ব্লেড হ্রদের ধারে

জীবনযুদ্ধ এর ছবি
লিখেছেন জীবনযুদ্ধ [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ০৭/১২/২০১৬ - ৩:৪৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ দূরপাল্লার ট্রেনেই বসবার স্থানগুলো থাকে কূপের ভেতরে, একেকটি কূপে ছ জনের বসবার ব্যবস্থা। ব্যাপারটি বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় সেই কূপে যাত্রী আছে এক কী দু জন। এযাবৎ আমার কূপভাগ্য বেশ ভালই বলতে হবে, কারণ এখন পর্যন্ত যতবারই এমন কূপে উঠেছি পেয়েছি যতসামান্য যাত্রী। আর যাদেরকেও পেয়েছি তাদের সাথে আলাপ জমে উঠতে দেরি হয়নি। ভিয়েনার ‘হাউপ্ট বানহফ’ স্টেশন ছেড়ে আমার ট্রেনটি বেশ কয়েকশ মাইল যাওয়া অব্ধি আমার কূপে একমাত্র আমিই ছিলাম। চোখ ভরে দেখছিলাম অস্ট্রিয়ার গ্রামীণ প্রকৃতি, দূরের পাহাড়ের মাথায় বাতিঘরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গির্জার চুড়ো, পাহাড়ের ঢাল আড়াল করে রাখা পাইনের বন। ভোরের সময়, তাই স্বাভাবিকভাবেই মাঝে মাঝে বুজে আসছিলো দু চোখের পাতা। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ঘুমোবার সুযোগ নেই। তাঁর আগেই ট্রেনটি ‘পিউউউ’ শব্দে একটানা হুইসেল বাজিয়ে জানিয়ে দেয়, “ওহে ওঠো ওঠো, তাকিয়ে দেখ বাইরের অপার সৌন্দর্য”। আমি সে ডাকে সাড়া দেই, যতটুকু সম্ভব তন্দ্রার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ডুবে যাই একটানা ছুটে চলা দৃশ্যাবলীর মাঝে।

আমি চলেছি ভিয়েনা থেকে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুব্লিয়ানায়। ছ ঘণ্টার পথ। ইচ্ছে করেই ট্রেন-যাত্রা বেছে নিয়েছি, এতে হয়তো একটু সময় বেশি লাগবে। লাগুক। তেমন কোন তাড়া নেই আমার, বেশ এক লম্বা ছুটিতে এবার এসেছি পূর্ব ইউরোপে।

কেপফেনবার্গ স্টেশনে ট্রেনটি থামলে আমার কূপে এসে বসলো এক যুবক। ত্রিশের কোঠায় বয়স। চোখে মোটা ফ্রেমের একটি চশমা। মাঝারি গড়নের এই যুবক কূপে ঢোকা মাত্রই জার্মান ভাষায় কারও সাথে মুঠোফোনে কথা বলা শুরু করলেন। আমি বসে বসে এই যুবককে পর্যবেক্ষণ করি। বোঝার চেষ্টা করি এই যুবক কী আদতে জার্মান? গাত্রবর্ণ এবং মুখমণ্ডলের গড়ন দেখে তাকে কিন্তু এশীয় বলেই মনে হয়, ওদিকে আবার চোস্ত জার্মানের জন্যে সে সিদ্ধান্তেও ঠিক উপনীত হতে পারছি না। সে অনুমানের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলো সে যুবক নিজেই, মুঠোফোনে কথা শেষ হবার পর। “কোথা থেকে আসছো তুমি? আর যাচ্ছই বা কোথায়”? আমি যে ভিয়েনা থেকে স্লোভেনিয়ার লুব্লিয়ানায় যাচ্ছি সে শুনে যুবক কিছুটা বিস্মিত হয়। এ পথে সে নাকি দৈনিক যাতায়াত করে, তাই আমার মতো পর্যটক নাকি কমই দেখেছে এ ট্রেনে। আমাদের আলাপ জমতে থাকে। আমি জানতে পারি, আমার প্রথম অনুমানটি সঠিক। এই যুবকের নাম শেরিফ। ইরান থেকে পালিয়ে এসেছিল হাইস্কুলের গণ্ডি পেরনোর পরই। তারপর এ দেশে এসে যন্ত্র-প্রকৌশল এবং অর্থনীতিতে দ্বৈত স্নাতক ডিগ্রী নেয়। কিন্তু তারপরও কাজে-কর্মে নাকি খুব একটা সুবিধে করতে পারেনি গত পনের বছর অস্ট্রিয়াতে কাটিয়ে দেবার পরও। আমাকে বলছিলো, “বেশ করেছ আমেরিকা পাড়ি জমিয়ে, কেন যে এদেশে এসেছিলাম। গত দু মাস ধরে স্থায়ী কোন চাকরি নেই। বেকার ভাতার অল্প কিছু টাকা পাই, কিন্তু তাই দিয়ে কী আর সংসার চলে”? তা এখন যেখানে যাচ্ছ সেখানে কী এই চাকরি সংক্রান্ত কোন ব্যাপারে যাচ্ছ? আমার পায়ের নাইকি জুতোর দিকে নির্দেশ করে সে জবাব দেয়, “ওই নাইকির এক জুতোর দোকানে কয়েক ঘণ্টার একটা পার্ট-টাইম কাজ জুটিয়েছি গত মাস থেকে। সেখানেই যাচ্ছি আজ”। শেরিফের কথাতে আমি যারপরনাই অবাক হই। ওর মতো উচ্চশিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থান নিয়ে যদি এতটা জটিলতা থাকে, তবে বাদবাকি আমজনতা অভিবাসীদের তো ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হবার কথা। অথচ এতকিছুর পরও তো অস্ট্রিয়া-অভিমুখে অভিবাসীর ঢল থেমে নেই। সে কথা আমি পাড়ি ওর কাছে। শেরিফ কাষ্ঠ হেসে জবাব দেয়, “ সে তো বটেই। এমনকি আমার দেশ ইরান থেকেও তো কত লোক এখনও এ দেশে আসছে, বা আসার চেষ্টা করছে। তবে আমার মতো যারা অনেক আগেই এসে খুঁটি গেড়েছে তারা অবশ্য আজকাল বলে কেন যে এরা আবার এসে হল্লা করছে, এমনিতেই আমাদের মতো পুরনোদের কাজ নেই। এমনই বোধ হয় বুঝলে? ডুবে যাবার আগে যারা জাহাজ ছেড়ে ডিঙি নৌকায় ওঠে, তারা ভাবে অন্যেরা মরুকগে। আগে তো আমরা বাঁচি। এক্ষেত্রে তুমি কাদেরকে দুষবে বলো”? এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক চট করে খুঁজে পাইনা, তবে অন্য আরেকটা ব্যাপার মনে হওয়ায় শেরিফের সাথে সেটি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেই। “শেরিফ মজার ব্যপার কি জানো, তোমার দেশে কিন্তু এই আশির দশক অব্ধিও আমার দেশ বাংলাদেশ থেকে অনেকেই যেতো কাজের সন্ধানে। সেই দেশ ইরান থেকে তোমরা এভাবে অর্থনীতিক অভিবাসী হিসেবে পালিয়ে আসছো, ব্যাপারটা আমাকে কিছুটা আশ্চর্যান্বিত করে। সে কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, অন্য এক প্রসঙ্গে কথা বলি। আমেরিকায় আসার পর অনেক ইরানির সাথেই আমার পরিচয় হয়েছে। কট্টরপন্থী একটি দেশ হিসেবে বাইরের দুনিয়ায় ইরানের যে ইমেজটি প্রচলিত, ব্যক্তিগতভাবে কিন্তু আমার কাছে তাদেরকে সেই ইমেজের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়নি। আর সেখানেই আমার এক বিশাল খটকা। এক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হল ইরানে খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি রক্ষণশীল বিপ্লব তাহলে কী করে সম্ভব হয়েছিলো”? আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে কিছুটা সময় নেয় শেরিফ, তারপর গুছিয়ে বলা শুরু করে, “তাহলে বলি শোন। আমাদের শহরে আমার দাদা ছিলেন মোটামুটি প্রভাবশালী একজন মানুষ। বিপ্লবের সময়ে তাকেও ডাকা হয়েছিল, কিন্তু তিনি বলা চলে ডামাডোল থেকে কিছুটা সরেই ছিলেন। মজার ব্যাপার হল এই বিপ্লবের পর আমরা দেখলাম শহরে রেভলুশনারি গার্ড বাহিনীর পাণ্ডা হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে লাগলো কিছু মানুষ যারা কদিন আগেও বিপ্লবের নাম-গন্ধ সম্পর্কে জানত না বা পূর্বে হয়তো শাহের সরকারের ধামাধরা ছিল। বিপ্লবের সময়ে চট করে ভোল পাল্টে নেমে পড়ে খোমেনির দলে। ওই বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলো বলতে পার ইরানের পনের কী বিশ ভাগ লোক। আর প্রায় চল্লিশ ভাগ লোক ছিল দোদুল্যমান অবস্থায়, হাওয়া যেদিকে বইবে তারাও সেদিকে বইবে এমন আরকি। ওই বিশ শতাংশ লোক যখন বিপ্লবে সফল হয়ে যায় তখন বাদবাকি দোদুল্যমান অংশের সমর্থনও তারা সহজেই পেয়ে যায়। আর এভাবেই বিপ্লব সফল হয়। তবে তার মানে এই নয় যে ইরানের সকলেই বিপ্লবের বা খোমেনির সমর্থক। বিশেষত বাইরের বিশ্বে যাদেরকে দেখছ তাদের অধিকাংশ তো নয়ই। ইরানের বিপ্লবে মানুষের সত্যিকারের মুক্তি যদি আসতোই তবে তো আর এই শেরিফকে দেশ ছেড়ে গত পনের বছর ধরে বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে থাকতে হতো না”। শেরিফ নেমে যায় গ্রাৎস শহরের স্টেশনে, আর কোন এক ফাঁকে আমাদের ট্রেনটিও সীমান্ত পেড়িয়ে ঢুকে পড়ে স্লোভেনিয়ায়।

স্লোভেনিয়ার মারিবর থেকে খলখলে হাসি আর কিচির-মিচির করা দুটো ছানা-পোনা নিয়ে এবার আমার কূপে এসে উঠলো সায়মন পরিবারটি। মধ্য ত্রিশের সায়মন, ওর বউ, ওদের দশ বছর বয়সী মেয়ে রিটা আর পাঁচ বছরের ছেলে রিয়ন। সায়মনরা যাচ্ছে দু ঘণ্টা দুরে স্লোভেনিয়ার আরেকটি শহর লাস্কতে এক রবিবারের মেলায়। সায়মনের ছেলে-মেয়ে দুটি কোনকালে ট্রেনে চড়েনি, এই তাদের প্রথম ট্রেন-যাত্রা। তাই তাদের এ নিয়ে উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই, তবে সেই সাথে যাত্রাসঙ্গী এই বিদেশী সম্পর্কেও তাদের অপার কৌতূহল। রিয়ন তার ছোট্ট ব্যাগ থেকে চিপসের প্যাকেট বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, তুমি খাবে আমার চিপস? "কেনো খাবো না? দাও দেখি আমাকেও কিছু"। ওদিকে রিটা বায়না ধরলো তার সাথে খেলতে হবে ওর সাথে আনা এক টাকা-কড়ির কার্ডের খেলা। ওর বাবার কাছে আবদার ধরলো সায়মন যেন আমাকে ইংরেজিতে তর্জমা করে বুঝিয়ে দেয় খেলার নিয়ম কানুন। বাবা বেচারা পরে গেলেন মহা বিপদে। এদিকে মেয়ের কথা ফেলতেও পারেন না আবার ওদিকে বিরক্তিকর তর্জমার যন্ত্রণা। আমি অবশ্য ততক্ষণে আয়েশ করে সায়মন-পত্নীর আনা ঘরে ভাজা গোলাকার নিমকি খাচ্ছি আর বাবা-মেয়ের বাহাস শুনছি। এই নিমকিগুলো নাকি ওরা সুপে মিশিয়ে খায়। সায়মন কাজ করে মারিবরে নয়, বরং অস্ট্রিয়ার গ্রাৎস শহরের এক জার্মান গাড়ি তৈরির কারখানায়। এখন তো আর সীমান্তের ব্যাপারগুলো নেই, তাই প্রতি সকালে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঘণ্টা খানেকের পথ পেড়িয়ে সায়মন পৌঁছে যায় কাজে। ওদিকে সায়মন-পত্নী কাজ করে ওদের বাড়ি থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে এক স্কুলে, সেখানে যেতে তাঁর নিজের সাইকেলটিই ভরসা। নিজেদের গাড়ি, সাইকেল এসবের বাইরে এই পরিবারটির তাই আর ট্রেনে চড়বার তেমন কোন প্রয়োজন পড়েনা। সাইমনের মেয়ের মুখে মিষ্টি স্লোভেনিয়ান বোল শুনে আমি সাইমনকে জিজ্ঞাসা করি, এই কি বলকানের সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান ভাষা? “নাহ, আমরা স্লোভেনিয়ানরা ও ভাষায় কথা বলি না, আমাদের ভাষা স্বতন্ত্র। যদিও সার্বো-ক্রোয়েশিয়ানের অনেক শব্দই আমাদের এ ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এই সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান মূলত এক স্লাভিক ভাষা। সার্বো এবং ক্রোয়েশিয়ান দুটো খুব কাছাকাছি ভাষা, বলা চলে একই ভাষার দুটো কথ্য রূপ। টিটোই মূলত উদ্যোগ নেন এই দুটি ভাষার সম্মিলনে একটি নতুন সরিকারি ভাষা চালু করার, যেটি অন্তত ব্যবহৃত হবে সকল সরকারি কাজ-কর্মে এবং দপ্তরে। সমস্যার কথা ছিল, আমরা মানে স্লোভেনিয়ানদেরও সেই ভাষা শিখে রপ্ত করতে হতো সে সময়ে। এই ভাষা এবং টিটোর কথা উত্থাপিত হওয়ায় আমি সাইমনের কাছে জানতে চাই গৃহযুদ্ধের সময়কার দিনগুলো সম্পর্কে। বেশ হাল্কা মেজাজে সায়মন উত্তর দেয়, “আমাদের উপর দিয়ে কিন্তু তেমন একটা ঝাপটা যায়নি। সাত দিন, হ্যাঁ, মাত্র সাত দিন স্থায়ী হয়েছিলো সে যুদ্ধ। স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর মিলেশভিচ কয়েকটি মিগ বিমান পাঠিয়েছিলো বটে, কিন্তু তারা ওই উড়ে এসে কয়েক চক্কর খেয়ে আমাদের কয়েকটা রাডার স্টেশনের উপর বোমাবর্ষণ করেই ফিরে যায়। মিলেশভিচের আসলে স্লোভেনিয়ায়া নিয়ে তেমন একটা মাথা ব্যথা ছিল না। কারণ সে জানত স্লোভেনিয়া আজ হোক কাল হোক যুগোস্লাভিয়া থেকে বেরিয়ে যাবেই। আর ওদিকে স্লোভেনিয়া যেহেতু ক্রোয়েশিয়ার পাশে, তাই সার্বিয়ান ভূখণ্ডের সাথে থাকা না থাকাটা নিয়ে বাস্তবিকভাবেই ওদের তেমন একটা দুশ্চিন্তা ছিল না। এই যুদ্ধের ব্যাপারগুলো থেকে স্লোভেনিয়া নিজে এড়াতে পেরে কিন্তু বিশাল একটা লাভ হয়েছে আমাদের। এই যেমন ধরো সার্বিয়া বা ক্রোয়েশিয়া কিন্তু এখনও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ঢুকতে পারেনি ওদের দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারগুলোকে সঠিক ভাবে না করতে পারার জন্যে। অথচ দেখ আমরা সেই কবেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ঢুকে গেছি”। সাইমনের সাথে আরও হয়তো অনেক কথা হতো, কিন্তু কথার মাঝেই ওর মেয়েটি বাগড়া দেয় খেলার পরবর্তী চাল দেবার জন্যে। আর আমিও মজা পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি ওর সাথে। দু ঘণ্টার পথ শেষ হয় যেন কয়েক নিমিষে। ওরা নেমে যায়, তবে নামার আগে স্মৃতি হিসেবে রেখে যায় ওদের সাথে তোলা একটি ছবি।

লুব্লিয়ানা রেল-স্টেশনে নেমে আমার খুব একটা বেগ পাবার কথা নয়, কিন্তু তার পরও অল্প-বিস্তর সমস্যায় যে পড়লাম না তা নয়। কিন্তু সে নিয়ে খুব একটা ঝামেলায় পড়তে হল না। দু একজন যাকেই জিজ্ঞেস করলাম হোটেলের নিশানা, সেই বেশ বিজ্ঞ-চিত্তে বলে দিলো, “ও হ্যা হোস্টেল সেলিস্কা? ওই তো ওধারের পথ ধরে হেঁটে চলে যাও”। সে না হয় গেলাম, কিন্তু আমি ভাবছিলাম এ শহরের সবাই আমার এই হোটেলের নিশানা জানে, তবে কী কোন পাঁচ-তারা হোটেলে ঘর ভাড়া করলাম? বুকিং দেবার সময়ে তো বেশ এক সস্তা হোস্টেলেই বুকিং দিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে। ঠিকানা মতে হোটেলে পৌঁছে চাবি দিয়ে নিজের ঘরের দরজা খোলার পর খেলাম দ্বিতীয় ধাক্কাটি। এমন অদ্ভুত হোটেল ঘর আমি এ জন্মে দেখিনি। প্রথমত ঢোকার মুখে কাঠের দরজার পর আরেকটি লোহার গরাদ-সম পাল্লা দ্বিতীয় চাবিটি দিয়ে খুলতে হয়। নিরাপত্তার এই বাড়াবাড়ি দেখে আমার বাঙাল মনে কেবলই কু গায়, শঙ্কিত মনে ভাবি কোন চোর-ছ্যাঁচড়ের শহরে এসে পড়লাম রে বাবা? অতঃপর সেই দরজাদুটি খুলে এক চিলতে এক ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখলাম ওপরের ঘুলঘুলির কাঁচের এপাশে আরেকটি লোহার খাঁচা। ওদিকে ঘরের মেঝেটিতে বিবর্ণ এক কালচে কাঠের পাটাতন। শোবার খাটের মাথার দিকটিতে এক ছোট বইয়ের আলমারিতে বেশ কিছু জীর্ণ-বিবর্ণ পুরনো বই রাখা। বইগুলো স্লোভেনিয়ান ভাষায় লিখা বিধায় পড়ে দেখা হল না। তবে সেই বুকশেলফের পুরনো বইগুলোর মাঝেই আমি পেয়ে যাই একটি দু পাতার ভাঁজ করা কাগজ, যেখানে এই হোটেল স্থাপনের ইতিবৃত্ত সম্পর্কে দু চার ছত্র লেখা রয়েছে, আর সেটি আমাকে আমার ধন্দের উত্তর দিয়ে দেয়। এই হোটেলের ভবনটি আসলে যুগোস্লাভ সময়ে ছিল গুপ্ত পুলিশ বাহিনীর ঘাঁটি, এটিকে তখন ব্যবহার করা হতো এক ছোটখাটো জেলখানা হিসেবে। ৯১ সালে স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা লাভের পর স্থানীয় শিল্পীদের একটি দল মেলা কাঠ-খড় পুড়িয়ে এটিকে সরকারের কাছ থেকে কিনে নয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত এই ভবনের ইতিহাসকে অবিকৃত রেখে একে অন্য কোনভাবে ব্যবহারোপযোগী করা। স্লোভেনিয়ার বেশ কিছু নামী স্থপতি এগিয়ে এলেন সে কাজে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা এমনভাবে এই পুনর্সজ্জার নকশা করলেন যাতে এই হোটেলের কক্ষগুলোতে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন ঢুকে বসেছেন কোন জেলখানার কক্ষে। তাদের সেই প্রচেষ্টা মোটামুটি সফল হয়েছে বলা চলে, কারণ কিছুক্ষণ সে কক্ষে অবস্থান করেই কেমন যেন এক অস্থিরতা আমাকে ঘিরে ধরে, আমি সেই গারদের দরজা হাট করে খুলে দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।

ছোট একটা ঘুম দিয়ে উঠে বুঝলাম বেশ খিদে পেয়েছে ততক্ষণে। কালবিলম্ব না করে হস্টেলের কাছের এক দোকান থেকেই কিছু-মিছু খেয়ে নিলাম। আমার এই হোস্টেলটি থেকে এ শহরের প্রধান স্কয়ারটি তেমন দূরে নয়, এই পনের কী কুড়ি মিনিটের পথ। সেখানে যাবার তেমন কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নেই আমার, এই একটু জনসমাগম, কোলাহল এসবের মুখোমুখি হওয়া। শুনেছি এই একরত্তি শহরে নাকি এক রত্তি লুবিয়াঙ্কা নদী নিরন্তর শহরের ওই মাঝ বরাবর দিয়েই বয়ে চলে। আর কিছু না হোক, সেই নদীর সাথে তো অন্তত দেখা হবে। হাঁটতে হাঁটতে যেখানে এসে আমি দাঁড়াই সেখানে ঠিক নদী নয়, বরং দেখা হয় এক কবির সাথে। এই কবি ভালোবাসার কবি, প্রকৃতির কবি। কবি প্রেসেরেনের সেই ভাস্কর্যে তাঁর মাথার উপরে লরেল পাতার মুকুট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক বিদ্যার দেবী। কবির বাঁ হাতে এক কবিতার বই, কিন্তু আমার মাথায় তখন কবিতা নয়, বরং ঘুরছে লুবিয়াঙ্কার কথা, কয়েক কদম যেতেই যার দেখা আমি পেয়ে যাই।

নদীর ধারের এক বাঁধানো ঘাটে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে বসে যাই, আর আশেপাশে আমোদে মেতে থাকা লোকদের পরখ করতে থাকি। হটাৎ আমি কোথায় যেন হারিয়ে যাই, আমার মনে হতে থাকে যেন স্লোভেনিয়ার কোন নদীর পাশে নয়, বরং আমি বসে আছি পঞ্চগড়ের এক নিভৃত পল্লীর এক শীর্ণকায় নদীর তীরে। আমার এক বন্ধু শখ করে নিয়ে গিয়েছিলো ওদের গাঁয়ে। আমাকে বলল চল তোকে আমাদের আমাদের গাঁয়ের নদী দেখাব। চনমনে মনে রোদেলা এক সকালে ভ্যানে চেপে পঞ্চগড় শহরের ‘ধাক্কা-মারা’ মহল্লা থেকে আমি আর আমার সেই বন্ধু চললাম সেই গাঁয়ের পানে। সেদিন সেই নদী দেখে আমি তো হেসেই খুন। এ আবার নদী নাকি, যে নদী প্রায় হেঁটেই পেরোনো যায়? মাথার ওপরে শ্রাবণের মেঘের ভেলা, আর আমার পায়ের পাতার নিচে কুলকুল শব্দে বয়ে চলা সেই নিরীহ দর্শন নদীর শান্ত জল- এই নিয়েই আমি বালখিল্যে মেতে উঠি। কিন্তু সময়ের স্রোত তো আর সেই পঞ্চগড়ের নদীটির মতো ধীরলয়ে বয়ে চলা স্রোতধারা নয়, সময়ের স্রোত বরং বয়ে চলে পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর গর্জন তোলা ধারার মতো। তাই স্বপ্ন থেকে আড়মোড়া ভেঙ্গে জাগার মতো আমিও উপলব্ধি করি আমি সেই ফেলে আশা অতীতের কোন এক অধ্যায়ে আমার সেই বন্ধুর গাঁয়ের নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে নেই, বরং বসে আছি এই সুদূর স্লোভেনিয়ার ঠিক তেমনই এক শান্ত নদীর ধারে। হয়তো স্বপ্নের সেই দৃশ্য আর আজকের এই বাস্তব দৃশ্যের মাঝে আলগোছে কেটে গেছে মহাকালের এক আবশ্যকীয় অংশ।

লকলকে জিভ আর সূচালো লেজ নিয়ে চারটি আক্রমনোদ্যত ড্রাগন পাহারা দেয় এই লুবিয়াঙ্কা নদীটিকে দুপারের সাথে বেঁধে রাখা ড্রাগন সেতুকে। সে সেতুটিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পায়ের নিচ দিয়ে কাঁচের ছইওয়ালা কয়েকটি নৌকা পেরিয়ে যাবার পর আমি পা চালাই নদীর অন্যপ্রান্তে। হটাৎ আমার নাকে ভেসে আসে বিরিয়ানির গন্ধ, আমি ভাবি এ আমার গন্ধ-ভ্রম নয় তো? হয়তো আমার অবচেতন মন বেশ কদিন বাড়ির ডাল-ভাত না খেতে পারার বিষয়টি থেকেই আমার সামনে বিরিয়ানির গন্ধ এনে হাজির করেছে, মনের মাঝে কিছুটা পুলক জাগাবার জন্যে। তবে ততক্ষণে আমার মনের সচেতন অংশটি লেগে গেছে চুলচেরা অনুসন্ধানে। অচিরেই আবিষ্কার করি যে পাড়ায় আমি হাঁটছি সে পাড়াতেই এক ঝুপড়ি দোকান থেকে ভেসে আসছে বিরিয়ানির খুশবু আর তার সাথে দোকানের অভ্যন্তর ভাগ থেকে কখনো ছিটকে আসছে দু বঙ্গ-সন্তানের কথোপকথনে ব্যবহৃত বাংলা শব্দ। দোকানটির নাম ‘তন্দুরি’, নেহায়েত উদর পরিপূর্ণ, নতুবা হয়তো এ বেলায় সেখানে একটু ঢুঁ মারা যেতো।

যেকোনো নতুন স্থানে গেলেই আমার অনেক সময় বেশ আগেভাগেই ঘুম ভাঙ্গে, তাই বলে এত আগে? সেদিন আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো রাত ঠিক সাড়ে চারটের দিকে। উপায়ন্তর না দেখে আমার সেই গরাদসম কক্ষের বিছানায় বসে বাইরের জানালা খুলে দিয়ে আমি ভোরের আলোর প্রতীক্ষা করতে থাকি। সে সকালে আমার স্লোভানিয়ার আগমনের মূল আকর্ষণ, ব্লেড হ্রদে যাবার পরিকল্পনা। লুব্লিয়ানা রেল-স্টেশনের পাশের বাস-স্টেশন থেকে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বাস ছেড়ে যায় সেই হ্রদের পানে, সময় লাগে এই ঘণ্টা খানেকের মতো। আমি তাই ভোরের আলো ফোটা মাত্র হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সেই বাস-স্টেশনে এলাম পরের বাস ঠিক কটায় ছাড়বে সেটি জানতে, আর সেই ট্রেন-স্টেশন থেকে সকালের প্রাতরাশের জন্যে কিছু-মিছু কিনতে। জানতে পেলাম পরের বাস সকাল নটার আগে যাবে না। আমি আগেভাগেই বাসের টিকেট কিনে সন্নিকটের এক মুদি দোকান থেকে পালংশাক আর ছানার পুর দেয়া ক্রশয়া কিনে আয়েশ করে খেতে লাগলাম।

বাস ছাড়ল ঠিক সময় মতোই। বেশ ধীর লয়ে স্লোভেনিয়ার গ্রামীণ জনপদ পেড়িয়ে আমাদের বাসটি গুটিসুটি মেরে এগিয়ে চলেছে ব্লেড শহরের দিকে। ইঞ্জিনের মৃদু একটানা গর্জনের মাঝে চালকের গিয়ার চেঞ্জের শব্দটুকুই আমি আলাদা করে ধরতে পারি। মসৃণ এসফল্টের যে হাইওয়ে কামড়ে ধরে বাসটি এগিয়ে চলেছে সেটি দু লেনের, তবে দু লেন বলেই যে একজনকে ছাড়িয়ে হুস করে আরেকজন উল্টোদিকের লেনটি ধরে বেরিয়ে যাবে তেমনটি করতে কিন্তু কাউকে দেখলাম না। বিশাল কাঁচের জানালার মাঝ দিয়ে আশেপাশের গ্রামের বাড়িগুলোর দিকে লক্ষ করার সময় আমি একটি বিষয়ে মিল খুঁজে পাই। আর সেই মিলটি হল প্রায় প্রতিটি বাড়ির জালালার কার্নিশে ফুলের টবে ফুটে থাকা বিজিলিজি ফুল। বাড়িগুলো কিন্তু তেমন আহামরি কিছু নয়, মধ্যবিত্ত কৃষকের নেহায়াতই সাদামাটা বাড়ি। অধিকাংশ বাড়ির দেয়ালের চুনকামও বেশ পুরনো, সেসব দেয়ালের স্থানে স্থানে লালচে-হলুদের প্রলেপ উঠে গিয়ে পুরনো রঙটিকে জাগিয়ে তুলেছে। এতসব সাধারণত্বের মাঝেই বাইরের জানালার ধারে ফুটে থাকা সেই ফুলগুলো যেন অদ্ভুত এক দীপ্তি ছড়ায়।

স্লোভেনিয়ার ব্লেড হ্রদের কথা জেনে যারা আসেন, তাদের অধিকাংশই সেই জ্ঞানটি লাভ করেন পর্যটক-নির্দেশিকার পাতা হতে। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য আমি হ্রদটির কথা প্রথম জেনেছিলাম যুগোস্লাভ নেতা মার্শাল টিটোর জীবনী নিয়ে কিছুটা পড়াশোনার সময়ে। জেনেছিলাম, টিটো বুলগেরিয়ার নেতা দিমিত্রভকে সাথে নিয়ে বলকান ফেডারেশন গড়বার নিমিত্তে দু দেশের মাঝে যে আলোচনা এবং চুক্তির সূচনা করেছিলেন সেটি সম্পাদিত হয়েছিলো এই ব্লেড হ্রদের ধারেই। সেসময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পর যুগোস্লাভিয়াই ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক দেশ। তাই টিটোর ধারণা জন্মে আশেপাশের দেশ বুলগেরিয়া বা রুমানিয়াকে নিয়ে যদি একটি ফেডারেশন করা যায় তাহলে সেটি হয়তো অনেকটাই মস্কোর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে। বলা বাহুল্য স্টালিন এই ব্যাপারটিকে ভালো চোখে দেখেননি। অনেকে তো বলেন ব্লেড হ্রদের ধারে সম্পাদিত ওই চুক্তিতে সায় দেবার জন্যেই দিমিত্রভকে অকালে প্রাণটি খোয়াতে হয়। আর দিমিত্রভের মৃত্যুর পর সেই ব্লেড চুক্তিটিরও মৃত্যু ঘটে। এসব বহুকাল আগে চুকেবুকে যাওয়া ইতিহাসের কথা, যদিও সেই ইতিহাসের সুত্ররেখাই আমাকে এই হ্রদের সন্ধান আর তাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

স্বল্প একটা বিরতি নিয়ে বাস আমাকে যেখানে নামিয়ে দিলো সেখান থেকে ব্লেড হ্রদের ঘাট বড়জোর সিকি মাইল। হ্রদের পাশের উজ্জ্বল এক বাগানে ফুটে থাকা অসংখ্য সিঙ্কফয়া, লিলি, অর্কিড আর গোলাপের ঘ্রাণ প্রাণ ভরে নিয়ে হ্রদের দিকে প্রথম বারের মতো দৃষ্টিপাত করেই প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। এ হ্রদ প্রমত্তা নয়, আবার ঠিক এঁদো ডোবার মতোও নয়। সবুজাভ জলে বিশালাকারের চঞ্চু নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে গ্রীবা উঁচু করে ভেসে বেড়াচ্ছে বেশ কিছু রাজহাঁস, আর তীরের কাছটাতে আরও কিছু বালিহাঁসকে দানা-পানি খাওয়াচ্ছে বেশ কিছু শিশু। হ্রদের ধারের বাঁধানো পথ ধরে হাঁটার সময়ে আমি দ্বিতীয় আরেকটি ঘাটে বেঁধে রাখা কয়েকটি রঙচঙয়ে ছইয়ের বাহারি নৌকোর দেখা পাই, যেগুলোকে স্থানীয়রা বলে ‘প্লেত্না’। নৌকার মাঝি হাঁক ছেড়ে যাত্রী খুঁজছে, গন্তব্য এ হ্রদের মাঝকার এক দ্বীপ। যাওয়া আসা মিলিয়ে মাঝিকে দিতে হবে দশ ইউরো।

দামি জিন্স আর রে-ব্যান রোদ-চশমা পরিহিত ধোপদুরস্ত যে মাঝি আমাদের নৌকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তাকে দেখে হয়তো গ্রাম বাংলার হতদরিদ্র মাঝিদের অক্কা পাবার দশা হবে। কৌতূহলী হয়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি তা দিনে আয় রোজগার কেমন হয়? জবাবে জানতে পারি দিনে সব কিছু বাদ দিয়ে ছোকরার আয় একশ ইউরোর কম নয়। দামি রোদ-চশমা আর জিন্সের ব্যাপারটি এবার আমার কাছে পরিষ্কার হয়। নৌকায় আমরা উঠেছি এই জনা পনেরোর মতো। আমার ঠিক পাশেই বসেছে এক আমেরিকান দম্পতি, তাদের কোলে দু বছর বয়েসি এক শিশু। আমি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছি জেনে বধূটি আগ্রহান্বিত হয়ে বলে ওর বরের বাড়িও ক্যালিফোর্নিয়াতে। আরও জানায় ওরা ঢাকা সম্পর্কেও বেশ খবর রাখে, কারণ মেয়েটির এক বান্ধবী নাকি একবার কী এক ইংরেজি শেখাবার স্কুলের মাস্টারনি হয়ে বেশ কিছুকাল ঢাকায় কাটিয়ে গেছে। ফিরে গিয়ে সেই মেয়েটিই এই দম্পতির কাছে ঢাকার অভিজ্ঞতা মেলে ধরেছে, এই কথাটি জানার পর আমার মনের ভেতর এক ধরণের প্রশ্ন খেলা করে। আমি ভাবার চেষ্টা করি এই দম্পতির বান্ধবী সে মেয়েটির ঢাকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে। কেমন ছিল সেটি? কী ভাবেই বা সে তুলে ধরছে আমার শৈশবের সেই শহরটিকে এই বিদেশীদের কাছে? এই আমেরিকান দম্পতি অবশ্য সে নিয়ে আর খোলাসা করে তেমন কিছু বলেনা। আমাদের কথা বরং এগুতে থাকে এই দম্পতির বর্তমান আবাসস্থল তিউনিসিয়া নিয়ে। সেখানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকটি অর্থনীতি নিয়ে পড়ায়। ভালো মাইনে পাবার কারণে আমেরিকা ছেড়ে কয়েক বছর হল ওরা সেখানেই আছে। তিউনিসিয়ায় পশ্চিমাদের অবস্থান এখন আর ততটা নিরাপদ নয়, নিকট অতীতেই কট্টরপন্থী কয়েকটি গ্রুপ দ্বারা বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমি তাই ওদের নিরাপত্তা নিয়ে আমার শঙ্কার কথা প্রকাশ করি। ভদ্রলোকটি বলে, “যাদেরকে আমি পড়াই বা যাদের মাঝে থাকি তাঁরা কিন্তু বেশ চমৎকার মানুষ। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এদের মাঝ থেকেই কোন বিপদ উঠে আসবে। আর তিউনিসিয়া কিন্তু এতকাল বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল, এইসব গোলযোগ শুরু হয়েছে অল্প কিছুদিন হল”। আমাদের এমনি সব টুকরো আলোচনার মাঝে এক সময় দেখতে পাই হ্রদের টলটলে সবুজাভ জলে দ্বীপের একমাত্র গির্জাটির ঘণ্টা-বাঁধা চুড়োর পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি। ছইয়ের তল থেকে মুখ বার করে তাকিয়ে দেখি সেই দ্বীপের বেশ কাছেই চলে এসেছি আমরা। বাঁধানো ঘাটে আলগোছে নৌকার রশি বেঁধে মাঝি আমাদের দ্বীপ ভ্রমণের সময়টাও বেঁধে দেয় ত্রিশ মিনিটের জন্যে। বাধ্য যাত্রীর মতো আমরা তাই মেনে নিয়ে দ্বীপের একমাত্র পাহাড়টির গা বেয়ে ঊর্ধ্বপানে চলে যাওয়া সিঁড়ির ধাপ বাইতে থাকি। পাক্কা নিরানব্বই ধাপ পেরোবার পর যখন দম নেবার জন্যে একটু থামতে চাই, তখনই দেখতে পাই সেই পাহাড় চুড়োর সমতলে অবস্থিত গির্জাটির প্রবেশমুখ। যারা আমার আগেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছেন তাঁরা চটপট সেই গির্জায় ঢুকে বাজিয়ে দিচ্ছেন গির্জার ছাদ থেকে ঝোলা এক ধাতব ঘণ্টা, নাকি এটি এক ইচ্ছে-পূরণ ঘণ্টা। দড়ি ধরে এই ঘণ্টা বাজাবার সময়ে কোন মনস্কামনা করলে সেটি পূরণ হবেই। আমাকে অবশ্য সেই কয়েক শ বছরের পুরনো বারোক স্থাপত্যে নির্মিত গির্জাটির চেয়েও বেশি আকর্ষণ করলো সেই গির্জা প্রাঙ্গণের অপূর্ব গোলাপ আর অর্কিডের সম্ভার। আমার আর সব যাত্রাসঙ্গীরা যখন সেই গির্জার অভ্যন্তরের রূপ-সুধা আহরণে ব্যস্ত, আমি তখন সময় কাটাই সেই বাগানে উড়ে বেড়ানো ঝলমলে ডানার কয়েকটি প্রজাপতির পেছনে।

আমাদের ফেরার সময় হয়ে আসে। ফিরতি পথে সবাই একটু যেন বেশিই নীরব, যেন অলক্ষ্যে সবার মাঝেই এক আকাঙ্ক্ষা, আর কিছুটা সময় ওই দ্বীপে থাকলে বেশ হতো। মূল ঘাটে এসে ভিড়বার পর আমি ভাবতে থাকি কোথায় যাবো এবার? হ্রদের পূর্ব পাড়ে এক সুউচ্চ পাহাড়ের একেবারে চুড়োতে রয়েছে ব্লেড ক্যাসল, শুনেছি সেখানে আছে এক জাদুঘর। সেখানে যাবো কী? কিন্তু ততক্ষণে মধ্য দুপুরের রোদ প্রায় তেতে উঠেছে। আর ওদিকে এই ব্লেড হ্রদ থেকে যে বাসগুলো লুব্লিয়ানা শহরে যায় সেগুলোও বেশ নিয়মিত নয়। আজ আমার সময়ে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিকেলের ট্রেনেই জাগরেবে পৌঁছুতে হবে। আগের দিন লুব্লিয়ানা শহরের দুপুরের হাটে যাওয়া হয়নি, সেটিতেও একটু ঢুঁ মারতে হবে। হিসেব-নিকেশ করে দেখলাম সেই পাহাড় ডিঙিয়ে যদি আজ ব্লেড ক্যাসল দেখতে চাই, তবে বাদবাদি পরিকল্পনাগুলো কিছুটা ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। তাই ভাবলাম বেলা থাকতেই বাসের খোঁজ করি। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে জানতে পারলাম পরের বাসটি এসে পৌঁছুবে ঠিক আর এক ঘণ্টা পর। মনকে এবার দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করলাম, কি হে যেতে চাও সেই ক্যাসলে? পারবে এই ঘণ্টার মাঝে আবার ফিরে এসে বাস ধরতে? যুক্তিপূর্ণ অংশটি সায় দিলো, এবারের মতো ছেড়ে দাও, ক্যাসল দেখে ফিরে আসতে কম সে কম দেড় ঘণ্টা লাগবে। সুতরাং সে ক্ষেত্রে পরের বাসটি ধরা আর সম্ভব হবে না, তার পরের বাসটি আরও দু ঘণ্টা পর। অগত্যা দুপুরের খাবারের একটি বাক্স কিনে আবার হেঁটে হেঁটে সেই হ্রদের তীরে এক লোহার বেঞ্চে এসে বসে সেই প্রতীক্ষার এক ঘণ্টা পার করতে লাগলাম। এই ফিরে আসার সময়ে পথের ধারে এক কিষাণীর সাথে দেখা হয়েছিলো, দূর্বাঘাসের ওপরে কাপড় পেতে সে বিক্রি করছিলো তাঁর নিজের বাগান থেকে তুলে আনা চেরি ফল। এমন টসটসে আর সুস্বাদু চেরি আমি কস্মিনকালে দেখিনি বা চেখে দেখিনি। দু ইউরোতে যখন পাউন্ড খানেক এমন চেরি মেলে তখন তা হেলায় হারানো উচিত বলে মনে হয় না। সেই বেঞ্চে বসে দুপুরের খাবার শেষ করার পর আমি এবার সেই সদ্যকেনা চেরি টপাটপ মুখে চালান করতে থাকি। ওদিকে আমার অনতিদূরে হ্রদের জলে তখন ভেসে যায় কিছু জলজ লিলি ফুলের দল। বিষণ্ণ এক আর্দ্র হাওয়া ছড়িয়ে আমার পেছনের কয়েকটি বার্চ গাছের আমলকী রঙের পাতাগুলো বারে বারে দুলাতে থাকে। কেন যেন এডগার এলেন পোর “সেই হ্রদ” কবিতাটির কয়েক ছত্র আমার মনে পড়ে, সময় কাটাবার জন্যে আমি নিজের মনেই সেই কবিতার ভাবানুবাদের চেষ্টা করি, প্রতিবারেই মনে হয় বিফল হলাম। নিজের মস্তিষ্কের মাঝেই বেশ কয়েকবার কাটা-ছেঁড়ার পর যেটি দাঁড়িয়ে যায় সেটি অনেকটা এমন-

যৌবনের বসন্তে আমি
উদগ্র ভালোবাসাময় একটি স্থান খুঁজে ফিরেছি
চষে ফেলেছি বিস্তীর্ণ এই পৃথিবীর সকল প্রান্ত---
যে স্থানে এক উদ্দাম হ্রদ তাঁর সমস্ত নিঃসঙ্গতা,
চারিধারে ঘিরে থাকা কালো পাথর আর নুয়ে পড়া পাইনের বন নিয়ে-
অপেক্ষায় থাকে।

ব্লেড হ্রদের এক কোণের সে বেঞ্চে বসে আমার সত্যিই মনে হতে থাকে ভালোবাসাময় তেমন একটি স্থান আমি যেন সত্যিই সেদিন খুঁজে পেয়েছি।


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার লেখাগুলো দারুণ উপভোগ করি। রিগা থেকে সারায়েভো তো পড়লাম। সামনের বইমেলায় কি নতুন কিছু পাব? ভ্রমণের ব্যাপারে আমি একটা নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করি। সেটা হচ্ছে পরেরবার দেখব এই ভেবে কোন কিছু ফেলে আসতে নেই। কারণ বেশিরভাগ সময়েই সেই পরেরবার আসে না। চলতে থাকুক ভ্রমণ।

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

সেটা ঠিকই, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওই পরের বার আর আসে না.
হ্যাঁ আশা করছি এ বারের বইমেলায় দুটো বই আসতে পারে, একটি , "আমেরিকার টুকরো গপ্পো", অন্যটি "বলকানের বারুদ". যদি শেষ পর্যন্ত দুটো বইই আলোর মুখ দেখে তবে জানাবো আপনাকে। ধন্যবাদ।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

চমৎকার লাগলো লেখাটি। সাইমন পরিবারের সাথে যে ছবিটি তুলেছিলেন, সেটা এবং অন্যান্য জনদের ছবি দিলে আরও ভাল লাগতো।

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

ধন্যবাদ আব্দুল্লাহ ভাই, সাইমন পরিবারের সাথে তোলা ছবিটি তুলে ধরলাম

সোহেল ইমাম এর ছবি

আবারও মুগ্ধতার সাথে পড়ে গেলাম। আপনার বই গুলো পড়তে চাই। কি নামে ওগুলো আছে অর্থাৎ জীবনযুদ্ধ নাম দিয়েই কি? না অন্য নামে?

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

ধন্যবাদ সোহেল ভাই, "রিগা থেকে সারায়েভো" এখানে পাবেন হয়তো,https://www.facebook.com/boiparabd/, https://www.facebook.com/pg/palaliksaurabh/shop/?rid=1116401981723136&rt=6

অতিথি লেখক এর ছবি

অসম্ভব সুন্দর >> আর কি বলবো? হান্টার হান্টার

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA