১৯৭১

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি
লিখেছেন মেহবুবা জুবায়ের [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৬/০৫/২০১১ - ১২:৩৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব > দ্বিতীয় পর্ব > তৃতীয় পর্ব > চতুর্থ পর্ব

সবুজ মামার বাসায় কিছুই ছিলো না। এমনকি ঠিক মতো প্লেট-গ্লাস, হাঁড়ি-পাতিল, বিছানা-পত্র কিচ্ছু না। শুধু একটা বিরাট ফিলিপসের ধূসর রঙের রেডিও আর একটা বড় পাতিল ছিলো। সেটাতে করে পাড়ার মুদি দোকান থেকে চাল-ডাল কিনে এনে শুধু খিচুরি রান্না করে খেতাম আমরা। প্লেট-গ্লাস বেশী ছিলো না বলে পালা করে খাওয়া হতো। পাড়ার মুদি দোকানটা তখন পর্যন্ত ছিলো বাঙালির। দোকানটা সামনের দিকে বন্ধ, কিন্তু পেছনের একপাশে একটু খোলা ছিলো। ওদিক দিয়েই পাড়ার লোকে কেনাকাটা করতো। তেমন ভালো কিছু ছিলো না সেখানে। মনে হয়, পান-বিড়ির দোকানের মতো ছিলো সেটা। সিগারেটের মধ্যে স্টার, বগা, উইল্স আর সবচেয়ে বেশী ছিলো বিড়ি।

আমার বাবা ছিলেন সেই বিড়ির প্রধান খরিদ্দার। আব্বা এমনিতে থ্রি ক্যাসলস খেতেন। কিন্তু তখন, কে জানে কেন, তিনি খুব বিড়ি ফুঁকতেন। আমাদের সব কেনাকাটা চলতো ওখান থেকেই। তখন পর্যন্তও ওই দোকানে বঙ্গবন্ধুর একটা ছবি ঝুলানো ছিলো।

শাহজাহানপুরের কিছু লোক সালোয়ার শার্ট পরে, মাথায় টুপি লাগিয়ে, গলায় রুমাল বেঁধে বিহারি সেজে খুব লুট-পাট শুরু করে দিয়েছিলো। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখতাম, কার্ফুর মাঝে বাক্স-জিনিসপত্র নিয়ে দৌড় দিচ্ছে। ওরা যে বিহারি না, সেটা ওদের কথা শুনেই বোঝা যেত। তারা সুযোগ বুঝে অমুসলিম বাঙালিদের দোকান-পাট, বাড়ি-ঘর দখল করে নিয়েছিলো। শুধু শাহজাহানপুরেই নয়, যতটুকু শুনেছি তখন প্রায় সব পাড়াতেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিলো। সব মানুষ যখন প্রাণের ভয়ে দিশাহারা, সর্বস্ব ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে, তখন এই সব মানুষ নামের জন্তুগুলি ভোল পাল্টিয়ে লুট-পাট, খুন-জখম, মেয়েদের অত্যাচার করা, কিছুই বাকি রাখেনি। এরা এসব শুরু করেছিলো ২৬ মার্চ থেকেই।

বাসার লেআউটটা আমার পরিষ্কার মনে নেই। তবে খাবার ঘরের পাশে আর একটা ছোট্ট ঘর ছিলো। দুপুরের একটু আগে সবুজ মামার শাহজাহানপুরের এই বাসায় আব্বা বোরখাপড়া একজন মহিলাকে নিয়ে এসেছিলেন। উনি এসেই ঐ ছোট্ট ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এই তিনরুমের বাসায় আমরা মনে হয় আন্ডা-বাচ্চাসহ প্রায় পনরো-বিশ জন একসাথে ছিলাম। এতজনে মিলে এতটুকু বাসায় শুধু কথা বললেই মনে হতো চেঁচামেচি করছি। হয়তো আমরা একটু চেঁচামেচি করেছিলামও। হঠাৎ আব্বা জোরে ধমকিয়ে উঠলেন, “এই চুপ, একদম চুপ”। আমরা চুপ হয়ে গেলাম। রেডিওর একটু ঘড়ঘড় শব্দ ছাপিয়ে একটা ভারি গলা শোনা গেলো, “This is Swadhn Bangla Betar Kendra. I, Major Ziaur Rahman, at the direction of Bango Bondhu Mujibur Rahman................... Joy Bangla."

