কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী

নির্ঝর অলয় এর ছবি
লিখেছেন নির্ঝর অলয় [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ২২/০৫/২০১৩ - ১০:৪৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বইটা যে ঠিক কীভাবে হাতে এসেছিল, আজ আর মনে নেই। বন্ধুর বড় বোনের বিয়েতে উপহার দেবার জন্য বোধহয় ‘তক্ষশিলা’ থেকে কিনেছিলাম বইটা, থার্ড ইয়ারে থাকতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী থেকে লেখকের “দিশি গান-বিলিতি খেলা” পড়ে বিষয়গুণে ও বিদগ্ধ বিটলেমিতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এবার বইয়ের নামটা আমার খামখেয়ালী মনে বেশ ভালো লাগায় কিনে ফেললাম। রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম বাসে কৌতুহলের বশে আর সময় কাটানোর জন্য বইটা খুলে বসলাম। বইটা রাগসঙ্গীত নিয়ে সেটা জানতাম। আমি তখন সাঙ্গীতিক পঠনে একান্তই নবীস (এখনো তাই!), তবে ভালো গানবাজনা শোনা ও কিঞ্চিত বন্ধুবান্ধব মিলে টেবিল পিটে গাওয়ার অভ্যেস ছিল। যাই হোক, নিজে ঘোরতর আড্ডাবাজ বলেই হয়তো, আড্ডার মেজাজে শুরু বইটা আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করল, তারপর এই আকর্ষণ বেড়েই চলল, শেষমেষ এই আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ালো ঘোর বর্ষার দিনে ইলিশ ভাজার মত, গুড়ের সন্দেশের মত। এরপর বহুবার বইটা পড়েছি কিন্তু আজও সেই প্রথম পড়ার স্মৃতি ভুলতে পারি না। কারণটা সোজা- বাসের যাত্রাবিরতিতে ক্ষীণ আলোয় পড়া, পরদিন সকালে না ঘুমিয়ে বইটা শেষ করা, আমার পর বন্ধু কবির বইটা হস্তগত করা এবং সব শেষে মাসিমা, অর্থাৎ বন্ধুর মা আমাদের মুখে বইটার সুখ্যাতি শুনে বইটি নিয়ে পড়লেন এবং এই মোড়কবিহীন উপহারটিকে বিয়ের শ্রেষ্ঠ উপহার বলে স্বীকৃতি দিলেন। বিস্তৃত ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলছি যে, বাংলা সাহিত্যের এই কুদরতী সৃষ্টিটি কুমার প্রসাদ মুখোপাধ্যায় তথা অবাঙালিদের কাছে পণ্ডিত কুমার মুখার্জি নামে পরিচিত সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকের অমর সৃষ্টি “কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী।” যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নাম শুনলেই দস্তুরমতো ডরান তাদের জন্য এ এক অদ্ভুত আনন্দদায়ক বই( সৃজনশীল গাইডও ভাবতে পারেন!)। বইটি ভালো লাগবে প্রতিটি সঙ্গীত ও সাহিত্যপ্রেমীর, গপ্পের মোড়কে জানা হবে ইতিহাস- তা শুধু রাগসঙ্গীতের নয় ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক ও অসাম্প্রদায়িক কৃষ্টির ইতিহাস। স্রেফ ভাষার প্রসাদগুণেও বইটি উপাদেয়।

রাগসঙ্গীত বিশ্বের এক অসাধারণ সুন্দর সঙ্গীতসৃষ্টি, যাকে লোকে ভুল করে দরবারীসঙ্গীত, আখড়াই সঙ্গীত ইত্যাদি নাম দিয়ে সাধারণ মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, যার জন্য দায়ী সামন্ততন্ত্র, শিল্পীদের জনবিচ্ছিন্নতা, পরিবেশকদের কুরুচি এবং শ্রোতাদের ঔদাসিন্য। বস্তুত এই অনাবিল সঙ্গীতধারা মানুষের প্রাণের গান তথা লোকগীতির উৎসমুখ থেকেই প্রবাহিত হয়েছে সুসংবদ্ধ আকারে। কাজেই একে মানুষের আবেগের সাথে সংশ্রববিহীন বলে ভাববার, বা শুধু বিত্তবান উন্নাসিকদের সঙ্গীত ভাববার কারণ নেই। সামন্তযুগে রাজা-নবাব-জমিদাররা ছিলেন শিল্পের পৃষ্ঠপোষক, গণতান্ত্রিক যুগে জনগণই শিল্পের পৃষ্ঠপোষক। এমন বহু শ্রোতা আছেন যারা শুধুমাত্র জানেন না বা বোঝেন না –এই আক্ষেপেই রাগসঙ্গীত শোনেন না, কিন্তু তাদের সুরের কান আছে। এই আগ্রহী রসিক লোকদের জন্য ‘কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী’ আনন্দের ফল্গুধারার মতই।

বইটি আক্ষরিক অর্থেই আরব্য রজনীর ধাঁচে লেখা। একাবারে গল্পের পেট থেকে একের পর এক গল্প বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু গল্পগুলো খাপছাড়াভাবে আসে নি। গানবাজনার জগতের কথা শুরু হয়েছে বাংলার অবিসংবাদিত গায়ক জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীকে নিয়ে। সেই সাথে দিলীপ চন্দ্র বেদীর প্রসঙ্গে এসে গেলেন তাঁর গুরু কিংবদন্তীতুল্য গায়ক ভাস্কর বুয়া বাখলে। নিতান্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই গন্ধর্বতুল্য গাইয়ের কোন রেকর্ডের সন্ধান মেলে না(আন্তর্জালে দু একটা নমুনা আছে বটে, কিন্তু শুনে মনে হল ওগুলো বানোয়াট!)। ভাস্কর বুয়া বাখলেকে নিয়ে আলোচনা শুরু কারণটা অসাধারণ কৌশলের পরিচয় বহন করে। কেননা বালক ভাস্করের তালিম শুরু করেন কিরানা ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা বন্দে আলী খান। এরপর উনি গোয়ালিয়র ঘরানার ফয়েজ মহম্মদ খান, আগ্রার নত্থন পীর বখশ এবং সবশেষে জয়পুর ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা আল্লাদিয়া খানের কাছে তালিম পান। অর্থাৎ মাত্র একজন গাইয়ের আরুণি-উপমন্যু-একলব্য তুল্য গুরুভক্তি ও নিষ্ঠার বিবরণের মাধ্যমে লেখক চার চারটি প্রতিষ্ঠিত ঘরানার নামের সাথে আনকোরা পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিলেন!

