বাংলাদেশে বন ব্যবস্থাপনার বিকল্প পদ্ধতি

মাহবুব রানা এর ছবি
লিখেছেন মাহবুব রানা [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ০৬/০৪/২০১১ - ৮:০৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বাংলাদেশে বন-ব্যবস্থাপনার প্রচলিত পদ্ধতি যে ব্যর্থ সেটা যেকোনো বনের দিকে চোখ গেলেই বোঝা যায়।

প্রচলিত ব‌্যবস্থায় বনকে সরকারী সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয় এবং এতে বনের উপর নির্ভরশীল মানুষের অধিকারকে স্বীকার করা হয় না, বরং ধরে নেয়া হয় এরাই বনের প্রধান শত্রু। অধিক জনসংখ্যার চাপে বনের উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা এবং বনভূমি জবরদখল বন ধ্বংসের একটা কারণ বটে, কিন্তু বন তো এমন সম্পদ না যে আপনি তালা চাবি দিয়ে আটকে রাখবেন। তাহলে উপায়? পাহাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু দেশের সমস্ত বন পাহাড়া দেয়ার মত প্রহরী কি বন বিভাগের আছে? সুন্দরবন পাহাড়ার ভার না হয় ৪৩০ টা বাঘের উপর ছেড়ে দেয়া গেলো, কিন্তু অন্যগুলো?
কিছুদিন আগে ইনানী বন এলাকার এক বন কর্মকর্তার সাথে নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিলো। তিনি বলছিলেন কিভাবে ইনানী-উখিয়া-কক্সবাজার অঞ্চলের বনগুলো ভয়াবহ ধংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রভাবশালী, অপ্রভাবশালী সবাই মিলে লুটেপুটে খাচ্ছে এই সম্পদ। আমি প্রশ্ন করেছিলাম বন বিভাগ তাহলে কি করছে? তিনি শুকনো হাসি দিয়ে বললেন প্রতিদিন গড়ে ১০টি করে বন-অপরাধের অভিযোগ তার নজরে আসে, কিন্তু মাত্র ২জন গার্ড আর একটা ভাংগাচোড়া গাড়ি দিয়ে তিনি ঠেকাতে পারেন মাত্র ১ টা। তার মানে বাকী ৯টা অপরাধই বিনা প্রশ্নে, বিনা বাধায় সংগঠিত হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।








এ অবস্থায় প্রচলিত বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ব্যর্থতার কারনেই আসে সামাজিক বনায়ন বা সোশ্যাল ফরেস্ট্রির ধারণা। এ ব্যবস্থায় বনের উপর নির্ভরশীল মানুষকেই বন ব্যবস্থাপনায় সম্‍পৃক্ত করা হয়। বিনিময়ে আরো কিছু সুবিধার সাথে একটি নির্দিস্ট সময় (সাধারনত ১০ বছর) পর গাছ বিক্রির টাকার একটা ভাগ (৪৫ ভাগ) তাদের দেয়া হয়। দক্ষিন এশিয়া, দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকার কিছু দেশ এবং মধ্য-আমেরিকাতে সোশ্যাল ফরেস্ট্রি বন ব্যবস্থাপনায় অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আমার বিবেচনায়, মোটা দাগে, বাংলাদেশেও এ পদ্ধতি বনায়নের ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রেখেছে।




কিন্তু সামাজিক বনায়ন নতুন বন সৃজনের একটি মডেল। অর্থাৎ বনের যে অংশে গাছপালা নেই সেটা নতুন করে বনায়নের আওতায় আনতেই এই মডেল কাজ করে। তার মানে যে বন কাল ধ্বংস হয়ে যাবে, আজ সেটি রক্ষায় সামাজিক বনায়নের বর্তমান মডেল কাজে দিচ্ছে না। এই বাস্তবতাতেই নতুন কোনো মডেলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। আর সেটির পোশাকী নাম 'অল্টারনেটিভ ইনকাম জেনারেশন'। অর্থাৎ, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে যারা বনজ দ্রব্য আহরণ করছে, তাদের বিকল্প কোনো রোজগারের ব্যবস্থা করে দেয়া। আমি উখিয়ার বনাঞ্চলে দেখেছি কিভাবে দরিদ্র মানুষেরা জ্বালানীকাঠ সংগ্রহ করে বিক্রি করে সামান্য কিছু রোজগারের আশায় বনের ডালপালা, গাছ এমন কি ছোট ছোট চারাগুলোও কেটে ফেলছে। বন ব্যবস্থাপনার নতুন মডেলের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বনজীবিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ধরে নেয়া যায় সারাদিন বনজদ্রব্য সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে দরিদ্র বনজীবিরা যে টাকা পায়, বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থা করলে হয়তো তারা আর বনে যাবে না।
পরিকল্পিতভাবে মডেলগুলো প্রয়োগ করা গেলে দরিদ্র বনজীবিদের হাত থেকে বন রক্ষা পাবে ঠিক আছে, কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিদস্যূ, বড় বড় গাছ চোর, বন-ডাকাতদের হাত থেকে বন রক্ষা করতে কোন মডেল কাজ করবে তা আমার সতি্যই জানা নেই। তেমনি জানা নেই কি ধরনের মডেল দরকার বন বিভাগের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যারা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে বনকে দস্যুদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

ছবি-
১) সংগ্রহ করা বনজ দ্রব্য বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভ্যানে করে (শালবন, গাজীপুর)
২) বনের কাছ কেটে লাকড়ি বানিয়ে পাচার হচ্ছে (উখিয়া, কক্সবাজার)
৩) বনের গাছ কেটে জমিয়ে রেখেছে বিক্রির জন্য (চিম্বুকের কাছাকাছি, বান্দরবান)
৪) পার্বত্য এলাকার সব বাড়িতেই এরকম চোখে পড়বে (বান্দরবান)
৫) রাস্তার ডান পাশে প্রাকৃতিক শালবন, বামপাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো আকাশমনি (ধামুরহাট, নওগাঁ)
৬) অল্টারনেটিভ ইনকাম জেনারেশনের এক সভায় বনজীবিদের একাংশ (উখিয়া, কক্সবাজার)

ছবি: 
01/10/2009 - 10:50pm
01/10/2009 - 10:50pm
01/10/2009 - 10:50pm
01/10/2009 - 10:50pm
01/10/2009 - 10:50pm
01/10/2009 - 10:50pm

মন্তব্য

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

মন খারাপ

মাহবুব রানা এর ছবি

এরকম নির্বাক হয়ে থাকলে চলপে? হাসি

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

দিনে দিনে হতাশাবাদী হয়ে যাচ্ছি।

ফাহিম হাসান এর ছবি

এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় পোস্ট দিয়ে সময় নষ্ট করলেন ভাই। বাংলাদেশের বন দরকার নাই, ইউক্যালিপ্টাস আর সেগুন-মেহগনির বাগান হলেই চলবে। গাছপালা থাকবে বোটানিকাল গার্ডেনে আর বাড়ির ছাদে। ফুল আনবো থাইল্যান্ড থেকে আর পাখি কিনবো নীলক্ষেত থাকে। হরিণ, বাঘ এগুলো থাকবে চিড়িয়াখানায়। ব্যস, সব সমস্যার সমাধান।

মাহবুব রানা এর ছবি

হাসি

পাগল মন এর ছবি

বাংলাদেশে আদৌ কোন মডেল কাজ করবে কিনা সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।
আর যেখানে বেকারত্বের হার এত বেশি সেখানে অল্টারনেটিভ ইনকামের ব্যবস্থা কীভাবে করা সম্ভব সেটাও একটা ব‌্যাপার বটে।

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

মাহবুব রানা এর ছবি

বর্তমান মডেলে বনজীবিদের বিনা সুদে ঋণ দেয়া হচ্ছে। অনেকেই সেই টাকার সাথে নিজের টাকা মিলিয়ে কিছু করার চেস্টা করছে। বনে সারাদিন লাকড়ি সংগ্রহ করে যে টাকা পায়, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা হলে আর বনে যাবে না, কাগজে কলমে সেটা ধরে নেয়া যায়; কিন্তু গাছেরটা খাবে, তলারটা কুড়াবে না- এই নিশ্চয়তা মনে হয় দেয়া যাচ্ছে না।

অতিথি লেখক এর ছবি

চলুক

অতীত

মাহবুব রানা এর ছবি

ধন্যবাদ।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সামাজিক বনায়নে লাগানো অ্যাকেশিয়া বা ইউক্যালিপ্‌টাস গাছ আমাদের কোন উপকারটা করবে বলতে পারেন? সামাজিক বনায়নে কাঁঠালের মতো পাতাবহুল (পাতায় পুরু কিউটিক্‌ল আছে), চিরসবুজ, ফলজ, উন্নত মানের কাষ্ঠ - এমন গাছ লাগানো হয় না কেনো?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মাহবুব রানা এর ছবি

দ্রুত রিটার্ন চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি । তাই খুব কম সময়ের মধ্যে সামাজিক বনায়নের সাথে যুক্ত কৃষকদের কিছু লাভের মুখ দেখানোর উদ্দেশ্যেই দ্রুতবর্ধনশীল আকাশমনি আর ইউক্যালিপটাস* লাগানো হয়েছিলো। আর একটি ব্যাপার ছিল কিভাবে নগ্ন বনভূমিকে দ্রুত বনায়নের আওতায় আনা। ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও দেশিইয় প্রজাতির (যেমন কাঁঠাল) বাগান করার কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে । কিছু ব্যতিক্রমও অবশ্য আছে । নওঁগাতে দেখেছি রাস্তার ধরে সামাজিক বনায়নের আওতায় আম গাছ লাগাতে । মধুপুরে গেলে দেখবেন আকাশমনি, শিশুর সাথে পেঁপে গাছও লাগানো হয়েছে ।

সময় নিয়ে পড়ার আর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ পাণ্ডবদা। আপনার প্রশ্নের উত্তরটা আরো বিস্তারিত দেয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে সংক্ষেপেই সারতে হলো হাসি

* ইউক্যালিপটাস এখন আর বন বিভাগ লাগাচ্ছে না

মুস্তাফিজ এর ছবি

বন সংরক্ষণে সবচাইতে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এটা করা হলে শতকরা ৫০ভাগ কাজ এমনিতেই হাসিল হয়ে যাবে।

...........................
Every Picture Tells a Story

মাহবুব রানা এর ছবি

কথা সত্য মুস্তাফিজ ভাই। বর্তমান বন আইন যথেষ্ট সয়ংসম্পূর্ন, কিন্তু এই আইন প্রয়োগ করার জন্য যে প্রাতিস্ঠানিক আয়োজন আর লোকবলের দরকার তার সিকি ভাগও বন বিভাগের নেই। বন বিভাগের ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সরকার অবস্থা চলতেছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।