আমরা ছোটরা কী বুঝলাম, কে জানে! কিন্তু এইটা শুনেই চিৎকার করতে শুরু করে দিয়েছিলাম, “দেশ স্বাধীন, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। জয় বাংলা! জয় বাংলা!” এইবার একসাথে সবাই জোরে ধমক দিয়ে আমাদের একদম চুপ করিয়ে দিলো। বড়রা রেডিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শুনেই যাচ্ছে। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা আরো কত কী! কতক্ষণ আর চুপ করে থাকা যায়? রাতও হয়ে গিয়েছিলো আমরা খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম।

বসার ঘরের মেঝেতে ঢালা বিছানা করে আমাদের ছোটদের ঘুমানোর ব্যবস্হা করা হয়েছিলো। সারাদিনে টের পাইনি, কিন্তু রাতের বেলায় আবার প্রচণ্ড গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিলো। মনে হয়, পাক আর্মিরা রাতের আঁধারের সুযোগ নিয়ে আবার বাঙালী খুন করতে লেগে গিয়েছিলো। গুলির শব্দ শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

রাত তখন কত, ঠিক জানি না। সম্ভবত অনেক। রেডিওর শব্দে, নাকি সিগারেটের গন্ধে, জানি না, কেন আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মাথা উঁচু করে খাবার ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সবুজ মামা ও আব্বারা খাবার ঘরের চৌকিটার উপর গোল হয়ে বসে আছেন, সঙ্গে সেই মহিলা, তিনিও চৌকিটার উপর বসে আছেন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। ঠিক আমি যেখানে শুয়ে আছি সেখান থেকে সরলরেখা বরাবর।

পুরো বাসাটা অন্ধকার। শুধু চৌকির মাঝখানে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। তার আলোয় সেই অপূর্ব মায়াবতী মুখটার দিকে তাকিয়েছিলাম। মুখটা আমার স্মৃতিতে এতো স্পষ্ট যে, এখনো চোখ বন্ধ করলে পরিষ্কার দেখতে পাই। ঘনকালো একজোড়া ভুরু, ঘনপল্লবে ভরা মায়া মায়া বিশাল দু’টি চোখ। ভারী, পুরু ঠোঁট দুটো মাঝে মাঝেই সিগারেট চেপে-চেপে ধরছে। আর আর সেই টিকালো নাকটাতে একটা নাকফুল। মোমের আলোয় ঝিলিক দিয়ে ওঠা তার দ্যুতি সিগারেটের আগুনকে হার মানিয়ে দিচ্ছিল। (হ্যাঁ, সে রাতে তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন) সেই আলো আধাঁরির রাতে আবারো রেডিও থেকে ভেসে এলো ইংরেজিতে, “আমি মেজর জিয়া বলছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করছি...”

এই ভাষণটা আগেরটার চেয়ে অনেক বড়, সন্ধ্যারটা ছোট ছিলো বা আমিই অল্প শুনেছিলাম। শুনতে শুনতে এক সময় আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছি! এটা ছিলো ২৭শে মার্চের রাতের ঘটনা। তিনি ছিলেন মতিয়া চৌধুরী, আমার বাবার সাথে ন্যাপ (মোজাফফর) করতেন। আমার মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে, আমাদের বর্তমান কৃষি মন্ত্রীর কী সেই রাতের কথা মনে আছে?

পরদিন সকালে তাকে ভালোভাবে দেখলাম। চৌকির ওপর ঠিক তেমনি দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে চা খাচ্ছিলেন। আমি প্রথমেই তার নাকের দিকে তাকালাম, দেখলাম নাকের নাকফুলটা ইমিটেশনের, চাপ দিয়ে নাকের সাথে লাগানো। আসল না। কী রঙের শাড়ী পরেছিলেন মনে নেই, তবে ব্লাউজটা ছিলো কালো-সাদা প্রিন্টের। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সবুজ মামা ও আব্বাদের সাথে বিরক্ত ও হতাশ স্বরে তর্ক করছিলেন। বাঙালিদেরকে এমন একটা পরিস্হিতিতে ফেলবার জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুকে দায়ী করেছিলেন। আরো কী কী বলেছিলেন আমার ঠিক মনে নেই, তবে মনে আছে, তার কথা আমার খুব খারাপ লেগেছিলো। গতরাতের মুগ্ধতা এক নিমিষে কেটে গিয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর নামে নেগেটিভ কথা সহ্য করতে তখন কষ্ট হতো। এমন কি আব্বা বললেও। আসলে ২৫ মার্চের সন্ধ্যার পর থেকে আমাদের বাঙালিদের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি কী বলেছেন? কী করছেন? তিনি কোথায়? বেচেঁ আছেন তো? এর বাইরে আর কিছু আমরা ভাবিনি, ভাবতে পারিনি।