পরের পরিচ্ছেদগুলোতে লেখক ওস্তাদ আল্লাদিয়া খানের অসামান্য সৃজনশৈলী ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের মাধ্যমে জয়পুর ঘরানার খেয়াল গায়কীর সূত্রপাত বিবৃত করেছেন গল্পের ছলে। গল্পের চরিত্র হিসেবে ইতিহাসের পাতা থেকে একে একে উঠে এলেন খাঁ সাহেবের দুই ছেলে মঞ্ঝী খান ও ভুর্জী খান (আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র সঙ্গীত অঙ্গনে নাম করতে পারেন নি), কেসরবাঈ কেরকর, মোঘুবাঈ কুর্দিকর, পণ্ডিত নিবৃত্তিবুয়া সরনায়েক ও সঙ্গীতঅন্তপ্রাণ পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর, এবং কিশোরী আমুনকর। ধীরে ধীরে গল্প জমে উঠল। আসরের আড্ডার মেজাজে আমরা জেনে যাই দিল্লীর সঙ্গীতজগতের কথা, উগ্র মৌলবাদী আওরংজেব কর্তৃক সঙ্গীতের জানাজা ও দাফনের কথা, আবার বাদশাহ মহম্মদ শাহ রঙ্গীলের সময় রাগসঙ্গীতের পুনর্জাগরণ এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ (যথাক্রমে নিয়ামত খান ও ফিরোজ খান) ভ্রাতৃদ্বয়ের ধ্রুপদ ভেঙে খেয়াল গান তৈরী। একই সময়ে আবার লখনউ এ নবাব আসফউদ্দৌলার দরবারের সভাগায়ক গুলাম রসুল জন্ম দিলেন খেয়াল গানের প্যারালাল স্ট্রিমের যা প্রথমে গোয়ালিয়রে এবং সেখান থেকে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে রপ্তানি হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখি খেয়াল গানের জন্ম নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। অনেকেই আমীর খসরু সাহেবকে খেয়াল গানের জনক বলেন এবং স্বয়ং ওস্তাদ আমীর খাঁ সাহেবও তাই মনে করতেন। বলা হয় যে আমীর খসরু কাওয়ালি গান থেকে খেয়াল গানের জন্ম দেন। এটি বিতর্কের বিষয়। কেননা গত দু-আড়াইশ বছর ধরে সদারঙ্গ ও অদারঙ্গের যেসমস্ত প্রাচীন ও আশ্চর্য সুন্দর খেয়ালের বন্দিশ গাওয়া হচ্ছে সেগুলোর প্রায় কোনটাই কাওয়ালির সাথে সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক আছে ধ্রুপদের সাথে। কাজেই আমীর খসরু খেয়াল গানের প্রবর্তক হলেও ধরে নেয়া যায় যে তাঁর ধারাটি বিলুপ্ত হয়েছিল। এই দলে কুমারপ্রসাদ ছাড়াও অন্যান্য পণ্ডিত ব্যক্তিও আছেন এবং এদের যুক্তিগুলো আমার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। তবে কুমারপ্রসাদ গুলাম রসুল কর্তৃক সৃষ্ট খেয়ালের সমান্তরাল ধারার সঙ্গে সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ ভ্রাতৃদ্বয়-সৃষ্ট খেয়ালের সম্পর্ক দেখান নি। সম্পর্ক নিশ্চয়ই ছিল। নইলে গোয়ালিয়রের গায়কেরা সদারঙ্গের কম্পোজিশন কী করে গাইতেন? যাহোক সেসব এ লেখার বিষয় নয়।

আড্ডার পরিধি ধীরে ধীরে বড় হয় এবং জয়পুর ঘরানার তথা সব খেয়াল গায়কীর জনক গোয়ালিয়র ঘরানার গায়কী আলোচনায় চলে আসে। গল্পের মোড়কে ইতিহাস চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়, গুলাম রসুলের সৃষ্ট খেয়াল তাঁর সাকরেদদের মারফত লক্ষ্ণৌ থেকে গোয়ালিয়রে আসে। গোয়ালিয়র থেকেই আগ্রা, সহসওয়ান, কিরানা ও পাতিয়ালায় খেয়াল গানের প্রচলন ঘটে। এ কথা হয়তো অনেক গোঁড়া ঘরানাদার ওস্তাদ মানবেন না। কিন্তু ইতিহাস তেমনই সাক্ষী দেয়। যেমন সব মানুষই আফ্রিকার একটি ছোট্ট প্রাচীন জনগোষ্ঠীর বংশধর, তেমনি সব ঘরানাই গোয়ালিয়র ঘরানার প্রসূন। গল্পে উঠে আসে গোয়ালিয়র ওস্তাদ হদ্দু খাঁর ভোর সকালের ডন-বৈঠক শেষে দু’সের দুধে আটচল্লিশটি জিলিপি ভক্ষণের পিলে চমকানো বিবরণ। তবে সে যুগে এমন খাওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না! ভোজনবিলাসী লোকদের মানসিক অশান্তি বাড়িয়ে দেয় রামপুরের নবাবের রন্ধনশালার শামী ও কাকোরী কাবাব যার এন্ড প্রোডাক্ট ‘মুখে দিলে মাখনের মত গলে যেত!’ আমাদের সামনে বলিষ্ঠ তানকারী নিয়ে হাজির হন কৃষ্ণরাও শঙ্কর পণ্ডিত যার ভয়েস থ্রোয়িং এর সাথে আমি বড়ে গুলাম আলী খান সাহেবের ভয়েস থ্রোয়িং এর সাংঘাতিক মিল খুঁজে পাই। জানতে পারি রাজাভইয়া পুঁছওয়ালের অসামান্য নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ইতিহাস। গোয়ালিয়রের কিংবদন্তী গায়ক রহমত খাঁর গায়কী সম্পর্কে আঁচ পাই আমরা যখন জানি যে ওস্তাদ আবদুল করীম খাঁ সাহেব তাঁর গায়কী থেকেই বিলম্বিতে সুর লাগানোর ধাঁচ রপ্ত করেছিলেন এবং ভাস্কর বুয়া তাঁর তানের ফান্দা হাসিল করেছিলেন। হদ্দু খাঁর জামাই হবার সুবাদে এনায়েত হুসেন খানের হাত ধরে গোয়ালিয়রের গায়কী রামপুরের সহসওয়ানে ঢুকে পড়ল। এনায়েত হুসেন খাঁর জামাই ও কুমারপ্রসাদ বাবুর দ্বিতীয় গুরু পদ্মভূষণ ওস্তাদ মুস্তাক হুসেন খাঁর গায়কী, মেজাজ ও উদারতা-মহানুভবতার (চিনচোরে বলে এক ছত্রকে ১০০ তে ১১৫ নম্বর প্রদান!) বিবরণ আমাকে মুগ্ধ করে। পাশাপাশি আছে ওস্তাদ নিসার হুসেন খাঁর সাংঘাতিক পাল্টার রেয়াজ ও ধুয়াঁধার তারানা গায়কী এবং আজকের যুগন্ধর শিল্পী রশীদ খানের অসাধারণ কণ্ঠ ও বিরল প্রতিভার ইঙ্গিত।

পাতিয়ালা ঘরানা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে গোয়ালিয়রের ঠিক পর পরই। কারণ লেখক এবং জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের মতেও উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান সাহেবের গায়নশৈলী মূলত প্রাচীনতম ঘরানা তথা গোয়ালিয়র গায়কীর আরো পরিশীলিত ও শ্রূতিমধুর রূপ। বড়ে গুলাম আলী খান ছিলেন সঙ্গীতের মানবিক প্রতিমূর্তি। জেগে থাকা পুরো সময়টাই উনি রেয়াজ করতেন এবং প্রকৃতির সব কিছুর মধ্যেই সঙ্গীত খুঁজে পেতেন শিশুর মত সরল এই মানুষটি। প্রকৃতির সাথে এতো নিবিড়ভাবে যুক্ত গায়ক আর কেউ ছিলেন কি, এক রবিঠাকুর ছাড়া? লেখক বড়ে গুলাম আলী খাঁর চাচা, উস্তাদ কালে খাঁর স্মৃতি রোমন্থন করেছেন মূলত অমিয় সান্যালের “স্মৃতির অতলে” গ্রন্থ থেকে এবং দুজনের কণ্ঠ ও গায়কীর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বর্ণনা করেছেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান সাহেবকে ভয়েস কালচারের শেষ কথা বলে ধরা হয় এবং এমন বিজ্ঞানসম্মত কণ্ঠপ্রক্ষেপন তাঁর পূর্বে ও পরে শোনা গেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

