তাহলে একটু সুনামের কথাই হোক

কৌস্তুভ এর ছবি
লিখেছেন কৌস্তুভ (তারিখ: বুধ, ১২/০১/২০১১ - ১:০৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

গত বারের লেখায় মেন্ডেল সায়েবের কিঞ্চিৎ বদনামের কথা তুলেছিলাম, তাতে সায়েবের জন্য অনেকে সমব্যথী হয়েছিলেন। এবার তাহলে সুনাম নিয়েই কিছুমিছু কথা হোক, আরেক জীববিজ্ঞানী সায়েবকে নিয়ে। জে.বি.এস. হল্ডেন।

(১)

গত শতকের প্রথমার্ধে হল্ডেন ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানের জগতে এক প্রখ্যাত নাম ছিলেন। বায়োমেট্রি অর্থাৎ সংখ্যাভিত্তিক বায়োলজি নিয়ে ওনার সুবিদিত কাজ ছিল। নানা গাণিতিক মডেল উনি আবিষ্কার করেন। (আমাদের জননকোষে পিতা ও মাতার ক্রোমোজমে জিন আদান-প্রদানের যে ঘটনা ঘটে, যাকে রিকম্বিনেশন বলে, তার হার নিয়ে একটা ফর্মুলা দেন; আবার অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর হ্রাস-বৃদ্ধির হার নিয়েও ফর্মুলা দেন।)

কিন্তু যে ব্যাপারটার জন্য হল্ডেনকে আমার বিশেষ পছন্দ, সেটা এই, যে উনি শুধু থিয়োরি-ধাঁচের কাজই করতেন না, হাতেকলমে প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করতেন।

উনি বলছেন, ওনার বাবা খনিতে শ্রমিকদের শ্বাস-অযোগ্য গ্যাস সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতেন, ডাক্তার হিসাবে। আর ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে বিপজ্জনক খনিতে গিয়ে কাজ করতে করতে হাতেকলমে গবেষণা করার প্রতি তাঁর দুর্দান্ত আকর্ষণ তৈরী হয়ে যায়। নিজেও প্রচুর বিপজ্জনক গবেষণা করতেন উনি।

(২)

প্র্যাকটিকাল কাজকর্ম সম্পর্কে হল্ডেন খুব অদ্ভুত কিন্তু ইন্টারেস্টিং কিছু প্রশ্ন তুলতে পারতেন। নিজেই বলছেন এক বক্তৃতায়, যে হয়ত আমায় এই কাজটা দেবার এটাই কারণ, যে আমি এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে পারি যা আগে কেউ তোলে নি।

ভারতের কৃষি সম্পর্কে উনি বলছেন, যে এখানে খোলা মাঠে চাষাবাদ হয় বলদ ইত্যাদির দ্বারা। তা আমরা জানি, কালো জিনিস রোদ শুষে জলদি গরম হয়ে যায়, আর সাদা জিনিস তুলনামূলক ঠাণ্ডা থাকে। তাহলে বলুন তো, এই কাজ করতে কি কালো চামড়ার বলদদের বেশি কষ্ট হয়, সাদা চামড়ার বলদদের তুলনায়? তাহলে আমাদের কি উচিত এক বিশেষ রঙের গরুদেরই ব্রীডিং করা, এই অঞ্চলে চাষের জন্য? প্রশ্নটা প্রথম দর্শনে অদ্ভুত মনে হয়, কিন্তু আসলে হয়ত ফালতু নয়।

আরেক জায়গায় বলছেন, সরকার জনগণনা করাচ্ছেন, কত জমিতে তুলো চাষ হয় তা মাপাচ্ছেন, আমাদের একরপিছু চিনির উৎপাদন কত তা পরিমাপ করছেন, তা এইসব মাপে ‘এরর’ হয় নিশ্চয়ই? আর তার একটা অংশ নিশ্চয়ই আসে যাঁরা মাপছেন সেই সরকারী কর্মচারীদের মাপঝোকে বিচ্যুতি থেকেই। তা সরকারের কি উচিত নয়, এই কর্মচারীদের নিয়ে একটা ট্রায়াল করে আন্দাজ করা, যে তাঁদের কাজকর্মে গড় বিচ্যুতি বা এরর কত? তাহলে ভুলত্রুটির পরিমাণ, বা ভেরিয়েন্স-এর একটা ভালো আন্দাজ পাওয়া যাবে। এইভাবে তথ্য-সংগ্রাহকদের কর্মদক্ষতাকে সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করার আইডিয়াটাও নতুনত্ব।

