| নাস্তিক্য বনাম আস্তিক্য, শুধুই কি সত্যাসত্য দ্বন্দ্ব ?---০১/৪

রণদীপম বসু এর ছবি
লিখেছেন রণদীপম বসু (তারিখ: মঙ্গল, ২৫/০৬/২০১৩ - ১০:৪০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(১)
ইদানিংকালে আস্তিক্য-নাস্তিক্য নামক একটা বিভ্রান্তিমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে যে তুলকালাম ঘটনাপ্রবাহ বয়ে গেলো আমাদের জাতীয় জীবনে তা কতোটা যৌক্তিক বা জরুরি ছিলো তা নিয়ে বিজ্ঞজনেরা বিস্তর আলাপ-আলোচনা বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্ববোধ থেকেই। তবে সচেতন নাগরিকমাত্রেই আমাদের স্ব-স্ব চিন্তাজগতে অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা যে অনেকগুলো কপাল-ভাঁজ করা প্রশ্নবোধক চিহ্নেরও জন্ম দিয়েছে তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়ার সাথে আস্তিক্য-নাস্তিক্যবাদের কী সম্পর্ক, কিংবা জাতীয় নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় আস্তিক্য-নাস্তিক্য চিন্তাধারা কোন্ অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করে, অথবা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালন-দক্ষতা ও সততার সাথে ব্যক্তিগত আধ্যাত্ম বিশ্বাস-অবিশ্বাস কী প্রক্রিয়ায় জড়িত এসব বিষয়-আশয় রাজনীতি-অপরাজনীতির অবলম্বন হতে পারে হয়তো। কিন্তু দর্শন-তাত্ত্বিক বিচারে আমাদের সমাজ-রাজনৈতিক পরিমন্ডলে তা কতোটা অনিবার্য, এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি বিচারটাও সমকালীন প্রেক্ষাপটে জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু যিনি বা যারা এই বিচার করবেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কতোটা প্রভাবমুক্ত সেটাও বিবেচ্য নয় কি ?

যতটুকু মনে হয়, দর্শন-তাত্ত্বিক বিবেচনায় নিরপেক্ষতা একটা আহাম্মকি শব্দ। হাঁ এবং না এর মাঝামাঝি কোন অবস্থান থাকা কি বাস্তবে আদৌ সম্ভব ? যুক্তিশাস্ত্রও তা অনুমোদন করে কিনা জানি না। তবে এই নিষ্ক্রিয় মধ্যবর্তী জড়-অবস্থান যে সত্য ও মিথ্যার মাঝামাঝি থাকার মতোই একটা পরাবাস্তব-রূপ শূন্য অবস্থা, তা বোধ করি বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও আমরা অনেকেই যে এই পরাবাস্তব সত্তা প্রদর্শন করতে পিছপা হই না, সেটা কি আমাদের আপাত নিষ্ক্রিয়তা, না কি সুযোগ-সন্ধানের সুবিধাবাধী অবস্থান, তাও এক জটিল প্রশ্ন বৈ কি ! মানব সভ্যতার আদি লগ্ন থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়তোবা এরকম পরাবাস্তববাদী গোষ্ঠি যুগে যুগে ছিলো, আছে এবং আগামীতেও থাকবে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই যারা এই সুবিধাবাদী পরাবাস্তব অবস্থায় থাকতে পছন্দ করেন তারা আমাদের সমাজ-জীবনে কতোটা জরুরি প্রয়োজন সংরক্ষণ করেন বা আদৌ করেন কিনা তাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে বৈ কি। আমাদের ভুলে গেলে চলে না যে, কোন রাষ্ট্র বা সমাজ-বিকাশেই এ ধরনের সুবিধাবাদী প্যারামিটার কোন ইতিবাচক স্রোতকে সমৃদ্ধ তো করেই না বরং এর স্বভাবগত প্রক্রিয়া নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতাকেই উৎসাহিত করে থাকে। আর একইভাবে আমাদের প্রচার-মাধ্যমগুলোও যে সম্ভাব্য এই প্যারামিটারের বাইরের কিছু নয় সেটিও ভুলে যাওয়া বোধ করি সঙ্গত হবে না।