আগ্রা ঘরানার গায়কী বিবৃত হয়েছে মূলত আফতাব-এ-মৌসিকী উস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের গায়কীর সূত্র ধরে। নৌহারবাণীর ধ্রুপদ গায়কীর হিসেবে প্রাচীনতম ঘরানা আগ্রায় খেয়াল গান আসে গোয়ালিয়র থেকে। কেননা আগ্রার ঘগগে খুদা বখশ গোয়ালিয়রের নত্থন পীর বখশের কাছে ১২ বছর স্বরসাধনা ও খেয়ালের তালিম পান। এই সঙ্গীতধারা প্রবাহিত হয় ঘগগে খুদা বখশের শিষ্য গোলাম আব্বাস খান ও কল্লন খাঁর মধ্যে এবং গোলাম আব্বাস খাঁরই দৌহিত্র ও শিষ্য প্রবাদপ্রতিম গায়ক, দৃপ্ত কণ্ঠের উস্তাদ ফৈয়াজ খান। ফৈয়াজ খান ছিলেন তাঁর নামের মতই উদার ও মহৎ। অর্থলোভ বলতে তাঁর কিছু ছিল না। সব দিক থেকেই আশ্চর্য রুচিশীল ও পরিমার্জিত এবং গভীর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। দরিদ্র স্টেশন মাস্টারের ছেলের পৈতের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে টাকা নেবার বদলে উলটো নিজে সোনার আংটি দিয়ে ছেলেকে আশীর্বাদ করে গেলেন। আজকের অর্থসর্বস্ব জগতে এ বিবরণ সত্যি চোখে জল আনে। ফৈয়াজ খান সাহেব ছিলেন সত্যিকারের চৌমুখা গাবৈয়া বা আজকের ভাষায় “ভার্সেটাইল সিঙ্গার।” তাঁর ভাণ্ডার ছিল ধ্রুপদ থেকে শুরু করে খেয়াল-ঠুমরী ও দেহাতী গানে পরিপূর্ণ। গানের মধ্যে আবেগ ও নাটকীয় উপাদান ও কাকুপ্রয়োগে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর হিমালয়স্পর্শী উচ্চতার জন্যই হয়তো আগ্রা ঘরানার অন্যান্য সুপণ্ডিত ও সুগায়করা তেমন ভাবে জনপ্রিয় হতে পারেননি। কেননা ফৈয়াজ খাঁ যে মান স্থাপন করে গিয়েছিলেন সেটা খুব বেশি উঁচু। এছাড়াও আমরা পাই অসাধারণ কণ্ঠের অধিকারী শরাফত হুসেব খান এর কথা, অসামান্য পণ্ডিত উস্তাদ বিলায়েত হুসেন খাঁর কথা, সুফী সাধকতুল্য উস্তাদ আতা হুসেন খান এবং ফৈয়াজ খাঁর ছায়াসঙ্গী ও দরদী গায়ক উস্তাদ লতাফত হুসেন খান এর কথা।

একটি পৃথক পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে সেই দুই মহাপুরুষের কথা যাঁদের অসামান্য আত্মত্যাগের জন্যই এই সাংগীতিক ডামাডোলের যুগেও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আজও বেঁচে আছে। নিঃসন্দেহে এই দুজন হলেন পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে ও তাঁর সুযোগ্য শিষ্য পণ্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতনজনকর। সাধারণ মানুষের প্রাণের আবেগ থেকে সৃষ্ট লোকসঙ্গীতের সন্তান রাগসঙ্গীতকে দরবার ও ঘরানার ক্ষুদ্র গন্ডী থেকে বের করে আবার মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবার একক কৃতিত্ব পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডের। নইলে আজকে আমরা যে কজন উন্মাদ এই “বিদঘুটে-বিরক্তিকর-অর্থহীন আঁ-আঁ গান শুনছি” – এই ক’জনও অবশিষ্ট থাকত না। রতনজনকর তাঁর গুরুর নির্দেশিত পথে সঙ্গীতশিক্ষার প্রসার ঘটাতে তাঁর জীবনের সব ঐহিক সুখ বর্জন করেছিলেন। প্রায় পুরো কর্মজীবন প্রিন্সিপাল, উপাচার্য এবং পাশাপাশি রেডিওর উচ্চপদে নিযুক্ত থেকেও এই মহর্ষিতুল্য লোকটির অর্থাভাব দূর হয়নি। কারণ তিনি সঙ্গীতের প্রসারকল্পে মুক্তহস্তে দান করতেন। আজকের ক্রোড়পতি প্রিন্সিপাল ও ভিসিদের জন্য এ তো কল্পকাহিনী!

