ভারতের প্রতারনার প্রচেষ্টা থেকে শিক্ষা নিতে হবে সরকারকে

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৮/০৯/২০১১ - ৮:৩২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি হলো না। হলো না ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তিও। অনেক আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। মনমোহন সিংয়ের সফরটা নিয়ে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আশায় গুড়ে-বালি। শেষ মুহুর্তে শ্রীমতি মমতা ব্যনার্জী বেঁকে বসাতে এ যাএায় বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গের মানুষের মঙ্গা আরো দির্ঘায়িত হল। তিনি উত্তর বঙ্গের ভারত অংশের মানুষের সমস্যার কথা চিন্তা করে শেষ মুহূর্তে পিছমোড়া দিলেন। এটা তিনি করতেই পারেন। তার দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা আগে চিন্তা করবেন এটাই স্বভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন তিনি আগে বিষয়গুলো চিন্তা করেননি? শেষ মুহূর্তে কেন এ পিছটান? পশ্চিম বঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও যে বাংলাদেশের চেয়ে খুব একটা ভাল না এটা জানা ছিল আগেই। সেখানেও বনধ লেগে থাকে। সিপিএম আর তৃনমূলের সংঘাত নিত্যকার। সন্ত্রাস দমনের নামে সেখানেও চলে বিরোধী কন্ঠকে হত্যা। সেখানেও চলে রাজনীতিবিদদের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা। মমতা বিপুল সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর মনে হয়েছিল পশ্চিম বঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটতে চলছে। বাম রাজনীতি মানুষের প্রত্যাশা পুরনে ব্যর্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিম বঙ্গের মানুষ তৃনমূলের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, তার প্রতিফলন ঘটে কয়েকমাস আগের নির্বাচনে। আমাদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মমতার ভাল সম্পর্কের একটা ইতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে পড়বে। দুই বাংলার মাঝে বিদ্যমান দূরত্বও এর ফলে ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু আমার আশা হলো দুরাশা। কেননা, এ অঞ্চলের নেতারা যে প্রতিনিয়ত সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ঘোরেন তা আমার বিবেচনা থেকে বাদ পড়েছিল। মমতা শেষ মুহুর্তে তার তুরুপের তাসের চাল দিলেন। শেষ মুহূর্তে তার মনে হলো এতে করে তার প্রদেশের উত্তর বঙ্গের মানুষ পানি পাবেন না। তাহলে কি বলতে হবে মমতা জানতেন না কি পরিমান পানি বাংলাদেশকে দিতে হবে? পশ্চিম বঙ্গের পত্রিকাগুলো দেখলে অবশ্য মনে হয় মমতা এ বিষয়ে ভালই তথ্য জানতেন। তাকে নাকি বলা হয়েছিল বাংলাদেশকে ২৫০০০ কিউসেক পানি দেয়া হবে কিন্তু খসড়া চুক্তিতে নাকি ছিল ৩৩০০০ কিউসেক পানি দেয়া হবে। এ অজুহাতে তিনি তার দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশ সফরে না আসার সিদ্ধান্ত নেন। মনমোহন সিং আসার আগ মুগূর্তে তার এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানুষকে হতাশ করে। এক পর্যায়ে ভারতের বিদেশ সচিব রঞ্জন মাথাই বললেন যে যুক্তরাষ্টীয় কাঠামোয় কোন অংগরাজ্যের সম্মতি ছাড়া আর্ন্তজাতিক চুক্তি করা সম্ভব নয়। তার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে কতগুলো প্রশ্ন এসে যায়। যুক্তরাষ্টীয় কাঠামোয় যে কোন অংগরাজ্যের সম্মতি ছাড়া আর্ন্তজাতিক চুক্তি করা সম্ভব নয় এটা কি ভারতের সরকার এবং কুটনীতিকরা আগে জানতেন না? যদি জেনে থাকেন তাহলে কি পশ্চিম বঙ্গের সরকারকে তারা আগ থেকে চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়ে আবহিত করেছিলেন? যদি অবহিত করেই থাকে তাহলে মমতা ব্যনার্জী শেষ মুহূর্তে কেন তার মত পরিবর্তন করলেন?

দেখি প্রশ্নগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করা যাক। ১৯৯৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং সেই সফরের সময় গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। সে সময় ভারতের বর্তমান বিদেশ সচিব রঞ্জন মাথাই বাংলাদেশ বিষয়ক যুগ্নসচিব ছিলেন। তিনি তখন পশ্চিম বঙ্গের তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সাখে সে চুক্তির খসড়া তৈরীর আগে বহুবার বৈঠক করেছিলেন। তিনি নিজে বলেছেন, ‘সে সময় জ্যোতিবাবুর সঙ্গে যে কতবার দেখা করেছি তার কোন ইয়াত্তা নেই। আমরা দু’জনে নৌকায় করে গঙ্গাতেও ঘুরেছি। নদীর নব্যতা পরিদর্শন করা হয়েছে’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে একই ব্যক্তি এখন ভারতের বিদেশ সচিব, তার রয়েছে গঙ্গা চুক্তি করার অভিজ্ঞতা। তিনি তিস্তা চুক্তি করার আগে মমতার সাথে পর্যাপ্ত যোগাযোগ করবেন না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আবার তিনিই বলছেন, ‘ যুক্তরাষ্টীয় কাঠামোয় কোন অংগরাজ্যের সম্মতি ছাড়া আর্ন্তজাতিক চুক্তি করা সম্ভব নয় ’। তাহলে দেখা যাচ্ছে তিনি এ ধরনের চুক্তির জন্য ভারতের আভ্যন্তরীন ফ্যাক্টরগুলো ভালই জানেন। তার গঙ্গার পানি চুক্তির অভিজ্ঞতা ও পশ্চিম বঙ্গের সম্মতির প্রয়জনীয়তার জ্ঞান থেকে মনে হচ্ছে মমতার সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে তিনি বা অন্য কেউ অবশ্যই পর্যাপ্ত আলোচনা করেছিলেন এবং সেই আলোচনার প্রক্ষিতেই তারা খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছিলেন।

ভারতের গঙ্গা চুক্তির অভিজ্ঞতার আলোকে যদি কেন্দ্রীয় সরকার মমতার পশ্চিম বঙ্গ সরকারের সাথে আলোচনা না করে চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করে তাহলে মনে প্রশ্ন জাগে, ভারতের সরকার প্রতারনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মাথায় হাত বুলিয়ে তিস্তা চুক্তির মুলা দেখিয়ে ট্রানজিটের সম্মতি পত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে চেয়েছিল কি? এটা কি ভারতের একটা সাজানো নাটক ছিল কেবল মাত্র? যদি তাই না হয় তাহলে এতো অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রঞ্জন মাথাই বা কোন অভিজ্ঞ কুটনীতিক বা কংগ্রেস সরকারের প্রতিনীধি কেন পশ্চিম বঙ্গের সরকারের সাথে যথেষ্ট আলোচনা করলেন না?

যদি তারা পূর্বে পর্যাপ্ত আলোচনা করে চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করে থাকেন তাহলে বলতে হবে মমতা প্রতারনার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি চুক্তির খসড়া জানতেন। পত্রপত্রিকায় এমনই দেখেছিলাম যে মমতা খসড়া প্রস্তুতের সময় নিজে জড়িত ছিলেন। পশ্চিম বঙ্গের পত্রিকা থেকে জানতে পারলাম মমতার আসল রাজনীতি। সামনের পঞ্চায়েতের নির্বাচনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় তিনি শেষ মুহুর্তে তিস্তা চুক্তির প্রকৃয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। ভারতের পত্রিকাগুলো আরো দাবি করছে মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকারও এমুহূর্তে সকরারের অংশীদার তৃনমূল কংগ্রেসকে ঘাটাতে চায় না। দূর্নীতির অভিযোগে চাপে থাকা কেন্দ্রীয় সরকার আপাতত মমতাকে ম্যনেজ করে চলতে চায়। ভারত সরকার অবশ্যই জানতো যে মমতা শেষ মুহূর্তে বাগড়া দিতে পারেন। তারপরও তারা মমতাকে পুরোপুরি ম্যনেজ না করেই বলে দিয়েছিল খসড়া চুক্তি প্রস্তুত আর এটা এখন শুধু স্বাক্ষরের অপেক্ষায়। শেষ মুহূর্তেও তারা বলে গেছেন যে চুক্তি হচ্ছে। সেই সাথে বলে যাচ্ছিলেন আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনিও। তিনি অবশ্য ভারতের কাছ থেকে যেভাবে শুনছিলেন তাতে হয়ত মনে করেছিলেন শেষ পর্যন্ত চুক্তি হচ্ছে। তাহলে বলতে হয়, ভারত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। একদিকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী বলছিলেন, ‘ যুক্তরাষ্টীয় কাঠামোয় কোন অংগরাজ্যের সম্মতি ছাড়া আর্ন্তজাতিক চুক্তি করা সম্ভব নয় ’ আর অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে তিন্তা চুক্তি স্থগিত বা বাতিল হওয়া দিয়ে কোন প্রকার অবহিত করা হলো না বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতরকে। তাহলে এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর মানে কি? মানেটা পরিস্কার। বাংলাদেশেকে শেষ মুহূর্তে এসে ভবিষ্যতের মূলা দেখিয়ে ট্রানজিটের সম্মতিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া। মূলা দেখানোর নমুনাও দেখতে পেলাম। ৪৬টি পোষাক ও বন্ত্রখাতের আইটেম সহ ৬১টি আইটেমের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া, ভারতের রাস্তা ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বানিজ্যিক ট্রাক আসা যাবার আনুমতি দেয়া, তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

আনন্দবাজার পত্রিকার রির্পোটার এসবকে ভারতের উদারতা হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু আমি বলব, কোন উদারতাই তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার অধিকার বঞ্চিত করার কপটতাকে মুছে দিতে পারেনা। তিস্তার পানি আমাদের প্রাপ্য। পশ্চিম বঙ্গের কৃষকের গোয়াল ভরা ধান উঠবে আর বাংলাদেশে মঙ্গায় মানুষ মরবে এটা কোন উদারতা? নদীর প্রবাহ বন্ধ করে একটা দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা কোন উদারতা? এইসব উদারতা দিয়ে তারা চট্টগ্রাম আর মংলা বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাস্তা দিয়ে মালামাল নিয়ে যেতে চায় নিজ দেশে। জানি, আমাদের দেশের কিছু রাজনীতিবিদ আর কতিপয় বুদ্ধিজীবি এখন ভারতের এসব উদারতার গুনগান করে ট্রানজিট প্রটোকলে সম্মতি আদায়ের জন্য তৎপর হবেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ট্রানজিট হলো আমাদের হাতে থাকা একমাত্র ট্রাম্পকার্ড। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ সুবিধা আর ন্যায্য পাওনা ভারতের কাছ থেকে আদায় করে নেয়ার মানসিকতাই হওয়া উচিৎ আমাদের ভারত বিষয়ক চলমান বিদেশ নীতির মুলমন্ত্র। আমাদের ভূলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশের ভু-রাজনৈতিক গুরুত্ব দক্ষিন এশিয়ার প্রেক্ষাপটে অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ন। ভারতের সাথে তার প্রতিবেশী বেশীরভাগ দেশের সাথে বৈরী সম্পর্ক বিরাজমান। পশ্চিমে পাকিস্থানের সাথে সম্পর্ক শত্রভাবাপন্ন, আফগানিস্থানের সাথে সম্পর্ক জোড়ালো নয়, চীনের মাথে ভারতের সীমানা বিরোধ বেশ পুরাতন। চীন ও পাকিস্থান ভারতের জন্য সব সময়ই হুমকি। ভারত চায় তার পূর্ব সীমান্তের ছোট ছোট দেশগুলোর সাথে একটা অক্ষশক্তি গড়ে তুলতে কিন্তু কখনই দেশটি ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কেও ক্ষেত্রে সংর্কীর্নতার উর্দ্ধে উঠতে পারেনি। তাই এখন পর্যন্ত ভারত তার পূর্বদিকের দেশগুলোর সাথে একজোট হয়ে কাজ করতে পারেনি। অন্যদিকে চীন সবসময়ই ভারতের পূর্বদিকের দেশগুলোর উপর তাদের প্রভাব অক্ষন্ন রাখার চেষ্টা করে। ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশের সাথে চীনের যে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক তৈরী হয় তাকে ভারত সব সময়ই দেখেছে সন্দেহের চোখে। দেখাটাই স্বাভাবিক। কারন বাংলাদেশের সাথে চীনের সরাসরি কোন ভৌগলিক সীমারেখা না থাকলেও, এ দুটো দেশের মাঝখানে সামান্য কিছু কিলোমিটারের শিলিগুড়ি করিডোর সব সময়ই ভারতেকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার ভীতিতে রাখে। শিলিগুড়ি করিডোর নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝখানে সর্বনিন্ম মাত্র ১২ কিলোমিটার প্রশ্বস্ত একটা করিডোর। এর পাশেই রয়েছে অরুনাচল প্রদেশ সংলগ্ন চীন সীমান্ত। চীন যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্যকে মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম তা প্রমানিত হয়েছে ১৯৬২ সালে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন ভারতকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে ভারতের অভ্যন্তরে বেশ কিছুদুর আগ্রসরও হয়েছিল। এখনও ভারতের সীমান্তের বিশাল এলাকা চীন অধিকৃত।

একদিকে চীনের হুমকী আর অন্যদিকে ৭টি রাজ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিদ্রোহও ভারতকে সব সময় আভ্যন্তরীন দিক থেকেও বিচ্ছিন্নতার হুমকিতে রাখে। কেননা ভারত দাবী করে ভাবতের গোলযোগপূর্ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নত্বাদীরা চীনের মদদপুষ্ট। আগে বাংলাদেশও একই দোষে দুষ্ট ছিল, কিন্তু আজকাল বাংলাদেশে সম্পর্কে এসব অভিযোগ করে না ভারত, সম্ভবত কৌশলগত কারনে। বাংলাদেশের সাথে বিরোধপূর্ন সম্পর্ক ভারতকে আরো সংকটে ফেলার সম্ভবনা তৈরী করে। বরং বাংলাদেশকে যদি কব্জায় আনা যায় তাহলে এই সব বিচ্ছিন্নতাবাদকে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করা সম্ভব আর চীনের হুমকিও এড়ানো সম্ভব। ভারত সব সময়ই চায় তার মুরগীর গলার আকৃতির শিলিগুড়ি করিডোরটি নিরাপদ থাকুক। তাই চীন বাংলাদেশ সম্পর্ককে সব সময়ই সন্দেহের চোখে দেখে ভারত। বাংলাদেশের রাস্তায় ভারতীয় যানবহনের প্রবেশাধিকার পেলে ভারতের পক্ষে খুব সহজেই সম্ভব এই ৭টি রাজ্যকে মুলখারায় সম্পৃক্ত করা।

বাংলাদেশ শুধুমাত্র উপরুক্ত কারনেই ভারত বা চীনের কাছে ভ’-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ন না, আরো কারন আছে। বাংলদেশের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ মাত্র ৩০০ ম্ইাল দক্ষিনে অবস্থিত। ভারত আন্দমানে ভারত মহাসাগরীয় সামরিক ঘাটি তৈরী করেছে এবং এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের উপর তার অধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেতে চায়। অন্যদিকে চীনও বার্মার জলসীমা ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরের উপর ভারতীয় নিয়ন্ত্রনকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা বাংলাদেশের গভীর সমূদ্রে বন্দর তৈরী করতে চায়। অন্যদিকে ভারতের অধুনা মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও চায় বঙ্গোপোসাগরে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন করতে। ভারতকে হুমকির মধ্যে রাখতে হলে বঙ্গোপোসাগরের উপর নিয়ন্ত্রন খুবই গুরুত্বপূর্ন। তাই কৌশলগত মিত্র হিসেবে বাংলাদেশকে পেতে চায় ভারত, চীন আর যুক্তরাষ্ট্র। বঙ্গোপোসাগরের গ্যাস ব্লকগুলোর দিকেও চোখ আছে এসব দেশের।

স্নায়ু যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে চীন ও রাশিয়া কৌশলগত কারনে পরস্পরের কাছাকাছি এসেছে। তাদের কৌশলগত মিত্রতাকে যুক্তরাষ্ট্র সব সবময়ই হুমকি মনে করে। পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের সাথে সামরিক মৈত্রী গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান চীনের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতকে চীনের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরীতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অতীতে প্রমানিত হয়েছে শিলিগুড়ি করিডোর বন্ধ করে দেবার ক্ষমতা চীনের আছে। যদি এমনটি কখনও ঘটে থাকে তাহলে ভারতের হাতে একটাই রাস্তা খোলা থাকবে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্যে প্রবেশের। আর সেটি হলো বাংলাদেশের রাস্তাকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে প্রবেশ। আমি অস্বীকার করছিনা যে ভারত তার বানিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশকে তার করিডোর হিসেবে পেতে পায়। কিন্তু অন্তরালে এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অবশ্যই একটা ফেক্টর। সুতরাং, ভারতকে করিডোর ব্যবহারের জন্য দিলে ভবিষ্যৎে বাংলদেশকেও বিভিন্ন আঞ্চলিক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়তে হবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

বাংলাদেশ যদি করিডোর দিতে সম্মত হয়েই থাকে তাহলে, আমাদের সবার আগে ভাবতে হবে যে এত বড় ছাড়ের পর আমাদের কতটা লাভ হচ্ছে। আমরা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আমাদের বানিজ্য কতটা প্রসার ঘটাতে পারব, আমরা ট্রানজিট ফি বাবদ কত টাকা বছরে আয় করতে পারব, ভারত আমাদের এ সহযোগীতাকে কতটা শ্রদ্ধা করবে অর্থাৎ ভারত কতটা আন্তরিকতার সাথে অন্যান্য বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে এগিয়ে আসবে। এসব বিষয়ের সুস্পষ্ট হিসাব আমাদের হাতে থাকতে হবে। যতদূর জানি, এ হিসাবগুলো খুবই অস্পষ্ট। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারত যে চালবাজি করার চেষ্টা করল তাতে প্রমানিত হয়েছে ভারত বাংলাদেশের সাথে বিরাজমান দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো নিয়ে আন্তরিক নয়। তবে আমি হতাশ নই। ভারতকে তার নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশের সাথে সমস্যাগুলোর সমাধার করতে হবে। ভারত তার আঞ্চলিক অখন্ডতা বজায় রাখার প্রকিৃয়াকে আরো শক্তিশালী করতে হলে তাদের বাংলদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় না রেখে উপায় নেই। এক্ষেত্রে আমাদের সরকারকে হতে হবে আরো কুশলী। তাদের দর কষাকষি হতে হবে আরো শক্ত হাতে। তিস্তা চুক্তি না হওয়া আর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সহ আরো একজন উপদেষ্টার অতিমাত্রায় ভারত প্রীতি আমাদের ন্যায্য পাওনাগুলোকে ধরাছোঁয়ার বাইরেই রেখে দিতে পারে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের তথ্যহীনতা আমাদের পররাষ্ট্র নীতির দূর্বলতাকে প্রকাশিত করেছে। তাই আমি সরকারের কাছে আহবান জানাব পুনবায় ভারতের সাথে বসার আগে আমাদের দর কষাকষির জায়গাগুলোকে নিয়ে আরো ভাল করে হোম ওয়ার্ক করতে। প্রয়োজনে অতিমাত্রায় ভারত প্রেমিক কেউ যদি থাকেন তাকে দায়িত্ব থেকে বাদ দেয়া যেতে পারে।

সাইফ জুয়েল

সূত্র:

1. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা (অনলাইন এডিশন) : ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর
2. Brig Gen Sakhawat Hussein ndc, psc (Retd); Geo-strategic importance of Bangladesh; The Daily Star; February 19, 2006
3. বিডি নিউজ বাংলা: ৭ সেপ্টেম্বর


মন্তব্য

সচল জাহিদ এর ছবি

তিস্তা, ট্রানজিট, ভারত-চীন-বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, গভীর সমুদ্র বন্দর, বঙ্গোপসাগরের গ্যাসব্লক, ভারতের অভ্যন্তরীন সমস্যা এই সব ইস্যুগুলো নিয়ে এক লেখায় আলোচনা করে গেলেন ফলশ্রুতিতে কোন কিছুই যৌক্তিক ভাবে পরিষ্কার হলোনা। এই প্রত্যেকটা ইস্যু নিয়ে আলাদা করে আলোচনা প্রয়োজন এবং সেই সাথে এদের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকী। আমার তিস্তা নিয়ে সামান্য জ্ঞান আছে তাই সেইটাই আলোচনা করি।

"২৫,০০০ আর ৩,০০০০ কিউসেক" এই দুটি সংখ্যা সংবাদ মাধ্যমে আসছে কয়েকদিন ধরে কিন্তু এই পরিমান পানি আসলে কি সেটা কেউ জানেনা। কখন কি সময়ে এই পরিমান পানি ছাড়া হবে সেটাও কেউ জানেনা। তিস্তা চুক্তি হবার কথা ১ অক্টোবর থেকে ৩০ এপ্রিল পর্সন্ত ১০ দিন ভিত্তিক গড় প্রবাহের উপর ভিত্তি করে। সেই বিচারে এই ৭ মাসে মোট ২১ টি পর্যায় থাকার কথা ( অক্টোবর ১-১০, অক্টোবর ১১-২০ , .........মার্চ ২১-৩১) এর মধ্যে কখন এই প্রবাহ ছাড়া হবে। এই সময়ের মধ্যে প্রবাহ ন্যুনতম ৪০০ কিউসেক পর্যন্ত যেতে পারে ( উপাত্ত বিশ্লেষণে)।

গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দিল্লীতে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করছিলেন। আপনি উল্লেখ করলেন ১৯৯৭ সালে দেব গৌড়ার বাংলাদেশ সফরের সময়ের কথা ।

আমার ব্যাক্তিগত ধারনা তিস্তা চুক্তি হচ্ছেনা এই তথ্য শেষ মূহুর্তে দুই দেশের নেতৃবৃন্দ জানতেন, বিশেষত মমতা ব্যানার্জীর সফর থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবার পর। কিন্তু যেহেতু ভারত সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে তখনো জানায়নি তাই কূটনৈতিক ভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চুক্তি হচ্ছেনা এই কথাটি সরাসরি সংবাদ মাধ্যমে বলতে পারেননি /চাননি। তবে সরকার হয় আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেন যে তিস্তা চুক্তি না হলে অন্যান্ন কোন কোন বিষয়ে ভারতের সাথে ঐক্যমতে যাবেননা।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

সাইফ জুয়েল এর ছবি

ধন্যবাদ জাহিদ ভাই, ভূলটা ধরিয়ে দেবার জন্য। গঙ্গা চুক্তি আসলে হয়েছিল বাংলাদশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনিার ভারত সফরের সময়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে। আর ২৫০০০ আর ৩৩০০০ কিউসেকের ধারনাটা পেয়েছি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে (৬ সেপ্টম্বের ২০১১ অনলাইন সংখ্যা থেকে)। আর আপনার ব্যক্তিগত ধারনা হয়ত ঠিক। তবে এটা নিয়ে আমাদের বিদেশ মন্ত্রীর এমন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন যে চুক্তি হবে! এটা বলা ঠিক হয়নি। ধন্যবাদ আপনার মূল্যবাদ মতামতের জন্য। ভাল লাগল।

guesr_writer rajkonya এর ছবি

চলুক

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি
সাইফ জুয়েল এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ সবুজ পাহাড়ের রাজা। অনেক ভাল থাকবেন।

সাইফ জুয়েল এর ছবি

রাজকন্যাকে অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।

nupurkanti এর ছবি

ভারতের কূটনীতিকরা আমদের দেশেরগুলোর থেকে অনেক বেশী দক্ষ আর দড়। এমনি এমনি তো আর সুপারপাওয়ার হয়নি! এদের সংগে টেক্কা দেয়াটা সহজ ব্যাপার না। আমাদের রাষ্ট্রদূতদের হাল তো দেখছি। বিভিন্ন এমব্যাসিতে কি টাইপ অখাদ্য লোক যায় দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে তা বলার নয়। তার উপর আছে রাজনীতির পচনশীল অবস্থা। সবাই স্টান্টবাজি আর চাপাবাজিতে ব্যস্ত। এ অবস্থায় তিস্তা কি গঙ্গা যে কোন চুক্তিতে বাংলাদেশকে ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দেবে ভারত।এটা তো একটা খেলা। প্রতিপক্ষের কাছে ন্যায় বা বিবেচনাবোধ বা বিবেক জাগ্রত হবার অলীক স্বপ্ন না দেখে তাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
মেধাবী মানুষরা যতদিন পর্যন্ত রাজনীতিতে না আসছে, ততদিন এদেশের কোন ভবিষ্যত নেই।

সাইফ জুয়েল এর ছবি

ঠিকই বলেছেন। আমাদের কুটনীতিকদের দক্ষতা আরো বাড়ানো দরকার। দর কষাকষির বিষয়গুলোতে ভাল নেগোসিয়েট করার মত দক্ষ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, কুটনীতিক আর আমলার বড়ই অভাব আজ বাংলাদেশে।

মেধাবী মানুষরা যতদিন পর্যন্ত রাজনীতিতে না আসছে, ততদিন এদেশের কোন ভবিষ্যত নেই।

সহমত।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।

পিয়াল এর ছবি

"মেধাবী মানুষরা যতদিন পর্যন্ত রাজনীতিতে না আসছে, ততদিন এদেশের কোন ভবিষ্যত নেই।"

আর আমাদের মেধাবী বন্ধুরা বিসিএস দিয়ে প্রশাসন/ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে যোগ দেয়ার পর সেই গতানুগতিক সিস্টেমেরই অংশ হয়ে যান।

সাইফ জুয়েল এর ছবি

সহমত। তবে শুধুমাত্র মেধাবী হলেই চলে না, দেশপ্রেম্ও থাকতে হয়। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। পিয়াল ভাল থাকবেন।

কল্যাণF এর ছবি

আসলে মেধাবীরা কি বিসিএস দেয়? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমার ব্যাচের মেধাবীরা কিন্তু কেউ বিসিএস দেয়নি। তারা হয় দেশের বাইরে অথবা প্রাইভেট কোম্পানির বড় পদে কর্মরত। আর যারা দিয়েছে তারা নেহাত সাধারনই ছিলো। আমার ভাই বোনদের, বউ এর এবং তার ভাই বোনদের, আত্মীয় স্বজনের মধ্যে, পরিচিত সার্কেলে একই অবস্থা। কি আর বলব, নিজে কখনো বিসিএস দেইনি, হয়তো তলার দিকের ছাত্র ছিলাম, কিন্তু আশে পাশে অনেক ভাল ছাত্র কিন্তু ছিল। সুতরাং কারা যাচ্ছে আর সহজেই গতানুগতিক সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। এখানে মনে হয় আরো চিন্তা ভাবনার ব্যপার আছে। ভাল থাকবেন।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।