কলকাতায় ছাত্রদের পড়াতে পড়াতে, পাশ করে যারা অনেকেই সরকারী চাকরি নেবে ওইরকম, তাদেরকে প্রশ্ন করতেন হল্ডেন, এই যে রোজ সকালে ছাত্রাবাস থেকে হেঁটে ক্লাসে আসো, বলতে পারো কেউ, এই রাস্তার দুপাশে মোট কটা সুপারিগাছ আছে? বলতে পারত না অনেকেই, কেউ আন্দাজ করত কিন্তু ভুলভাল। তখন বলতেন, ওহে, এসব কাজ করতে গেলে তো চোখকান খোলা রাখতে হবে, আর তেমনই চট করে কিন্তু মোটামুটি সঠিক এস্টিমেট করার ক্ষমতা থাকতে হবে। ব্যবহারিক পরিসংখ্যান-কর্মীদের জন্য খুব দরকারী উপদেশ।

(৩)

জনগণনা আর সরকারী কর্মচারীদের কথা যখন উঠল, তখন একটা কথা বলে যাই। আমাদের যিনি সরকারী স্ট্যাটিস্টিক্স পড়াতেন, তিনি কর্মজীবনের শুরুতে জনগণনা-পরিদর্শক হিসাবে গ্রামে গ্রামে যেতেন। তা বলতেন, যে বিহারে কি উত্তরপ্রদেশে কোনো দেহাতি গ্রামে গ্রাম্য বড়লোকের বাড়িতে গেলাম, মাটির সদর দরজা পেরিয়ে বিশাল উঠোনে গিয়ে চারপাই-তে বসা হল, দেখি উঠোনের একপাশে কিছু গরু বাঁধা, আরেক কোণে কিছু বাচ্চাকাচ্চা খেলা করছে, আরেক পাশে আবার বাড়ির কর্তার দুই ছেলে বন্দুক পরিষ্কার করতে করতে আমাদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। একটু পর কর্তা এলেন, বিশাল চেহারা, খাটিয়ায় বসে নিজের দোনলা বন্দুকে ভর দিয়ে পারিষদ-পরিবৃত হয়ে আমাদের বললেন, নিন সরকারি বাবু, কি বলবেন বলুন। তখন এমনিতেই বুক কাঁপতে থাকে, তারপর আবার যেসব প্রশ্ন করার জন্য কাগজে লিখে দেওয়া থাকে তাতে... যেমন ধরুন, একজনের একাধিক বিয়ে হতেই পারে, ছেলে হলে তো বটেই, মেয়ে হলেও তো বিধবা-বিবাহ হয়ই। তাই ফর্মে সেই প্রশ্ন থাকে বাড়ির প্রত্যেকের জন্যেই, যে বিয়ে হয়েছে কি না, হলে ক’টা। তা কর্তাকে সেই প্রশ্ন করতে অসুবিধা নেই, কিন্তু কর্তার স্ত্রীরা একাধিক বিয়ে করেছেন কি না, এহেন ধৃষ্ট প্রশ্ন কি করা যায়, তাও আবার কর্তাকেই?

একজন জনগণনা-কারী সরকারী চাকুরে গোপনে শুনিয়েছিলেন আরেক চমৎকার কথা। বললেন, সারাদিনে হয়ত তিনটে পাড়া গোনার টার্গেট হয়েছে, কিন্তু দুটো হয়ে তিনটে পুরো হল না, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। বা, এমনিতেই বিকেল হয়ে এল, মনমেজাজ আর ভাল ঠেকছে না। তখন পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে বসি, এককাপ চা নিয়ে দোকানীকে প্রশ্ন করি, আচ্ছা বল তো, ওই সবুজ দরজাওয়ালা বাড়িটায় কজন লোক? ছেলে, মেয়ে ক’টা? কার বয়স কেমন? এইসব সেকেন্ডহ্যান্ড তথ্য দিয়েই ফর্ম ভরে ফেলে দিনের কোটা পুরিয়ে নিই।

