১৯৭১

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি
লিখেছেন মেহবুবা জুবায়ের [অতিথি] (তারিখ: সোম, ০২/০৫/২০১১ - ৫:১৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব

পিঠে হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম বড়াপু। ওকে দেখেই আমি মাথাটা সরিয়ে ফেললাম চট করে, যাতে আর চড় না মারতে পারে। কিন্তু ও আমাকে চড় মারলো না, বরং দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। তারপর প্রায় কোলে করে আমাকে গেস্টরুম থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলো ড্রেসিংরুমে। সেখানে আমাদের পরিবারের সবাই গাদাগাদি করে বসে ছিলো। আমরাও একপাশে বসে পড়লাম। গতরাতে বড়াপুই বাথরুমের দরজাটা লাগিয়ে দিয়েছিলো। আমাকে গেষ্টরুমে আটকিয়ে রেখে ভয় দেখাবার জন্য।

মনে হয় সেই গিল্টি ফিলিংস থেকেই ও আমার হাতটা ধরে থাকলো।

ড্রেসিংরুমের সাথেই লাগানো বাথরুম। আব্বা বাথরুমে গিয়ে নিচতলার চাচার সাথে কথা বলছিলেন, বাথরুমের পানি পড়ার পাইপের কাছে মুখ নিয়ে। এভাবে কথা বল্লে নিচ থেকে শোনা যেত। চাচা আমাদের নিচে চলে যেতে বলছিলেন। কিন্তু এতো গোলা-গুলি আর শব্দ হচ্ছিলো যে, বাইরে দূরে থাকুক এই ঘরটা থেকে বের হতেই আমাদের সাহস হচ্ছিল না। তাই টর্নেডোর শেল্টারের মতো এই ড্রেসিংরুমটাতেই আমরা সবাই বসে ছিলাম। ঘরটা ছিলো বাসার একদম মাঝখানে। অন্তত একটা ঘর পার হয়ে এখানে আসতে হতো।

ভোরের দিকে, তখন গুলির শব্দ একটু কমে গেছে, কারা যেন আমাদের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলো। সেই শব্দ শুনে আমাদের কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেলো। বুয়া আর আম্মা জোরে জোরে কলেমা পড়তে শুরু করলেন। ওদের দেখা দেখি আমরাও। আব্বা যাবেন দরজা খুলতে, আম্মা কিছুতেই দেবেন না তাঁকে যেতে। অবশেষে আব্বা একরকম জোর করেই আমাদের কাজের ছেলে হালিমকে নিয়ে দরজা খুলে দেখতে গেলেন কী ব্যাপার? কিছুক্ষণ পর বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে আব্বা ফিরে এলেন। এসে সব জানালেন:

আমাদের পাড়ায় তখন আমাদেরটা সহ ছয়-সাতটা দোতলা বাড়ি, আর মাত্র দু’টো তিনতলা বাড়ি ছিলো। মধ্যরাতের পর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তানি আর্মিরা যখন আঘাত হানে, তখন পুলিশ লাইন থেকে প্রথম দিকে তাঁদের সীমিত ক্ষমতা নিয়ে যতটা সম্ভব প্রাণপণ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। কিন্তু এক পর্যায়ে পাকিস্তানি আর্মিদের প্রচণ্ড আক্রমনের বিপক্ষে টিকতে না পেরে তারা আত্মসমর্পণ করে, রাইফেল ফেলে দেয়। কিন্তু পাক আর্মিরা তাদেরকে রেহা‌ই দেয় না। ট্যাঙ্কের গোলা আর মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁজরা করে দেয়। কিছু পুলিশ সেখান থেকে জান নিয়ে পিছু হটে পালিয়ে আসতে পেরেছিলো, তারাই আশেপাশের পাড়ার উচু বাড়িগুলোর ছাদে আশ্রয় নিয়ে বাকি রাতটুকু যুদ্ধ করেছিলো। পাকিস্তানি আর্মিরা মনে হয় তাদেরকে প্রতিহত করার জন্যই শহীদবাগ, মোমিনবাগসহ আশে-পাশের পাড়ার দিকে তাক করে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার ও ট্যাঙ্কের শেল ছুড়েছিলো। যার একটা এসে লেগেছিলো আমাদের পানির ট্যাঙ্কে।

আমাদের ছাদে যারা ছিলো, তারা ভোরের আলো ফুটে ওঠবার সাথে সাথে ছাদ থেকে নেমে এসে দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করে। ওরা বুদ্ধি করে পতাকাটা খুলে নিয়ে এসেছিলো। আব্বা, বুয়া আর কাজের মেয়ে রেহেনাকে নিয়ে গেলেন ওদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য, আর আম্মাকে বললেন তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে - এ বাসা থেকে সরে যেতে হবে, এক্ষুনি! পুলিশ লাইনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন আমাদের পাড়ায় আসবে ওরা। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের প্রধান প্রবেশদ্বারের ডান পাশে ছিলো পুলিশদের থাকার ব্যারাক। লম্বা লম্বা একসারি ঘর, ওপরে টিনের চাল আর চারিদিকে বেড়া দিয়ে তৈরি। ২৬শে মার্চের খুব সকালে সেগুলিতেই পাক আর্মিরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো।

বুয়া উঠে যেতেই আমি জোর করে বড়াপুর হাত ছাড়িয়ে বুয়ার পিছু পিছু ছুট লাগালাম। ছাদ থেকে সিঁড়িটা নেমে এসে দো’তলার ল্যান্ডিংটায় যেখানে মিশেছে, সেখানে দুইজন পুলিশ দাঁড়িয়ে, আর একজন পুলিশ মাটিতে বসে ছিলো। দাঁড়ালো দু’জনের একজন শুকনা, লম্বা, সারা গায়ে ময়লা, মনে হচ্ছিলো ধুলো দিয়ে গোসল করে এসেছে। সে তার বন্দুকটা লাঠির মতো করে ধরে সেটার সাথে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। দ্বিতীয়জনের খালি পা, গালের একপাশ থেকে রক্ত পড়ছিলো, জানি না কেন জানি সে থরথর করে কাঁপছিল। হয়তো শীতে। ওদের কোন শীতের কাপড় ছিলো না। শুধু পুলিশের ড্রেস। মাটিতে যে বসে ছিলো, তার চেহারাটা আমার ভালো মনে নেই, শুধু মনে আছে তার দাড়ি ছিলো। তাদেরকে রান্নাঘরের সাথে লাগানো স্টোর রুমের ভেতরে নিয়ে এসে বসানো হলো। খাওয়ার পর তাদেরকে আব্বার লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী দেওয়া হলো কাপড় বদলিয়ে নেবার জন্য। কাপড় বদলানো হলে হালিম তাদের পুলিশের ড্রেসগুলি নিয়ে গেলো কপিক্ষেতের কুয়োটাতে ফেলে দিতে। ওরা চলে গেলো ফজরের আজান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে।

আম্মা তার স্বভাবসুলভ নিয়মে ফোনে সবাইকে খবর দিতে গিয়ে দেখলেন, ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন। পানি তো আগেই ছিলো না।

কী আর গোছাবেন? কিছু কাপড়-চোপড়, গহনা, টাকা আর আমার ছোট বোন দু’টির খাবার। আমার ছোট বোন অস্টারমিল্ক খেতো, দশ পাউন্ডের এক একটা টিন। গুঁড়ো দুধগুলো একটা পলিথিনের প্যাকেটের ভেতর থাকতো। দেখলাম, আম্মা পলিথিনের প্যাকেটটা সরিয়ে তার গহনাগুলি প্রথমে রাখলেন, তার উপর দুধের প্যাকেটটা বসিয়ে দিলেন। সম্ভবত সকাল নয়টা-দশটার মধ্যেই আমরা পাড়া ছাড়লাম। পেছনে পড়ে রইলো আমাদের বাকি সর্বস্ব। আর কোনদিন এই পাড়ায়, এই বাড়িতে ফিরে আসতে পারবো কি না, কে জানে?।

তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইন জ্বলছে আর শহীদবাগ ছেয়ে গেছে কালো ধোঁয়ায়। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম সেই ধোঁয়ার মাঝে ডিএসপি চাচাদের বাসায় পতপত করে উড়ছে চাঁদ-তারা! কাল বিকেলেও ওখানে উড়ছিলো আমাদের লাল সূর্যটা, বুকে বাংলাদেশকে জড়িয়ে।


মন্তব্য

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

আমি ভাবছিলাম, পরের পর্ব কবে আসবে... এক নিঃশ্বাসে পড়া শেষ করলাম...
এর পরের পর্ব দ্রুত লিখুন প্লিজ, সম্ভব হলে একটানে লিখে রাখুন, পরে ভাগ ভাগ করে পোস্ট দেবেন...

