অণুপ্রবন্ধ-১ঃ পরশুরাম

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০৫/০৪/২০২১ - ৮:৪২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অণুগল্প বা ফ্ল্যাশ-ফিকশন অধুনা সাহিত্যের জনপ্রিয় শাখা হয়ে উঠছে। গত বেশ ক'বছর ধরে ব্রিটেনে ন্যাশনাল ফ্ল্যাশ-ফিকশন ডে উদযাপিত হয়। অণুগল্পে বেঁধে দেওয়া কোন আকার না থাকলেও কেউ কেউ মনে করেন এটি ১০০ শব্দের মধ্যে শেষ হওয়া চাই, আবার কেউ হাজার শব্দের নীচে যে কোন গল্প কে অণুগল্প বলে মনে করেন।

এরকম অণুগল্পের অনুকরণে এই সিরিজে কিছু অণু প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আছে। কিছু অণু গল্পের উদাহরণ সম্বলিত অণু প্রবন্ধ আরেকদিন লিখব। আজ সিরিজ শুরু করি বাংলা সাহিত্যের রম্য লেখক রাজশেখর বসু (পরশুরাম) কে নিয়ে।

হাসির গল্পলেখক মাত্রেই হাসিখুশি থাকবে, আমুদে হবে, এমন ধারণা অনেকের আছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে হাসির রচনা যারা লিখে গিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই গম্ভীর প্রকৃতির লোক।প্রভাতকুমার, ত্রৈলোক্যনাথ, পরশুরাম সকলেরই প্রকৃতি গম্ভীর। ব্যতিক্রম বোধ হয় শিবরাম, দীনবন্ধু, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ।

তবে শিবরাম আর মুজতবা আলী এখনও যেমন সমাদৃত, পরশুরাম কে কিন্তু সত্তর বা আশির দশকের পরে জন্মানো বাংলাদেশী পাঠকরা সেভাবে চেনে নি। বাংলা সাহিত্যের রসাস্বাদনে খামতির অপুষ্টিজনিত লক্ষণ আমার মধ্যেও বিলক্ষণ প্রতিভাত হয়ে থাকবে। সত্যি বলতে আমি তার গল্প প্রথম পড়েছি বয়স ত্রিশের কোঠা ছাড়াবার পরে। অথচ সৈয়দ মুজতবা আলী নিজে পরশুরাম কে বলেছিলেন ' আপনার সমস্ত পান্ডুলিপি যদি হারিয়ে যায়, আমাকে বলবেন। আমি স্মৃতি থেকে সমস্ত লিখে দোব।'

রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরামের জন্ম ১৮৮০ সালে আর মৃত্যু ১৯৬০ এ। ১৮৯৯ সালে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে কেমিস্ট্রি আর ফিজিক্সে দ্বিতীয় শ্রেণীর অনার্স নিয়ে বি. এ আর ১৯০০ সালে কেমিস্ট্রিতে প্রথম স্থান নিয়ে এম.এ পরীক্ষায় উত্তির্ণ হন। তাঁর গ্রন্থাবলী দুটি নামেই রচিত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বেংগল কেমিক্যালস এর জাঁদরেল ম্যানেজার। তবে লেখালেখিতে এই দুই নামের সাতন্ত্র তিনি শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছেন, যেন দুটি সম্পূর্ণ সাতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। রাজশেখর বসু নামে পরিচিত গ্রন্থাবলীতে তার মনীষার পরিচয় ঘটে, আর পরশুরামের ছদ্মনামে পরিচিত জনবল্লভ গল্পের বইগুলি যেন শিল্পীর হাতের রচনা। তাঁর স্বনামে প্রকাশিত হয়েছিল দশটি গ্রন্থ যেখানে তিনি রামায়ণ মহাভারত সারানুবাদ থেকে শুরু করে কুটিরশিল্প আর ভারতের খনিজ নিয়েও লিখেছেন। পরশুরাম নামে প্রকাশিত হয় মোট সাতানব্বইটি গল্প নিয়ে ন'টি গ্রন্থ। এছাড়াও রয়েছে কিছু কবিতা।

১৯২২ সালে তাঁর প্রথম গল্প গ্রন্থ 'গড্ডালিকা প্রবাহ' প্রকাশের পর স্ব্যয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখলেন 'সকালে হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়া যদি দ্বারের কাছে দেখি একটা উইয়ের ঢিবি তবে আশ্চর্য ঠেকে না, কিন্তু যদি দেখি মস্ত একটা বটগাছ তবে সেটাকে কি ঠাউরাইব ভাবিয়া ওঠা যায় না।'

তার 'রাতারাতি' গল্পটিতে বাংলাদেশের অদ্বিতীয় ফল কাঁঠালের (তিনি বানান লিখেছেন কাঁটাল) যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়ঃ

" চাটুজ্জ্যে বলতে লাগলেন- "বাল্যে দুগ্ধ, যৌবনে কচি পাঁঠা, বার্ধক্যে একটু নিমঝোল আর প্রচুর হরিনাম, এই হল আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রসম্মত পন্থা। কিন্তু এদ্দিনে আমরা জেনে ফেলেছি, ভাইটামিনই হচ্ছে আসল জিনিস, ভবনদীতে ভাসবার একমাত্র ভেলা। অতএব ভাইটামিন চান তো কাঁটাল খান।"

টোমাটো ভোজী বাবু বল্লেনঃ "কাঁটাল কি একটা ফল হলো মশাই?"

চাটুজ্জ্যেঃ "ফলের রাজা হলো কাঁটাল, দু'মণ পর্য্যন্ত ওজন হয়। এক একটি কোয়া এক-এক পো, কাঁচা সোনার বর্ন, ভাইটামিনে টইটম্বুর। গালে দিয়ে বার পাঁচেক এদিক ওদিক চালিয়ে রস অনুভব করুন, তার পর চক্ষু বুঁজে একটু চাপ দিন,অবলীলাক্রমে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। কোথায় লাগে আপনার কালিয়া কোর্মা। হেন বস্তু নাই যা কাঁটালে পাবেন না। গুঁড়ি চিরুন, তক্তা হবে, হোগনি কাঠ তার কাছে তুচ্ছ। পাতা পাকিয়ে নিন, হুঁকোয় পরাবার উত্তম নল হবে। আর ফলের তো কথাই নেই। কোলে তুলে নিয়ে বাজান, পাখওয়াজের কাজ করবে। কাঁচার কালিয়া খান, যেন পাঁঠা। বিচি পুড়িয়ে খান, যেন কাবুলি মেওয়া। পাকা কোয়ার রস গ্রহণ করে ছিবড়েটা চরকায় চড়িয়ে সুতো কাটুন, বেরবে সিল্ক!""

আমার তো এখন মনে হয়, বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসাবে কাঁঠাল কে পছন্দের পিছনে এই গল্পের নিশ্চয়ই কোন ভূমিকা থেকে থাকবে।

তাঁর মজার গল্পগুলিতে তিনি কিছু স্কেচ ও করতেন। 'প্রেমচক্র' গল্পটিতে তমিতা চিংড়ি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলোঃ ' আচ্ছা চিংড়ি, আড়চোখে চাওয়া কি রকম করে আঁকতে হয় জানিস?'

আর রাজশেখর বসু চিংড়ি বনে গিয়ে দেখালেন, আড়চোখ তো নস্যি, বাংলা সংখ্যা ৮ দিয়ে মোনালিসা হাসিও আঁকা সম্ভব। ছবিগুলো প্রবন্ধের অনলাইন সংস্করণে জুড়ে দেওয়া হলো পাঠকের জন্য।

রাজশেখর বাবু নিজে খ্যাতি সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন,স্মৃতিকথা, জীবনচরিত লিখে যান নি। তার স্বজন ও অনুরাগী দের স্মৃতিচারণ থেকেই তাকে খুঁজে নিতে হলো। প্রবন্ধটা বরং শেষ করা যাক রাজশেখরের বাবা চন্দ্রশেখর কে নিয়ে। চন্দ্রশেখর যখন যশোহর জেলার সামান্য একজন ডাক বিভাগের কর্মচারী, সে সময় নীলকর সাহেবদের অত্যাচার সম্পর্কে অনুসন্ধান করে কলকাতায় যে রিপোর্ট দাখিল করেছিলেন, তারই উপর ভিত্তি করে কলকাতা ইন্ডিগো কমিশন তদন্ত সূচনা করে। তাদের দু'জনকেই বাংগালীর ভালবাসা দিলাম এই পর্বে।

(বিরিঞ্চি বেগ)

ছবি: 
24/08/2007 - 2:03পূর্বাহ্ন

মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।