(৪)

হল্ডেন তাঁর কেরিয়ারের শেষ দিকে পাকাপোক্তভাবে চলে আসেন ভারতে, ১৯৫৭’য়। ওখানকার বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ ছেড়ে ভারতে কেন এলেন, তাও যখন সেখানের পরিকাঠামো সবে তৈরী হচ্ছে, এই প্রশ্ন অনেকেই করেন।

একটা প্রধান কারণ এই, যে তাঁর ভাবনাচিন্তা ছিল কমিউনিস্ট-ঘেঁষা। আর সে সময়ে বিলেতে কমিউনিস্টদের আদৌ পছন্দ করা হত না। প্রতিকূল পরিবেশে থাকতে না চেয়ে উনি চলে এলেন ভারতে। নতুন গড়ে উঠতে থাকা দেশের সরকারী পলিসি তাঁর উদার বলে পছন্দ হয়েছিল, মনে হয়েছিল এটা ‘সোশালিজম’-এর বেশি কাছাকাছি।

আর কাগজপত্রের কড়াকড়ি, যাকে বলে রেড-টেপ, সেটাও উনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। গবেষণার সময় এসব নিয়ে ওনার ঝামেলা লাগত ওখানের কলেজে। এখানে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের আমন্ত্রণে এসে আই.এস.আই.তে যোগ দেন, কিন্তু এই সরকারী প্রতিষ্ঠানের জটিলতাও পছন্দ হত না তাঁর। কয়েক বছর পরেই এটাও ছেড়ে দিয়ে কটকে এক কৃষি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পত্তন করে তার সর্বময় কর্তা হিসাবে কয়েক বছর সুখে কাটান, মারা যাবার আগে।

কমিউনিস্ট রাষ্ট্র মানেই ইউটোপিয়া, এই ইলিউশন-এ বাংলার কমরেডদের বহু বছর ভুগতে দেখেছি আমরা। হল্ডেনও তাঁর ব্যতিক্রম ছিলেন না। স্টালিন-এর শাসন যে সোশালিজম থেকে টোটালিটারিয়ান হয়ে পড়ছে, এটা তিনি প্রথমে বুঝতে না পেরে স্টালিনকেই আদর্শ শাসক হিসাবে মানতেন। সোভিয়েত জীববিজ্ঞানী লিসেঙ্কো, যাঁর ভ্রান্ত কার্যকলাপ সোভিয়েত জীববিজ্ঞানীদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল, তাকেও চিনতে তাঁর প্রচুর সময় লেগেছিল। জীবনের শেষদিকে এসে ওদের সমালোচনা শুরু করেন হল্ডেন, কিন্তু ততদিনে ভলগা দিয়ে প্রচুর জল গড়িয়ে গেছে।

(৫)

আরো মজার ব্যাপার, বাংলার কমিউনিস্টদের অনেকেই কিন্তু ধর্মেও আছেন জিরাফেও আছেন। অধুনালুপ্ত মন্ত্রী সুভাষবাবু যেমন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই কালীঘাটে পুজো দিতে যেতেন। এক দুষ্টজনের থিয়োরী ছিল, এঁরা পার্টি-সমাজতন্ত্র এসবের বুকনিতেই মেতে থাকেন, ঘরেতে ছেলের দিকে নজর দেন না, তারপর সময়মত ছেলেপিলে বখে গেলে উদ্বিগ্ন মায়ের মন যায় শিবঠাকুরের পায়ে মানত দিতেই। ততদিনে এনাদের বয়স হয়েছে, যৌবনের জোশও কমে গেছে, বউএর চাপে ঠিকই আঙুলে একটা পলা ধারণ করে নেন।

হল্ডেনও ক্রমে ক্রমে হয়ে গেলেন বেশ ধার্মিক। ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে ঢুকে পড়লেন হিন্দুধর্মে। পেশাভিত্তিক যে উৎস ছিল বর্ণপ্রথার, সেটাকে সমর্থন এবং কিছু বিতর্কিত অংশও ওনার পছন্দ হতে লাগল। ‘প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান’ এর আলোকে সবকিছুকে বিচার করতে লাগলেন তিনি। এবং যথারীতি এর মধ্যেও তাঁর নিজস্বতা নিয়ে এলেন।

‘ভারতের আলোকে ডারউইন’ বিষয়ক একটা প্রবন্ধে একটা মজাদার কথা বললেন উনি। বললেন, যে ডারউইনকে তাঁর মত ছড়িয়ে দিতে হয়েছিল খ্রীষ্টীয় ভাবসম্পন্ন সমাজে। আর বাইবেলের গল্প বলে, এই জগতের মধ্যে মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ, ঈশ্বর বিশেষ যত্ন নিয়ে শুধু আমাদেরই সৃষ্টি করেছিলেন, বাকি জীবজন্তু-গাছপালা সব তুশ্চু, আমাদের সেবার জন্যই তৈরী। তাই বিবর্তনের পথে এদের আর আমাদের সম্পর্ক মেনে নিতে লোকের এত অসুবিধা হয়েছিল। ডারউইন যদি ভারতে জন্মাতেন, ওনার এত অসুবিধা হয় না, কারণ ভারতীয় দর্শন বলে, সব জীবই ঈশ্বরের সৃষ্ট, তাঁর প্রিয়, জীবে সেবাই আমাদের ধর্ম, তাদেরও সম্মান করা উচিত। আর বাঁদরকে তো আমরা পুজোই করি, তাই তারা আমাদের পুর্বপুরুষ মেনে নিতে কোনো সমস্যাই হত না। ইন্টারেস্টিং!

(৬)


নতুন দেশ গড়ে তোলার অঙ্গ হিসাবে, প্রধানমন্ত্রী নেহেরু অধ্যাপক মহলানবিশকে দায়িত্ব দেন, নতুন সৃষ্ট যোজনা কমিশনের। সরকারের আয়ব্যায় কোথায় কেমন হয় এবং কেমন হওয়া উচিত, সেসব নির্ধারণ করতে গেলে তো প্রচুর হিসাব পাওয়া উচিত আগে, যে আমাদের জনসংখ্যা কত, আমাদের জমিতে কত ধান উৎপন্ন হয়, আমাদের চাল খাওয়ার পরিমাণ কেমন, তাহলে মোট চাহিদা কেমন হবে, ইত্যাদি প্রচুর প্রশ্ন। সেগুলোর উত্তর পেতে গেলে প্রচুর সার্ভে করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই বিশাল দেশে এই গণনা-মহাযজ্ঞের কর্ণধার হিসাবে মহলানবিশ সুবিদিত।

এই ধরণের বাস্তব পরিসংখ্যানে আকর্ষণ ছিল হল্ডেনেরও। তাঁকে ডেকে আনার পিছনে মহলানবিশের এটা ছিল বড় কারণ। হল্ডেনও যেমন কাজ করতেন তাতে ভারত ছিল তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক জায়গা। এখানে চাষাবাদের যেমন বৈচিত্র, তেমনই প্রাণীসম্পদের। আর তিনি জোর দিতেন সহজে সস্তায় গবেষণা করার উপর, যেটাও সেসময়ে ভারতের পক্ষে খুব দরকারি ছিল। উনি নিজেই উদাহরণ দিচ্ছেন –

সাহা পরমাণুবিজ্ঞান কেন্দ্রের এক বিজ্ঞানী সেই সময় ব্যাকটিরিওফাজ-দের মাপছেন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে। সেই সময় ব্যাকটিরিওফাজ-দের সম্পর্কে খুব কমই জানা ছিল, ভাইরাস হিসাবে তাদের প্রাণী হিসাবে ধরা হবে কি হবে না তাই নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। গড় দৈর্ঘ্য ৯৬৪ অ্যাংস্ট্রমে (মাথার মোটা অংশটার) এরা একটা খুব ছোট্ট কোষও হতে পারে, আবার একটা বড় জৈব-অণু’ও। হল্ডেন বলছেন, একটা খুব সহজ স্ট্যাটিস্টিকাল পরিমাপ নিয়ে দেখি – গড় বিচ্যুতি। সেটা এদের হয় ২২ অ্যাংস্ট্রম, যা প্রায় সব জীবকোষের গড় বিচ্যুতির চেয়েই ছোট। আর, সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং, এই ২২ সংখ্যাটা হল একটা কার্বন পরমাণুর ব্যাসার্ধ – ১.৭ অ্যাংস্ট্রম – এর মাত্র ১৪ গুণ। যেখানে বিচ্যুতিটা পরমাণুর স্তরে চলে যাচ্ছে, সেখানে জিনিসটা তাই একটা অণু হবার সংখ্যাই বেশি।