তখনো আমরা কেউ জানি না, ২৫ মার্চের রাতে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। তাই রেডিওতে যখন মেজর জিয়া নামে একজন মেজর ওই ঘোষণাটা দিয়েছিলেন, যার নাম আমরা আগে কখনো শুনিনি, তখন একবারও কেউ সেটা নিয়ে গবেষণা করেনি যে, ব্যাপারটা কী? কেন মেজর জিয়া এই ঘোষণা দিলেন? বঙ্গবন্ধু কেন দিলেন না? বরং সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন এই মনে করে যে, যাক, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ভালো আছেন, বেঁচে আছেন।

কিন্তু এই স্বস্তিটা বেশীক্ষণ স্হায়ী হয়নি, কারণ ২৮ মার্চে দুই পাতার যে-পত্রিকাটা বের হয়েছিলো (পাকিস্তান অবজারভার), তা থেকে জানা গেল, মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঠিক কখন, মনে নেই, আবার বোরখা পরে মতিয়া চৌধুরী সবুজ মামাকে সাথে নিয়ে তাদের জনৈক দেওয়ান ভাইয়ের বাসায় চলে গিয়েছিলেন। তাদের সেই দেওয়ান ভাইও শাহজাহানপুরের কোথায় যেন থাকতেন।


মন্তব্য

অপছন্দনীয় এর ছবি

প্রথম থেকে পড়েই যাচ্ছি, দয়া করে থামবেন না।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------

আশালতা এর ছবি

এক টানে সবগুলো পর্ব পড়ে ফেললাম । অনবদ্য । চলুক
আগামী পর্বের অপেক্ষায় । পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

এই পপকর্ন এর ইমোটা তো খুব মজার! কই পাইলেন?
লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

--------------------------------------------------------------------------------

আশালতা এর ছবি

আপনি যেখানে ধইন্যা পাতার ইমো পান, সেখানেই আছে তো হাসি

রু (অতিথি)  এর ছবি

খুব ভালো লাগছে আপনার বর্ণনা পড়তে। অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনার এই সিরিজটার জন্য।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আপনাকেও আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------

সচল জাহিদ এর ছবি

সাথে আছি ভাবী।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

জেনে ভালো লাগলো।

--------------------------------------------------------------------------------

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

ধন্যবাদ জাহিদ।

--------------------------------------------------------------------------------

পাগল মন এর ছবি

পড়ে যাচ্ছি।
পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

অমিত এর ছবি

মুগ্ধভাবে পড়ছি

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------

আসমা খান, অটোয়া। এর ছবি

প্রথম থেকেই পড়ছি, ভালো লাগছে, পরের পর্বের অপেক্ষায়। ধন্যবাদ।

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

সিরিজের সাথে আছি...

ঐ রাতের স্মৃতি তো সম্ভবতঃ কোন বাঙ্গালিই ভুলতে পারবেন না, শ্রদ্ধেয় কৃষিমন্ত্রীও নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন। হাসি

_________________________________________

সেরিওজার গল্প

আয়নামতি1 এর ছবি

প্রিয় ধারাবাহিক.........

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

পড়ছি...

লিখতে থাকুন...

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

পুতুল এর ছবি

সবকটা পর্ব পড়লাম।
আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে হাতেগোনা দু'এক জন মানুষ দু'তিনখানা বই লিখেছেন। আমরা যারা যুদ্ধ দেখেছি তারা (আমি সহ) সবাই ভাবি আমাদের এইসব ছোটখাটো মানুষের যুদ্ধের স্মৃতি লিখে কী হবে! ভাবনাটা ভুল। সাংঘাতিক রকমের একটা গুরুত্বপূর্ণ কজ হচ্ছে।

ভাষা, বাচনভঙ্গীতে খুব সাবলিল এবং সতস্ফূর্ত একটা ছন্দ আছে, পড়তে কোথাও আটকাতে হয় না।

যা তখন আপনার জানার কথা নয়; সে বিষয়গুলু আলাদা করে দেয়াতে লেখাটা নির্ভেজাল সত্যটা তুলে ধর‌ছে। কী যে ভাল লাগছে ভাবী বলে বোঝাতে পারব না। একটা কামনা রইল লেখাটা যেন নিয়মিত চলে। ভাল থাকবেন সব সময়।

**********************
ছায়াবাজি পুতুলরূপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ!
!কাশ বনের বাঘ!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA