শব্দগল্পদ্রুম ০৪

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: শনি, ২২/০৭/২০১৭ - ৮:৫৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

শব্দের প্রথম ও প্রধান কাজ নতুনকে বেধ করা, যেভাবে শুক্রাণু বেধ করে ডিম্বাণুকে। এরপর শব্দ আর নতুন মিলেমিশে এক ভ্রুণ জন্ম দেয়, যাকে আমরা বলতে পারি, "ধারণা"।

নিল নদের তীরে হেরোডোটাস দেখেছিলেন, প্রকাণ্ড সব কুমির রোদ পোহাচ্ছে। গ্রিসে কুমির নেই, গ্রিক ভাষাতেও তখন কুমিরের প্রতিশব্দ থাকার কথা নয়। হেরোডোটাসের কুমিরদর্শনের আগ পর্যন্ত গ্রিক ভাষার ভাণ্ডারে অন্তত একটা শব্দ কম ছিলো। হেরোডোটাস মাতৃভাষায় কুমিরের নাম রাখেন "পাথরকৃমি"। গ্রিকে ক্রোকে মানে নুড়ি, দ্রিলোস মানে কৃমি, দুয়ে মিলে খানিক উচ্চারণ পাল্টে সেটা হয়ে যায় ক্রোকোদিলোস। আমরা যেমন ইংরেজি থেকে অকাতরে শব্দ নিয়ে তার নিচে চাপা পড়ে গেছি, ল্যাটিনও একই ভাবে গ্রিক থেকে শব্দ ধার করায় ক্রোকোডিলাস শব্দটা রোমান সম্প্রসারণের সাথে গোটা ইয়োরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইয়োরোপের প্রায় সব ভাষায় এখন কুমিরকে ক্রোকোদিলোসের কোনো এক তদ্ভবে ডাকা হয়। হেরোডোটাস কুমিরের নতুনত্বকে বেধ করেন তৎপুরুষ সমাসে, নুড়ি আর কৃমি সম্বল করে, যার সাথে কুমিরের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। চুটকির সেই পাগলটার মতো ম্যাকগাইভার যেমন মেয়েদের অন্তর্বাসের স্থিতিস্থাপক ফিতা খুলে নিয়ে তার সাথে চুলের কাঁটা বা চুষনিকাঠি জুড়ে তুলকালাম ঘটিয়ে ছাড়ে, হেরোডোটাসও যেন সে কাণ্ডই করেছেন শব্দ নিয়ে। একবার যখন ক্রোকোদিলোস শব্দটা এই অদৃষ্টপূর্ব জানোয়ারকে গেঁথে ফেললো, কুমিরের ধারণাটা তখন গ্রিক ভাষার গর্ভে জন্ম নিলো, এবং ল্যাটিনভাষীদের গ্রিকমোহ আর সামরিক প্রতাপের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়লো বিরাট এলাকা জুড়ে।

"আ সং অফ আইস অ্যান্ড ফায়ার"-এর বইগুলো যারা পড়েছেন, তারা লক্ষ করে থাকবেন, ওয়েস্টেরোসের নেক এলাকায় কুমিরের এই নতুনত্বকে মার্টিন বেধ করেছেন ভিন্ন দুটো উপাদানশব্দ দিয়ে, উপমিত কর্মধারয়ের চুলোয় গলিয়ে: লিজার্ড-লায়ন বা সর্পসিংহ। নতুনকে পুরনো দিয়ে চেনার প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক, যেমনটা চিনেছিলেন হেরোডোটাস। মার্টিন শুধু আরেকধাপ এগিয়ে কুমিরকে বিঁধেছেন মাতৃভাষার শব্দে। এই ধাপটা ছোটো, কিন্তু তাৎপর্য বিচারে গভীর, অনেকটা চাঁদের বুকে ঈগল থেকে নেমে আসা মইটার শেষ ধাপের মতো।

কয়েক বছর আগে চাকমা ভাষায় নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের নাম দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম। "মর ঠ্যাংগাড়ি", ইংরেজি শিরোনাম ছিলো মাই বাইসাইকেল। আমরা বাইসাইকেলকে "সাইকেল" ডাকি, "দ্বিচক্রযান" শব্দটা সে তুলনায় বুলডোজারের মতো ভারি, ব্যবহার করতে গেলে বাইসেপ-অহম-যদিবলিলোকেহাসবে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় টান পড়ে। বিমল মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথা "দুচাকায় দুনিয়া"-র শিরোনামে বাইসাইকেলের একটা সহজ, অনায়াসোচ্চার্য বাংলা বাতলে দিয়েছিলেন, কিন্তু সাইকেলকে দুচাকা বলাটা ঠিক যেন ভেতর থেকে আসে না। চাকমাভাষী পরিচালক এ সংকোচ ঝেড়ে বাইসাইকেলকে ঠ্যাংগাড়ি ডেকে একে সিনেমার শিরোনাম করেছেন, তাঁকে সাধুবাদ জানাই। নতুনকে তিনি আপন পুরনো সম্বল দিয়ে চিনেছেন, আমরা পারিনি।

নতুনকে নিজের মতো করে চিনে নেওয়ার অভ্যাসটা জরুরি, সেটা করতে না পারলে চিরকাল নতুনের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা হিসেবে থেকে যেতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রেলব্যবস্থা একান্ত ইংরেজের উদ্ভাবন, প্রায় সকল উপনিবেশে তারা এটি রোপণ করেছে পণ্য ও সেনা স্থানান্তরের সুবিধার জন্যে। প্রতিযোগী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোও রেলপ্রযুক্তি আত্মস্থ করেছে, নিজেদের উপনিবেশে ছড়িয়েছে, কিন্তু ইংরেজের দেওয়া নামটিকে তারা নেয়নি। ফরাসিরা বলে শ্যমাঁ দ্য ফেখ, স্পেনীয়রা বলে ফেরোকারিল, জার্মানরা বলে আইজেনবান, ইতালীয়রা বলে ফেরোভিয়া, রুশরা বলে ঝেলেজনাইয়া দারোগা, ফারসিতে বলে রাহি আহান, তুর্কিতে বলে দেমির ইয়োলু (মধ্য এশীয় তুর্কিঘেঁষা ভাষাগুলো, যেমন কাজাখ-কিরগিজ-উজবেকে বলে তেমির জল), ইন্দোনেশীয়/মালয় ভাষায় কেরেতা আপি, আমহারিকে ইয়েবাবুরি হাদিদি... মোট কথা, সবার ভাষায় এর অর্থ অভিন্ন: লৌহপথ। আমরা রেলব্যবস্থা পেয়েছি আমাদের খরচে, কিন্তু ইংরেজের মর্জিতে, এখনও সেটাই যেন আমরা মাথায় করে চলছি। আমি বলছি না যে "রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ" থেকে "সড়ক ও জনপথ" কিংবা "রেডিও বাংলাদেশ" থেকে "বাংলাদেশ বেতার" নাম রাখার মতো "বাংলাদেশ রেলওয়ে" নাম পাল্টে "বাংলাদেশ লৌহপথ" করলে রাতারাতি আমরা রেলব্যবস্থায় উন্নতি করে ফাটিয়ে ফেলবো, কিন্তু এটা সেই ঈগলের মইতে শেষ ধাপটার মতো, অচেনাকে নিজের মতো করে চেনার শুরু। ডাকাতের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া চটি কপালে বেঁধে না ঘোরার মাঝে যতোটুকু উন্নতি আছে, ততোটুকুই বা করতে সমস্যা কোথায়?