পরবর্তীকালে ব্যাকটিরিওফাজ’এর প্রোটিন অণু দিয়ে নির্মিত সুষম কেলাসের মত গঠন আবিষ্কৃত হয়, যা হল্ডেনের বিশ্লেষণকে সমর্থন দেয়। স্ট্যাট-এ সহজ জিনিসপত্র ব্যবহার করে এধরনের সিদ্ধান্ত টানার ক্ষমতা আমি খুবই পছন্দ করি। অহেতুক জটিল জটিল থিয়োরি কষে কি হবে?

-------------------------------------------------------------------

ওনার সম্বন্ধে এই পর্যন্তই। শেষ করার আগে মহলানবিশ সম্পর্কে দুএককথা বলে যাই। বৃহত্তম এই সরকারী পরিসংখ্যান-পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য উনি সমাদৃত, কিন্তু থিয়োরীর জন্য স্ট্যাট-দুনিয়ায় ওনার তেমন নাম নেই। একটাই জনপ্রিয় জিনিস ওনার নামে প্রচলিত – মহলানবিশ ডিসট্যান্স। অবশ্য ওনার নাম না প্রচলিত হবার আরো একটা কারণ হয়ত এই, যে বিলিতি বা চীনা কোনো প্রফেসরই ওনার নাম ঠিক করে উচ্চারণ করতে পারেন না। সেদিনও ক্লাসে একজন ম্যাম ওই ডিসট্যান্সের কথা বলতে গিয়ে ‘মহলা... মহ... মহবি... ওই সেই ডিসট্যান্সটা” বলে চালিয়ে দিলেন।


এমনিতেও, ভারতীয় প্রফেসরদের খুব বেশী সম্মান দিতে ওঁরা আগ্রহী নন। এই যেমন গতবার বলেছিলাম ডি. বসু’র কথা, যিনি ‘মাস্টার অফ কাউন্টার-এক্সাম্পলস’ নামে সুখ্যাত; স্ট্যাট-এর একটা ধারা পড়াতে গেলে ওনার কাউন্টার-এক্সাম্পলগুলো আনতে হবেই। তা আমাদের স্ট্যাট ডিপার্টমেন্টের স্যারেরাও, সেগুলো পড়ালেও ওনার নামটা আর উল্লেখ করেন না, এদিকে নিজেদের ডিপু’র লোকেদের পেপারের ছোটখাট রেজাল্টও যত্ন করে উল্লেখ করেন পড়াবার সময়।

-------------------------------------------------------------------

ফের অফটপিকঃ আমার বাংলাদেশ বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানের কথা শুনে যাঁরা শুভেচ্ছা বা পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁদের আবারো ধন্যবাদ, কিন্তু সমান্তরাল আতিথেয়তা এখানের বাংলাদেশ হাইকমিশন দেখাতে আগ্রহী নন। তাঁরা আমার চরিত্র কি কাগজপত্র ভরসা করতে না পেরে ভিসা রিজেক্ট করলেন। এইতেই লেগে গেল ১১ দিন, যদিও সাইটে লেখা হ্যান্ড-ইন অ্যাপ্লিকেশনের পরের দিনই ফেরত, যেইটাই দস্তুর বেশিরভাগ দেশের (আমার দেখা); তাই আবার অ্যাপ্লাই করার আর সময় নেই। তাঁরা ফর্ম বা সাইটে উল্লেখ নেই এমন আরো নানারকম কাগজ চান, সেসব ব্যবস্থা করে সামনের বার যবে ফিরব তখন চেষ্টা করব। (খানকতক দেশে গেলাম, এইটাই আমার প্রথম ভিসা ফর্ম যেখানে আবেদনকারীর ধর্ম জানতে চাওয়া হয়। আমরা পাষণ্ড নাস্তিক মানুষজন সেটা খালি রেখেছিলাম, সেই ধৃষ্টতাও হয়ত ওনাদের পছন্দ হয় নি।) আচ্ছা, সামনের বার সচল-হাচল-অতিথি বন্ধুদের সন্দর্শনের আশা রাখি।


