আঙুরলতাকে নিয়ে একটা পোস্টমর্ডান গল্পের প্রচেষ্টা

শুভাশীষ দাশ এর ছবি
লিখেছেন শুভাশীষ দাশ (তারিখ: বুধ, ০৯/১২/২০০৯ - ২:৫২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আঙুরলতাকে নিয়ে আমি অনেক ভাবি। অনেক অনেক গল্প আমার চিন্তা করা হয়েছে তাকে নিয়ে। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। আগে একটা আবছা আবছা চেহারা আমার মাথায় ছিল। ইদানীং ঝামেলা হয়ে গেছে। নামটা মাথায় আসলে সাথে সাথে জয়া আহসানের চেহারা মনে পড়ে। নাটকটা কিভাবে যেন দেখা হয়ে গেছে। আমার আঙুরলতা কিংবা আঙুরলতাকে নিয়ে একটা পোস্টমর্ডান গল্পে জয়া আহসান হানা দিলে গিয়ানজাম লেগে যায়। গল্প তার পাখা নিয়ে তার ডানা উড়িয়ে দূরে সরে পড়ে।

আমি যখন চুপে বসে থাকি আঙুরলতা উঁকি মারে। আঙুরলতা এক স্বাভাবিক মেয়ে। একজন মানুষ মেয়ে। তার ডিভোর্স হয়েছে কিংবা হয়নি। তার স্বামী আছে বা নেই। সে গুলশানে থাকে কিংবা পট্টিতে থাকে। তার ব্যাপারে যে কোন স্বতঃসিদ্ধ ধরে আমি কাহিনী বসাতে পারি। একটু একটু করে খোলসা করতে পারি তার পেখম। তার জড়তা। শোক। মায়াজাল। তার উড়তে শেখা। ডানা কেটে খোজা করে দেয়া। কিন্তু জয়া আহসান তার যাবতীয় প্রোপাগাণ্ডা নিয়ে ঝাঁপিয়ে আমার গল্পের গলা চিপে ধরে।

আঙুরলতার কেউ নেই। স্বামী মরে গেছে। মারার আগে অনেক মেরে গেছে। তার উঠোনে বসে অপেক্ষা করে এক রক্তাক্ত রোদ। সেখানে শকুনরা জড়ো হয়ে মন্ত্র পড়ে। বলে- এসো আঙুরি, অবগাহন করো আমাদের ছায়ায়। হতে পারে।

আঙুরলতার স্বামী আছে। সোহাগ করে খুব। ভালোবাসার সময় তাকে অন্য নামে ডাকে। নদী। আঙ্গিনা। সারা। সোমা। রিতা। আঙুর তার কণ্ঠে, তার কিন্নর ঝংকারে বার্তা পায় মৃতের।মৃত্যুর। অধিকার হারানোর। হতে পারে।

আঙুরলতা বুড়িয়ে গেছে। বুড়ো আর নেই। ছেলে আছে এবং নেই। তার চর্মসার দেহে ধমনী বেশ আস্তে ধীরে রক্ত পাচার করে। তার উঠোন পুড়ে গেছে। কণ্ঠে মাতম আছে। সুর তাচ্ছিল্য করে সুঠাম কর্কশ হয়ে গেছে সে বহুকাল। হতে পারে।

আঙুরলতা আজ বিকালে সবুজ ডুরে শাড়ি পড়ে যাবে কোন মেঘবালকের কাছে। আজ তার আত্মসমর্পনের দিন। দুর্বা দিবে। পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে আজ তার উদ্ধোধন হবে সশরীরে। পরে সব শেষ হয়ে গেলে দক্ষিণা নিয়ে সে ফিরে যাবে তার ম্লান দ্বীপে। রাত্রি নেমে আসবে আরেকটু বেশি রাত করে। হতে পারে।

আঙুরলতা আজ বৃষ্টিতে ভিজে নেয়। পৃথিবী তার মৃত্যুর আগে আজ শেষ বর্ষণ করে। আঙুরলতা তার ডানা পাখা পেখম নিয়ে স্নান করে উজ্জ্বল রোদে। শান্ত হয়। দাবানল নিভে যায়। হতে পারে।

আঙুরলতা তার ছোট্ট আনন্দ নিয়ে একটি পাখি পোষে। দানা দেয়। পাখি খুঁটে খায়। একটু পানি চুমুক দিয়ে দিয়ে খায় অজস্রবার। আঙুরলতা খুশি হয়। কিছুকাল পরে পাখি মারা যায় তার অপাখিত্ব শোক নিয়ে। আঙুরলতা রোদন করে। হতে পারে।

আঙুরলতা আজ এক কেজি আপেলের বদলে ভুল করে এক কেজি আঙুর নিয়ে ঘরে ঢোকে। প্যাকেট খোলার পর এক একটি আঙুর তার উপবৃত্ত শরীরে পরিহাসের দিকে তাকায় তার দিকে। আঙুরলতা কেঁপে ওঠে।হতে পারে।

আঙুরলতা আজ অমরত্ব পাবে। আজ তার শোকসঙ্গীতে বিউগল বাজাবে অনেক গোত্রপতি। আঙুরলতা আজ স্থিতু হবে। আজ দুরন্ত হয়ে দৌড় দিয়ে হাঁফাবে, হাঁফাতে থাকবে আমাদের অজস্র আঙুরলতা। তাও হতে পারে।

আরো অনেক কিছু হতে পারে। আঙুরলতা তার নাম তার একটু একটু করে বিচ্ছিন্ন প্রতিটা বর্ণ আমাকে ক্লান্ত করে দেয় গল্পের রাজ্যে। আ ঙু র ল তা … নবোকভের লোলিতার মতো কখনো সে বালখিল্য হাসি হাসে। কিংবা ধেয়ে আসে ফোকলা দাঁতে। তার মুখের গভীরের গর্তে আমার দেখা হয়ে যায় অন্তহীন কৃষ্ণফুটোর। কলম ঠিকঠাক ধরে কাগজে লিখতে গেলেই সাদা পৃষ্ঠায় আবার জয়া আহসানকে দেখি। আঙুরলতা সরে যায়।তাকে নিয়ে একটা পোস্টমর্ডান গল্প ফের মারা পড়ে।


মন্তব্য

ওসিরিস এর ছবি

দুর্দান্ত লাগলো।
একেই কি ভেগোলজি বলে??? হতে পারে।।

***********************************************
সিগনেচার কই??? আমি ভাই শিক্ষিৎ নই। চলবে টিপসই???

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

বলতে পারেন।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

বস, একদিন মাধবীলতাকে নিয়ে একটা গল্প লেইখেন । আমার খুব প্রিয় চরিত্র-- বলা যায় প্রথম প্রেমিকা।
লেখা খুবই ভালো লাগল--যথারীতি।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

হাসি

সুমন চৌধুরী এর ছবি

এই বিষয়টা আমার কাছে খানিক ধোঁয়াটে। পোমো ট্যাগ লাগানো গল্প আগেও পড়েছি। কিন্তু প্রতিবারই ঠিক কী কারণে পোমো. সেটা আর বোঝা হয়ে ওঠে নাই।

আপনার গল্পটা পড়লাম।

আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা একটা গল্প।



অজ্ঞাতবাস

শুভাশীষ দাশ এর ছবি


পোমো ট্যাগ তো লাগাইনি। ট্যাগ ছিল গল্প, পরমাণু গল্প, প্রায় গল্প। নামে কেবল পোমো আসছে। লেখা আছে বারবার- পোস্টমর্ডান গল্প আর লেখা হয়ে ওঠে নাই। সে কাহিনীরই এক ধরণের অপ-গল্প খাড়া করছি আরকি। ভালৈছে। লেখে আপ করছি। আপনার পোমো গল্পের খাসা খসড়া পাইলাম।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

শব্দ নিয়ে খেলা, বাক্য নিয়ে খেলা, কাঠামো নিয়ে খেলা, আরেকটু সাহস বাড়লে ভাষা নিয়ে খেলা হচ্ছে এক মারাত্মক নেশা। এই খেলায় শহীদুল জহির অমর হয়, সুবিমল মিশ্র অকালে মরে।

Perhaps something has occurred in the history of the concept of structure that could be called an "event," if this loaded word did not entail a meaning which it is precisely the function of structural—or structuralist—thought to reduce or to suspect.

এইখানেই কিন্তু শেষ না। উত্তরাধুনিকতার গুরুরা "একাধিক অর্থ" বা "কনটেক্‌স্টের ভিন্নতার চশমা"র পথ দেখানোর সাথে সাথে হুঁশিয়ারীও উচ্চারণ করেন। নিজেকে নিয়ে, নিজের লেখাকে নিয়ে, নিজের লেখার স্টাইল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করুন - তবে সাবধানে। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মত প্রতিভা ইয়ার্কি করার লোভ সামলাতে না পেরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ড্রয়িংরুম থেকে রান্নাঘরে গিয়ে ঠেকেছেন। নিজের পথটা চিনে নিন, মানুষকে নিজের পরিচয়টা সেভাবেই দিন। চর্চার জন্য, এক্সপেরিমেন্টের জন্য নিজের খেরোখাতাতো আছেই।



তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

পাণ্ডবদা,

আপনার মন্তব্যে আমি গুরুত্ব দিই।

অর্বাচীন এর ছবি

দারুন, দারুন।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

তাই! দারু চোখ টিপি

রণদীপম বসু এর ছবি

শব্দের খেলা দেখলে আমার মনে হয় এ খেলাটা তো আমিও খেলতে পারতাম !
খেললাম না কেন ? আমি খেলতে পারি না। হতে পারে ।

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

আপনি খেলতে পারেন না। কন কি !

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাল লাগলো লেখাটা*নক্ষ্ত্র

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

হাসি

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

দূর্দান্ত লাগলো লেখাটা... স্রেফ দূর্দান্ত
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

শুনে আমারো দুর্দান্ত ভালো লাগলো। নিজের জন্মদিনে এতো লেখা পড়েন। ক্যামনে কি বুঝি না।

পুতুল এর ছবি

আচ্ছা, এটাই তবে পোস্টমর্ডান গল্প?
**********************
ছায়া বাজে পুতুল রুপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কি দোষ!
!কাঁশ বনের বাঘ!

**********************
ছায়াবাজি পুতুলরূপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ!
!কাশ বনের বাঘ!

অতিথি লেখক এর ছবি

দারুন হইছে । আপনার ছফাগিরি বন্ধ করে দিলেন নাকি।

স্বপ্নদ্রোহ

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

'ছফাগিরি। কিস্তি চার ' লিখছি বেশ কয়েকদিন ধরে। কাল আপ করবো।

অতিথি লেখক এর ছবি

শব্দ আর ভাষার মায়াজালে ডুবে ছিলাম, কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম। ধন্যবাদ।

ডি,এম, কামরুজ্জামান।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

থ্যাংকস

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাল লাগলো !! এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম !!!

দিশা___
সচলায়তনের নতুন অতিথি

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

হাসি

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

গল্পটা পড়তে খানিক দেরী হলো। দু'বার পড়লাম।... এই জাতীয় গল্প আমি সাধারণতঃ পাশ কাটিয়ে যাই। ভাবের অস্পষ্টতা, লেখকের সাথে চিন্তাধারার দূরত্ব এরকম গল্পে প্রভাব ফেলে বলে আমি পাশ কাটানোটাকেই শ্রেয় মনে করি।

শব্দ নিয়ে খেলতে আপনি পছন্দ করেন, এটা আপনার লেখা থেকে আমার ধারণা। এটা এ গল্পেও ধরা পড়লো...।

_________________________________________

সেরিওজা

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

চিন্তিত

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।