জোনাক জীবন

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ০২/০৬/২০১৯ - ১২:৪৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এ লেখাটা লিখতে গিয়ে নিজেকে কেমন যেন মওদুদ আহমেদ মনে হচ্ছে। এই সচলেই ঠিক আগের লেখায় যা লিখেছি, পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে এখন উল্টো জিনিস লিখতে যাচ্ছি, সংগত কারনেই ওই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমি বিখ্যাত লেখক নই, সুতরাং আগের লেখায় কি ছিল সেটা কারো মনে থাকার কোন কারন নেই। সেখানে 'প্রতিভা' জিনিসটার প্রতি আমার দুর্নিবার আকর্ষনের কথা লিখেছিলাম। তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু আকর্ষনের পেছনের কারনটা ছিল যে তাতে আমাকে লোকে চিরদিন মনে রাখবে। ধরুন যদি রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়ারের মত লিখতে পারতাম, তাহলে মরার শত বছর পরেও মানুষ আমার লেখা পড়বে এই ব্যাপারটা আমাকে খুব টানত। কিন্তু ইদানিং চিন্তাভাবনায় একটা পরিবর্তন এসেছে, সেজন্যেই এই লেখা।

সেদিন ইন্টারনেটে একটা আর্টিকেল পড়লাম পড়লাম যেটার সারমর্ম হচ্ছে যে আপনি যত যাই করুন না কেন, এক সময় বিস্মৃত হবেনই। লেখাটা শুরু হয়েছিল টিভি হোস্ট কোনান ও ব্রায়েনকে নিয়ে। উনার জনপ্রিয় লেট নাইট শো 'কোনান' একসময় শেষ হবে এবং দুবছরের মধ্যে লোকে সেটা ভুলেও যাবে। কথাটা খোদ ব্রায়েনেরই! ব্রায়েন এক সাক্ষাতকারে অভিনেতা আলবার্ট ব্রুকসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তার সিনেমাতো চিরদিন টিকে থাকবে, ব্যাপারটাকে তিনি কিভাবে দেখেন। আমি অবশ্য ব্রুকস এর নামই শুনিনি, গুগুল করে দেখলাম যে তেমন কোন আহামরি সিনেমাও তিনি করেননি। যাই হোক, ব্রুকস তখন তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ক্লার্ক গ্যাবলের কথা। 'গন উইথ দ্যা উয়িন্ড' এর জন্য খ্যাত এই নায়ককে ১৯৪০ এ লোকে বলত 'ফেস অব দ্যা টুয়েন্টিএথ সেঞ্চুরি '। আর আজ? নেহায়েত পাঁড় সিনেমাখোর না হলে খুব কম তরুনই গ্যাবলের নাম জানে। শন কনারি, ক্লিন্ট ইস্টউড,রজার মুর, আল পাচিনো, রবার্ট ডি নিরো, ডাস্টিন হফম্যান, জ্যাক নিকলসন, টম ক্রুজ,পিয়ার্স ব্রসন্যান, ব্র‍্যাড পিট, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও...আরো কত জন এলো, আসবে আবার চলেও যাবে! শুধু অভিনেতা বা শো নয়, প্রায় সব কিছুর জন্যই কি তা সত্যি নয়?

আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এর কথাই ধরুন। সেই সুদূর পুঁচকে মেসিডোনিয়া থেকে বের হয়ে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী জয় করে যখন মরে যান, তখন তার বয়েস মাত্র বত্রিশ। ইতিহাস বইয়ে তার নাম লেখা আছে দিগবিজয়ী হিসেবে, কিন্তু তার বাইরে তাঁর নাম আর কয়জন জানে? চেংগিস খান, আতিলা দা হুন, সুলতান সালাহ উদ দীন (পশ্চিম যাকে সালাদিন নামে জানে), প্লেটো, সক্রেটিস, আর্কিমিডিস, হোমার বা এরকম অনেক নামই আমরা জানি, কিন্তু পরীক্ষায় দুটো নাম্বার বেশি পেতে না হলে ওই নামগুলো আমাদের না জানতে হলেও চলত। একসময় লোকের মুখে মুখে ফেরা এই নামগুলো এখন তাই আমাদের কদাচিৎ মনে পড়ে। শুরুতে বলছিলাম রবীন্দ্রনাথ আর শেক্সপিয়ারের কথা। তাঁদের লেখা আমরা এখনো পড়ি, কিন্তু পাঁচশ বছর পরেও কি পড়ব? তখন কি তাঁদের লেখা সেই সময়ের মানুষের জন্যে প্রাসঙ্গিক থাকবে? আমি ঠিক নিশ্চিত নই।

সেকারনেই ইদানিং ভাবি যে প্রতিভা থাকলে মন্দ হয় না, কিন্তু আমি যেমন অমরত্বের জন্য প্রতিভা চেয়েছিলাম, সেটা আসলে অর্থহীন। রবীন্দ্রনাথ 'গোরা' লিখেছিলেন মনের আনন্দে, একশ বছর পরে আমি সেটা মুগ্ধ হয়ে পড়ব- সে কারনে নিশ্চয়ই নয়। প্রতিভাবানরা যা ভাল পারেন, সেটা না করে আসলে থাকতে পারেন না, সেটা করতে করতে ভাগ্যবানেরা খ্যাতি পেয়ে যান, দূর্ভাগারা আবার প্রতিভা থাকার পরও তেমন খ্যাতি পান না। প্রায় একই সময়ে একই দেশের হয়ে খেলা গারিঞ্চা কিন্তু পেলের মত যশ বা খ্যাতি পাননি। দুজনের প্রতিভার তুলনা আমি করছি না, কিন্তু গারিঞ্চা তার প্রাপ্যটা পাননি, এটা অনেক ব্রাজিলিয়ানই বলে।

সুতরাং আমাদের বরং যেমন আছি, তেমন জীবনটাই উপভোগ করা উচিত। যে জিনিসগুলো আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে- যেমন ভালোবাসা বা নি:স্বার্থভাবে কারো উপকার করা, নতুন কিছু করা; এগুলোই বেশি বেশি করা উচিত। কেউ মনে রাখলো বা রাখলো না সেটা নিয়ে মাথা না ঘামানোই মনে হয় শ্রেয়। আমার বাবা বা খালু বা তাদের মত অনেক মানুষই আছেন, যাদের পৃথিবী চেনেনা, কোথাও তাদের নাম লেখাও থাকবেনা । কিন্তু তারা সেই সুদূর অজপাড়াগাঁ থেকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তারপর তাদের পিছিয়ে থাকা পরিবারকে টেনে নিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন, এই ব্যাপারটাতো আসলে সামান্য ব্যাপার না। চাঁদ বা সুর্যের মত চারপাশ আলোকিত করাটাই নিশ্চয়ই একমাত্র স্বার্থকতা না, জোনাকি হয়ে উঠোন কোনের আঁধার দূর করতে পারাটাও হয়ত এক জীবনের জন্য যথেষ্ট!

"ও জোনাকি কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ।
আঁধার সাঁঝে বনের মাঝে উল্লাসে প্রাণ ঢেলেছ
তুমি  নও তো সূর্য, নও তো চন্দ্র, তোমার তাই ব'লে কি কম আনন্দ।
তুমি  আপন জীবন পূর্ণ ক'রে আপন আলো জ্বেলেছ॥"

- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঘুরেফিরে সেই প্রতিভাবান রবীন্দ্রনাথ!)

গগন শিরীষ


মন্তব্য

অবনীল এর ছবি

সুতরাং আমাদের বরং যেমন আছি, তেমন জীবনটাই উপভোগ করা উচিত। যে জিনিসগুলো আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে- যেমন ভালোবাসা বা নি:স্বার্থভাবে কারো উপকার করা, নতুন কিছু করা; এগুলোই বেশি বেশি করা উচিত। কেউ মনে রাখলো বা রাখলো না সেটা নিয়ে মাথা না ঘামানোই মনে হয় শ্রেয়। আমার বাবা বা খালু বা তাদের মত অনেক মানুষই আছেন, যাদের পৃথিবী চেনেনা, কোথাও তাদের নাম লেখাও থাকবেনা । কিন্তু তারা সেই সুদূর অজপাড়াগাঁ থেকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তারপর তাদের পিছিয়ে থাকা পরিবারকে টেনে নিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন, এই ব্যাপারটাতো আসলে সামান্য ব্যাপার না। চাঁদ বা সুর্যের মত চারপাশ আলোকিত করাটাই নিশ্চয়ই একমাত্র স্বার্থকতা না, জোনাকি হয়ে উঠোন কোনের আঁধার দূর করতে পারাটাও হয়ত এক জীবনের জন্য যথেষ্ট!

উত্তম জাঝা!

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

গগন শিরীষ এর ছবি

পড়ার এবং মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, অবনীল!

মেঘলা মানুষ এর ছবি

অনেক সময় ব্যাপারটা অমরত্বের চেয়ে মনে হয় 'মানুষের মনে দীর্ঘজীবী' হওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে -যেটা নেহায়েত কম নয়। আমি এসব স্মরণীয় খ্যাতিমানদের নিয়ে আরেকটা জিনিস নিয়ে ভাবতাম। তাদের শারীরিক মৃত্যুর সময় তারা কী ভাবছিলেন? (সোনার তরী কবিতার কথা মনে পড়ল, প্রাসঙ্গিক কারণে)

একটা Anime দেখেছিলাম " Fullmetal Alchemist" নামে। সেখানে অমর বা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকা মানুষের কষ্টকর সময়টা তুলে ধার হয়েছিল। সমসাময়িক সবাই এক এক করে চলে যায়, সংসারী হয়ে থাকাও সমস্যা। সেবারই প্রথম আমি অমরত্বের কষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম। তারআগে শিশুকালের ধারণাই আঁকড়ে রেখেছিলাম যে, দীর্ঘকাল বেঁচে থাকাই বুঝি জীবনের লক্ষ্য।

আরও মনে পড়লো, ছোটকালে এইসব খটমটে জিনিসপত্র বের করার জন্য সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্ট‌টলদের কম গালমন্দ করিনি আমি আর আমার স‌হপাঠীরা রেগে টং

শুভেচ্ছা হাসি R.I. M.

গগন শিরীষ এর ছবি

ভাল বলেছেন মেঘলা মানুষ। দীর্ঘজীবী হওয়াটা মন্দ না যদি স্বাস্থ্য ঠিক থাকে,চিন্তাভাবনা সক্রিয় থাকে, আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবরা সাথে থাকে। নাহলে এটা আসলে যন্ত্রনার ব্যাপার।

শারীরিক মৃত্যুর সময়ে বিখ্যাতরা কি ভাবে সেটাও আসলে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। আমার ধারনা মরার পরের মুহূর্তটা ঠিক কেমন হবে সেই চিন্তাতেই তারা আচ্ছন্ন থাকেন, পেছনে কি রেখে গেলেন সেটা তখন আর গুরুত্বপূর্ণ থাকার কথা না। কি জানি? কোন দিন বিখ্যাত হয়ে গেলে হয়ত মরার সময় উত্তরটা পেয়ে যাবেন।

কিন্তু আপনি আমার আসলে নামের ইনিশিয়াল কেমনে জানলেন? চিন্তার বিষয় হাসি

নজমুল আলবাব এর ছবি

মরার পরের চিন্তাতো অনেক দুরের কথা, কালকের কথাইতো ভাবিনা বেশিরভাগ সময়। দম ফুরাইলেই ঠুস এইটাই হইলো জিবনের দর্শণ

অনেক পছন্দের একটা গান, আবার মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন। শুনেই যাচ্ছি। মাহতিম শাকিবের পাল্লায় যাতে এই গানটা না পড়ে তার জন্যে আসেন সমবেত প্রার্থেণা করি।

গগন শিরীষ এর ছবি

বেশির ভাগ মানুষই তো তাই ভাবে নজমুল ভাই, নাহলে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে যেত। তবু সময়ে সময়ে ভেতরের দার্শনিক বেরিয়ে আসে, কাজকাম যখন কম থাকে, পেটে ক্ষুধা থাকেনা, তখন এইসব ভাবতে মন্দ লাগেনা।

পড়ার এবং মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ!

কর্ণজয় এর ছবি

সুন্দর লেখা। শেষটা দূর্দান্ত, শুরুটাও (মওদুদ সাহেবের প্রসঙ্গ)। অমরত্ব’র আনন্দ দিতে দরজায় এসে কড়া নাড়ছে বেহেস্তের সুবাশ আর নরকের গুলজার, প্রত্যেকদিনের আনন্দ আর যন্ত্রণার মতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, আমাদের খাবার টেবিলে যেতে হয় জোনাকীর আলোয়

গগন শিরীষ এর ছবি

আপনার মন্তব্যটাও কিন্তু বাঁধিয়ে রাখার মত! পড়ার জন্য ধন্যবাদ কর্ণজয়।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

এই লেখার দর্শনটা বেশ ভালো লাগলো। জীবনটা তো আসলে যাপন করার। আমরা প্রতিদিন যে জীবনটা যাপন করি আলোয় ছায়ায় শেষমেষ সেখানেই সবটুকু আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

গগন শিরীষ এর ছবি

আসলেই তাই। কোথায় যেন পড়েছিলাম যে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের উপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে যে তাদের সব আক্ষেপ হচ্ছে কাছের মানুষদের সাথে যথেষ্ট সময় না কাটানো। জীবনে কি হাতি ঘোড়া মারা হল, সেটা সম্ভবত তেমন গুরুত্ববহ থাকেনা তখন।

পড়ার জন্য ধন্যবাদ নীড় সন্ধানী!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।