মন্তব্য

তাসনীম এর ছবি

দারুণ লাগলো লেখাটা। এরকম লেখা আরো চলুক। রেডিও আবিষ্কারের কৃতিত্ব জগদীশ বোসকে দিতে ১০০ বছর লেগেছে।

শুধু ভিসার জন্য বাংলাদেশ ভ্রমণ হচ্ছে না শুনে দুঃখ লেগেছে। আপনারা বরিশালের লোক, সেখানে যেতেও ভিসা লাগে। আমার মায়ের জন্ম মুর্শিদাবাদে, সেটা দেখতেও ভিসা লাগবে। দুঃখজনক...আমি ভেবেছিলাম যতই দিন যাবে এই সব জটিলতা কমবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ঠিক তার উল্টোটা হচ্ছে।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

কৌস্তুভ এর ছবি

শেষপর্যন্ত যে ওনাকে স্বীকৃতিটা দেওয়া হল, তাই নিয়ে কোনো লিঙ্ক আছে?

সেই তো দেখি অবস্থা। কে যেন কথা তুলেছিল, ই.ইউ. এর মত সার্ক দেশগুলিরও একত্রে ভিসার ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু পাকিস্থানের যা অবস্থা, পিলপিল করে যে মুজাহিদ ঢুকে পড়বে সে নিশ্চিত করেই বলা যায়। অতএব...

আপনি কথায় কথায় ধন্যবাদ দেন। কিন্তু আমি ইটের বদলে পাটকেল ফিরিয়ে দিতে চাই না। তাই চেপে গেলাম। খাইছে

তাসনীম এর ছবি

লিঙ্কটা আমি খুঁজব, ২০০১/২০০২ সালে আই ট্রিপলইর পত্রিকাতে একটা লেখা এসেছিল।

ধন্যবাদ দেওয়াটা মনে হয় বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে আমার হাসি

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

তাসনীম এর ছবি

http://en.wikipedia.org/wiki/Jagadish_Chandra_Bose

ছয় নম্বর রেফারেন্স।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

কৌস্তুভ এর ছবি

কোনটা বলুন তো, Sen না Aggarwal নাকি Mervis?

এগুলো তো ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, সেসব তো অনেকদিনই লেখা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কি স্বীকৃতিটা এসেছে?

অপছন্দনীয় এর ছবি

আবার ওই বেচারা T2 কে নিয়ে এলেন? আমার 'রি-ভিউড' দুঃস্বপ্ন আরেকটা বাড়লো মন খারাপ

জিরাফ?

কৌস্তুভ এর ছবি

ওই ছোট্ট T2-টুকুই চোখে পড়ল, বাকি লেখাটা আর মন ভালো করতে পারল না? মন খারাপ
ধর্মেও আছি জিরাফেও আছি-টা বাংলায় একটা প্রচলিত বাক্যবন্ধ, ঠিক উৎস জানি না। তবে অর্থটা নিশ্চয়ই আঁচ করে নিতে পারছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটা কবিতার বইয়ের নাম দেখলাম এটা নিয়ে - ধর্মেও আছো জিরাফেও আছো।

অপছন্দনীয় এর ছবি

লেখাটা নিঃসন্দেহে দারুণ, আপনার আর সব লেখার মতই।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি যেসব 'গিলিয়ে' দিয়েছে সেগুলোর কোনকিছু দেখলেই এমন আতঙ্ক হয় যে আগে পরের সব আস্বাদিত রস হাওয়া হয়ে যায়। আমি বোকাসোকা ভীতু টাইপ মানুষ, অল্পেই ভয় পাই কিনা - তাছাড়া ঘরপোড়া গরু আর সিঁদুরে মেঘ নিয়ে কি একটা কথাও যেন আছে... হাসি

সজল এর ছবি

ভালো লিখেছেন। নাম নিয়ে দুঃখের কথা আর কী বলব, আজকে দুইবার বলার পরও আমার আকার ওকার দিতে হয়না, সহজ সরল নামটা এক প্রফেসরকে বুঝাতে পারলামনা।

---
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

কৌস্তুভ এর ছবি

আপনার সজল নাম তো তাও সহজ সরল, আমার নাম নিয়ে কী অবস্থা হয় ভাবুন।

স্পর্শ এর ছবি

আপনার ফ্যান হয়ে যাচ্ছি! একের পর এক দুর্দান্ত লেখা!!


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

কৌস্তুভ এর ছবি

লইজ্জা লাগে

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

কবে যে বিয়োন্ড দ্য বর্ডার থাকবেনা কোন কাঁটাতার, অথবা কাঁটাতার কেন থাকবেনা কোন বর্ডার। তখন দেখবো ব্যাটা পাসপোর্ট, ভিসা কেমনে দেখাস তোদের ভানুমতির খেল, নির্ব্বংশ হবি তোরা!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

কৌস্তুভ এর ছবি

আমাদের জীবদ্দশায় সে সব দেখব বলে তো মনে হয় না!

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

খুবই চমৎকার লেখা! সেকশন (৩) খানিকটা অসংলগ্ন হলেও এটা বেশী ইন্টারেস্টিং। এরকম আরো চাই। পরে হয়ত বিজ্ঞানীদের গল্প নামে ইবুক বেরোতে পারে আপনার। হাসি

কৌস্তুভ এর ছবি

লইজ্জা লাগে

ওই, গল্পের মাঝে মজার হলে একটু আশকথা-পাশকথা ঢুকিয়ে দিতে ইচ্ছা করে, আলিসাহেব পড়ে পড়ে বড় হইচি তো। তবে ঠিক করে বুনতে পারি না সবসময়।

ইবুক দূর অস্ত। তবে বিজ্ঞানীদের গল্প বেশ কিছু আছে...

অতিথি লেখক এর ছবি

আগেই বলেছি, আপনার লেখার জন্য মনে মনে অপেক্ষা করি। এ পর্বটাও দারুণ লাগলো।
বিশেষত নিজেদের দেশের কোন বিজ্ঞানীর সাফল্যগাঁথা পড়লে কিংবা এমন কেউ যিনি কিনা এ পাড়ায় এসে গবেষণা করেছে, ভালোই লাগে।
কখনো না কখনো দেখা নিশ্চয়ই হবে হাসি

---আশফাক আহমেদ

কৌস্তুভ এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

এভাবে দুদ্দাড় লিখতে থাকুন ইন্টারেস্টিং সব জিনিস নিয়ে, চিপার মন্তব্য ধূসর হয়ে গেলেও সচলত্ব নিশ্চিত! হাসি

অট: শেষতক বাংলাদেশ আসা বাতিল হয়ে গেল ভিসা জটিলতায় জেনে খারাপ লাগলো। আগের লেখায় আপানার এ সংক্রান্ত মন্তব্যের উত্তর দেয়া হয়নি, কিন্তু হ্যাঁ ব্যাপারটা আমার জানা মতে এদিক থেকেও একই রকম বিচ্ছিরি হয়েই আছে। মাঝে এত খারাপ অবস্থা হয়ে গিয়েছিল যে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে দিনরাত বিছানা-বালিশ নিয়ে বিশাল লাইনে অপেক্ষা করছিলেন চিকিৎসার জন্যে ভারতে যাবার উদ্দেশ্যে অসুস্থ রোগীরাও। এখন হাইকমিশনের ওয়েবসাইট থেকে একটা টোকেন জেনেরেশনের ব্যবস্থা হয়েছে, ভিসার জন্যে সাক্ষাতের লক্ষ্যে। ফর্ম ফিলাপ করে টোকেন নিতে হয়, যেদিন যে সময়ে ইন্টারভিউয়ের জন্যে যেতে বলে টোকেনে, ঐ সময়ে সব রকম কাগজ রেডি করে সাথে নিয়ে যেতে হয়। সম্প্রতি এক ব্যাচমেট/কলিগ গিয়েছে একটা ওয়ার্কশপে দিল্লি, বললো রাজশাহীর হাইকমিশনে যাঁরা কর্মকর্তা আছেন তাঁরা না বুঝতে পারছেন বাংলা, না ইংরেজি (আমি ব্যক্তিগতভাবে খুশি হয়েছি যে সে নিজে হিন্দি বলবার চেষ্টা করে আসেনি)! তবে নিয়োজিত সর্বোচ্চ কর্মকর্তার ব্যবহারে সে মুগ্ধ, আর ভিসাটা শেষ মুহূর্তে হয়ে গেছে।

আশাকরছি পরেরবার অবশ্যই ঘুরে দেখবার সুযোগ পাবেন বাংলাদেশ।

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

কৌস্তুভ এর ছবি

আপনাদের সমবেদনার জন্য ধন্যবাদ। সদ্য গেলাম এখানের শিল্পমেলায়, সেখানের বাংলাদেশ কর্ণারেও শুনলাম অর্ধেক লোকই ভিসা পান নি। দুজনেই ফ্যাচাং বাড়াবার কম্পিটিশন না করে সহজ করে দিলেই পারে!

লিখব তো নিশ্চয়ই, যতদিন আপনারা পড়বেন ততদিনই লিখতে ইচ্ছা করবে। বাকি থাকে সময় পাওয়ার ব্যাপার।

তুলিরেখা এর ছবি

দারুণ লেখা। জে বি এস হলডেনকে নিয়ে একবার বেরিয়েছিলো কাগজে, সেই গপ্পো শুনে মনোমুগ্ধকর লাগলো। সে নাকি চার বছর বয়সে, একদিন পড়ে গিয়ে কপাল কেটে দরদর করে রক্ত পড়ছে, সে তার বাবাকে জিগালো, "বাবা, এটা কি অক্সি-হিমোগ্লোবিন? " হাসি নির্ঘাত আবাপ রঙ ঢেলে বানিয়েছিলো!
আপনার ভ্রমণে বাধা এলো শুনে দু:খিত, কর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে ফিরছেন কবে? চিন্তিত

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

কৌস্তুভ এর ছবি

এই সব তো কিছু পড়ি নাই... রেফারেন্স দিন, তাহলে আবাপে খুঁজে দেখি।

ফিরব ২৪-২৫। তা সান্ত্বনা পুরষ্কার কিছু একটা দেওয়া যায় না?

ফাহিম হাসান এর ছবি

পোস্টটা বার কয়েক পড়েও মন্তব্য করা হয় নাই। ভুলেই গেসিলাম।

আপনি সচল গড়ের (সাড়ে চব্বিশখানা) থেকে আর তো বেশি দূরে নাই। দেঁতো হাসি

আপনার লেখা অনেক গোছানো হয়। কিন্তু এই পোস্টে তিন নং বিষয়টার মনে হয় দরকার ছিল না। এ ধরনের দু নম্বরি এখন সব্বাই জানে। মূল পোস্টের মজাটা নষ্ট করে দেয়।

আপনি ভিসা পান নি জেনে খুব কষ্ট পেলাম। আমি সারা জীবনে সবচেয়ে বাজে ব্যবহার পেয়েছি ভিসা অফিসারদের কাছ থেকে। প্রথম প্রথম খুব গায়ে লাগত। এখন আমল দেই না। কিন্তু আপনার ভিসা না পাওয়াতে এ্যাত্ত খারাপ লাগল! হুদাই গ্যাঞ্জাম করে এই সব অফিসার।

কৌস্তুভ এর ছবি

ধন্যবাদ ফাহিম ভাই, এই আপনারা মনোবেদনাটা ভাগ করে নেন বলেই না...

লোকজনকে প্রমোশন দেবার দিকে মডুদের অনেকদিন মন নাই বলে মনে হয়, বড়সড় প্রজেক্ট নিয়ে তাঁরা সব ব্যস্ত। সচলগড়^2 পরিমাণ পোস্ট লাগবে এখন মনে হচ্ছে। মন খারাপ

আপনি বললেন এইরকম, আর ওদিকে মুর্শেদ ভাই বলছেন "সেকশন (৩) খানিকটা অসংলগ্ন হলেও এটা বেশী ইন্টারেস্টিং।" বল কোথা যাই কোথায় দাঁড়াই... যেটা করতে হবে দেখছি, এরপর থেকে এরকম বাইরের জিনিসপত্র ঢোকাবার সময় সেলাইয়ের জায়গাটা আরো মসৃণ করে দিতে হবে।

guest_writer এর ছবি

চমৎকার ! শুভেচ্ছা-- অণু

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA