প্রসাধনী আয়নাঃ ধারাবাহিক উপন্যাস

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি
লিখেছেন জহিরুল ইসলাম নাদিম [অতিথি] (তারিখ: রবি, ২৭/১১/২০১১ - ৫:৩৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পর্ব ৮
আগের পর্ব

কাজটায় দারুণ মজা পাচ্ছে মিথুন। যন্ত্রটা চোখের সামনে আনা মাত্রই লাফিয়ে চলে আসছে সব চোখের নাগালে!

দূরে কোনো একটা বাড়ির ছাদে স্থাপিত পানির ট্যাঙ্কে বসেছিল একটা কাক। মিথুনের মনে হলো ওর চোখ থেকে বড় জোর হাত পাঁচেক দূরে সেটা। চোখের চাহনি পর্যন্ত স্পষ্ট ধরা পড়েছে। ও দৃষ্টিটা সরিয়ে নিল। এ সব দেখায় ওর কোনো উৎসাহ নেই। ও চায় রহস্যের গন্ধ যার গায়ে লেপ্টে আছে এমন কিছু দেখতে। জন্মদিনের উপহার হিসেবে এই বায়নোকুলারটা হাতে পাওয়া অব্দি সময় পেলেই ও জানালার কাছে ধারে বসে পড়ে। চারতলার এই জানালা দিয়ে ওয়ারীর অনেকটা অংশই চোখে পড়ে। ওর ধারণা একদিন সত্যি সত্যি এমন কিছু দেখে ফেলবে যার তুলনা কেবল বিদেশি সিরিয়ালগুলোর সাথেই হয়। মা ডাকছেন ওকে। ‘যাই’ বলেই দূরবীণটাকে আরো একবার ঘুরিয়ে আনলো ডান থেকে বাঁয়ে। হঠাৎ একটা দৃশ্য চটজলদি সামনে চলে এলো ওর। দু জন বয়স্ক লোক একটা ছেলেকে, ওর চেয়ে বড়ই হবে, টেনে দরজা দিয়ে বের করে আনল। ছেলেটা জোরাজুরি করছে! মিথুন জানালার দিকে ক ইঞ্চি সরে গেল। ছেলেটার হাত বাঁধা মনে হচ্ছে! উত্তেজনায় মিথুনের নিঃশ্বাস জমে এলো প্রায়। ছেলেটাকে ছোট্ট একটা ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। একটা লোক শিকল তুলে দিচ্ছে দরজায়। ওমা! কী সাংঘাতিক! মিথুন ঘামতে শুরু করেছে। এরপরের ত্রিশ মিনিট দূরবীণ চোখে ঠায় বসে থাকল মিথুন। মেইন গেট বন্ধ করে লোকগুলো চলে যাওয়া পর্যন্ত। তারপর সন্তর্পণে বেরিয়ে এলো ওর রুম থেকে। মায়ের দৃষ্টি বাঁচিয়ে সোজা নিচে। তারপর ৯৯৯ নং বাড়িটার সামনে। ও স্পষ্ট দেখেছে ছেলেটাকে এই গ্যারেজটার ভিতরই আটকে রাখা হয়েছে। বাইরে শাটার গেট - বড় বড় দুটো তালা দিয়ে শক্তভাবে লাগানো। বাড়ির ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল মিথুন। বাউন্ডারি দেয়ালটা ওর চাইতে উঁচু। কিন্তু কসরৎ করে ঠিকই উঠে এলো ও দেয়ালের ওপরে। তারপর লাফিয়ে নামল নিচে।

আজ সাতাশ তারিখ। হিসেব কষতে বসল অর্ণব। নিশ্চিদ্র অন্ধকার ঠেলে দরজা পরীক্ষা করে দেখেছে ও একটু আগে। কাজ হয়নি। কাজে লাগতে পারে এমন কোনো কিছুই লাগেনি ওর পায়ে। মুখের ভেতর রুমালটা নিদারুণ বিস্বাদ ঠেকছে। মুখটা খোলা থাকলে চিৎকার করে দেখতে পারত। ও যদি ভাগ্যক্রমে এখন ছাড়া না পায় তাহলে কমপক্ষে আরো তিন চার দিন এইভাবে পড়ে থাকতে হবে। যদি নতুন ভাড়াটে আসে এবং গ্যারেজের প্রয়োজন পড়ে তবেই তা খুলবে তারা। ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠল অর্ণব। অসম্ভব! এই ভাবে আগামী তিন ঘন্টাই সে বাঁচবে না তো তিন দিন। কান্না পেয়ে গেল ওর। মা’র কথা মনে পড়তে লাগল ভীষণভাবে। তারপর বাবার কথা। রহিম কাকার চেহারাও স্পষ্ট ভেসে উঠল ওর মনের পর্দায়। ওঁদেরকে আর দেখা হবে না ওর!

মিথুন দেখল দরজায় শেকল তুলে দেয়া হলেও তালা লাগানো নেই। তার বদলে একটা লোহার মোটা দন্ড ঢোকানো আংটার ভেতরে। একটু টান দিতেই খুলে এলো ওটা। শিকল খুলে ফেলল মিথুন এক ঝটকায়। দরজাও খুলল। এক ঝলক ঠান্ডা মিষ্টি বাতাস মধুর আমেজ ছড়িয়ে দিল অর্ণবের পুরো চোখ মুখ জুড়ে। ওর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল ছোট একটা ছেলেকে ওর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। ছেলেটা তার মুখের টেপ খুলে দিল প্রথমে। ওয়াক্ করে অর্ণব ফেলে দিল রুমালটাকে। ছেলেটা এবার ওর হাতের বাঁধন খুলতে শুরু করেছে।
‘তুমি কে?’ জিজ্ঞেস করল অর্ণব।
‘আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি মিথুন। থাকি পাশের বিল্ডিং-এ। আপনাকে লোকগুলো যখন বেঁধে এখানে এনে রাখছিল তখন আমি সব দেখেছি। তবে আপনাকে আমি কিন্তু ঠিক চিনেছি। আপনি একজন গোয়েন্দা না? কিশোর পাশার মত!’
হেসে ফেলল অর্ণব। গোয়েন্দা! হ্যাঁ গোয়েন্দা বলেই তো পৈত্রিক প্রাণটাকে প্রায় খোয়াতে বসেছিল ও। মিথুনের ঠিকানাটা রাখল অর্ণব। ছেলেটার কাছে দারুণ কৃতজ্ঞ ও। জান বাঁচিয়েছে ওর। যদি কখনো এই সমস্যার সমাধান করতে পারে তবে মিথুনকে জানাবে - এই কথা দিয়ে একটা স্কুটারে চড়ে বসল অর্ণব। বাসায় যাবে এখন ও। মনটাকে শান্ত করা দরকার।

‘শার্লক হোমসের ফেরা হলো তাহলে?’, শয়তানী হাসি হাসল চন্দন, ‘মনে হচ্ছে অ্যাসাইনমেন্টে ধরা খেয়েছিস!’, কৃত্রিম দুঃখবোধ ছড়িয়ে চুক চুক করল ও। আশ্চর্য হলো অর্ণব। ও সব জানে না কি! পরে নিশ্চিত হলো। অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে চন্দন। কিন্তু এখন ঠাট্টা করার সময় নয়। চন্দনকে ঠেলে ড্রয়িং রুম থেকে নিজের ঘরে নিয়ে এলো অর্ণব। তারপর ঘটনা আদ্যোপান্ত বলে গেল। সব শুনে-টুনে সিরিয়াসনেস দেখা দিল চন্দনের কথা-বার্তায়।
‘তুই বলছিস গুপ্তধনের নির্দেশনা ছিনিয়ে নিয়েছে লোকটা। তাহলে এখন কী করা উচিৎ?’
কী আর করা উচিৎ- দু দিন অপেক্ষা করা উচিৎ। তোমার ঠিকানায় তো পোস্ট করে দিয়েছিই একটা কপি- মনে মনে ভাবল অর্ণব। কিন্তু বলল না এই সব। কেননা তার আগেই ওর মনে পড়েছে কাগজটার কপি করিয়েছিল দুটি। একটা পোস্ট করেছিল চন্দনকে আর দ্বিতীয়টা রেখেছিল পকেটে। দ্রত হাতে পকেট থেকে বের করল সেই কপিটা। চন্দনকে পড়তে দিল। চন্দনের মুখে প্রশ্নবাচকতার ধরণ দেখে অর্ণব বুঝে গেল কিচ্ছু বোঝেনি ও। অর্ণব আবার পড়ল কাগজটাকে। জগলুল পাশা কী কী করেছিলেন মনে করবার চেষ্টা করল। ‘বোঝা নয় শক্ত/ কায়া-ছায়া যোগ করা/ খুঁজে নাও অক্ত’ অর্ণব জানে কায়ারই ছায়া হয়। অর্থাৎ এখানে কায়া কোনো বস্তু বা স্থাপনাকে সূচিত করছে। জগলুল পাশা প্রধান ভবন দুটোকে কায়া ধরেছিলেন- মনে পড়ছে অর্ণবের। কায়া ছায়া যোগ করা অক্ত এর মানে হ-লো, এর মানে--- দি আইডিয়া! যখন কোনো বস্তুর ছায়া তার দৈর্ঘ্যের দ্বিগুণ হয় সেই সময়টার কথাই বলা হয়েছে। এবং সময়টা নিশ্চয়ই বিকেল চারটা/পাঁচটার দিকের একটা সময়। আগে যখন ঘড়ির প্রচলন ছিল না তখন নামাজের সময় সূর্য দেখেই নিরূপণ করা হোত- কোনো একটা বইয়ে পড়েছিল ও। তখন আসরের নামাজের সময় বের করা হোত কোনো দন্ডের ছায়া দ্বিগুণ হয়েছে কি না তা দেখে। খুশী হয়ে উঠল অর্ণব। বেশ ভালোভাবেই এগুচ্ছে। চন্দন সাত সতেরো না বুঝে তাকিয়ে থাকল হাবলাকান্তের মতো! পরের লাইনে এলো অর্ণব। ‘মিলনের রেশ ধরে’ এর মানেটা পানির মতো পরিষ্কার। সেই সময় যখন ছায়া দুটো পরষ্পরকে ছেদ করবে সেই স্থান থেকে। ‘শুণ্যের দুই/এগোলেই সব পাবে/যদি খোঁড়ো ভুঁই’- এইখানে একটু ঝামেলা আছে। ‘শুণ্যের দুই’ মানে কী? অবশ্যই কোনো দূরত্বের একক। ওহ্ এমন একটা সংখ্যা হতে পারে যার শেষে দুটো ‘শুণ্য’ আছে। এমন সংখ্যা তো অসংখ্য হতে পারে! তার ওপর সেটা গজে না ফুটে তা কে জানে! অর্ণব ধরে নিল দূরত্বটা একশ গজ। তাহলে মোটমুটি অর্থ দাঁড়ালো আসরের সময় যখন ভবনের ছায়া দুটো পরষ্পরকে ছেদ করবে সেখান থেকে ১০০ গজ এগোলেই পাওয়া যাবে কাঙ্খিত গুপ্তধন! জগলুল পাশাও একইভাবে রেখা টেনেছিলেন স্কেচে। কিন্তু শেষের চারটি লাইন বিভ্রান্তিমূলক। ‘পুরো ঠিক না এগোলে/কেউ কিছু পায় না/মিটিয়ে তো দিতে পারে/প্রসাধনী আয়না’- এর কোনো মানে বের করতে পারল না অর্ণব। (চলবে)


মন্তব্য

তাপস শর্মা এর ছবি

আইচ্ছা। এই নি অবস্থা। ঠিকাছে চিন্তিত

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি

হো হো হো

বন্দনা এর ছবি

সবগুলা পর্বই পড়া হয়েছে যদি ও মন্তব্য করা হয়নি।বেশ লাগছিলো পড়তে, তিন গোয়েন্দার কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে গেলো এই রহস্য গল্পটা পড়তে গিয়ে। তাড়াতাড়ি পরের পর্ব দিয়ে শেষ করে দিন।

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি

আচ্ছা!

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

চলুক, পড়ছি।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি

পড়ুন ভালো কথা। তবে বেশি চলবে না! অ্যাঁ

তদানিন্তন পাঁঠা এর ছবি

কেন কেন? শেষ হয়ে এলো বুঝি? মন খারাপ আরো বড় করতে পারলেন না? ছোটখাটো গোয়েন্দা গল্প পড়তে বরাবরই মন খারাপ হয়। মনে হয় লেখক ফাঁকি দিয়ে গেল।

বেশ হচ্ছে কিন্তু, চলুক আরও কয়েক পর্ব অন্তঃত।

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি

আগেই যেহেতু লেখা হয়ে আছে তাই নতুন করে বাড়ানোর কিছু নেই।
আর কাহিনির প্যাটার্ণই এমন যে বড় হবার নয়! ফাঁকি নয়, যৌক্তিকভাবেই শেষ হচ্ছে লেখাটি। আগামী পর্বে!

আশালতা এর ছবি

একটানে সবগুলো পর্ব শেষ করলাম। প্রাইজ হিসেবে পরের পর্ব দিন, এক্ষুনি। হাসি

----------------
স্বপ্ন হোক শক্তি

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি

ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
সম্ভব হলে এক্ষুনি দিতাম। কিন্তু ল্যাপিটা হাতের কাছে নেই। তবে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পাবেন আশা করছি।

কল্যাণ এর ছবি

আছিইইই

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

জহিরুল ইসলাম নাদিম এর ছবি

প্লিজ থাকুন!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।