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রবাহের আলোকচ্ছ্বটায় আমাদের সমাজ-দেহ কোথায় কতটুকু আলোকিত হয়েছে তা নির্ণয়ের ভার সমাজ-বিজ্ঞানীদের কাঁধে অর্পিত আছে। তারা নিশ্চয়ই খুঁজে দেখবেন সমাজদেহের কোন্ কোন্ ঘুপচিময় অন্ধকার অলিতে-গলিতে এখনো জ্ঞানের যথার্থ আলোটুকু পৌঁছুতে পারে নি এবং তা কেন হয়নি ও কী করলে কীভাবে ওগুলোকে একটু একটু আলোকিত করে তোলা যাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উজ্জ্বল আলোকধারায় সেটারও অনুসন্ধান করবেন। কিন্তু সমাজদেহের যেটুকুকে আমরা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত বলে ধরে নিয়েছি বস্তুত তা-ই বা কতোটা সত্য ও স্বচ্ছ ? আমরা জানি যে, প্রাতিষ্ঠানিকতার সনদ থাকে, কিন্তু জ্ঞানের কোন সনদ হয় না। কোন বিষয়ে ধারণা অর্জন আর বিষয়ের উপলব্ধ হওয়া সম্পূর্ণই ভিন্ন জিনিস। তাই সনদপ্রাপ্ত বলে আমরা যতোই লম্ফঝম্ফ করি না কেন, যুক্তি আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্বমুখরতাই আসলে নির্ধারণ করে দেয় কার অবস্থান কোথায়, ঘুপচিতে না উদার উজ্জ্বলতায়। দুনিয়া জুড়েই যুক্তি আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব এখনো বহমান একটি বিষয়। কিন্তু যুক্তিকে বিশ্বাস আর বিশ্বাসকে যুক্তি বলে গুলিয়ে ফেলাও এক ধরনের পরাবাস্তব অবস্থা। বাস্তবও নয় আবার অবাস্তবও নয় এই যে অবস্থা, প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা এটিকে বলেন অনির্বচনীয়। অর্থাৎ সৎও (সত্য বা অস্তিত্বশীল) নয়, অসৎও (অসত্য বা অস্তিত্বহীন) নয়, আবার সৎ বা অসৎ কোনোটিই বলা যায় না তাকে বলে অনির্বচনীয়। যুক্তি ও বিশ্বাসের জবরজং অবস্থার মতোই আমাদের সমাজদেহে আস্তিক্য-নাস্তিক্য বিষয়ক ধারণাটাও বোধ করি বর্তমানে এরকমই এক অনির্বচনীয় অবস্থায় বিরাজ করছে।

এখানে নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঠবে, এরকম মনে করার কারণ কী ? খুব সহজ-সরল ভাষায় একবাক্যে এর জবার দেয়ার উপায় নেই যদিও, তবু মনে হয়, এই কারণটুকু খুঁজতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই এটা ভাবনায় রাখতে হবে যে, আস্তিক্য-নাস্তিক্য দ্বন্দ্বটা আসলে প্রকারান্তরে মানব-সভ্যতার সেই চিরায়ত সত্য-মিথ্যারই ভিন্নতর এক দ্বন্দ্ব। এই সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বের সাথে কিছু আধ্যাত্মিক উপাদান যুক্ত হয়ে একই দ্বন্দ্বই আস্তিক্য-নাস্তিক্যের নতুন চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে কেবল। সত্যি কি তাই ? তবে খুব ভালো করে খেয়াল রাখা উচিত যে, এটি মূলত একটি প্রাচীন দার্শনিক দ্বন্দ্ব। এখন আমরা তাকে জেনে বা না-জেনে বুঝে বা না-বুঝে যতোই সামাজিক ও রাজনৈতিক অপ-ব্যবহার করি না কেন, প্রকৃতপক্ষে আস্তিক নাস্তিক শব্দগুলো পরিপূর্ণভাবেই ভারতীয় দার্শনিক পরিভাষার অন্তর্গত সংস্কৃতাগত শব্দ এবং তার সাথে ধর্ম বা অধর্মের আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবু যেহেতু এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ভিন্ন আকার-আকৃতি-চেহারায় সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বটাও অন্তর্নিহিত, তাই আমাদের বোধ করি এটাও উপলব্ধিতে রাখা দরকার, সত্য বলতে আমরা আসলে কী বুঝি, মিথ্যাই বা কী, এবং তাদের স্বরূপটাই বা কেমন ?

(২)
সত্য ও মিথ্যা, আপাত দৃষ্টিতে সাদাসিধে এই শব্দ দুটোর অর্থ বোঝেন না এমন একজন লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আমার সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া সন্তানকে জিজ্ঞেস করলাম, বলো তো সত্য কী ? এতটুকু সময় না নিয়ে ঝটপট উত্তর, যা সত্য তাই সত্য ! বাহ্, কী দ্বিধাহীন জবাব ! আবারো প্রশ্ন করলাম, তাহলে মিথ্যা কী ? যা সত্য নয় তাই মিথ্যা ! একেবারে জুতসই জবাব ! সপ্তম শ্রেণীর এক কিশোর ছাত্রের কাছে মূলত উত্তর পাওয়ার জন্যে প্রশ্নটা করা হয়নি, বরং কী ধরনের উত্তর আসে তা যাচাই করার কৌতুহল থেকেই এটি করা। এই একই প্রশ্ন যখন আমার এমএ পাশ সহকর্মীটিকে করলাম, তিনিও প্রায় একই ধরনের উত্তর দিলেন। তবে সত্যের সংজ্ঞায় তিনি বললেন, যা বাস্তব তাই সত্য। তাঁর এই উত্তরের প্রসঙ্গ ধরেই আরেকটি প্রশ্ন মুখের উপর চলে এসেছিলো প্রায়, কিন্তু অতিশয় ধার্মিক বন্ধুটির অনুভূতিতে আবার কোনো কারণে অহেতুক আঘাত লেগে যায় কিনা ভেবে প্রশ্নটি আর করা হয়নি। তবে একটু ঘুরিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলাম, তবে কি যা সত্য তাই বাস্তব ? একটু থতমত খেয়ে বন্ধুটি শেষমেষ উত্তর খোঁজার বদলে প্রশ্নের উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠলেন।

তাঁর এই সন্দিহান হয়ে ওঠা আসলে বর্তমান বাস্তবতায় তেমন অস্বাভাবিক নয়। কেননা অকস্মাৎ কোন প্রশ্নের মুখোমুখি হলে ওই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য নিয়েও একটা অব্যক্ত প্রশ্ন জেগে ওঠে, তিনি কেন এই প্রশ্ন করছেন ? এবং প্রশ্নের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মনে মনে অনেকগুলো ইতিবাচক বা নেতিবাচক ধারণাও তৈরি করতে থাকি আমরা। আর এই ধারণার ভিত্তি হিসেবে সক্রিয় থাকে প্রশ্নকর্তা ব্যক্তিটির সম্বন্ধে আমাদের পূর্বকৃত অভিজ্ঞতা। অপরিচিত কোন ব্যক্তিকে সামনে পেয়ে নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন করতে পারি না যে, আপনি কি সত্যি বিয়ে করেছেন ? কিংবা কোন অপরিচিতা রমণীকে অহেতুক প্রশ্ন করা যায় না যে, আপনার বাসাটি ঠিক কোথায় ? আবার প্রশ্নের প্রকৃতি ভেদে পরিচিতজনের কাছেও অনেক প্রশ্নের উত্তর আশা করা যায় না।
নিজের সময়েই অসম্ভব জনপ্রিয় ও বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর কাছে নাকি এক ভক্ত জানতে চাইলেন, তিনি কোন্ বই কী অবস্থায় লিখেছেন ? এ ব্যাপারে কিছু বলতে অনীহ লেখক যতোই প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চাইলেন প্রশ্নকর্তা ততোই পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত রসিক লেখক সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন, দেখো, সুইস মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল গুস্তাফ জাং একদা তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, কিছু লোক আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কিভাবে লিখি। এ ব্যাপারে আমাকে একটা কথা বলতেই হয়, কেউ চাইলে তাকে আমরা আমাদের সন্তানগুলো দেখাতে পারি, কিন্তু সন্তানগুলো উৎপাদনের পদ্ধতি তো দেখাতে পারি না !

স্থান-কাল-পাত্র ও পরিস্থিতি ভেদে একটি আপাত নির্দোষ অভিন্ন প্রশ্নও যে ভিন্নমাত্রিক উত্তর ও কখনো কখনো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি করতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমানও হতে পারে, অদৃশ্যমানও হতে পারে। যদি বলি কেন এ প্রতিক্রিয়া হয়, এরকম প্রশ্ন হাস্যকর মনে হতে পারে। তবে এর পেছনে যে আসলে ব্যক্তি-মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বোধটুকু জড়িত তা হয়তো অস্বীকার করা যাবে না। এই নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই কোন ব্যক্তি তার নানান প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে, যতোটাই কার্যকরি হোক, জানতে বা অজান্তে আসলে একধরনের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেন। অন্যকে অবৈধ আক্রান্ত না করে নিজেকে যতোটা সম্ভব নিরাপদ রাখার অধিকার নিশ্চয়ই প্রতিটি ব্যক্তির রয়েছে। কিন্তু কোন প্রশ্ন যখন বস্তুত কোনো ব্যক্তিকে নয়, আসলে আক্রান্ত করে কোন মতাদর্শকে, সেখানে কি ব্যক্তির ওই সমীকরণ বিবেচ্য থাকে ? থাকার কথা নয়। সেখানেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় বটে, তবে এর দৃষ্টিকোণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তখন বিবেচনায় এসে পড়ে উত্থিত প্রশ্নের একান্ত বৈশিষ্ট্য বা শক্তিমত্তার বিষয়টি। এই শক্তিমত্তা আসলে কী ?

প্রশ্নের শক্তি হলো তার উত্থিত যুক্তি, যা কোনো সীমানা মানে না। সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে আরোহ ও অবরোহ পদ্ধতির এসিড টেস্টে গলিয়ে গলিয়ে কার্যের পেছনে কারণ এবং তারও পেছনের সূচনা-বিন্দুকে খুঁজে বের করতে যে কিনা সদা তৎপর। যুক্তির এই ঐকান্তিক তৎপরতাই মূলত প্রশ্নের শক্তি। যে প্রশ্ন যুক্তির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে জানে না, সে প্রশ্ন আদতে শক্তিহীন। আর শক্তিহীন প্রশ্ন আসলে কোন প্রশ্নই নয়। আর তাই বলা যায়, যার মধ্যে কোন উত্তর নেই সেটা কোন প্রশ্ন নয়, প্রতিটি প্রশ্নের মধ্যেই তার উত্তর নিহিত থাকে। এবং সাথে সাথে আমাদের এটাও খেয়াল রাখার দরকার হয় যে, উত্তর জানা না-থাকা আর উত্তর না-থাকার মধ্যে বিস্তর তফাৎ। জগতে এমন কোন বিষয়ই নেই যার কোন উত্তর নেই। হতে পারে উত্তরটি আমাদের জানা নেই, তাই বলে উত্তর নেই তা বলা যাবে না। অতএব এমন জিজ্ঞাসা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, প্রশ্নের এই যে যৌক্তিক শক্তি এটা প্রকৃত কার জন্যে হুমকি হতে পারে ? বুদ্ধিমান পাঠকের কাছে এর উত্তর নিশ্চয়ই অধরা নয়। প্রশ্ন হুমকি হয় আসলে মিথ্যার কাছে। কেন ? কারণ, মিথ্যার কোন সত্যনিষ্ঠ ভিত্তি থাকে না। প্রশ্নের শক্তির কাছে মিথ্যার ফানুস টিকতে পারে না, চুপসে যায়। বাইরের চকমকি চেহারার ভেতরে ভিত্তিহীন অবলম্বনগুলো মুহুর্মূহু প্রশ্নের ধাক্কায় ভেঙে গেলে মিথ্যার সৌধটা হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। আর তাই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত কোন তত্ত্ব বা মতবাদ প্রশ্নকেই বেশি ভয় পায়। সেক্ষেত্রে প্রশ্নকারীই হয়ে ওঠে তার অনাকাঙ্ক্ষিত শত্রু। তাহলে আবারো সেই শুরুর প্রশ্নেই ফিরে যেতে হয়, সত্য আসলে কী ?

(৩)
অনেকেই কৌতুক করে বলেন, সহজ জিনিস নিয়ে ঘোট পাকাতে সিদ্ধহস্ত নাকি দার্শনিকেরা। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথও কম যান না, কী অবলীলায় বলে ফেলেন- ‘সহজ করে বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে’ ! অর্থাৎ তিনিও সহজ জিনিসকে এতো সহজে ছেড়ে দিতে রাজী নন। তাহলে সত্য জিনিসটা প্রকৃতই কী বিষয় তা কি আমাদেরকে সেই মাতাল গাড়ি-চালকের চোখ দিয়েই উপলব্ধি করতে হবে !
কৌতুকটা নিশ্চয়ই মনে আছে সবার। দুর্ঘটনার পর প্রাণে বেঁচে যাওয়া চালককে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, এই স্পষ্ট দিবালোকে সেতুতে উঠার এতো চওড়া ফাঁকা রাস্তা থাকা সত্ত্বেও তুমি রাস্তা ছেড়ে খাদে পড়লে কী করে ? উত্তরে চালক বললো, মোড় ঘুরতেই দেখি সামনে খুব দ্রুতবেগে একটা ট্যাক্সিক্যাব ধেয়ে আসছে ঠিক আমার দিকে। আমিও খুব দ্রুততার সাথে ওটাকে সাইড দিয়ে দিলাম। এরপরই দেখি একটা বিরাট কাভার্ডভ্যান ! স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ওটাকে সাইড দিতে না দিতেই দেখি আস্ত একটা ব্রীজ একেবারে গায়ের উপর এসে পড়লো বলে ! চোখ-মুখ বন্ধ করে অল্পের জন্য সংঘর্ষ এড়িয়ে ওটাকেও সাইড দিয়ে দিলাম।

বিষয়টা কৌতুককর হলেও চালকের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ আছে কি ? চালক তার নিজের অবস্থান থেকে যেভাবে যা দেখেছে বা উপলব্ধি করেছে সে অনুযায়ীই তৎপর হয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু মাতাল থাকার কারণে তার বিবেচনাবোধে যে ঘাটতি ছিলো তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। বিবেচনাবোধের এই ঘাটতিটা কী ? হতে পারে বিভ্রম বা সচেতনতার অভাব, ব্রীজটা তার দিকে ধেয়ে আসা। অর্থাৎ ব্রীজটা নয়, সে-ই যে ব্রীজের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিলো এই বোধটাই হারিয়ে ফেলেছিলো সে, বা একটা বিপরীত বোধ তৈরি হয়েছিলো তার। অর্থাৎ চালকের বোধ এখানে সত্য নয়, ভ্রান্ত। কিন্তু ওই চালক যদি মাতাল না হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক হতো তাহলেও কি এর ব্যতিক্রম কিছু দেখতো বা উপলব্ধি বোধ হতো ? উপলব্ধির ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে তেমন কোন ব্যতিক্রমই হতো না হয়তো, তবে তখন সচেতন বিচারবোধটুকু যে অন্তত সক্রিয় থাকতো সেটা ধারণা করা চলে। ফলে ব্রীজ পাশ কাটিয়ে গাড়িটাকে খাদে যেতে হতো না হয়তো। এখন প্রশ্ন, এই যে বিবেচনাবোধের ঘাটতি বিচার করা হচ্ছে, এই বিচার আসলে কে করছে ? আমরা করছি। এই আমরা কারা ? আমরা যারা ব্রীজটিকে স্থির বিবেচনা করে গাড়িটি রাস্তা ছেড়ে খাদের দিকে ধাবিত হয়েছে বলে অনুমান করছি। অথবা ধরা যেতে পারে যে আমরা অনুভূত স্থির ব্রীজটির পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছি। চালক যদি প্রথম পক্ষ হয়, আমরা এখানে দ্বিতীয় পক্ষ যারা মনে করছি যে আমাদের বোধ সত্য, অর্থাৎ আমাদের বিবেচনাবোধে ব্রীজটি স্থির অবস্থায় রয়েছে। আমাদের বোধ এখানে ভ্রান্ত নয় সত্য বলে প্রতিপাদন করছি আমরাই।

ঠিক এ অবস্থানে দাঁড়িয়ে এখন আমরা যদি আমাদের সত্য বিবেচনাবোধকে আরেকটু প্রসারিত করে সূর্যটার দিকে তাকাই, কী দেখবো আমরা ? সূর্যটা পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে চক্রবাল ঘুরে একটু একটু করে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে। সত্যি কি তাই ? অথচ বিজ্ঞান-দৃষ্টির এ যুগের জ্ঞান-কাঠামোয় আমরা এটা নিশ্চিত করে জানতে পারছি যে সূর্য নয় আসলে পৃথিবীটাই আবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির স্কুল-পাঠ্য জ্ঞান দিয়েই আমরা বুঝতে পারি যে, পৃথিবীটাকে স্থির উপলব্ধি করাটাই আমাদের ভ্রান্ত উপলব্ধি। পৃথিবীর প্রচন্ড আবর্তন গতির কারণে আমরা যে পৃথিবী-পৃষ্ঠ থেকে এক ঝটকায় ছিটকে যাচ্ছি না সেটা আমাদের উপর পৃথিবীর টেনে রাখা মাধ্যাকর্ষণ বল ও গতি-জড়তার কারণে। তবু এই ভ্রান্ত উপলব্ধিকে আমাদের কাছে যে ভ্রান্ত মনে হচ্ছে না বরং সত্য উপলব্ধি মনে হচ্ছে, তাতে করে সেই মাতাল চালকের সাথে আমাদের বস্তুত পার্থক্যটা কোথায় ? সত্য-সন্ধানি দৃষ্টিতে বিচার করলে বলতেই হয় যে, আসলেই কোনো পার্থক্য নেই। এই পার্থক্য উপলব্ধ না হওয়ার কারণটাই হলো আপেক্ষিকতা। অর্থাৎ আমরা যার যার আপেক্ষিক অবস্থান থেকেই বাকি সব কিছুকে বিচার করছি। তার অর্থ কি এই নয় যে, আমাদের কাছে প্রতিভাত সত্যটাও আসলে একটা আপেক্ষিক সত্য ? অর্থাৎ স্থির বা পূর্ণ সত্য নয় ! যদি তাই সত্যি হয় তাহলে মিথ্যা বলতে কী বোঝায় ?

মহাবিজ্ঞানী নিউটনের মহাকর্ষিক সূত্র বা মহামতি আইনস্টাইন তাঁর ভূবনবিখ্যাত আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব দিয়ে উচ্চতর বিজ্ঞানের খোলনলচে পাল্টে দেবার আগেও সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবর্তন অনাদিকাল থেকে চলে আসছিলো এবং পৃথিবীতে অবস্থানকারী প্রতিটা ব্যক্তি-মানুষই সূর্যকে ঠিকই পূর্ব থেকে পশ্চিমেই হেলে পড়তে দেখে এসেছে। কিংবা চলমান মোটরযান আরোহী যেকোনো ব্যক্তিই নিজের আপাত স্থির অবস্থানের সাপেক্ষে আশপাশের প্রকৃতি গাছপালা মাঠঘাট প্রভৃতিকে বিপরীত দিকে পেছনে সরে যেতে দেখে এসেছে, আজও দেখছে। ফলে আমাদের ইহজাগতিক আপেক্ষিক অবস্থানের সাথে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির যে বোধ তার সাথে বৈজ্ঞানিক জটিল তত্ত্ব বোঝা না-বোঝার আপাত কোন সম্পর্ক আছে কি ! সত্য আপেক্ষিক বলেই হয়তো এ ব্যাপারেও নিশ্চয় করে কিছু বলার উপায় নেই। তবে ব্যক্তিক এই উপলব্ধিকে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা যে সেই দু-তিন হাজার বছর আগেই দর্শন ও জ্ঞানচর্চার মূখ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে বস্তুগত বহু বহু বিষয়ের প্রামাণ্য ও ব্যাখ্যা জানা সম্ভব হলেও এমন কিছু বিষয় থেকে যায় যেগুলো আসলে বাহ্যবস্তুর বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির অতীত। এবং সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা পেতে আমাদেরকে অবশ্যই যুক্তি-বিজ্ঞানের শৃঙ্খলা চর্চায় ঢু মারতে হয়। কেউ কেউ এটিকেই বলেন দর্শন-চর্চা। আর ঐতিহ্য অনুসারে প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের সমৃদ্ধিও কিন্তু অনস্বীকার্য।

এখানে উল্লেখ্য, দর্শনের নাম শুনেই তাতে অনাধুনিকতার ছোঁয়া ভেবে মুখ গোমড়া করে ফেলার কারণ নেই। কেননা সচেতন বা অবচেতনেই হোক, বিজ্ঞান ও দর্শন আমাদের জীবন-যাত্রারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানব-সভ্যতায় নিরাকার জ্ঞান-চর্চার যে সূত্রপাত তা-ই প্রাচীন দর্শন হলে, কালে কালে সেগুলোই বিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হতে হতে আধুনিক জ্ঞান-মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে আজ বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে আমাদের জাগতিক অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। আর তাই বিজ্ঞান, দর্শন এবং আমাদের অস্তিত্ব এই তিনে মিলে যে সম্মিলিত সত্তা সেটাই আমাদের বর্তমান অবস্থান। তাছাড়া এটাও মনে রাখা দরকার যে, মহামতি আইনস্টাইন কিংবা স্টিফেন হকিং-এর মতো বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের আলোড়নসৃষ্টিকারী সমস্ত মহাজাগতিক তত্ত্বই কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে তাঁদের করোটির মধ্যে অর্থাৎ চিন্তা-জগতে, যা হাতে-কলমে প্রমাণ করার মতো বিষয় ছিলো না। এবং সেগুলি যে একান্তই যুক্তি-বিজ্ঞানের শৃঙ্খলা মাত্র তা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না, কেননা তার প্রামাণ্য আসলে শুধুমাত্র কিছু গণিতের শুদ্ধ সমীকরণ মাত্র। আর উচ্চতর গণিত-শাস্ত্রের ছাত্রমাত্রই এটা বোঝেন যে গণিতও আসলে যুক্তির কঠিন শৃঙ্খলায় বাঁধা সংখ্যা ও প্রতীকের চিহ্নধারী দর্শন ভিন্ন কিছু নয়। অতএব আগামীকাল কোন্ পোশাক-পরিচ্ছদে সেজে কখন কীভাবে কোথায় প্রথম প্রিয়-সন্দর্শনে যাবো এবং প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে কোন্ পর্যায়ে কী সম্ভাষণ করবো এরকম ভাবনা যেমন দর্শন-বহির্ভূত নয়, তেমনি আস্তিক্য-নাস্তিক্য নির্ধারণে জ্ঞান ও তার প্রামাণ্য কী, সত্য কী, মিথ্যা কী এইসব ভাবনারাজিকে দর্শন-চর্চা ভেবে এড়িয়ে যাবারও উপায় নেই, আবার এতে আঁৎকে ওঠারও কিছু নেই। কেননা বক্ষ্যমান নিবন্ধটার এ পর্যন্ত এসে যদি পাঠক হিসেবে আপনার মনে হয় যে আপনি এবার বুঝি দর্শন-চর্চায় ঢুকতে যাচ্ছেন, তাহলে আপনার ভ্রান্তি নিরসনকল্পে এই বলে আশ্বস্ত করছি যে, আপনি আসলে শুরু থেকেই দর্শনের রাস্তা মাড়িয়েই এটুকু পথ এসেছেন। নতুন করে আর দর্শনে ঢোকার অবকাশ নেই।
---
(চলবে---)
---
[*] [পর্ব-০২] [পর্ব-০৩] [পর্ব-০৪]
---


মন্তব্য

Emran  এর ছবি

বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। Alan Sokal এবং Jean Bricmont-এর রচিত বই “Fashionable Nonsense (১৯৯৮)”-এর একটি অধ্যায় হলঃ Epistemic Relativism in the Philosophy of Science। আপনি যে বিষয়ে লিখছেন, সেই বিষয়ের কাছাকাছি আলোচনা এই অধ্যায়ে আছে। আমার মনে হয় আপনি পড়ে দেখতে পারেন।

রণদীপম বসু এর ছবি

সুযোগ পেলে পড়বো নিশ্চয়ই।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

চরম উদাস এর ছবি

চলুক
পরের পর্বের অপেক্ষায় ...

কেউ চাইলে তাকে আমরা আমাদের সন্তানগুলো দেখাতে পারি, কিন্তু সন্তানগুলো উৎপাদনের পদ্ধতি তো দেখাতে পারি না !

... মুজতবা আলী বস

রণদীপম বসু এর ছবি

আসলেই তাই। সাহিত্যে সিরিয়াসনেসের সাথে হিউমার মিশেল দেয়ার ক্ষেত্রে এই বস লোকটির আসলেই জুরি নেই।

যথাসময়ে পরের পর্ব চলে আসবে নিশ্চয়ই।

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

PaMaALe এর ছবি

আমাদের দেশের রাতারাতি সামনে নিয়ে আসা আস্তিক-নাস্তিক দ্বন্দ্ব আসলে কোন দর্শন, গুস্তাব জং, নিউটন, আইনস্টাইন বা অন্য কোন কিছু বা কারও থিওরী মেনেই আসেনি। এটা আনা হয়েছে একাত্তরে সকল ধরণের জঘন্য অপরাধকারী ধর্মব্যবসায়ীরদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে তাদের অনুসারীদের দ্বারা এবং যারা তাদেরকে ক্ষমতারোহনের সিড়ি হিসেব ব্যবহার করতে চায় তাদের দ্বারা। খুন, ধর্ষণ প্রভৃতি জঘন্য অপরাধ কর্মে জড়িত একজন আস্তিকের চেয়ে যে একজন নিরপরাধ এবং মানবতায় বিশ্বাসী নাস্তিক শ্রেয়তর সে বিষয়টি আমাদের সাধারণ মানুষও বুঝেন। কিন্তু আমরা তা তাদের মনে এখনও পুরোপুরি মজবুতভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারিনি। তাই ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মের ছুতো তুলে এখনও এ নড়বরড় অবস্থার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। তবে এটা সাময়িক, তা কখনও স্থায়ী হবে না।

- পামাআলে

চরম উদাস এর ছবি

চলুক

রণদীপম বসু এর ছবি

তা ঠিক যে সাধারণ মানুষও হয়তো অপপ্রয়োগের বিষয়টা বুঝেন। কিন্তু আস্তিক নাস্তিক শব্দগুলো কোত্থেকে এসেছে এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে স্বীকার অস্বীকারের আদৌ কোন সম্পর্ক আছে কিনা সে ব্যাপারে অনেকেই হয়তো অস্পষ্ট। সেই ব্যুৎপত্তিকালেই যে শব্দগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে একধরনের রাজনীতি ছিলো এবং তার সাথে ধর্মাধর্মের কোন সম্পর্ক ছিলো কিনা, সে বিষয়টারই সন্ধান করা হয়েছে। তবে একান্তই তা দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চা হিসেবে। বিষয়টা কিন্তু সেই খ্রীস্টপূর্ব সময়কালের হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর প্রাসঙ্গিকতা এখনো রয়ে গেছে বলেই ব্যুৎপত্তি খোঁজার ছোট্ট প্রয়াসটা নিতে হয়েছে।
আশা করি পাঠকরাও এটিকে একান্তই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির পর্যালোচনা হিসেবে বিবেচনায় নেবেন।

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

অতিথি লেখক এর ছবি

(এবারের থান ইট-টা পুরোপুরি জেনেশুনেই খেয়েছি তাই চোট-চাপট ছাড়াই সামলান গেল )
চমৎকার লেখা। বিষয়টা সত্যই, মানে আমার বোধে বেশীর ভাগ লোকের বোধ সম্পর্কে যে ধারণা সেই আপেক্ষিক অবস্থানের সত্যতায়, জটীল। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে চেক কবি মিরোস্লাভ হোলুব-এর 'সূর্য বিষয়ে' নামের কবিতাটি থেকে কয়েকটি লাইন তোলা যাক।

***************
আমরা সূর্যকে দেখিয়াছি
গাছপালার মধ্যে, তাত্রা জাতীয়বিতানের উপরে,
দেখিয়াছি অনতিক্রম্য রাজপথের ওপারে,
••• •••
কিন্তু কখনও সূর্যকে দেখি নাই,
সেই শুধু-কেবল আর-কিছুই-নয় সূর্যকে।
••• •••
শুধু-কেবল আর-কিছুই-নয় সূর্য মহাশয় এক প্রচন্ড মুষ্ট্যাঘাতের ন্যায়
উপস্থিত থাকেন সমুদ্রের উপর, মরুভূমির উপর
অথবা কোনো বিমানের উপর,
তিনি কোনো ছায়া বানান না আর দল বাঁধিয়া ঝলসানও না,
তিনি এমনই একমাত্র এবং অদ্বিতীয় যে
আছেন কি না সেটাই বোঝা দায়।

সত্যের বেলাতেও ব্যাপারটা ঠিক এইরকমই।
***************
তা এই হচ্ছে হতভাগা সত্যের অবস্থা। সরাসরি উপর থেকে দেখা বেলন দন্ড একটা গোল বৃত্ত। সামনা-সামনি দেখলে আয়তাকার। আর দর্শক যখন বেলন-এর তুলনায় অতি ক্ষুদ্র তখন সেই বেলনটি এক অনন্ত বিস্তারিত তল বিশেষ! আপেক্ষিকতাই ধরে রাখে সত্যকে!
তবে আপনার লেখাটি আগামী খন্ডগুলিতে আরো প্রসারিত হবে আর আমরা ক্রমে আপনার মূল বক্তব্যের মুখোমুখি হব। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম।
- একলহমা

রণদীপম বসু এর ছবি

যাক্, চোট-চাপট ছাড়া সামনের দিকে সামলানো গেলেই হলো !

সত্য যে আপেক্ষিক তার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত কিন্তু আমরা ব্যবহার করে থাকি, যা মূলত প্রাচীন ভারতীয় দর্শন থেকেই এসেছে, অন্ধের হস্তীদর্শন। কারো কাছে স্তম্ভ, কারো কাছে দেয়াল আবার কারো কাছে কুলার মতো। তার পরও তো সত্যকে খুঁজতেই হবে, কী বলেন !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

অতিথি লেখক এর ছবি

"চোট-চাপট ছাড়া সামনের দিকে সামলানো গেলেই হলো !"
হা: হা: হা: নিশ্চয়-ই। অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ এই ধরণের প্রবন্ধ লেখা। আপনি সেটা সামলাচ্ছেন চমৎকার ভাবে। দেখা যাক ক্রমাগত আপেক্ষিক অবস্থান বদল করে, নানা দিক থেকে যা দেখছি তাকে প্রশ্ন করে (দেখার সীমাবদ্ধতার অন্ধত্ব কাটানোর একমাত্র উপায়) ডানা পুড়িয়ে বা না পুড়িয়ে সত্য-র কত কাছাকাছি যাওয়া যায়! জিভ খসিয়ে দেওয়ার মহামানবেরাও তো সদাই প্রস্তুত থাকেন!
- একলহমা

অতিথি লেখক এর ছবি

রণদা, আপনি তো বাঙ্গালির ৩ নম্বর বিচি ধর্মানুভূতির বিচিতে হাত দিয়েছেন। দেখেন আপনার উপর না আবার হাত দেয়।

এবারের এই আস্তিক-নাস্তিক দ্বন্দ আসলে এসেছে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদরদের বাঁচানোর জন্য। এর আগে একাত্তরে এরা মুসলমান-হিন্দু দ্বন্দ লাগিয়ে স্বার্থ হাসিল করেছিলো। আর বাঙ্গালি সব ভুলে বসে আছে, ৪২ বছর পরও একই কথা বলে ওরা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

-----------------
মিলন

রণদীপম বসু এর ছবি

না ভাই, আমি কারো ধর্মানুভূতির ধারে কাছেও যাচ্ছি না। এটা পরিপূর্ণ একটি দর্শন চর্চা। যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভারতীয় দর্শনের পাঠ্য। আমি সেখান থেকেই বিষয়গুলো তুলে আনছি। তাও দু-আড়াইহাজার বছর আগের প্রেক্ষাপট, দর্শন-ইতিহাসও বলতে পারেন।
আমার এই চর্চাকে কেবল তখনই আপত্তিকর বলতে পারেন, যদি তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় দর্শন নামক বিষয়টিকে আপত্তিকর হিসেবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। আমার এ লেখার উৎসগ্রন্থগুলিও কিন্তু সেইসব একাডেমিক পাঠ্যগ্রন্থই।

এটা সবারই স্পষ্টত মনে রাখা উচিৎ যে, দর্শনের সাথে ধর্মানুভূতির কোন সম্পর্ক নেই। আর প্রাচীন ভারতীয় তাবৎ দর্শনই কিন্তু বৈদিক সংস্কৃতি থেকেই উদ্ভূত। আরেকটু সামনে গেলেই দেখবেন যে, আমরা খ্রীস্টপূর্ব সময়কালে অবস্থান করেই বৈদিক সংস্কৃতির সাপেক্ষেই বিষয়গুলো আলোচনা করছি। যেহেতু এই দার্শনিক দ্বন্দ্বটা মূলতই সেই বৈদিক কালের।

এই দ্বন্দ্বটা সেকালে কোন্ প্রেক্ষিতে উদ্ভূত হয়েছিলো তাই দেখার চেষ্টা করেছি। সামনে আমরা হয়তো বেদ, মনুসংহিতা এসব স্মৃতি ও শ্রুতিশাস্ত্র এবং ন্যায় বৈশেষিক, মীমাংসা এসব প্রাচীন দর্শন ও দার্শনিকদের কিঞ্চিৎ তর্ক-বিতর্কই দেখবো। কারণ বিষয়টার উৎস কোথায় সেটিই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। আর দার্শনিক বিতর্কে ধর্মানুভূতি জাতীয় কিছুর অস্তিত্বই নেই। অতএব সে আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক।

গোটা বিষয়টাকে একাডেমিক দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করবো।

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

অতিথি লেখক এর ছবি

চলুক চলুক চলুক চলুক চলুক
ইসরাত

রণদীপম বসু এর ছবি

ধন্যবাদ।

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

রণদীপম বসু এর ছবি

পপকর্ন একা একাই খাইবেন !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আরে আপ্নারেও দিমুনে... (খালি হিম্ভাই'র মত চা খাইতে যাইয়েন না... পিলিজ লাগে)

রণদীপম বসু এর ছবি

ক্যান, আমার কি চা খাইবার মন চায় না ! তয় কেউ যদি সোহাগ কইরা চা-টা আগাইয়া দেয়, তাইলে আর উইঠা যাইতে কে চায় ! হা হা হা !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

তারেক অণু এর ছবি

চলুক, ইয়ে দাদা ম্যাংগো পিপলের জন্য আরেকটু সহজবোধ্য করা সম্ভব কি?

রণদীপম বসু এর ছবি

অণু তো এইবার গোড়া ধরেই টান দিলো দেখছি ! ভড়কে গেলাম পরের পর্বগুলির নিয়তি চিন্তা করে ! হা হা হা !

বিজ্ঞানী জগদীশ বসুই তো মনে হয় বলেছিলেন, যিনি বিজ্ঞান ভালো জানেন তিনিই বিজ্ঞান সহজ করে বোঝাতে পারেন। দর্শন তো ভাই চিরকালই আমার মাথার সাতহাজার ফিট উপর দিয়ে গেছে, আমি কেমনে সহজ করে বোঝাই কন ! ভাবছিলাম কাট-পেস্ট করে কোনভাবে চালিয়ে দেবো, আপনি তো সাক্ষাৎ বিভীষণ হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন এসে ! এখন উপায় !!

যেহেতু আমি নিজেও ম্যাংগো পিপল, তাই ম্যাংগো পিপলের জন্য ভয়ে ভয়ে বলে রাখি, কিছু কিছু বিষয়কে একটানে পড়ে যাওয়ার উপায় থাকে না, রয়েসয়েই বিষয়টাকে উপলব্ধিতে নিতে হয়। দর্শন হলো সেই বদ জিনিস ! তবে আশ্বস্তের বিষয় হলো প্রত্যেকটা মানুষই কিন্তু এক ধরনের দার্শনিকই। তাই শেষ পর্যন্ত এসব ছোট ছোট দার্শনিকতাগুলো অনায়ত্ত থাকে না। সাথে সাথে এটাও ভাবছি, অরিজিনাল দর্শনের ছাত্র কেউ এসে আবার আপত্তি করে বসে যে, উচ্চমার্গীয় বিষয়কে এভাবে টেনে নামিয়ে নিম্নবর্গীয় করার কারণ কী ! হা হা হা !

তবে আমার ঘরে আরেক বিভীষণ যিনি রয়েছেন তিনি আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, যা বোঝো না তা নিয়ে এতো কেরদানির কী দরকার ? তাই আপনার পরামর্শ মনে রেখেও কোনভাবেই আমি আমার সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করছি না কিন্তু ! আসলে কেউ বকছে না দেখে নিজেই বকা শুরু করলাম, এই আর কী !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।