এন্টি গল্প > পেটকাটি চাঁদিয়াল > ০৪

মনজুরাউল এর ছবি
লিখেছেন মনজুরাউল (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৪/০৮/২০০৮ - ১১:৩২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বহুকাল আগে নাজিম হিকমত বলেছিল-'বিংশশতাব্দীতে শোকের আয়ূ বড়জোর দু'মাস!'একবিংশ’র গোড়ায় মাত্র মিনিটখানেক। পিতা-মাতার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকে মোবাইল রিসিভ করতে হয়! তার বাদে মোবাইলের পেছনে কাঠিকরার মত জ্যাক ঢোকাতে হয়। শোকপালনের ফুরসত্ও নেই মানুষের। বিজ্ঞানীরা বলেছিল-বিজ্ঞানের চরম উত্কর্ষতা মানুষকে চরম বস্তুবাদী করবে-।ভুল। মানুষ এখনো কূপমন্ডুক। বাড়ি থেকে বেরুবার আগে বাধা পেলে দাঁড়িয়ে যায়। শরীরবিদ্যার কারিগররা কড়েবর্গার মত শরীরের পার্টস- পুর্টস লাগাচ্ছে,কলজে পাল্টে দিচ্ছে,জিনের গতি-প্রকৃতি আয়ত্বে এনেছে-তার পরও এক চিলতে ক্ষুদে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু,এবং মুত্যু। রতিকর্মে এক মানুষে সাড়ে ছ’শো কোটি মানুষের পয়দা,অথচ সেই কাজ একটু গোলমেলে ভাবে করলেই এইডস! তড়পে তড়পে মরা !
না, এতসব বিটকেলে চিন্তা ঘনার ঘিলুতে আঁটবে না। আঁটেওনি।

ঠিক এই মুহূর্তে ঘনার সামনে মুর্তিমান বিপদ। ঘনার সাদামাটা ঘিলু বলছে-খিঁচে দৌড় দিতে। ঘনা জানে ওর সামনে দাঁড়ানো মালটার এক হাত নেই,সোজা হয়ে দৌড়ুতে পারে না। তাতেকি?ঘনা দৌড় দিলেই কনফার্ম জানে, ফুটো করে দেবে,দেবেই। নাটা কুদ্দুস ঘোড়া নিয়ে ঘোরে। শালার হাতের টিপও তেমন। বলবে –'ঘনা,তোর এ কানে ঢুকাব অন্য কানে বেরোবে...'
তাই বেরোবে। ভুলেও চোখে লাগবে না। নাটা কুদ্দুসও একসময় ঘনাদের লাইনের মাল ছিল। মাসকাবারি শশুরবাড়ি ঢুকত আর বেরোতো।একবার ধরা পড়ার পর রোয়াব দেখাতে গেছিল,মামারা চিমটি দিয়ে একটা চোখ তুলে নিয়েছিল। বাঁশকলে ফেলে একটা হাত খেজাব করে দিয়েছিল। পরে অর্ধেকটা কেটে ফেলতে হয়েছে। সে থেকে নাটা খোচরের ওয়াচার। হেভভি ক্ষমতা নাটার। খোচোরের হয়ে হপ্তা ওঠায়,ওপরে মাগী সাপ্লাই দেয়,আর নেতা-ফেতারা ভাষণ দেয়ার সময় ভোদাইয়ের মত মাঠে বসে থাকে। বড় দারোগা একটা ঘোড়া দিয়েছে,ছ'টা গুলি ভরা থাকে সবসময়।সেই নাটা এই মুহূর্তে ঘনার সামনে! পুরো ব্যাপারটা ঘনার মাথায় ঢুকে মগজে খেলাকরে সিদ্ধান্ত হতে সময় নিল মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড! ঘনার মাথা থেকে পালানোর চিন্তা হাওয়া। দু’পাটি দাঁত কেলিয়ে ঘনাই আগে শুরু করল-
_সেলাম গুরু,ভালো? কি মুনে কোরে এত্তো দিন বাদমে...
_চোপ শালা মারানীর পুত,গতরে হাওয়া লাগাইয়া ঘুরতাছ,বাজানরে আর মুনে নেই না?
_কি যে বুলেন না গুরু, স্লা ঘোনা হারামি হোবে ঠিক,কিন্তুক বেঈমান লয়।
_হপ্তা কই? কয় মাস দেছ না?ছইন্যা হালায় মরার পর কি দিছস?
_না গুরু,ছনিয়ার মা কে তো টাকা দিতে হোয়..
_চোপ শালা খঁটমলের পো ।
নাটা আগে ঘনাকে বিহারির বাচ্চা,পচ্চিয়ার বাচ্চা গালি দিত। একদিন এক হিন্দি ফিলিমে দেখল কে এক নানা পাটেকর নানা বাল পাটেকর ডায়লগ দিচ্ছে_'এক স্লা মচ্ছর আদমীকো হিজড়া বনা দেতা/এক স্লা খটমল রাত কো আপাইশ বনা দেতা.....' ব্যাস নাটার মনে ধরে গেল।সেই থেকে ঘনা খটমল।অন্য সব গালি কান দিয়ে ঢুকে পোঁদ দিয়ে বের হলেও ঘনা কিছু মনে করে না, কিন্তু খটমল শুনলেই মাথায় আগুন ধরে যায়---
_দেখো গুরু,আর যা বোলো,বোলো, কিন্তুক খোটমোল বলবে না----কথাটা শেষ হবার আহেই প্রচন্ড এক থ্প্পড় খেয়ে ঘনা পড়ে গেল। ভোজবাজির মত চারপাঁচ ঘনা-ছেনো হাজির হয়ে ঘনাকে টেনে তুলল। ঘনার চোয়ালের হাঁড় শক্ত হলো আবার স্বাভাবিক হলো।

নাটাখেল শেষ হবার পরে ঘনাকে স্যাঙাতরা দোকানে নিয়ে বসাল। একসাথে চার-পাঁচজনে মিলে বগরবগর।ঘনার কানে ওসব ঢুকছে না। ঘনা ভাবছে_সে কি কি করতে পারত ?
ঘনা উল্টে থাপ্পড় দিলে নাটা গুলি করে দিত।
ঘনা লাত্থিমেরে দৌড় দিলে নাটা গুলি করে দিত।
ঘনা থুথু দিলেও নাটা গুলি করে দিত।
ঘনা 'নাটাবাঞ্চোত্' বললেও নাটা গুলি করে দিত।
নাটা যখন গুলি করে দিতই তখন কেন ঘনা নাটাকে ছেড়ে দিল সেজন্য নিজেকে ভয়ানক অশ্রাব্য একটা গালি দিল। স্যাঙাতরা জিজ্ঞেস করল_ কিছু বললে গুরু?_না,ওঠ। ঘনার নির্লিপ্ত উত্তর।

মানুষ মানুষকে ভয়ানক এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।যেখানে কেউ কাউকে আর বিশ্বাস করে না। সে নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করে না। কর্পোরেট ধান্ধাবাজরা এমন এক ধান্ধা বের করেছে যে তোমার সামনে দু’টো পথ। হয় সাঁতার দিয়ে পার হও অথবা ডুবে মর। কাব্য-কাহিনী,অন্তর- যামিনী,ল্যালচা ঢেমনি, যেই হও না কেন তুমি স্বাধীন নও। তুমি রাজা,তুমি প্রজা, তুমি সিংহাসন,তুমি মোল্লাপুরুত,তুমি মহাজন,তুমি ফকির,তুমি বাল,তুমি ছাল-যেই হও না কেন তুমি তোমার নও। হয় তুমি কর্পোরেট দালাল। নয়তো দালাল হওয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছ। একটু পরেই তুমি দালাল। দালালিতে যুক্তি -দালালিতে মুক্তি।

ঠিক এরকমই এক নয়ামুক্তি খুঁজে নিতে চেয়ে হাশমি ডবকার পেছনে লোল ফেলছে। আর কোহিনূর রোজ রাতে সেই লোলচর্ম ঘসে ঘসে সাফসুতোর করছে। আরো এক মুক্তি খুঁজে নিতে চেয়েছিল ছেনোর মা। ঘনা যায়নি অনেক দিন, নিজেরও করে-কম্মে খাওয়ার শক্তি নেই তাই ট্রেনের তলে ঝাঁপ দিতে চেয়েছিল। হৃদয়হীন কিছু চোরছ্যাচ্চোড় গোছের মানুষ তাকে টান মেরে
বাঁচায়। ঘনা সব খবর পায় না।

ছেনো,চুমকি,মালঝাড়া,কোহিনূর,তুলি সবকিছু ছাঁপিয়ে ঘনার শিরার মধ্যে নাটা ঢুকে গেছে। নাটা। নাটা কুদ্দুস।ঘনা চোয়াল শক্ত করে বিড় বিড় করে_নাটাকে কেলাবোই কেলাবো। আমার নাম ঘোনা। ঘোনসাম ঝুনঝুনওলা। নিজের নাম আর হিকমত নিয়ে যখন ঘনা মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়ে বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলি ছেড়ে দিল, ঠিক তার একটু আগে-পরে ঘনার বাপের কুন্ডলিমারা শরীরখাঁচা ছেড়ে প্রাণটা ছোট্ট ঝাঁকি দিয়ে উড়ে গেল-------------


মন্তব্য

কীর্তিনাশা এর ছবি

মুগ্ধ পাঠকের সালাম নিন।
-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

মনজুরাউল এর ছবি

অবনত মস্তকে নিলাম।

.......................................................................................
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

.......................................................................................
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

ফাহিম এর ছবি

গল্পে শীর্ষেন্দু-ভাব প্রবল। তারপরেও অত্যন্ত স্বতন্ত্র এবং খুবই সুখপাঠ্য।

পাংখা হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। একজন শক্তিশালী গদ্যলেখক\ঔপন্যাসিক হিসাবে আপনার উত্থানের যথেষ্ঠ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। চালিয়ে যান দয়া করে।

মনজুরাউল এর ছবি

শীর্ষেন্দু-ভাব সম্ভবত কাকতালীয় । শীর্ষেন্দু পড়া হয়নি।
আপনার মন্তব্যর জন্য ধন্যবাদ ।

.......................................................................................
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

.......................................................................................
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

দেবোত্তম দাশ এর ছবি

আমি আপনার লেখার একজন মুগ্ধ পাঠক মাত্র, কিছুই বলার নেই । বললে কিছুই বলা হবে না তাই "স্পিকটি নট"

------------------------------------------------------
স্বপ্নকে জিইয়ে রেখেছি বলেই আজো বেঁচে আছি

------------------------------------------------------
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন’রা কি কখনো ফিরে আসে !

মনজুরাউল এর ছবি

কি আর করা ! আমিও " স্পিকটি নট "।

.......................................................................................
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

.......................................................................................
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

ঝরাপাতা এর ছবি

দুর্দান্ত...


যে রাতে গুঁজেছো চুলে বেগুনি রিবন বাঁধা ভাট,
সে রাতে নরকও ছিলো প্রেমের তল্লাট।
. . . . . . . . . . . . . . . . . . (আবু হাসান শাহরিয়ার)


বিকিয়ে যাওয়া মানুষ তুমি, আসল মানুষ চিনে নাও
আসল মানুষ ধরবে সে হাত, যদি হাত বাড়িয়ে দাও।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।