দু’টি আলাদা পরিচ্ছেদে আলোচিত হয়েছে এখনকার জনপ্রিয়তম ঘরানা কিরানার ইতিহাস ও আসরের গল্প এবং সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী শিল্পী উস্তাদ আমীর খাঁর গায়কী। উল্লেখ্য বর্তমানে খেয়াল গানের যে পদ্ধতি প্রচলিত অর্থাৎ শুরুতে অতিসংক্ষিপ্ত আলাপ, অতি বিলম্বিত বা বিলম্বিত লয়ে বন্দিশ গাওয়া, বন্দিশের বোলের সাহায্যে রাগের বিস্তার বা বঢ়ত, অতি সামান্য বোল-বাঁট(এই অঙ্গটি প্রায়ই বাদ পড়ে), বোলতান, স্বরবিস্তার ও সরগম-তান এবং সবশেষে তান – এই ধাঁচ কমবেশি কিরানার ধাঁচেই করা হয়। গোয়ালিয়র ও আগ্রার গায়কীতে বন্দিশের নায়কী(মূল গান) ও গায়কী(মূল সুর ঠিক রেখে কিছুটা ভ্যারিয়েশন দেখানো) অঙ্গ ছিল, কিন্তু বোল-বিস্তার ছিল না। রাগবিস্তার করা হত বহলাওয়া তথা ধীরগতির আকারের মাধ্যমে। ডি,ভি পালুস্করের গানে এর প্রকৃষ্ট নমুনা পাওয়া যায়। উস্তাদ আবদুল করিম খানই প্রথম বিলম্বিত একতালের আটচল্লিশ মাত্রার ঠেকার সঙ্গে বোল-বিস্তার যোগ করেন যা ধীরে ধীরে সব ঘরানাই আপন করে নেয়। আজকাল অবশ্য এই বোল-বিস্তার এবং বোলের অস্পষ্টতার জন্যই আনাড়ি শ্রোতারা ঘুমিয়ে পড়েন! কিরানা ঘরানার দুটি মূল ধারা যার একটির প্রধান উস্তাদ আবদুল করীম খান ও অপরটির উস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খান। এঁদের স্রষ্টা বললাম না কারণ এঁদের আগে এই ঘরানায় প্রখ্যাত বীণবাদক উস্তাদ বন্দে আলী খান ছিলেন যাঁকে কিরানা ঘরের স্রষ্টা বলা যেতে পারে। ওস্তাদ রজব আলী খাঁর বিজলির মত তানকারী আর ঠোঁটকাটা স্বভাব ও খামখেয়ালীপনা অত্যন্ত আনন্দ দেয়। হীরাবাঈ ও রোশেনারা বেগম সম্পর্কে অবশ্য যৎসামান্য কথায় প্রশস্তি সারা হয়েছে। আলোচিত হয়েছে পণ্ডিত সওয়াই গন্ধর্ব ও তাঁর কালজয়ী শিষ্য পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর কথা। ভীমসেনজী সত্তরের দশক থেকে গোটা নব্বইয়ের দশক জুড়ে ছিলেন রাগসঙ্গীতের অবিসংবাদিত সম্রাট, সত্যিকার অর্থেই স্বরাধিরাজ! তাঁর গোটা জীবনটাই ছিল একটা এডভেঞ্চার। সুনীল লালনকে নিয়ে অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন। বালক ও যুবক ভীমসেনের রোমাঞ্চকর সাংগীতিক জীবন উপন্যাসকেও হার মানায়। তার সবকিছু অবশ্য এই বইয়ের উপজীব্য নয়, তবে তাঁর বাল্যবয়সে গৃহত্যাগ, অপরিসীম কষ্টের দিন এবং ‘মোষের দুধ খেয়ে’ ও যোগ ব্যায়াম সেরে দৈনিক কমপক্ষে আট ঘন্টার রেয়াজের ইঙ্গিত এই বইতে আছে। যুগন্ধর শিল্পী উস্তাদ আমীর খাঁকে কিরানা ঘরানার বলাতে ভীষণ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ আমীর খাঁ সাহেব নিজে তাঁর ঘরানাকে ইন্দোর ঘরানা বলতেন। কিন্তু আমীর খাঁ সাহেবের গায়কীকে লেখক কোথাও এতটুকু অমর্যাদা করেন নি। বোলবাঁটের অভাব তাঁর গায়কীতে সত্যিই ছিল, সেটাকে তাঁর শিষ্য সিংবন্ধু সাহিত্যের মান রক্ষার খাতিরে বলে মন্তব্য করেছেন। তাছাড়া আমীর খাঁ সাহেবের বিলম্বিত বোলবিস্তার ভীষণভাবেই উস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খানের বিস্তার দিয়ে প্রভাবিত ছিল। এটা আমি পড়ে নয়, দুজনের গান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শুনে বলছি। আমীর খাঁ সাহেব মূলত উস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খানের বিস্তার, রজব আলী খাঁর তান এবং ভিণ্ডিবাজারের উস্তাদ আমন আলি খাঁর সরগমকে অনুকরণ নয় বরং আত্মীকরণ করে নিজের মেধা, চিন্তাশক্তি, আর ওজস্বী সুগম্ভীর কণ্ঠস্বর দিয়ে এক অসামান্য সঙ্গীতরীতি তৈরী করেছিলেন যার প্রভাব থেকে পরবর্তীকালের অধিকাংশ গায়ক বাদকই মুক্ত নন। সেক্ষেত্রে তাঁর এই অসামান্য সঙ্গীতের ঘরানা কিরানা বললে ক্ষতি নেই কেননা, আমীর খাঁ সাহেবের পিতা নাকি তেমন উঁচুমাপের কলাকার ছিলেন না। সেক্ষেত্রে ঘরানার জনক আমীর খাঁ সাহেবকেই বলতে হবে এবং তাও প্রথাগতভাবে একে পৃথক ঘরানা বলা যাবে না, কারণ তিন পুরুষের কমে এবং অতি বিশিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য না থাকলে তাকে ঘরানা বলা যায় না। প্রত্যেক ঘরানার গুণী শিল্পীরা ঘরানার গায়কীতে নিজের ব্যক্তিত্বের ছাপ ফেলেন কিন্তু তাতে ঘরানা পালটে যায় না। না হলে ভীমসেন যোশীকেও পৃথক ঘরানার স্রষ্টা বলতে হবে কারণ ওঁর গুরু ও দাদাগুরুর গানের সাথে ওঁর গানের অনেকটাই প্রভেদ হয়ে গিয়েছিল।

কুমারপ্রসাদের বৈদগ্ধ ও মননশীলতার পরিচয় বহন করে বইটির উপসংহার। অত্যন্ত সুসংবদ্ধ ভাষায় তিনি রাগসঙ্গীতের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও তার ক্রমবিবর্তন এবং বর্তমান কালের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন আশ্চর্য প্রাঞ্জল ভাষায়। আকবরোত্তর ভারতবর্ষের অসাম্প্রদায়িক রূপটি উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। সঙ্গীত সত্যিই জাতি ধর্মের ঊর্ধ্বে, তাই তো হদ্দু খাঁ বেছে বেছে ব্রাহ্মণ সাকরেদ তৈরি করতেন। আবদুল করিম গাইতেন ভজন “হরিকে ভেদ না পায়ো রামা, কুদরৎ তোরি রঙ্গিবিরঙ্গি।” লেখকের মতে জিন্না সাহেব মনে প্রাণে ইংরেজ ছিলেন, তাই তাঁর টু নেশন থিওরিতে বিশ্বাস জন্মেছিল। ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামান্য পরিচয় থাকলে এ থিওরি মাথায় ঢুকত না। আর এ-যুগের নেতাদের সম্পর্কে যত কম কথা বলা যায়, ততই মঙ্গল।” এ যুগের গায়ক-গায়িকাদের মূল সমস্যা হিসেবে লেখক চিহ্নিত করেছেন রাগদারি ও তালিমের প্রতি অনীহা, গলা চেপে গান করা, বন্দিশভিত্তিক গায়কী ও বিস্তারের অভাব-কে। ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রথমটি সম্পর্কে বলার যোগ্যতা রাখি না, কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি সহমত। কেননা চাপা গলায় সুর লাগানো বা ক্রুনিং যে কেউই পারে এবং সে সুরও কৃত্রিম। বৈচিত্র্যের জন্য বা কাকুপ্রয়োগের জন্য আওয়াজ চাপানো যেতে পারে, কিন্তু পুরো গান চাপা গলায় গাওয়া মানে স্রেফ গায়কের দুর্বলতা ও বেসুরোপনা ঢাকবার চেষ্টা। আর রাগসঙ্গীতের বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রোতাদের প্রধান অভিযোগই এই যে, এর কথা বোঝা যায় না। যদিও রাগসঙ্গীত কথানির্ভর নয়, তবুও রাগের ভাবানুকূল বন্দিশের আলাদা মজা আছে।

এবার আসি সমালোচনার কথায়। ‘কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী’র ও তার লেখকের বিরূপ সমালোচনা কম হয় নি। কুমারপ্রসাদকে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ‘ভুঁইফোঁড়’ আখ্যা দিয়েছেন তাঁর আত্মজীবনী ‘রাগ-অনুরাগ’ এ, কুমারবাবু কর্তৃক কোন এক ইংরেজী দৈনিকে রবিশঙ্করের শ্রী রাগে রেখাবের শ্রুতি সঠিক লাগেনি- এ কথা লেখার কারণে। কুমারপ্রসাদ সুযুক্তি উপস্থাপন করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। তবে সবচেয়ে কটু সমালোচনা করেছেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী তাঁর ‘শ্রুতিনন্দন’ বইতে। কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গীর মত বইকে নামোল্লেখ না করে তিনি গালগল্প আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, এসব গরু পোষা ও গণ্ডা গণ্ডা জিলিপি গিলে রেয়াজে বসার গালগপ্পে লেখকের নাম হলেও সঙ্গীতের কোন উন্নতিই হয় না। শুধু তাই নয়, কুমারপ্রসাদকে তিনি নাম উল্লেখ না করে তাঁর সঙ্গীতসমালোচনাকে অজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাসের সমন্বয়জাত ভয়াবহ ফল হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। পরবর্তীতে কুমারপ্রসাদ তাঁর অন্য বই ‘খেয়াল ও হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের অবক্ষয়’ গ্রন্থে এই সমালোচনার শালীন জবাব দিয়েছেন। অজয় চক্রবর্তী আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিল্পী হলেও তাঁর এই উষ্মা কোন অজ্ঞাত কারণবশত বলে মনে হয়েছে। কারণ কুমারপ্রসাদ আত্মবিশ্বাসী হলেও কোন বিচারেই অজ্ঞ নন। অসাধারণ পাণ্ডিত্য তাঁর ছিল এবং গায়ক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি স্বয়ং অজয়ের গুরুজী জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষও করে গেছেন। জ্ঞানবাবুর ‘তহজিব-এ-মৌসিকী’ তে কুমারপ্রসাদের ওপর একটি পরিচ্ছেদ ছিল। আমার ধারণা কুমারপ্রসাদ অজয় চক্রবর্তীর প্রশংসা করলেও ‘চমক প্রদর্শনে বেজায় আগ্রহী,’ ‘পণ্ডিত জগদীশ প্রসাদের সঙ্গে রেষারেষি’ –ইত্যাদি খোঁচার কারণেই অজয় তাঁর ওপর এত খেপে গিয়েছিলেন। কুমারবাবুর গানের সি,ডি বাংলাদেশেই পাওয়া যায়, একটা দিনকর কৈকিনীর সাথে ডুয়েট, আরেকটা ভি,জি, যোগের বেহালা সঙ্গতে- বেহাগ, মেঘমল্লার, জলধর কেদার, নটবেহাগ ইত্যাদি- শুনে ভালো লেগেছে, অজ্ঞ বলে মনে হয় নি! আমীর খাঁ সাহেবকে কিরানা ঘরানার বলাতে তাঁর অনুরাগীরা অনেকেই ক্ষেপে গিয়েছিলেন। এক্ষেত্রেও জ্ঞানবাবুর বইতে পাচ্ছি যে, আমীর খাঁ সাহেব জ্ঞানবাবুর কাছে নিজেকে কিরানা ঘরানার বলেই পরিচয় দিয়েছিলেন। আর ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের পাগলামি ও তাঁর ফৈয়াজ খাঁর শিষ্যত্ব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক দেশ পত্রিকায় হয়েছে। পরিশিষ্টে পণ্ডিত ধ্রুবতারা যোশীর ‘স্মৃতির কয়েক পাতা’ একটি অমূল্য সংযোজন। তবে দু একটি ব্যাপারে লেখককে অত্যন্ত প্রাচীনপন্থী বলে মনে হয়েছে। বইটিকে সামগ্রিক ভাবার কারণ নেই। কারণ অনেক খ্যাতিমান শিল্পী সম্পর্কেই আলোচনা বা উল্লেখমাত্র নেই। যেমন বিষ্ণুপুর ঘরানার ডঃ অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ ভাদুড়ী, রাজন-সাজন মিশ্র, ভীমসেনজীর প্রশিষ্য জয়তীর্থ মেভুন্দী, জয়পুরের অশ্বিনী ভিড়ে দেশপাণ্ডে প্রমূখ শিল্পী। পাতিয়ালা ঘরানার যাঁরা বংশধর অর্থাৎ আমানত আলী ( দুর্ভাগ্যক্রমে আজকাল এঁকে সুপারহিট গায়ক শাফকাতের পিতা বলে পরিচয় দিতে হয়!) ও ফতে আলী খান সম্পর্কে মাত্র একটি লাইন আছে। উল্লেখ্য যে ঘরানা নিয়ে যারা অকারণ মারামারির রোগগ্রস্থ তাঁরা অবশ্য বড়ে গুলাম আলীকে পাতিয়ালা না বলে কসুর ঘরানা বলেন, কিন্তু বড়ে গুলাম আলীর খাঁসাহেবের বাপ-চাচা পাতিয়ালার ফতে আলী(বড়ে) খাঁর গাণ্ডাবন্ধ শাগীর্দ ছিলেন।

পরিশেষে বলব রাগসঙ্গীতের অপূর্ব সুন্দর জগতের রূপ ও রস উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে এবং কিংবদন্তীর শিল্পীদের সম্পর্কে জানার জন্য ‘কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী’র চেয়ে উপাদেয় বই বাংলায় আর লেখা হয়নি। শুষ্ক পাণ্ডিত্যের চেয়ে সরস গল্পের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞান উপভোগ্য ও স্থায়ী হয়। কুদরত না পড়লে হয়তো অসামান্য দরকারী বই 'শ্রুতিনন্দন' পড়ার মেজাজই তৈরী হোত না। যাদের সত্যিকার অর্থে সুর ভালো লাগে কিন্তু স্রেফ জানা ও বোঝার অভাবে আমাদের রাগসঙ্গীত শোনা হয় না, তাদের জন্য বইটি নতুন রাস্তা দেখাবে। যারা বিদগ্ধ শিল্পী ও শ্রোতা বইটি তাঁদের জন্য আনন্দবর্ধক। রুচিবর্ধক হিসেবে এ বইয়ের জুড়ি নেই। মনে পড়ে ছাত্রজীবনে বহু কষ্টে টাকা জমিয়ে বড়ে গুলাম আলী আর আমীর খাঁ সাহেবের প্রায় সব সি,ডি আমি কিনে ফেলি এই বইটি প্রথমবার পড়ার পরই। তার আগে আমার শোনার পরিধি ছিল ৩মিনিটের ছোট্ট রেকর্ডগুলো, রশীদ খাঁর মারুবিহাগ আর ভীমসেনজীর ইমনকল্যাণ, ললিত আর যোগিয়া। কুমারপ্রসাদের ভাষাশৈলী ও বর্ণনার ভঙ্গিটিও লাজবাব। একটু উদ্ধৃত করছি,

“মানুষের মনের এক স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে, অপ্রিয় স্মৃতি দূরে সরিয়ে দিয়ে মধুর স্মৃতিগুলোকেই আঁকড়ে রাখে। লখনউ এর বাল্যকালের স্মৃতি বড়ই মধুর। বেনারসিবাগের ওপন এয়ার চিড়িয়াখানা, সেকেন্দ্রাবাগের নানা স্বাদ ও গন্ধের পেয়ারা, শীতের ভোরে কুয়াশা ভেদ করে মিঠে রোদের সঙ্গে মিলিয়ে পুলিস লাইনের কুচকাওয়াজের বিউগলের আওয়াজ, জোহরাবাই ও আবদুল করিমের রেকর্ডের গান, চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইটস, তীরধনুক নিয়ে ইটালি ও অ্যাবিসিনিয়ার লড়াই,- বায়োস্কোপের ছবির মতো টুকরো টুকরো মনের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বায়োস্কোপ স্বাদ আর গন্ধ দিতে পারে না। আমি কিন্তু চোখ বুজলেই শীতের শিশির ভেজা ঘাসের ঘ্রাণ, গোলাপ ও মধুমালতী ফুলের মিষ্টি গন্ধ বা কর্তার লাইব্রেরিতে সিগারেট ও পুরনো বইয়ের সোঁদা সোঁদা গন্ধ, ডুবসাঁতার দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে এই সুদীর্ঘকাল ফেরত আনতে পারি।”

- আর নয়, বাকি কুদরতের জন্য রঙ বেরঙের বইটির পাতায় চোখ রাখুন।

নির্ঝর অলয়


মন্তব্য

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

বইটির অনেক প্রশংসা শুনেছি, পড়া হয়নি এখনো।
আপনার লেখা তৃষ্ণাটা জাগিয়ে তুললো আরো।
অচিরেই পড়ে ফেলবো আশা করছি

আলোচনার জন্য ধন্যবাদ

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

নির্ঝর অলয় এর ছবি

পড়ে ফেলুন। তাহলে আলোচনা আরো জমবে!

এক লহমা এর ছবি

'দেশ' পত্রিকায় যখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখন বইটি প্রথমবার পড়ি - প্রতি সংখ্যার জন্য প্রায় নেশাগ্রস্তর মত অপেক্ষা করে থাকতাম আমি আর আমার স্ত্রী। বই হাতে আসা মাত্র একজন আরেকজন-কে পরে শোনাতে থাকতাম। অতি সম্প্রতি এই সচলায়তনেই মাহবুব লীনেন-এর মহাভারত-এর উপর লেখাগুলি ছাড়া আর কোন লেখাই আমি 'কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী'-র সমতুল্য আনন্দ ও উচ্ছাসের সঙ্গে পড়েছি বলে মনে পড়ে না। পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত ছাপানো লেখাটি পড়ে মনে হয়েছিল - মূল লেখাটি আরও আকর্ষণীয় ছিল। তবে বাদ যা পড়েছে তা প্রাপ্তির তুলনায় সামান্যই।
পরিশেষে আপনার এই সমালোচনা সম্পর্কে বলি - অনবদ্য লেখা হয়েছে। অসাধারণ গোছান। এক্কেবারে ঠিকঠাক। আপনার পরের লেখার জন্য সাগ্রহ অপেক্ষায় থাকব।

আলতাইর এর ছবি

রাগসঙ্গীত কে আমিও দরবারী হিসেবাই জানতাম। আজকে ভুল ভাংলো। অনেক তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। আসলে রাগসঙ্গীত বুঝতে পারিনা বলেই উপভোগ করতে পারিনা। অক্ষমতা আমারই।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

দুঃখ হয় যে, সঙ্গীত যাদের জীবিকা তারা নিজেরা এই বিষয়গুলো নিয়ে হয় জানেন না, না হয় জেনেও উদাসীন থাকেন। ফলাফল আমজনতার ভুল ধারনা।

রাগসঙ্গীতের জন্ম নিয়ে দু খণ্ড 'কত নদী সরোবর' লেখা যায়- অবশ্য তার জন্য হুমায়ুন আজাদের মত ক্ষণজন্মা লেখকের প্রয়োজন। আমি কাঠখোট্টা বিজ্ঞানের মানুষ। তাই খুব অল্প কথায় এর জন্ম ও ক্রমবিবর্তন উল্লেখ করছি।

আদিম মানব গোষ্ঠী জীবনসংগ্রামের মধ্যে অবকাশের আনন্দ খুঁজে পেত সঙ্গীতের মধ্যে। এই সুকুমারবৃত্তি মানুষকে অন্য প্রাণীর ওপরে অনেকটা বিবর্তনীয় সুবিধেও দিয়েছিল। এই আদিম লোকসঙ্গীত ছিল পেন্টাটোনিক বা পাঁচ স্বর বিশিষ্ট যা 'উদাত্ত (চ্যাঁচানো), অনুদাত্ত (স্বাভাবিক) ও স্বরিত (গম্ভীর)- এই ক্রমে অবরোহী আকারে সাজানো হত। বৈদিক সামগানের স্কেলও এরকম পেন্টাটোনিক ছিল। হিমালয়ের পাদদেশে এবং নেপাল, তিব্বত ও চীনের লোকগীতিতে খুঁজে পাবেন পাহাড়ী, ভুপালী, দুর্গা ইত্যাদি রাগ। মালকোষ অবশ্য লোকগীতির ফর্মে ছিল বলে কোথাও পাইনি। অনেকে বলেন সঙ্গীত দু রকমের, যথা মার্গ ও দেশি। আসলে কথাটা পুরো সঠিক নয়। কারণ দেশি বলে যে সঙ্গীত প্রচলিত ছিল সেটা আসলে লোকগীতি নয় বরং লোকগীতির সুসংবদ্ধ ও বিধিবদ্ধ রূপ। অর্থাৎ লোকসঙ্গীতকে রিফর্ম করে রাগ ও দেশী সঙ্গীতের জন্ম দেয় প্রাচীনকালের সঙ্গীতগুণীরা। ক্রমে ৫ স্বর থেকে ৭ স্বরের স্কেল এল। এই দেশি সঙ্গীত প্রথমে মন্দিরে মরমী সঙ্গীত হিসেবে গীত হত এবং পরে হিন্দু ও মুসলিম সম্রাটদের দরবারে পৃষ্ঠপোষকতা পায়। মার্গ গান্ধর্ব সংগীত কী বস্তু তা বোধহয় ওই দেব-দানব-গন্ধর্বরাই জানেন - ওদেরই গান কিনা! যাই হোক মুসলিম অনুপ্রবেশের পর এই সঙ্গীতের সাথে যুক্ত হল সুফী সঙ্গীতের ধারা। শেষ পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলিম সঙ্গীতগুণীদের মিলিত অবদান আমাদের আজকের রাগসঙ্গীত। ডঃ পবিত্র কুমার ঘোষ তাঁর একটি গ্রন্থে শেষ ভাগ ৩টি কে মন্দিরাশ্রিত প্রবন্ধগীতি, দরবারাশ্রিত বা শাস্ত্রীয় ও সৃজনমূলক বা লঘু কিংবা মিশ্র সঙ্গীত নাম দিয়েছেন। আমার মনে হয় ৩টি ধারার দরকার নেই। কেননা মন্দিরাশ্রিত প্রবন্ধগীতি থেকেই গোয়ালিয়রের রাজা মানসিংহ তোমর, নায়ক গোপাল প্রমূখ গুণী ধ্রুপদ গানের জন্ম দেন যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে স্বামী হরিদাস ও তাঁর দুই শিষ্য মিয়া তানসেন ও বৈজু বাওরার অসামান্য প্রতিভার দ্বারা। এই ধ্রুপদ ভেঙেই সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ ভ্রাতৃদ্বয় অধুনা খেয়াল গানের জন্ম দেন। প্রবন্ধ থেকে ধুরপদের জন্মের সময়ই রাগসঙ্গীত মন্দির ও দরগাহ থেকে দরবারে প্রবেশ করে এবং এর সাথে সাধারণ মানুষের সংযোগ কমতে থাকে। দক্ষিণ ভারতে রাগসঙ্গীতের ঢালাও দরবারীকরণ হয় নি বলেই সেখানে রাগসঙ্গীত এখনো অত্যন্ত জনপ্রিয়! তবে এতাও ঠিক যে, পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া শিল্প বাঁচে না। আধুনিক গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই পৃষ্ঠপোষক অবশ্যই সঙ্গীতামোদী জনসাধারণ।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

@আলতাইর,

না বোঝার কিছু নেই। শোনা শুরু করুন। আর সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমীর এই অসাধারণ ওয়েবসাইটটিতে অনেক তথ্য ও দুষ্প্রাপ্য গানের আর্কাইভ পাবেনঃ

http://www.itcsra.org/sra_index/sra_index.asp

নির্ঝর অলয় এর ছবি

@ এক লহমা,

আপনার বিদগ্ধ মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। মূল লেখাটা আমার পড়া হয় নি। আপনার সংগ্রহে থাকলে স্ক্যান করে আপলোড করে দিতে পারেন। শুনেছি দারুণ দারুণ ছবিও ছিল ওখানে। বইটা এখন আরো নেশাগ্রস্থ করে। কারণ এখন আমার শোনার ভাঁড়ার অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে! দুর্ভাগ্য আমজনতার যে, কুমারপ্রসাদের করা অমূল্য ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রজেক্টের দুর্লভ রেকর্ডিংগুলো এস,আর,এর আর্কাইভে নিভৃতে পচে যাচ্ছে। বের হয়নি ঘরানার ওপরে তার অনুষ্ঠান 'চর্চা'র কোন সি,ডি। এভাবেই একটি বেনিয়া গোষ্ঠী আগের দিনের রাজাদের মতই এই মহান সঙ্গীতকে মানুষের নাগালের বাইরে রাখছে। রাগসঙ্গীতের সি,ডি-ডি,ভি,ডির দামও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। দক্ষিণ ভারতে শুনেছি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সি,ডি মাত্র চল্লিশ রুপি দাম রাখা হয় এবং রজনীকান্তের ছবির গানের চেয়ে খুব কম বিক্রি হয় না!

বেঙ্গল ও আইটিসির সদাগরি সংক্রান্ত অনৈক্যে বাংলাদেশের সঙ্গীতমহোৎসবটিরও ডি,ভি,ডি বেরুলো না। আশার মধ্যেও এটা বেশ হতাশার।

তিথীডোর এর ছবি

আগ্রহ জাগানিয়া রিভিউ। পড়ব বইটা। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

নির্ঝর অলয় এর ছবি

পড়লে ঠকবেন না- এটা নিশ্চিত! হাসি

ফাহিম হাসান এর ছবি

বই এবং আপনার আলোচনা/পাঠ-প্রতিক্রিয়া - দুইটাই দারুণ!

নির্ঝর অলয় এর ছবি

সকল কৃতিত্ব কুদরতের! হাসি
ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

পড়ার আগ্রহ তৈরি হোলো, যদিও সংগীতবিদ্যা বিষয়ে পড়াশুনা একেবারেই নেই।
অনেক ধন্যবাদ রিভিউর জন্য।

-অপর্ণা হাওলাদার।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

যেকোন শিল্পের ক্ষেত্রেই আগে দরকার শিল্পের চর্চা, তারপর পড়াশোনা।
ধন্যবাদ।

স্যাম এর ছবি

চলুক
আপনার আগের লেখাগুলো কিভাবে পড়তে পারব?

নির্ঝর অলয় এর ছবি

এই বিপদে ফেলেছেন। আমি নিজেও জানি না। কারণ অতিথি লেখকের ব্লগে লেখা আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে হয়। আমি নিজে বাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করি বলে আপনাকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও লিঙ্ক দিতে পারলাম না। এ দোষ আমার না, ইন্টারনেটব্যবসায়ী কর্তাব্যক্তিদের! মন খারাপ

পড়ার ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

এই একটা খুঁজে পেয়েছি!
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/46124

দময়ন্তী এর ছবি

বাঃ চমৎকার আলোচনা। একেবারে ঠিকঠাক।

-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'

নির্ঝর অলয় এর ছবি

ধন্যবাদ। তবে সব কি আর ঠিকঠাক হয়!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

উত্তর ও পূর্ব ভারতের সঙ্গীতবোদ্ধা, শ্রোতা, আয়োজকদের কাছে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গীতশিল্পীরা অচ্ছুৎ কেন? কেন তাদের আলোচনা, অনুষ্ঠান, কনসার্ট, কনফারেন্সে দক্ষিণীরা প্রায় অনুপস্থিত? কুমারজী'র আলোচনায়ও কি দক্ষিণীরা গুরুত্ব পেয়েছেন? মঙ্গলপল্লী বালমুরালী কৃষ্ণের মতো লিভিং লেজেন্ড কেন আমাদের অজ্ঞাতে থেকে যায়?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

পাণ্ডবদা,
কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। এর সাথে উপমহাদেশের সাঙ্গীতিক বিবর্তন, মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট জড়িত।

কুমারজী পরবর্তী বইগুলোতে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যেহেতু উনি নিজে খ্যাল-ঠুমরীর গাইয়ে ছিলেন এবং চর্চার মূল বিষয়ও তাই- সেহেতু তাঁর আলোচনা মূলত খেয়াল ও অংশত ঠুমরী বিষয়েই সীমাবদ্ধ। উল্লেখ্য যে, কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গীর আলোচ্য বিষয় 'হিন্দুস্থানী সঙ্গীত,' নামে গোটা ভারতবর্ষ বোঝালেও সঙ্গীতে 'হিন্দুস্থানী' শব্দটি শুধুমাত্র উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতকেই বোঝায়, দক্ষিণী বা কর্ণাটকী সংগীত তাই এই বইয়ের আওতার বাইরে। সমগ্র ভারতের সঙ্গীত নিয়ে বই লিখলে এটা সত্যিই গুরুতর অপরাধ ছিল।

আদিতে তো উত্তর দক্ষিণ একই ছিল। উত্তর ভারতে প্রথমে মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হল, সেই সাথে পারসীক সঙ্গীতের সংস্পর্শে রাগসঙ্গীত এক নতুন রূপ ধারণ করল। দক্ষিণীরা দাবী করে আদি ও অকৃত্রিম থাকার। যদিও সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। দাক্ষিণাত্যে ইসলামের বিজয় পতাকা দেরিতে ওড়ে এবং সেটা পুরো অঞ্চলে নয়। দক্ষিণী শিল্পীরা পারসিক সঙ্গীত দিয়ে কিছুটা কম প্রভাবিত ছিলেন কিন্তু একেবারে অপ্রভাবিত কিনা -সেটা নিশ্চিত নয়। সম্ভবত বৈদিক স্বরগ্রাম থেকে উদ্ভুত স্বরগ্রাম থেকে মূর্ছনার মাধ্যমে রাগ তৈরি এবং নতুন স্বরগ্রাম উদ্ভাবনের কোন এক পর্যায়ে উত্তর ও দক্ষিণ আলাদা হয়ে যায়। আসলে সেকালে কী হয়েছিল- আর সেসব প্রাচীন রাগের কল্পনা করাও এখন বেশ কঠিন।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দক্ষিণী/পান্নিকাই সঙ্গীতকে কর্ণাটকী সঙ্গীত বলাটা কতটুকু ঠিক?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

কর্ণাটকী প্রচলিত, তবে দক্ষিণী বলাই যুক্তিসঙ্গত।

হিমু এর ছবি

আপনি কি সচলায়তনে নিবন্ধন করেছেন?

নির্ঝর অলয় এর ছবি

হিমুদা, করেছিলাম তো।
নির্ঝর অলয় নামে ইমেইল আইডি

কিন্তু পর পর চারটে লেখায় ভুলে শুধু 'অলয়' নাম লিখেছিলাম। তারো আগে আরেকটা আইডি দিয়ে নিবন্ধন করেছিলাম। সেটাকে বাতিল করার জন্য কর্তৃপক্ষকে ইমেইল করেছি।

তারেক অণু এর ছবি

পড়ার ইচ্ছে অনেকদিনের, হাতে আসে নি। মন খারাপ

নির্ঝর অলয় এর ছবি

আজিজ সুপারমার্কেটে বেশ কিছু দোকানে পাবেন। হাসি

ডালটন এর ছবি

অনু, আমার কাছে আছে বইগুলো। এবার এলে বলিস, ধার দিব। হাসি

ডালটন  এর ছবি

বইখানা আমিও কিনেছি তক্ষশীলা থেকে। সাথে মজলিস ও ম্যাহফিল নামে উনার লেখা আরোও দুইটি বই। পড়া শুরু করব জলদি।

ডালটন  এর ছবি

লেখকের এই বইটি ছাড়াও আরো তিনটি বই আমার সংগ্রহে আছে। কিছুদিন আগেই আজিজ থেকে কিনেছি। পড়া শুরু করা হয়নি।

ডালটন এর ছবি

আমার জানা মতে কুমার প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ৫ খানা বই রয়েছে। যার মাঝে ' দিশি গান বিলিতি খেলে" বাদে ৪ টে আমার সংগ্রহে আছে। কিছুদিন আগেই আজিজ সুপার থেকে কিনেছি। যদিও এখনও পড়া শুরু করতে পারিনি। কারণ হাতে এখন আরেক অসাধারণ বই আছে, প্রখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ' কথায় কথায় রাত হয়ে যায়"। একই ধাঁচের বই এটাও। লেখকের গীতিকার জীবনের পথে পরিচিত হওয়া, এক সাথে কাজ করা অসংখ্য নামী দামী, নাম না জানা আবার অজানাদের একান্ত জীবনের কথা আছে এই বইটাতে। সাথে আছে তাঁদের সাথে লেখকের অন্তরঙ্গ অনেক মুহুর্তের কথা। আমাদের শোনা অনেক জনপ্রিয় গানের রচনার পটভুমি।

এই বইটাও সবাইকে পড়তে অনুরোধ করব।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

@ডালটন,

ধন্যবাদ পড়ার জন্য। কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিছুটা সৈয়দ মুজতবা আলীর ঢঙে যে গদ্যশৈলীর নিদর্শন রেখেছেন- তা এক কথায় অনবদ্য। তাঁর প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছেঃ
১। কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী
২। দিশি গান বিলিতি খেলা
৩। মেহফিল (আত্মজীবনীমূলক)
৪। মজলিস
৫। খেয়াল ও হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের অবক্ষয়

প্রতিটা বইই অসাধারণ। বাংলা সাহিত্যে কুমারপ্রসাদের অবদান নিয়ে আরো আলচনা হওয়া উচিত। তবে আসলে আমাদের দেশে সঙ্গীত নিয়ে মানসম্মত সমালোচনা প্রায় অনুপস্থিত। দু চারজন ভালো লোক আছেন বটে, তবে তাঁরা বেজায় গোঁড়া এবং গজদন্ত মীনারের বাসিন্দা! সচলের মত অসাধারণ একটি বাংলা ব্লগে সঙ্গীত বিষয়ে একটা আলাদা বিভাগ থাকা উচিত বলে মনে করি। কারণ পৃথিবীর নানান প্রান্তের অসাধারণ সব গান নিয়ে এখানে পোস্ট দেখেছি। গানবাজনার মান উন্নত করার জন্য রসিক শ্রোতার কোন বিকল্প নেই। নইলে বেসুরোদের উৎপাতেই দিন যাবে!

'কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়'- পড়েছি। এই ধারাবাহিক লেখাগুলোর জন্য অনেকগুলো পুরনো আনন্দলোক কিনেছিলাম। পরে বই আকারে পেয়ে মনে খুশির রংমশালের আলো! ওটা নিয়ে লিখুন।

Rajib Chakraborty এর ছবি

নির্ঝর, তোমার লেখাটি পড়লাম এই সদ্য। খুব সুচিন্তিত লেখা। সংগীত সম্পর্কিত বইয়ের এরকম আরও পর্যালোচনা করো। অপেক্ষায় থাকলাম।

নির্ঝর অলয় এর ছবি

রাজীব দা, আমি আমার টুটোফাটা লেখার লিঙ্ক আপনাকে পাঠাতে সাহস করি না। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
আসলে সঙ্গীত আলোচনার সংস্কৃতি আমাদের নেই বললেই চলে।

সচলে সঙ্গীত নিয়ে অনেকেই অনবদ্য সব পোস্ট দেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে "সঙ্গীত" নামে কোন বিভাগ নেই। এ বিষয়ে মডারেটরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মণিকা রশিদ এর ছবি

কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের তিনখানা বই পড়া হয়েছে। কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গি, দিশি গান বিলিতি খেলা ও মজলিশ। রিভিউ লেখার মতন তেল নাই বলে লেখা হয়নি। ওঁর খেয়াল ও হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের অবক্ষয় বইটি পড়তে আমি খুবই আগ্রহী। আপনার রিভিউ ভাল লাগলো।

----------------------------------------------
We all have reason
for moving
I move
to keep things whole.
-Mark Strand

নির্ঝর অলয় এর ছবি

ধন্যবাদ মণিকা দি।

আসলে রিভিউ এর ছলে বিস্তৃত আলোচনা কিন্তু হয়েই যায়। কাজেই তেল সংগ্রহ করলে আমার মত আমপাঠক উপকৃত হত।

আমি কুমারপ্রসাদের সব লেখাই মন দিয়ে পড়েছি। ভদ্রলোক বাংলাসাহিত্যের এক আনসাং হিরো। ওঁর প্রতিটি বই নিয়ে এবং বহুমাত্রিক ব্যক্তি কুমারপ্রসাদকে নিয়ে প্রচুর আলোচনার সুযোগ আছে। দিশি গান ও বিলিতি খেলার রিভিউ লিখতে সেরকম রসিক লোক চাই অবশ্যই। মজলিশ আর মেহফিল ও তেমনি আড্ডাবাজ পণ্ডিতের কাজ।

'খেয়াল ও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অবক্ষয়"- কুমারপ্রসাদের ঈষৎ গম্ভীর ভঙ্গিমায় লেখা মাস্টারপিস। ওতে খেয়াল গানের উদ্ভব, বিবর্তন ও বিভিন্ন ঘরানার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো পাবেন। এ বিষয়ে কুমারপ্রসাদের অমূল্য কাজ ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রজেক্টের ইন্টারভিউ এর টেপগুলো এস,আর,এ র গুদামে পচছে। পচবে তবুও সাধারণ মানুষকে শুনতে দেবে না। এই কারণেই হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত লোকে শোনে না। দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কিন্তু মন্দির ভিত্তিক হবার কারণে এবং হালে স্বল্প মূল্যের সিডির কারণে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিষয়টা ভেবে দেখবার মত।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।