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

হয় না রে আসলে! কত যে কাজ থাকে! তবু চেষ্টা করবো। হাসি

--------------------------------------------------------------------------------

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------

হিমু এর ছবি

ভাবী, খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি কিন্তু। পর্বগুলো আরেকটু বড় হলে ভালো হতো।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আমার কিছু কিছু টুকরো টুকরো ঘটনা খুব পরিষ্কার মনে আছে, পুরোটা নয়। পুরো ঘটনাটা আমি জানি, শুনেছি অজস্রবার পরিবারের সবার কাছে। সে সব যোগ করলে, পর্ব গুলি অনেক বড় হবে সন্দেহ নেই। আমি আসলে আমার দেখা টুকু শেয়ার করতে চাইছিলাম। জানা টুকু নয়। ঠিক আছে বড় করতে চেষ্টা করবো।

--------------------------------------------------------------------------------

রু (অতিথি) এর ছবি

একটা বালিকার চোখ দিয়ে কালরাত্রিকে আগে কখনো দেখা হয়নি। আপনার সিরিজটার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আরও জলদি লিখুন, আরও বড় করে।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

পড়বার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।

--------------------------------------------------------------------------------

সাফি এর ছবি

ডি এস পি এর কি সরকারী বাসা? পারলে তার নাম প্রকাশ করুন। লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়ছি, পরের পর্ব আসুক তাড়াতাড়ি

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

বেশ বিরাট হলুদ রঙের এল প্যাটার্নের দো'তলা বাড়ীটা ছিলো তার নিজের । চাচার ছেলে-মেয়েদের সবার নাম মনে আছে, অথচ তার নাম মনে নেই। মনে হয় আমাদের সময় নাম ধরে চাচা ডাকবার রেওয়াজ ছিলো না তো তাই!

--------------------------------------------------------------------------------

সচল জাহিদ এর ছবি

পড়ছি ।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------

তিথীডোর এর ছবি

পরের পর্ব তাড়াতাড়ি আসুক...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

কত তাড়াতাড়ি? হাসি

--------------------------------------------------------------------------------

নীড় সন্ধানী এর ছবি

সবগুলো পর্ব একসাথ করে জোড়া দিয়ে একটা ইবুক করে ফেলা যায়।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

আমার লেখা ইবুক! পাগল না মাথাখারাপ?

--------------------------------------------------------------------------------

রানা মেহের এর ছবি

খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ছি

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

মেহবুবা জুবায়ের এর ছবি

জেনে ভালো লাগলো রানা, ধন্যবাদ।

--------------------------------------------------------------------------------

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

প্রথম পর্ব থেকেই আছি। এই সিরিজ শেষ করাটা দরকার।

Akram এর ছবি

সুন্দর ও সাবলীল লেখা।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

প্রিয় একটা সিরিজ
ইবুক না, আস্ত বই-ই হতে হবে এটাকে
আপনি লিখুন... কোনো কিছুই বাদ দিবেন না, যা যা মনে আছে সব লিখে রাখুন। যতটুকু শুনেছেন তাও লিখে রাখুন। অনুরোধ
পর্ব যতো খুশি বড় হোক, এগুলো নিয়ে ভাববেন না

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

সাফি এর ছবি

সহমত

কৌস্তুভ এর ছবি

নিয়মিত মন্তব্য করা না হলেও নিয়মিতই পড়ছি কিন্তু!

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

চলুক এই ইতিহাস নির্মাণ।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

পাগল মন এর ছবি

এরকম ঘরোয়া বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে বেশ ভালো লাগছে।
পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

সুমিত রহমান এর ছবি

যথারীতি সাবলীল এবং সুন্দর উপস্থাপনা... উপরের মন্তব্যের সাথে সহমত, অজস্রবার শোনা কথাগুলিও লিখে ফেলতে পারেন...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।