স্টেশনকে ইস্টিশন, স্টিমারকে ইস্টিমার আর স্কুলকে ইস্কুল ডেকে শব্দগুলোকে বাঙালি রসনাবান্ধব করে শ'দেড়েক বছর আগে বাংলাভাষীরা ক্ষান্ত হয়েছিলেন, কারণ এমন কোনো পৃথিবী তাঁরা কল্পনা করতে সক্ষম হননি, যেখানে ইংরেজিভাষীর প্রাধান্য থাকবে না। ঠিক যেভাবে মোগল আমলে তাঁরা আইন-দলিল নিয়ে কাজ করার সময় ফারসিভাষীর-লাঠি-থেকে-মুক্ত পৃথিবী কল্পনা করতে অক্ষম ছিলেন। আজও আমাদের অবচেতনে ভবিষ্যৎকল্পনায় ইংরেজিরই রমরমা। যদি কোথাও কোনো পিঠা থাকে, সবাই সেটার ভাগ চায়। আমরা তাই কয়েকশ বছর ফারসি পিঠার টুকরার জন্য দৌড়েছি, তারপর দৌড়ে চলছি ইংরেজি পিঠার টুকরার পেছনে। নিজেরা যে একটা পিঠা সেঁকে নিতে পারি, এ উপলব্ধি আমাদের এখনও হয়নি। সামনের পৃথিবীতে যে হিন্দি কিংবা চীনা পিঠার টুকরার জন্যে ফ্যাফ্যা করে আমাদের ঘুরে বেড়াতে হবে না, সেটা কে বলতে পারে?

ফারসি বা ইংরেজির বিস্তারের আমলেও পৃথিবীতে নতুনের সরবরাহ ছিলো মন্থর। এখন সে গতি সহস্রগুণে বেড়েছে। নতুনের সরবরাহ কাদের হাতে, সে তালিকা খতিয়ে দেখলে নিজেদের খুঁজে পাবো না আমরা। কারণ নতুনকে বিদ্ধ করার শক্তিই আমাদের নেই। যা কিছু এ শক্তি যোগায়, তার মাঝে হাওয়ার মতো অদৃশ্য-কিন্তু-অপরিহার্য উপকরণ ভাষা। আর ভাষা বিস্তার পায় গল্পে, কবিতায়, গানে, সংবাদে, ইদানীং ব্লগ-ফেসবুকের স্বগত সংলাপে। আমরা যদি নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ কুণ্ঠিত থাকি, আর অন্যের দিকে চেয়ে এর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অনুমোদন খুঁজি, আমাদের জীবন কেটে যাবে অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষায়। নতুনকে নিজের মতো করে চিনতে কেন অন্যের অনুমোদন লাগবে?

ফ্যান্টাসি গল্প শেষ পর্যন্ত পুরনোর মাঝে নতুনের সন্ধান, কিংবা নতুনের মাঝে পুরনোর। বাস্তবে আমরা যে ধাপটায় এসে থমকে গেছি, ফ্যান্টাসি গল্পে সেটা অনায়াসে টপকানো যায়। দেড়শ বছর আগে আমাদের উত্তরসূরীরা যে নতুনকে বিদ্ধ করতে পারেননি, ফ্যান্টাসি গল্পের নবীন চরিত্র গল্পের পাতায় সেটা পারে। ধরুন, একটি চরিত্রকে কোনো তৃণভূমিঘেরা নদীর বুকে নৌকায় বসিয়ে দিলাম; পাটাতনে বসে সে দেখতে পায়, তালগাছের মতো মস্ত গলার একটা হরিণ আকাশমণি গাছের পাতা চিবিয়ে খাচ্ছে, আর একগাদা সাদাকালো ডোরাকাটা ঘোড়ার মতো দেখতে জীব দুদ্দাড় ছুটে যাচ্ছে একদিকে। জিরাফ আর জেব্রা শব্দদুটো ঐ কাল্পনিক দুনিয়ায় অনুপস্থিত। হেরোডোটাসের মতো ঐ চরিত্রটিও তখন নতুনের মোকাবেলা করে নিজের চেনা জগতের শব্দ দিয়ে; যাত্রা শেষে ভিনদেশে পৌঁছে আরেক চরিত্রকে সে তালহরিণ আর ডোরাঘোড়ার একগাদা গল্প শোনায়। তালহরিণ আর ডোরাঘোড়া শেষ পর্যন্ত গল্পের গণ্ডি পেরিয়ে আর বাস্তবে পা রাখবে কি রাখবে না, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় ঐ চরিত্রটির নেই। অচেনাকে চেনার জন্যে আপনাকে চেনার কাজটা সে করছে শুধু, যাতে গল্পের কোনো অংশে পাঠকের-পৃথিবীতে-অনুপস্থিত, এমন কোনো আনকোরা নতুন জীবের সন্ধান পেয়ে তা নিয়ে কথা বলার সুযোগ তার থাকে।

দ্রিঘাংচু-ট্যাঁশগরু-কুমড়োপটাশ-স্বর্ণপর্ণীতে গিয়েই কি ফ্যান্টাসি পশুপাখিলতাপাতা নিয়ে বাংলায় গুলগল্পের সুযোগ ফুরিয়ে যাবে? উঁহু।


মন্তব্য

মন মাঝি এর ছবি

চলুক

কিন্তু সাইকেলকে দুচাকা বলাটা ঠিক যেন ভেতর থেকে আসে না

আচ্ছা, "দুচাক্কা" বললে কেমন হয়? আপনমনে দুয়েকবার উচ্চারণ করে দেখুন তো, বিশেষ করে যেকোন বাংলা বাক্যে বসিয়ে? আমার কেন জানি মনে হলো - 'দুচাকা'-র ভেতর থেকে না আসাটা এতে খুব সামান্য হলেও হ্রাস পায়। অবশ্য এটা আমার মনের ভুলও হতে পারে!

****************************************

হিমু এর ছবি

সবাই দুচাকা বলা শুরু করলে দুচাক্কা মনে হয় দ্রুত বাজারে উঠে আসবে। সাইক্লিস্টকে কী বলবেন তখন? দুচাক্কী?

ফারসিতে বাইসাইকেলকে দোচরখে বলে সম্ভবত।

সোহেল ইমাম এর ছবি

দুচাক্কাবাজ !! দুচাক্কারু!! হাসি

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মন মাঝি এর ছবি

কিম্বা দুচাক্কাওয়ালা? চিন্তিত
(অবশ্য দুচাক্কাওয়ালা বললে ফেরিওয়ালা বা রিকশাওয়ালার মতো দুচাক্কার পেশাজীবী চালকের মতো শোনাতে পারে)।

****************************************

হিমু এর ছবি

ঢাক বাজায় যে = ঢাকী, মধুর চাক ভাঙে যে = চাকী, এই ঘরানায় ফেলে দুচাকী বলা যায়। মেয়ে সাইক্লিস্টকে তখন দুচাকিনী বলা যাবে। বাইসাইকেল লেইনের বাংলা করা যায় দুচাকাপথ।

মোটর সাইকেলকে কী বলা যায়? বাংলাদেশে অনেক জায়গায় মোটর সাইকেলকে লোকে "হুণ্ডা" হিসেবে চেনে। ব্যাপারটা হোণ্ডা কোম্পানির জন্যে শ্লাঘাব্যঞ্জক হলেও আমাদের জন্যে ইয়ে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

রক্ষণশীলতা কম-বেশি সব দেশে আছে, তবে আমাদের ক্ষেত্রে সেটা সামাজিক আচার-বিধি, ধর্ম-পূজা-প্রার্থণা ইত্যাদির সীমা ছাড়িয়ে জীবনের আরও নানা কন্দরে হানা দেয়। ৮,৬২৬ কিলোমিটার লম্বা সমুদ্রতটরেখা নিয়েও ভারতবর্ষের লোকেরা সমুদ্র অভিযাত্রায় দড় হয় না বা তাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে ওঠেনা কয়েক হাজার বছরেও; কারণ সমুদ্র অভিযাত্রার ক্ষেত্রেও পরম পাকা লোকজন নানা বিধিবিধান দিয়ে রেখেছেন। ফলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের হার্মাদ-ফিরিঙ্গীরা নৌকায় চড়ে এসে দেশ দখল করে ফেলে। পরম পাকারা সেই দস্যুতাকে নানা বিধিবিধান দিয়ে বৈধতা দিয়ে ফেলেন।

এদেশে রক্ষণশীলতার দুর্গ ভাঙতে হলে প্রবল পরাক্রান্ত দস্যু হতে হয়। শাক্যমুনি-বর্ধমান স্বামী-মাক্ষালী গোসালাদের পথে হাঁটলে বিধিবিধানের ধ্বজাধারী কোন এক চণ্ডাশোক এসে তাদের কচুকাটা করবে। এরচেয়ে বরং বার বার বাংলাকে লুট করে, হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগে ফর্দাফাই করে চলে যাওয়া বর্গী দস্যুদের পথে হাঁটলে এদেশের পরম পূজনীয় জনও তখন বলবেন,
"মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কণ্ঠে বলো
‘জয়তু শিবাজী’।
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো
মহোৎসবে সাজি।"

বাংলা ভাষার ঠিকঠাক ব্যাকরণ আজও গড়ে ওঠেনি। সংস্কৃতের পরম পাকারা সংস্কৃত ব্যাকরণের হাড্ডিগুড্ডিনাড়িভুঁড়ি দিয়ে বাংলা ব্যাকরণ বানিয়ে দিয়েছেন। পাণিনিকর্তৃক কাঠামোবদ্ধ এই ধ্রুপদী সংস্কৃত আর বৈদিক সংস্কৃত এক বস্তু নয়। ফলে বৈদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত, মাগধীর পথ ধরে যে বাংলা ভাষার জন্ম তার ব্যাকরণকে বাংলা ভাষার মামারশালারপিসেরভাই ধ্রুপদী সংস্কৃতের বিধিবিধান দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করলে যে ট্যাঁশগরু তৈরী হয় তা দিয়ে আর যাই হোক ভাষার উন্নতি হয় না।

ভাষায় তথাকথিত গুরুচণ্ডালী মিশ্রন আর ছন্দের বিধিবিধানকে ফর্দাফাই করে মাইকেল, এবং উপমা-রূপকের ফর্দাফাই করে জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যকে যে পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন সেই পথে হাঁটার মতো কোমরের জোর অন্যদের ছিল না। ফলে সাহিত্য রচনায় পরম পাকাদের বিধি বিধান আজও চোখ রাঙিয়ে যায়।

সুকুমার রায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আব্‌দার রশীদেরা শব্দ নিয়ে যে অল্প খেলাটুকু খেলে গেছেন সেগুলোতে এডওয়ার্ড লিয়ার, লুই ক্যারলদের মতো শব্দশিল্পীদের প্রভাব স্পষ্ট। তাতে ক্ষতি নেই। বিলেতী জেমস ওয়াট বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার করলেও সেটা বানানো বা ব্যবহারের অধিকার সারা দুনিয়ার আছে। বাংলা ভাষায় শব্দ নিয়ে এই খেলাটা সন্ধি-সমাসের সহযোগিতায় বেশ খেলা যায়। সে খেলাটা খেলার সামর্থ্য অনেকের থাকলেও তার কথা ভাবলে তাদের "বাইসেপ-অহম-যদিবলিলোকেহাসবে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় টান পড়ে"। ফলে বাংলা ভাষা এই ধন থেকে প্রায় বঞ্চিত রয়ে গেছে।

পরম পাকাদের হাত ভাষা-ব্যাকরণ ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ নয়। সে হাত সাহিত্যের কোনাকাঞ্চিতে সদাসর্বদা মুষল নিয়ে ঘোরাফেরা করে। ফলে বাংলা সাহিত্যে ফ্যান্টাসির দৌড় রূপকথা-উপকথা-লোককথা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কল্পব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করে সেখানে পাত্রপাত্রীদের চড়তে দেবার ঘটনা এখানে ঘটে না। আজতক সে ঘটনা ঘটেনি বলে যে ভবিষ্যতে সেটা ঘটতে পারবে না অমন ঐশ্বরিক বানী অবতীর্ণ হয়নি। কল্পব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের মাধ্যমে আখ্যান রচনার যে চর্চ্চা অন্য ভাষাগুলোতে বিদ্যমান সে চর্চ্চা বাংলায়ও করতে হবে। তাহলে নতুন নতুন শব্দ, সমস্তপদ নির্মাণের অবস্থা তৈরী হবে। আগে ব্যবহৃত হয়নি এমন কম্বিনেশনের উপসর্গ/অনুসর্গযুক্ত পদ ব্যবহারের চর্চ্চা তৈরী হবে।

সম্ভাবনা অপার। শুধু ব্যবহার করার শক্তি-সাহস-সামর্থ্য থাকতে হবে। আর একটু উদ্যোগ নিতে হবে। কলম/কী-বোর্ড নিয়ে বসতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

৮,৬২৬ কিলোমিটার লম্বা সমুদ্রতটরেখা নিয়েও ভারতবর্ষের লোকেরা সমুদ্র অভিযাত্রায় দড় হয় না বা তাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে ওঠেনা কয়েক হাজার বছরেও; কারণ সমুদ্র অভিযাত্রার ক্ষেত্রেও পরম পাকা লোকজন নানা বিধিবিধান দিয়ে রেখেছেন।

ভারতবর্ষের সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস কিন্তু যথেষ্ট পুরনো আর সমৃদ্ধ। ঋগ্বেদে রমরমা সমুদ্রবাণিজ্যের উল্লেখ আছে, আর বাবেরু-জাতকের বাবেরু তো ব্যাবিলন। ব্যাবিলনের সাথে নৌবাণিজ্য খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত বেশ সরগরম ছিলো বলে ধারণা করা হয়। ঐ আমলে পশ্চিম ভারতের প্রধান বন্দর ছিলো গুজরাটের শূর্পারক আর ভারুকচ্ছ। দুয়েকজন পণ্ডিতের ধারণা, এ নৌবাণিজ্য দ্রাবিড়দের হাতে ছিলো, আর্যদের হাতে নয়, কারণ বেশ কিছু একান্ত-ভারতবর্ষীয় পণ্যের নাম ব্যাবিলন-লেভান্ট হয়ে গ্রিসে গেছে দ্রাবিড় মূল থেকে। যেমন ময়ূরের তামিল-মালয়ালম নাম তোকেই, সলোমনের কেচ্ছায় সেটা হিব্রুতে তুকি, গ্রিকে হয়েছে তাওস। আবার চালের তামিল আরিসি, সেটা থেকে গ্রিকে হয়েছে ওরিজা (অবশ্য এটাও দেখেছি যে সংস্কৃত ব্রীহি থেকে আদি পারসি ব্রিসি হয়ে তারপরে ওরিজায় গিয়ে ঠেকেছে)। আবার ডিওডোরাস সিকুলাসের কথা বিশ্বাস করলে, সেমিরামিস যখন পশ্চিম ভারত আক্রমণ করে, তখন সিন্ধু নদে ৪,০০০ জাহাজ জড়ো করে সম্রাজ্ঞীর বহর প্রতিরোধ করা হয়েছিলো। আবার মৌর্য যুগে জাহাজনির্মাণ শিল্পের রাষ্ট্রীয়করণ ঘটেছিলো, অর্থশাস্ত্রে নৌবিভাগের কার্যক্রম নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে। কাশ্মীরের কবি ক্ষেমেন্দ্রের বোধিসত্ত্বাবদান কল্পলতায় বর্ণনা করা আছে, কীভাবে অশোকের পাটলিপুত্রের দরবারে পূর্বদিকের সমুদ্রপথে নাগা (চৈনিক?) জলদস্যুদের হাতে মালসামানা খুইয়ে বণিকরা বিচার দিতে এসে বলেছিলো, সম্রাট ব্যবস্থা না নিলে এ বাণিজ্য থেমে যাবে, তখন রাজকোষ শূন্য হয়ে যাবে। "পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি"-তে করোমণ্ডল উপকূল থেকে মালাক্কায় বাণিজ্যের জন্যে "কোল্যান্ডিওফন্টা" কিসিমের বিশাল জাহাজের বর্ণনা আছে। বার্মার পেগু অঞ্চল তেলুগুভাষী রাজ্যের অভিবাসীরা সমুদ্রপথে গিয়ে দখল করেছিলো, বার্মিজরা ওদের সে কারণে তালায়িং বলে ডাকতো। বার্মায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারই হয়েছে কলিঙ্গের বণিকদের হাত ধরে। ৭৫ খ্রিস্টাব্দে কলিঙ্গের হিন্দু বণিকেরা ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যবদ্বীপে উপনিবেশ পত্তন করে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার 'কয়েক হাজার বছরেও' বলাটা ভুল হয়েছে। আমার বলা উচিত ছিল 'গত দেড় হাজার বছরে'। কারণ, সমুদ্রযাত্রায় পরম পাকাদের বিধিনিষেধ এই সময়কালটাতে বিদ্যমান ছিল। আপনি ইতিহাসের যে সময়ের কথা বললেন সেটা ঐ নিষেধাজ্ঞা কালের আগের। এর যে ব্যতিক্রম নেই তা নয়। ভারত মহাসাগরে মারাঠাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। নদীপথে আকবরের শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। যে ভারতীয় নাবিকেরা বণিকেরা জাহাজে করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে বাণিজ্য করেছে, ধর্ম প্রচার করেছে, বসতি গড়েছে তাদের চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল বিধিনিষেধ দিয়ে। আপনার ধারণা ঠিক যে সমুদ্রাভিযানগুলোর কৃতিত্ব মূলত অনার্য-দ্রাবিড়দের। আর্য্য পরম পাকাদের বিধিনিষেধের এটা একটা কারণ হতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ বঙ্গোপসগার ও উত্তর ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নিয়মিতভাবে জাহাজডুবিতে সর্বস্ব হারানোটা ঠেকানোর জন্য। আরও একটা কারণ হতে পারে আর্য্যদের ধর্মকে সাগরের অন্য পাড়ের অন্য কোন ধর্মের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না করা। এই অবসরে এই এলাকায় সমুদ্রে পরাক্রান্ত আরব বণিকেরা আরও শক্তি অর্জন করেছে, আরাকানী-মগ-মালাক্কান-ফিলিপিনো'রা শক্তিশালী জলদস্যু নেটওয়ার্ক তৈরী করেছে; আর শেষে ইউরোপীয় ডাকাতরা জাহাজে করে এসে দেশ দখল করেছে। ভারতীয়দের সমুদ্রাভিযান বন্ধ করা না হলে হয়তো ভারতীয়রাই আরব গাইডদের সাহায্য নিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে জাহাজ বোঝাই পণ্য নিয়ে লিসবন বন্দরে উপস্থিত হতো।

পুনশ্চঃ পূর্ব দেশগুলোর ইতিহাসের ব্যাপারে গ্রীক ঐতিহাসিকদের বয়ানে আমার বিশেষ ঈমান নাই। এদের বর্ণনায় পূর্ব দেশগুলোর বিবরণ পড়লে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম বোঝা একটু মুশকিল হয়; কিলোমিটার আর মিলিমিটারের পার্থক্য করাও মুশকিল হয়। ইনারা পৌত্তলিক চরিত্রের, তাই যে নৃপতিকে পছন্দ করেন তাকে আকাশের সূর্য বানিয়ে ফেলেন, তার সৈন্য সংখ্যা আধুনিক ভারত বা চীনের জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে চায়, তার সোনাদানাধনরত্নের ভাণ্ডার হিমালয়ের চেয়ে উঁচু হয়ে যায়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় স্থলবদ্ধ, অর্থাৎ ল্যাণ্ডলক্‌ড মধ্য-এশিয়া থেকে প্রাচীণ যুগে আসা আর্য আর মধ্যযুগে আসা মোগলদের মধ্যে কোনরকম জলভীতি / সাগরভীতি বা নিদেনপক্ষে নৌ-এ্যাডভেঞ্চার নিয়ে কোন কমপ্লেক্স, গুরুত্ববোধহীণতা বা উপলব্ধিহীণতা ছিল - যে কারনে সাগরপারের আরব, ইউরোপীয় এমনকি অনার্য-দ্রাবিড়দের মতো এইক্ষেত্রে তারা খুব বেশি উৎসাহ দেখায় নি বা যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি? আমার মাঝে মাঝে এই সন্দেহটা হয়।

****************************************

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

ভারতীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী অনেক অভিযাত্রী মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও সন্নিহিত অঞ্চল সমূহে এক সময় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে সে সব অঞ্চলে রীতিমত হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ রাষ্ট্র পর্যন্ত গঠন করতে সমর্থ হয়েছিল। প্রাচীন অনেক মন্দির এবং অন্যান্য পুরাকীর্তি এখনও এ সকল অঞ্চলে কালের সাক্ষী হিসেবে রয়ে গেছে। অভিযাত্রী এবং অভিবাসীদের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ, উভয় ধরনের ভারতীয়ই ছিল। অভিযান কার্যক্রমের শুরু হয় কম করে হলেও খ্রীষ্টপুর্ব দুই/তিন শতকের দিকে এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে তা অব্যাহত ছিল। এ সব অঞ্চলে গমনাগমন/অভিযান নৌযাত্রা ছাড়া সম্ভব ছিল না। সুতরাং ভারতীয়দের জলভীতি বা সাগরভীতি ছিল, সেটা মনে করার কারন নেই। পরবর্তীতে কোন কারনে সমুদ্রযাত্রায় ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

মন মাঝি, আবদুল্লাহ্‌ ভাই, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৈদিক ধর্মগুলো প্রচারের কৃতিত্বটা পুরোপুরি আর্য্যদের নয়। এখানে অনার্য-দ্রাবিড়দের কৃতিত্ব বেশি, কারণ তারা সমুদ্রাভিযানে দড় ছিল। এই জন্য ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়াতে দক্ষিণ ভারতীয় দেবদেবীদেরকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। সেখানে উত্তর ভারতীয় বা আর্য্য দেবদেবীরাও অনেক বেশি দক্ষিণ ভারতীয় ফর্মের। পায়ে হাঁটা পথে হিমালয়ের মূলভাগ আর তার দক্ষিণবাহী শিরাগুলো পাড়ি দিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হয়েছে। সেখানে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের কৃতিত্বটা অভারতীয়দের বেশি।

মধ্য এশীয়, মঙ্গোল, য়ুরাল অঞ্চলের জাতিদের মধ্যে সমুদ্রভীতি থাকা খুবই সম্ভব। ভূমি-আবদ্ধ বলে এই জাতিসমূহের মধ্যে সমুদ্রাভিযাত্রীর সংখ্যা বিরল। সমুদ্র ছাড়াই তাদের সামনে পূর্বে কোরীয় উপদ্বীপ থেকে পশ্চিমে পর্তুগাল, উত্তরে মেরুদেশ থেকে দক্ষিণে ভারত-আরব-মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত তখনকার গোটা পৃথিবী জয় করবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। পাহাড়-তুষার-মরুভূমি-বন বড় জোর নদী তাদের কাছে বাধা স্বরূপ ছিল। যেখানে ঘোড়া চলে না সেখানে যাবার প্রয়োজন তাই তারা বোধ করেনি। এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে যেসব দুঃসাহসী সমূদ্র পাড়ি দিয়ে জাপান দখল করতে যেতো তাদের ঠেকানোর জন্য জাপানীরা নাকি সমুদ্র তটরেখা জুড়ে এক মানুষ সমান উঁচু পাথরের দেয়াল তুলতো যাতে ঘোড়া তা ডিঙাতে না পারে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের "Hindu Colonies in the Far East" নামক গবেষণা গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ থেকে নীচের অংশটুকু তুলে ধরলাম।

.........মালয়ে এইরূপ বহু উৎকীর্ণ লিপি পাওয়া গিয়াছে। এইগুলি সংস্কৃত ভাষায় চতুর্থ বা পঞ্চম খ্ৰীষ্টাব্দে প্রচলিত ভারতীয় লিপিতে লেখা। ইহাদের মধ্যে দুইটিতে বৌদ্ধমন্ত্র থাকায় বোঝা যায় যে এইস্থানে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার হইয়াছিল। কেন্ডার নিকট তিনটি সংস্কৃত মহাযান সূত্র উৎকীর্ণ একটি মাটির ফলক পাওয়া গিয়াছে। এই সূত্র তিনটি “সাগরমতিপরিপৃচ্ছা’ নামক গ্রন্থের চীনা অনুবাদে পাওয়া যায়। এই লিপিগুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে চতুর্থ বা পঞ্চম খ্ৰীষ্টাব্দের মধ্যে ভারতীয়রা মালয় উপদ্বীপের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং ঔপনিবেশিকদের মধ্যে যেমন দক্ষিণ ভারতের লোক ছিল তেমন উত্তর ভারতের লোকও ছিল। একটি উৎকীর্ণ লিপিতে ‘রক্তমৃত্তিকার অধিবাসী' বুদ্ধগুপ্ত নামে একজন মহানাবিকের উল্লেখ আছে। ‘রক্তমৃত্তিকা’ বাংলাদেশের মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি গ্রামের প্রাচীন নাম বলিয়া অনেকে অনুমান করেন।.....

এ থেকে বোঝা যায় উত্তর দক্ষিণ নির্বিশেষে সকল ধরনের ভারতীয়রাই সমুদ্র অভিযানে সিদ্ধ ছিল। বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত বন্দর যে সময় কর্মমুখর ছিল, তখন এ স্থান থেকে ভারতীয় নাবিকদের নানা স্থানে ভ্রমণটা খুবই সম্ভব। আর দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ায় দক্ষিনী প্রভাব এখন এত বেশী পরিলক্ষিত হওয়ার কারন সম্ভবত চোল রাজাদের সে সব অঞ্চলে সামরিক অভিযান এবং উপনিবেশ স্থাপন। কিন্তু সে সব তো আরও অনেক পরের ঘটনা।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

মালয় উপদ্বীপের পশ্চিমের কেদাহ্‌তে সংস্কৃত লিপিযুক্ত মাটির ফলক পাওয়া থেকে শ্রীযুক্ত মজুমদারের উত্তর ভারতের লোক থাকার সিদ্ধান্তটি কি অতি সরলীকৃত বলে মনে হয় না! আর্য্য ধর্ম দক্ষিণ ভারতে বিস্তারের পর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়ে গেছে। সুতরাং ধর্মীয় শ্লোক লেখার ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতীয়রাও কি সংস্কৃত ব্যবহার করার কথা না? 'রক্তমৃত্তিকা' মুর্শিদাবাদে হবার চেয়ে চট্টগ্রামে হওয়াটা অধিক যুক্তিযুক্ত হয় না!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

প্রাচীন রক্তমৃত্তিকার বর্তমান অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবেত্তারা বিস্তর সংশয়ে ছিলেন। "বাঙালির ইতিহাস: আদি পর্ব" বইয়ের প্রথম সংস্করণে নীহাররঞ্জন রায় কোন কোন স্থান রক্তমৃত্তিকার উত্তররূপ হওয়ার দাবিদার, তা নিয়ে খানিক আলোচনা করেছিলেন। তিনিও চট্টগ্রামের রাঙামাটির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি, যেহেতু মালয় উপদ্বীপ চট্টগ্রামের নিকটতর। কিন্তু বইটির পরবর্তী সংস্করণে তৎকালীন টাটকা উৎখননে পাওয়া কিছু ভৌত প্রমাণ আর য়ুয়ান চোয়াঙের কর্ণসুবর্ণ যাত্রার বর্ণনায় পাওয়া লো-তো-মি-চি (রক্তমত্তি < রক্তমৃত্তিকা) বৌদ্ধবিহার, দুটো সমন্বয় করে দেখিয়েছেন যে মুর্শিদাবাদ এলাকাতেই বুদ্ধগুপ্তের রক্তমৃত্তিকার অবস্থান। এ এলাকার মাটিও গৈরিক, তাতে ছোটোনাগপুর-রাজমহল থেকে গড়িয়ে নামা নদী-ঝর্ণার ভূমিকা আছে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

প্রশ্ন হচ্ছে কেদাহ্‌তে প্রাপ্ত ফলকটি কবেকার? স্যুয়াঙ চ্যাঙ ভারতে এসেছিলেন সপ্তম শতকে। চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্ম পৌঁছে গেছে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে। তো এক হাজার বছরে চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে বৌদ্ধ বিহার তৈরি হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আর চট্টগ্রামের রাঙামাটির নাবিকের মালয় উপদ্বীপে পৌঁছানোও খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কেদাহ্‌তে প্রাপ্ত ফলকের জন্ম যদি সপ্তম শতক বা তার পরে হয় অথবা সেখানে যদি স্যুয়াঙ চ্যাঙ-এর সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কিছু থাকে তাহলে মুর্শিদাবাদের দাবী গ্রহনযোগ্য হয়। নচেৎ চট্টগ্রামের দাবীই অগ্রগণ্য হয়। লাল রঙের মাটি চট্টগ্রামেও আছে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

বুদ্ধগুপ্তের লিপি চতুর্থ-পঞ্চম খ্রিস্টাব্দের। চট্টগ্রামের রাঙামাটির নাম কবে রাঙামাটি রাখা হয়েছে, তার উত্তর আগে জানতে হবে।

বুদ্ধগুপ্তের লিপিতে বলা আছে, তিনি রক্তমৃত্তিকা থেকে মালয় গিয়েছেন, রক্তমৃত্তিকার বৌদ্ধবিহারের আশীর্বাদ নিয়ে। সাধারণত সমুদ্রযাত্রার বর্ণনায় দুটো বন্দরের কথাই বলা হয়। চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে বন্দর আর বৌদ্ধবিহার আমরা তর্কের খাতিরে কল্পনা করছি। আর কর্ণসুবর্ণের রক্তমৃত্তিকা গঙ্গা-ভাগীরথীর তীরে, সেখানে খনন করে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের নামাঙ্কিত ফলক পাওয়া গেছে। এ বিহারে য়ুয়ান চোয়াঙও এসেছিলেন।

থাইরা দাবি করে রক্তমৃত্তিকা থাইল্যান্ডে। ওখানেও "লাল মাটি" নামের সাথে সম্পর্কিত নামের প্রচুর জায়গা আছে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বুদ্ধগুপ্তের লিপি চতুর্থ/পঞ্চম শতকের হলে সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। তখন সমুদ্রযাত্রায় বাধা ছিল না। সুতরাং বুদ্ধগুপ্ত ভারতবর্ষের যে কোন জায়গার হতে পারেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

রমেশচন্দ্র মজুমদারের যে বইটির কথা উপরে উল্লেখ করেছি, সেখানে আমার উদ্ধৃত অংশটি ছাড়াও আরও বহু বর্ননা আছে, যেখানে চীনা সূত্র থেকে জানা যায় যে খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম দিকেই মালয়, সুবর্নদ্বীপ, জাভা, বালি, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, প্রভৃতি স্থানে ভারতীয় উপনিবেশ কিংবা বসতি স্থাপিত হয়েছে। সে সবের সাথে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতের কলিঙ্গ, গুজরাট, তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি উত্তর ভারতীয় স্থানের সংশ্লিষ্টতাও মিঃ মজুমদার বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করে নির্দেশ করেছেন।

যতদূর জানি, উল্লেখিত রাঙ্গামাটির অবস্থান মালদা মুর্শিদাবাদের অঞ্চলের বাইরে এখন আর কেউই মনে করেন না। আপনার দাবী মত যদি তা চট্টগ্রাম বলে মেনেও নেই, তবুও মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের দক্ষিণ ভারতীয় হবার কোন সম্ভাবনা থাকে কি?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বুদ্ধগুপ্তকে দক্ষিণ ভারতীয় হতে হবে অমন দাবী আমি করছি না। সমুদ্রযাত্রায় উত্তর ভারতীয়দের পিছিয়ে থাকার ব্যাপারটা ঐতিহাসিক।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

‘রক্তমৃত্তিকা’ বাংলাদেশের মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি গ্রামের প্রাচীন নাম বলিয়া অনেকে অনুমান করেন।

স্রেফ শব্দার্থের মধ্যেই মিলই যদি এই অনুমানের কারন হয়, তাহলে "রক্তমৃত্তিকা" ঢাকা শহরের 'লালমাটিয়া" নামের এলাকাটা হতে অসুবিধা কোথায়? হাসি

****************************************

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

অনুমানটি যদি আমি করি, কিংবা কোন ছলিমুদ্দি কলিমুদ্দি, তাহলে এই কথা বলা যায়। কিন্তু এই অনুমান যাঁরা করেছেন, তাঁদের এরকম কিছু অনুমানের পিছনে রয়েছে বহু দিনের বহু গবেষণা। সুতরাং এভাবে সরলীকরণ করা কতটা যৌক্তিক?

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আমার প্রস্তাব- সাইকেলের নাম দুপাচাক্কা, রিক্সার নাম তেপাচাক্কা, আর ভ্যানের নাম চৌপাচাক্কা। চালকদের নাম যথাক্রমে দুপাচাক্কী, তেপাচাক্কী আর চৌপাচাক্কী। অবশ্য আইডিয়ার জন্য চাকমাভাষী চলচ্চিত্র পরিচালকের কাছে একান্তভাবেই ঋণী।

চলতি পথে সাইনবোর্ড চোখে পড়বে- "এখানে দুপাচাক্কা ও তেপাচাক্কার লিক উত্তমরূপে সারাই করানো হয়, পাম দেওয়া হয় এবং সকল প্রকার যন্ত্রাংশের খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা"।

রেলপথের নাম ইসপথ(ইস্পাতের পথ) অথবা ইসজোড়পথ(ইস্পাতের জোড়া পথ)।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আরে! এই মন্তব্যটা এখানে এলো কী ভাবে? চিন্তিত

সত্যপীর এর ছবি

আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় স্থলবদ্ধ, অর্থাৎ ল্যাণ্ডলক্‌ড মধ্য-এশিয়া থেকে প্রাচীণ যুগে আসা আর্য আর মধ্যযুগে আসা মোগলদের মধ্যে কোনরকম জলভীতি / সাগরভীতি বা নিদেনপক্ষে নৌ-এ্যাডভেঞ্চার নিয়ে কোন কমপ্লেক্স, গুরুত্ববোধহীণতা বা উপলব্ধিহীণতা ছিল

আলী সায়েব কয়েছেনঃ
"একাধিক রণ-পণ্ডিত বলেছেন, হিটলার এমন দেশে জন্মগ্রহন করেছিলেন, যার সঙ্গে সমুদ্র ও সমুদ্রাভিযানের যোগসূত্র বা ঐতিহ্য ছিলনা। অস্ট্রিয়াকে ইংরেজ, স্পানীয় বা আরবের মত ম্যারিটিম নেশন বলা চলে না। তাই ইংলন্ড অভিযানের সব কিছু তৈরী করেও হিটলার শেষ মুহুর্তে কিন্তু-কিন্তু করে থেমে গেলেন।
অর্থাৎ জলাতঙ্ক না থাকলেও হিটলারের সমুদ্রাতঙ্ক ছিল - অন্তত সমুদ্র-প্রীতি যে ছিলনা সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। অবশ্য মানতে হবে এইটেই সর্বপ্রধান কারণ নয়।
পাঠান মোগল বংশের রাজাদেরও হিটলারের অবস্থা ছিল। এঁরা এসেছিলেন ল্যান্ড-লকট দেশ থেকে। সমুদ্রের সাথে তাঁদের কণামাত্র সম্পর্ক ছিল না। আমার যতদূর জানা আছে, মোগলদের ভিতর প্রথম আকবরই গুজরাত জয় করে চাক্ষুষ সমুদ্রদর্শন করেন। 'আকবর-নামার' ইংরিজী অনুবাদক সেই সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে সমুদ্র আকবরের মনে কোনও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি। তাও আকবর প্রভৃতি বাদশারা যদি সমুদ্রপারে কিংবা অদূরে রাজধানী করতেন তা হলেও না হয় কিছুটা হত। তাঁরা থাকতেন আগ্রা-দিল্লীতে যেখানে সমুদ্রের লোনা হাওয়া পর্যন্ত পৌঁছয় না।
ফলে এদের বিপুল ঐশ্বর্য জনবল থাকা সত্বেও আমাদের নৌবহর তৈরী হলনা।
হোয়াট এ ট্র্যাজেডি! এঁরা যদি নৌবহর তৈরী করতেন, তবে পর্তুগীজ ইংরেজ এদেশে যে এক রত্তি পাত্তা পেতনা তাই নয়, আমাদের পণ্যসম্ভার আমাদের জাহাজে করে দুনিয়ার বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়াত। আজ আমরা মার্কিন ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিতুম।"
(রাজহংসের মরণগীতি)

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

হ্যাঁ, মোগল পাঠান ভাইদের ব্যাপারে এ কথা পুরোপুরিই প্রযোজ্য, তেনারা বোধ হয় সমুদ্রদর্শনে প্রমোদ অপেক্ষা ভীতি বোধ করতেন বেশী।

সোহেল ইমাম এর ছবি

আপনার এই সিরিজটা ভালো লাগছে। ভাষার ক্ষেত্রে যে এখনও আমাদের অনেক কিছু করার আছে এটা আপনি এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালে হয়তো উপলব্ধিতে আসতোনা। এখন হরহামেশা আপনার কথা গুলো মাথার ভেতর ঘোরে। আড্ডার হৈ হল্লার মধ্যে আমরাই হাসতে খেলতে কত শব্দ বানিয়েছি কিন্তু ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এসে কি যেন একটা জড়তায় তোতাপাখির মত হয়ে যাই। সিরিজটা আরো চলুক।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মাহবুব লীলেন এর ছবি

আমার দাদাবাড়ি এলাকায় (কুলাউড়া) একবার একজনের মুখে সাইকেলের নাম শুনছিলাম 'পায়দল'। বাবার মুখেও দুয়েকবার শুনেছি। পায়দলে যাও; মানে সাইকেলে যাও
এইটা 'পা দিয়ে দলে' অথবা প্যাডেল থেকে আসছে কি না জানি না। কিন্তু শব্দটা কোনো এককালে বোধহয় প্রচলিত ছিল

নিঃসঙ্গ গ্রহচারী  এর ছবি

পায়দল মানেতো হেঁটে যাওয়া।

সোহেল ইমাম এর ছবি

হিন্দি ভাষায় পায়দল শব্দটা মনে হয় পায়ে হাঁটা অর্থে প্রয়োগ হতে দেখেছি। যেমন আমরা বাংলায় বলি তিনি পদব্রজে যাত্রা করিলেন, পায়ে হেঁটে আসলেন।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

'পায়দল' প্রমিত বাংলা শব্দ, এর অর্থ 'পদাতিক বাহিনী'। এই অর্থ ছাড়া 'পায়ে হেঁটে যাওয়া'কেও পায়দল বলা হয় - এর বহুল ব্যবহার দেখা যায়। আপনি যে উদাহরণটা দিলেন সেটা বোধকরি একেবারেই আঞ্চলিক।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মাহবুব লীলেন এর ছবি

ঠিকাছে; পায়দল মানে পায়ে হাইটা যাওয়া
গুলায়ে ফেলছিলাম

স্পর্শ এর ছবি

চমৎকার আলোচনাটা চালিয়ে যাবার জন্য ধন্যবাদ।

শেষের কল্পজগৎ এ নতুন ভাবে শব্দসৃষ্টির ধারনাটা ভাল লাগল। আপনার হাত দিয়েই এমন কিছু গল্প আসুক।
ভাষা-সাহিত্যের ক্ষেত্রে দেখেছি। অনেক সময় একা হাতেই অনেক কিছু করে ফেলা যায়।তার জন্য যে বাস্তুসংস্থান দরকার, সেটা না হয় সচল থেকেই এলো।

যে লেখক নতুন শব্দ শৃষ্টির গুরুভার নেবেন, তার গল্পরচনার পাশাপাশি ভাষাজ্ঞান আর শব্দরুচিরও একধরনের পরিপক্ষতা প্রয়োজন। এইসব চাপ কেউ নিতে চায়না বলেই বাংলা সিনেমা-নাটকের আজ এই দশা।

ঠ্যাংগাড়ির চালককে কি বলে, ঠ্যাঙাড়ে দেঁতো হাসি ?


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

শিশিরকণা এর ছবি

আচ্ছা! ব্লগ শব্দটার বাংলা কি হবে তাহলে? ওয়েবলগ হতে পারে অন্তর্জালকথিকা? এর সংক্ষিপ্ত আকার হতে পারে জালকথিকা?

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

হিমু এর ছবি

আরেকটু ঘুরিয়ে চিন্তা করে দেখেন, আরো কিছু পান কি না।

আমরা ইন্টারনেটের আক্ষরিক অনুবাদ করেছি আন্তর্জাল (অন্তর্জাল হচ্ছে ইনট্রানেট)। বাইসাইকেলকে দুচাকা বললে যেমন চট করে একটা ছবি ভেসে ওঠে মনের মধ্যে, আন্তর্জালের মধ্যে সে "ছবি"টা যেন পুরোপুরি পাওয়া যায় না। যেমন ইংরেজি স্পেইসের চেয়ে বাংলা মহাশূন্য অনেক বেশি লাগসই। ইন্টারনেটের চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে পারে, এমন একটা শব্দ দরকার। তখন ঐ শব্দটাকেই উপসর্গের মতো ব্যবহার করা যাবে। ব্লগসহ আরো অনেক কিছুর বাংলা করা তখন সহজ হয়ে যাবে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর কাজাখরা মাতৃভাষার ওপর জোর দিয়ে পরিভাষার ওপর প্রচুর কাজ করেছে। ওরা ইন্টারনেটের অনুবাদ করেছে গালামতোর (পৃথিবীজাল), কিন্তু আন্তর্জাল যেমন বাংলায় কম চলে, কাজাখে গালামতোরও তাই। মাওরি ভাষায় ইন্টারনেট হচ্ছে ইপুরাঙ্গি; এর দুটো মানে আছে, ব্যাঙের ছাতা আর ঝর্ণার উৎস, সেদিক থেকে এটা বেশ কাব্যিক, ইন্টারনেটের চরিত্রটাও খানিকটা ফুটে উঠেছে।

মন মাঝি এর ছবি

তথ্যজাল?

****************************************

হিমু এর ছবি

"জাল" ছাড়া কিছু কি হয়? কারণ সংক্ষেপে জাল- উপসর্গ দিয়ে বলতে গেলে কোনটা জালিয়াতির জাল আর কোনটা নেটওয়ার্কের জাল, সেটা নিয়ে আবার ঝামেলা হবে। ইপুরাঙ্গির উদাহরণটা এ জন্যেই টানলাম, ইন্টারনেটকে জাল হিসেবে না দেখে একটা বড়সড় আশ্রয়স্থল, কিংবা উৎস হিসেবেও দেখা সম্ভব।

বসন্তের একটা প্রতিশব্দ আছে, কুসুমাকর (ফুলের খনি)। ইন্টারনেটকেও আমরা চাইলে এক অফুরান, চিরবর্ধমান খনি হিসেবেও দেখতে পারি কিন্তু (খনিও একটা বিশেষায়িত নেটওয়ার্ক)। ইন্টারনেটকে যদি শুধু "আকর" বলি আমরা (যেহেতু শব্দটা তার মূল অর্থে এখন ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে), তাহলে নেটবিষয়ক সবকিছুর গোড়ায় "আকর-" উপসর্গ বসিয়ে আরাম করা যাবে। ব্লগ হয়ে যাবে আকরলেখা, পডকাস্ট হবে আকরবাণী, স্ট্রিমড মিউজিক হবে আকরগান... ইউ নেইম ইট, উই হ্যাভ ইট।

সোহেল ইমাম এর ছবি

উর্ণালোক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

হিমু এর ছবি

ঊর্ণ মানে কিন্তু wool। মাকড়সাকে ঊর্ণনাভ বলে বটে, কিন্তু সেটা জালের কারণে নয়, সুতোর কারণে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ইন্টারনেট 'আকর' বটে, কিন্তু এটা কি শুধুই আকর? এটা আকর, যোগাযোগের উপায়, প্রচার মাধ্যম, বিনোদনের মাধ্যম, কর্মসঞ্চালনের উপায় কত কী! আকর দিয়ে সমস্তপদ তৈরী করলে আরাম হয় বটে কিন্তু তাতে ইন্টারনেটের গভীরতা আর ব্যাপকত্ব অনেকটাই মার খেয়ে যায় না! আমার মনে হয় আমাদের আরও ভাবতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

একই আপত্তি "ইন্টারনেট" শব্দটার ক্ষেত্রেও খাটে তো। "ইন্টারনেট" শব্দটা দিয়ে বিনোদনের মাধ্যম, বা কর্মসঞ্চালনের উপায়, এগুলো কি বোঝা যায়?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপত্তিটা অবশ্যই 'ইন্টারনেট' শব্দটার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ওটা নিয়ে সায়েবরা ভাবুক, আমরা বরং এর লাগসই বাংলা প্রতিশব্দের জন্য আরেকটু ভাবি।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

ঐ আপত্তি বজায় রেখে "ইন্টারনেট" দিয়ে কাজ চালানো গেলে, তার পরিভাষার ক্ষেত্রেও একই ছাড় দেওয়া যাবে।

শিশিরকণা এর ছবি

ইন্টারনেট এর পুরো ব্যাপারটাই হলো সুতোর বুনট। জালের ধারণা সেখান থেকেই আসছে। সুতো ধরে ধরে আপনি নানা জায়গায় পৌছতে পারবেন, গিট দিয়ে দিয়ে সুতোর নানান ব্যবহার সৃষ্টি করতে পারবেন। এই সুতোগুলোকে ধারন করে আছে যা, তাকে বলা যেতে পারে, সুতোধার। ওয়েবসাইট বরং হতে পারে তথ্যজাল, যেখানে সুতো বুনে জাল পাতা হয়েছে তথ্য ধরে রাখতে।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

শিশিরকণা এর ছবি

ব্লগ এর পরিভাষা ভাবতে গিয়ে মনে এলো, ডিজিটাল এর বাংলা কি হবে? এনালগ এর বাংলাই বা কি হবে?

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

হিমু এর ছবি

ডিজিটালকে আঙ্কিক আর অ্যানালগকে নিরাঙ্কিক বলা যায়।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

বাংলা ভাষা তো বহুকাল ধরে অন্যের ভাষা ধার করে করে সমৃদ্ধ হচ্ছে। নিজস্ব শব্দ সৃষ্টির ব্যাপারটা গত এক শতাব্দীতেও চোখে পড়ে না। ইন্টারনেট, ব্লগ, ডাউনলোড, ওয়েবসাইট, এই শব্দগুলোকে আজকাল আর ইংরেজী বা বিদেশী শব্দ মনে হয় না। এগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ বানাতে গেলে সেটাই বরং বিদেশী শব্দের মতো মনে হবে।

মাঝে মাঝে বাংলা ভাষায় কিছু অনুভূতি প্রকাশে শব্দ সংকট লাগে। সেরকম একটা পরিস্থিতিতে একবার আমি নিজে নিজে একটা শব্দ উদ্ভাবন করার চেষ্টা করলাম। শব্দটা একটা গালি বা নিন্দা। একজন খুব অসৎ এবং ভণ্ড চরিত্রের মানুষকে দেখে শব্দটা মাথায় আসলো। সেই মানুষের চরিত্র হলো নিজে যেসব অপকর্ম করে বেড়ায় অন্যকে সেসব অপকর্মের জন্য দোষারোপ করে।[সে একজন প্রতিষ্ঠিত লম্পট, কিন্তু বাড়ি ফেরার পর তার অতি লক্ষী বউটাকে বেল্ট খুলে পিটানোর পর গালি দেয় বেশ্যা বলে] লোকটাকে ভণ্ড বলে গালি দিতে চাইলাম, কিন্তু যুতসই হলো না। আরো শব্দ খুঁজলাম কিছুতে যুত হলো না। শেষে স্বপ্নে পাওয়া একটা শব্দ মাথায় আসলো 'ছোলেষ'। আমি মনে মনে বহুবার শব্দটা উচ্চারণ করলাম ছোলেষ, ছোলেষ, ছোলেষ.....শব্দটা কেমন পছন্দ হয়ে গেল গালি হিসেবে। এখন লোকটাকে দেখলেই 'ছোলেষ' বলে গালি দেই। যুতসই শব্দে গালি দিলে এত আরাম লাগে আগে জানতাম না। শেষে নিজের ডিকশেনারীতে শব্দটা যোগ করে রাখলাম। যে ব্যক্তি নিজে অপকর্ম করে কোন নির্দোষকে সেই অপকর্মের জন্য দোষারোপ করে= 'ছোলেষ'।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

হিমু এর ছবি

বাংলা ভাষা তো বহুকাল ধরে অন্যের ভাষা ধার করে করে সমৃদ্ধ হচ্ছে। নিজস্ব শব্দ সৃষ্টির ব্যাপারটা গত এক শতাব্দীতেও চোখে পড়ে না। ইন্টারনেট, ব্লগ, ডাউনলোড, ওয়েবসাইট, এই শব্দগুলোকে আজকাল আর ইংরেজী বা বিদেশী শব্দ মনে হয় না। এগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ বানাতে গেলে সেটাই বরং বিদেশী শব্দের মতো মনে হবে।

আমরা পাঠ্য বইতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের যেসব বিশেষ শব্দ পড়েছি, সেগুলোভ একটা বড় অংশ গত এক শতাব্দীতে গড়েপিটে তৈরি করা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সংসদের একটা বড় ভূমিকা আছে এ ব্যাপারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি উদ্যোগী হয়, হয়তো আবার পরিভাষা নিয়ে আন্তরিক কাজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেগবান হতে পারে।

তবে "ধার নিয়ে সমৃদ্ধ হওয়া"র ধারণাটায় দ্বিমত করছি। পৃথিবীর সব ভাষাতেই বিদেশি শব্দ ঢোকে, সেটাই ভাষার স্বাভাবিক ধর্ম। কিন্তু যা কিছু নতুন, তার সবই ইংরেজিতে পাওয়া এবং ইংরেজিতে গাওয়াকে ঠিক ধার নেওয়া বলা যায় না, এটা এক ধরনের নিরুপায় আসক্তি হয়ে গেছে। ইন্টারনেট বাংলাদেশে রমরমা হয়েছে হয়তো দু'দশক ধরে, এই দু'দশকে য়্যাত্তো ভারি ভারি মহা মহা পণ্ডিত লোক কেউ চেষ্টাই করেননি একে বাংলায় চিনতে। ইন্টারনেট তো মূর্খ লোকে ব্যবহার করেন না, "শিক্ষিত"রাই করেন, তাঁরাও বিকল্প খোঁজেন না। ফলে একসময় জিনিসটাকে স্বভাষায় চেনার চেষ্টাই হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের শিক্ষা আর আত্মসম্মানজ্ঞানের ছোটো ছোটো পরীক্ষা হয়ে যায় এ শব্দগুলোতে এসে।

এভাবে সমানে ধার করে সমৃদ্ধ হতে গেলে একটা কিছু বন্ধক দিতে হয়। আমরা সম্ভবত আত্মসম্মান, বা আত্মশক্তি-উপলব্ধির-সামর্থ্য বন্ধক দিয়েছি। সে খাতে শূন্যতা এখন ইংরেজি দিয়ে ভরাট করছি, অনাগত দিনে হিন্দি বা চীনা দিয়ে ভরাট করতে হবে হয়তো।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

আমরা সম্ভবত আত্মসম্মান, বা আত্মশক্তি-উপলব্ধির-সামর্থ্য বন্ধক দিয়েছি। সে খাতে শূন্যতা এখন ইংরেজি দিয়ে ভরাট করছি

আমরা বোধহয় সবচেয়ে বেশী বন্ধক দিয়েছি স্কুলের ইংরেজী পাঠ্য বইয়ের ক্ষেত্রে। দেশের প্রতিটি স্কুলে(সরকারী বাদে) যে সকল ইংরেজি অপ্রয়োজনীয় বই পড়ানো হয় তার সবগুলোই বিদেশী সুত্র থেকে পাওয়া। এটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বড় ধরণের একটা ঘা। এই ঘা নিয়ে সরকার বা শিক্ষকসমাজ কারো মাথাব্যথা দেখি না। অনেক অভিভাবকও মেনে নিয়েছে এই ক্ষতকে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

হিমু এর ছবি

ভুক্তভোগী হিসেবে এ নিয়ে একটা বিশদ পোস্ট দেবেন নাকি?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA