'আবার তোরা মানুষ হ' কোন ধরনের চলচ্চিত্র?

নাদির জুনাইদ এর ছবি
লিখেছেন নাদির জুনাইদ (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৯/১০/২০১৭ - ১:০১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অভিনেতা, গায়ক, গীতিকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক খান আতাউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের দুই বছর পর তৈরি করেছিলেন আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩)। ছবিটির বিষয়বস্তু আর বক্তব্য নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি আর আলোচনা হয়নি বললেই চলে। বিটিভি এবং অন্য কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে মাঝে মাঝে ছবিটি দেখানো হয়েছে। কিন্তু পুরনো সময়ের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছবির মতো এই ছবিটিও বাংলাদেশে ডিভিডি হিসেবে পাওয়া যায় না। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই ছবিটি দেখার এবং ছবিটির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ পাননি। সম্প্রতি, একটি মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খান আতাউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সেই সাথে আবার তোরা মানুষ হ ছবিটির নিন্দাও করা হয়েছে। খান আতাউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী মানসিকতা বহন করতেন নাকি করতেন না তা নিয়ে আলোচনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এই লেখাটি কেবল আবার তোরা মানুষ হ ছবিটির নির্মাণ-পটভূমি এবং বিষয়বস্তুর বিভিন্ন দিকের একটি বিশ্লেষণ যার মাধ্যমে ছবিটির বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবিটির নিন্দা করা কি যৌক্তিক নাকি ছবিটির বিভিন্ন দিকের প্রশংসা করা যায় তা এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

বাংলাদেশের প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র নিয়ে লেখা আমার একটি বই এবং বিডিনিউজ২৪-এ এই লেখাটি আগে ভিন্ন শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এই মুহুর্তে যেহেতু আবার তোরা মানুষ হ ছবিটি সম্পর্কে একটি প্রশ্ন অনেকের মনে তৈরি হয়েছে, এবং অনেকেই এই ছবিটি দেখেননি তাই পুরনো লেখাটি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে আবার প্রকাশ করা হলো।

আবার তোরা মানুষ হ মূলধারার ছবি হলেও এখানে সাম্প্রতিক সময়ের জরুরি সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে খোলাখুলিভাবে, রূপকের সাহায্য ছাড়াই। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক এমনকি বিকল্প ধারার ছবিতেও বর্তমান সময়ের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা খুব কমই করা হয়েছে। ফলে আবার তোরা মানুষ হ বাংলাদেশের অন্য অনেক চলচ্চিত্র থেকেই আলাদা। অভিনব এবং নতুন নির্মাণশৈলীর ব্যবহার এই ছবিতে না থাকলেও গতানুগতিক মূলধারার ছবিতে যেভাবে বাণিজ্যিক লাভের জন্য চটক আর চাকচিক্য ব্যবহার করা হয়, তেমন উপাদান এই ছবিতে অনুপস্থিত। দর্শককে বিনোদন প্রদান নয়, বরং সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমালোচনা করাই ছবিটির মূল উদ্দেশ্য তা বোঝা যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র দুই বছর পরই সমাজে কিভাবে দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে, কিছু মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কোনোভাবেই ধারণ করে না তারা কিভাবে বিত্তশালী হয়ে উঠছে আর দেশপ্রেমিক, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন সমাজে কতোটা হতাশাগ্রস্ত এবং টাকার জোরে ক্ষমতাবান হওয়া মানুষদের দ্বারা নিগৃহীত এবং অবহেলিত সেই অশুভ দিকগুলোই ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে।

সাত জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা যারা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে ছিলো বঙ্গবাণী নামে একটি কলেজের ছাত্র মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে তাদের পরিবর্তিত জীবনের নানা দিক নিয়েই ছবির কাহিনি। যুদ্ধের পর এই তরুণদের হাতে আছে আধুনিক মারণাস্ত্র। কিন্তু তারা তাদের আদর্শবাদিতা বিসর্জন দেয়নি। অন্যায়ভাবে অস্ত্র ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার পরিবর্তে তারা যেখানেই অন্যায় আর দুর্নীতি দেখে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। বলা যায় যে স্বাধীন দেশেও যেন এই তরুণদের যুদ্ধ শেষ হয়নি। বঙ্গবাণী কলেজের প্রিন্সিপাল একজন অত্যন্ত আদর্শবাদী মানুষ। বিদগ্ধ, নীতিবান এই শিক্ষককে তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা গভীরভাবে ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে। সাত মুক্তিযোদ্ধার নামও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাদের নাম: হিরা, চুনি, সোনা, রতন, পান্না, কাঞ্চন আর মাণিক। ছবির শুরুতেই পর্দায় ভেসে ওঠে একটি লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পুড়ে যারা সোনা হয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।’ এরপরই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় একটি ভাস্কর্যের ছবির উপর ধীরে ধীরে ছবির সাথে যুক্ত শিল্পী আর অন্যান্যদের নাম ভেসে উঠতে থাকে। পরিচালক খান আতাউর রহমান নিজেই অভিনয় করেছেন কলেজের আদর্শবাদী অধ্যক্ষের চরিত্রে। মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, ফারুক, আল মনসুরের মতো প্রখ্যাত অভিনেতারা যারা বাস্তব জীবনেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ আর আদর্শবাদিতা ছবিতে তুলে ধরা হয় গুরুত্বের সাথে। আর তীব্র সমালোচনা করা হয় স্বাধীন দেশে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর মূল্যবোধের অবমাননা করছে সেই গোষ্ঠীটির।

আবার তোরা মানুষ হ নির্মাণের সময় বিদ্যমান সামাজিক সমস্যা:

এই ছবিতে সাম্প্রতিক বাস্তবতার বিবরণ কতোটা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা বিশ্লেষণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অল্প সময় পর আমাদের সমাজে দেখতে পাওয়া কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করার পর তাদের প্রতিরোধের জন্য গড়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী বা মুক্তিফৌজ। মুক্তিবাহিনীতে যেমন সামরিক বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী এবং পুলিশের বাঙালি সদস্যরা ছিলেন তেমনি ছিলেন সারা দেশের বহু বেসামরিক মানুষ যাদের যুদ্ধ করার কোনো প্রশিক্ষণ ছিলো না। এই মানুষদের মধ্যে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা ছিলেন, তেমনি ছিলেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুররাও। মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য এই বেসামরিক মানুষরা কয়েক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিবাহিনীর এই হাজার হাজার বেসামরিক যোদ্ধারা পরিচিত ছিলেন ‘গণবাহিনী’ নামে। অর্থাৎ মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছিলো সশস্ত্রবাহিনীর কিছু নিয়মিত বাঙালি সদস্য এবং গণবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের সাথে গণবাহিনীর অল্প-প্রশিক্ষিত সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সাথে যুদ্ধ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় গণবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে। যারা দেশের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছে সেই দেশপ্রেমিক, সাহসী, নীতিবান মানুষদের মাধ্যমেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার কাজ সবচেয়ে সফলভাবে করা সম্ভব এই চিন্তা থেকেই জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় দেখতে পাওয়া জনবিচ্ছিন্ন আইনরক্ষাকারী বাহিনী থেকে এই মিলিশিয়া বাহিনীর মানসিকতা হবে সম্পূর্ণ আলাদা। এই বাহিনী সাধারণ জনগণ থেকে দূরে বিচ্ছিন্নভাবে থাকবে না, বরং সাধারণ মানুষের সাথে এক হয়ে দেশ গঠনের জন্য কাজ করবে। আর বলা বাহুল্য, ক্ষমতা দখল করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কেবল নিজেরা ভোগ করে সাধারণ মানুষের প্রভু হয়ে ওঠার চেষ্টা তারা করবে না। ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী বিখ্যাত চিন্তাবিদ ফ্র্যান্ত্জ ফাঁনো ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর কোনো দেশে আদর্শ শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এমন একটি গণ মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন। ফাঁনোর মতে এই বাহিনী কেবল যুদ্ধবিদ্যা শেখার মধ্যে নিজেদের সীমিত রাখবে না, তারা অর্জন করবে নাগরিক গুণাবলী এবং রাজনৈতিক জ্ঞান। এই বাহিনীর সদস্যরা সামাজিক কাজেও শ্রম দেবেন এবং দেশের উন্নয়নের প্রতিনিধি হিসেবে অবদান রাখবেন (হ্যানসেন, পৃ. ১৯৬)।

কিন্তু গণবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে জাতীয় মিলিশিয়া গঠন করার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কয়েকটি বৈঠক হওয়ার পর হঠাৎই এই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। কেন তা বাতিল করা হয় সেই প্রসঙ্গে সরকারিভাবে কোনো সুস্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। গণবাহিনীর সদস্যদের এক মাসের বেতন হিসেবে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে তাদের চলে যেতে বলা হয়। তাদের নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা সেই ব্যাপারেও সরকারিভাবে কিছু বলা হয় না (কাইয়ুম খান, পৃ. ১৯৪)। মুক্তিফৌজে থাকা সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের নিজ বাহিনীতে থেকে যাওয়ার সুযোগ ছিলো। বেসামরিক যোদ্ধাদের মধ্যে অবস্থাপন্নরাও নিজেদের পরিবারে বা কাজে ফিরে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু সমস্যার সম্মুখীন হন গণবাহিনীতে যোগ দেয়া বহুসংখ্যক দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী মানুষরা। দেশকে স্বাধীন করার জন্য অসামান্য আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাঁরা নয় মাস যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের পর অনেকেই দেখেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বেঁচে নেই, বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, করার মতো কোনো কাজ নেই। সাধারণ এই মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রও জমা দিয়ে দিয়েছিলেন সরকারের কাছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা দেশ স্বাধীন করলেন, কিন্তু স্বাধীন দেশে তাঁদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়লো।

পাশাপাশি দেখা গেল যারা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করেছে সেই এদেশীয় দালালদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন দেশে ঠিকই চাকরিতে টিকে আছে। পুলিশসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমন অনেক লোক কাজ করতে থাকেন যারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার প্রতি এদের কোনো শ্রদ্ধা ছিলো না। কিন্তু এদের চাকুরিচ্যুত করা হয়নি। এম আর আখতার মুকুল এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায় না যে একটি দীর্ঘ, রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে পুরনো শাসনের প্রতি অনুগত আমলা আর সামরিক অফিসারদের সম্মানের সাথে চাকরিতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে আর দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের দূরে সরে যেতে হয়েছে” (ঐ, পৃ. ২০৭)। মুক্তিযুদ্ধের সাত নম্বর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নূরউজ্জামান উল্লেখ করেছেন, “দালাল হিসেবে যারা জেলে ছিলো তারা সবাই ছিলো নিজ নিজ এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। প্রশাসনিক কাঠামোর বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করায় দালালদের প্রভাব স্বাধীনতার পরও কমেনি। এই প্রভাবের বলে তারা ছাড়া পাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে লাগে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য” (কাজী নূরউজ্জামান, পৃ. ৩৩৩)।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত একজন অফিসার ছিলেন আবদুল কাইয়ুম খান যিনিও সাত নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। কাইয়ুম খান বর্ণনা করেছেন যখন তাদের সেক্টরের গণবাহিনীর সদস্যদের জানানো হয় যে তাদের আর প্রয়োজন নেই, তারা পঞ্চাশ টাকা মাসিক বেতন নিয়ে চলে যেতে পারে তখন বিষণ্ণ এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সমবেত মুক্তিযোদ্ধারা নানা প্রশ্ন এবং ক্ষোভপ্রকাশ করতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা মন্তব্য করেন যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে পরিত্যাগ করা কতোটা গ্রহণযোগ্য? আর একজন মুক্তিযোদ্ধা মন্তব্য করেন চারদিকে সক্রিয় এবং প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তৎপর শত্রুদের সামনে তাদের অসহায় অবস্থায় ঠেলে দেয়া হলো (কাইয়ুম খান, পৃ. ১৯৪)। কাইয়ুম খান আরো বর্ণনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে সৈয়দপুর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন তখন মাঝে মাঝে সাত নম্বর সেক্টরের গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধদিনের সঙ্গী সেনা অফিসারদের সাথে দেখা করতে আসতেন। এই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই তখন ফেরারি কারণ পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে দেয়া মিথ্যা অস্ত্র মামলায় তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। কখনো এই মামলা দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা, এমনকি কখনো পাকিস্তানিদের পক্ষে কাজ করা শান্তি কমিটির প্রাক্তন সদস্যরাও। পুলিশের অনেক সদস্যও মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে নয় মাস পাকিস্তানিদের পক্ষেই কাজ করেছিল। ফলে এই পুলিশরাও পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেই কাজ করেছে (কাইয়ুম খান, পৃ. ২১৯-২২০)।

সরকার মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট প্রদানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু শুরু থেকেই দেখা যায় যারা মুক্তিযুদ্ধ করেনি এমন অনেকেই বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে যাচ্ছে (কাইয়ুম খান, পৃ. ১৯৬; কাজী নূরউজ্জামান, পৃ. ৩৩৭)। মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী এই প্রসঙ্গে লিখেছেন: “যাচাই না করে ঢালাওভাবে মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র দেওয়া হয় দেশের লোক থেকে শুরু করে ভারতে অবস্থানকারী শরণার্থী পর্যন্ত যুদ্ধে যাদের কোনো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ অবদান ছিল না। এমনকি সময়ে সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কর্মকর্তা করা হয় এমন সব ব্যক্তিকে যাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ কিংবা কোনো ভূমিকা ছিল না। এদেরকে শুধু রাজনৈতিক কারণে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো এবং তারা অবাধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সনদপত্র বিতরণ করতেন” (চৌধুরী, পৃ. ৫১-৫২)।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরই আরেকটি গোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের সমাজে লক্ষ্য করা যায়। এই গোষ্ঠীটিকে ষোড়শ বা সিক্সটিন ডিভিশন হিসেবে মানুষ আখ্যায়িত করে। পশ্চিম বাংলার সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকা এসেছিলেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। তিনি তার ডেটলাইন ঢাকা গ্রন্থে লিখেছেন: “বাংলাদেশে একটা কথা তখনই বেশ চালু হয়ে গিয়েছিল - ষোড়শ ডিভিশন। অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের পর যারা রাতারাতি মুক্তিবাহিনী সেজে যায়। হাতে রাইফেল নিয়ে, মাথায় হেলমেট পরে হাইজ্যাক করা গাড়িতে চড়ে শহর কাঁপাতে কাঁপাতে এরা সাধারণ মানুষের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করে। সংগ্রামের দিনগুলিতে এদের টিকি দেখা যায়নি” (চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ১৩৮)। ১৬ ডিসেম্বরের পর অনেক পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের এদেশীয় দোসর আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্র ফেলে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যায়। সুযোগসন্ধানী দুশ্চরিত্রের অনেকে তখন সেই সব অস্ত্র কুড়িয়ে নিয়ে রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসে। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল দুষ্কৃতকারী যারা অস্ত্র নিয়ে ১৭ ডিসেম্বরই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় লুটপাট শুরু করে (চৌধুরী, পৃ. ১৮; ইসলাম, ২২৯-২৩০)। দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের নিয়ে তৎকালীন মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মুক্ত ঢাকায় প্রবেশ করেন। ১৭ ডিসেম্বর সকালে নয় মাস যুদ্ধ পরিচালনা করা অভিজ্ঞ এই সেনানায়ক দেখতে পান: “শহরে প্রচুর লোকসমাগম। তাদের অনেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং গাড়ি করে ও পায়ে হেঁটে শহরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের দেখে মনে হয়নি গত ৯ মাসে কখনও তারা বৃষ্টিতে ভিজেছে বা রোদে ঘেমেছে। তাদের বেশভূষা, চালচলন ও আচরণে যুদ্ধের কোনো ছাপ ছিল না” (চৌধুরী, পৃ. ১৭-১৮)।

২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি ব্যাটালিয়ন ১১ ইস্ট বেঙ্গলের একটি সেনাদল নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করা বাঙালি সেনা অফিসার তৎকালীন লেফটেনান্ট নাসির উদ্দিনও ঢাকায় বহু তরুণের হাতে অস্ত্র দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন: “চারদিকে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক আনাগোনা দেখা গেলো। মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিশাল সমাগম দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। কোথা থেকে এলো মুক্তিযোদ্ধাদের এই ঢল। কোথায় ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিশাল বাহিনী। এতো সংখ্যার মুক্তিযোদ্ধা তাহলে কেন পারলো না প্রতিরোধ যুদ্ধকে আরো তীব্রতর করতে গত ন’মাসে” (নাসির উদ্দিন, পৃ. ২২)। ১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকার পথে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ানো সব তরুণই যে মুক্তিযোদ্ধা না তা নয় মাস যুদ্ধ করা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝতে সমস্যা হয়নি। লেফটেনান্ট কাইয়ুম খান ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় এসে তার বন্ধু দুই নম্বর সেক্টরের গেরিলা যোদ্ধা এবং ঢাকায় বিভিন্ন সফল অপারেশন চালানো গেরিলা ইউনিট ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম সদস্য হাবিবুল আলমের কাছ থেকে জানতে পারেন পাকিস্তানি সৈন্য এবং রাজাকারদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র কুড়িয়ে নিয়ে ঢাকার প্রায় প্রতিটি পাড়াতেই মুক্তিযোদ্ধা সাজা লোকজন দেখা যাচ্ছে এবং এই দুশ্চরিত্রের লোকরা বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তাদের অন্যায় আচরণ আর লুটতরাজের জন্য মুক্তিবাহিনীর সুনাম নষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। হাবিবুল আলম আরো জানান ঢাকায় অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ানো বেশির ভাগ তরুণই হলো ‘১৬ ডিভিশন’-এর অসাধু লোক। আর ঢাকায় উপস্থিত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা খুবই কম (কাইয়ুম খান, পৃ. ১৮১)।

কাইয়ুম খান উল্লেখ করেছেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী প্রায় এক লক্ষ যোদ্ধার শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়। এদের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করা বাঙালি নিয়মিত সেনাসদস্যদের সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ হাজার। সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর সদস্য ছিল সাত থেকে আট হাজার। আর বাকী বিশালসংখ্যক যোদ্ধা ছিলেন বেসামরিক মানুষ যারা মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দেয়। এদের মধ্যেও অধিকাংশ ছিলেন গ্রামের দরিদ্র, সাধারণ মানুষ। একদিকে তারা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ করেছে, অন্যদিকে তারা যুদ্ধে যাওয়ার কারণে তাদের বাড়িঘর স্বাধীনতাবিরোধীরা জ্বালিয়ে দিয়েছে, অত্যাচার করেছে তাদের পরিবারের সদস্যদের উপর। কাইয়ুম খানের মতে, এই সাধারণ মানুষরাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আসল নায়ক। তারা আত্মত্যাগ করেছে, মুক্তিযুদ্ধ করেছে কোনো পুরস্কারের আশা ছাড়াই। তাদের কেবল একটিই আশা ছিল তা হলো দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা (ঐ, পৃ. ১৭৭-১৭৮)। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা সমাজে যথাযথ মর্যাদা আর ভালোবাসা পাননি। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধার জন্য দুঃখজনক এবং হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল বিভিন্ন ব্যক্তির বর্ণনা এই তথ্য তুলে ধরে।

বর্তমান সময়ের মুখোমুখি হওয়া এবং সামাজিক সমালোচনা:

আবার তোরা মানুষ হ যখন নির্মাণ করা হয়েছে সেই সময় যে দিকগুলো হতাশা এবং বিপদ সৃষ্টি করছিলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, পরিচালক তাঁর ছবিতে সেই সমস্যাগুলির মুখোমুখি হয়েছেন। কারা এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী ছবিতে সেই প্রশ্ন করা হয়েছে, এবং পরিচালক অঙ্গুলিনির্দেশও করেছেন দোষী ব্যক্তিদের প্রতি। ছবির প্রথম কয়েকটি দৃশ্যে দেখা যায় তিনজন মুক্তিযোদ্ধা সোনা, হিরা আর কাঞ্চন আলাদাভাবে যথাক্রমে একটি ঔষধের দোকান, একটি রেশনের দোকান আর কেরোসিনের দোকানে যেয়ে দেখতে পায় দোকানমালিকরা সাধারণ মানুষদের ঔষধ, চাল আর কেরোসিন দিচ্ছে না। সারা পাড়ায় কাউকে কেরোসিন না দিয়ে ড্রামে করে কেরোসিন পাচার করা হচ্ছে, ঔষধ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে ক্যাশ মেমো পাওয়া যাবে না, আর দোকানে চাল লুকিয়ে রেখে অপেক্ষারত মানুষকে বলা হচ্ছে চাল নেই। অনেক আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীন করা এই স্বপ্নের দেশে কিছু দুর্নীতিবাজ মানুষের এমন অন্যায় আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দেখে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যথিত আর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা তখনো অস্ত্র জমা দেয়নি। সোনা, হিরা আর কাঞ্চনের হাতে যেহেতু অস্ত্র তাই অসৎ লোকজন তাদের বিরুদ্ধে কিছু করার সাহস পায় না। ঐ দোকান মালিকদের হাতের অস্ত্র দিয়ে ইচ্ছামতো পেটায় সোনা, হিরা আর কাঞ্চন। আর সাধারণ মানুষদের বলে দোকান থেকে তাদের প্রয়োজন মতো ঔষধ, চাল নিয়ে নিতে। এর পরের দৃশ্যে দেখা যায় সাত জন মুক্তিযোদ্ধা একটি এলাকায় অনেক সাধারণ মানুষকে এক লাইনে দাড় করিয়ে তাদের প্রয়োজনমতো কেরোসিন দিচ্ছে। তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতো এখনো তারা সাধারণ মানুষের উপকার করছে। তারা প্রতিরোধ করছে দুশ্চরিত্রের আর অসৎ মানুষদের। এই মুক্তিযোদ্ধারা হাতের অস্ত্র দিয়ে লুটপাট করে নিজেরা বিত্তশালী হচ্ছে না।

আরেকটি দৃশ্যে মুক্তিযোদ্ধা মাণিকের প্রেমিকা নীলা যখন মাণিককে বলে তোমরা এভাবে ক’জন অসৎ লোককে ধরবে, ক’জনকে মারবে তখন মাণিকের উত্তরে ফুটে ওঠে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মাণিকের হতাশা: “সবই বুঝি, নীলা। বড় দুঃখে মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যাই। যখন যুদ্ধ করতাম, তখন ভাবতাম যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন বাংলার দিগন্ত থেকে দিগন্ত সোনার আলোয় ঝলমল করবে। মানুষ মানুষ হবে। কিন্তু কই, কী হলো।” মাণিক এবং তার সঙ্গী অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কারো কারো মা-বাবা, বাড়ি ঘরও আর নেই। এই মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার জায়গাও নেই। আবার কখনো বাড়িতেও তাদের জোটে গঞ্জনা। এই সমাজের মানুষ কিভাবে যুদ্ধ শেষ হতেই স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ভুলে গেল এই দৃশ্যগুলো তাই প্রকাশ করে। কিন্তু পরিচালক দেখান এই মুক্তিযোদ্ধারা অর্থ উপার্জনের জন্য নানা চাপ আর প্ররোচনা সত্বেও অসৎ পথে যেতে আগ্রহী নয়। কিন্তু নিজেরা ভাল থাকার পরও সমাজের মানুষ তাদের সেই ভাল মানসিকতাকে মূল্য দিচ্ছে না এই কারণে একদিন সোনাকে ক্ষুব্ধভাবে তার বন্ধুদের সামনে বলতে দেখা যায়: “ভাল কাকে বলে রে? এই যে আমি ভাল। আজ পর্যন্ত এই অস্ত্র দিয়ে একটা হারামের পয়সাও কামাই নি। কিন্তু আমার বাপ কী বলে জানিস? বলে আমি চাল নিয়ে আসি নি কেন। আমি পারি না লক্ষ মণ চালের পাহাড় তৈরি করতে? আমি করি না। আমি ভাল! তোর ভালোর নিকুচি করি।”

স্বাধীনতার পর দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছিলো অস্বাভাবিকভাবে। যুদ্ধের সময় চালের মণ ছিল চল্লিশ টাকার নিচে, কিন্তু পরের বছরই তা আশি টাকা হয়ে যায়। অবস্থা সামাল দেয়ার জন্য বিভিন্ন পণ্যের নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারিভাবে ডিলারশিপ দেয়া শুরু হলেও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এমন ডিলারশিপ নিয়ে তা উচ্চমূল্যে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা শুরু করে (আলতাফ পারভেজ, ১৭১-১৭২)। এই পরিস্থিতির বর্ণনাও উঠে আসে আবার তোরা মানুষ হ ছবিতে। এক দৃশ্যে দেখা যায় মাণিকের মা মাণিকের ছিঁড়ে যাওয়া একটি শার্ট সেলাই করে মাণিককে তা পরতে দিচ্ছে। মাণিককে সোনার মতোই বলতে শোনা যায়: “ভাল হয়ে লাভ কি মা? কে দাম দিচ্ছে ভাল হওয়ার। সেদিন বাজারে গেলাম তোমার জন্য একটা কাপড় কিনতে। পারলাম না। বারো টাকার কাপড়ের দাম চাইলো চল্লিশ টাকা। অথচ জানো মা, মানুষ লাইন দিয়ে পাঁচশো, হাজার টাকার শাড়ি কিনছে।” তখন মাণিকের মা চিন্তিতভাবে মন্তব্য করেন “তবে যে শুনি দেশ জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে গেছে, কারো ঘরে কিচ্ছু নাই। ওরা এতো টাকা পায় কোথায়? কারা ওরা?” মাণিকের মায়ের করা এই জরুরি প্রশ্নগুলো চলচ্চিত্রটিকে করে তোলে সমাজ-সচেতন যে ধরনের ছবিতে সমাজে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করার মাধ্যমে দর্শককে সচেতনভাবে তা নিয়ে চিন্তা করতে আগ্রহী করে তোলা হয়। পরিচালক প্রশ্নের উত্তরও দৃশ্যের মাধ্যমেই দিয়ে দেন। মাণিকের মায়ের প্রশ্নের পরই কাটের মাধ্যমে অন্য দৃশ্যে মিড শটে দেখা যায় বঙ্গবাণী কলেজের প্রিন্সিপালের ছেলে মিজানকে। আগের দৃশ্যেই আমরা দেখি মাণিক ছিঁড়ে যাওয়া শার্ট সেলাই করে পরছে। তার মুখ হতাশাগ্রস্ত। আর পরের দৃশ্যেই মিজানকে দেখা যায় দামী পোশাক পরা অবস্থায়। তার মুখে হাসি। সেই মুখে হতাশার কোন ছাপ নেই।

ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র বঙ্গবাণী কলেজের প্রিন্সিপাল অত্যন্ত আদর্শবাদী একজন মানুষ। কিন্তু তার ছেলে মিজানের কাছে আদর্শবাদিতা, লেখাপড়ার কোনো মূল্য নেই। নিজের পিতার আদর্শবাদী আচরণকে মিজান মনে করে সেকেলে আচরণ। মিজান বলে তার দরকার টাকা কারণ টাকা দিয়ে সব কিছুই কেনা যায়। নীলার বাবা আফাজউদ্দিন চৌধুরীও দুর্নীতিগ্রস্ত একজন ব্যবসায়ী। শহরের বিত্তশালীদের এলাকায় তার বিশাল বাড়ির ড্রইং রুমে বসে তিনি মিজানের সাথে বিভিন্ন অসাধু পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। চৌধুরী সাহেবকে মিজান দেখায় যে সে মুক্তিযোদ্ধার নকল সার্টিফিকেট এবং একটি অস্ত্রও যোগাড় করে ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধার নকল সার্টিফিকেট সে কি করে সংগ্রহ করলো জিজ্ঞেস করলে মিজান উত্তর দেয় ‘টাকা দিলে কী না হয়।’ সে আরো বলে টাকা নাকি এখন বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে, ধরতে পারলেই হলো। চৌধুরী সাহেবের ড্রইং রুম থেকে দৃশ্যটি কাট করে চলে যায় ঢাকার রাস্তায়। আমরা দেখি চুনি আর পান্না এই দুই মুক্তিযোদ্ধা ফুটপাথ ধরে হেঁটে আসছে। চুনি পান্নাকে বলে আমার কাছে আট আনা হবে, পান্না বলে বাকীটা আমার কাছে হবে। এরপর এই দুই যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা তাদের কাছে যে টাকা ছিল তা দিয়ে রাস্তার পাশে বসা এক সিগারেট বিক্রেতাকে এক প্যাকেট কমদামী স্টার সিগারেট দিতে বলে। ঠিক সেই সময় সিগারেট বিক্রেতার সামনে টাকা ছুঁড়ে দেয় আরেকটি লোক। আমরা শুনি তার কন্ঠ। সে চায় এক কার্টন দামী ফাইফ ফিফটি ফাইভ সিগারেট। মিড শটে দেখা যায় সিগারেট বিক্রেতার মুখ। সেই মুখে লক্ষ্য করা যায় ভীতি আর অপছন্দের একটি ভাব। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই সমাজে এখন এতো টাকা দিয়ে দামী সিগারেট যারা কিনতে পারে সেই মানুষদের চরিত্র সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের মনোভাব কেমন তাই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিগারেট বিক্রেতার মুখের অস্বস্তির সেই ছাপের মধ্য দিয়ে।

এবার লংশটে লোকটিকে, দুজন মুক্তিযোদ্ধা আর সিগারেট বিক্রেতাকে দেখা যায়। আমরা দেখি এক কার্টন দামি সিগারেট কিনতে চাওয়া লোকটি হিরা আর চুনির বয়সী এক তরুণ। কিন্তু যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা চুনি আর পান্নার পরনে কমদামি, মলিন পোশাক। আর এই তরুণটি পরে আছে নিখুঁত ছাটের দামি পোশাক, তার পায়ে চকচকে জুতো, চোখে দামি রোদ-চশমা। আর তার কাঁধে ঝুলছে একটি স্টেনগান। সিগারেট নিয়ে তরুণটি পাশে রাখা একটি বিশাল গাড়ি চালিয়ে চলে গেল। মুক্তিযোদ্ধা চুনি আর পান্না অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো তরুণটির দিকে। সিগারেট বিক্রেতা তখন চলে যাওয়া তরুণটিকে ইঙ্গিত করে ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার টানে বলে: “কি দ্যাখতাছেন স্যার? দেশ স্বাধীন হইছে তো অগো জন্যেই। আপনি আর আমি তো মশা আর মাছি। দ্যাখে ক্যাডা?” সাধারণ সিগারেট বিক্রেতার এই সংলাপটি হয়ে ওঠে বর্তমান সমাজের এক তীব্র, কঠোর সমালোচনা। দৃশ্যটি বোঝায় স্বাধীন সমাজেও টিকে আছে শ্রেণিকাঠামো এবং বিত্তশালীরাই যাবতীয় সুবিধা ভোগ করছে। স্বাধীনতা আনার জন্য সাধারণ মানুষ অপরিসীম কষ্ট আর আত্মত্যাগ করলেও স্বাধীনতার সুফল কি তারা পাচ্ছে? সমাজে প্রভাব, প্রতিপত্তি টিকে আছে সুবিধাভোগী শ্রেণির মানুষদেরই। স্টেনগান কাঁধে দামি সিগারেট কেনা তরুণটির জেল্লাদার এবং পরিপাটি বেশভূষা দেখে মনে পড়ে ১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকার পথে বহু অস্ত্রধারী তরুণ দেখে মেজর মইনের ভাবনা, “এদের দেখে মনে হয়নি গত ৯ মাসে কখনও তারা বৃষ্টিতে ভিজেছে বা রোদে ঘেমেছে। তাদের বেশভূষা, চালচলন ও আচরণে যুদ্ধের কোনো ছাপ ছিল না।”

মিজানের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে মনে হয় এই সমাজে টাকা বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা চুনি, পান্না, সোনা, মাণিকরা এখনো অস্ত্র হাতে রাখলেও তাদের পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই। এক প্যাকেট কমদামি সিগারেটও তাদের কারো একার পক্ষে কেনা সম্ভব হয় না। একটি দৃশ্যে যখন কলেজের প্রিন্সিপাল তার মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের বলে দেশের শান্তি-শৃক্সখলা রক্ষার ভার পুলিশ আর প্রশাসনের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে তারা যেন লেখাপড়ায় ফিরে আসে, তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা রাজি হয়। কিন্তু যখনই প্রিন্সিপাল বলেন অস্ত্রগুলো তার কাছে জমা দেয়ার জন্য, সঙ্গে সঙ্গে একটি মিড শটে চুনি আর রতনকে তাদের হাতের স্টেনগানগুলো চেপে ধরতে দেখা যায়। অস্ত্র জমা দেয়ার কথা শুনে তাদের মুখে ভয়ের ছাপ। কেন যুদ্ধের পরেও শান্তির সময়ে তারা অস্ত্র জমা দিতে ভয় পাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর বোঝানো হয় আরেকটি দৃশ্যের মাধ্যমে। রেডিওতে শোনা যায় একটি ঘোষণা যে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের আদেশ দেয়া হচ্ছে যে তারা যেন তাদের অস্ত্র নিজ এলাকার থানায় জমা দেয়। ঘোষণাটি শোনা মাত্রই মুক্তিযোদ্ধা রতন তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে এক ঝাঁক ফাঁকা গুলি করে। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ছুটে এসে থামায়। প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে রতন এরপর বলে, “অস্ত্র জমা দেবে! এতোই সোজা। দেশ যেন শান্তিতে হাওয়া খাচ্ছে।” এরপর সে তার সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা চুনিকে দেখিয়ে অন্যদের বলে: “ঐ যে চুনি, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের বাসায় অপারেশন করেছিল। আর আজ সেই বাড়ির ছেলে সিক্সটিন ডিভিশন সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে চুনিকে গুলি করে মারার জন্য। এখনো অন্ধকারের আনাচে কানাচে লুকিয়ে রয়েছে শত্রু। অস্ত্র জমা দেবে! আবদার!” ছবির বিভিন্ন দৃশ্য আর সংলাপ তাই সরাসরিভাবে তুলে ধরে বর্তমান সময়ের গুরুতর বিভিন্ন সমস্যা। ছবির কাহিনি মুখোমুখি হয় বিদ্যমান বাস্তবতার, যে বাস্তবতার বর্ণনা মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা তাদের লেখায় তুলে ধরেছেন।

ছবিতে প্রিন্সিপালের একটি সংলাপ প্রায়ই শোনা যায়। তিনি তার কলেজের একজন কর্মচারীকে ‘সময়’ বলে ডাকেন। আর সেই লোকটি প্রতিবার ডাক শোনার পর প্রিন্সিপালের কাছে এসে বলেন সময় খুব খারাপ, স্যার। গণযুদ্ধ এবং বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পরও যখন দেখা যায় সমাজে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ না করেও কেউ ঠিকই সংগ্রহ করতে পারছে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট, নকল মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, প্রকৃত অথচ দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান না দেখিয়ে তাদের অবজ্ঞা করছে সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির মানুষ তখন সময় খারাপ এই বক্তব্য অযৌক্তিক শোনায় না। কিন্তু একদিন প্রিন্সিপাল বলেন সময় খারাপ না, সময় খুব ভাল। কারণ তার যুদ্ধফেরত ছাত্ররা পরীক্ষা দেবে ঠিক করেছে।

কিন্তু সমাজের অবক্ষয় যে পর্যায়ে গেছে সেই পরিবেশে এই কমবয়সী মুক্তিযোদ্ধারাও কখনো ভাল মন্দের পার্থক্য ধরতে পারে না। পরীক্ষার হলে দেখা যায় তরুণরা সবাই নকল করছে। একজন শিক্ষক বাধা দিতে চাইলে এক তরুণ ছুরি বের করে টেবিলে রাখে। একই রকম দৃশ্য দেখা গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র জন অরণ্য (১৯৭৫)-এর প্রথম সিকোয়েন্সেই। সবসময় আশা দেখিয়ে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র শেষ করলেও সত্তরের দশকের মধ্যভাগে পশ্চিম বাংলায় হতাশা আর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সেই সময়ে তৈরি জন অরণ্য-ই একমাত্র ছবি যেখানে পরিচালক কোনো আশা দেখাতে পারেননি। সেই ছবির প্রথম দৃশ্যেই দেখা গিয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষায় ছাত্ররা অবলীলায় নকল করছে। তাদের কোনো ভয় বা অপরাধবোধ নেই। এই ছবির দুই বছর আগে বাংলাদেশে তৈরি আবার তোরা মানুষ হ-তেও আমরা দেখি পরীক্ষার হলে ছাত্রদের নকলের দৃশ্য। সাত তরুণ মুক্তিযোদ্ধা পরীক্ষার আগে যথেষ্ট পরিশ্রম করে পড়ালেখা করলেও পরীক্ষার হলে তাদের বয়সী অন্য ছাত্রদের অবাধে নকল করা দেখে তারাও নকল করতে শুরু করে। মাণিক নকল করতে চাচ্ছিলো না কিন্তু এক পর্যায়ে অন্যদের চাপাচাপিতে সেও একটি বই নিজের কাছে নেয়। কিন্তু হঠাৎ পরীক্ষার হল পরিদর্শনে আসা প্রিন্সিপালের কাছে সে ধরা পড়ে যায়। নিজের প্রিয় ছাত্র মাণিককে প্রিন্সিপাল কোনো দয়া দেখান না। মাণিককে তিনি বহিষ্কার করেন।

মাণিককে বহিষ্কার করার কারণে প্রিন্সিপালের সাথে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তাদের পরিবারের সদস্যদের দুর্ব্যবহার, চারদিকে অনিয়ম, মিজানের কারণে মুক্তিযোদ্ধা কাঞ্চনের বোন মেঘলার হঠাৎ অন্ত:সত্বা হয়ে পড়া, নীলার সাথে সম্পর্ক না রাখার জন্য মাণিকের প্রতি নীলার বাবা চৌধুরী সাহেবের আদেশ প্রভৃতি চাপের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা দিন দিন হতাশ হয়ে পড়তে থাকে। মেঘলার সাথে মিজান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সে মেঘলাকে একটি আংটিও দেয়। ভালোবাসার মিথ্যা অভিনয় করে মেঘলার সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠার পর যখন মেঘলা অন্তঃসত্বা হয়ে পড়ে তখন মিজান তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এই ব্যাপারে কাঞ্চন মিজানকে অভিযুক্ত করলে মিজান মিথ্যা কথা বলে। সে জানায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যে রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা কাঞ্চনের খোঁজে তাদের বাড়িতে যেয়ে তার মা-বাবাকে হত্যা করে সেই রাতে তারা মেঘলাকেও ধর্ষণ করেছিল। ঘটনা জানার পর মিজানের মা যখন মিজানকে নির্দেশ দেয় মেঘলাকে বিয়ে করার জন্য তখন নিজের মায়ের কাছেও মিজান সত্য অস্বীকার করে এবং মেঘলাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। সে তার দুষ্কর্মের সঙ্গী আফাজউদ্দিন চৌধুরীর মেয়ে নীলাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত হয়। নীলা এই বিয়েতে রাজি না হলেও তার বাবা তাকে চাপ দিয়ে রাজি করাতে চেষ্টা করে।

হতাশ তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে কিছু অপকর্মের সাথে যুক্ত হয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু তাদের মন যে মিজান বা অন্য দুশ্চরিত্রের মানুষের মতো কলুষিত নয় তা বোঝা যায় বিভিন্ন দৃশ্যে। মিজান আর আফাজউদ্দিন চৌধুরী প্রায়ই একসাথে বসে বিভিন্ন অসৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলে। চৌধুরী মিজানকে বলে এক ট্রাক রিলিফের মাল সরিয়ে দেয়া যায় না কারণ তাতে অনেক লাভ। মিজান আফাজউদ্দিন চৌধুরীকে যোগাড় করে দেয় বিভিন্ন পারমিট। তারা হাসিমুখে এই ধরনের অন্যায় পরিকল্পনা করে যায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা যখন কোনো খারাপ কাজ করে আমরা দেখি তাদের অপরাধবোধ আর অনুশোচনা। একদিন গভীর রাতে সোনা, হিরা আর চুনি তাদের আস্তানায় ফেরার সময় সোনা শহীদ মিনারের সামনে গাড়ি থামায়। তারপর তিন জন নেমে হেঁটে আসে শহীদ মিনারের সামনে। ক্যামেরা ক্লোজ শটে টিল্ট ডাউন করে দেখায় শহীদ মিনার। এরপর কাট করে দেখানো হয় পাশাপাশি দাঁড়ানো তিন মুক্তিযোদ্ধাকে। ভাষা আন্দোলনের সময় শহীদ ভাষা সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে সোনা বলে: “শহীদ হয়ে তোরা ভালই আছিস। আমরা বেঁচে থেকে নষ্ট হয়ে গেছি। তোদের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়িয়ে যতো কসম খেয়েছিলাম সব ভেঙ্গে ফেলেছি। আমাদের তোরা মাফ করে দিস।”

শহীদ মিনার থেকে নেমে আসার সময় তারা দেখতে পায় গভীর রাতে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি শহীদ মিনারের সিঁড়ির সামনে একাকী বসে আছে। অতো রাতে লোকটি কেন ওখানে বসে আছে জিজ্ঞেস করলে লোকটি জানায় ছেলেদের কবর সে পাহারা দিচ্ছে। তাকে বাড়ি চলে যেতে বলা হলে সে জানায় তার বাড়ি জ্বলে পুড়ে শেষ। যুদ্ধের শিকার এই মানুষটি স্বাধীন সমাজে আজ গৃহহীন, অসহায়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে শহীদের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট এবং নিখাদ। তাই সে তার দুঃখের এই দিনগুলিতেও বসে থাকে শহীদ মিনারের সামনে। শহীদদের কবর সে পাহারা দেয়। বাংলা ভাষার প্রতি, বাংলাদেশের প্রতি, এবং দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছে তাঁদের প্রতি এই লোকটির মতো সাধারণ মানুষদের অকৃত্রিম এবং অসীম ভালোবাসার জন্যই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই দেশে পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশ এই মানুষদের কাছেই নিরাপদ। কিন্তু যুদ্ধের ধ্বংসলীলার জন্য স্বাধীন সমাজে যখন এমন মানুষদের মাথা গোঁজার স্থানও নেই, তখন তাদের জরুরি প্রয়োজন যে রিলিফের উপকরণ বিলাসবহুল বাড়িতে বসে সেই রিলিফ আত্মসাতের পরিকল্পনা করে মিজান এবং চৌধুরীর মতো কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এই দুর্নীতিবাজ অসৎ মানুষদের মনে কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। চুনি তার পকেট থেকে টাকা বের করে দেয় নিরন্ন মানুষটিকে। কিন্তু সমাজে যারা বিত্তশালী তারা কি এমন দুঃস্থ মানুষদের সাহায্য করছে?

ছবিতে দেখানো হয় থানায় এই মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে চোরাকারবারিদের অভিযোগ পুলিশ গ্রহণ করছে। কিন্তু চোরাকারবারিদের পুলিশ গ্রেফতার করে না। পুলিশ খুঁজে বেড়ায় এই মুক্তিযোদ্ধাদের। কিন্তু কলেজের প্রিন্সিপাল তার প্রিয় ছাত্রদের ঠিকই বুঝতে পারেন। নকল করার দায়ে তিনি যেমন মাণিককে বহিস্কার করেছেন, আবার যখন মাণিকসহ অন্যরা পুলিশের কারণে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তখন তিনি প্রত্যেকের বাড়িতে যেয়ে তাদের খোঁজ করেন। মাণিককে পেয়ে তিনি আবার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। একদিন তাঁর প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের সম্পর্কে প্রিন্সিপালকে বলতে শোনা যায়: “ওরা আমার বড় ভাল ছেলে। যে যাই বলুক ওরা কখনো অন্যায় করে না। ওরা ন মাস যুদ্ধ করেছে। বাপ, মা, ভাই, বোনকে হারিয়েছে। এখন ওদের না আছে থাকার জায়গা, না আছে খাবার বন্দোবস্ত। ওদের বড় অভাব।” এই কথাটি শেষ হতেই কাট করে নতুন দৃশ্যে দেখানো হয় এক তাড়া টাকা। সেই টাকা চৌধুরী তুলে দিচ্ছেন মিজানের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের নকল সার্টিফিকেট যোগাড় করা মিজান এবং রিলিফের মাল চুরি করে লাভ করার চিন্তায় মত্ত চৌধুরীর কোনো অভাব নেই বর্তমান সময়ে। অভাব আছে দেশ স্বাধীন করার জন্য যারা অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে যুদ্ধ করলো সেই সাধারণ, অস্বচ্ছল পরিবারের মুক্তিযোদ্ধাদের।

মিজানের কাছে চরম অপমানিত হয়ে আত্মহত্যা করে অন্ত:সত্ত্বা মেঘলা। তার মৃতদেহের সাথে পাওয়া চিঠি থেকে কাঞ্চন আর তার মুক্তিযোদ্ধা সঙ্গীরা জানতে পারে মিজানের কুকর্মের কথা। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা ছুটে যায় চৌধুরীর বাড়িতে যেখানে জোর করে নীলার বিয়ে দেয়া হচ্ছে মিজানের সাথে। কলেজের প্রিন্সিপালকে তাঁর স্ত্রী নিজেদের ছেলের কুকর্মের কথা জানালে প্রিন্সিপাল মিজানের বিয়ে বন্ধ করার জন্য ছুটে যান। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই তাঁর ছাত্ররা পৌঁছে যায় সেখানে। আর অপরাধী মিজানকে গুলি করে হত্যা করে মেঘলার ভাই কাঞ্চন। চৌধুরী বাধা দিতে আসলে কাঞ্চন সজোরে চড় দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। স্বাধীন দেশে একজন দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী যে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থী কাজ করছে, মুক্তিযোদ্ধা কাঞ্চন তাকে আঘাত করে। দুর্নীতিবাজ, সুবিধাবাদী মানুষদের প্রতি তীব্র নিন্দা আর কঠোর অবস্থান প্রকাশ করা হয় এই চড়ের দৃশ্যটির মধ্য দিয়ে।

কাঞ্চন বার বার বাধা দিলেও তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে পুলিশকে প্রিন্সিপাল জানান যে তার ছেলে মিজান একজন খুনি। সে কাঞ্চনের বোন মেঘলাকে খুন করেছে। আর তাই তিনি নিজ হাতে গুলি করে মিজানকে খুন করেছেন। এখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু তাঁর ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিতে হবে। এরপর তিনি তাঁর ছাত্রদের অস্ত্র জমা দিয়ে দিতে বলেন। আবার তোরা মানুষ হ সমাজে বিদ্যমান সমস্যাগুলি তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের কাছের মানুষ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়া উচিৎ এই বক্তব্যটিও তুলে ধরে জোরালোভাবে। মিজানের মতো অন্যায়কারীকে হত্যা করায় প্রিন্সিপাল এবং তাঁর স্ত্রী কাঞ্চনের উপর ক্ষুব্ধ হননি। বরং প্রিন্সিপাল পুুলিশের কাছে নিজের ছেলের বিরুদ্ধেই কথা বলেন। নীলাও তার দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থশালী বাবাকে ছেড়ে দরিদ্র কিন্তু নীতিবান মাণিকের কাছে চলে যায়। পরিচালক তাই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের একদিকে বর্তমান সময়ের বিভিন্ন জরুরি সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেন, অন্যদিকে স্বাধীন দেশে আদর্শবাদী এবং নীতিনিষ্ঠ চিন্তা প্রাধান্য দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ছবিটির নামের মধ্য দিয়েও হয়তো দেশে তৈরি হওয়া নতুন সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে তরুণদের তথা বহু মানুষের আবারো সচেতন আর প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণের মানসিকতা অর্জনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। প্রচলিত কাঠামোর মাধ্যমে কাহিনি এগিয়ে নেয়া হলেও সাম্প্রতিক বাস্তবতার বিভিন্ন সমস্যা সরাসরি তুলে ধরা এবং কঠোর সামাজিক সমালোচনা প্রদানের কারণে ছবিটিকে অগতানুগতিক, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি চলচ্চিত্র হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।

তথ্যসূত্র:

আবদুল কাইয়ুম খান, বিটারসুইট ভিকটরি: আ ফ্রিডম ফাইটার’স টেল (ঢাকা: দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১৩)

ইম্যানুয়েল হ্যানসেন, ফ্র্যান্ত্জ ফাঁনো: সোশাল অ্যান্ড পোলিটিকাল থট (ওহাইও: ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৭৭)

কাজী নূর-উজ্জামান, নির্বাচিত রচনা (ঢাকা: সংহতি, ২০১৪)

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অবঃ) বীরবিক্রম, এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০০)

পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ডেটলাইন ঢাকা (ঢাকা: বিপিএল, ২০১৫)

জহিরুল ইসলাম, একাত্তরের গেরিলা (ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী, ২০১০)

মেজর নাসির উদ্দিন, গণতন্ত্রের বিপন্নধারায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭)

আলতাফ পারভেজ, মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনর্পাঠ (ঢাকা: ঐতিহ্য, ২০১৫)


মন্তব্য

হাসিব এর ছবি

এই সিনেমাটা কবে বানানো শুরু হয়েছিল? আরও নির্দিষ্ট করে বললে এই সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা হয়েছিল কবে? সিনেমাটি যদি ৭৩এর ডিসেম্বার মাসে মুক্তি পায় তাহলে ধরে নেয়া যায় অন্তত এক থেকে দেড় বছর আছে এটা বানানো শুরু হয়েছিল। আমার প্রশ্ন হল ৭২এর মাঝামাঝি সময়ে কি কিছু মুক্তিযোদ্ধা বা রাইফেল হাতে অমুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সমস্যাটা এতো ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল যে একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলতে হল সেজন্য? আমি পোস্ট পড়ে বুঝতে পারলাম আপনার আলোচনাটা ব্যক্তি খান আতাউরের বিচার নয়। এ সত্যেও একজন দর্শক হিসাবে আমি প্রশ্ন করতে পারি সেই সময়টাতে সিনেমায় বিবৃত ঘটনা কতোটুকু অ্যানেক্টোড।

আমার আরেকটা সম্পূরক প্রশ্ন আছে। স্বাধীনতার পরের সংবাদপত্র খুললে দেখা যায় দালাল আইনে লোকে গ্রেফতার হচ্ছে। মানুষজন স্বজনদের খোঁজ চেয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অপারেশনের সিরিজ কাহিনী প্রকাশিত হচ্ছে। এইসব বিষয় সিনেমা, নাটকে কতোটুকু উঠে এসেছে?

দীর্ঘ খেটে লেখা পোস্টের জন্য সাধুবাদ।

ইয়ামেন এর ছবি

ইটা রাইখ্যা গেলাম...

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

নাদির জুনাইদ এর ছবি

হাসিব, আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

এই লেখার একটি সেকশনের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা যেমন মইনুল হোসেন চৌধুরী, নাসির উদ্দিন, হাবিবুল আলম, আবদুল কাইয়ুম খান এবং পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো সাংবাদিক প্রমুখ জানিয়েছেন যে রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা সাজা '১৬ ডিভিশন'-এর অসাধু মানুষদের তৎপরতা ঢাকায় দেখা যাচ্ছিলো ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকেই। এমন প্রসঙ্গ মুক্তিযোদ্ধারাই তাঁদের স্মৃতিকথায় লিখেছেন। কাজেই ১৯৭২-এর মাঝামাঝি নয় বরং তারও আগে থেকেই তো এখানে মুক্তিযোদ্ধা সেজে অন্যায় করা শুরু করেছিল কিছু লোক। আবার কর্নেল কাজী নূরউজ্জামান লিখেছেন পাকিস্তানিদের দালালদের প্রভাব না কমার কথা কারণ প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন হয়নি। তিনি এবং মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা না এমন মানুষরা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে যাচ্ছে সেই কথা। এই সব ঘটনা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মেনে নেয়া কঠিন ছিল এবং ঘটনাগুলি খুব সাধারণ সমস্যাও ছিল না অবশ্যই। বরং তা ছিল গুরুতর সমস্যা। আর তাঁদের বিবরণ থেকে বোঝা যায় নকল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যায় শুরু হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকেই। এমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধার দেয়া বক্তব্য ভুল সেই কথাও কি বলা যায়?

সেই সময় ঢাকা সেনানিবাসের ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার অর্থাৎ খুবই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে ছিলেন কর্নেল এম জিয়াউদ্দিন বীর উত্তম। তিনি ২০ আগস্ট ১৯৭২ 'হলিডে' পত্রিকায় 'হিডেন প্রাইজ' শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন। এই লেখা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় তিনি দ্রুতই পদত্যাগ করেছিলেন এবং তিনি সেনাবাহিনীর চাকরিও ছেড়ে দেন। এই লেখার কিছু লাইন ছিল - "স্ট্যান্ড অন দ্য স্ট্রিট অ্যান্ড ইউ সি পারপাসলেস, স্পিরিটলেস, লাইফলেস ফেসেস গোইং থ্রু দ্য মেকানিকস অফ লাইফ। দিস কান্ট্রি ইজ অন দ্য ভার্জ অফ ফলিং ইনটু দি অ্যাবিস।" এই লেখা জিয়াউদ্দিনের ব্যক্তিগত মতামত নাকি তা সমাজের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরেছে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে তবে ১৯৭২ এর মাঝামাঝি সময়ে যে দেশে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তা তো বোঝা যায়। মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার আবদুল কাইয়ুম খানের বিস্তারিত বিবরণ থেকেও জানা যায় মুক্তিফৌজের সাধারণ সদস্যদের সমস্যা আর বিপদের কথা যা দ্রুতই শুরু হয়েছিল।

সেই সময় যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলি তৈরি হয়েছিল তার বেশির ভাগই তো ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, মানুষের কষ্ট আর ত্যাগ, দালালদের অন্যায় প্রভৃতি দিক তুলে ধরেছিল। অল্প কিছু ছবি মুক্তিযুদ্ধের পরের সমসাময়িক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। যেমন ১৯৭৩ সালে তৈরি আলমগীর কবিরের 'ধীরে বহে মেঘনা।' এই ছবির একটি দৃশ্যেও কিন্তু আছে দুজন হতাশাগ্রস্ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধা গাড়ি হাইজ্যাক করছে। কিন্তু দ্রুতই তাদের একজন বুঝতে পারে যে তারা অত্যন্ত অন্যায় করছে এবং সে আর অসৎ কাজ করতে চায় না। কাজেই হতাশা তখন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিল কারণ কদরের পরিবর্তে বরং তারা অবহেলা পেয়েছে। আর এমন অনেকেই ক্ষমতা উপভোগ করেছে যাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখা যায়নি। কিন্তু এই গুরুতর সমসাময়িক সমস্যাগুলির মুখোমুখি আমাদের চলচ্চিত্রকাররা কমই হয়েছেন। সেই কারণে 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবিটি অন্য অনেক ছবি থেকেই ভিন্ন।

হাসিব এর ছবি

এমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধার দেয়া বক্তব্য ভুল সেই কথাও কি বলা যায়?

সদ্য স্বাধীন একটা দেশ। অস্ত্র সব ঠিকমতো জমা পড়েনি। পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্রও হয়তো মানুষের হাতে হাতে ছিল। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে কিছু নেই - এরকম একটা অবস্থায় আপনি যে ঘটনাগুলোর রেফারেন্সগুলো দিয়েছেন সেগুলো একটা মাত্রা পর্যন্ত হয়েছে এটা মানতেই হবে।
আমার প্রশ্নটা ছিল এই মাত্রা নিয়ে। একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ টানি। বাংলাট্রিবিউনে একটা খবর প্রকাশিত হয়েছিল দিন দুই আগে। খবরটার একটা স্ক্রিনশট দেখুন।

এই নিউজটিকে মিথ্যা/ভুল/ফেক নিউজ বলা যাবে না। আবার এটাও বলা যাবে না যে রোহিঙ্গারা অ্যাজ এ নেশন এই কাজ করে বেড়াচ্ছে। এখন ধরা যাক আগামী বছর কেউ একটা সিনেমা বানালো রোহিঙ্গাদের নিয়ে "রোহিঙ্গারা মানুষ হ" নাম দিয়ে যেখানে মূল উপজীব্য রোহিঙ্গারা কী কী খারাপ কাজ করে বেড়াচ্ছে সেটা। এটা কি রোহিঙ্গাদের প্রতি সুবিচার হবে? আবার তোরা মানুষ হ সিনেমাটা নিয়ে আমার প্রশ্নটা ওটাই ছিল যে তখনকার পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ ছিল কিনা যার জন্য একটা সিনেমা বানাতে বসে পড়া হলো স্বাধীনতার ৬-৭ মাসের মধ্যে!
মিডিয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। আমি তখনকার বিভিন্ন গোষ্ঠী মিডিয়াতে কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং সেইটা উপস্থাপনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট বুঝতে চাইছি।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আপনার কথায় যুক্তি আছে। ওই সময় অবশ্যই কারো কারো মধ্যে সামান্য সমস্যাকেও বড় করে দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিপদে বা অসুবিধায় ফেলার চেষ্টা ছিল। তবে ১৬ ডিভিশনের নকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতাপ বেড়ে যাওয়া, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট অমুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যাওয়া, যারা মুক্তিযুদ্ধ করেনি তাদেরও প্রশাসনিক কাঠামোতে টিকে থাকা আর ক্ষমতাশালী হওয়া আর অন্যদিকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন সমাজে গুরুত্ব না পাওয়া প্রভৃতি কিন্তু ছোট সমস্যা নয়। তা গুরুতর সমস্যা। এই সমস্যাগুলি দূর করা যায়নি বলেই কয়েক বছরের মধ্যেই সেনাবাহিনীতে প্রতিক্রিয়াশীল এবং অমুক্তিযোদ্ধারা ক্ষমতাবান হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করা হয়েছে। চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা হয়েছে মন্ত্রী। আমি মনে করি এই বড় সমস্যাগুলি তাই আরো বেশি এক্সপোজ করে সে সম্পর্কে দেশে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি ছিল। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রে সমকালীন জটিল সমস্যাগুলির মুখোমুখি হওয়ার উদাহরণ আমরা দেখি না বললেই চলে। তখনো না, এবং এখনো নয়। এই দিক থেকে 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবিটিকে আমি আলাদা মনে করি। কারণ ছবিটি যে সমস্যাগুলো তুলে ধরেছে তা কিন্তু সমাজে ছিল। আর সমস্যাগুলি ক্ষুদ্রও নয়। তা বড় সমস্যাই যার কারণে আমাদের দেশে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা বহুদিন কোণঠাসা হয়েছে।

এখন খান আতাউর রহমানের মানসিকতা কেমন, বা ১৯৭১-এ তিনি কী করেছেন, পরবর্তীতে কী করেছেন তা অন্য বিশ্লেষণ। আমি কেবল দেখছি এই ছবিটিতে কী বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এই ছবি অন্য কোনো পরিচালকও তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু ছবিতে যা আছে অর্থাৎ সমকালীন কিছু গুরুতর সমস্যার সরাসরি উপস্থাপন আর সমালোচনা, সেটা সমাজে অমুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্যই জরুরি ছিল। এই ছবির বক্তব্য অমুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে, ১৬ ডিভিশনের বিরুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবহেলা এই ছবিতে সমালোচিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শবাদী মানসিকতার প্রশংসা ছবিতে এসেছে। ছবিটিকে তাই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই বিবেচনা করতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

"আবার তোরা মানুষ হ" নিয়ে এই মহাখ্যান এর লেখককে অশেষ ধন্যবাদ। লেখাটির জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করছি। এদেশে প্রতিদিন এই একটি বাণী প্রচার করা উচিত।
বাড়াবাড়ি মনে হলেও বলতে দ্বিধা নেই, এরপর আর নতুন কোনো সিনেমার দরকার নেই। কারনঃ এই সিনেমাটি দেখে শেষ করতে পারিনি।

 সিসিফাস আবার এর ছবি

যদিও আপনার উদ্দেশ্য জনাব খান আতার ব্যক্তিগত অবস্থান মূল্যায়ন করা নয়, তবে যে সময়ে এই চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভাষ্য তুলে ধরলেন, না চাইলেও প্রাসঙ্গিকভাবে জনাব খান আতা চলে আসবেন চলচ্চিত্রটি তৈরি করবার পেছনের আদর্শিক উদ্দ্যেশ্য নির্ণয়ের প্রয়োজনে।

যুদ্ধোত্তর সময়ের অনেক অসম্পূর্ণতাই ছিলো পরিস্থিতিকেন্দ্রিক-- মুক্তিযোদ্ধাদের সেসময়ের নানান সমস্যার পেছনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ জড়িত ছিলো। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পূর্বে কেউই অস্ত্র জমা দিতে রাজি হন নি, মুজিবনগর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিলো না স্বাধীন বাংলাদেশে, এবং যা পুণরায় প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধুর অপরিহার্যতা।

শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু আসবার পরই এই প্রক্রিয়া কিছুটা সফল হয়. অস্ত্রপ্রতি ৫০টাকা দিয়েও বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই অস্ত্র জমাদান করে নি. অস্ত্র জমা না দেওয়া ইস্যুতে মূলত রাজনৈতিক আদর্শই জোরালো ভূমিকা রেখেছে, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্পর্কিত পরবর্তী সকল বিশৃঙ্খলাতেই এই রাজনৈতিক বিভেদ একটা অন্যতম প্রধান কারণ ছিলো। বিশৃঙ্খলার যে চিত্র আঁকা হয় আজও, সেখানে ব্যাপক সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণ ছিলো সেটা বলা কঠিন। পাশাপাশি, আপনি জনাব জিয়াউদ্দিনের হলিডে আর্টিকেলের ভাষ্য থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশা চিত্রিত করতে চেয়েছেন, জিয়াউদ্দিনদের সেই হতাশা অর্থনৈতিক দুরবস্থার হতাশা নয়, তাদের হতাশা ছিলো মূলত রাজনৈতিক আদর্শ প্রভাবিত।

আবার তোরা মানুষ হ চলচ্চিত্র সেই আমল থেকেই বিতর্কিত-- এই চলচ্চিত্র সেসময়ের অনেক খন্ড চিত্র তুলে ধরেছে, তবে সেসব খন্ড চিত্রের সাথে রাজনৈতিক আদর্শজনিত বিরোধকে বিচ্ছিন্ন করে এই চলচিত্র ইস্যুতে বির্তকের অবকাশ তৈরী করেছিলো-- পাশাপাশি, ৭৩ এর নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের তাবৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এতটা শোচনীয় ছিলো না যে, চলচ্চিত্র বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সুপথে ফেরানোর আহ্বান জানার জরুরী দরকার ছিলো। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দুরবস্থার সবচেয়ে খারাপ সময়টি ছিলো ১৯৭৪। ১৯৭৩ ঠিক কোন অর্থে এধরণের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট তৈরী করেছিলো সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। পাশাপাশি, এই সন্দেহকে আরও উস্কে দিয়েছে চলচ্চিত্রকার জনাব খান আতার যুদ্ধকালীন অবস্থান (অস্ত্রের মুখে বা অন্য যে কারণেই হোক).

সুতরাং, চাইলেও চলচ্চিত্রকারের আদ্যপ্রান্ত পাশে সরিয়ে রেখে "আবার তোরা মানুষ হ" চলচ্চিত্রের মূল্যায়ন সঠিক হবে না, বরংচ, তা হবে একটি খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ মূল্যায়ন.

প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের একটা মন্তব্য পড়েছিলাম "আবার তোরা মানুষ হ" চলচ্চিত্র নিয়ে-- যৌক্তিক মনে করি উনার অবস্থান।

প্রয়াত তারেক মাসুদ অবশ্য তাঁর এক লেখায় এই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলেছিলেন, '১৯৭২-৭৩ সালে আসলেই কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা আদর্শচ্যুত হয়েছিল। তারা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা বটে, তবে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ৯ মাসের অস্ত্রের স্বাদ পাওয়ায় তারা শুধু অস্ত্রের ভাষায়ই কথা বলতে শিখেছিল। এর মানে কিন্তু এই নয়, তারা সবাই "পশু" হয়ে গিয়েছিল। তাদের ভালোবাসার পাত্রীকেও অস্ত্রের ভাষায় প্রেম নিবেদেন করেছিল। যুদ্ধ একটি ভাষা তৈরি করে দেয়। আর সেই ভাষাটি হলো অস্ত্রের ভাষা। এই জিনিসটি আমরা দেখেছি ১৯৭২-৭৩ সালে। এই ছবিটি সৃজনশীল ছবি হিসেবে না হোক, ওই সময়ের হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেন্ক্ষেশন অব মাইন্ড, নট অনলি সেপস। সময়ের এবং মেন্ক্ষাল সেপস বা মেন্ক্ষাল যে টাইমটা ছিল, তা ওই জিনিসটাকে প্রতিনিধিত্ব করে। ব্যাপারটা আসলে তখনই জটিল হয়ে পড়ে, যখন যিনি নির্মাণ করলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবস্থানটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল কি না। যখন দেখা যায়, তাঁর অবস্থানটাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বিভিন্নভাবে, তখন কিন্তু মানুষ সেটাকে প্রশ্ন করে এবং সেই হিসেবে কিন্তু "আবার তোরা মানুষ হ" ছবিটি বিতর্কিত হয়েছিল এবং এর সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

আপনার লেখার জন্য ধন্যবাদ।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

একজন অ্যাকাডেমিক হিসেবে আমি কোনো টেক্সটের নির্মোহ বিশ্লেষণ করে অভ্যস্ত। আমার এই লেখা 'আবার তোরা মানুষ হ' চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু, ফর্ম আর বক্তব্যের বিশ্লেষণ। আমি দেখবো পরিচালক কোন বক্তব্য কিভাবে এখানে তুলে ধরেছেন। এখানে পরিচালকের প্রকৃত মানসিকতা কেমন তা যাচাই করার সুযোগ তো নেই। আমি দেখবো তিনি এই ছবিতে কী বলেছেন। কাজেই 'না চাইলেও প্রাসঙ্গিকভাবে জনাব খান আতা চলে আসবেন চলচ্চিত্রটি তৈরি করবার পেছনের আদর্শিক উদ্দ্যেশ্য নির্ণয়ের প্রয়োজনে' আমি তা মনে করি না। সেভাবে চিন্তা করলে আমাকে আগে থেকেই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট চিন্তা করে এগোতে হবে। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানবিক গবেষণায় আমরা 'রিয়েলিটি ইজ নট ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট, ইট ইজ গ্রে' এভাবে চিন্তা করি। এটাই এই ধরনের গবেষণার নিয়ম।

খান আতা রাজাকার ছিলেন কী ছিলেন না এই চিন্তা দিয়ে কোনো কিছু বিচার না করে আমি দেখবো 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবিটি কী রাজাকার না মুক্তিযোদ্ধা কোন পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরেছে। আপনি যদি সতর্কভাবে এই ছবি দেখে থাকেন তাহলে লক্ষ্য করবেন এই ছবি মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের আদর্শকে খাটো করেনি এক সেকেন্ডের জন্যও। এই ছবিতে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে নকল মুক্তিযোদ্ধাদের, মুক্তিযুদ্ধ না করেই যারা স্বাধীন দেশে ক্ষমতাশালী তাদের আর বিদ্যমান দুর্নীতির। কাজেই এই ছবির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কোনো ক্ষতি হয় না। আর আপনি যেমন বললেন এই ছবির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সুপথে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে তাও ঠিক নয়। এই নামটি সিম্বলিক। এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যে দুর্নীতি বিদ্যমান তার বিরুদ্ধে বহু মানুষকে, পুরো সমাজকে আবারো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সুপথে ফেরার কথা বললে তো ছবিতে দেখানো হতো মুক্তিযোদ্ধারা ঘোরতর অন্যায় করছে। একটি দৃশ্যেও তো তেমন দেখানো হয়নি। বরং মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের সম্পর্কে প্রিন্সিপালকে বলতে শোনা যায়: “ওরা আমার বড় ভাল ছেলে। যে যাই বলুক ওরা কখনো অন্যায় করে না। ওরা ন মাস যুদ্ধ করেছে। বাপ, মা, ভাই, বোনকে হারিয়েছে। এখন ওদের না আছে থাকার জায়গা, না আছে খাবার বন্দোবস্ত। ওদের বড় অভাব।” কাজেই এমন ডায়ালগ ব্যবহারের পর আর বলা যায় না যে পরিচালক মুক্তিযোদ্ধাদের খারাপ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছি, অনেকেই এই ছবি ভালভাবে না দেখেই মন্তব্য করছেন। ছবিটি সহজে পাওয়া যায় না। তাই অনেকেই হয়তো একবার, দুইবার কোনো টেলিভিশনে ছবিটি দেখেছেন। কিন্তু খুব কেয়ারফুলি কোনো ছবি না দেখে সেই ছবি নেতিবাচক এমন কথা বলাও যৌক্তিক নয়।

তারেক মাসুদ কেবল একটি মন্তব্য করেছেন। ছবিটির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করেননি। তিনি কেবল বলেছেন খান আতা এই ছবি তৈরি করায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছে। ওয়েল, সেই একই প্রশ্ন এখনো লোকজন করছে। আমি সেই আলোচনায় না যেয়ে দেখতে চেয়েছি ছবিটি কী বার্তা তুলে ধরেছে। সেটা কার তৈরি তা নিয়ে আগে থেকে চিন্তা করলে নির্মোহ বিশ্লেষণ করা সম্ভব না।

আপনি বলেছেন - "১৯৭৩ ঠিক কোন অর্থে এধরণের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট তৈরী করেছিলো সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।" ১৬ ডিভিশন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নকল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যায় শুরু হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকেই। এই লেখার যে সেকশনে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধার ভাষ্য অনুযায়ী সেই সময়ের পরিবেশ আলোচনা করা হয়েছে তাতে যে সমস্যাগুলো উঠে এসেছে সেগুলোকে যুদ্ধোত্তর দেশে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। ভুলে যাবেন না এই সমস্যাগুলোই টিকে থেকেছে আর তার কারণেই মুক্তিযোদ্ধারা একে একে হত্যার শিকার হয়েছেন, আর ক্ষমতাশালী হয়ে মন্ত্রী এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। কাজেই এই সমস্যাগুলো যে তখন 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবিতে উঠে এসেছিল তার জন্য ছবিটিকে নিন্দা করার তো কোনো কারণ দেখি না। সমাজে সমস্যা থাকলে তা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাই যৌক্তিক। আর যে সমস্যাগুলো ছবিতে সমালোচিত হয়েছে সেই সমস্যাগুলো যে কল্পিত নয় তা তো রণাঙ্গনের বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধার বক্তব্য থেকেই জানা যায়। আর ছবিটি আগাগোড়া মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্ব দিয়ে গেছে। ছবি নিয়ে বিশ্লেষণ করলে আমরা তাই দেখি। এখন খান আতার প্রকৃত মানসিকতা কী তা অন্য আলোচনা। সেই আলোচনা চলচ্চিত্র বিশ্লেষণে করার সুযোগ নেই। আমাদের দেখতে হবে পরিচালক এই ছবিতে ঠিক কোন বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

আর হ্যাঁ, কর্নেল জিয়াউদ্দিনের হতাশা রাজনৈতিক কারণেই ছিল। সেটা তো স্পষ্টই। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক কারণই গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক কারণ নয় এমনটাও তো বলা যাবে না। যে অফিসার এক বছর আগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ করলেন, তিনি এক বছরের মধ্যে হতাশাগ্রস্ত হলে বুঝতে হবে তখন তাদের উদ্দীপনা ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো ঘটনা ঘটছিলো। আর পরের ইতিহাস কী জানায় আমাদের? এই ক্ষতিকর দিকগুলি টিকে থেকেছে আর তার জের আমাদের টানতে হয়েছে ১৯৯০ পর্যন্ত। হয়তো এখনো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী শক্তির আস্ফোলন কি আমরা দেখি না এখনো? অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর পরই মুক্তিযোদ্ধারা যেন হতাশাগ্রস্ত না হন কোনোভাবেই সেই দিকটি নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। জরুরি ছিল মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে সচেতন রাখা। বিজয় অর্জন করা কঠিন, কিন্তু আরো কঠিন হলো বিজয় অর্জন করার পরের দিনগুলির কাজ।

আবারো ধন্যবাদ।

হাসিব এর ছবি

একজন অ্যাকাডেমিক হিসেবে আমি কোনো টেক্সটের নির্মোহ বিশ্লেষণ করে অভ্যস্ত।

নির্মোহ বা অবজেক্টিভ অ্যানালাইসিস তো পজিটিভিস্টদের অনুমিতি। আপনার বিশ্লেষণে জ্ঞানতাত্তিক (epistemological) অবস্থান কি পজিটিভিস্টিক?

নাদির জুনাইদ এর ছবি

উপরে এক মন্তব্যে বলেছি যে 'রিয়েলিটি ইজ নট ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট, ইট ইজ গ্রে' এই চিন্তাধারা থেকেই আমি কাজ করি। আমার মনে হয় এই কথাটি অনেক কিছুর সাথে এই দিকটিও নির্দেশ করছে যে কোনো নির্দিষ্ট ক্যাটেগরি বা প্রেসক্রিপশন দিয়ে ইতিহাস বা সংস্কৃতির বিশ্লেষণ করা যায় না। এই ধরনের বিশ্লেষণ একই সাথে ইন্টারডিসিপ্লিনারি আবার অ্যান্টিডিসিপ্লিনারি। আর নির্মোহ বিশ্লেষণ কেবল ন্যাচারাল সাইন্সের একচেটিয়া নয়, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনাতেও নির্মোহ বিশ্লেষণ সম্ভব। দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর এক লেখায় সুন্দর করে বুঝিয়েছেন যে জ্যামিতির 'সুতরাং' আর ইতিহাসের 'সুতরাং' এক ব্যাপার নয়। এটা বুঝলেই বোঝা যায় সাইন্টিফিক মেথডের অবজেকটিভ অ্যানালিসিস আর সামাজিক বিজ্ঞান আর মানবিক শাখার অবজেকটিভ অ্যানালিসিসের ভিন্নতা কেমন।
কাজেই ইতিহাস, সংস্কৃতির আলোচনায় একইসাথে পজিটিভিজম এবং অ্যান্টিপজিটিভিজমের প্রভাব থাকতে পারে। আমার এই লেখায় কোনো ভ্যালু জাজমেন্ট নেই, প্রিকনসিভ্ড আইডিয়াজ নেই। আবেগের চেয়ে যুক্তি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আবার লেখায় যে মত এসেছে তা তো সাবজেকটিভ। আমার নিজের মত। অন্য কেউ ভিন্নমত নিয়ে আসতেই পারেন (তবে তাকে যুক্তি দিয়ে বক্তব্য তুলে ধরতে হবে নিশ্চয়ই। কেবল মনে হয়েছে, লিখেছি ধারার হলে হবে না।) আমার 'সুতরাং' তো গণিতের 'সুতরাং'-এর মতো নয়।
আশা করি আমার বিশ্লেষণের স্টান্স বোঝাতে পেরেছি।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আবার তোরা মানুষ হ ছবিটি আমি হলে গিয়ে দেখেছিলাম ৭৪ সালের প্রথম দিকে। তখন আমি স্কুলের ছাত্র, সুতরাং জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে ছবি দেখতে যাই নি, বিনোদন লাভের জন্যই গিয়েছিলাম এবং বলাইবাহুল্য বেশ হতাশ হয়েছিলাম। তবে যখন দেখলাম ছবিটা নিয়ে বেশ সারগর্ভ আলোচনা হচ্ছে, তখন এক ধরনের গর্ব অনুভব করেছিলাম এই ভেবে যে, আমিও এই ধরনের ছবি দেখি যা সমাজের জ্ঞানী লোকজনের আলোচনার খোরাক যোগায়। ছবিতে জ্ঞানের খোরাক কি আছে, তখন তা খুব একটা বুঝতে পারি নি, পরবর্তি কালে একটু একটু করে বুঝেছি।

লেখক বলেছেন- "এই লেখাটি কেবল আবার তোরা মানুষ হ ছবিটির নির্মাণ-পটভূমি এবং বিষয়বস্তুর বিভিন্ন দিকের একটি বিশ্লেষণ যার মাধ্যমে ছবিটির বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবিটির নিন্দা করা কি যৌক্তিক নাকি ছবিটির বিভিন্ন দিকের প্রশংসা করা যায় তা এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে"। তবে বিশ্লেষনধর্মী এই চমৎকার লেখাটি পাঠ করার সময়ও আমরা কিন্তু এই ভাবনা থেকে বের হতে পারবো না যে, সম্প্রতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ এই ছবিটি এবং তার পরিচালক, বিদগ্ধ গুণী শিল্পী খান আতাউর রহমান সম্পর্কে কিছু কথা বলেছেন এবং লেখক নিশ্চিতরূপেই তারই সূত্র ধরে এই লেখাটি আমাদের উপহার দিয়েছেন। লেখক ছবিটি নির্মানের অপরিহার্যতা বোঝানোর জন্য বেশ কয়েকজন মুক্তিযদ্ধা এবং গবেষকের বিভিন্ন লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আবার ছবির বিভিন্ন দৃশ্যের বাস্তব ব্যাখ্যা, বিভিন্ন সংলাপের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কেও সবিস্তার বর্ননা করেছেন। এসবই ছবিটির অন্তর্গত সেইসব জ্ঞানের খোরাক, যা আমি সেই তেতাল্লিশ বছর আগে কিছুই ধরতে পারি নি।

তখন ছবিটি সম্পর্কে আমার মনে শুধু একটি প্রশ্নেরই উদয় হয়েছিল- আচ্ছা এই যে বিদঘুটে একটি নাম এই ছবিটির, তার অর্থ আসলে কি? এই ছেলেগুলোকেই কি আবার মানুষ হতে বলা হচ্ছে? তারা কি একসময় মানুষ ছিল এবং এখন অমানুষ হয়ে গেছে? সামাজিক পরিমন্ডলে দেখেছিলাম দর্শক-বোদ্ধাদের একটি বড়সড় অংশ ছবিটকে সরকারের বিরুদ্ধে একটা চপটাঘাত হিসেবেই দেখেছে। কেন তারা সেরকমটা ভেবেছে? তার উত্তর এই লেখকের বিভিন্ন উদ্ধৃতির মধ্যেই রয়েছে। মানুষ বড় আশা করে যুদ্ধে গিয়েছে, যুদ্ধকে সমর্থন করেছে, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে অন্যরা। অন্য বিভিন্ন রকম ভাবনাও ছিল- কি লাভ হল এত বিপুল ত্যাগের এই স্বাধীনতায়? এই সরকার এবং তার লোকজন তো শুধু নিজেদের পকেট ভরছে, এর চেয়ে তো পাকিস্তানই ভাল ছিল। কিংবা, আহা কি দেশ ছিল! সারা পৃথিবী ডরাইত, ইন্ডিয়া তো ডরে মুইত্যা ভাসাইয়া দিত। মালাউনদের চক্রান্তে কি সর্বনাশই না হল।

যারা যুদ্ধে অংশগ্রহন করে নি কিংবা করতে পারে নি, তাদের প্রসঙ্গে কিছু কৈফিয়ত- আমার পুলিশ অফিসার বাবা আমাদের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং বেঁচে ফিরেছিলেন। স্বাধীনতার পরে তিনি যখন একটি থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন, তখন সেখানে তিনি এবং একজন কন্সটেবল ছাড়া আর কেউ যুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে পারেন নি। লেখকের বিবেচনা মত এদের সবার ফায়ারিং স্কোয়াড না হোক, চাকুরিচ্যুতি অবশ্যই পাওনা ছিল। এমনি ভাবে অন্যান্য সকল দপ্তরে যত এই ধরনের বিশ্বাসঘাতক ছিল, সবাইকে নিদেনপক্ষে চাকুরী থেকে বিদায় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। যে সকল গবেষক, যে সকল মুক্তিযোদ্ধার উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক এই মত প্রকাশ করেছেন, তারা কি আসলেই ভেবে দেখেছেন সে রকমটা করা হলে কী ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হত? যুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে অনেকেরই হয়ত এক ধরনের অহংকার ছিল যে আমরা মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তারা যখন কেবলমাত্র দুটি টাইমস্কেল পেলেন পুরষ্কার হিসেবে, তাদের অনেকেই মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। আর যাদের চাকুরিচ্যুত করা হয় নি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এ জন্য কোন কৃতজ্ঞতা বোধ করেন নি, কিন্তু নানা অসুবিধার কারনে সরকারেরই মুণ্ডুপাত করেছেন। যে সকল গবেষক এবং মুক্তিযোদ্ধা একটি গণ মিলিশিয়া বাহিনী গঠন না করার জন্য সরকারের সমালোচনা করেছেন, তারা আসলে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেন নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার উদ্ভব ঘটলো যারা আদৌ যুদ্ধে অংশগ্রহন করে নি। বস্তুতপক্ষে ব্যাপারটি ঘটে গেছে ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই, যখন দেশ চলছিল কার্যত একটি সরকাবিহীন অবস্থায়। এইসব তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধারা একটি অস্ত্র যেমন যোগার করতে সমর্থ হয়েছিল, তেমনই তাদের কেউ কেউ একটি সার্টিফিকেটও যোগার করতে সক্ষম হয়েছিল। বাহিনীবহির্ভুত যারা যুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ ছিলেন ছাত্র। যুদ্ধ শেষে তারা আবার স্কুল কলেজে ফিরে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক এবং সেটাই হয়েছিল, অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। আমাদের এলাকায় আমার পরিচিত যাঁরা তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে তালিকা থেকে আব্দুল কাইয়ুম খান বর্নিত তথাকথিত গ্রামের গরীব কৃষক কাউকে তেমন একটা বের করতে পারি নি।

খান আতা এ ছবিটি নির্মানের আগে বেশ কয়েকটি ছবি বানিয়েছেন, যেগুলো সবই নিখাদ বানিজ্যিক ছবি। এই প্রথম তিনি এমন একটি ছবি বানিয়েছেন যা রাজনৈতিক তো বটেই, দেশের সবচেয়ে প্রধান বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। এবং ছবিটি ছবিটি দেখে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে এই ভাবনার উদয় ঘটেছে যে- নাহঃ কোন কিছু ঠিকমত চলছে না। লেখকের উদ্ধৃত একটি সংলাপ লক্ষ্যনীয়- "মাণিকের মা চিন্তিতভাবে মন্তব্য করেন “তবে যে শুনি দেশ জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে গেছে, কারো ঘরে কিচ্ছু নাই"। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে ছবির নির্মাতা দেশের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বাস্তবতাকে একটি প্রশ্নের মুখে দাড় করিয়েছেন। জীবন থেকে নেয়া যেমন, এ ছবিটিও তেমনি অতি সুক্ষ্মভাবে একটি সরকার বিরোধী ছবি, যা বোঝা যায় কিন্তু ধরা যায় না। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেকেই বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করেছিলেন, খান আতা তাদেরই একজন। নিতান্ত বাধ্য হয়ে এরকম ভূমিকা পালনের কারনে স্বাধীনতার পরে খুব কম মানুষকেই পালিয়ে থাকতে হয়েছিল, খান আতা সেই অল্প সংখ্যক মানুষদেরই একজন, যাকে জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে থাকতে হয়েছিল। তবে সৌভাগ্য তাঁর, শিল্পী সমাজের, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দিকপাল ব্যাক্তিরা, যাঁদের অনেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর প্রতি সহমর্মী ছিলেন, সে কারনে তিনি প্রানে রক্ষা তো পেয়েছেনই, পালিয়ে থাকার মত গুরুতর কোন অপরাধ তাঁর আদৌ ছিল কি না, তা নিয়েও কোন প্রশ্ন উঠতে পারে নি।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আপনাকে ধন্যবাদ জানাই লেখাটি পড়ার জন্য।
কিন্তু আপনার মন্তব্যের কয়েকটি বক্তব্য আমার কাছে স্পষ্ট হলো না। আপনি লিখেছেন "এমনি ভাবে অন্যান্য সকল দপ্তরে যত এই ধরনের বিশ্বাসঘাতক ছিল, সবাইকে নিদেনপক্ষে চাকুরী থেকে বিদায় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। যে সকল গবেষক, যে সকল মুক্তিযোদ্ধার উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক এই মত প্রকাশ করেছেন, তারা কি আসলেই ভেবে দেখেছেন সে রকমটা করা হলে কী ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হত?" নিরুপায় হয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি এবং চাকরি করে গিয়েছেন কিন্তু মূলত সমর্থন করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের এবং গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন তাদের ব্যাপারটি অন্যরকম। কিন্তু যারা ছিল চিহ্নিত 'বিশ্বাসঘাতক' এবং যারা স্বেচ্ছায় এবং উৎসাহ নিয়ে পাকিস্তানিদের সমর্থন করেছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের চাকরিতে রাখা হবে কেন আর কেনইবা তাদের চাকরিচ্যুত করা হলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতো? চাকরি থেকে তাদের বাদ দিয়ে দেয়াটাই কি স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না? বাদ দেয়া যায় নি বলেই কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এই দেশে। আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী শক্তির আস্ফোলন।

আপনি আরো লিখেছেন "বাহিনীবহির্ভুত যারা যুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ ছিলেন ছাত্র। যুদ্ধ শেষে তারা আবার স্কুল কলেজে ফিরে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক এবং সেটাই হয়েছিল, অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। আমাদের এলাকায় আমার পরিচিত যাঁরা তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে তালিকা থেকে আব্দুল কাইয়ুম খান বর্নিত তথাকথিত গ্রামের গরীব কৃষক কাউকে তেমন একটা বের করতে পারি নি।"
আপনি আপনার এলাকা থেকে গ্রামের কৃষক মুক্তিযোদ্ধা বের করতে পারেননি বলে মনে করার কোনো কারণ নেই যে আবদুল কাইয়ুম খানের মতো রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা যে বিবরণ দিয়েছেন তা ভুল। তিনি তো যুদ্ধই করেছেন সরাসরি। কাজেই তার বিবরণ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর এছাড়াও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত যে বহু বই আছে সেগুলো পড়ে দেখুন তো সেখানে গ্রামের সাধারণ মানুষদের মুক্তিযুদ্ধ করা নিয়ে কী লেখা আছে। কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করছি - আ সেকটর কমান্ডার রিমেমবারস বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার ১৯৭১ - কর্নেল কাজী নূরউজ্জামান, দ্য গেরিলাস অফ ঢাকা ইন ১৯৭১ - কর্ণেল তৌফিকুর রহমান, একাত্তরের গেরিলা - জহিরুল ইসলাম, দাস পার্টির খোঁজে - হাসান মোরশেদ, জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা - মেজর কামরুল হাসান ভূইয়া, গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে - মাহবুব আলম, রক্তেভেজা একাত্তর - মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা - মেজর নাসির উদ্দিন। এই বইগুলো এবং মুক্তিযুদ্ধের উপর আরো অনেক বই পড়লেই তো দেখা যায় আপনি যাদের "তথাকথিত গ্রামের গরীব কৃষক" বলেছেন গ্রামের এমন কতো সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। কেবল ছাত্ররাই যোদ দিয়েছিল আর সেনাসদস্যরা তা তো নয়। জহিরুল ইসলামের বইতে দুই নম্বর সেক্টরে যোগ দেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করার ব্যাপার নিয়ে লেখা একটি তথ্য উল্লেখ করছি। তিনি লিখেছেন - "এই ভাবে কুমিল্লা, ঢাকা, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ইত্যাদি শহরের ছেলেদের আলাদা করা হলো। ৩০০-৪০০ ছেলের মধ্যে মাত্র ৪০ জন পাওয়া গেল শহরের।" কী প্রমাণ হয় এই কথা থেকে? "গ্রামের গরীব কৃষক" যুদ্ধ করেনি? কর্ণেল নূরউজ্জামান তাঁর সাত নম্বর সেক্টর সম্পর্কে লিখেছেন - "মোস্ট অফ দ্য ফ্রিডম ফাইটারস ইন মাই সেক্টর অয়ার সিম্পল ইয়াং ভিলেজার্স, আরবান ওয়ার্কার্স অ্যান্ড স্টুডেন্টস।" তিনি কাদের নাম প্রথমে লিখলেন? আর জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা বইটি পুরোটাই লেখা হয়েছে লেখকের ভাষায় 'গ্রামাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ' দের নিয়ে যে "অশিক্ষিত গ্রামের কিশোর যুবকরা জীবন বিপন্ন করে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের সম্মুখে।" দয়া করে এই বইগুলো পড়ুন। আর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তৈরি তথ্যচিত্রগুলো দেখুন, সেই সময়কার ছবি দেখুন। দেখবেন গ্রামের কতো সাধারণ মানুষদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেখানে দেখা যাচ্ছে। আবদুল কাইয়ুম খান এঁদের কথাই বলেছেন। আপনার বলা "বাহিনীবহির্ভুত যারা যুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ ছিলেন ছাত্র" এই কথাটিও তাই গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।

আপনি বলেছেন "যে সকল গবেষক এবং মুক্তিযোদ্ধা একটি গণ মিলিশিয়া বাহিনী গঠন না করার জন্য সরকারের সমালোচনা করেছেন, তারা আসলে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেন নি।" কী সেই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করুন। শুনি আপনার ব্যাখ্যা। নকল মুক্তিযোদ্ধা এসে গেল তাই মিলিশিয়া বাহিনী তৈরি করা গেল না প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে? দরকার তো ছিল নকলদের খুঁজে বের করে তাদের যথাযথ শাস্তি দেয়া। সেটা করা যায়নি বলেই পরবর্তীতে অনেক বড় মূল্য দেশকে দিতে হয়েছে।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

যারা চিহ্নিত 'বিশ্বাসঘাতক' এবং যারা স্বেচ্ছায় এবং উৎসাহ নিয়ে পাকিস্তানিদের সমর্থন করেছেন, তাদের কাউকেই চাকুরিচ্যুত করা হয় নি, এটা বোধ হয় সঠিক নয়। দু-চারটি ঘটনার কথা আমি জানি, যারা এ ধরনের কার্যক্রমের কারনে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, যেমন ফরিদপুরের ভাঙা থানার ওসি। আবার অনেকে নানা শুভানুধ্যায়ীদের সুপারিশ ও তদ্বিরের কারনে পারও পেয়ে গেছেন, যেমন মেজর জেনারেল আমজাদ, এমনকি এ ক্ষেত্রে খান আতাউর রহমানের নামটিও বোধ হয় উল্লেখ করা যায়।

গ্রামের গরীব কৃষক মুক্তিযোদ্ধা প্রসঙ্গে- একটা বিষয় বোধ হয় গুলিয়ে ফেলা হয় কিংবা গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মানেই গ্রামের গরীব কৃষক নয়। আপনি যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন "জহিরুল ইসলামের বইতে দুই নম্বর সেক্টরে যোগ দেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করার ব্যাপার নিয়ে লেখা একটি তথ্য উল্লেখ করছি। তিনি লিখেছেন - "এই ভাবে কুমিল্লা, ঢাকা, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ইত্যাদি শহরের ছেলেদের আলাদা করা হলো। ৩০০-৪০০ ছেলের মধ্যে মাত্র ৪০ জন পাওয়া গেল শহরের"। এর মানে কি দাঁড়ালো? ৪০ জন বাদে আর সবাই কিংবা সিংভাগই গ্রামের গরীব কৃষক? মোটেই তা নয়, আমার অবজারভেশন হল- এদের সিংভাগই হল গ্রামের ছাত্র, খুবই অল্প সংখ্যক অন্যান্য পেশাজীবী। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরাই যোগ দিয়েছেন, তাঁরা সেটা করেছেন একটা মোটিভেশন থেকে। বাস্তব কারনেই সেই মোটিভেশন ছাত্রদের মধ্যে কাজ করেছে অনেক বেশী। সাধারন কৃষক শ্রেনীর মানুষদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করার মত মোটিভেশন ছিল বলে আমার মনে হয় না। আপনার লেখা পড়ে মনে হয় আপনি গবেষণা মূলক কাজকর্মের সাথে যুক্ত আছেন, অথবা এ ধরনের কাজ কর্ম পছন্দ করেন। এক কাজ করুন না, এখন তো ওয়েবেই সকল মুক্তিযোদ্ধার তালিকা দেয়া আছে, আপনার এলাকার কয়েকটি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, সেই সময় তাদের মধ্যে কতজন ছিল ছাত্র আর কতজন ছিল গরীব কৃষক।

গণ মিলিশিয়া বাহিনী গঠন না করার বাস্তবতা প্রসঙ্গে- আমার কাছে জানতে চেয়েছেন এর ব্যাখ্যা, আরে ভাই আমি ব্যাখ্যা দেয়ার কে? সেই সময় সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন এমন একজনকে(খুব সম্ভবত তোফায়েল আহমেদ, নিশ্চিত নই) একবার টিভি টক শোতে বলেছেন শুনেছি এরকম- যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ ছাত্র এবং পেশাজীবী তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে ফেরত গিয়েছেন, অপর দিকে স্বাধীনতার পর পরই বিপুল সংখ্যক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার প্রাদুর্ভাব হওয়ায় সঠিকভাবে যাচাই বাছাই না করে একটা গণ মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা সম্ভব ছিল না। তবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা ইচ্ছুক, তাদের নবগঠিত রক্ষীবাহিনীতে আত্মিকরনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আপনি "যে সকল গবেষক এবং মুক্তিযোদ্ধা একটি গণ মিলিশিয়া বাহিনী গঠন না করার জন্য সরকারের সমালোচনা করেছেন, তারা আসলে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেন নি" এমন মন্তব্য করেছেন বলে আপনি 'বাস্তবতা' বলতে কি বুঝিয়েছেন তা ব্যাখ্যা করতে বলেছি। কোনো মন্তব্য যদি আপনি করেন তাহলে আপনাকেই ব্যাখ্যা দিতে হবে। মন্তব্য করবেন আর সেখানে কী বুঝিয়েছেন তা জিজ্ঞাসা করলে "আরে ভাই আমি ব্যাখ্যা দেয়ার কে" বললে সেটা তো গ্রহণযোগ্য হয় না।

আর আপনি বলছেন "এর মানে কি দাঁড়ালো? ৪০ জন বাদে আর সবাই কিংবা সিংভাগই গ্রামের গরীব কৃষক? মোটেই তা নয়"। 'মোটেই তা নয়' বললে ধরে নিতে হবে আপনার কাছে নিশ্চিত প্রমাণ আছে যে ৪০ জন ছাড়া বাকী সবাই ছিল গ্রামের ছাত্র, সাধারণ কৃষক নয়। কিন্তু এই প্রমাণ আপনি দিতে পারেননি। আপনি আপনার ধারণা থেকে কথা বলছেন। এমনও তো হতে পারে যে বাকী সবাই ছিল গ্রামের সাধারণ কৃষক। আপনার ধারণা যে সত্য তার তো কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু গ্রামের বহু সাধারণ লোক যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তার তো বহু প্রমাণ আছে। আমি অন্য যে বইগুলোর নাম উল্লেখ করেছি সেখানে রণাঙ্গনের যোদ্ধারা গ্রামের যে সাধারণ মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন তাঁদের দেয়া সেই তথ্য ভুল? অবশ্যই নয়। আমরা তাঁদের বক্তব্যই গ্রহণ করবো। কারণ তারা অনেকে একই তথ্য দিয়েছেন। আর আমরা দেখবো তথ্যচিত্রগুলি বা সেই সময়ের তোলা বহু ছবি যে সেখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাদের দেখা যায়।

আপনি বলছেন আপনার অবজারভেশনের কথা যে যুদ্ধ করার মোটিভেশন কেবল শিক্ষিতদেরই হয়, সাধারণ মানুষের হয় না। মোটিভেশন কেবল শিক্ষিতদের থাকে গ্রামের সাধারণ মানুষের থাকে না আপনার দেয়া এই তথ্যের ভিত্তি কী? মাও সে তুং-এর বিপ্লবে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করেছিল কারা? মাও সে তুং আর ফ্র্যান্তজ ফাঁনো কিসের ভিত্তিতে বলেছিলেন যে কৃষকরা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী যারা বিপ্লবের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্দীপিত হয়? ফিদেল ক্যাস্ট্রোর গেরিলা বাহিনীতে শিক্ষিত ছাত্রের সংখ্যা বেশি ছিল নাকি অন্যদের সংখ্যা বেশি ছিল দয়া করে খোঁজ নিয়ে দেখুন। মুক্তিযুদ্ধের ১১ নং সেক্টর কমান্ডার লেফটেনান্ট কর্ণেল আবু তাহের লিখেছেন: "গ্রামের সব গরীব গ্রামবাসীদের কথাও বলতে হয়। এরা আমাদের দিয়েছে খাদ্য ও আশ্রয়। শত্রু-সেনার অবস্থান সম্পর্কে তারা আমাদের সব সময় খবর দিয়েছে। এরা ছিল আমাদের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণার উৎস। আমাদের সাহায্য করতে যেয়ে এরা পাকিস্তানি বুলেটের শিকার হয়েছে। এরাই ছিল আসলে সবচেয়ে বেশি সাহসী।" কর্ণেল তাহেরের এই বক্তব্য থেকে কী প্রমাণ হয়? এখনো বলবেন গ্রামের মানুষের 'মোটিভেশন' থাকে না?

"সাধারন কৃষক শ্রেনীর মানুষদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করার মত মোটিভেশন ছিল বলে আমার মনে হয় না" -- আপনার এমন মন্তব্য শুনে ভাবছি আমাদের দেশেই অতীতের বিভিন্ন সংগ্রামের কথা যেমন রংপুর কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), তুষখালীর কৃষক বিদ্রোহ (১৮৫৮-৭৫), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬১), সিরাজগঞ্জ বিদ্রোহ (১৮৭২-৭৩), নানকার বিদ্রোহ (১৯২২-৫০), নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ (১৯৪৯-৫০), আর তেভাগা আন্দোলন, ফকীর-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সহ আরো নানা সংগ্রাম আর আন্দোলনের কথা। এইসব বিখ্যাত আন্দোলন আর সংগ্রাম কি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা করেছিলেন যে আপনি চট করে বলে দিলেন সাধারণ কৃষক শ্রেণির মানুষদের যুদ্ধ করার মোটিভেশন থাকে না? এই দেশে কৃষকরা আর অশিক্ষিত নিম্নবর্গের মানুষ জাঁদরেল বৃটিশারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল আর ১৯৭১ সালে যখন পুরো দেশে শুরু হয়েছে একটা গণযুদ্ধ তখন এই দেশের কৃষকরা সেই যুদ্ধে যোগ দেয়ার মোটিভেশন পাবে না??? আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে ১৯৭১ সালের ইতিহাস আর কারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তা দয়া করে ভাল করে জানুন। তারপর আপনার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করবেন।

আর আপনার কথা মতো কোনো এক থানার ওসিকে পাকিস্তানি পক্ষ অবলম্বনের জন্য চাকুরিচ্যুত করা হয়েছিল। আর রাজাকার বাহিনীর হয়ে কাজ করা পুলিশের প্রাক্তন আইজি আবদুর রহিম আর সেনাবাহিনীর কর্নেল ফিরোজ সালাউদ্দিনের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্বাধীন দেশে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে চাকরি করেছেন। এই ব্যাপারগুলো আমাদের মাথায় রাখতে হবে। পরবর্তী ইতিহাসও প্রমাণ করে এর জন্য আমাদের কতোটা মাশুল দিতে হয়েছে।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

ব্যাখ্যা না হলেও একটি উদ্ধৃতি দিয়েছি, বোঝাই যাচ্ছে সেটা আপনি মোটেই আমলে নেন নি, বেশ!

মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল গ্রামের গরীব কৃষকেরা, এই বিষয়টি প্রমানের জন্য আপনি একটি উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন- "৩০০-৪০০ ছেলের মধ্যে মাত্র ৪০ জন পাওয়া গেল শহরের", এবং এ থেকেই নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন যে বাকি সবাই গ্রামের গরীব কৃষক। আমি বলতে চেয়েছি, বাকি সবাই যে গ্রামের গরীব কৃষক এ কথা তো লেখক বলেন নি, আপনার অনুমান মাত্র। আমি আমার পর্যবেক্ষন এবং উপলব্ধি অনুসারে বলেছি বাকি সবার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল গ্রামেরই ছাত্রগোষ্ঠী। আপনি অনেক বইয়ের নাম উল্লেখ করে আমার প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু এক আব্দুল কাইয়ুম খান ছাড়া অন্যরা নির্দিষ্টভাবে ঠিক কি বলেছেন, যার ফলে এটা বোঝা যায় যে গ্রামের গরীব কৃষকেরাই বিপুল সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন, তা উদ্ধৃত করেন নি। কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করে পাঠকদের সেসব পড়ে একটি তথ্য খুঁজে দেখতে বলাটা আমার কাছে এক ধরনের স্থুল রসিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নি। আমার কাছেও তো হার্ডকপি এবং সফটকপি মিলে প্রায় শ-দুয়েক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই রয়েছে, কোন একটি তথ্য প্রমানের জন্য কি তাহলে আমি সেসব বইয়ের একটি তালিকা পেশ করবো? আপনি পণ্ডিত মানুষ, অনেক বই পড়েছেন, অনেক বইয়ের রেফারেন্সও দিয়ে সেসব পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। দেখুন, পৃথিবীর সব কিছু একই ফর্মুলায় পড়ে না। মাও সে তুং এর লং মার্চে গ্রামের কৃষকেরা ছিলেন, কারন দীর্ঘদিন ধরে তাদের সেভাবেই মোটিভেট করা হয়েছিল। বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহে কৃষকেরা যোগ দিয়েছিলেন, কারন সেসব বিষয় ছিল কৃষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, সেসব বিষয়ে তাঁরা যথাযথভাবে মোটিভেটেড ছিলেন। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সুপরিকল্পিতভাবে শুরু হয় নি, এর শুরুটা আকস্মিকভাবে, যার জন্য এমনকি আওয়ামী লীগেরও অনেকেই প্রস্তুত ছিলেন না। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে আকাঙ্খা, মোটিভেশন এবং প্রস্তুতি বলতে যদি কিছু থেকে থাকে, তা সবচাইতে বেশী ছিল ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্রদের মধ্যে, গ্রামের গরীব কৃষকের মধ্যে তা ছিল না। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সাথে মানসিকভাবে একাত্ম হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে গ্রামের বহু সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, কেবল ছাত্ররা নয়, এই সত্য বিভিন্ন বইয়ে আর তথ্যচিত্রেই স্পষ্ট। আপনার কাছে হার্ডকপি এবং সফটকপি মিলে যে প্রায় শ-দুয়েক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই রয়েছে তার মধ্যেই এই বক্তব্যের সমর্থনে প্রমাণ পাবেন। এমন একটি বিষয় নিয়ে তর্ক করাই অপ্রয়োজনীয়। আর "কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করে পাঠকদের সেসব পড়ে একটি তথ্য খুঁজে দেখতে বলাটা আমার কাছে এক ধরনের স্থুল রসিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নি" আপনার এই কথাটিই স্থুলতা বহন করছে এবং অতি হাস্যকর শোনাচ্ছে। কারণ কোনো বক্তব্যের সমর্থনে কিছু বলতে গেলে অবশ্যই তথ্যসূত্র উল্লেখ করেই কথা বলতে হয়। এটা রসিকতা কেউ বলতে পারে তা এই প্রথম দেখলাম। আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, হ্যাঁ যদি কোনো বক্তব্য আপনি দেন তাহলে আপনার সংগ্রহে থাকা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই থেকে সেই তথ্য প্রমাণের জন্য আপনি অবশ্যই প্রাসঙ্গিক বইয়ের তালিকা পেশ করবেন। সেটাই নিয়ম। আপনার কথা থেকেই বোঝা গেল এই অতি সাধারণ আর বেসিক নিয়মটা আপনার জানা ছিল না। এখন জানলেন।

আর কৃষকরা মুক্তিযুদ্ধ করার আগে মোটিভেটেড ছিল নাকি পরে মোটিভেটেড হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তা নিয়ে তো আলোচনা হচ্ছে না। আপনি বলেছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণই করেনি। যদিও আপনার শেষ মন্তব্যে বলেছেন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সাথে মানসিকভাবে একাত্ম হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। যখনই হোক, তারা তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আর তাদের সংখ্যা যে কম ছিল না সেই তথ্য তো বিভিন্ন বইয়ের মাধ্যমেই জানা যায়। আমি কর্নেল নূরউজ্জামান কী বলেছেন, কর্নেল তাহের কী বলেছেন তাও লিখেছি। কাজেই শুধু আবদুল কাইয়ুম খানের রেফারেন্স দিয়েছি আপনার বলা এই কথা ঠিক নয়। আর আমি তো বইয়ের নামই দিয়েছি। সব বই থেকে আমাকে কোট করতে হবে কেন? আপনি বই পড়ে দেখলেই বুঝবেন আপনার ভাবনা ঠিক নয়। আগ্রহ থাকলে বইয়ের নাম পেয়ে ঠিকই বই পড়বেন। আর যদি নিজে যা মনে করেন তাই নিয়েই কেবল তর্ক করার আগ্রহ থাকে তাহলে হাজার বার বইয়ের নাম বললেও কোনো বই স্পর্শও করবেন না।

আর যদি পারেন তো আপনার সংগ্রহে থাকা প্রায় শ দুয়েক মুক্তিযুদ্ধের বই থেকে এমন তথ্য উল্লেখ করুন যেখানে বলা আছে যে মুক্তিযুদ্ধে কেবল গ্রামের ছাত্ররাই অংশগ্রহণ করেছিল আর অশিক্ষিত নিম্নবর্গের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। আমি তো অনেক বইয়ের নাম উল্লেখ করেছি। আপনার বক্তব্যের সমর্থনে বই আর গবেষণার নাম আপনি উল্লেখ করুন। দেখি আপনার ধারণার ভিত্তি কী। সরাসরি যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাঁদের বক্তব্য আর বর্ণনা আপনি মানছেন না। কিসের ভিত্তিতে আপনি এই ধারণা তৈরি করলেন? ব্যাপারটা স্পষ্ট যে আপনার বক্তব্য কেবল আপনার নিজের ধারণা প্রকাশ করছে। তা সত্য তুলে ধরছে না। কারণ প্রকৃত ঘটনার যে বিবরণ আমরা পাই বিভিন্ন বই, ছবি আর তথ্যচিত্রে তা আপনার ধারণাকে সমর্থন করে না।

আপনি বললেন "বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহে কৃষকেরা যোগ দিয়েছিলেন, কারন সেসব বিষয় ছিল কৃষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট।" মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, মানুষ মারছে আর গ্রামের মানুষের রুখে দাঁড়াবার প্রয়োজন পড়েনি? আপনার কথা শুনে মনে হয় কৃষকরা অতি স্বার্থপর। তাদের জন্য লাভজনক না হলে তারা কোনো আন্দোলনে যাবে না। কোথায় পেলেন এই ধারণা যে বাংলাদেশের কৃষকদের দেশপ্রেমের বোধ নেই? কর্ণেল তাহেরের যে কথা কোট করেছি সেই কথা শুনে কী মনে হয় গ্রামের মানুষ কেবল তাদের স্বার্থের জন্য জীবন বিপন্ন করে পাকিস্তানি বুলেটের মুখোমুখি হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছে? সশস্ত্র প্রতিরোধ আর জীবন বিপন্ন করে শক্তিশালী পক্ষের বিরুদ্ধে মানুষ কাজ করে চেতনা আর দেশপ্রেম থেকে। স্বার্থ দেখলে মানুষ রাজাকার হতে পারে, মুক্তিযোদ্ধা নয়। বাংলাদেশের শুধু নয় সারা বিশ্বেই বিপ্লব আর আন্দোলন হয়েছে চেতনা থেকে। স্বার্থচিন্তায় মগ্ন মানুষ বিপ্লব করতে পারবে না। স্বার্থ আর চেতনা এই দুইয়ের পার্থক্য অনুধাবন করুন আগে। আর মুক্তিযুদ্ধ, বিদ্রোহ, বিপ্লব এই শব্দগুলির ব্যাপকতাও অনুধাবন করুন। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে মানুষ দর কষাকষি করে, জীবন বিপন্ন করে যুদ্ধে যায় না। সেজন্য চেতনা প্রয়োজন হয়।

আপনার সেই তথ্য আমলে নেইনি কারণ তোফায়েল আহমদ বা অন্য কারো কথা আপনি বলেছেন এবং কার কথা তা আপনার মনে নেই। আর সেই কথার যুক্তিও অগ্রহণযোগ্য। নকল মুক্তিযোদ্ধা বেড়ে গেছে বলে মিলিশিয়া বাহিনি করা যায়নি। নকল মুক্তিযোদ্ধা চেনা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া কি কঠিন কোনো কাজ ছিল? মিলিশিয়া বাহিনি তৈরির ক্ষেত্রে অন্য বাধা এসেছিল। এই নিয়ে পিলখানায় প্রায় যুদ্ধও বেঁধে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। আরও অনেক ঘটনাই আছে। মিলিশিয়া বাহিনি কেন তৈরি করা যায়নি তা বোঝাও কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। আর তৈরি যে করা যায়নি তার দায়ভারও কাউকে নিতে হবে। সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেনি কেবল ছাত্ররা করেছে আর তারা মুক্তিযুদ্ধের পর লেখাপড়া করতে ফিরে গেছে আবার ব্যাপারটা অতো সহজ ছিল না।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন। আপনার এই পোষ্টের মূল ইস্যু ছেড়ে গৌণ(এই পোষ্টের জন্য) একটি ইস্যু নিয়ে খামাখা অনেক কথা হল। তবে আপনি যেমনটা বলেছেন "বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে গ্রামের বহু সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, কেবল ছাত্ররা নয়, এই সত্য বিভিন্ন বইয়ে আর তথ্যচিত্রেই স্পষ্ট" তার যথাযথ প্রতিফলন আপনার পোষ্ট কিংবা মতামত অংশে প্রকাশ পায় নি। কাইয়ুম খানের এক লাইনের একটি উদ্ধৃতি ছাড়া আর কোন উদ্ধৃতিতে এটা স্পষ্ট নয় যে লেখক বলেছেন "গ্রামের গরীব কৃষকেরাই" গ্রাম থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহন করা সিংহভাগ মুক্তিযোদ্ধা। আর আমি যেহেতু স্কুলের ছাত্র হলেও গ্রামে থেকে নিজের চোখে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, আমার আত্মীয় স্বজনের মধ্যেই বহু মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, এবং আরও বহু মুক্তিযদ্ধাকে আমি চিনি ও জানি, সে আলোকেই আমি মতামত ব্যাক্ত করেছি। আসুন এক কাজ করি, মফঃস্বলের একটি উপজেলার কয়েকটি গ্রামকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচন করে সেখানের মুক্তিযোদ্ধারা ৭১এ কোন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন তা বের করি। ঢাকার আশেপাশের কোন একটি জেলা হলে ভাল হয়।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

গ্রামের মানুষরা মুক্তিযুদ্ধ করেনি, তাদের মোটিভেশন থাকার কথা না, কেবল ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধ করেছে আপনার বলা এই কথাগুলো প্রতিষ্ঠা করা বা এর উল্টো কথা প্রমাণ করা তো আমার লেখার উদ্দেশ্য ছিল না যে আপনি এমন প্রসঙ্গ আমার লেখায় আশা করছেন। আপনি একই কথা বার বার বলতে বাধ্য করেন, তাই বাধ্য হয়েই আবারও বলছি যে আবদুল কাইয়ুম খানের বই থেকে বক্তব্য প্রাসঙ্গিকভাবেই আমার লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর আবদুল কাইয়ুম খান যে বক্তব্য দিয়েছেন গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তেমন বক্তব্য প্রায় সব লেখকই দিয়েছেন। সেই প্রমাণ দেয়ার জন্য আপনাকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন বইয়ের নাম জানিয়েছি। সেই লেখকদের উল্লেখ করা বক্তব্যই গ্রহণযোগ্য। আপনার বক্তব্য গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিক কারণ আপনি নিজেও দেখাতে পারেননি। আপনি আপনার আত্মীয় স্বজনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেন, অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে চেনেন বললেন আর ধরে নিচ্ছি তাঁদের কথা অনুযায়ী আর আপনার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আপনি আপনার ধারণা শক্তভাবে আঁকড়ে আছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার সহ আরো বিভিন্ন খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধার দেয়া বিবরণ বিশ্বাস করতে আপনি নারাজ। আপনি গবেষণা করার কথা বলছেন, আপনার যেমন নিজের মত আঁকড়ে থাকার মানসিকতা দেখছি এবং বিভিন্ন বইয়ের বক্তব্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার প্রবণতা আপনি দেখাচ্ছেন, এবং বইয়ের নাম উল্লেখ করাকে 'স্থুল রসিকতা' মনে করছেন আপনার আচরণ অবশ্যই কোনো গবেষকের মতো নয়। নিজের গ্রামের উদাহরণ আর নিজের আত্মীয়দের উদাহরণ দেখে আপনি সারা দেশের সব অঞ্চলে একই ব্যাপার ঘটেছিল তাই মনে করেন আর বহু বইয়ে লেখা বিবরণ অস্বীকার করেন এমনকি তা পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করেন না আর আপনি বলছেন গবেষণার কথা!!

সত্যি কথা বলতে কী আপনার সাথে এমন আলোচনা করে কেবল সময়ই নষ্ট হচ্ছে। আপনি যেভাবে কথা বলছেন তাতে করে আপনি আমার মূল লেখা আর মন্তব্যগুলোও ঠিকমতো পড়েছেন বলে মনে হয় না। কারণ আপনি ঘুরেফিরে কেবল কাইয়ুম খান নিয়েই পড়ে আছেন। আমার মন্তব্যে যে আমি আরো বইয়ের নাম উল্লেখ করেছি তা আপনার চোখে পড়ছে না যাদের বক্তব্য কাইয়ুম খানের থেকে ভিন্ন নয়। অথবা আপনি ঠিকই বুঝেছেন কিন্তু জোর করে তর্ক করার জন্য আপনি সেসব ব্যক্তির বলা কথাগুলোর ধারে কাছেও যাচ্ছেন না। আর আমাদের গ্রামগুলি থেকে বহু সাধারণ মানুষ যারা ছাত্র নয় তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন কিনা নাকি শুধু গ্রামের ছাত্ররাই যুদ্ধ করেছে এই তথ্য জানার জন্য নতুন গবেষণা করার তো কোনো দরকার নেই। গত ৪৬ বছরে বহু বই প্রকাশিত হয়েছে আর গ্রামের কারা যুদ্ধ করেছেন সেই তথ্য সেইসব বইতে আছে। তথ্যচিত্র দেখুন। তাহলে বুঝবেন আমার কথার প্রতিফলন আছে কি নেই। মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ুন। দেখেন সেখানে আপনার একটি ধারণাও সমর্থন করার মতো কোনো লাইন আমাকে দেখাতে পারেন কিনা। আমি জানি যে পারবেন না। তার পরও আপনি আপনার ধারণাই আঁকড়ে থাকবেন। আর অন্য কেউ বইয়ের নাম বললে উদ্ভট আর হাস্যকর কথা বলবেন। পারলে আপনার মতো ধারণা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এমন মানুষদের বর্ণনায় এসেছে তা আমাকে দেখান। আপনার আত্মীয় আর জানাশোনা মুক্তিযোদ্ধারাই দেশের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা নয়। আপনার বক্তব্য যে কতোটা দুর্বল!! জেনারালাইজেশন কী প্রকট আপনার কথায়।

আপনার এমন ধারণার কথা তো আর কাউকেই বলতে শুনিনি। বরং নিম্নবর্গের মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার কথা অনেক লেখক আর মুক্তিযোদ্ধারা লিখেছেন। কাজেই আপনার কথা যৌক্তিক মনে করার কোনোই কারণ নেই। আর আপনি কেবল নিজের গ্রামে যা দেখেছেন সেটাকেই সারা দেশেও সত্যি মনে করছেন। অন্য মানুষরা নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বইয়ে কী লিখেছেন তা নিয়ে ভাবার কোনো আগ্রহ আপনার নেই। আপনি মনে করেন নিজে যা বোঝেন তাই ঠিক। অন্যদের বই পড়ার প্রয়োজনীয়তাও আপনি অনুভব করেন না। আপনার মতো যারা এমনভাবে চিন্তা করে অভ্যস্ত, যাদের মন এমন সংকীর্ণ আর বদ্ধ চিন্তা দ্বারা আচ্ছন্ন তাদের হাজার যুক্তি দিলেও তারা সেই যুক্তি গ্রহণ করবেন না। কাজেই সেই মানুষদের সাথে কথা বলা মানে শুধুই সময় নষ্ট করা। আর আমি যা বললাম তা আপনার আচরণ দেখেই বলেছি। এবং ব্যাখ্যা করে যুক্তি দিয়েই বলেছি।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

"গ্রামের মানুষরা মুক্তিযুদ্ধ করেনি, তাদের মোটিভেশন থাকার কথা না" এমন কথা আমি কোথাও বলি নি, এটা আপনার একন্তই সকপোলকল্পিত একটি কথা। আমি বলেছি গ্রাম থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অধিকাংশই ছাত্র, "গরীব কৃষক" নয়। আবারও বলছি, কাইয়ুম খানের একটি লাইন ছাড়া আপনার দেয়া আর কোন উদ্ধৃতি এটা নির্দেশ করে না যে, আমাদের অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন গ্রামের "গরীব কৃষক"। আর আপনার একটি ধারনা অন্যদের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য শুধু কয়েকটি বইয়ের নাম বলে দেয়াই যথেষ্ট নয়, সেই সব বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দেয়াই উচিৎ, এটা কি আপনআর কাছে সংগত মনে হচ্ছে না?

আর যে বললাম- আসুন এক কাজ করি, মফঃস্বলের একটি উপজেলার কয়েকটি গ্রামকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচন করে সেখানের মুক্তিযোদ্ধারা ৭১এ কোন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন তা বের করি, তাহলেই তো সহজেই নিরসন হয় আমার ভুল ধারনার, কিংবা আপনার।

আমি এই বিষয় ছাড়া আপনার লেখার অন্য কোন দিক নিয়ে কী কথা বলি নি? আমার প্রথম মন্তব্যটি আবার একটু পড়ে দেখবেন?

নাদির জুনাইদ এর ছবি

"আমাদের এলাকায় আমার পরিচিত যাঁরা তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে তালিকা থেকে আব্দুল কাইয়ুম খান বর্নিত তথাকথিত গ্রামের গরীব কৃষক কাউকে তেমন একটা বের করতে পারি নি।"

"মুক্তিযুদ্ধে যাঁরাই যোগ দিয়েছেন, তাঁরা সেটা করেছেন একটা মোটিভেশন থেকে। বাস্তব কারনেই সেই মোটিভেশন ছাত্রদের মধ্যে কাজ করেছে অনেক বেশী। সাধারন কৃষক শ্রেনীর মানুষদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করার মত মোটিভেশন ছিল বলে আমার মনে হয় না।"

"সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে আকাঙ্খা, মোটিভেশন এবং প্রস্তুতি বলতে যদি কিছু থেকে থাকে, তা সবচাইতে বেশী ছিল ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্রদের মধ্যে, গ্রামের গরীব কৃষকের মধ্যে তা ছিল না।"

উপরের কথাগুলি তো আপনারই বলা। আপনার যেন মনে পড়ে তাই বোল্ড করে দিলাম। কী অর্থ দাঁড়ায় কথাগুলির? আপনি আপনার গ্রাম থেকে তথাকথিত কোনো গরীব কৃষক মুক্তিযোদ্ধা বের করতে পারেননি। তাই আপনি ভাবছেন সারা দেশেই গ্রামের কৃষক মুক্তিযুদ্ধে কম ছিল। তাই ভাবছেন না? আর মোটিভেশন তাদের ছিল না সেই কথা তো বার বার বলেছেন। তাহলে এইসব কথা আমার বানানো হবে কেন? আপনি যে বলেছেন তা আপনার কথা কোট করেই আপনাকে মনি করিয়ে দিলাম। আর গ্রামের কৃষকরা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মেজরিটি ছিল তা নিয়ে তো তর্ক হচ্ছে না। বরং আপনি বলেছেন ছাত্ররা মেজরিটি ছিল আর কৃষকদের মোটিভেশন না থাকায় তারা অংশই নেয়নি। বা নিলেও কম নিয়েছে। কিন্তু বহু মানুষের বর্ণনা থেকে জানা যায় গ্রামের অশিক্ষিত সাধারণ মানুষরাও বিপুল পরিমাণে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল যে তথ্য আপনি মানতে চাইছেন না। এখানে 'অধিকাংশ' ব্যাপারটা আপনার বলা ছাত্রদের সম্পর্কে। আমি অধিকাংশ নিয়ে কোনো কথা বলিনি। আপনার 'অধিকাংশ ছাত্র' থিওরি ঠিক না আমি তা বলছি অনেক বইয়ের রেফারেন্সের মাধ্যমে। আর সেইসব বইয়েও কেউ আপনার মতো 'অধিকাংশ' বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় নি। বরং গ্রামের বহু সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন তাঁরা তাই বলেছেন। আর আরেকটি কথা, গ্রামের বহু সাধারণ মানুষের কিন্তু ছাত্র হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। গ্রামে বিপুল পরিমাণে ছাত্র নেই। কিন্তু আপনি আপনার গ্রাম থেকে দেখা দৃশ্যের ভিত্তিতে বলতে চাইছেন মুক্তিযুদ্ধে কেবল গ্রামের ছাত্রদেরই বেশি অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু অন্য অনেক বইয়ে বলা আছে গ্রামের বহু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কথা। সেই তথ্যের দিকে আপনি তাকিয়ে দেখতেও চান না। আপনার এই অনীহা কী নির্দেশ করে আপনিই ভাবুন। এটাই কি মনে হচ্ছে না যে আপনি বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের বইয়ে লেখা কথা শুনতে চান না। তা সত্য বলে মনে করেন না। কেবল নিজে যা সঠিক মনে করেন তাই আঁকড়ে থাকতে চান। এমন মানসিকতা তো অত্যন্ত নেতিবাচক।

আর আবারো বলছেন দৈবচয়নের ভিত্তিতে গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধা বাছাই করার কথা। গতকাল যে বললাম আপনি আমার মন্তব্য না পড়েই কথা বলেন তা তো আবার প্রমাণিত হলো। গতকাল যা বলেছি তা আবারো বলছি যদি এইবার আপনার চোখে পড়ে -- "আর আমাদের গ্রামগুলি থেকে বহু সাধারণ মানুষ যারা ছাত্র নয় তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন কিনা নাকি শুধু গ্রামের ছাত্ররাই যুদ্ধ করেছে এই তথ্য জানার জন্য নতুন গবেষণা করার তো কোনো দরকার নেই। গত ৪৬ বছরে বহু বই প্রকাশিত হয়েছে আর গ্রামের কারা যুদ্ধ করেছেন সেই তথ্য সেইসব বইতে আছে। তথ্যচিত্র দেখুন। তাহলে বুঝবেন আমার কথার প্রতিফলন আছে কি নেই। মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ুন। দেখেন সেখানে আপনার একটি ধারণাও সমর্থন করার মতো কোনো লাইন আমাকে দেখাতে পারেন কিনা।"

আর গ্রামের মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সত্যতার পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আমার মন্তব্যে আমি বার বার উল্লেখ করেছি। ওই যে বললাম আপনি তো আমার মন্তব্য না পড়েই কথা বলেন। যার কারণে বার বার আপনি একই কথা বলেন। কোনো নতুন তথ্য নেই, বক্তব্য নেই। আমার মন্তব্যগুলো সব উপরে আছে। পড়ার আগ্রহ থাকলে পড়ে দেখুন। তারপর কথা বললে তাও আপনার বক্তব্য একটু হলেও ভাল শোনাবে।

আর আপনি তো বয়স্ক মানুষ। ১৯৭১ সালে স্কুলে পড়তেন। এই সাধারণ ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না বহু মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের বইয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা লিখেছেন। আর আপনি সেই সব বই ইগনোর করে কেবল আপনার গ্রামে কী দেখেছেন তা নিয়ে আপনার বক্তব্য অন্ধের মতো বলে যাচ্ছেন। আপনার গ্রাম দিয়ে পুরো দেশ বিচার করবো কেন? আপনার গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ যদি রাজাকার হতো, তাহলে কী সেই হিসাবে আমাদের বিশ্বাস করতে হতো যে পুরো দেশের সব গ্রামে মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে রাজাকারের সংখ্যা বেশি ছিল? বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের বই পড়ুন। কেবল আপনার গ্রাম আর আপনার আত্মীয়দের উদাহরণের বাইরে আসুন। মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়ার কথা তো কোট করেছি। ওনাকে চেনেন? গণযোদ্ধাদের নিয়ে ওনার গবেষণার কথা জানেন? সেই বিষয়ে ওনার লেখা কতকগুলো বই আছে জানেন? আপনি কেবল আমাকে কোট করার কথা বলছেন কেন? বই থেকেও তো অনেক লাইন আমি তুলে দিয়েছি আপনার জানার জন্য। আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে আপনি সেগুলো পড়েননি। মেজর কামরুলের বই নিজে সংগ্রহ করে পড়ুন। আরো বহু বই পড়ুন। দেখবেন গ্রামের সাধারণ মানুষের মোটিভেশন কতো অসাধারণ ছিল আর তারা কতো সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে। আর তাদের সংখ্যাও কতো বেশি ছিল।

কর্নেল তাহের, কর্নেল নূরউজ্জামানের কথা তো আমার মন্তব্যে লিখেছি। সেগুলো আপনার চোখে পড়েনি? ওনাদের কথা পড়ে অনুধাবন করুন ওনারা কী লিখেছেন আর তার অর্থ কী আর কিভাবে ওনাদের কথা আপনার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। আপনার চেয়ে তো ওনারা মুক্তিযুদ্ধ বেশি দেখেছেন, তাই না? নাকি আপনি দাবী করবেন কর্নেল তাহের, কর্নেল নূরউজ্জামান, মেজর কামরুল, মেজর কাইয়ুম ওনাদের বইয়ে লেখা তথ্য সব ভুল আর আপনার নিজের গ্রামের চিত্রই মুক্তিযুদ্ধের আসল চিত্র? আসলেই হাসিই পাচ্ছে আমার আপনার সাথে এমন আলোচনা করতে করতে। মনেই হচ্ছে না কোনো বয়স্ক মানুষের সাথে কথা বলছি। তবে অনেক হয়েছে। আপনার সাথে কথা বলে আমি আর সময় নষ্ট করতে রাজী নই। যে নিজের বলা কথা নিজেই অস্বীকার করে আর একের পর এক অযৌক্তিক কথা বলতে থাকে তার সাথে অনেক ধৈর্য নিয়েই কথা বলেছি। কিন্তু এইভাবে আপনার মতো মানুষের সাথে কথা বলা ১০০ ভাগ পয়েন্টলেস। শুধু শুধু অনেকটাই সময় নষ্ট হলো আমার।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আপনার বহু মূল্যবান অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে বলে দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু তার জন্য আমাকে দোষারোপ করা কেন? আপনি কি ভেবেছিলেন আপনি লিখেছেন, এই খুশীতে সবাই বাকুম বাকুম করবে আর বাহবা বাহবা বলে তালি দিয়ে যাবে? যদি আপনার লেখার যৌক্তিক মূল্যায়ন সহজভাবে গ্রহন করতে না পারেন, তাহলে আর পাবলিক প্লেসে তা পোষ্ট করেছেন কেন, আপনার নিজের খেরো খাতায় লিখে নিজেই বারংবার পড়ুন, কারো কিচ্ছুটি বলার প্রশ্ন আসবে না। আমাদেরও সময় একেবারে ফালতু নয় যে বিবেচনাবোধহীন কারো সঙ্গে বেহুদা প্যাচাল তার অপচয় করে বেড়াবো।

শেষ কথাটি বলি, আমি বলেছিলাম- "বাহিনীবহির্ভুত যারা যুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ ছিলেন ছাত্র। যুদ্ধ শেষে তারা আবার স্কুল কলেজে ফিরে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক এবং সেটাই হয়েছিল, অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। আমাদের এলাকায় আমার পরিচিত যাঁরা তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে তালিকা থেকে আব্দুল কাইয়ুম খান বর্নিত তথাকথিত গ্রামের গরীব কৃষক কাউকে তেমন একটা বের করতে পারি নি।"
আপনি শুরু থেকেই আমার এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বহু কথা গেলেন এবং বারংবার কয়েকজন মুক্তিযদ্ধা/লেখকের নাম উল্লেখ করে গেলেন। আমি বার বার জিজ্ঞেস করলাম, কাইয়ুম খান ছাড়া উল্লিখিত লেখকদের কোন লেখা প্রমান করে যে অংশগ্রহণকারী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছাত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। আপনি বারংবার আমার সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যেয়ে অপ্রাসঙ্গিক দীর্ঘ মন্তব্য করে গেলেন।

সর্বশেষে যখন প্রস্তাব করলাম চলুন তাহলে একটি অঞ্চলে যৌথ জরিপ করে দেখি তখন কোন শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণ কি পরিমান ছিল, তখন প্রকারান্তরে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলেন।

আসলে আপনার এজেন্ডা ছিল ভিন্ন। মুভি রিভিউয়ের নামে খান আতাউর রহমানের নামে ওঠা গুরুতর অভিযোগটকে নিউট্রালাইজ করার চেষ্টা। তাতে পুরোপুরি সফল না হওয়ায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আমার লেখার যৌক্তিক মূল্যায়ণ আপনি করলে তো খুশিই হতাম। কিন্তু আপনি যেভাবে কথা বলেছেন আপনার প্রথম মন্তব্য থেকে তা তো কেবলই গোঁজামিল, ব্যক্তিগত ধারণা দেয়া, ভুল যুক্তি, ইতিহাস আর গবেষণা সম্পর্কে ধারণা না থাকা, নিজের দেয়া বক্তব্য অস্বীকার করা প্রভৃতি। কোনো বিষয় নিয়েই কোনো যৌক্তিক মূল্যায়ণের ধারে কাছে তো আপনি যাননি। কেবল করেছেন অত্যন্ত অযৌক্তিক মন্তব্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। আর সেই মন্তব্যগুলো আমি এক এক করে খন্ডন করলাম। আর আমার একটি যুক্তির উত্তরও আপনি দিতে পারেননি। বার বার কথায় না পেরে অবশেষে এখন মিথ্যা আর কল্পিত অভিযোগ করা এবং অশোভন কথা বলা শুরু করেছেন। আপনার কালচারাল স্ট্যানডার্ড আর রুচি যে কতোটা নীচু তা তো স্পষ্ট হলো এই পাবলিক স্পেসে।

আর বার বার বলে যাচ্ছেন অপ্রয়োজনীয় গবেষণার কথা। আপনি তো গবেষণালবব্ধ তথ্য যে বিভিন্ন বইতে পাওয়া যায় সেইসব বই ছুঁয়েও দেখেন না। এতো কথা বললেন একটি বইয়ের নাম আপনি উচ্চারণ করতে পারেননি। বইয়ের নাম বলা হলে বার বার কাইয়ুম খানের বইতে কি লেখা আছে তার বিরুদ্ধে নিজের অযৌক্তিক দাবী আউড়ে যাচ্ছেন। অন্যদের বইয়ের বক্তব্য যে আপনার কথা ভুল আর কাইয়ুম খানের কথা সঠিক তা নির্দেশ করে তা নিয়েও কথা বলছেন না। নিজে বই পড়েন এমন কোনো প্রমাণ আপনার কথায় তুলে ধরতে পারেননি, বইয়ের নাম উল্লেখ করাকে মনে করেন স্থুলতা আর আপনি বলছেন গবেষণার কথা!! গবেষণা শব্দটি উচ্চারণ করতেও আপনার লজ্জা হওয়া উচিৎ।

তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলে তো আপনার মতো অশোভন কথা বলতাম। বরং আপনার বার বার বলা অসংলগ্ন কথার বিপরীতে ধৈর্য ধরে আপনাকে যুক্তি দিয়েছি আর নিজের সময় নষ্ট করেছি। আপনি তো নিজের কথা নিজেই অস্বীকার করেন। আপনি যে এক মন্তব্যে বললেন আপনি কিছু কথা বলেননি আর আমি যে আপনার কথা কোট করে দেখালাম যে আপনি বলেছিলেন সেই জন্য আপনার লজ্জা হচ্ছে না? নিজের সেই ভুল সম্পর্কে তো একটি কথাও আপনার 'তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা' এই মন্তব্যে দেখলাম না। লজ্জাবোধ তো থাকা উচিৎ যে নিজে বলে আবার নিজেই নিজের কথা অস্বীকার করেছেন আর তার প্রমাণও দেয়া হয়েছে।

"আমি বার বার জিজ্ঞেস করলাম, কাইয়ুম খান ছাড়া উল্লিখিত লেখকদের কোন লেখা প্রমান করে যে অংশগ্রহণকারী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছাত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। আপনি বারংবার আমার সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যেয়ে অপ্রাসঙ্গিক দীর্ঘ মন্তব্য করে গেলেন।" আমার মন্তব্যগুলোতে যে বইয়ের নাম আছে তা দিয়েছি কেন? আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যই তো। সেই বইগুলো পড়ুন। দেখবেন তা কখনো বলেনি গ্রামের ছাত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। বরং বলা আছে ছাত্রদের সাথে গ্রামের সাধারণ মানুষদের কথা। ছাত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে তো সবাই বলতেন ছাত্ররাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তা তো কেউ বলেননি। কী প্রমাণ হয়? আপনাকে বইয়ের নাম দিয়েছি, বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কোট করেছি কেন? বিনা কারণে? আপনাকে জবাব দিয়েছি উদাহরণ সহ বার বার আর আপনি বাজিয়ে যাচ্ছেন ফাটা রেকর্ড কাইয়ুম খান ছাড়া আমি আর কারো লেখার রেফারেন্স দেইনি। এতোগুলো বইয়ের নাম আপনাকে তাহলে দিলাম কী কারণে? আপনার বক্তব্য প্রতি মুহুর্তে প্রমাণ করছে আপনি আমার লেখা, মন্তব্য না পড়েই তর্ক করছেন। এইজন্য আপনি একই ফাটা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছেন। আপনার লজ্জিত হওয়া উচিৎ যে আপনি আমার মন্তব্য ঠিকমতো না পড়েই বার বার একই কথা বলে যাচ্ছেন।

আমার মুভি রিভিউতে খান আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে কথা বলার কোনো কারণ নেই। কারণ এটা মুভি রিভিউ। সেই অভিযোগ নিয়ে কথা বলার বিষয় নয়। এটা আমি রিভিউয়ের শুরুতেই বলেছি, আর যে কেউ পড়লেও বুঝবে। আপনার বোঝার ক্ষমতা নেই সেটা স্পষ্ট হলো। আর আপনি তো আমার লেখার কোনো নিন্দা করেননি। বরং আমার লেখাকে "বিশ্লেষনধর্মী এই চমৎকার লেখা" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কাজেই আমার তো আপনার প্রতি তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠার কারণ নেই। কিন্তু আপনি গ্রামের সাধারণ মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা নিয়ে যে কথা বার বার বলে যাচ্ছেন আমি তা সঙ্গত কারণেই অযৌক্তিক মনে করে আপনাকে পাল্টা যুক্তি দিয়েছি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য আমার যুক্তির পক্ষে উল্লেখ করেছি। আপনি আমার লেখাকে চমৎকার বলার পরও আমি আপনার কিছু অযৌক্তিক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। এটা থেকেই বোঝা যায় আমার অ্যাটিচিউড কেমন আর আমি আপনার কোন কথার বিরোধিতা করছি। আর আপনি অন্ধের মতো আপনার কথায় আটকে আছেন। যুক্তি দিতে না পেরেও আপনার কথা থেকে সরছেন না। বার বার যুক্তি দেয়া ছাড়া, আর যুক্তি উপেক্ষা করে একই কথা বলে যাচ্ছেন। আর এখন কথায় না পেরে করছেন ব্যক্তিগত আক্রমণ। নিজেই যেই লেখাকে 'বিশ্লেষনধর্মী চমৎকার লেখা' বলেছেন শুরুতে এখন সেই লেখাকে বলছেন খান আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বাতিল করার জন্য তৈরি করা লেখা। আপনি বুঝবেন কিনা জানি না বা আমার বলা উচিৎ আপনি আমার এই লাইনগুলো পড়বেন কিনা জানিনা কিন্তু আসল সত্য হলো আমি 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবিটি কোন অর্থ বহন করে তা মানুষের কাছে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। এই ছবির পরিচালক খান আতা না হয়ে অন্য কেউও হতে পারতো। এখানে পরিচালকের আইডিওলজি কী তা আলোচনার পরিবর্তে এই ছবিতে তিনি কী বক্তব্য প্রকাশ করেছেন তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আপনি বার বার আমার সাথে কথায় পরাজিত হচ্ছেন। যখন মানুষ যুক্তি দিতে পারে না তখনি তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু করে। আপনি বার বার দেখেছেন আপনার কথায় শোচনীয় সব ভুল। আমার যুক্তির বিপরীতে বার বার ওই একই কাইয়ুম খানের বইয়ে পড়ে আছেন। নিজে একটি কথাও যৌক্তিকভাবে বলতে পারছেন না। নিজের কথা নিজে অস্বীকার করে আবার আটকে যাচ্ছেন। এতোভাবে নাস্তানাবুদ হয়ে তাই এখন আমার এই লেখার এজেন্ডা কী ছিল তা আবিস্কার করার চেষ্টা করেছেন। এবং নিজের সংকীর্ণ মন যা পারে তা দিয়ে বের করেছেন কল্পিত এজেন্ডা - "মুভি রিভিউয়ের নামে খান আতাউর রহমানের নামে ওঠা গুরুতর অভিযোগটকে নিউট্রালাইজ করার চেষ্টা" করেছি আমি। আপনার চিন্তার মান যে কতো নীচু তাই প্রমাণ করলেন। অবজেকটিভ মুভি রিভিউ কী জিনিস সেই সম্পর্কেও আপনার ধারণা নেই। আপনাকে তা বোঝানোর চেষ্টা করা আর অরণ্যে রোদন করা যে একই ব্যাপার তা তো আমি বুঝে গেছি। আর যদি পারেন তাহলে যুক্তি দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করে দেখতে পারেন এই মুভি রিভিউ কিভাবে খান আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খন্ডনের চেষ্টা হতে পারে।

আপনি তো বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষদের বিপুল সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সত্য অস্বীকার করছেন। তাদের মোটিভেশন ছিল না তাই তারা অংশগ্রহণ করেনি তেমন, আর ছাত্ররাই বেশি অংশ নিয়েছে এই আপনার বক্তব্য আর আপনার বক্তব্যের ভিত্তি কেবল আপনার নিজের গ্রাম। কেবল নিজের গ্রামের উদাহরণ দিয়ে আপনি পুরো দেশের মুক্তিযুদ্ধের ধারা সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। এটা যে কতোটা হাস্যকর একটি ব্যাপার তা বোঝার ক্ষমতা থাকলে আপনি এই ব্যাপারে কথাই বলতেন না। জেনারালাইজেশন বা সাধারণীকরণ বলতে কী বোঝায় তাও আপনি জানেন না তা নিশ্চিত। আর আপনি বলেন গবেষণা করার কথা!!!

এতোই বদ্ধ চিন্তা দ্বারা আচ্ছন্ন আপনার মন যে বিভিন্ন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্যও আপনি ইগনোর করেন। তাঁদের বইয়ে কী লেখা আছে তা জানার বা তা মূল্য দেয়ার কোনো আগ্রহ আপনার কথায় পাওয়া যায় না। তাঁদের দেয়া বক্তব্য আপনার কাছে মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক। আপনার আসল উদ্দেশ্য কি এবং কোন চেতনা আপনি ধারণ করেন তা নিয়েই তো প্রশ্ন উঠবে এবং এমন প্রশ্ন ওঠাটাই তো যৌক্তিক।

আর আমার দেয়া যুক্তি, উদাহরণ আমলে না নিয়ে আপনি বার বার একই কথা বলে গেছেন আর তার বিপরীতে কথা বলে আমার সময় নষ্ট হয়েছে তার জন্য আমি আপনাকেই তো দোষারোপ করবো। যদি আপনি আপনার প্রতি মন্তব্যে একই কথা না বলে আর নিজের কথা নিজে অস্বীকার না করে বিভিন্ন যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তুলে ধরতেন তাহলে আপনার সাথে কথা বলে আমি আনন্দিত হতাম। কিন্তু আপনার প্রতিটি মন্তব্যে আপনি কী লিখেছেন তা তো দেখলো সবাই। আমার লেখার যৌক্তিক সমালোচনা করলে তো আমি খুশিই হতাম। কিন্তু আমার লেখার জন্য নয়, আপনার কথা খন্ডন করে যুক্তি দিয়ে করা আমার মন্তব্যগুলোর যথাযথ জবাব না দিতে পেরে আপনি ক্ষেপে গিয়েছেন। আর কথায় না পেরে ক্ষেপে গিয়ে অবশেষে শুরু করেছেন অশোভন কথা ব্যবহার করে ব্যক্তি আক্রমণ। আপনার চিন্তার আর কথার মান কতোটা নীচু তাই বোঝালেন সবাইকে এই পাবলিক স্পেসে। কথায় না পেরে, যৌক্তিক উদাহরণ দিতে ব্যর্থ হয়ে, নিজের বক্তব্য নিজে অস্বীকার করে, বহু মুক্তিযোদ্ধার বক্তব্য ইগনোর করার পর আপনি আমাকে অশোভন ভাষায় বলছেন 'লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলেন।' যুক্তিহীন, অসত্য আর কদর্য কথার কী স্পষ্ট এক উদাহরণ দেখালেন আপনি।

সবাই তো দেখছে আপনি কী বলেছেন আর আমি কী বলেছি। কার যুক্তি কেমন তাও স্পষ্টই আছে ওপরের প্রতিটি মন্তব্যে। আপনি যে আমার মন্তব্য না পড়েই তর্ক করছেন তাও তো স্পষ্ট আপনারই কথায়। নিজের কথা নিজে অস্বীকার করার পর তার প্রমাণ তুলে ধরলে সেই প্রসঙ্গে একটা কথাও উচ্চারণ না করে শুরু করেন ব্যক্তি আক্রমণ। এতো যুক্তিহীন আর অন্ধভাবে ক্রমাগত কথা বলার পর, কথায় না পারার পর, কোনো বই থেকে নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি উদাহরণও না দেখানোর পর, গবেষণার অতি প্রাথমিক নিয়ম সম্পর্কে ধারণা না থাকার পর আবার অন্যকেই 'লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলেন' এমন কথা বলতে পারতেন না নিজের লজ্জাবোধ থাকলে। আপনার চিন্তা, রুচি আর কথার মান যে অত্যন্ত নীচু আর কদর্য আপনার সর্বশেষ মন্তব্যের পর তো আর এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকে না।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আমার চিন্তা, রুচি আর কথার মান কেমন, ভাগ্যিস তার মানদণ্ড আপনার কাছ থেকে নেয়া সার্টিফিকেট অনুযায়ী নির্নিত হয় ন। আমি বহুদিন এই ব্লগেই লেখালেখি করছি, একটু গবেষনা করে দেখুন অন্য কেউ কখনো আমার সম্পর্কে আপনার মত এমন নির্বোধ ধারনা পোষণ করেছে কি না। তাহলেই আপনার নিজের সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়ে যাওয়ার কথা।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আমার বা অন্য কারো সার্টিফিকেটের তো দরকার নেই, আপনার নিজের কথাই তো সার্টিফাই করছে স্পষ্টভাবে যে আপনার চিন্তা আর রুচির মান কতোটা নীচু আর কদর্য। বিভিন্ন প্রমাণ আর যুক্তি দিয়ে বলা বক্তব্যের বিপরীতে নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ দেখাতে না পেরে আপনি অবশেষে করেন যুক্তিহীন ব্যক্তি আক্রমণ, ব্যবহার করেন অশোভন ভাষা। এরপর আপনার মানসিকতা কেমন তা বুঝতে তো কারো অসুবিধা হয় না।

আপনার আচরণের যে সমালোচনা করা হয়েছে তা যুক্তি দিয়ে শোভন ভাষা ব্যবহার করেই করা হয়েছে। আপনি যেমন করেছেন তেমনভাবে যুক্তি ছাড়া ব্যক্তিআক্রমণ আর অশোভন ভাষা ব্যবহার করে করা হয়নি। কাজেই আপনার আচরণের সমালোচনা কোনো 'নির্বোধ' সমালোচনা হয়নি। আর আপনি কী করেছেন? যুক্তি দিতে না পেরে নিজের বলা কথা নিজে অস্বীকার করেছেন, নিজের গ্রামে কী দেখেছেন প্রমাণ ছাড়া তা উল্লেখ করে তা দিয়ে সারা দেশের সব গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সময় কী ঘটেছিল সেই সম্পর্কে অত্যন্তু অযৌক্তিকভাবে ধারণা তৈরি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা সব বইয়ে যে গবেষণালব্ধ তথ্য এবং বহু প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা আছে তা আপনি কোনোভাবেই মানতে চান না, বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের বই থেকে তথ্য উল্লেখ করা আপনার কাছ মনে হয় স্থুল রসিকতা, নিজের বক্তব্যের সমর্থনে একটি বইয়ের নামও উচ্চারণ করতে পারেন না, বহু বইতে আপনার ধারণার বিপরীত বক্তব্য আছে তার প্রমাণ দেয়া হলে আপনি সেই প্রসঙ্গে একটি কথাও না বলে যুক্তিহীনভাবে বলেই যেতে থাকেন নিজের ধারণা। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, রণাঙ্গনের অন্য পরিচিত মুক্তিযোদ্ধারা এবং অজস্র প্রত্যক্ষদর্শী যা বলেছেন তা আপনি মানতে চান না আর বিশ্বাস করেন কেবল নিজের গ্রামে কী দেখেছেন আর নিজের আত্মীয়রা কী বলেছে সেই কথা। বিভিন্ন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার বর্ণনা আপনার কাছে সত্য মনে হয় না আর নিজের গ্রামে যা দেখেছেন তাই সারা দেশে আপনি সত্য বলে মনে করেন। আপনার কথা যে সাধারণীকরণের দোষে দুষ্ট আর বিভিন্ন অথেনটিক বক্তব্য থাকার পরও যে আপনার তা গ্রহণ করার ইচ্ছা নেই তাও তো স্পষ্ট। আপনার ভাবনায় এতো অসঙ্গতি, প্রেজুডিস আর যুক্তিহীনতা থাকার পর কী আর আপনার চিন্তা আর ধারণাকে 'বুদ্ধিদীপ্ত' বলার কোনো কারণ থাকতে পারে?

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্কুল পড়ুয়া হিসেবে আপনি মুক্তিযুদ্ধ এতো বেশি অনুধাবন করলেন আর মুক্তিযুদ্ধে মানুষের অংশগ্রহণ কিভাবে হয়েছে তা সঠিকভাবে (!) বুঝে গেলেন আর বিভিন্ন রণাঙ্গনে যারা সরাসরি যুদ্ধ করেছিলেন সেই বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধারা এবং অন্য বহু প্রত্যক্ষদর্শী সব মিথ্যা আর ভুল তথ্য দিলেন তাদের বইয়ে, তাই না? দেশের বিভিন্ন স্থানে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়া বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা আর অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া যে বিবরণ বহু বইতে পাওয়া যায় তাই যে সত্য তুলে ধরে আর কেবল একটি গ্রামে একজন কী দেখেছে তার ভিত্তিতে যে পুরো দেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যায় না তা বোঝার মতো সাধারণ বুদ্ধি সবারই আছে। আর বিভিন্ন বইতে মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া একই রকম তথ্য থাকার পরও কোনো যুক্তি না দেখিয়ে কেবল সাধারণীকরণ করা আর নিজের ব্যক্তিগত প্রমাণবিহীন ধারণার মাধ্যমে তা মানতে না চাওয়া আর তাকে মিথ বলা 'বুদ্ধিমত্তা' না 'নির্বুদ্ধিতা' সেটাও প্রতিটি সচেতন মানুষই বুঝতে পারেন।

সোহেল ইমাম এর ছবি

খুব ভালো লাগলো লেখাটা। মন্তব্য গুলোও পড়লাম। অনেক দিন থেকেই লেখাটা দেখে পড়বো পড়বো করেও পড়া হয়ে উঠছিলোনা কিছু ব্যস্ততার জন্য। এখন পড়লাম, আপনার বক্তব্যের সাথে এখন পর্যন্ত দ্বিমত হবার কোন কারণ দেখছিনা। স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে তার পরবর্তী বছর গুলোর ইতিহাস নিয়ে এখনও অনেক কিছু গবেষণার আছে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা, বিশাল একটা মিথ যার উপর নির্ভর করে আমাদের সৃজনশীলতা, আত্মত্যাগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শক্তি সঞ্চয় করে। আবার সেই মিথটাকে কেউ কেউ দেবতার বেদীর উপর বসিয়েও দেয় সে চেষ্টাটাও কম নেই এবং সেই চেষ্টার মধ্যে সুবিধাবাদ সহ এমন অনেক কিছুই আছে যা সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা মুশকিল। একদিন ইতিহাস আরো খানিকটা মুক্তি পাবে এই আশাতেই আছি। ইতিহাসকে দেখাটা শেষ হয়ে যায়নি, আরো গবেষণা হবে, এটাই আশার কথা। এই লেখাটার জন্য নাদির ভাই অনেক অনেক ধন্যবাদ।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আপনাকেও ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য আর মন্তব্যের জন্য।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

এই ছবিটা আশি দশকের শুরুতে দেখেছিলাম। আমার কৈশোরবেলায় মুক্তিযুদ্ধের উপর টিভিতে দেখানো একমাত্র সিনেমা। সে কারণে এই সিনেমার প্রতি একটা ভালো লাগা জড়িত। আরো একটু বড় হবার পর একটা প্রশ্নও জেগেছিল মনে।

মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা বলতে তখন আমরা স্কুল বালকেরা দুটি সিনেমার নাম শুনতাম। 'ওরা ১১জন' এবং 'আবার তোরা মানুষ হ'। প্রশ্নটা ছিল 'আবার তোরা মানুষ হ' একাধিকবার টিভিতে দেখানো হয়ে গেলেও 'ওরা ১১জন' একবারও টিভিতে দেখানো হয়নি। অথচ ওই সিনেমাটি দেখার জন্য আমরা খুব উৎসুক ছিলাম। জিয়া বা এরশাদের আমলে সরকারের মানসিক অবস্থানের সাথে 'আবার তোরা মানুষ হ' খুব বেশী দূরত্বের ছিল না বলে হয়তো এই সিনেমা প্রদর্শনে বাধা ছিল না। যে কারণে আবার তোরা মানুষ হ প্রদর্শনযোগ্য ছিল হয়তো সেই কারণে 'ওরা ১১ জন' প্রদর্শণযোগ্য ছিল না। বলা বাহুল্য, সেই যুগে বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা ইত্যাদি ছিল নিষিদ্ধ শব্দের কাতারে।

এতদিন বাদে খান আতা বিতর্কটি তোলার পর অতীতের সেই না মেলা সমীকরণগুলো মিলতে শুরু করেছে বলে মনে হয়।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

নাদির জুনাইদ এর ছবি

জিয়ার আমলে শাহ আজিজুর রহমান মন্ত্রী হয়েছিলো, এরশাদের সময় মওলানা মান্নান। এই মানসিক অবস্থান যদি বিবেচনা করি, আর তারপর বলি যে " জিয়া বা এরশাদের আমলে সরকারের মানসিক অবস্থানের সাথে 'আবার তোরা মানুষ হ' খুব বেশী দূরত্বের ছিল না" তাহলে আমার মতে ছবিটির প্রতি সুবিচার করা হয় না। কারণ এই ছবিটি রাজাকারদের পক্ষে কোনো বক্তব্য বা মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী কোনো বক্তব্য তুলে ধরেনি। সমালোচনা করা হয়েছে স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা সাজা অসৎ মানুষদের, আর যারা মুক্তিযোদ্ধাদের খাটো করছে সেই সুবিধাবাদী আর দুর্নীতিবাজদের। আবার তোরা মানুষ হ মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করেনি এক মুহুর্তের জন্যও। কিন্তু শাহ আজিজুর রহমান আর মওলানা মান্নানকে মন্ত্রী বানানো তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সরাসরি আঘাত। কাজেই এই ছবির বক্তব্যকে চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতাশালী করার মানসিক অবস্থানের সাথে মেলানো যায় না।

হ্যাঁ, আশির দশকে ওরা ১১ জন ছবির কেবল কিছু অংশই কদাচিৎ বিটিভিতে দেখানো হতো। তবে সেই সময় অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি যেমন আলোর মিছিল, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, ধীরে বহে মেঘনা, মেঘের অনেক রংও কদাচিৎই দেখানো হয়েছে। আবার তোরা মানুষ হ ছবিটিও খুব অল্পই দেখানো হতো। এমনকি যে ছবিগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি আসেনি, তবে ইনডিরেক্টলি এসেছে যেমন রূপালি সৈকতে, আবার যেখানে মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখ আছে যেমন ঘুড্ডি এমন ছবিও দেখানো হতো খুবই কম। আর এই সব ছবিরই অনেক অংশ কিন্তু বাদ দেয়া হতো। ছবির সব অংশই দেখানো হতো না।

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখককে ধন্যবাদ তার এই চমৎকার তথ্যবহুল পোস্টটির জন্য। কিছু বিষয়ে লেখকের সাথে জনাব আব্দুল্লাহ এ.এম এর বিতর্কের সুত্রে কয়েকটি বিষয়ে নিজের নিজের সামান্য মতামত তুলে ধরলাম। লেখক লিখেছেনঃ-

কাইয়ুম খান উল্লেখ করেছেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী প্রায় এক লক্ষ যোদ্ধার শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়। এদের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করা বাঙালি নিয়মিত সেনাসদস্যদের সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ হাজার। সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর সদস্য ছিল সাত থেকে আট হাজার। আর বাকী বিশালসংখ্যক যোদ্ধা ছিলেন বেসামরিক মানুষ যারা মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দেয়। এদের মধ্যেও অধিকাংশ ছিলেন গ্রামের দরিদ্র, সাধারণ মানুষ। (কাইয়ুম খান, পৃ. ১৭৭-১৭৮)।

এপ্রসঙ্গে ডিসেম্বর ২৮, ২০১৪ তে বনিকবার্তায় প্রকাশিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ এর শিক্ষক জনাব মো. শামসুদ্দোহা এর নিবন্ধ থেকে জানা যায়ঃ-

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত বিজয় মেলায় বিআইডিএসের গবেষকরা সমবেত ১৫৯ মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন। সে সাক্ষাত্কারে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই ১৫৯ মুক্তিযোদ্ধার ৭৮ শতাংশই ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা

অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে যে গ্রামের সাধারণ মানুষরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন তা ভিন্ন দুটি সূত্র (কাইয়ুম খান ও বিআইডিএসের গবেষকবৃন্দ) এবং ভিন্ন দুটি পদ্ধতির(প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও জরিপ) মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়।
এখন প্রশ্ন হল গ্রামের সাধারণ মানুষরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন কেন? এর একটা সম্ভাব্য উত্তর পাওয়া যেতে পারে তৎকালীন সময়ের জনমিতিক বৈশিষ্ঠ্যে। তৎকালীন সময়ে অধিকাংশ লোক গ্রামীণ জনপদে থাকত বলেই স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধে যে গ্রামের সাধারণ মানুষরাই প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছিল।
এই পোস্টে জনাব আব্দুল্লাহ এ.এম তার প্রথম মন্তব্যে উল্লেখ করেন

বাহিনীবহির্ভুত যারা যুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ ছিলেন ছাত্র। যুদ্ধ শেষে তারা আবার স্কুল কলেজে ফিরে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক এবং সেটাই হয়েছিল, অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। আমাদের এলাকায় আমার পরিচিত যাঁরা তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে তালিকা থেকে আব্দুল কাইয়ুম খান বর্নিত তথাকথিত গ্রামের গরীব কৃষক কাউকে তেমন একটা বের করতে পারি নি।

যদিও তিনি নিজে তার এ দাবির পক্ষে কোন তথ্যসুত্র উল্লেখ করেননি তবু তার মন্তব্যের পরবর্তি অংশ থেকে বোঝা যায় তার এ দাবির উৎস হলো তার নিজের অভিজ্ঞতা। এই প্রসঙ্গে আমার পর্যবেক্ষন নিম্নরূপ
একঃ- ঠিক যে কারনে (জনমিতিক বৈশিষ্ঠ্য) মুক্তিযুদ্ধে যে গ্রামের সাধারণ মানুষের ভূমিকাই ছিল প্রধান একই কারনে ছাত্রদের তুলনায় গ্রামের নিরক্ষর খেটে খাওয়া মানুষের ভূমিকাই প্রধান বলে আমার মনে হয়। কারন বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে পুরনো যে উপাত্ত পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় ২০০১ সনেও সমগ্র জনগোষ্ঠীতে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৮% (ছেলেদের মধ্যে ৫৪%)। সুতরাং তৎকালীন সময়ে সাক্ষরতার হার আরো কম হবে এইটুকু ধরে নিলে মুক্তিযুদ্ধে গ্রামের নিরক্ষর খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা স্বাভাবিক ভাবেই বেশি হবে।
দুইঃ- জনাব হাসান মোরশেদ এর দাসপার্টির খোঁজে # খসড়াপর্ব- ১ ব্লগে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জনাব সিকন্দর আলীর ভাষ্য

সিকন্দর আলী স্পষ্টভাষী। তার সাব-সেক্টর থেকে বীর প্রতীক উপাধি পেয়েছেন লেঃ রউফ, তারই সহযোদ্ধা। এই সাব-সেক্টরে দু চারজন সেনা কর্মকর্তা, কয়েক জন তরুন ছাত্র এবং বাকী সবাই তার মতো অর্ধ-শিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষেরা ছিলো। তিনি বলেন যুদ্ধ শেষে ছাত্ররা চলে গেছে পড়ালেখা করতে আমরা চলে আসছি হালচাষে আর আর্মির স্যারেরা পদক টদক সব নিয়ে গেছেন নিজেরাই, আমাদের খবর কেউ রাখে নাই কিন্তু যুদ্ধের সময় সবথেকে বিপদের কাজগুলো আমরাই করছি

এই পোস্টে জনাব আব্দুল্লাহ এ.এম তার দ্বিতীয় মন্তব্যে উল্লেখ করেন

এদের সিংভাগই হল গ্রামের ছাত্র, খুবই অল্প সংখ্যক অন্যান্য পেশাজীবী। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরাই যোগ দিয়েছেন, তাঁরা সেটা করেছেন একটা মোটিভেশন থেকে। বাস্তব কারনেই সেই মোটিভেশন ছাত্রদের মধ্যে কাজ করেছে অনেক বেশী। সাধারন কৃষক শ্রেনীর মানুষদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করার মত মোটিভেশন ছিল বলে আমার মনে হয় না

এই প্রসঙ্গে জনাব মো. শামসুদ্দোহা এর পর্যবেক্ষন-

ইতিহাসের পাতায় একটু পেছন ফিরে তাকালেই দেখা যায়, সুবিধাভোগী উচ্চবিত্তের লোকেরা প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে আন্দোলনে সহজে নামতে চায় না। যেমন— তেভাগা কিংবা নীল চাষ-বিরোধী আন্দোলন এলিট ক্লাস করেনি, বরং এলিট ক্লাস জমিদারদের বিরুদ্ধে এগুলো ছিল সাধারণ কৃষকের সম্মিলিত প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। আরেকটু পিছিয়ে গেলে দেখা যায়, ব্রিটিশবিরোধী সিপাহী আন্দোলনে অধিকাংশ সুবিধাভোগী জমিদারই ব্রিটিশদের পক্ষাবলম্বন করেছে। এটাই চিরসত্য। সুবিধাভোগীরা সংগ্রাম করে না, করে বঞ্চিতরা। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ’৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণে ঝাঁপিয়ে পড়া সমবেত লাখো জনতার শতকরা কয় ভাগ কৃষক শ্রমিকের বাইরে, তা সহজেই অনুমেয়

এবং এই নিউজের বরাতে জানা যায়

এদের সাথে ব্যাপক আলোচনাকালে জানা যায়, ১৯৭১ সালে এদেশের মানুষের উপর যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমন চালায়, তখন মুক্তিযোদ্ধারা দেশ মাতৃকার টানে এদেশের সাধারণ মানুষ ও মা বোনের ইজ্জত রক্ষার্থে ঝাপিয়ে পরে। তখন চাঁদপুর সহ বাংলাদেশের যে যে স্থানে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা বসবাস করতো, তারা তখন বসে থাকেনি। হরিজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠির যুবকরা তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। তার পাশাপশি হরিজন নারীরা ঘরে বসে থাকে নাই। তারাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে মুক্তিযুদ্ধাদের সহযোগীতায় এগিয়ে গিয়েছিলো। এ সম্প্রদায়ের নারীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে গিয়ে পাকিস্তানী পাক হানাদার বাহিনীর বড় ধরনের পদক্ষেপের কথা জানতে পেরে মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দিয়েছিলো।

এখনও বাংলাদেশে সবচেয়ে অবহেলিত হরিজন সম্প্রদায় যদি তৎকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে নিজের আগ্রহেই অংশগ্রহণ করে থাকে তাহলে জনাব আব্দুল্লাহ এ.এম এর দ্বিতীয় মন্তব্যে করা সাধারন কৃষক শ্রেনীর মানুষদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করার মোটিভেশন সংক্রান্ত পর্যবেক্ষনটি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়না।

অনেক কোটেশন থাকার কারনে মন্তব্যটি বড় হয়ে গেল। তার জন্য দুঃখিত। কিন্তু কোটেশন ছাড়া আমি আমার মতামত সঠিক ভাবে তুলে ধরতে পারতাম বলে মনে হয় না।
-- আতোকেন

নাদির জুনাইদ এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ এমন একটি সুবিন্যস্ত, তথ্যবহুল, অত্যন্ত গোছানো এবং যুক্তিনির্ভর মন্তব্যের জন্য। আপনার বক্তব্য প্রমাণের জন্য আপনি যেভাবে বিভিন্ন সূত্রের ব্যবহার করেছেন তা খুবই প্রশংসনীয়। আপনার মন্তব্যের কারণে আমারও কয়েকটি নতুন রেফারেন্স জানা হলো।

যে বিষয়টি নিয়ে আব্দুল্লাহ এ এম-এর সাথে কথা বলতে হয়েছে তা আসলেই প্রয়োজন ছিল না। কারণ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের গ্রামের বহু সাধারণ মানুষ যারা শিক্ষিতও ছিল না তারাও যে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই তথ্য তো বহু মুক্তিযোদ্ধা আর প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া বর্ণনা আর প্রকাশিত বইতেই লিপিবদ্ধ আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া বিবরণ তো মিথ্যা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ একজন মুক্তিযোদ্ধা তো আর এমন কথা বলেননি। বলেছেন বলতে গেলে সবাই। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ফোটোগ্রাফ আর তথ্যচিত্রেও গ্রামের সাধারণ মানুষদের যুদ্ধ করার প্রমাণ দেখা যায়। কাজেই আব্দুল্লাহ এ এম কেবল তার নিজের গ্রামে কী দেখেছেন তার ভিত্তিতেই যখন সিদ্ধান্ত টানেন যে কাইয়ুম খান যা বলেছেন তা ভুল আর গ্রামের সাধারণ মানুষ অতোটা মুক্তিযুদ্ধ করেনি, অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই ছিল ছাত্র তাহলে এটাই বোঝা যাবে যে আব্দুল্লাহ এ এম সাধারণীকরণ করছেন আর বহু বইয়ে বর্ণিত তথ্যকে উপেক্ষা করছেন। কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপর লিখিত অনেক বইয়ের তথ্য ইগনোর করছেন, তাকে বার বার বিভিন্ন বইয়ের নাম বলার পরও কেন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা সেই সব বই আমলে নিচ্ছেন না এমন আচরণ প্রশ্ন তৈরি করে। এই আচরণ আর যাই হোক স্বাভাবিক মনে হয় না।

আপনি যেমন আপনার মন্তব্যে 'দাস পার্টির খোঁজে' নামক গুরুত্বপূর্ণ বইটি থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ করেছেন। এই বইটির নাম এবং আরো বিভিন্ন বই যেখানে গ্রামের অনেক সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা আমি আমার প্রথম মন্তব্যেই আব্দুল্লাহ এ এম-কে জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো ওনার কাছে এই ভাবে প্রাসঙ্গিক বইয়ের নাম উল্লেখ করা মনে হয়েছে স্থুল রসিকতা। তিনি বোঝেনও না যে তার এই কথাটিই কতোটা স্থুলতাসর্বস্ব একটি কথা হয়ে উঠেছে। যুক্তির সপক্ষে বক্তব্য তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন বইয়ের নাম বার বার বলার পরেও তিনি একবারের জন্যও বলেননি যে তিনি বইগুলো পড়ে দেখবেন। বরং তিনি বার বার বলে গেছেন একই কথা যে কাইয়ুম খানের বক্তব্যের সাথে মিল আছে এমন কোনো বক্তব্য নাকি আমি দেখাতে পারিনি। এতোগুলো বইয়ের নাম তাকে দেয়া হলো, বিভিন্ন কথা কোট করা হলো সেগুলো দেখেও তিনি ওই একই কথা বলে গেলেন। আপনার দেয়া বিভিন্ন রেফারেন্সকেও হয়তো তিনি স্থুল রসিকতা বলবেন। বইয়ের রেফারেন্স তিনি পছন্দ করেন না, তথ্যচিত্র, ছবি নিয়ে তার কোনো কথা নেই কেবল তিনি পড়ে আছেন তার নিজ গ্রাম নিয়ে। আবার তিনি বলেন গবেষণা করার কথা। গ্রামের বহু সাধারণ মানুষের যারা ছাত্র ছিল না তাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে গবেষণালব্ধ তথ্য আর প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ যে অনেক বইতে ইতিমধ্যেই আছে সেই সত্যকে তিনি এড়িয়ে যান বার বার। এমন যুক্তিহীনভাবে কথা বলা আর সাধারণীকরণ করা মানুষের সাথে আলোচনা করা তাই অর্থহীন একটি ব্যাপার হয়ে ওঠে।

আর গ্রামের সাধারণ মানুষের বিপ্লব আর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার মোটিভেশন থাকে না আব্দুল্লাহ এ এম-এর এমন বক্তব্যটি যে পুরোটাই ভুল তা তো আমাদের দেশের এবং নানা দেশের ইতিহাসই প্রমাণ করে। আপনার মন্তব্যে আপনি হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদাহরণটির মাধ্যমে খুব যৌক্তিকভাবে এই ব্যাপারে আপনার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। আপনার মন্তব্যে বিভিন্ন রেফারেন্সের চমৎকার ব্যবহারের প্রশংসা করছি আবারো। আর আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি আপনার যুক্তিনির্ভর এবং তথ্যবহুল মন্তব্যের জন্য। শুভেচ্ছা রইলো।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আতোকেন সাহেব,

বহুদিন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে দুটি মিথ প্রচলিত রয়েছে। নানা আলোচনা সভা এবং টক শো গুলোতে এই দুটি মিথ অহরহ পরিবেশন করা হয়ে থাকে। এর একটি হল- ক) মুক্তিযুদ্ধের সময় দু-একজন কুলাঙ্গার ছাড়া নিরানব্বই শতাংশ মানুষই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ছিলেন। খ) গ্রামের সাধারন গরীব কৃষকেরা বিপুল সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে এ দুটোর কোনটিই সঠিক নয়।

প্রথমত মুক্তিযুদ্ধকালে বহু মানুষই মনেপ্রানে স্বাধীনতার বিরোধী ছিল এবং স্বাধীনতাও মন থেকে মেনে নিতে পারে নি। দ্বিতীয়ত যেহেতু তখন সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করত, সুতরাং মুক্তিযোদ্ধাদের সিংহভাগই যে গ্রামের হবে তা তো বলাই বাহুল্য। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন খুব সহজ কোন ব্যাপার ছিল না, একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ বিপদসংকুল পথ দীর্ঘ সময় ধরে পাড়ি দিয়ে ভারতের কোন একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে পৌঁছতে হত। এই কাজটি একজন মোটিভেটেড মানুষের(ছাত্রের) জন্য সম্ভব হলেও গ্রামের সহজ সরল নিরক্ষর গরীব, দিন আনি দিন খাই টাইপের মানুষের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। ছাত্ররা মোটিভেটেড ছিল, কারন ৬৭ সাল থেকেই তাঁরা ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যেই ছিল। একাত্তরের ফেব্রুয়ারি মার্চে অনেক স্থানেই ছাত্ররা ডামি রাইফেল দিয়ে ট্রেনিংও নিচ্ছিল।

আমি নিজের চোখে যুদ্ধের প্রস্তুতি, যুদ্ধের সংগঠন দেখেছি। সে থেকে এবং পরবর্তীতে অর্জিত উপলব্ধি থেকে আমার মতামত ব্যাক্ত করেছি। এখনও খুব সহজেই আপনি একটা মোটামুটি ধারনা পেতে পারেন। যদি আপনার সাথে গ্রামের একটি যোগাযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেখানের যে কোন দশজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচিত হোন। তারপর তাদের প্রতিজনের পরিচিত আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করুন। এবার তাঁদের যুদ্ধকালীন সময়ের পেশার ব্যাপারে জেনে নিন। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, আমার মতামতের সাথে খুব একটা ফারাক পাবেন না।

নাদির জুনাইদ এর ছবি

"আমি নিজের চোখে যুদ্ধের প্রস্তুতি, যুদ্ধের সংগঠন দেখেছি।" ক'টা জেলায় দেখেছেন? ক'টা গ্রামে দেখেছেন? তখন না স্কুলে পড়তেন? এতো কম বয়সেই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন বুঝে গেলেন যে আপনার ধারণাই একশো ভাগ সত্য মনে করছেন আর বহু বিখ্যাত মু্ক্তিযোদ্ধার লেখা বক্তব্যকে কোনো গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তাই মনে করছেন না। নিজের মনের জানালা সব বন্ধ করে নিজে যা বিশ্বাস করেন তাই বলে যাচ্ছেন কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া? আপনার কাছে না মুক্তিযুদ্ধের উপর কয়েক শ বই আছে? সেসব বই থেকে একটা লাইন দেখান তো দেখি যেখানে আপনার মতামতের পক্ষে বক্তব্য আছে। আমি আর জনাব আতোকেন তো বিভিন্ন লেখকের ভাষ্য তুলে ধরলাম। আপনার চিন্তা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে তো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের লেখা বইতে আপনার বিশ্বাস করা ধারণার পক্ষেই বক্তব্য থাকবে। দেখান তো দেখি।

আর বার বার গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের উপর গবেষণা করার কথা বলছেন আপনি আপনার নিজের গ্রাম ছাড়া আর ক'টা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেছেন? ক'টা গ্রামে গবেষণার ভিত্তিতে আপনার ধারণা যে সত্য সেই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত হয়েছেন? আপনার ধারণা সঠিক তার প্রমাণ কী? কোনো বইতে এমন কথা লেখা নেই, বরং আপনি যা বিশ্বাস করেন তার বিপরীত কথা পাওয়া যায় বেশির ভাগ বইতে তাহলে আপনি কিসের ভিত্তিতে আপনার ধারণা সত্যি তা মনে করছেন? আপনার গ্রাম দিয়ে তো পুরো দেশ বিচার করা যাবে না।

আপনার কথা শুনে বোঝা যায় মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে হয়েছিল তা নিয়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বই আছে তার কোনো বই আপনি পড়েননি। কোনো তথ্যচিত্রও দেখেননি। গ্রামের সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেয়ার ক্ষেত্রে গ্রামের কতো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল সে সম্পর্কে সেক্টর কমান্ডার সহ বহু বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা কোন বিবরণ দিয়ে গেছেন তার কিছুই আপনার পড়া হয়নি, পড়ার আগ্রহও আপনার নেই। আপনি কেবল আপনার নিজের গ্রামে কী দেখেছেন আর আপনার আত্মীয়দের সাথে কথার ভিত্তিতে যে ধারণা করেছেন তাই বার বার বলে যাচ্ছেন। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের বিবরণ আপনি জানতে চান না। সে সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বার বার উল্লেখ করার পরও আপনি তা ইগনোর করে নিজের ধারণা বলে যান যে ধারণার পক্ষে কোনো বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার সমর্থন আপনি দেখাতে পারেন না। আপনার বক্তব্য কেবল আপনার নিজের ধারণা। আর এই ধারণা ভুল আর অসত্য কারণ কখনোই কেউ আপনার এই ধারণার পক্ষে কোনো বক্তব্য দেননি। বরং আপনার ধারণার বিপরীত বক্তব্যই সবার সমর্থন পেয়েছে, সবার বর্ণনায় তাই উঠে এসেছে।

অতিথি লেখক এর ছবি

জনাব আব্দুল্লাহ এ.এম
তেমন নতুন কোন কিছুই আপনার এ মন্তব্য হতে পেলাম না। লেখক ও আপনার মধ্যকার বিতর্ক এর ফলে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম, তাই তৃতীয় কোন সূত্র হতে থেকে যাচাই করে দেখতে চাওয়ার সুত্রে এই পোষ্টে প্রথম মন্তব্যটি করা।
১। আপনি বলেছেন

বহুদিন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে দুটি মিথ প্রচলিত রয়েছে। নানা আলোচনা সভা এবং টক শো গুলোতে এই দুটি মিথ অহরহ পরিবেশন করা হয়ে থাকে। এর একটি হল- ক) মুক্তিযুদ্ধের সময় দু-একজন কুলাঙ্গার ছাড়া নিরানব্বই শতাংশ মানুষই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ছিলেন। খ) গ্রামের সাধারন গরীব কৃষকেরা বিপুল সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে এ দুটোর কোনটিই সঠিক নয়।

যতদূর বুঝি যেকোন ভুল মিথ প্রচারের পেছনে কোন/কতগুলি অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। যেমন ধরেন গোআ ভাষা আন্দোলন করছে বলে মিথ প্রচারের পেছনে জামাতী ছাগুদের অসৎ উদ্দেশ্য আছে। আপনার কথিত মিথ প্রচারের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্যগুলি কি? যেকোন মিথ ভেঙ্গে ফেলার সবচেয়ে কার্যকরি উপায় হল উপযুক্ত তথ্যপ্রমান উল্লেখ করে সেটা নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেলা। এই সচলায়তনেই মিথ ভেঙ্গে ফেলার অনেক উদাহরন আছে, উপযুক্ত তথ্যপ্রমান উল্লেখ করে কিভাবে মিথ ভেঙ্গে ফেলতে হয় তা জানার জন্য এই লেখাটি দেখতে পারেন। আপনি সচলায়তনে অনেক দিন লেখালেখি করেছেন, আপনার কথিত মিথ প্রচারের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য আর তা ভেঙ্গে ফেলার জন্য উপযুক্ত তথ্যপ্রমান সহ একটা লেখাতো আপনার থেকে আশা করাই যায়।
২। আপনি বলেছেন

তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন খুব সহজ কোন ব্যাপার ছিল না, একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ বিপদসংকুল পথ দীর্ঘ সময় ধরে পাড়ি দিয়ে ভারতের কোন একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে পৌঁছতে হত। এই কাজটি একজন মোটিভেটেড মানুষের(ছাত্রের) জন্য সম্ভব হলেও গ্রামের সহজ সরল নিরক্ষর গরীব, দিন আনি দিন খাই টাইপের মানুষের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব।

আপনার এই পর্যবেক্ষণ এর সূত্র ধরেই বলি এত কষ্ট শুধু মোটিভেটেড মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না তার জন্য শারীরিক সহ্য ক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এখন এবং তৎকালীন দুই সময়েই গ্রামের নিরক্ষর দিন আনি দিন খাই টাইপের মানুষের সহ্য ক্ষমতা ছাত্রদের চেয়ে বেশি। এই পর্যবেক্ষনের পেছনে আর তথ্যসুত্র উল্লেখ করলাম না। যেহেতু আপনি গ্রামে বড় হয়েছেন, আপনার বোঝার কথা। তারপরও সন্দেহ থাকলে গ্রামের দিন আনি দিন খাই টাইপের মানুষদের আর ছাত্রদের মধ্যে জোড়ে হাটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে দেখতে পারেন কি ফলাফল আসে।
৩। আপনি বলেছেন

যদি আপনার সাথে গ্রামের একটি যোগাযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেখানের যে কোন দশজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচিত হোন। তারপর তাদের প্রতিজনের পরিচিত আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করুন। এবার তাঁদের যুদ্ধকালীন সময়ের পেশার ব্যাপারে জেনে নিন। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, আমার মতামতের সাথে খুব একটা ফারাক পাবেন না।

এই কষ্টটুকু করার জন্য আপনি অনুরোধ করলেন। কষ্টতো মানুষ এমনি এমনি করেনা তার জন্য একটু মোটিভেশন লাগে। আপনি যদি আপনার কথিত মিথ ভাঙ্গার জন্য উপযুক্ত তথ্যপ্রমান নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেলেন অথবা নিদান পক্ষে আপনার বক্তব্যের সমর্থনে আপনার সংগ্রহে থাকা হার্ডকপি এবং সফটকপি মিলে প্রায় শ-দুয়েক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই থেকে দুই চারটা কোটেশন দেন তাইলে হয়ত কিছুটা মোটিভেশন পাওয়া যাবে। তখন আমার ফলাফলটা এখানে জানিয়ে দিব।
৪। আরেকটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। যেই লেখা থেকে আমি সিকন্দর আলীর বক্তব্য উল্লেখ করলাম, দুইবছর আগে প্রকাশিত সেই লেখার নীচে আপনার মন্তব্য শোভা পাচ্ছে। মন্তব্য দেখে বোঝা যায় লেখাটি আপনি মনযোগ দিয়েই পরেছেন। সেই মন্তব্যে আপনার কথিত মিথ বিষয়ে আপনার হিরন্ময় নিরবতার কারনটা ঠিক কি?

-- আতোকেন

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আব্দুল্লাহ এ.এম-এর সাথে আমার কথোপকথনকে বিতর্ক বলা যায় বলে মনে হয় না। তিনি যৌক্তিকভাবে বিতর্ক করলে তো খুশিই হতাম। হয়তো তার দেয়া তথ্য থেকে নতুন জ্ঞানও অর্জন করা সম্ভব হতো। কিন্তু উনি তো যুক্তিনির্ভর ডিসকাশন বা ডিবেট কোনোটাই করেননি। তিনি বার বার দিয়েছেন সাধারণীকরণের দোষে দুষ্ট বক্তব্য (কেবল নিজের গ্রাম আর আত্মীয়দের কথার ভিত্তিতে পুরো মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ), সম্পূর্ণ যুক্তিহীন ব্যক্তিগত ধারণা যা আমাদের দেশের এবং অন্য দেশের ঐতিহাসিক ঘটনা সমর্থন করে না (নিম্নবর্গের মানুষের গণযুদ্ধ বা বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার মোটিভেশন থাকে না), করেছেন অত্যন্ত হাস্যকর আর অর্বাচীন মন্তব্য (বিভিন্ন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের বইয়ের উল্লেখ তার কাছে মনে হয়েছে স্থুল রসিকতা), নিজের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শ দুয়েক বই থাকার পরও নিজের ব্যক্তিগত ধারণার সমর্থনে একটি বই থেকেও কোনো বক্তব্য দেখাতে না পারা, আর বিভিন্ন বইয়ে উল্লিখিত তথ্য যা তার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে তা তুলে ধরা হলে সে সম্পর্কে একটি কথাও না বলে কেবল নিজের ধারণাই কোনো প্রমাণ দেখানো ছাড়া বার বার বলে যাওয়া, আর সবশেষে যুক্তির বিপরীতে যুক্তি দিতে না পেরে ব্যক্তি আক্রমণ শুরু করা। সেই আক্রমণও যুক্তি দিয়ে করেননি তিনি। কেবলই নিজের ধারণা ছুঁড়ে দিয়েছেন। আর ব্যবহার করেছেন অশোভন ভাষা। কাজেই এমন আচরণের পর তার সাথে আমার একটি যুক্তিনির্ভর 'বিতর্ক' হয়েছে তা বলা যায় না। যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করা হলে খুশি হতাম। কিন্তু আব্দুল্লাহ এ.এম বিতর্ক করার যে নিয়ম বা পদ্ধতি তার ধারে কাছেও যাননি।

মন মাঝি এর ছবি

একটা কৌতুহল। ছাত্ররা কি "সাধারণ মানুষ"-এর সংজ্ঞার্থের আওতায় পড়েন না? তারা কি "অসাধারণ"? আমি যদ্দুর জানি, উচ্চবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের বাইরের সবাইকেই "সাধারণ মানুষ" বলা হয়। সেদিক থেকে গ্রাম বা মফস্বলের তো বটেই, এমনকি শহরেরও বেশির ভাগ ছাত্রই মনে হয় "সাধারণ মানুষ" পর্যায়ভূক্ত হবেন। নেটে কয়েকটা অভিধানে আর উইকেপিডিয়াতেও সাধারন মানুষ বা "কমন পিপল"-এর অর্থ সেরকমই দেখলাম। যেমন ধরুন এইটাঃ

The common people, also known as the common man, commoners, or the masses, are the ordinary people in a community or nation who lack any significant social status, especially those who are members of neither royalty nor nobility nor the priesthood.

Whereas historically many civilizations have institutionalized the notion of a common class within society, since the 20th century the term common people has been used in a more general sense to refer to typical members of society in contrast to the highly privileged (in either wealth or influence) (সূত্র).

আমার প্রশ্নঃ সাধারণ ছাত্রদের, বিশেষ করে গ্রাম বা মফস্বলের ছাত্রদের কি রয়ালটি, নোবিলিটি বা প্রিস্টহুডের (বা এসবের বাংলাদেশি ইকুইভ্যালেন্টের) মতো কোন অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদমর্যাদা আছে/ছিল, নাকি অর্থ-বিত্ত-প্রতিপত্তিতে তারা হাইলি প্রিভিলেজড শ্রেণীভূক্ত - নাকি তাদের বেশির ভাগই আসলে অর্থ-ক্ষমতা-পদগরিমাহীণ নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, অর্থাৎ উপরের সংজ্ঞা অনুযায়ী "সাধারণ মানুষ" বা "আম জনতা"-রই একটি অংশ মাত্র?

****************************************

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

গ্রামের বাসিন্দা হলেও বয়সের গুণে এবং একটি মহৎ স্বপ্ন বুকে ধারন করার কারনে, মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া খালি পা, লুঙ্গি পরিহিত ছাত্রদেরও তখন অত্যন্ত ব্রাইট ও সুদর্শন বলে মনে হত- অন্তত আমার এবং স্বাধীনতাকামী জনতার চোখে। পরবর্তীতে অবশ্য নানা ঘাত প্রতিঘাতে এবং বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে দৃশ্যত তাঁরা গ্রামের সাধারন জনতায়ই পরিণত হয়েছেন।

মন মাঝি এর ছবি

প্রশ্নটা আসলে নাদির জুনাইদ সাহেবের কাছে। হাসি

****************************************

নাদির জুনাইদ এর ছবি

আপনার প্রশ্ন: "সাধারণ ছাত্রদের, বিশেষ করে গ্রাম বা মফস্বলের ছাত্রদের কি রয়ালটি, নোবিলিটি বা প্রিস্টহুডের (বা এসবের বাংলাদেশি ইকুইভ্যালেন্টের) মতো কোন অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদমর্যাদা আছে/ছিল?

উত্তর: অবশ্যই নেই বা ছিল না।

আপনার প্রশ্ন: অর্থ-বিত্ত-প্রতিপত্তিতে তারা হাইলি প্রিভিলেজড শ্রেণীভূক্ত - নাকি তাদের বেশির ভাগই আসলে অর্থ-ক্ষমতা-পদগরিমাহীণ নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, অর্থাৎ উপরের সংজ্ঞা অনুযায়ী "সাধারণ মানুষ" বা "আম জনতা"-রই একটি অংশ মাত্র?

গ্রামের যে কমবয়সীরা স্কুলে বা কলেজে পড়েছে তাদের অনেকের পরিবার নিম্নবর্গের। আবার গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তানরাও লেখাপড়া শিখেছে। আবার গ্রামের বহু কমবয়সী আছে যারা কোনোদিন দারিদ্রের কারণে লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি। এই তিন ধরনের কমবয়সীর মধ্যে পার্থক্য হলো প্রথম দুই ধরনের পরিবারে ভিন্নতা থাকলেও তারা লেখাপড়া কিছুটা হলেও শিখেছে। আর তৃতীয় ধরনের কমবয়সীদের গ্রামের সেই সাধারণ মানুষদের সাথে তুলনা করা যায় যারা শিক্ষিত হয়নি কখনো। এইভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় সাধারণ আম জনতা যারা শিক্ষিত নয় তাদের সাথে যারা দরিদ্র বা গ্রামবাসী হলেও কিছুটা লেখাপড়া যারা শিখেছে তাদের কিছুটা পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যটা কিছুটা লেখাপড়া জানা আর একেবারেই না জানার পার্থক্য। দুই পক্ষকেই সাধারণ মানুষ বলা যায় তবে এক পক্ষের মাঝে কিছুটা হলেও স্কুল-কলেজে লেখাপড়ার অভিজ্ঞতা আছে।

গ্রামের নিম্নবর্গের মানুষরা কখনো শহরের ভাল বিশ্ববিদ্যালয়েও লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে। আবার শহরের উচ্চবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। এদের শিক্ষা এক হলেও, দুই পক্ষই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও পারিবারিক কারণে এদের মধ্যে শ্রেণিগত ব্যবধান আছে।

এই গেল গ্র্রামের ছাত্রদের সাধারণ মানুষ বলা যায় কী যায় না সেই আলোচনা। গ্রামের নিম্নবর্গের যে ছেলেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বুয়েটে পড়েছে তার পরিবার হয়তো অতি দরিদ্র। কিন্তু তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে সে তো শিক্ষাহীন আম জনতা থেকে আলাদা।

১৯৭১ সালে কী ঘটেছিল? শহরের উচ্চবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাল প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করা ছাত্ররা যেমন রুমী, হাবিবুল আলম, ফতেহ আলী চৌধুরী, কাজী কামালউদ্দিন, এ এফ এম এ হ্যারিস, মাসুদ সাদেক চুল্লু প্রমুখ যেমন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি করেছিলেন গ্রামের স্কুল, মফস্বলের কলেজে লেখাপড়া শেখা তরুণরা, আবার সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন একেবারেই লেখাপড়া না জানা গ্রামের আম জনতা যাদের একজন মেলাঘর গেরিলা ক্যাম্পে মেজর হায়দারের প্রথম লেকচারের পর মেজর হায়দারকে জিজ্ঞাসা করেছিল, "আমার একটা প্রশ্ন আছে। আফনের পরিচয়টা?" অংশগ্রহণ করেছিলেন গনি। যার কথা মেজর কামরুল তাঁর 'জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা' বইতে লিখেছেন, "লেখাপড়া দূরে থাক, কারুর বইপত্র কোনোদিন বহন করার সুযোগও বোধকরি হয়নি তার। পরিবার শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সে আমাদের কাছে এসেছে যুদ্ধ করবে বলে।" এমনি লেখাপড়া না জানা আরো বহু সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন লেখাপড়া জানা ছাত্রদের সাথে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য লেখাপড়া জানা আর লেখাপড়া না জানা কোনো বাঙালীরই মোটিভেশনের অভাব হয়নি। এই কারণেই গ্রামের এক নাম না জানা অতি সাধারণ মহিলা যিনি পুকুরে ক্যাপ্টেন মেহবুবুর রহমান আর ইশরাককে লুকিয়ে থাকতে দেখেও ধাওয়া করে আাসা পাকিস্তানি সৈন্যদের বলেননি মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় লুকিয়ে আছে। পাকিস্তানিরা সেই মহিলাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেননি। এই তথ্য হাবিবুল আলম বীর প্রতীক লিখিত 'ব্রেভ অফ হার্ট' বইতে আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এমন সাহসী আর উদ্দীপিত অংশগ্রহণ ছিল শিক্ষিত মানুষ আর সাধারণ আম জনতা - সবার। আর কতিপয় কুলাঙ্গার নিজ দেশের সাথে বেঈমানি করা পিশাচ আর অমানুষ হয়েছিল আল বদর আর রাজাকার। তাদের কি আমরা শিক্ষিত বলতে পারি? তারা শিক্ষক হলেই বা কি আর ছাত্র হলেই বা কি।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA