। দেহি আঙ্গর জামির গাছের চিপা দিয়া ক্যালা যেন আইট্টা যায়। আমি কইলাম ক্যালা? আমার গলা নি হুইনা হেইলা দিল দৌড়। আতের কাছে কিসু না পাইয়া আমি চিক্কুর পাইরা কইলাম নডির পুত তোরে লুডা দিয়াই কুইট্টালবাম, খাড়া কইতাসি। হেইলা মুড়া দিয়া গিয়া পড়ল ফুবের ফাগারো। যাইয়া দেহি আঙ্গর রেজাইক্কা। রেজাইক্কার আতে অথ বড় একটা পিতলার তামবশ। আমি কইলাম নডির পুত যাস কই? রেজাইক্কা কয় গঞ্জে যাইবাম। হুনুইন যে কাহা, হেইলা নি পিতলার তামবশ আতে লইয়া বিয়ান বেলায় গঞ্জে যায়! আমি কইলাম তর লাহান বুইত্তা মারা ব্যাডা পিতলার তামবশ লইয়া বিয়ান বেলায় চুরের লাহান দৌড়ায় ক্যান? মিসা কতা কইস না, গঞ্জের আড তো বিষ্যুদবার! পিতলার তামবশ কই পাইলি? যাস কই? হেইলার মুহ কুনু রাও নাই। আমিও শেহের ব্যাডা, পাচড়া দিয়া ধরলাম মান্দার গাছের গুড়াত, হেবলা মুহ দিয়া রাও ছাড়ে রেজাইক্কা। কয় 'তামবশ শম্ভুনাথ কাহার, চুরি করসি। কাহায় কইসিলো তামবশের মাইদ্দে শুল্লুক আছে। তামবশ লইয়া আসাম যাইবাম। তূইন আমার মিতা লাগস, কাহারে কইসনা জ্যারে।’ বাদে আত নি ছুডাইয়া দিলো দৌড়। কইনযে কাহা, বিষয় কী?”

শম্ভুনাথের মুখ থমথমে হয়ে যায়। রণ শেখ চাষীর ছেলে, ভোরের আলো আঁধারিতে সোনা আর পিতলের পার্থক্য বুঝতে পারেনি সে। কিন্তু ভাবনার বিষয় সেটি নয়। সোনার সে চামচে সুলুক একটা আছে বটে, জীবন মরণের সুলুক।

"বাইস্তা ব্যাডা, তুমার কাহি সন্দ করি গাডে গেসে। আঙ্গর উগাড় তন একখান জিনিস লইয়া আস তো।"
"কী জিনিস কাহা?"
"কাসার বর্তন, দন্নার লগে বাইন্দা রাখসি।"

কুপি হাতে ভয়ে ভয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রণ শেখ। যদিও এখন শীতকাল, ভাঁড়ার ঘরের উষ্ণতায় এক দুটা সাপ থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়। দরজার কাছেই কড়ই কাঠের ধন্নাটা, জায়গায় জায়গায় ঘুনে ধরা ক্ষয়িষ্ণু সে ধন্না যেন আদিনাথের শেষ কটা দিনের প্রতীক হয়ে টিকে আছে। ধন্নার সাথে দারুন বেমানান রংচঙে একটা পাটের শিকায় ঝুলিয়ে রাখা বর্তনটার দিকে হত বাড়াতেই চমকে উঠে রণ শেখ, গোক্ষুর! ধন্নার গায়ে লেজ পেঁচিয়ে ফনা তুলে দুলছে। ধীরজার কুলে যাদের বসবাস সাপ তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। প্রতি বর্ষায় ধীরজার শরীরটা সন্তানসম্ভবা নারীর মত ফুলে ফেঁপে ওঠে। কাশবনের সাপগুলো আশ্রয় হারিয়ে ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে। কখনো সাপের বিষে মানুষ, কখনো মানুষের হাতে সাপ, বর্ষা মানেই মরণ। রণ শেখ নিশ্চল হয়ে দাড়িয়ে রয়, সে ভালো করেই জানে যে চুল মাত্র নড়াচড়া মানেই মৃত্যুর ছোবল। গোক্ষুর দুলে চলে, ডান থেকে বামে, বাম থেকে ডানে, তার হিম শীতল চোখের দিকে তাকিয়ে রণ শেখ। রণ শেখের পৃথিবী জুড়ে কেবল শীতল দুটি চোখ, লকলকে জিভ আর একটা ফোঁস ফোঁস শব্দ। উনিশ বছরের জীবনে এত বড় গোক্ষুর কখনো দেখেনি সে। সাপটা পলকের জন্য একবার ফনা নামিয়েই আবার তাকায় রণশেখের দিকে। সাপের মাথায় খড়মের মত দুটো দাগ, বাস্তু সাপ! রণশেখের মনে পড়ে যায় আদিনাথের মরণ হয়েছিল জেলেই। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, আদিনাথ ফাঁসি নিয়েছিল। আতঙ্কে থর থর করে কেঁপে উঠে রণ শেখ। মুহুর্তেই সাপের ছোবল। চোখের কোনা দিয়ে ছুঁচালো দাঁত দুটো দেখতে পায় সে, আর তার পাশেই একটি হাত। রেশমি চুড়িতে ছাওয়া সেই পেলব হাতের মুঠোয় আটকা পড়ে আছে বাস্তু সাপের ফনা, চাবুকের মত তীক্ষ্ণ লেজের বাড়িতে সম্বিত ফিরে পায় রণ শেখ। সামনে দাড়িয়ে শম্ভুনাথিনি, কুপির নিভুনিভু আলোয় জলজল করে জলছে তার রক্তিম গাল, খোলা দরজা দিয়ে বয়ে আসা বাতাসে অবিন্ন্যস্ত খোপার চুল, তার একটা গোছা এসে লুটিয়ে পড়েছে পাকা জামের মত ফোলা ফোলা ঠোঁটে। চোখে চোখ পড়ে রণশেখের, কটা চোখে অদ্ভুত একটা হাসি। রণশেখের অবশ অবশ লাগে |

শম্ভুনাথের যাত্রা

"উরররর, হেট হেট, হেট। হেটহেট, হেট, উরররর। রান্দা করিসনা, আরে যাসনা ক্যারে? উরররর, হেট হেট, হেট। উডুইন ব্যাডাইনরা, লাইমা খারুইন। এরার আর দম নাই। আমি দীগিত গেলাম পানি আনতে, আপনেরা চিড়ামুড়ি মুহ দিয়া জিরাইয়া লইন যে।"

জৈষ্ঠের দুপুর। সুর্যের তাপে গায়ের ঘাম গায়েই শুখিয়ে যায় এমন গরম। থেকে থেকে ঘূর্ণি দিয়ে বাতাস বইলেও সে বাতাসে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হুন্দামুড়ির বন্দ বড় খারাপ জায়গা। মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত এই বন্দে প্রানের কোনো চিহ্ন নেই, একটা মেঠো ইদুরেরও দেখা মেলেনা। বর্ষায় আবার অন্য রূপ, লকলকে সবুজ উঁচু ঘাসে ছেয়ে যায় চারিদিক। উর্বর জনপদের মাঝখানে প্রকৃতির এক আশ্চর্য কীর্তি এই তৃণভূমি। এ জায়গার মাটির ধরন গঠন সবকিছুই কেমন অন্য রকম। দেখতে কালো, দূর থেকে মনে হবে দোআঁশ মাটি। হাতে নিয়ে মুঠো পাকালে জমাট বাঁধেনা। কিন্তু তাই বলে আবার বেলেও নয়, মাটির দানাগুলো অনেক বড় আর ভারি। ঘাস ছাড়া আর কিছুই জন্মায়না এ মাটিতে, তাও শুধু আষাঢ়-শ্রাবনে। হুন্দামুড়ির ঠিক কেন্দ্রেই রয়েছে অতি পুরাতন একটি দীঘি, দিঘীর চারপাশ জুড়ে বিচিত্র কিছু গাছপালা, সবই নিষ্ফলা। এই নির্মম জৈষ্ঠেও দীঘির পানি মাঘের সকালে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরের মতো শীতল।

শম্ভুনাথ আঁজলা ভরে পানি খেয়ে একটা গাছের নিচে হেলান দিয়ে বসে। হাড় জিরজিরে বলদ দুটি পাশেই দাড়িয়ে, তাদের মুখে তালপাতার ঠুলি। গাড়োয়ান ছাড়া আরো তিনজন রয়েছে তাদের যাত্রায়। তিনজনই শক্ত সমর্থ, তুলনায় শম্ভুনাথ ওই বলদ দুটির মতই রুগ্ন। হবেই বা না কেন! সোনাপুর গঞ্জে এসে কাজকর্ম মেলেনি কোনও, আদিনাথের কীর্তির কথা সবাই জানে, জানে ওলাবিবির অভিশাপের কথা। মাস খানেক বলতে গেলে একরকম না খেয়েই কেটেছে তার। সোনাপুরে তার মন বসেনা, কিন্তু কোথায় যাবে মনস্থির করতে পারেনি। গঞ্জের মানুষের মুখে একদিন শোনে হুন্দামুড়ির কথা, বন্দের ওই পারে নাকি রয়েছে আজব এক দেশ। ওইটুকুই, কী আছে সেই দেশে, কোন কারণে আজব, কেউ জানেনা। হুন্দামুড়ি যে আসলে কোথায়, সে কথাও বলতে পারেনি কেউ। কেমন করে সে ওখানে পৌঁছুল সে আরেকদিনের গল্প। শুধু জেনে রাখুন, হুন্দামুড়িতে এসে সে পথ হারায়। তারপর তিন দিন তিন রাত — খাওয়া নেই, পানি নেই, জন নেই, প্রাণী নেই, গাছ নেই, ছায়া নেই, প্রাণের কোনও চিহ্ন নেই, আশা নেই।

তিনজন তিনরকম, তিন বয়েসের। একজন দারুণ বৃদ্ধ, দীর্ঘকায় শরীরটা বয়সের তুলনায় যথেষ্ট শক্তপোক্ত। ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় তার কাশফুলের মত শেতশুভ্র চুল আর মুখ জুড়ে লেপ্টে থাকা অজস্র বলিরেখার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জোড়া নির্দয় চোখ। আরেকজন মাঝবয়েসী, পাঁকানো বাঁশের লাঠির মতই গাঁট পাকানো তার শরীর। তৃতীয়জনের বয়স বোঝা ভার। ঘোলাটে সাদা চুল, খানিকটা কুঁচকানো তার হাত এবং মুখের চামড়া। সেকি প্রৌড়? নাকি মাঝবয়সী? লোকটির হাত এবং চোখ বাঁধা, প্রাণহীন শব্দহীন হুন্দামুড়ির বন্দ কাঁপিয়ে হঠাৎ হঠাৎ হেসে উঠে, সে হাসিতে যেন ঝরে ঝরে পড়ে যৌবনের ঔদ্ধত্য। তিনজনের একটাই মিল, এরা ভিনদেশী।

শম্ভুনাথের প্রাণ আইঢাই করে কথা বলার জন্য। গারওয়ানের সাথে কথা বলে সে তৃষ্ণা মেটেনা। বোকাসোকা সুখীমতন মানুষ গারওয়ানটি। একবার কথা শুরু করলে আর থামতে জানেনা, তার সমস্ত কথাই হুন্দামুড়িকে ঘিরে। কবে কোন পূর্নিমায় কোন কন্দ কাটা প্রেতের হাসি শুনেছিল, হাতছানি দিয়ে খোনাসুরে ডেকেছিল এক ছায়া সুন্দরী - এসবের বাইরে তার কোনো গল্প নেই। ধীরজার ওপারের শম্ভুনাথ হয়তো মাঝ পুকুরে পিঁপড়ার ডিমের চার খুঁজে পাওয়া কাতল মাছের মত হা করে গিলত এসব গল্প। কিন্তু এপারের শম্ভুনাথ? হুন্দামুড়িকে তার মত আর চিনেছে কে! তিন দিন তিন রাত তো নয়, যেন তিনশ জীবন। তিনশো বার মরে গিয়ে তিনশো পুনর্জন্ম|

"এরার কতা কইন জ্যাডা, এরার কতা কইন।”

"এইতা হুইন্না আঙ্গর কাম কী? এইতাইন বিদেশি ব্যাডাইন, আম্ব চিনিনা, তুম্ব চিননা। হুন জ্যারে কইন্না আমারে কী কয়। কইন্না জবর সুন্দরী, কইন্নার শইল্লে কী কইবাম বাইস্তা ব্যাডা, কইন্নার শইল্লে কুনুই........."

শুনশান রাতে মরচে পড়া শব্দ তুলে এগিয়ে চলে শকট। মরচে ধরা কন্ঠে ফেলে আসা সময়ের গল্প বলে যায় গাড়োয়ান, সে গল্পে মন নেই শম্ভুনাথের, মন তার পড়ে আছে পেছনে। ছাউনিতে বসে থাকা মানুষগুলোর কথা ভাবে। বুড়ো লোকটির বয়স কত? চোখ বাঁধা মানুষটি কে? কোথায় চলেছে এরা? আর কেনইবা শম্ভুনাথকে তুলে নিয়েছে মৃত্যুর মুখ থেকে? শম্ভুনাথ ভাবে আর ভাবে, ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে, তারপর একটা সময় হুন্দামুড়ি আঁধারে করে খসে পড়ে তৃতীয়ার চাঁদ।

শম্ভুনাথের ঘুম ভাঙ্গলো চোখ বাঁধা বন্দীর আচমকা হাসিতে। ভোরের আলো তখনো ফুটেছি কি ফোটেনি, আধফোটা আলোয় দুরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা শালবনের গায়ে ধাক্কা লেগে ফিরে ফিরে আসছে সে হাসির প্রতিধ্বনি। গাড়োয়ান শকট থামাতেই একটা লাফ দিয়ে নেমে পড়ে শম্ভুনাথ। ততক্ষণে ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসেছে অতিবৃদ্ধ মানুষটি, তার পেছন পেছন সেই মাঝবয়সী লোকটা। শম্ভুনাথ বুঝতে পারে তাকে ইশারা করা হচ্ছে ছাউনির ভেতরে যাবার জন্য। ভেতরে যেতে না যেতেই বাইরে থেকে একটা আর্ত চিৎকার, পেছন ফিরে তাকাতে গিয়ে বাঁধা পায় সে, কাঁধ চেপে ধরেছে রাতের বন্দি। শরীর মুচড়ে জোর করে কাঁধটা ছাড়িয়ে নিয়ে ছাওনির আড়াল থেকে উঁকি দেয় শম্ভুনাথ, চাকার পেছনটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পাশেই ছটফট করে দাপাচ্ছে একটি শরীর, মুন্ডুহীন।  

শম্ভুনাথ পেয়াদার ছেলে। পেয়াদা বাড়ির ইতিহাসে রক্ত নতুন কিছু নয়, কবন্ধ লাশ আগেও দেখেছে সে। কিন্তু এত কাছ থেকে এত রক্ত! একটু আগেই যাকে চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছে সেই মানুষটা, সেই জলজ্যান্ত মানুষটা! মাথাটা কোথায়? উদ্ভ্রান্তের মত চারিদিকে তাকায় শম্ভুনাথ, মাথাটা কোথায় গেল? শরীরটা পড়ে আছে যে! ছাউনি থেকে ভুতে পাওয়া মানুষের মত ছিটকে বের হয় শম্ভুনাথ, হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সে, মাথাটা ঘুরেছে যেন চড়কের দোলনা। হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়াতে থাকে ডানে বামে সামনে পেছনে, হুন্দামুড়ির ভারি মাটিতে একটা মাথা লুটিয়ে পড়ে আছে, মাথাটা কোথায় গেলো!

“কী, খুঁজে পেয়েছ? আরেকটু সামনে তাকাও না, চাকার পাশেই রয়েছে ওটা।”

রাতের বন্দি শম্ভুনাথকে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে চাকার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখায়। শম্ভুনাথ দেখতে পায় মাথাটা স্থির হয়ে পড়ে আছে, শরীর থেকে দশ হাত দুরে। দশ হাত, মাত্র দশ হাত! এক দৌড়ে কাছে গিয়ে তুলতে যাবার মুহূর্তেই থমকে যায় সে, টের পায় দশ হাতের এই দুরত্ব আর কোনদিন ঘুচবার নয়।

বৃষ্টি পড়ছে। ছাড়া ছাড়া বৃষ্টি, এক ফোটা দু ফোটা। শম্ভুনাথ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, দাঁড়িয়ে থাকে পড়ে থাকা মাথার পাশে। পায়ের কাছে তার ঘুরপাক খায় দুরের শালবন থেকে বাতাসে উড়ে আসা এক রাশ শুকনো পাতা।

কতক্ষণ ধরে সে দাড়িয়ে এখানে? কানে ভেসে আসছে ঝুপঝুপ ঝুপঝুপ ঝুপঝুপ একটা শব্দ, কোদালের। দুহাতে কোদাল চালাচ্ছে গাড়োয়ান।

"বাইস্তা ব্যাডা, আত লাগান লাগে যে। এহলা মানুষ আমি আর কত করবাম? তুমি ঠ্যাঙ্গ দুইডা দরো, আমি শইলডা তুলি।"

যন্ত্রের মত হাত লাগায় শম্ভুনাথ। পা দুটো ধরেই ছেড়ে দেয় আবার, মাথাটা খুঁজে আনে। আকাশে এখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, থেকে থেকে শোনা যায় বাজের আওয়াজ, একটা, দুটা, অনেকগুলো। দুরে, অনেক দুরে যেখানে শালবনের শুরু সেখানে কুন্ডুলি পাকিয়ে দ্রুত বাড়ছে একফালি কালো মেঘ, আসছে এদিকেই, কিছুক্ষণ পরেই হুন্দামুড়ির তপ্ত বুকে অঝোর ধারায় ভেঙ্গে পড়বে সমস্ত আকাশ। একটা মানুষ শুয়ে এখানে, তার রক্তে ভিজে ভারি হয়ে আছে মাটি। হুন্দামুড়ির মাটি অন্য রকম। ঘাস ছাড়া অন্য কিছু জন্মায়না এখানে।

আর্মানিটোলার আগুন

“আসুঘিগকে কোথায় পেলে?”
“আগুন লাগার পর আপনাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে আমি দল ভেঙ্গে দেই। যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দিকে। আমি ঢাকাতেই ছিলাম, সুযোগ খুজছিলাম কোলকাতায় যাবার, ইচ্ছে ছিল সেখান থেকে আরব সাগরের কোনও জাহাজে উঠে পড়বো। একবার সিরাজে পৌঁছে যেতে পারলে আমার ইরেওয়ান যাওয়া ঠেকায় কে? হায়াযদানের লোকজন তখনো শহর ছেড়ে যায়নি, তারা পাগলের মতো খুঁজে ফিরছে আহুরামাযদার গেদাল। গা ঢাকা দিয়ে আর কতদিন থাকা যায়? একটা টাঙ্গায় কিছু পাট চাপিয়ে বনিকের ছদ্মবেশে বেড়িয়ে পড়লাম একদিন, গির্জায় পৌঁছে দেখি লোকজন তেমন একটা নেই। খানিকক্ষণ পরেই মিনারের ঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে উঠলো, পাঁচবার। টাঙ্গা বাইরে রেখে গির্জার ভেতরে যে প্যাঁচানো সিঁড়িটা রয়েছে তারই গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি ফাদার আগামিনাস কে নিজের পরিচয়টা দেব কিনা। এমন সময় কে যেন পেছন থেকে আমার কাঁধ চেপে ধরল, ঘুরেই দেখি আসুঘিগ, মিটি মিটি হাসছে। বুঝে গেলাম আমাকে চিনে ফেলেছে সে। আসুঘিগ যে ঢাকায় সে খবর আমার কাছে ছিলনা। আমি মুখ খোলার আগেই ইশারায় বোঝাল এখানে কোনও কথা নয়। আমাকে নিয়ে গেল গোরস্তানের মাঝখানে, আভাতিকের সমাধির পাশে। ওর কাছেই জানলাম আপনি বেঁচে আছেন এবং লুকিয়ে রয়েছেন শালবনের ভেতরে। আহুরামাযদার গেদালটাও নাকি আপনারই কাছে। আপনার মাথার দাম সহস্র স্বর্ণমুদ্রা, আর হায়াযদানের কাছে জ্যান্ত নিয়ে যেতে পারলে এর তিনগুন। আসুঘিগ এই প্রথম এসেছে বাংলায়, তার একজনকে চাই যে এই অঞ্চলটা ভালো করে চেনে। আমার সামনে দুটি পথ, আসুঘিগের সঙ্গী হয়ে আপনাকে খুঁজে বের করা, সেক্ষেত্রে বখরা মিলবে স্বর্ণমুদ্রার অর্ধেক। অথবা, হায়াযদানের হাতে মৃত্যু।

আসুঘিগের সাহস দেখে আমি অবাক হলাম, ইরেওয়ানে দাঁড়িয়ে এই কথা বললে ওর জিব্বাটা টেনে ছিঁড়ে নিতে আমার এক দণ্ডও লাগতনা। আমার চোখ দেখে মনের ভাব বুঝতে পারল সে, মিটি মিটি হেসে বলল, 'দেশটা আর্মেনিয়া নয় সেভর্গ, এখানে তুমিও যা আমিও তাই। সানাসার বংশের শেষ উত্তরাধিকারী বাগদাসারও এই দেশে নাম পরিচয় হীন একজন আগন্তুক। এখন ভেবে দেখো, বাগদাসার নাকি তুমি, কার জীবনের মূল্য বেশি?’। আমি ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম।

আমাকে বেঈমান ভাববেন না বাগদাসার। কাউকে না কাউকে ও তো পেয়েই যেতো, মাঝখান থেকে আমার মরে গিয়ে কী লাভ বলুন?

“বেঈমান যে নও তার প্রমাণ তুমি কিছুক্ষণ আগেই দিয়েছ সেভর্গ। এর পুরষ্কার তুমি পাবে। এখন বল গাড়োয়ান আর ওই ছেলেটাকে নিয়ে কী করা যায়? গাড়োয়ানটাকে বিশ্বাস নেই, কথা বেশি বলে। সামনেই পাটের মউশুম, আর্মেনীয় বনিকরা চলে আসবে যে কোনদিন। ছেলেটাকে রেখে দাও। ওর প্রাণ বাঁচিয়েছ তুমি, বিশ্বাস ঘাতকতা করবেনা।”

চাকায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই বিদেশির কথা শুনছিল শম্ভুনাথ, অদ্ভুত এক বিজাতীয় ভাষা, যার বিন্দু বিসর্গও মাথায় ঢোকেনি ওর। একদিন জানতে পেরেছিল সব ইতিহাস, সে আরও অনেক পরে, অনেক পথ পেরিয়ে, ধীরজা থেকে অনেক দুরে, সোনাপুরের চেয়েও অনেক ঝলমলে একটা নগরীর শান বাঁধানো কোনও এক চত্বরে বসে।

গরু দুটির খাওয়া শেষ, গাড়োয়ান অপেক্ষা করছে কখন যাত্রা শুরু হবে সেই নির্দেশের জন্য। বৃদ্ধ লোকটি ধীর পায়ে এগিয়ে যায় তার দিকে, বাতাসে উড়ছে তার কাশফুলের মতো সাদা সাদা চুল, মুখে আশ্চর্য এক প্রশান্তির কোমল ছায়া। অজস্র বলিরেখার আড়াল লুকিয়ে তার দাঁড়াশ সাপের চোখের মতো হিম শীতল একজোড়া চোখ। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখে ধাঁধা লাগে শম্ভুনাথের। বৃদ্ধের হাতে একটা তলোয়ার, অর্ধেক তার কালচে হয়ে আছে মাঝ বয়সী লোকটার, সেই তেল পাকানো বাঁশের লাঠির মতো শক্তপোক্ত লোকটার শুকিয়ে আশা রক্তে। বাকি অর্ধেকটাতে প্রতিফলিত সকালের হলদে সূর্য। হুন্দামুড়ির আঁধার চিড়ে ঝলমলে একটা সূর্য উঠেছে আজ।

আহুরামাযদার গেদাল

আহুরামাযদা আর আহির্মান যমজ ভাই। আহুরা অর্থ আলো আর মাযদা মানে জ্ঞান। আহুরামাযদা আলো এবং জ্ঞানের দেবতা, সম্রাট দারায়ুসের শক্তির উৎস। তিনি নিরাকার, একক এবং অনাদি। সম্রাট যখন যুদ্ধে চলেন, তাঁর রথের পাশে পাশে চলে সাদা ঘোড়ায় টানা আরেকটি রথ। যোদ্ধা বিহীন, যাত্রী বিহীন সে রথের সারথি যুবরাজ স্বয়ং। পারস্য জানে, জানে পারস্যের প্রবল শত্রুরাও, ওই শুন্য রথে অধিষ্ঠান করেন আহুরামাযদা। কেউ জানেনা কেমন সে দেবতার রূপ, কী তাঁর অবয়ব। জরস্ট্রিয়ান ধর্মগ্রন্থ ‘গাঁথা’য় তাঁর বর্ণনা পাওয়া গেলেও কোনও শারীরিক বর্ণনা নেই, জনশ্রুতি রয়েছে আকিমিনেড সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর সাইরাসের সময় থেকেই চলে আসছে এই রীতি। তৃতীয় পৃথিবী যাকে জানবে দারাউস দ্যা গ্রেট নামে।

…………………চলবে।
টীকা:
বাইডাগ = বহিরাঙ্গন
ক্যালা = কে
হাইন্জা = সন্ধা
হেইলা = সে
টাইন = কাছ থেকে
আডো = হাটে
আড়া = বাশঝাড়
আঙ্গর = আমাদের
জামির = লেবু
লুডা = বদনা 
ফুব = পূর্ব দিক
ফাগার/পাগার = এঁদো ডোবা
তামবশ = চামচ
বুইত্তা মারা = বিশালদেহী
কুইট্টালবাম = নল্লি ভাইঙ্গা হাতে ধরাইয়া দিমু
হেবলা = তখন
শুল্লুক = সূত্র
উগাড় = ভাঁড়ার
বর্তন = পাত্র
দন্না/ধন্না = কাঠ অথবা বাঁশের বীম
রান্দা = বিরক্ত
বন্দ = খোলা মাঠ
ব্যাডাইনরা = পুরুষেরা
বাইস্তা = ভাতিজা
আম্ব = আমিও
তুম্ব = তুমিও
গেদাল = চামচ, আর্মেনিয়ান ভাষায়।

-----মোখলেস হোসেন


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

শেষের লাইনে সাইরাস দ্যা গ্রেট হবে। সম্পাদনার সুযোগ না থাকায় এখানেই সংশোধন করে নিলাম।

--মোখলেস হোসেন

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

ইটা রাইখ্যা গেলাম...

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

সচলায়তনের সিম্বল টিম্বল তো চিনিনা খুব একটা। থান ইট দেখাচ্ছেন নাকি সাক্ষী সত্যানন্দ!!!
------মোখলেস হোসেন

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

নাহ ইটা মারার জন্য না, ইটা রাইখা লাইনে আসলাম, পরে পড়ুম।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

নিজের চোখে না দেখলে এমন লেখা যায়? শুরুটা বেশ হয়েছে কিন্তু। বাড়তি পাওয়া বর্ণনা। অনেকগুলো জায়গা কোট করতে ইচ্ছে করছে। সচলে কোন গল্প বা উপন্যাস দেখলে চুলোতে তরকারি রেখেই মোবাইলে পড়তে শুরু করি। সাথেই আছি।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ সুলতানা সাদিয়া।
---মোখলেস হোসেন

অতিথি লেখক এর ছবি

অদ্ভুত সুন্দর, ছবির মত দেখছি মনে হলো । পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

সোহেল ইমাম

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ সোহেল ইমাম

------- মোখলেস হোসেন

এক লহমা এর ছবি

চলুক পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখাটি মনে হয় ভালো হয়নি, এক লহমা। পাঠক পেতে হলে আরও পরিশ্রম করতে হবে, ভাবতে হবে। পড়েছেন বলে অনেক ধন্যবাদ।
-----মোখলেস হোসেন

অতিথি লেখক এর ছবি

মোখলেস ভাই লিখে যান, আপনার লেখায় কি একটা আকর্ষন আছে বলেই এই লেখাটা পড়া শুরু করেছিলাম হতাশ হইনি, পরের পর্বের জন্য এখন থেকেই উৎসুক। এখন পর্যন্ত চমৎকার যাচ্ছে তবে উপন্যাস হিসেবে সামগ্রিক আঙ্গিকটার ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে যা ঠিক এক্ষুনি বোঝা যচ্ছেনা তবে লেখার ধরনটা ভালো, শুধু শুধু চিন্তা করছেন। আনন্দ নিয়ে লিখে যান। জানিনা আমার মত পাঠকের মন্তব্য আপনার কাছে কতখানি গুরুত্ব পাবে তবুও বলছি ভালো লাগছে, চলুক।

সোহেল ইমাম

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ সোহেল ইমাম। আমি ওই যাকে বলে ঠিক সহজাত লেখক নই। আমি লিখি গায়ের জোরে, রীতিমতো কষ্ট করে। তাই জানতে ইচ্ছে করে কেমন লিখছি। সহজাত লেখক হলে হয়তো নিজেই বুঝতে পারতাম।
----মোখলেস হোসেন।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।